উত্তরঃ

'অন্নবস্ত্রের প্রাচুর্যের চেয়েও মুক্তি বড়' – এ বোধটি মানবতাবোধ এবং শোষণমুক্তির আকাঙ্ক্ষার পরিচায়ক।

Satt AI
Satt AI
1 week ago
উত্তরঃ

মোতাহের হোসেন চৌধুরী রচিত 'শিক্ষা ও মনুষ্যত্ব' প্রবন্ধে মানুষের দুটি সত্তার কথা বলা হয়েছে— একটি হলো মানবসত্তা এবং অপরটি হলো মনুষ্যত্ব। প্রবন্ধকারের মতে, মানবসত্তা হলো মানুষের জৈবিক অস্তিত্ব যা অন্নবস্ত্রের সংস্থান ও মৌলিক চাহিদা পূরণের সাথে জড়িত। এর ঊর্ধ্বে উঠে মানবিক গুণাবলি, পরার্থপরতা, বিবেকবোধ ও মূল্যবোধের পরিচর্যার মধ্য দিয়ে যে উন্নত সত্তার বিকাশ ঘটে, তাই হলো মনুষ্যত্ব। এটি মানুষের মুক্তি ও আত্মিক আনন্দের উৎস।

উদ্দীপকের রশিদ সাহেব বন্যায় দুর্দশাগ্রস্ত মানুষের দুঃখ দেখে নিজের পেনশনের টাকায় খাদ্যসামগ্রী কিনে তাদের মাঝে বিতরণ করে জীবন রক্ষায় এগিয়ে আসেন। তার এই কর্মে ব্যক্তিগত স্বার্থচিন্তা বা পার্থিব লাভের আকাঙ্ক্ষা ছিল না, বরং ছিল অন্যের প্রতি গভীর সহানুভূতি ও নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগ। তিনি নিজের আর্থিক নিরাপত্তা উপেক্ষা করে বন্যার্তদের কল্যাণে এগিয়ে এসে প্রমাণ করেছেন যে, তিনি জাগতিক ভোগ বা ক্ষুদ্র স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে মনুষ্যত্বের আলোকবর্তিকা ধারণ করেছেন। তাঁর এই মানবতাবাদী আচরণ 'শিক্ষা ও মনুষ্যত্ব' প্রবন্ধে বর্ণিত মনুষ্যত্ব সত্তার এক প্রকট উদাহরণ।

'শিক্ষা ও মনুষ্যত্ব' প্রবন্ধে লেখক দেখিয়েছেন যে, মানবসত্তা কেবল জৈবিক চাহিদা পূরণে ব্যস্ত থাকে, কিন্তু মনুষ্যত্ব মানুষের আত্মাকে মুক্তি দেয় এবং বৃহত্তর কল্যাণের পথে পরিচালিত করে। রশিদ সাহেবের কাজ প্রমাণ করে যে তিনি কেবল নিজের জীবিকার 'সুড়ঙ্গ পথে' আটকে থাকেননি, বরং মানবিক দায়িত্ববোধ এবং আত্মত্যাগের মাধ্যমে 'মুক্তির আনন্দ' উপলব্ধি করতে পেরেছেন। এই মুক্তির আনন্দই তাকে ভোগবাদী মানসিকতা থেকে দূরে সরিয়ে এনে আর্তমানবতার সেবায় উদ্বুদ্ধ করেছে, যা মনুষ্যত্বের প্রকৃত পরিচয়।

Satt AI
Satt AI
1 week ago
উত্তরঃ

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার কাব্যগ্রন্থ 'গীতাঞ্জলি'-এর জন্য নোবেল পুরস্কার পান।

Satt AI
Satt AI
1 week ago
উত্তরঃ

বাণীকন্ঠের পরিবারকে একঘরে করবে এমন জনরব শুনা যায় কারণ সে সমাজের তথাকথিত নিচু জাত বা ভিন্ন ধর্মাবলম্বী এক বৃদ্ধা মুসলিম মহিলাকে নিজ গৃহে আশ্রয় ও সেবা দিয়েছিল। গ্রামের কতিপয় রক্ষণশীল ও গোঁড়া হিন্দু ব্যক্তি এই বিষয়টিকে তাদের ধর্ম ও সামাজিক রীতির পরিপন্থী বলে মনে করেছিল।

তৎকালীন গ্রামীণ সমাজে ধর্ম ও জাতপাত নিয়ে কঠিন ভেদাভেদ প্রচলিত ছিল। কোনো উঁচু জাতের ব্যক্তি যদি নিচু জাতের বা ভিন্ন ধর্মাবলম্বী কোনো মানুষের প্রতি সহানুভূতি দেখাতো কিংবা নিজ গৃহে আশ্রয় দিত, তবে সমাজ তাকে অচ্ছুত বা একঘরে করার হুমকি দিত। বাণীকন্ঠের এই মানবতাবাদী কাজের জন্য গ্রাম্য সমাজের কট্টরপন্থীরা তার পরিবারকে সমাজচ্যুত করার জনরব তুলেছিল।

Satt AI
Satt AI
1 week ago
উত্তরঃ

'সুভা' গল্পের প্রধান চরিত্র সুভা যেমন তার বাকহীনতার কারণে মানবসমাজ থেকে এক ধরনের বিচ্ছিন্নতা অনুভব করে প্রকৃতির মাঝে আশ্রয় খুঁজেছিল, তেমনি উদ্দীপক-১ এ বর্ণিত কবিতার বক্তাও প্রকৃতির সাথে মিশে গিয়ে এক ধরনের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছে। উভয় ক্ষেত্রেই প্রকৃতির আশ্রয় এবং সরল জীবনের প্রতি আকর্ষণ সাদৃশ্যপূর্ণ দিক।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'সুভা' গল্পে সুভা বাকপ্রতিবন্ধী হওয়ায় মানব সমাজে নিজেকে অপাঙক্তেয় মনে করত। সে মানুষের কাছে ভালোবাসা ও সহমর্মিতা পেলেও তার মনের ভাব প্রকাশ করতে পারত না। তাই সে তার বিশ্বস্ত সঙ্গী নির্বাক প্রকৃতি, বিশেষত নদীর কলতান, গোয়ালঘরের দুটি গাভী এবং ছাগলছানার কাছেই নিজের অনুভূতি ও আশ্রয় খুঁজে পেত। প্রকৃতির সান্নিধ্যে সে নিজেকে স্বাধীন ও স্বচ্ছন্দ মনে করত এবং এক অনাবিল শান্তি খুঁজে পেত।

অপরদিকে, উদ্দীপক-১ এ বর্ণিত কবিতার বক্তা প্রজাপতি হয়ে নানান রঙের ফুলের উপর বসে সুবাস নিতে চায়। এই আকাঙ্ক্ষা মূলত প্রকৃতির সাথে মিশে গিয়ে মানবজীবনের জটিলতা, সীমাবদ্ধতা এবং অপ্রাপ্তি থেকে মুক্তি পাওয়ার এক গভীর ইচ্ছেকে নির্দেশ করে। প্রজাপতির ন্যায় স্বাধীন ও মুক্তভাবে বিচরণ করার মাধ্যমে বক্তা এক অনাবিল আনন্দ ও সরলতার জীবন পেতে চেয়েছেন, যা সুভার প্রকৃতিতে আশ্রয় খোঁজার এবং সেখানে শান্তি ও মুক্তির অন্বেষণের মানসিকতার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ।

Satt AI
Satt AI
1 week ago
উত্তরঃ

উদ্দীপক-২ এর শ্রেয়সীর মতো সুভার বাবা-মা ও বন্ধুরা হলে সুভার পরিণতি ভিন্ন হতো—মন্তব্যটি যথার্থ। সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি ও মানুষের সহযোগিতা যেকোনো প্রতিবন্ধী মানুষের জীবন বদলে দিতে পারে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত 'সুভা' গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র সুভা জন্মগতভাবে বাকপ্রতিবন্ধী ছিল। তার বাবা-মা তাকে পরিবারের বোঝা মনে করত এবং সমাজের কাছে তাদের অযোগ্যতা হিসেবে দেখত। ফলে সুভা একাকী জীবন কাটাত, কেবল প্রকৃতির সঙ্গেই তার গভীর সম্পর্ক গড়ে ওঠেছিল। অন্যদিকে, উদ্দীপক-২ এর শ্রেয়সী দুর্ঘটনায় দুটি পা হারালেও তার বাবা-মা ও সহপাঠীদের অক্লান্ত সহযোগিতা ও ভালোবাসায় সে একজন প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এই দুটি ঘটনা বিপরীতমুখী পরিণতির উদাহরণ স্থাপন করে।

সুভার জীবন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তার বাকপ্রতিবন্ধিতা যতটা না তার ব্যক্তিগত সমস্যা ছিল, তার চেয়ে বেশি সমস্যা ছিল তার প্রতি সমাজের এবং এমনকি তার পরিবারের সদস্যদের দৃষ্টিভঙ্গি ও আচরণ। তার বাবা-মা তাকে গ্রহণ করতে পারেননি, তার প্রতি সহানুভূতি বা ভালোবাসার পরিবর্তে তারা লোকলজ্জার ভয়ে ভোগেন। গ্রামবাসীও তাকে নিয়ে নানান কথা বলত। এই নেতিবাচক পরিবেশ সুভাকে আরও একা করে দেয় এবং তার মধ্যে আত্মবিশ্বাস গড়ে উঠতে দেয়নি। তার কোনো বন্ধু ছিল না, যার সাথে সে মনের কথা ভাগ করে নিতে পারত। ফলে, সুভার জীবন হয়ে ওঠেছিল এক অন্তর্মুখী, বেদনাকাতর ও নির্জন জীবন।

যদি সুভার বাবা-মা ও বন্ধুরা উদ্দীপক-২ এর শ্রেয়সীর মতো হতো, অর্থাৎ তারা সুভার প্রতি সংবেদনশীল, সহানুভূতিশীল এবং সহযোগিতাপূর্ণ মনোভাব পোষণ করত, তবে সুভার জীবন সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারত। সুভার বাবা-মা যদি তাকে বোঝা না ভেবে তার বিশেষ চাহিদাগুলো পূরণ করার চেষ্টা করতেন, তাকে সমাজে স্বাবলম্বী করার জন্য শিক্ষিত করতেন এবং তার প্রতি ভালোবাসা ও আস্থা দেখাতেন, তাহলে সে হয়তো আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠত। একইভাবে, তার সহপাঠী বা বন্ধুবান্ধব যদি তাকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করত, তার সঙ্গে খেলাধুলা করত এবং তার প্রতি সহানুভূতির হাত বাড়িয়ে দিত, তাহলে সুভার একাকীত্ব দূর হতো। বাকপ্রতিবন্ধী হলেও সুভার মনের গভীরতা ছিল, কিন্তু সেই গভীরতা প্রকাশের কোনো সুযোগ তার হয়নি। শ্রেয়সীর মতো সুভাও যদি সামাজিক ও পারিবারিক সমর্থন পেত, তবে তার মানসিক বিকাশ ঘটত এবং সেও হয়তো কোনো কর্মের মাধ্যমে নিজের যোগ্যতার প্রমাণ দিতে পারত, যা তার জীবনকে নতুন অর্থ দিত এবং তাকে সমাজের মূল স্রোতে যুক্ত করত। তাই বলা যায়, এই মন্তব্যটি যথার্থ যে সুভা সঠিক সমর্থন পেলে তার পরিণতি ভিন্ন হতে পারত।

Satt AI
Satt AI
1 week ago
490

মেয়েটির নাম যখন সুভাষিণী রাখা হইয়াছিল তখন কে জানিত সে বোবা হইবে। তাহার দুটি বড়ো বোনকে সুকেশিনী ও সুহাসিনী নাম দেওয়া হইয়াছিল, তাই মিলের অনুরোধে তাহার বাপ ছোটো মেয়েটির নাম সুভাষিণী রাখে । এখন সকলে তাহাকে সংক্ষেপে সুভা বলে ।
দস্তুরমত অনুসন্ধান ও অর্থব্যয়ে বড়ো দুটি মেয়ের বিবাহ হইয়া গেছে, এখন ছোটোটি পিতামাতার নীরব হৃদয়ভারের মতো বিরাজ করিতেছে।
যে কথা কয় না সে যে অনুভব করে ইহা সকলের মনে হয় না, এইজন্য তাহার সাক্ষাতেই সকলে তাহার ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে দুশ্চিন্তা প্রকাশ করিত। সে যে বিধাতার অভিশাপস্বরূপে তাহার পিতৃগৃহে আসিয়া জন্মগ্রহণ করিয়াছে এ কথা সে শিশুকাল হইতে বুঝিয়া লইয়াছিল। তাহার ফল এই হইয়াছিল, সাধারণের দৃষ্টিপথ হইতে সে আপনাকে গোপন করিয়া রাখিতে সর্বদাই চেষ্টা করিত। মনে করিত, আমাকে সবাই ভুলিলে বাঁচি । কিন্তু, বেদনা কি কেহ কখনো ভোলে? পিতামাতার মনে সে সর্বদাই জাগরূক ছিল ।
বিশেষত, তাহার মা তাহাকে নিজের একটা ত্রুটিস্বরূপ দেখিতেন; কেননা, মাতা পুত্র অপেক্ষা কন্যাকে নিজের অংশরূপে দেখেন— কন্যার কোনো অসম্পূর্ণতা দেখিলে সেটা যেন বিশেষরূপে নিজের লজ্জার কারণ বলিয়া মনে করেন। বরঞ্চ, কন্যার পিতা বাণীকণ্ঠ সুভাকে তাঁহার অন্য মেয়েদের অপেক্ষা যেন একটু বেশি ভালোবাসিতেন; কিন্তু মাতা তাহাকে নিজের গর্ভের কলঙ্ক জ্ঞান করিয়া তাহার প্রতি বড়ো বিরক্ত ছিলেন। সুভার কথা ছিল না, কিন্তু তাহার সুদীর্ঘপল্লববিশিষ্ট বড়ো বড়ো দুটি কালো চোখ ছিল এবং তাহার ওষ্ঠাধর ভাবের আভাসমাত্রে কচি কিশলয়ের মতো কাঁপিয়া উঠিত।
কথায় আমরা যেভাব প্রকাশ করি সেটা আমাদিগকে অনেকটা নিজের চেষ্টায় গড়িয়া লইতে হয়, কতকটা তর্জমা করার মতো; সকল সময়ে ঠিক হয় না, ক্ষমতার অভাবে অনেক সময়ে ভুলও হয়। কিন্তু কালো চোখকে কিছু তর্জমা করিতে হয় না- মন আপনি তাহার উপরে ছায়া ফেলে; ভাব আপনি তাহার উপরে কখনো প্রসারিত কখনো মুদিত হয়, কখনো উজ্জ্বলভাবে জ্বলিয়া উঠে, কখনো ম্লানভাবে নিবিয়া আসে, কখনো অস্তমান চন্দ্রের মতো অনিমেষভাবে চাহিয়া থাকে, কখনো দ্রুত চঞ্চল বিদ্যুতের মতো দিগ্‌বদিকে ঠিকরিয়া উঠে। মুখের ভাব বৈ আজন্মকাল যাহার অন্য ভাষা নাই তাহার চোখের ভাষা অসীম উদার এবং অতলস্পর্শ গভীর— অনেকটা স্বচ্ছ আকাশের মতো, উদয়াস্ত এবং ছায়ালোকের নিস্তব্ধ রঙ্গভূমি। এই বাক্যহীন মনুষ্যের মধ্যে বৃহৎ প্রকৃতির মতো একটা বিজন মহত্ত্ব আছে। এইজন্য সাধারণ বালকবালিকারা তাহাকে একপ্রকার ভয় করিত, তাহার সহিত খেলা করিত না। সে নির্জন দ্বিপ্রহরের মতো শব্দহীন এবং সঙ্গীহীন ।
গ্রামের নাম চণ্ডীপুর। নদীটি বাংলাদেশের একটি ছোটো নদী, গৃহস্থঘরের মেয়েটির মতো, বহুদূর পর্যন্ত তাহার প্রসার নহে; নিরলসা তন্বী নদীটি আপন কূল রক্ষা করিয়া কাজ করিয়া যায়; দুই ধারের গ্রামের সকলেরই সঙ্গে তাহার যেন একটা-না-একটা সম্পর্ক আছে । দুই ধারে লোকালয় এবং তরুচ্ছায়াঘন উচ্চ তট; নিম্নতল দিয়া গ্রামলক্ষ্মী স্রোতস্বিনী আত্মবিস্মৃত দ্রুত পদক্ষেপে প্রফুল্ল হৃদয়ে আপনার অসংখ্য কল্যাণকার্যে চলিয়াছে ।
বাণীকণ্ঠের ঘর নদীর একেবারে উপরেই। তাহার বাঁখারির বেড়া, আটচালা, গোয়ালঘর, ঢেঁকিশালা, খড়ের স্তূপ, তেঁতুলতলা, আম কাঁঠাল এবং কলার বাগান নৌকাবাহী-মাত্রেরই দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এই গার্হস্থ্য সচ্ছলতার মধ্যে বোবা মেয়েটি কাহারও নজরে পড়ে কি না জানি না, কিন্তু কাজকর্মে যখনই অবসর পায় তখনই সে এই নদীতীরে আসিয়া বসে।
প্রকৃতি যেন তাহার ভাষার অভাব পূরণ করিয়া দেয়। যেন তাহার হইয়া কথা কয়। নদীর কলধ্বনি, লোকের কোলাহল, মাঝির গান, পাখির ডাক, তরুর মর্মর— সমস্ত মিশিয়ে চারিদিকের চলাফেরা- আন্দোলন-কম্পনের সহিত এক হইয়া সমুদ্রের তরঙ্গরাশির ন্যায় বালিকার চিরনিস্তব্ধ হৃদয়- উপকূলের নিকটে আসিয়া ভাঙিয়া ভাঙিয়া পড়ে। প্রকৃতির এই বিবিধ শব্দ এবং বিচিত্র গতি, ইহাও বোবার ভাষা – বড়ো বড়ো চক্ষুপল্লববিশিষ্ট সুভার যেভাষা তাহারই একটা বিশ্বব্যাপী বিস্তার; ঝিল্লিরবপূর্ণ তৃণভূমি হইতে শব্দাতীত নক্ষত্রলোক পর্যন্ত কেবল ইঙ্গিত, ভঙ্গি, সংগীত, ক্রন্দন এবং দীর্ঘনিশ্বাস ।
এবং মধ্যাহ্নে যখন মাঝিরা জেলেরা খাইতে যাইত, গৃহস্থেরা ঘুমাইত, পাখিরা ডাকিত না, খেয়া-নৌকা বন্ধ থাকিত, সজন জগৎ সমস্ত কাজকর্মের মাঝখানে সহসা থামিয়া গিয়া ভয়ানক বিজনমূর্তি ধারণ করিত, তখন রুদ্র মহাকাশের তলে কেবল একটি বোবা প্রকৃতি এবং একটি বোবা মেয়ে মুখামুখি চুপ করিয়া বসিয়া থাকিত— একজন সুবিস্তীর্ণ রৌদ্রে, আর-একজন ক্ষুদ্র তরুচ্ছায়ায় ।

সুভার যে গুটিকতক অন্তরঙ্গ বন্ধুর দল ছিল না তাহা নহে। গোয়ালের দুটি গাভী, তাহাদের নাম সর্বশী ও পাঙ্গুলি। সে নাম বালিকার মুখে তাহারা কখনো শুনে নাই, কিন্তু তাহার পদশব্দ তাহারা চিনিত— তাহার কথাহীন একটা করুণ সুর ছিল, তাহার মর্ম তাহারা ভাষার অপেক্ষা সহজে বুঝিত । সুভা কখন তাহাদের আদর করিতেছে, কখন ভর্ৎসনা করিতেছে, কখন মিনতি করিতেছে, তাহা তাহারা মানুষের অপেক্ষা ভালো বুঝিতে পারিত ৷
সুভা গোয়ালে ঢুকিয়া দুই বাহুর দ্বারা সর্বশীর গ্রীবা বেষ্টন করিয়া তাহার কানের কাছে আপনার গণ্ডদেশ ঘর্ষণ করিত এবং পাঙ্গুলি স্নিগ্ধদৃষ্টিতে তাহার প্রতি নিরীক্ষণ করিয়া তাহার গা চাটিত। বালিকা দিনের মধ্যে নিয়মিত তিনবার করিয়া গোয়ালঘরে যাইত, তাহা ছাড়া অনিয়মিত আগমনও ছিল; গৃহে যেদিন কোনো কঠিন কথা শুনিত সেদিন সে অসময়ে তাহার এই মূক বন্ধু দুটির কাছে আসিত- তাহার সহিষ্ণুতাপরিপূর্ণ বিষাদশান্ত দৃষ্টিপাত হইতে তাহারা কী একটা অন্ধ অনুমানশক্তির দ্বারা বালিকার মর্মবেদনা যেন বুঝিতে পারিত, এবং সুভার গা ঘেঁষিয়া আসিয়া অল্পে অল্পে তাহার বাহুতে শিং ঘষিয়া ঘষিয়া তাহাকে নির্বাক ব্যাকুলতার সহিত সান্ত্বনা দিতে চেষ্টা করিত।
ইহারা ছাড়া ছাগল এবং বিড়ালশাবকও ছিল; কিন্তু তাহাদের সহিত সুভার এরূপ সমকক্ষভাবে মৈত্রী ছিল না, তথাপি তাহারা যথেষ্ট আনুগত্য প্রকাশ করিত। বিড়ালশিশুটি দিনে এবং রাত্রে যখন- তখন সুভার গরম কোলটি নিঃসংকোচে অধিকার করিয়া সুখনিদ্রার আয়োজন করিত এবং সুভা তাহার গ্রীবা ও পৃষ্ঠে কোমল অঙ্গুলি বুলাইয়া দিলে যে তাহার নিদ্রাকর্ষণের বিশেষ সহায়তা হয়, ইঙ্গিতে এরূপ অভিপ্রায়ও প্রকাশ করিত ৷
উন্নত শ্রেণির জীবের মধ্যে সুভার আরো একটি সঙ্গী জুটিয়াছিল। কিন্তু তাহার সহিত বালিকার ঠিক কিরূপ সম্পর্ক ছিল তাহা নির্ণয় করা কঠিন, কারণ, সে ভাষাবিশিষ্ট জীব; সুতরাং উভয়ের মধ্যে সমভাষা ছিল না ।
গোঁসাইদের ছোটো ছেলেটি— তাহার নাম প্রতাপ । লোকটি নিতান্ত অকর্মণ্য। সে যে কাজকর্ম করিয়া সংসারের উন্নতি করিতে যত্ন করিবে, বহু চেষ্টার পর বাপ-মা সে আশা ত্যাগ করিয়াছেন । অকর্মণ্য লোকের একটা সুবিধা এই যে, আত্মীয় লোকেরা তাহাদের উপর বিরক্ত হয় বটে, কিন্তু প্ৰায় তাহারা নিঃসম্পর্ক লোকদের প্রিয়পাত্র হয়— কারণ, কোনো কার্যে আবন্ধ না থাকাতে তাহারা সরকারি সম্পত্তি হইয়া দাঁড়ায়। শহরের যেমন এক-আধটা গৃহসম্পর্কহীন সরকারি বাগান থাকা আবশ্যক তেমনি গ্রামে দুই-চারিটা অকর্মণ্য সরকারি লোক থাকার বিশেষ প্রয়োজন। কাজে-কর্মে আমোদে অবসরে যেখানে একটা লোক কম পড়ে সেখানেই তাহাদিগকে হাতের কাছে পাওয়া যায় ।
প্রতাপের প্রধান শখ- ছিপ ফেলিয়া মাছ ধরা। ইহাতে অনেক সময় সহজে কাটানো যায়। অপরাহ্ণে নদীতীরে ইহাকে প্রায় এই কাজে নিযুক্ত দেখা যাইত । এবং এই উপলক্ষে সুভার সহিত তাহার প্রায় সাক্ষাৎ হইত । যে-কোনো কাজেই নিযুক্ত থাক, একটা সঙ্গী পাইলে প্রতাপ থাকে ভালো । মাছ ধরার সময় বাক্যহীন সঙ্গীই সর্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ— এইজন্য প্রতাপ সুভার মর্যাদা বুঝিত । এইজন্য, সকলেই সুভাকে সুভা বলিত, প্রতাপ আর-একটু অতিরিক্ত আদর সংযোগ করিয়া সুভাকে ‘সু’ বলিয়া ডাকিত ।

সুভা তেঁতুলতলায় বসিয়া থাকিত এবং প্রতাপ অনতিদূরে ছিপ ফেলিয়া জলের দিকে চাহিয়া থাকিত। প্রতাপের জন্য একটি করিয়া পান বরাদ্দ ছিল, সুভা তাহা নিজে সাজিয়া আনিত। এবং বোধ করি অনেকক্ষণ বসিয়া বসিয়া চাহিয়া ইচ্ছা করিত, প্রতাপের কোনো-একটা বিশেষ সাহায্য করিতে, একটা-কোনো কাজে লাগিতে, কোনোমতে জানাইয়া দিতে যে এই পৃথিবীতে সেও একজন কম প্রয়োজনীয় লোক নহে। কিন্তু কিছুই করিবার ছিল না। তখন সে মনে মনে বিধাতার কাছে অলৌকিক ক্ষমতা প্রার্থনা করিত— মন্ত্রবলে সহসা এমন একটা আশ্চর্য কাণ্ড ঘটাইতে ইচ্ছা করিত যাহা দেখিয়া প্রতাপ আশ্চর্য হইয়া যাইত, বলিত, ‘তাই তো, আমাদের সুভির যে এত ক্ষমতা তাহা তো জানিতাম না ।'
মনে করো, সুভা যদি জলকুমারী হইত; আস্তে আস্তে জল হইতে উঠিয়া একটা সাপের মাথার মণি ঘাটে রাখিয়া যাইত; প্রতাপ তাহার তুচ্ছ মাছধরা রাখিয়া সেই মানিক লইয়া জলে ডুব মারিত; এবং পাতালে গিয়া দেখিত, রুপার অট্টালিকায় সোনার পালঙ্কে—কে বসিয়া? – আমাদের বাণীকণ্ঠের ঘরের সেই বোবা মেয়ে সু— আমাদের সু সেই মণিদীপ্ত গভীর নিস্তব্ধ পাতালপুরীর একমাত্র রাজকন্যা। তাহা কি হইতে পারিত না, তাহা কি এতই অসম্ভব। আসলে কিছুই অসম্ভব নয়, কিন্তু তবুও সু প্রজাশূন্য পাতালের রাজবংশে না জন্মিয়া বাণীকণ্ঠের ঘরে আসিয়া জন্মিয়াছে এবং গোঁসাইদের ছেলে প্রতাপকে কিছুতেই আশ্চর্য করিতে পারিতেছে না ।
সুভার বয়স ক্রমেই বাড়িয়া উঠিতেছে। ক্রমে সে যেন আপনাকে আপনি অনুভব করিতে পারিতেছে। যেন কোনো একটা পূর্ণিমাতিথিতে কোনো-একটা সমুদ্র হইতে একটা জোয়ারের স্রোত আসিয়া তাহার অন্তরাত্মাকে এক নূতন অনির্বচনীয় চেতনাশক্তিতে পরিপূর্ণ করিয়া তুলিতেছে । সে আপনাকে আপনি দেখিতেছে,ভাবিতেছে, প্রশ্ন করিতেছে, এবং বুঝিতে পারিতেছে না ।
গভীর পূর্ণিমারাত্রে সে এক-একদিন ধীরে শয়নগৃহের দ্বার খুলিয়া ভয়ে ভয়ে মুখ বাড়াইয়া বাহিরের দিকে চাহিয়া দেখে পূর্ণিমাপ্রকৃতিও সুভার মতো একাকিনী সুপ্ত জগতের উপর জাগিয়া বসিয়া— যৌবনের রহস্যে পুলকে বিষাদে অসীম নির্জনতার একেবারে শেষ সীমা পর্যন্ত, এমন— কি, তাহা অতিক্রম করিয়াও ধমথম করিতেছে, একটি কথা কহিতে পারিতেছে না। এই নিস্তব্ধ ব্যাকুল প্রকৃতির প্রান্তে একটি নিস্তব্ধ ব্যাকুল বালিকা দাঁড়াইয়া ।
এ দিকে কন্যাভারগ্রস্ত পিতামাতা চিন্তিত হইয়া উঠিয়াছেন। লোকেও নিন্দা আরম্ভ করিয়াছে । এমন-কি, এক-ঘরে করিবে এমন জনরবও শুনা যায়। বাণীকণ্ঠের সচ্ছল অবস্থা, দুই বেলাই মাছভাত খায়, এজন্য তাহার শত্রু ছিল।
স্ত্রীপুরুষে বিস্তর পরামর্শ হইল । কিছুদিনের মতো বাণী বিদেশে গেল । অবশেষে ফিরিয়া আসিয়া কহিল, “চলো, কলিকাতায় চলো।”

বিদেশযাত্রার উদ্‌যোগ হইতে লাগিল। কুয়াশা-ঢাকা প্রভাতের মতো সুভার সমস্ত হৃদয় অশ্রুবাষ্পে একেবারে ভরিয়া গেল। একটা অনির্দিষ্ট আশঙ্কা বশে সে কিছুদিন হইতে ক্রমাগত নির্বাক জন্তুর মতো তাহার বাপ-মায়ের সঙ্গে সঙ্গে ফিরিত- ডাগর চক্ষু মেলিয়া তাঁহাদের মুখের দিকে চাহিয়া কী— একটা বুঝিতে চেষ্টা করিত, কিন্তু তাঁহারা কিছু বুঝাইয়া বলিতেন না ।
ইতিমধ্যে একদিন অপরাহ্ণে ছিপ ফেলিয়া প্রতাপ হাসিয়া কহিল, “কী রে সু, তোর নাকি বর পাওয়া গেছে, তুই বিয়ে করতে যাচ্ছিস? দেখিস আমাদের ভুলিস নে।” বলিয়া আবার মাছের দিকে মনোযোগ করিল ।
মর্মবিদ্ধ হরিণী ব্যাধের দিকে যেমন করিয়া তাকায়, নীরবে বলিতে থাকে ‘আমি তোমার কাছে কী দোষ করিয়াছিলাম', সুভা তেমনি করিয়া প্রতাপের দিকে চাহিল; সেদিন গাছের তলায় আর বসিল না; বাণীকণ্ঠ নিদ্রা হইতে উঠিয়া শয়নগৃহে তামাক খাইতেছিলেন, সুভা তাঁহার পায়ের কাছে বসিয়া তাঁহার মুখের দিকে চাহিয়া কাঁদিতে লাগিল । অবশেষে তাহাকে সান্ত্বনা দিতে গিয়া বাণীকণ্ঠের শুষ্ক কপোলে অশ্রু গড়াইয়া পড়িল ।
কাল কলিকাতায় যাইবার দিন স্থির হইয়াছে। সুভা গোয়ালঘরে তাহার বাল্য-সখীদের কাছে বিদায় লইতে গেল, তাহাদিগকে স্বহস্তে খাওয়াইয়া, গলা ধরিয়া একবার দুই চোখে যত পারে কথা ভরিয়া তাহাদের মুখের দিকে চাহিল— দুই নেত্রপল্লব হইতে টপ টপ করিয়া অশ্রুজল পড়তে লাগিল ।
সেদিন শুক্লাদ্বাদশীর রাত্রি। সুভা শয়নগৃহ হইতে বাহির হইয়া তাহার সেই চিরপরিচিত নদীতটে শষ্পশয্যায় লুটাইয়া পড়িল— যেন ধরণীকে, এই প্রকাণ্ড মূক মানবতাকে দুই বাহুতে ধরিয়া বলিতে চাহে, ‘তুমি আমাকে যাইতে দিয়ো না মা, আমার মতো দুটি বাহু বাড়াইয়া তুমিও আমাকে ধরিয়া রাখো।' [সংক্ষেপিত]

Related Question

View All
354
উত্তরঃ জ্ঞান পরিবেশন মূলত যোগাযোগ ও তথ্য আদান-প্রদানের একটি উপায়।
Satt AI
Satt AI
1 week ago
828
শিক্ষকদের জন্য বিশেষভাবে তৈরি

১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!

শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!

প্রশ্ন এডিট করা যাবে
জলছাপ দেয়া যাবে
ঠিকানা যুক্ত করা যাবে
Logo, Motto যুক্ত হবে
অটো প্রতিষ্ঠানের নাম
অটো সময়, পূর্ণমান
প্রশ্ন এডিট করা যাবে
জলছাপ দেয়া যাবে
ঠিকানা যুক্ত করা যাবে
Logo, Motto যুক্ত হবে
অটো প্রতিষ্ঠানের নাম
অটো সময়, পূর্ণমান
অটো নির্দেশনা (এডিটযোগ্য)
অটো বিষয় ও অধ্যায়
OMR সংযুক্ত করা যাবে
ফন্ট, কলাম, ডিভাইডার
প্রশ্ন/অপশন স্টাইল পরিবর্তন
সেট কোড, বিষয় কোড
অটো নির্দেশনা (এডিটযোগ্য)
অটো বিষয় ও অধ্যায়
OMR সংযুক্ত করা যাবে
ফন্ট, কলাম, ডিভাইডার
প্রশ্ন/অপশন স্টাইল পরিবর্তন
সেট কোড, বিষয় কোড
এখনই শুরু করুন ডেমো দেখুন
৫০,০০০+
শিক্ষক
৩০ লক্ষ+
প্রশ্নপত্র

Related Question

মাত্র ১৫ পয়সায় প্রশ্নপত্র
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন তৈরি করুন আজই

Complete Exam
Preparation

Learn, practice, analyse and improve

1M+ downloads
4.6 · 8k+ Reviews