উত্তরঃ উদ্দীপকে প্রতাপের প্রধান শখ উল্লেখ নেই।
Satt AI
Satt AI
4 weeks ago
উত্তরঃ

উদ্দীপকে উল্লিখিত মিদুল এবং 'সুভা' গল্পের সুভার মধ্যে শারীরিক সীমাবদ্ধতার কারণে সামাজিক বঞ্চনা ও অবহেলার দিক থেকে সাদৃশ্য পরিলক্ষিত হয়। উভয়েরই সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার পেছনে তাদের শারীরিক অসম্পূর্ণতা প্রধান ভূমিকা পালন করে, যদিও উভয়েরই নিজস্ব দক্ষতা ও সংবেদনশীলতা রয়েছে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত 'সুভা' গল্পে, সুভা বাকপ্রতিবন্ধী হওয়ার কারণে সমাজের মূল স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন থাকে। সে কথা বলতে পারে না বলে সমাজের চোখে সে যেন এক বোঝা, এমনকি তার পিতামাতাও তাকে নিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। সুভা লোকালয়ে নিজের অবস্থান খুঁজে না পেয়ে প্রকৃতির কাছে ও প্রাণীদের সাথে নিভৃতে সময় কাটায়, যা তার নিঃসঙ্গতা ও সমাজের প্রতি তার নীরব অভিমানকে প্রকাশ করে।

উদ্দীপকের মিদুলও সুভার মতোই সমাজের চোখে এক ভিন্ন সত্তা। এগারো বছর বয়সী এই কিশোর মুখে লালা ঝরার কারণে ও বাঁকিয়ে হাঁটার জন্য সমবয়সীদের খেলাধুলা থেকে বঞ্চিত হয়, সবাই তাকে এড়িয়ে চলতে চায়। সুভার মতো মিদুলও সমাজের সাধারণ জীবনযাপন থেকে বিচ্ছিন্ন। তবে সুভার মতো মিদুলেরও অসাধারণ কিছু দক্ষতা আছে, যেমন—সে ধান কাটতে পারে, নাও বাইতে পারে এবং অসাধারণ ছবি আঁকতে পারে। একজন সমাজকর্মী আদিলা ঠিকই উপলব্ধি করেন যে, মিদুল সমাজের বোঝা নয়, তারও বাঁচার অধিকার আছে। এই উপলব্ধির মাধ্যমেই সুভা ও মিদুলের প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা ও তাদের মানবিক অধিকারের দিকটি ফুটে ওঠে, যা তাদের মধ্যে গভীর সাদৃশ্য নির্দেশ করে।

Satt AI
Satt AI
4 weeks ago
উত্তরঃ মাইকেল মধুসূদন দত্ত বাংলা নাট্য সাহিত্যের যুগস্রষ্টা লেখক।
Satt AI
Satt AI
4 weeks ago
উত্তরঃ

উদ্দীপকে আক্কাস আলীর গুনগুনিয়ে বলার মধ্য দিয়ে সাহিত্যের 'কবিতা' নামক শাখার ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

হায়াৎ মামুদের 'সাহিত্যের রূপ ও রীতি' প্রবন্ধ অনুসারে, কবিতা সাহিত্যের প্রাচীনতম ও শ্রেষ্ঠ শাখাগুলোর অন্যতম। কবিতা মূলত ছন্দ, অলংকার, উপমা, উৎপ্রেক্ষা এবং চিত্রকল্পের মাধ্যমে গভীর অনুভূতি ও ভাবকে সংহত রূপে প্রকাশ করে। এখানে ভাষা ও ভাবের এক অপূর্ব সমন্বয় ঘটে, যা পাঠক বা শ্রোতার মনে বিশেষ প্রভাব ফেলে এবং তাদের অনুভূতিকে স্পর্শ করে।

উদ্দীপকে আক্কাস আলী ধানগাছকে উদ্দেশ্য করে যে পংক্তিগুলো গুনগুনিয়ে বলেছেন, তা কবিতার সকল বৈশিষ্ট্য ধারণ করে। তার উচ্চারিত "ধানগাছ পা-ছাড়া দাঁড়িয়ে, বহু হাত বাড়িয়ে, চারিদিকে ছড়িয়ে, কেশসব উড়িয়ে-উকি মারে আকাশে" – এই পংক্তিগুলোতে ছন্দের দোলা, সজীব চিত্রকল্পের ব্যবহার এবং ধানগাছে মানবীয় গুণের আরোপ (personification) সুস্পষ্ট। তার মনিবও আক্কাসের কথাকে "হৃদয়ের আবেগ, মনের ভাব প্রকাশের শৈল্পিক উপস্থাপন" হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যা কবিতারই বিশেষত্বের ইঙ্গিত দেয় এবং আক্কাস আলীর এই স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশকে সাহিত্যের কবিতা শাখার অংশ হিসেবে প্রমাণ করে।

Satt AI
Satt AI
4 weeks ago
উত্তরঃ

পণ গ্রহণসাপেক্ষ দান।

Satt AI
Satt AI
3 weeks ago
উত্তরঃ

“ব্যাধিই সংক্রামক, স্বাস্থ্য নয়” উক্তিটির মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে যে, সমাজে মন্দ দিক, কুসংস্কার, ভুল ধারণা বা অসচেতনতা রোগের মতো দ্রুত এক ব্যক্তি থেকে অন্য ব্যক্তিতে ছড়িয়ে পড়ে। এসব নেতিবাচক প্রভাব ছড়ানোর জন্য খুব বেশি প্রচেষ্টা বা সচেতনতার প্রয়োজন হয় না; বরং এগুলো স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিস্তার লাভ করে।

অন্যদিকে, জ্ঞান, সুস্থ চিন্তাভাবনা, উন্নত মূল্যবোধ ও সুঅভ্যাস সহজে ছড়িয়ে পড়ে না। স্বাস্থ্য যেমন সচেতন চর্চা ও নিয়ম মেনে চলার মাধ্যমে অর্জিত হয়, তেমনি সমাজের মানসিক সুস্থতা ও ইতিবাচক ধারণাগুলো ছড়িয়ে দিতেও নিরন্তর চেষ্টা, শিক্ষা এবং সাধনার প্রয়োজন হয়। মানুষ মন্দকে সহজে গ্রহণ করলেও ভালোর জন্য তাকে সংগ্রাম করতে হয়, যা এই উক্তির মূল মর্মার্থ।

Satt AI
Satt AI
2 weeks ago
উত্তরঃ

উদ্দীপকের শিক্ষক প্রমথ চৌধুরীর 'বইপড়া' প্রবন্ধে বর্ণিত সেই মনোভাবের প্রতিফলন, যেখানে শিক্ষাকে কেবলমাত্র পরীক্ষার সাফল্য অর্জনের মাধ্যম হিসেবে দেখা হয়। তিনি তিয়াশার জ্ঞান অর্জনের উদ্দেশ্যে বই পড়ার আনন্দকে অগ্রাহ্য করে শুধুমাত্র পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করার জন্য নির্দিষ্ট উত্তরপত্র পড়ার ওপর জোর দেন, যা 'বইপড়া' প্রবন্ধের মূল চেতনার পরিপন্থী।

উদ্দীপকে দেখা যায়, তিয়াশা স্কুলের পড়া শেষ করে নিয়মিত গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ ও বিজ্ঞান বিষয়ক কল্প-কাহিনী পড়ে এবং সহ-শিক্ষা কার্যক্রমেও সক্রিয়। কিন্তু তার গৃহশিক্ষক একে 'সময় নষ্ট' বলে অভিহিত করেন এবং বকাবকি করেন। তিনি তিয়াশাকে বলেন যে এসব পড়ে কোনো লাভ নেই এবং পরীক্ষায় এ-প্লাস পেতে হলে তার দেওয়া উত্তরপত্রগুলো পড়তে হবে। শিক্ষকের এই দৃষ্টিভঙ্গি তিয়াশার স্বতঃস্ফূর্ত জ্ঞানচর্চা ও মনন বিকাশের পথ রুদ্ধ করার চেষ্টা করে।

প্রমথ চৌধুরীর 'বইপড়া' প্রবন্ধটি মূলত ডিগ্রি-সর্বস্ব ও পরীক্ষাকেন্দ্রিক শিক্ষার তীব্র সমালোচনা করে। প্রবন্ধটি দেখায় যে শিক্ষা অর্জনের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত মনের বিকাশ ও আত্মার উন্নতি, যা কেবল স্বতঃস্ফূর্ত বই পড়ার মাধ্যমেই সম্ভব। উদ্দীপকের শিক্ষক জ্ঞান অর্জনের এই মহৎ উদ্দেশ্যকে অস্বীকার করে শুধুমাত্র সংকীর্ণ ফলাফলের দিকে নজর দিয়েছেন, যা 'বইপড়া' প্রবন্ধের আলোকিত দিকগুলোর বিপরীতে এক অন্ধকার দিকেরই প্রতিচ্ছবি।

Satt AI
Satt AI
2 weeks ago
উত্তরঃ

‘বইপড়া’ প্রবন্ধে প্রমথ চৌধুরী জ্ঞানার্জনের ক্ষেত্রে আনন্দ সহকারে স্বেচ্ছায় বই পড়াকেই প্রকৃত পথ বলে মনে করেন। তাঁর মতে, পরীক্ষায় ভালো ফল করা বা কেবল ব্যবহারিক জীবনে সফল হওয়ার উদ্দেশ্যে পড়া প্রকৃত শিক্ষা নয়। বরং, নিজের মনকে সজীব ও সচল রাখাই প্রকৃত শিক্ষার উদ্দেশ্য, যা আসে আনন্দময় বইপড়া থেকে। এই প্রবন্ধে লেখক একটি মুক্ত ও বুদ্ধিদীপ্ত সমাজের স্বপ্ন দেখিয়েছেন যেখানে পরীক্ষা পাসের সংকীর্ণ গণ্ডি পেরিয়ে জ্ঞানার্জনই প্রধান লক্ষ্য হবে।

উদ্দীপকের তিয়াশা স্কুলের পাঠ্যক্রমের বাইরে প্রতিদিন গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ ও বিজ্ঞান বিষয়ক কল্প-কাহিনী পড়ে। সে সহ-শিক্ষা কার্যক্রমেও সরব থাকে। তার গৃহশিক্ষক এ বিষয়টিকে সময় নষ্ট বলে মনে করেন এবং তাকে কেবল পরীক্ষার জন্য উত্তরপত্র পড়তে উৎসাহিত করেন। এখানে তিয়াশার গৃহশিক্ষকের মানসিকতা পাঠ্যপুস্তক-কেন্দ্রিক ও পরীক্ষা পাসের সংকীর্ণতার প্রতীক, যা প্রমথ চৌধুরীর ‘বইপড়া’ প্রবন্ধের মূল চেতনার পরিপন্থী।

অপরদিকে, তিয়াশার পাঠ্যাভ্যাস প্রমথ চৌধুরীর ‘বইপড়া’ প্রবন্ধের প্রত্যাশিত জগতের সঙ্গে সম্পূর্ণ সঙ্গতিপূর্ণ। প্রবন্ধের মূল কথা হলো, বইপড়া কেবল শেখার উদ্দেশ্যে নয়, মনের খোরাকের জন্যও। আনন্দ সহকারে বই পড়লে মন সতেজ ও প্রফুল্ল থাকে এবং প্রকৃত জ্ঞানার্জন ঘটে। তিয়াশা পাঠ্যবইয়ের বাইরে বিভিন্ন ধরনের বই পড়ে তার জ্ঞান ও চিন্তার জগৎকে প্রসারিত করছে। এতে তার মননশীলতার বিকাশ ঘটছে এবং সে সৃজনশীলতার পথে এগোচ্ছে। সহ-শিক্ষা কার্যক্রমে তার অংশগ্রহণও তার ব্যক্তিত্বের সামগ্রিক বিকাশে সহায়ক।

সুতরাং, তিয়াশার আনন্দ-ভিত্তিক স্বেচ্ছামূলক বইপড়া ও সহ-শিক্ষা কার্যক্রমে অংশগ্রহণ তার চিন্তাভাবনাকে স্বাধীন ও স্বকীয় করে তুলছে, যা তাকে সংকীর্ণ বৃত্ত থেকে বের হয়ে ‘বইপড়া’ প্রবন্ধের কাঙ্ক্ষিত মুক্ত জ্ঞানার্জনের জগতের জন্য উপযুক্ত করে তৈরি করছে। তার এই চেতনা কেবল পরীক্ষায় ভালো ফল করা নয়, বরং জীবনকে গভীরভাবে উপলব্ধি করার এবং একটি আলোকিত ও বুদ্ধিদীপ্ত সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখার পথ খুলে দেয়।

Satt AI
Satt AI
2 weeks ago
551

মেয়েটির নাম যখন সুভাষিণী রাখা হইয়াছিল তখন কে জানিত সে বোবা হইবে। তাহার দুটি বড়ো বোনকে সুকেশিনী ও সুহাসিনী নাম দেওয়া হইয়াছিল, তাই মিলের অনুরোধে তাহার বাপ ছোটো মেয়েটির নাম সুভাষিণী রাখে । এখন সকলে তাহাকে সংক্ষেপে সুভা বলে ।
দস্তুরমত অনুসন্ধান ও অর্থব্যয়ে বড়ো দুটি মেয়ের বিবাহ হইয়া গেছে, এখন ছোটোটি পিতামাতার নীরব হৃদয়ভারের মতো বিরাজ করিতেছে।
যে কথা কয় না সে যে অনুভব করে ইহা সকলের মনে হয় না, এইজন্য তাহার সাক্ষাতেই সকলে তাহার ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে দুশ্চিন্তা প্রকাশ করিত। সে যে বিধাতার অভিশাপস্বরূপে তাহার পিতৃগৃহে আসিয়া জন্মগ্রহণ করিয়াছে এ কথা সে শিশুকাল হইতে বুঝিয়া লইয়াছিল। তাহার ফল এই হইয়াছিল, সাধারণের দৃষ্টিপথ হইতে সে আপনাকে গোপন করিয়া রাখিতে সর্বদাই চেষ্টা করিত। মনে করিত, আমাকে সবাই ভুলিলে বাঁচি । কিন্তু, বেদনা কি কেহ কখনো ভোলে? পিতামাতার মনে সে সর্বদাই জাগরূক ছিল ।
বিশেষত, তাহার মা তাহাকে নিজের একটা ত্রুটিস্বরূপ দেখিতেন; কেননা, মাতা পুত্র অপেক্ষা কন্যাকে নিজের অংশরূপে দেখেন— কন্যার কোনো অসম্পূর্ণতা দেখিলে সেটা যেন বিশেষরূপে নিজের লজ্জার কারণ বলিয়া মনে করেন। বরঞ্চ, কন্যার পিতা বাণীকণ্ঠ সুভাকে তাঁহার অন্য মেয়েদের অপেক্ষা যেন একটু বেশি ভালোবাসিতেন; কিন্তু মাতা তাহাকে নিজের গর্ভের কলঙ্ক জ্ঞান করিয়া তাহার প্রতি বড়ো বিরক্ত ছিলেন। সুভার কথা ছিল না, কিন্তু তাহার সুদীর্ঘপল্লববিশিষ্ট বড়ো বড়ো দুটি কালো চোখ ছিল এবং তাহার ওষ্ঠাধর ভাবের আভাসমাত্রে কচি কিশলয়ের মতো কাঁপিয়া উঠিত।
কথায় আমরা যেভাব প্রকাশ করি সেটা আমাদিগকে অনেকটা নিজের চেষ্টায় গড়িয়া লইতে হয়, কতকটা তর্জমা করার মতো; সকল সময়ে ঠিক হয় না, ক্ষমতার অভাবে অনেক সময়ে ভুলও হয়। কিন্তু কালো চোখকে কিছু তর্জমা করিতে হয় না- মন আপনি তাহার উপরে ছায়া ফেলে; ভাব আপনি তাহার উপরে কখনো প্রসারিত কখনো মুদিত হয়, কখনো উজ্জ্বলভাবে জ্বলিয়া উঠে, কখনো ম্লানভাবে নিবিয়া আসে, কখনো অস্তমান চন্দ্রের মতো অনিমেষভাবে চাহিয়া থাকে, কখনো দ্রুত চঞ্চল বিদ্যুতের মতো দিগ্‌বদিকে ঠিকরিয়া উঠে। মুখের ভাব বৈ আজন্মকাল যাহার অন্য ভাষা নাই তাহার চোখের ভাষা অসীম উদার এবং অতলস্পর্শ গভীর— অনেকটা স্বচ্ছ আকাশের মতো, উদয়াস্ত এবং ছায়ালোকের নিস্তব্ধ রঙ্গভূমি। এই বাক্যহীন মনুষ্যের মধ্যে বৃহৎ প্রকৃতির মতো একটা বিজন মহত্ত্ব আছে। এইজন্য সাধারণ বালকবালিকারা তাহাকে একপ্রকার ভয় করিত, তাহার সহিত খেলা করিত না। সে নির্জন দ্বিপ্রহরের মতো শব্দহীন এবং সঙ্গীহীন ।
গ্রামের নাম চণ্ডীপুর। নদীটি বাংলাদেশের একটি ছোটো নদী, গৃহস্থঘরের মেয়েটির মতো, বহুদূর পর্যন্ত তাহার প্রসার নহে; নিরলসা তন্বী নদীটি আপন কূল রক্ষা করিয়া কাজ করিয়া যায়; দুই ধারের গ্রামের সকলেরই সঙ্গে তাহার যেন একটা-না-একটা সম্পর্ক আছে । দুই ধারে লোকালয় এবং তরুচ্ছায়াঘন উচ্চ তট; নিম্নতল দিয়া গ্রামলক্ষ্মী স্রোতস্বিনী আত্মবিস্মৃত দ্রুত পদক্ষেপে প্রফুল্ল হৃদয়ে আপনার অসংখ্য কল্যাণকার্যে চলিয়াছে ।
বাণীকণ্ঠের ঘর নদীর একেবারে উপরেই। তাহার বাঁখারির বেড়া, আটচালা, গোয়ালঘর, ঢেঁকিশালা, খড়ের স্তূপ, তেঁতুলতলা, আম কাঁঠাল এবং কলার বাগান নৌকাবাহী-মাত্রেরই দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এই গার্হস্থ্য সচ্ছলতার মধ্যে বোবা মেয়েটি কাহারও নজরে পড়ে কি না জানি না, কিন্তু কাজকর্মে যখনই অবসর পায় তখনই সে এই নদীতীরে আসিয়া বসে।
প্রকৃতি যেন তাহার ভাষার অভাব পূরণ করিয়া দেয়। যেন তাহার হইয়া কথা কয়। নদীর কলধ্বনি, লোকের কোলাহল, মাঝির গান, পাখির ডাক, তরুর মর্মর— সমস্ত মিশিয়ে চারিদিকের চলাফেরা- আন্দোলন-কম্পনের সহিত এক হইয়া সমুদ্রের তরঙ্গরাশির ন্যায় বালিকার চিরনিস্তব্ধ হৃদয়- উপকূলের নিকটে আসিয়া ভাঙিয়া ভাঙিয়া পড়ে। প্রকৃতির এই বিবিধ শব্দ এবং বিচিত্র গতি, ইহাও বোবার ভাষা – বড়ো বড়ো চক্ষুপল্লববিশিষ্ট সুভার যেভাষা তাহারই একটা বিশ্বব্যাপী বিস্তার; ঝিল্লিরবপূর্ণ তৃণভূমি হইতে শব্দাতীত নক্ষত্রলোক পর্যন্ত কেবল ইঙ্গিত, ভঙ্গি, সংগীত, ক্রন্দন এবং দীর্ঘনিশ্বাস ।
এবং মধ্যাহ্নে যখন মাঝিরা জেলেরা খাইতে যাইত, গৃহস্থেরা ঘুমাইত, পাখিরা ডাকিত না, খেয়া-নৌকা বন্ধ থাকিত, সজন জগৎ সমস্ত কাজকর্মের মাঝখানে সহসা থামিয়া গিয়া ভয়ানক বিজনমূর্তি ধারণ করিত, তখন রুদ্র মহাকাশের তলে কেবল একটি বোবা প্রকৃতি এবং একটি বোবা মেয়ে মুখামুখি চুপ করিয়া বসিয়া থাকিত— একজন সুবিস্তীর্ণ রৌদ্রে, আর-একজন ক্ষুদ্র তরুচ্ছায়ায় ।

সুভার যে গুটিকতক অন্তরঙ্গ বন্ধুর দল ছিল না তাহা নহে। গোয়ালের দুটি গাভী, তাহাদের নাম সর্বশী ও পাঙ্গুলি। সে নাম বালিকার মুখে তাহারা কখনো শুনে নাই, কিন্তু তাহার পদশব্দ তাহারা চিনিত— তাহার কথাহীন একটা করুণ সুর ছিল, তাহার মর্ম তাহারা ভাষার অপেক্ষা সহজে বুঝিত । সুভা কখন তাহাদের আদর করিতেছে, কখন ভর্ৎসনা করিতেছে, কখন মিনতি করিতেছে, তাহা তাহারা মানুষের অপেক্ষা ভালো বুঝিতে পারিত ৷
সুভা গোয়ালে ঢুকিয়া দুই বাহুর দ্বারা সর্বশীর গ্রীবা বেষ্টন করিয়া তাহার কানের কাছে আপনার গণ্ডদেশ ঘর্ষণ করিত এবং পাঙ্গুলি স্নিগ্ধদৃষ্টিতে তাহার প্রতি নিরীক্ষণ করিয়া তাহার গা চাটিত। বালিকা দিনের মধ্যে নিয়মিত তিনবার করিয়া গোয়ালঘরে যাইত, তাহা ছাড়া অনিয়মিত আগমনও ছিল; গৃহে যেদিন কোনো কঠিন কথা শুনিত সেদিন সে অসময়ে তাহার এই মূক বন্ধু দুটির কাছে আসিত- তাহার সহিষ্ণুতাপরিপূর্ণ বিষাদশান্ত দৃষ্টিপাত হইতে তাহারা কী একটা অন্ধ অনুমানশক্তির দ্বারা বালিকার মর্মবেদনা যেন বুঝিতে পারিত, এবং সুভার গা ঘেঁষিয়া আসিয়া অল্পে অল্পে তাহার বাহুতে শিং ঘষিয়া ঘষিয়া তাহাকে নির্বাক ব্যাকুলতার সহিত সান্ত্বনা দিতে চেষ্টা করিত।
ইহারা ছাড়া ছাগল এবং বিড়ালশাবকও ছিল; কিন্তু তাহাদের সহিত সুভার এরূপ সমকক্ষভাবে মৈত্রী ছিল না, তথাপি তাহারা যথেষ্ট আনুগত্য প্রকাশ করিত। বিড়ালশিশুটি দিনে এবং রাত্রে যখন- তখন সুভার গরম কোলটি নিঃসংকোচে অধিকার করিয়া সুখনিদ্রার আয়োজন করিত এবং সুভা তাহার গ্রীবা ও পৃষ্ঠে কোমল অঙ্গুলি বুলাইয়া দিলে যে তাহার নিদ্রাকর্ষণের বিশেষ সহায়তা হয়, ইঙ্গিতে এরূপ অভিপ্রায়ও প্রকাশ করিত ৷
উন্নত শ্রেণির জীবের মধ্যে সুভার আরো একটি সঙ্গী জুটিয়াছিল। কিন্তু তাহার সহিত বালিকার ঠিক কিরূপ সম্পর্ক ছিল তাহা নির্ণয় করা কঠিন, কারণ, সে ভাষাবিশিষ্ট জীব; সুতরাং উভয়ের মধ্যে সমভাষা ছিল না ।
গোঁসাইদের ছোটো ছেলেটি— তাহার নাম প্রতাপ । লোকটি নিতান্ত অকর্মণ্য। সে যে কাজকর্ম করিয়া সংসারের উন্নতি করিতে যত্ন করিবে, বহু চেষ্টার পর বাপ-মা সে আশা ত্যাগ করিয়াছেন । অকর্মণ্য লোকের একটা সুবিধা এই যে, আত্মীয় লোকেরা তাহাদের উপর বিরক্ত হয় বটে, কিন্তু প্ৰায় তাহারা নিঃসম্পর্ক লোকদের প্রিয়পাত্র হয়— কারণ, কোনো কার্যে আবন্ধ না থাকাতে তাহারা সরকারি সম্পত্তি হইয়া দাঁড়ায়। শহরের যেমন এক-আধটা গৃহসম্পর্কহীন সরকারি বাগান থাকা আবশ্যক তেমনি গ্রামে দুই-চারিটা অকর্মণ্য সরকারি লোক থাকার বিশেষ প্রয়োজন। কাজে-কর্মে আমোদে অবসরে যেখানে একটা লোক কম পড়ে সেখানেই তাহাদিগকে হাতের কাছে পাওয়া যায় ।
প্রতাপের প্রধান শখ- ছিপ ফেলিয়া মাছ ধরা। ইহাতে অনেক সময় সহজে কাটানো যায়। অপরাহ্ণে নদীতীরে ইহাকে প্রায় এই কাজে নিযুক্ত দেখা যাইত । এবং এই উপলক্ষে সুভার সহিত তাহার প্রায় সাক্ষাৎ হইত । যে-কোনো কাজেই নিযুক্ত থাক, একটা সঙ্গী পাইলে প্রতাপ থাকে ভালো । মাছ ধরার সময় বাক্যহীন সঙ্গীই সর্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ— এইজন্য প্রতাপ সুভার মর্যাদা বুঝিত । এইজন্য, সকলেই সুভাকে সুভা বলিত, প্রতাপ আর-একটু অতিরিক্ত আদর সংযোগ করিয়া সুভাকে ‘সু’ বলিয়া ডাকিত ।

সুভা তেঁতুলতলায় বসিয়া থাকিত এবং প্রতাপ অনতিদূরে ছিপ ফেলিয়া জলের দিকে চাহিয়া থাকিত। প্রতাপের জন্য একটি করিয়া পান বরাদ্দ ছিল, সুভা তাহা নিজে সাজিয়া আনিত। এবং বোধ করি অনেকক্ষণ বসিয়া বসিয়া চাহিয়া ইচ্ছা করিত, প্রতাপের কোনো-একটা বিশেষ সাহায্য করিতে, একটা-কোনো কাজে লাগিতে, কোনোমতে জানাইয়া দিতে যে এই পৃথিবীতে সেও একজন কম প্রয়োজনীয় লোক নহে। কিন্তু কিছুই করিবার ছিল না। তখন সে মনে মনে বিধাতার কাছে অলৌকিক ক্ষমতা প্রার্থনা করিত— মন্ত্রবলে সহসা এমন একটা আশ্চর্য কাণ্ড ঘটাইতে ইচ্ছা করিত যাহা দেখিয়া প্রতাপ আশ্চর্য হইয়া যাইত, বলিত, ‘তাই তো, আমাদের সুভির যে এত ক্ষমতা তাহা তো জানিতাম না ।'
মনে করো, সুভা যদি জলকুমারী হইত; আস্তে আস্তে জল হইতে উঠিয়া একটা সাপের মাথার মণি ঘাটে রাখিয়া যাইত; প্রতাপ তাহার তুচ্ছ মাছধরা রাখিয়া সেই মানিক লইয়া জলে ডুব মারিত; এবং পাতালে গিয়া দেখিত, রুপার অট্টালিকায় সোনার পালঙ্কে—কে বসিয়া? – আমাদের বাণীকণ্ঠের ঘরের সেই বোবা মেয়ে সু— আমাদের সু সেই মণিদীপ্ত গভীর নিস্তব্ধ পাতালপুরীর একমাত্র রাজকন্যা। তাহা কি হইতে পারিত না, তাহা কি এতই অসম্ভব। আসলে কিছুই অসম্ভব নয়, কিন্তু তবুও সু প্রজাশূন্য পাতালের রাজবংশে না জন্মিয়া বাণীকণ্ঠের ঘরে আসিয়া জন্মিয়াছে এবং গোঁসাইদের ছেলে প্রতাপকে কিছুতেই আশ্চর্য করিতে পারিতেছে না ।
সুভার বয়স ক্রমেই বাড়িয়া উঠিতেছে। ক্রমে সে যেন আপনাকে আপনি অনুভব করিতে পারিতেছে। যেন কোনো একটা পূর্ণিমাতিথিতে কোনো-একটা সমুদ্র হইতে একটা জোয়ারের স্রোত আসিয়া তাহার অন্তরাত্মাকে এক নূতন অনির্বচনীয় চেতনাশক্তিতে পরিপূর্ণ করিয়া তুলিতেছে । সে আপনাকে আপনি দেখিতেছে,ভাবিতেছে, প্রশ্ন করিতেছে, এবং বুঝিতে পারিতেছে না ।
গভীর পূর্ণিমারাত্রে সে এক-একদিন ধীরে শয়নগৃহের দ্বার খুলিয়া ভয়ে ভয়ে মুখ বাড়াইয়া বাহিরের দিকে চাহিয়া দেখে পূর্ণিমাপ্রকৃতিও সুভার মতো একাকিনী সুপ্ত জগতের উপর জাগিয়া বসিয়া— যৌবনের রহস্যে পুলকে বিষাদে অসীম নির্জনতার একেবারে শেষ সীমা পর্যন্ত, এমন— কি, তাহা অতিক্রম করিয়াও ধমথম করিতেছে, একটি কথা কহিতে পারিতেছে না। এই নিস্তব্ধ ব্যাকুল প্রকৃতির প্রান্তে একটি নিস্তব্ধ ব্যাকুল বালিকা দাঁড়াইয়া ।
এ দিকে কন্যাভারগ্রস্ত পিতামাতা চিন্তিত হইয়া উঠিয়াছেন। লোকেও নিন্দা আরম্ভ করিয়াছে । এমন-কি, এক-ঘরে করিবে এমন জনরবও শুনা যায়। বাণীকণ্ঠের সচ্ছল অবস্থা, দুই বেলাই মাছভাত খায়, এজন্য তাহার শত্রু ছিল।
স্ত্রীপুরুষে বিস্তর পরামর্শ হইল । কিছুদিনের মতো বাণী বিদেশে গেল । অবশেষে ফিরিয়া আসিয়া কহিল, “চলো, কলিকাতায় চলো।”

বিদেশযাত্রার উদ্‌যোগ হইতে লাগিল। কুয়াশা-ঢাকা প্রভাতের মতো সুভার সমস্ত হৃদয় অশ্রুবাষ্পে একেবারে ভরিয়া গেল। একটা অনির্দিষ্ট আশঙ্কা বশে সে কিছুদিন হইতে ক্রমাগত নির্বাক জন্তুর মতো তাহার বাপ-মায়ের সঙ্গে সঙ্গে ফিরিত- ডাগর চক্ষু মেলিয়া তাঁহাদের মুখের দিকে চাহিয়া কী— একটা বুঝিতে চেষ্টা করিত, কিন্তু তাঁহারা কিছু বুঝাইয়া বলিতেন না ।
ইতিমধ্যে একদিন অপরাহ্ণে ছিপ ফেলিয়া প্রতাপ হাসিয়া কহিল, “কী রে সু, তোর নাকি বর পাওয়া গেছে, তুই বিয়ে করতে যাচ্ছিস? দেখিস আমাদের ভুলিস নে।” বলিয়া আবার মাছের দিকে মনোযোগ করিল ।
মর্মবিদ্ধ হরিণী ব্যাধের দিকে যেমন করিয়া তাকায়, নীরবে বলিতে থাকে ‘আমি তোমার কাছে কী দোষ করিয়াছিলাম', সুভা তেমনি করিয়া প্রতাপের দিকে চাহিল; সেদিন গাছের তলায় আর বসিল না; বাণীকণ্ঠ নিদ্রা হইতে উঠিয়া শয়নগৃহে তামাক খাইতেছিলেন, সুভা তাঁহার পায়ের কাছে বসিয়া তাঁহার মুখের দিকে চাহিয়া কাঁদিতে লাগিল । অবশেষে তাহাকে সান্ত্বনা দিতে গিয়া বাণীকণ্ঠের শুষ্ক কপোলে অশ্রু গড়াইয়া পড়িল ।
কাল কলিকাতায় যাইবার দিন স্থির হইয়াছে। সুভা গোয়ালঘরে তাহার বাল্য-সখীদের কাছে বিদায় লইতে গেল, তাহাদিগকে স্বহস্তে খাওয়াইয়া, গলা ধরিয়া একবার দুই চোখে যত পারে কথা ভরিয়া তাহাদের মুখের দিকে চাহিল— দুই নেত্রপল্লব হইতে টপ টপ করিয়া অশ্রুজল পড়তে লাগিল ।
সেদিন শুক্লাদ্বাদশীর রাত্রি। সুভা শয়নগৃহ হইতে বাহির হইয়া তাহার সেই চিরপরিচিত নদীতটে শষ্পশয্যায় লুটাইয়া পড়িল— যেন ধরণীকে, এই প্রকাণ্ড মূক মানবতাকে দুই বাহুতে ধরিয়া বলিতে চাহে, ‘তুমি আমাকে যাইতে দিয়ো না মা, আমার মতো দুটি বাহু বাড়াইয়া তুমিও আমাকে ধরিয়া রাখো।' [সংক্ষেপিত]

Related Question

View All
661
369
শিক্ষকদের জন্য বিশেষভাবে তৈরি

১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!

শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!

প্রশ্ন এডিট করা যাবে
জলছাপ দেয়া যাবে
ঠিকানা যুক্ত করা যাবে
Logo, Motto যুক্ত হবে
অটো প্রতিষ্ঠানের নাম
অটো সময়, পূর্ণমান
প্রশ্ন এডিট করা যাবে
জলছাপ দেয়া যাবে
ঠিকানা যুক্ত করা যাবে
Logo, Motto যুক্ত হবে
অটো প্রতিষ্ঠানের নাম
অটো সময়, পূর্ণমান
অটো নির্দেশনা (এডিটযোগ্য)
অটো বিষয় ও অধ্যায়
OMR সংযুক্ত করা যাবে
ফন্ট, কলাম, ডিভাইডার
প্রশ্ন/অপশন স্টাইল পরিবর্তন
সেট কোড, বিষয় কোড
অটো নির্দেশনা (এডিটযোগ্য)
অটো বিষয় ও অধ্যায়
OMR সংযুক্ত করা যাবে
ফন্ট, কলাম, ডিভাইডার
প্রশ্ন/অপশন স্টাইল পরিবর্তন
সেট কোড, বিষয় কোড
এখনই শুরু করুন ডেমো দেখুন
৫০,০০০+
শিক্ষক
৩০ লক্ষ+
প্রশ্নপত্র

Related Question

মাত্র ১৫ পয়সায় প্রশ্নপত্র
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন তৈরি করুন আজই

Complete Exam
Preparation

Learn, practice, analyse and improve

1M+ downloads
4.6 · 8k+ Reviews