হান্স ক্রিশ্চিয়ান আন্দেরসেন রচিত 'কোকিল' গল্পটি চীনা রাজ্য ও একটি কোকিলকে ঘিরে আবর্তিত হয়েছে। এটি মূলত একটি রূপকথা। চীন দেশের রাজার রাজ্যে কালো রঙের একটি সুকণ্ঠী কোকিল পাখি ছিল। পাখির সুমধুর গানের সুখ্যাতি চীন দেশে তো বটেই, বিদেশেও ছড়িয়ে পড়েছিল। বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে সেসময় মানুষ চীন দেশে যেত শুধু কোকিল পাখির গান শোনার জন্য।
'কোকিল' গল্পের কোকিল পাখিটির ছিল আশ্চর্য গুণ। সে প্রচণ্ড মধুর কন্ঠে গান গাইতে পারত। পাখিটি বাস করত নীল জলের অতল সমুদ্র আর বনের ঝুঁকে-পড়া ডালপালার আড়ালে। তার গান এতই মধুর যে, জেলে মাছ ধরতে এসে হাতের কাজ ফেলে তার গান শুনত। নানান দেশ থেকে নানান লোক এসে রাজধানীর রাজপ্রাসাদ ও বাগান দেখে। কিন্তু যেই তারা কোকিলের গান শোনে, তখন তাদের মনে হয় অন্য কোনোকিছুই কোকিলের গানের মতো আশ্চর্যরকম ও চমকপ্রদ নয়। দেশে ফিরে তারা কোকিলের গল্প করে। পন্ডিতেরা চীন দেশের বর্ণনা লিখতে গিয়ে হাজার হাজার পাতাজুড়ে কেবল কোকিল ও তার গানের প্রশংসা করেন। কবিরাও হৃদে ঘেরা বনের বুকের এই আশ্চর্য পাখিকে নিয়ে আশ্চর্য সব কবিতা লেখেন। কোকিল পাখিকে নিয়ে লেখা পণ্ডিতদের এসব পুথি ও কবিদের কবিতাগুলো পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে যায়। সবাই এগুলো পড়ে চীন দেশের আশ্চর্য কোকিল পাখি সম্পর্কে জানতে পারে। চীনা রাজার হাতেও এসব পুথি ও কবিতার কয়েকটি আসে। এগুলো পড়ে তিনি তাঁর রাজ্যের সুকণ্ঠী কোকিল পাখিটির বিশ্বজোড়া সুখ্যাতি উপলব্ধি করেন এবং তার জন্য রাজসভায় সোনার খাঁচার ব্যবস্থা করেন।
সূতরাং, উপরের আলোচনার ভিত্তিতে বলা যায়, কোকিলের গানের সুখ্যাতি চীনা রাজ্য ছাপিয়ে সারা বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত ছিল।
শোনো তবে- চীনদেশের রাজা একজন চীনেম্যান, তাঁর আগে-পিছে ডাইনে-বাঁয়ে যত লোক, তারাও সব চীনে। রাজার ছিল এক প্রাসাদ, অমন আর পৃথিবীতে হয় না। বাগানে ফোটে কত আশ্চর্য ফুল; সবচেয়ে যেগুলো দামি তাদের গলায় রুপোর ঘণ্টা বাঁধা, কাছ দিয়ে যদি হেঁটে যাও, ঘণ্টার শব্দে ফিরে তাকাতেই হবে। বুঝালে, রাজার বাগানে সব ব্যবস্থাই চমৎকার। এত বড়ো বাগান, মালি নিজেই জানে না তার শেষ কোথায়। যদি কেবলই হেঁটে চলো, আসবে এক বনের ধারে। কী সুন্দর বন, তাতে মন্ত উঁচু গাছ আর গভীর হ্রদ। বন সোজা সমুদ্রে চলে গেছে, নীল জলের অতল সমুদ্র আর ঝুঁকে-পড়া ডালপালার আড়ালে লুকিয়ে থাকে এক কোকিল। কী মধুর তার গান, এত মধুর যে জেলে মাছ ধরতে এসে হাতের কাজ ফেলে চুপ করে শোনে, যখন শেষ রাতে জাল ফেলতে আসে সে শোনে কোকিলের স্বর।
নানা দেশ থেকে নানা লোক আসে সেই রাজধানীতে, দেখে বাহবা দেয়। রাজার প্রাসাদ আর বাগান দেখে তাদের চোখের পলক আর পড়ে না; কিন্তু কোকিলের গান যেই তারা শোনে, অমনি বলে ওঠে, 'আহা, এমন আর হয় না।' দেশে ফিরে এসে তারা কোকিলের গল্প করে; পণ্ডিতেরা বড়ো-বড়ো পুথি লেখেন চীন রাজার প্রাসাদ নিয়ে, বাগান নিয়ে; কিন্তু কোকিলকে কি তাঁরা ভুলতে পারেন? সেই পাখির প্রশংসা হাজার পাতা জুড়ে, আর কবিরা হ্রদে-ঘেরা বনের বুকের সেই আশ্চর্য পাখিকে নিয়ে আশ্চর্য সব কবিতা লেখেন।
পুথিগুলো পৃথিবীতে কে না পড়ল! আর চীন রাজার হাতেও কয়েকখানা এসে পড়ল বইকি। তাঁর সোনার সিংহাসনে বসে-বসে তিনি পড়লেন, আরও পড়লেন, পড়তে পড়তে কেবলি খুশি হয়ে মাথা নাড়তে লাগলেন-কেবল তাঁর রাজধানীর, তাঁর প্রাসাদের, তাঁর বাগানের এতসব উচ্ছ্বসিত বর্ণনা পড়ে বড়ো ভালো লাগল তাঁর। 'কিন্তু সবচেয়ে ভালো হচ্ছে কোকিল পাখি', সেখানে স্পষ্ট করে লেখা।
রাজা চমকে উঠলেন। কোকিল। সে কী জিনিস? ও-রকম কোনো পাখি আছে নাকি আমার রাজত্বে? আমার বাগানেও নাকি আছে! আমি তো কখনো শুনিনি! কী কাণ্ড, তার কথা আমি প্রথম জানলাম এসব বই পড়ে। রাজা তাঁর প্রধান অমাত্যকে ডেকে পাঠালেন। তিনি এতই প্রধান যে তাঁর নিম্নস্থ কেউ যদি কখনো সাহস করে তাঁর সঙ্গে কথা বলত তিনি শুধু জবাব দিতেন 'পি।' আর তার অবশ্য কোনো মানে হয় না।
কোকিল বলে এক আশ্চর্য পাখি নাকি এখানে আছে', রাজা বললেন। 'এঁরা বলছেন আমার এত বড়ো রাজত্বে সেটাই শ্রেষ্ঠ জিনিস। কই, আমি তো তার কথা কখনো শুনিনি!'
প্রধান অমাত্য একটু ভেবে বললেন, 'রাজসভায় সে তো কখনো উপস্থিত হয়নি, তার তো নামই শুনিনি, মহারাজ।'
রাজা বললেন, 'আজ সন্ধ্যায় সে আমার সভায় এসে গান করবে, এই আমার আদেশ। যদি সে না-আসে তাহলে আজ সান্ধ্যভোজের পর আমার সমস্ত সভাসদ হাতির নিচে পড়ে মরবে।'
চুং-পি!' প্রধান অমাত্য বলে উঠলেন। তারপর আবার তিনি ওঠানামা করলেন দু-শো সিঁড়ি দিয়ে, খুঁজলেন সব ঘর, সব বারান্দা, আর সভাসদরা ছুটল তাঁর সঙ্গে-সঙ্গে। হাতির নিচে পড়ে মরতে কারুরই পছন্দ নয়। শেষটায় রান্নাঘরে ছোটো একটা মেয়ের সঙ্গে তাদের দেখা, রাজার পাঁচশো রাঁধুনির জন্য পাঁচশো ঝি, সেই ঝিদের মধ্যে সবচেয়ে ছোটো সে। সে বলল, 'কোকিল? আমি তো রোজই শুনি তার গান- আহা, সত্যি বড়ো ভালো গায়।'
প্রধান অমাত্য গম্ভীরমুখে বললেন, 'আজ সন্ধ্যায় কোকিলের রাজসভায় আসবার কথা। তুমি পারবে আমাদের তার কাছে নিয়ে যেতে? যদি পারো, এক্ষুনি তোমাকে রাঁধুনি করে দেব, তা ছাড়া মহারাজ যখন ভোজে বসবেন তুমি দরজার ধারে দাঁড়িয়ে দেখবার অনুমতি পাবে।' তখন তারা সবাই মিলে গেল সেই বনে, কোকিল যেখানে গান গায়; গেল মন্ত্রী, সেনাপতি, উজির, নাজির, হাকিম, পেশকার।
'ওই তো!' মেয়েটি বলল। 'শুনুন আপনারা, শুনুন- ওই তো সে বসে আছে।' মেয়েটি একটা গাছের ঘন ডালের দিকে আঙুল তুলে দেখাল।
অনেকক্ষণ উঁকিঝুঁকি লাফঝাঁপ মেরে অনেক চেষ্টায় সবাই সেই কালো পাখিকে দেখতে পেল। প্রধান অমাত্য বলে উঠলেন, 'আরে এ আবার একটা পাখি নাকি। মরি মরি, কী রূপ।'
সমস্ত দল এই রসিকতায় হেসে উঠল। মেয়েটি গলা চড়িয়ে বলল, 'কোকিল, শুনছ? আমাদের সম্রাট তোমার গান শোনবার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন।' 'নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই।' কোকিল তক্ষুনি মহা উৎসাহে গান গাইতে আরম্ভ করল।
কোকিল ভেবেছিল সম্রাট বুঝি সেখানে উপস্থিত। প্রধান অমাত্য গম্ভীর স্বরে বললেন, 'বেশ গান তোমার, কোকিল। আজ রাজপ্রাসাদের সান্ধ্যউৎসবে তোমাকে আমি নিমন্ত্রণ করছি, সেখানে তুমি গান শুনিয়ে আমাদের সম্রাটকে মুগ্ধ করবে।'
রাজসভায় আজ উৎসব-সজ্জা। সভার ঠিক মাঝখানে সোনার একটা ডালে হীরের পাতা বসানো, কোকিল সেখানে বসবে। সভাসদরা বসেছেন সাজের আর অলংকারের ঝিলিক তুলে, আর সেই ছোটো মেয়েটি দরজার আড়ালে-সে এখন রাজ-রাঁধুনির পদ পেয়েছে। সবাই কোকিলের দিকে তাকিয়ে; স্বয়ং সম্রাট চোখের ইশারায় তাকে উৎসাহ দিচ্ছেন।
আর কোকিল এমন আশ্চর্য গান করল যে সম্রাটের দুই চোখ জলে ভরে উঠল, চোখ ছাপিয়ে বেয়ে পড়ল গাল দিয়ে; তখন কোকিল পাইল আরও মধুর, আরও তীব্র মধুর স্বরে, তা সোজা বুকের মধ্যে এসে লাগল। সম্রাট এত খুশি হলেন যে তিনি তাকে তাঁর একপাটি সোনার চটি গলায় পরবার জন্যে দিতে চাইলেন। কিন্তু কোকিল বলল, 'মহারাজ, আমাকে ক্ষমা করুন, আমি আর কিছু নিতে পারব না, যথেষ্ট পুরস্কার আমি পেয়েছি। আমি সম্রাটের চোখে অশ্রু দেখেছি- সেই তো আমার পরম ঐশ্বর্য। সম্রাটের অশ্রুর অদ্ভুত ক্ষমতা- এত বড়ো পুরস্কার আর কী আছে।'
তখন থেকে রাজসভাতেই তার বাসা হলো, নিজের সোনার খাঁচায়। দিনের মধ্যে দু-বার সে বেরোতে পারে, আর রাত্রে একবার। আর তার বেরোবার সময় সঙ্গে থাকে বারোজন চাকর, তাদের প্রত্যেকের হাতে পাখির পায়ের সঙ্গে বাঁধা রেশমি সুতো শক্ত করে ধরা। এ রকম বেড়ানোয় কোনো সুখ নেই, সত্যি বলতে।
একদিন রাজার নামে এল মস্ত একটা পার্সেল, তার গায়ে বড়ো-বড়ো অক্ষরে লেখা, 'কোকিল।' 'এই বিখ্যাত পাখি সম্বন্ধে নতুন একটা বই এল', রাজা বললেন। কিন্তু বই তো নয়, বাক্সের মধ্যে ছোটো একটা জিনিস। চমৎকার কাজ করা একটা কলের কোকিল, মণি মুক্তো হীরে জহরতে ঝলোমলো, সত্যিকারের পাখির মতো তার গান। কলের পাখিটায় দম দিয়েছ কি সে অবিকল কোকিলের মতো গাইতে শুরু করবে, আর সঙ্গে সঙ্গে দুলবে তার সোনা-রুপোর কাজ-করা লেজ। গলায় তার ছোট্ট ফিতে বাঁধা, তাতে লেখা ‘জাপানের মহামহিমান্বিত সম্রাটের কোকিলের তুলনায় চীন সম্রাটের কোকিল কিছুই নয়।’
'এখন এরা দুজন একসঙ্গে গান করুক', রাজা বললেন। 'সে কী চমৎকারই হবে!' দু-জনে একসঙ্গে গাইল, কিন্তু বেশি জমল না। কারণ কলের কোকিল গাইল বাঁধা গৎ, আর সত্যিকারের কোকিল গাইল নিজের খেয়ালে।
কোকিলবাহক বলল, 'আমাদের কোকিলের কিছু দোষ নয়; ও বাঁধা সুরে গায়- একেবারে নিখুঁত।' তারপর কলের কোকিল একা গাইল। আসল কোকিলেরই মতো সে মুগ্ধ করল- তার ওপর সে দেখতে অনেক ভালো, বাজুবন্ধহারের মতো ঝলমল করছে। একবার নয়, দুবার নয়, বত্রিশবার কলের কোকিল সেই একই গৎ গাইল, তবু ক্লান্ত হলো না। অমাত্যদের আবার শুনতেও আপত্তি নেই, কিন্তু সম্রাট বললেন, 'এখন জ্যান্ত কোকিল কিছু গান করুক।' কিন্তু কোথায় সে? কখন সে উড়ে গেছে খোলা জানালা দিয়ে, ফিরে গেছে বনের সবুজ বুকে, কেউ লক্ষ করেনি।
তারপর অবশ্য কলের কোকিলকে আবার গাইতে হলো, চৌত্রিশবারের বার একই গৎ তারা শুনল। পরের পূর্ণিমায় রাজ্যের সব প্রজাকে নিমন্ত্রণ করা হলো এই পাখি দেখতে- সংগীতবিশারদ দেখাবেন। গানও শুনতে হবে তাদের, রাজার হুকুম। গান তারা শুনল- একবার নয়, দু-বার নয়, ছত্রিশবার। এত খুশি হলো তারা গান শুনে, যেন ছত্রিশ পেয়ালা চা খেয়েছে। কেউ বলল আহা, কেউ বলল ওহো; কেউ ঘাড় নাড়ল, কেউ নাড়ল মাথা; কিন্তু সেই যে জেলে, বনের মধ্যে আসল কোকিলের গান যে শুনেছিল, সে বলল, 'মন্দ নয়, কিন্তু যতবার গাইল এক রকমই লাগল যেন। আর কী-যেন একটা নেই মনে হলো।'
জেলে বেচারা ঘাবড়ে চুপ করে গেল। আসল কোকিল নির্বাসিত হলো দেশ থেকে। নকল পাখিটা রইল রাজার হালে; সম্রাটের বিছানার পাশে রেশমি বালিশে সে ঘুমোয়, চারদিকে মণিমুক্তো হীরে-জহরতের সব উপঢৌকন ছড়ানো। সংগীতবিশারদ এই নকল পাখি সম্বন্ধে পঁচিশখানা মোটা-মোটা পুথি লিখে ফেললেন- তাঁর লেখা যেমন লম্বা তেমনি গুরু-গম্ভীর, চীনে ভাষার যত শক্ত-শক্ত কথা সব আছে তাতে- তবু সবাই বলল যে তারা সবটা পড়েছে এবং পড়ে বুঝেছে, পাছে কেউ বোকা ভাবে, কি সংগীতবিশারদ চটে গিয়ে পাগলা হাতির নিচে তাদের থেঁতলে মারেন। কাটল এক বছর এমনি করে। কলের পাখির গানের প্রতিটি ছোটো-ছোটো টান সম্রাটের মুখস্থ, তাঁর পারিষদদের মুখস্থ, প্রত্যেক চীনের মুখস্থ। এরই মধ্যে একদিন হলো কী- কলের পাখি গেয়ে চলছে, এত ভালো সে আর কখনোই যেন গায়নি- সম্রাট শুনছেন বিছানায় শুয়ে। হঠাৎ পাখিটার ভেতরে একটা শব্দ হলো, 'গর, কী যে একটা ছিঁড়ে গেল 'গ-গ- গর' সবগুলো চাকা একবার ঘুরে এল, তারপর গান গেল থেমে।
সম্রাট লাফিয়ে উঠলেন, ডেকে পাঠালেন তাঁর দেহ-পুরোহিতকে (চীন সম্রাটের চিকিৎসকের তা-ই উপাধি); কিন্তু তিনি কী করবেন? তারপর ডাকা হলো ঘড়িওয়ালাকে- অনেক বলাবলি, অনেক খোঁজাখুঁজি, টুকটাক ঠুকঠাকের পর পাখিটাকে কোনোরকম মেরামত করা গেল বটে; কিন্তু আগের জিনিস আর হলো না। ঘড়িওয়ালা বলে গেল একে যেন খুব সাবধানে নাড়াচাড়া করা হয়, কলকবজা গেছে খারাপ হয়ে, নতুন আর বসানো যাবে না। এরপর থেকে বছরে একবারের বেশি একে গাওয়ানো যাবে না, আর তাও না-গাওয়ালেই ভালো। রাজ্যে হাহাকার পড়ে গেল।
পাঁচ বছর কেটে গেল- এবার রাজ্যে সত্যিকারের হাহাকার। চীনেরা তাদের সম্রাটকে সত্যি ভালোবাসে, আর এখন শোনা যাচ্ছে সম্রাটের নাকি অসুখ, আর বেশি দিন তিনি বাঁচবেন না। এরই মধ্যে নতুন একজন সম্রাট ঠিক করা হয়ে গেছে; আর প্রজারা রাজপ্রাসাদের বাইরে রাস্তায় দাঁড়িয়ে প্রধান অমাত্যর কাছে খোঁজ নিচ্ছে রাজা কেমন আছেন। প্রধান অমাত্য বলছে, 'পি!' আর মাথা নাড়ছেন। মন্ত জমকালো বিছানায় সম্রাট শুয়ে আছেন- শরীর তাঁর ঠান্ডা, মুখ তাঁর ম্লান। সভাসদদের ধারণা তিনি মরে গেছেন- তাঁরা ছুটেছেন নতুন সম্রাটকে অভিনন্দন জানাতে। কিন্তু সম্রাট মরেননি; শক্ত, নিঃসাড় হয়ে শুয়ে আছেন জমকালো বিছানায়। ঘরের জানালা খোলা, আকাশ থেকে চাঁদের আলো এসে পড়েছে সম্রাটের ওপর আর তাঁর কলের পাখির ওপর। অতি কষ্টে সম্রাটের নিশ্বাস পড়ছে, কেউ যেন চেপে বসেছে তাঁর বুকের ওপর। চোখ মেলে তিনি তাকালেন; দেখলেন তাঁর বুকের ওপর মৃত্যু বসে, তার মাথায় তাঁরই সোনার মুকুট, এক হাতে তাঁরই তরোয়াল, অন্য হাতে তাঁরই ঝকঝকে নিশান। এখন মৃত্যু কিনা তাঁর বুকের ওপর বসে। 'গান। গান!' সম্রাট বলে উঠলেন।
কিন্তু পাখিটা চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল- কে দেবে তাকে দম, আর দম না-দিয়ে দিলে সে গাইবেই-বা কী করে? আর হঠাৎ জানালার দিক থেকে বেজে উঠল গান, আশ্চর্য মধুর গান। এ সেই ছোট্ট কোকিল, আসল কোকিল, জানালার বাইরে গাছের ডালে বসে সে গাইছে। সে শুনেছিল সম্রাট ভালো নেই, আর তাই সে এসেছে তাঁকে শান্তি দিতে, আশা দিতে। গেয়ে চলল সে একমনে, রক্ত উষ্ণ হয়ে উঠে জোরে বইল সম্রাটের দুর্বল শরীরে; এমনকি মৃত্যুও কান পেতে শুনল, তারপর বলল: 'আহা- থেমো না, বাছা, থেমো না!' 'তবে আমাকে দাও ওই ঝকঝকে সোনালি তরোয়াল, দাও ওই চোখ-ঝলসানো নিশান, দাও ওই সম্রাটের মুকুট।'
আর মৃত্যু একে-একে সব ঐশ্বর্যই দিয়ে দিল, গান শুনবে বলে। কোকিলের গান আর থামে না। রাজা বলে উঠলেন, 'ধন্য কোকিল, তুমি ধন্য! ওরে দেবতার দূত স্বর্গের পাখি, তোকে তো আমি চিনি! তোকেই না আমি আমার রাজত্ব থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিলাম! তবু তুই-ই তো আজ তাড়িয়ে দিলি মৃত্যুকে আমার হৃদয় থেকে। কী পুরস্কার চাস তুই বল।'
কোকিল বলল, 'আমি, তো পেয়েছি আমার পুরষ্কার। মহারাজ, প্রথম যেদিন আমি আপনার সামনে গান করি, আপনার চোখে জল এসেছিল। তা আমি কখনো ভুলব না। যে গান গায়, ওর বেশি আর কোন মণিমুক্তো চায় সে? এখন আপনি ঘুমোন, মহারাজ, সুস্থ সবল হয়ে উঠুন, আর আমি আপনাকে গান শোনাই।' গাইল কোকিল, শুনতে শুনতে সম্রাট ঘুমিয়ে পড়লেন। সে-ঘুম মুছিয়ে দিল তাঁর সকল রোগ, সকল ক্লান্তি। সকালবেলার আলো জানালা দিয়ে তাঁর মুখের ওপর এসে পড়ল; তিনি জেগে উঠলেন- নতুন স্বাস্থ্য, নতুন উৎসাহ নিয়ে। অমাত্য কি ভৃত্য কেউ তখনও আসেনি, সবাই জানে তিনি আর বেঁচে নেই। কেবল কোকিল তখনও গান করছে তাঁর পাশে বসে।
'তুমি সবসময় থাকবে আমার সঙ্গে থাকবে তো?' সম্রাট বললেন। 'তোমার যেমন খুশি গান করবে তুমি। কলের পুতুলটাকে হাজার টুকরো করে আমি ভেঙে ফেলব।' কোকিল বলল, 'মহারাজ, মিছিমিছি ওর ওপর রাগ করছেন। যতখানি ওর সাধ্য ও করেছে; এতদিন ওকে রেখেছেন, এখনও রাখুন। আমি তো রাজপ্রাসাদে বাসা বেঁধে থাকতে পারব না; অনুমতি করুন, যখন ইচ্ছে করবে আমি আসব, এসে সন্ধেবেলায় জানালার ধারে ওই ডালের ওপর বসে গান শোনাব আপনাকে- সে গান শুনে অনেক কথা আপনার মনে পড়বে। যারা সুখী তাদের গান গাইব, যারা দুঃখী তাদের গান গাইব; গাইব চারদিকে লুকোনো ভালো-মন্দের গান। আপনার এই ছোটো পাখিটি অনেক দূরে-দূরে ঘুরে বেড়ায়, গরিব জেলের ঘরে, চাষিদের খেতে- আপনার সভার ঐশ্বর্য থেকে অনেক দূরে যারা থাকে, যায় তাদের কাছে, জানে তাদের কথা। আপনাকে আমি গান শোনাব এসে; কিন্তু মহারাজ, একটি কথা আমাকে দিতে হবে।' 'যা চাও। যা কিছু চাও তুমি।' সম্রাট নিজের হাতেই তাঁর রাজবেশ পরে উঠে দাঁড়ালেন, তাঁর সোনার তরোয়াল চেপে ধরলেন বুকের ওপর। 'এই মিনতি আমার, ছোটো একটা পাখি এসে আপনাকে সব কথা বলে যায় এ-কথা কাউকে বলবেন না। তাহলেই সব ভালো রকম চলবে।' এল ভৃত্য, এল অমাত্য মৃত সম্রাটকে দেখতে। এ কী! ওই তো তিনি দাঁড়িয়ে! সম্রাট তাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, 'এসো'।
কলের কোকিল আগের মতো বাজে না বলে রাজ্যে হাহাকার পড়ে গেল।
কোকিল' গল্পে আসল কোকিলের গান শুনে রাজা মুগ্ধ হয়ে তাকে রাজপ্রাসাদে সোনার খাঁচায় রেখে দেন। তখন কলের কোকিল তার প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠে। সবাই কলের কোকিলের প্রশংসা করলে আসল কোকিল অবহেলার শিকার হয়ে রাজপ্রাসাদ ত্যাগ করে চলে যায়। এরই মধ্যে কলের কোকিলের তার ছিঁড়ে যায়। তাকে মেরামত করা হলেও আগের মতো তা আর টানা বাজে না। এ কারণে রাজ্যে হাহাকার পড়ে গেল।
উদ্দীপকের বিষয়টি 'কোকিল' গল্পের আসল কোকিলের জন্য সোনার খাঁচা এবং কলের কোকিলের গৎ বাঁধা সুরের সঙ্গে বৈসাদৃশ্যপূর্ণ।
জগতের সবকিছুই নিয়মের মধ্যে চলে। অনিয়ম হলেই সমস্যা দেখা দেয়। তাই যার যেখানে স্থান সেখানে থাকলেই নিয়ম রক্ষা হয় এবং সে ভালো থাকে।
উদ্দীপকে টুনটুনির বাসা তৈরির পদ্ধতি ও 'বৈশিষ্ট্য তুলে ধরা হয়েছে। এখানে হিংস্র জন্তুর আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য টুনটুনির বিশেষ পদ্ধতিতে বাসা তৈরির কথা বলা হয়েছে। এ দিকটি 'কোকিল' গল্পে বনের কোকিল রাজপ্রাসাদে সোনার খাঁচায় পুরে রাখার সঙ্গে বৈসাদৃশ্যপূর্ণ। কারণ বনের পাখিকে খাঁচায় রাখলে তার সৌন্দর্য নষ্ট হয়। অন্যদিকে কলের পাখিকে চাবি দিয়ে যে সুর পাওয়া যায় তা কোকিলের আসল সুর নয়, নকল সুর।
"যন্ত্রের চাকচিক্য সবসময় প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বিকল্প হয় না।"-উদ্দীপক ও 'কোকিল' গল্পের আলোকে মন্তব্যটি বিশ্লেষণ করা হলো।
যেকোনো বস্তু বা প্রাণী তার উপযুক্ত পরিবেশেই বেশি সুন্দর। যদি এর বিঘ্ন ঘটে তবে সেটির প্রকৃত সৌন্দর্য প্রকাশ পায় না এবং সেটির গুরুত্ব কমে যায়।
উদ্দীপকে টুনটুনির বাসা তৈরির বিষয়টি আলোচনা করা হয়েছে। এখানে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের প্রকাশ লক্ষ করা যায়। এ বিষয়টি 'কোকিল' গল্পের আসল কোকিলের জন্য সোনার খাঁচা এবং কলের কোকিলের নির্দিষ্ট করা সুর শুনে প্রশংসার সঙ্গে বৈসাদৃশ্যপূর্ণ। কারণ উভয়ই প্রকৃতির সম্পর্কচ্যুত। তাতে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের প্রকাশ লক্ষ করা যায় না।
'কোকিল' গল্পে বনের কোকিল রাজপ্রাসাদ ত্যাগ করার পর কলের কোকিলের তার ছিড়ে যায়। তাকে মেরামত করলেও আগের মতো সেটি বাজে না। ফলে রাজা অসুস্থ হয়ে পড়লেও তাকে সুস্থ করার জন্য কোনো সুর কলের কোকিল শোনাতে পারে না। তখন আসল কোকিল এসে মধুর সুরে গান শুনিয়ে রাজাকে সুস্থ করে তোলে। আসল কোকিল এখানে প্রকৃতির সৌন্দর্য চেতনার প্রতীক। যার সঙ্গে উদ্দীপকের টুনটুনির বাসা বানানো ও জীবনযাপন একসূত্রে গাঁথা। এদিক বিচারে তাই বলা যায়, প্রশ্নোক্ত মন্তব্যটি যথার্থ।
কলের কোকিলের প্রশংসায় অবহেলিত হয়ে আসল কোকিল রাজপ্রাসাদ ত্যাগ করে।
রাজা আসল কোকিলকে রাজসভায় ডেকে পাঠান। কোকিল সেখানে গান করে রাজাকে মুগ্ধ করে। রাজা খুশি হয়ে তাকে রাজসভায়ই সোনার খাঁচায় পুরে রাখেন। সেখানে এক কলের কোকিল তার প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠে। তার গৎ বাঁধা কণ্ঠ ও সুর শুনে সবাই প্রশংসা করে আর আসল কোকিলকে অবহেলা করতে থাকে। তাতে আসল কোকিল কষ্ট পেয়ে সোনার খাঁচা থেকে বের হয়ে রাজপ্রাসাদ ত্যাগ করে।