আল্লাহ ও রাসুল (স)-এর নির্দেশিত পথে গবেষণার মাধ্যমে ইজমাভিত্তিক বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীরা হলেন মুজতাহিদ।
কুরআন-সুন্নাহ পরিপন্থি ইজমা গ্রহণযোগ্য নয়। ইজমা বৈধ হওয়ার শর্ত হলো ইজমা কুরআন-সুন্নাহর 'নসের' বিরোধী হবে না। ইজমার সিদ্ধান্ত কোনোক্রমেই সাহাবাদের অভিমত বা সিদ্ধান্তের পরিপন্থি হতে পারবে না। ইজমার বিধানের মূলভিত্তি অবশ্যই শরিয়তের দলিলের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। তাই কুরআন-সুন্নাহ পরিপন্থি ইজমা গ্রহণযোগ্য না।
উদ্দীপকে দুইজন জ্যেষ্ঠ শিক্ষকের নীরবতা সত্ত্বেও জনাব মারুফকে হোস্টেল সুপার নিয়োগের প্রক্রিয়াটি শরিয়তের তৃতীয় উৎস ইজমার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। 'ইজমা' শব্দের অর্থ হলো একমত হওয়া, ঐক্যবদ্ধ হওয়া, মতৈক্য প্রতিষ্ঠা করা ইত্যাদি। সাধারণভাবে বলা যায়, মহানবি (স)-এর পর কোনো এক সময়কার মুসলিম উম্মতের সমস্ত মুজতাহিদ একত্রিত ও সম্পূর্ণ একমত হয়ে ইজতিহাদযোগ্য বিষয়ে শরিয়তের যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন, তাই ইজমা। তবে সবার ঐকমত্য বাদেও কয়েকজনের মৌনসম্মতি থাকা সত্ত্বেও ইজমা হতে পারে। উদ্দীপকেও এ বিষয়টি লক্ষ করা যায়।
উদ্দীপকে জনাব মারুফকে হোস্টেল সুপার হিসেবে নির্বাচিত করার প্রস্তাব উত্থাপিত হলে অধিকাংশ শিক্ষক তাতে মত দেন। কিন্তু দুইজন শিক্ষক এ ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত না দিয়ে নীরব থাকেন। তারপরও মারুফকে নির্বাচিত করা হয়। ইসলামি শরিয়তে ইজমার ক্ষেত্রেও অনুরূপ প্রক্রিয়া অনুসৃত হতে পারে। ইজমার একটি স্তর হচ্ছে সাহাবি (রা)-দের নীরবতামূলক ইজমা পালন করা। যে ইজমার মধ্যে কতিপয় মুজতাহিদ সম্মতি দিয়ে সম্মিলিতভাবে কাজটি করেছেন, কিন্তু বাকিরা ওই বিষয়ে নীরব থেকেছেন এবং কোনো রূপ প্রতিবাদ করেননি, তাকেই সাহাবি (রা)-দের নীরবতামূলক ইজমা বলা হয়। উদ্দীপকের ঘটনাটিতেও একই ধরনের প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে। তাই প্রক্রিয়াগত দিক থেকে এ দুটি বিষয় সাদৃশ্যপূর্ণ।
উদ্দীপকে উপাধ্যক্ষের সংবর্ধনার সিদ্ধান্তের প্রক্রিয়াটি সব সাহাবি (রা)-এর ইজমার অনুরূপ। আর এ ধরনের ঐকমত্য যেকোনো বিষয়ে সফলতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো একটি বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে যদি সব সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারেন, তবে সে সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে অনেক ফলপ্রসূ হয়। এ কারণে ইসলামে ইজমার ক্ষেত্রে সবার ঐকমত্যের বিষয়টি সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। উদ্দীপকে এ ধরনের ইজমার প্রকাশ পেয়েছে।
উদ্দীপকের উপাধ্যক্ষের সংবর্ধনা প্রদানের তারিখ নির্ধারনে সবার ঐক্যমত্য হয়। এ ঐকমত্যের গুরুত্ব অনেক বেশি। কেননা হকুম অনুসারে সব সাহাবির ঐকমত্যের ভিত্তিতে যে ইজমা সংঘটিত হয়, তা সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ও শক্তিশালী। এ ধরনের ইজমা প্রথম শ্রেণির ইজমা। সবার একমত হওয়ার মধ্য দিয়ে মূলত সমস্যাধীন বিষয়ে সব বিভ্রান্তি দূরীভূত হয়। এ নিয়ে পরবর্তীতে আর কোনো প্রশ্ন করার সুযোগ যেমন থাকে না। তেমনি কোনোরূপ দ্বন্দ্ব- সংঘাতেরও আশঙ্কা থাকে না। এ ধরনের ইজমার মধ্য দিয়ে মূলত জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয়। ইসলামের দৃষ্টিতে এ ধরনের ইজমা অবশ্যই মানতে হবে এবং কেউ এটি অস্বীকার করলে সে কাফির হয়ে যাবে। এ পরিপ্রেক্ষিতে উদ্দীপকে সবার ঐকমত্যের ভিত্তিতে আলোচ্য সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজনও বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এক্ষেত্রে উক্ত অনুষ্ঠানটি সফলতার সাথে সুসম্পন্ন করা সহজ হবে।
পরিশেষে বলা যায়, আমাদের জীবনের সবক্ষেত্রে একতা ও ঐকমত্য গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে আমাদের উচিত ইজমার শিক্ষা বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করা।
Related Question
View All'নিফাক' অর্থ- কপটতা, ভণ্ডামি ইত্যাদি।
'হুরুফে মুকাত্তায়াত' বলতে কুরআনে সংযোজিত বিচ্ছিন্ন বর্ণসমূহকে বোঝায়। কুরআন মাজিদের মোট ২৯টি সুরার শুরুতে হুরুফে মুকাত্তায়াত রয়েছে। প্রত্যেক গ্রন্থেই কিছু গোপন বিষয় থাকে, আর আল- কুরআনের গোপন বিষয় হলো হরফে মুকাত্তায়াত। তাফসিরকারগণের মতে যেসব বর্ণের প্রকৃত অর্থ ও যথার্থ মর্ম আল্লাহ ছাড়া আর কেউ অবহিত নয় তাকেই 'হুরুফে মুকাত্তায়াত' বলে। যেমন- এর অর্থ আল্লাহ ছাড়া আর কেউ অবগত নয়।
মিথ্যাচার করা মুনাফিকের স্বভাব। মুনাফিক বলতে তাদেরকে বোঝায়, যারা মৌখিকভাবে ইমানের ঘোষণা দেয়, নামাজ, রোজাও পালন করে, কিন্তু অন্তরে কুফরি পোষণ করে। এদের মুখের ভাষা এক রকম কিন্তু অন্তর অন্যরকম। উদ্দীপকের দৃশ্যপট-১ এ দেখা যায় রাইয়্যান এ স্বভাবের অধিকারী।
উদ্দীপকের রাইয়্যান মিথ্যাচারের মাধ্যমে মুনাফিকি করে। সুরা আল বাকারায় দ্বিতীয় রুকুতে আল্লাহ তায়ালা মুনাফিকদের করুণ পরিণতির কথা তুলে ধরেছেন। মুনাফিকরা ইমান আনার কথা বলে আল্লাহ ও মুমিনদের ঠকাতে চায়। কিন্তু তাদের এ কাজের কারণে নিজেরাই ঠকে। তাদের এরূপ কাজের কারণে দুনিয়া ও আখিরাতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। প্রকৃতপক্ষেই মুনাফিকদের অন্তরে থাকে নিফাক, কুফর, শিরকের ব্যাধি। তাদের এসব স্বভাবের কারণে পাপপ্রবণতা বৃদ্ধি পেতে থাকে। ফলে তারা আল্লাহর অনুগ্রহ ও রহমত থেকে বঞ্চিত হয়। তারা পৃথিবীতে অসম্মান ও অবিশ্বাসের পাত্রে পরিণত হয়। তাছাড়া পরকালীন জীবনেও তাদের কল্পনাতীত শাস্তি পেতে হবে। হাদিসেও নবি (স) মুনাফিকদের শাস্তির কথা বর্ণনা করেছেন। তাছাড়া মুনাফিকদের তিনটি গুণের মধ্যে মিথ্যাচার একটি। মিথ্যাচারকে মহানবি (স) সব পাপের মূল হিসেবে অবহিত করেছেন।
ওপরের আলোচনার আলোকে বলতে পারি, রাইয়্যান মিথ্যাচার করার মাধ্যমে মুনাফিকির স্বভাব পোষণ করছে। যার জন্য পরকালে তাকে কঠোর শাস্তি পেতে হবে।
উম্মাহর ঐকমত্যের জন্য বর্তমানে ইজমার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। ইজমা হচ্ছে সমকালীন বিজ্ঞ আলেমদের কোনো বিষয়ের ওপর ঐকমত্য। ধর্মীয় বা পার্থিব যেকোনো বিষয়ের বিধান উদ্ভাবন, প্রবর্তন বা নির্ধারণের ক্ষেত্রে যেকোনো যুগের মুসলিম মুজতাহিদ আলেমদের ঐকমত্যের মাধ্যমেই ইজমা হয়ে থাকে।
উদ্দীপকের দৃশ্যপট-২ এ রফিক ইসলামিক স্টাডিজ নিয়ে অধ্যয়ন করার কারণে ইজমার ব্যাপারে জানতে পারে। সে মুসলিম উম্মাহর ঐকমত্যের জন্য উদগ্রীব। বর্তমান বিশ্বে বিভিন্ন বৈপরীত্য মাসয়ালার সুন্দর সমাধানে ইজমার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। ইসলামি আইনের উৎসসমূহের মধ্যে কুরআন ও হাদিসের পরেই এর অবস্থান হওয়াতে এর দ্বারা শরিয়তের বিভিন্ন মাসয়ালা প্রণয়নে এর প্রয়োজন পড়ে। কুরআন ও হাদিসে যে পরিমাণ সমস্যার সমাধান পেশ করা হয়েছে তার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ অনেকগুণ বেশি বিষয়ে কোনো সমাধান দেওয়া হয়নি। এক্ষেত্রে সামঞ্জস্যপূর্ণ বিধান প্রবর্তন করতে ইজমার বিকল্প নেই। নবোদ্ভাবিত সব সমস্যার সমাধানে ইজমা অনিবার্য। তাছাড়া মহানবি (স) বলেছেন- 'আমার উম্মত বিভ্রান্তির ওপর এক হবে না।' রাসুল (স) এর এ বাণীর মধ্যেই ইজমার গুরুত্ব বিদ্যমান। কেননা রাসুল (স) নিজেই ইজমার প্রতি ইঙ্গিত করে আলেমদের ঐকমত্যে পৌঁছানোর উপদেশ দিয়েছেন।
ওপরের আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলতে পারি, বর্তমান বিশ্বে নতুন নতুন যেসব ধর্মীয় বিশৃঙ্খলা দেখা দিচ্ছে তা ইজমার মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব।
রুখসাত অর্থ অবকাশ, ঐচ্ছিক বা হালকা।
যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিরাই ইজমা করতে পারবে। ইজমা সম্পাদনে যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের 'আহলুল ইজমা' বলা হয়। রাসুল (স)-এর ইন্তেকালের পর সাহাবিরা ছিলেন ইজমার আহল। কেননা রাসুলের পর তারাই ছিলেন ইসলামি শরিয়ত সম্পর্কে অভিজ্ঞ, রাসুল (স)-এর পছন্দনীয় এবং সমাজে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি। সাহাবিদের যুগের পরে অভিজ্ঞ আলিমগণ ইজমা প্রদান করতে পারবেন। এভাবে শরিয়ত সম্পর্কে অভিজ্ঞ এবং সর্বজন গ্রহণযোগ্য মানুষ, যারা ইজমা প্রদান করলে তা শরিয়তের বিধানে পরিণত হবে সে ধরনের ব্যক্তি বা মানুষদের আহলুল ইজমা বা ইজমার আহল বলা হয়।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!