নিম্নমানের, ক্ষতিকর, অকেজো ও অপ্রয়োজনীয় দ্রব্য মেশানো খাদ্যই ভেজাল খাদ্য।
খাদ্য নিরাপত্তার তিনটি দিক খাদ্যের প্রাপ্যতা, খাদ্যের ক্রয়যোগ্যতা ও খাদ্যের ব্যবহারে ত্রুটিজনিত কারণে খাদ্য নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়। প্রধানত দুই ধরনের খাদ্য নিরাপত্তা হয়ে থাকে, যথা: (১) জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা ও (২) পারিবারিক খাদ্য নিরাপত্তা। এ দুই ধরনের খাদ্য নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার
কারণ নিম্নরূপ :
জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা সারাদেশের জনগণের খাদ্য সংগ্রহের সামর্থ্যের উপর নির্ভরশীল। খাদ্য উৎপাদনের স্বল্পতা, খাদ্য সংগ্রহের, অপর্যাপ্ততা, খাদ্য সাহায্য প্রাপ্তির অভাব, খাদ্য আমদানির সামর্থ্যহীনতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অতিরিক্ত জনসংখ্যা ইত্যাদি কারণে জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়। আবার পারিবারিক খাদ্য নিরাপত্তা প্রতিটি পরিবারের খাদ্য সংগ্রহের দক্ষতার উপর নির্ভরশীল। পারিবারিক স্বল্প আয়, স্বল্প কৃষিযোগ্য জমি, পারিবারিক শিক্ষা ও সংস্কৃতির প্রভাব, পরিবারের আয়তন বড় হওয়া, খাদ্য ও পুষ্টি সম্পর্কিত জ্ঞানের অভাব, খাদ্যদ্রব্যের উচ্চমূল্য, খাদ্য উৎপাদনে ব্যর্থতা, দরিদ্রতা ইত্যাদি কারণে পারিবারিক খাদ্য নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়।
বাংলাদেশে খাদ্য নিরাপত্তা পরিস্থিতি উদ্বেগজনক।
খাদ্যশস্য উৎপাদন, খাদ্যের প্রাপ্যতা, ব্যক্তিগত এবং জাতীয় পর্যায়ে খাদ্য নিরাপত্তা সত্ত্বেও সরকারের উদ্বিগ্ন হওয়ার অন্যতম কারণ প্রাকৃতিক দুর্যোগ। বাংলাদেশে ১৯৭১-৭২ সালে ধান ও গম উৎপাদন হয়েছিল ১০.৪৬ মিলিয়ন মে. টন। যা ১৯৯৯-২০০০ সালে ২৪.৯ মিলিয়ন মে. টন হয়েছিল। বর্তমানে ২০১৬-১৭অর্থবছরে ধান ও গম উৎপাদন হয়েছে, ৩৫.১ মিলিয়ন মে. টন যা খাদ্য উৎপাদনে সর্বোচ্চ। কিন্তু প্রতি বছর এ দেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগ; যেমন- বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, আবহাওয়াগত বিপর্যয়, অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি ইত্যাদি কারণে ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। এর ফলে খাদ্য নিরাপত্তা অনেকাংশে বিঘ্নিত হয়।
আবার মনুষ্য সৃষ্ট কারণেও বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে খাদ্য নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিভিন্ন। কিছু অঞ্চল দারিদ্র্যসীমার নিচে, আবার কিছু অঞ্চল দারিদ্র্যসীমার ঊর্ধ্বে অবস্থান করে। সেখানে খাদ্যের প্রাপ্যতা, ক্রয়যোগ্যতা ও ব্যবহারের ত্রুটিজনিত কারণে খাদ্য নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়। এছাড়া পারিবারিক স্বল্প আয়, স্বল্প কৃষিযোগ্য জমি, পরিবারের আয়তন বড় হওয়া, খাদ্য ও পুষ্টি সম্পর্কে জ্ঞানের অভাব, দারিদ্র্য ইত্যাদি কারণে খাদ্য নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়, যা মনুষ্য সৃষ্ট কারণ।
তবে সর্বোপরি বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তা পরিস্থিতি পূর্বের তুলনায় বর্তমানে অনেক ভালো। খাদ্য উৎপাদন পূর্বের তুলনায় ২/৩ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। খাদ্য আমদানি অনেক হ্রাস পেয়েছে। কিন্তু খাদ্য নিরাপত্তা সূচকে ১১৩টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ৮৯তম অবস্থানে রয়েছে, যা উদ্বেগের অন্যতম কারণ।
খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে খাদ্যের প্রাপ্যতা বৃদ্ধি এবং খাদ্যের সদ্ব্যবহারই যথেষ্ট নয়। এর সাথে আনুষঙ্গিক আরও অনেক বিষয় জড়িত। নিচে তা ব্যাখ্যা করা হলো-
খাদ্য নিরাপত্তার ৩টি দিক। যথা- খাদ্যের প্রাপ্যতা, খাদ্যের ক্রয়যোগ্যতা এবং খাদ্যের ব্যবহার। এই ৩টির কোনো একটি না থাকলে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ব নয়। উদ্দীপকে খাদ্যের প্রাপ্যতা বৃদ্ধি ও খাদ্যের সদ্ব্যবহারের মাধ্যমে খাদ্য নিরাপত্তা অর্জন করা যায় বলে মনে করা হলেও খাদ্যের ক্রয়যোগ্যতা ও অনেক গুরুত্বপূর্ণ। কোনো নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর নির্দিষ্ট দামে নির্দিষ্ট পরিমাণ দ্রব্য ক্রয়ের যোগ্যতাকেই খাদ্যের ক্রয়যোগ্যতা বলে। যদি জনসাধারণ উন্নত জীবনযাত্রায় প্রবেশ করে, তবে তাদের খাদ্যের ক্রয়যোগ্যতায়ও উন্নতি ঘটে। খাদ্যের ক্রয়যোগ্যতার অন্যতম নিয়ামক হলো ব্যক্তির আয়। যদি ব্যক্তির আয় কম হয় তবে তার ক্রয়যোগ্যতাও কমে যায়। আবার কোনো ব্যক্তির আয়ের স্তর বৃদ্ধি পেলে তার খাদ্যের ক্রয়যোগ্যতাও বৃদ্ধি পায়।
গ্রাম্য অবকাঠামো, কৃষি ও অকৃষি খাতে নিয়োগ জীবনমান বৃদ্ধি করে এবং খাদ্যের ক্রয়যোগ্যতাও বৃদ্ধি করে। সামাজিক এবং লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য জীবনমান তথা ব্যক্তিগত ক্রয়ক্ষমতাকে বাধাগ্রস্ত করে। খাদ্যের দুর্বল ক্রয়যোগ্যতা কম ভোগ ও কম পুষ্টির জন্য দায়ী। খাদ্য ভোগের স্তর নির্ভর করে প্রধানত খাদ্যের প্রাপ্যতা ও এর ক্রয়ক্ষমতার উপর। যদি গৃহস্থালি ব্যয়ের সিংহভাগ খাদ্যদ্রব্য ক্রয়ে ব্যয় হয় তবে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর প্রতিদিনের প্রয়োজনীয় ক্যালরি গ্রহণের জন্য যে পরিমাণ খাদ্যদ্রব্য প্রয়োজন তা নির্ভর করে খাদ্য মূল্যের উপর। দরিদ্র জনগোষ্ঠী খাদ্যদ্রব্য ক্রয়ে তাদের আয়ের সিংহভাগ ব্যয় করে, কিন্তু তাদের আয় কম থাকায় তারা কম পরিমাণ খাবার পায়। ফলে খাদ্য ও জীবনমানের অনিরাপত্তা তাদের জীবনে ঘটে।
তাই বলা যায়, খাদ্যের প্রাপ্যতা বৃদ্ধি ও খাদ্যের সদ্ব্যবহারের মাধ্যমে খাদ্য নিরাপত্তা অর্জিত হলেও তা সম্পন্ন হয় না। এর জন্য খাদ্যের ক্রয়যোগ্যতা থাকাও প্রয়োজন।
Related Question
View Allযা ভোক্তার নিকট ক্ষতিকর হবে না এবং যা ইচ্ছাকৃতভাবে ব্যবহৃত হবে ভোগের জন্য তা-ই নিরাপদ খাদ্য।
কোনো নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর নির্দিষ্ট সময়ে অত্যাবশ্যকীয় খাদ্যের প্রাপ্তিকেই খাদ্যের প্রাপ্যতা বলা হয়। পর্যাপ্ত উৎপাদন এবং নির্দিষ্ট স্থানে পর্যাপ্ত খাদ্যের যোগান খাদ্যের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করে। কোনো নির্দিষ্ট স্থানে পর্যাপ্ত খাদ্যের সরবরাহ নির্ভর করে সরকারি ও বেসরকারি খাদ্যশস্য সরবরাহ ব্যবস্থাপনার উপর। কিছু কিছু জায়গায় পদ্ধতিগত দুর্বলতা এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার অপর্যাপ্ততা ও প্রয়োজনীয় খাদ্যে সরকারি সহযোগিতার অভাবে খাদ্যের প্রাপ্যতা বাধাগ্রস্ত হয়।
উদ্দীপকে খাদ্যে ভেজালের কথা বলা হয়েছে। উক্ত বিষয়টি প্রতিরোধে সরকার যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে তা নিচে ব্যাখ্যা করা হলো-
⇨ সরকার ভেজালবিরোধী আইনের মাধ্যমে সকল পর্যায়ে ভেজাল খাদ্য উৎপাদন, বিপণন ও বিক্রয়ের সাথে জড়িত ব্যক্তিবর্গকে আইনের আওতায় আনার লক্ষ্যে সংসদে ভেজালবিরোধী আইন পাশ করার পাশাপাশি ভেজাল খাদ্যদ্রব্যের সাথে জড়িত ব্যক্তিদের কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করেছে।
⇨ দেশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন ভেজাল খাদ্যদ্রব্যের উৎপাদন বন্ধের পাশাপাশি বিদেশ থেকে আমদানিকৃত ভেজালে সহায়তাকারী বিভিন্ন রাসায়নিক দ্রব্যের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে।
⇨ ভেজাল প্রতিরোধে সরকার জনসচেতনতা সৃষ্টির পাশাপাশি খাদ্যে ভেজাল মিশ্রণকারীদের তাৎক্ষণিক শাস্তি প্রদানের জন্য নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনা করছে।
অতএব বলা যায়, সরকারের সদিচ্ছা এবং আইনের কার্যকরী প্রয়োগ দ্রুত দেশের ভেজাল প্রতিরোধ করতে পারে।
উদ্দীপকের শেষ উক্তিটি বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। নিচে আমার মতামত উপস্থাপন করা হলো-
উন্নত বিশ্ব খাদ্যে ভেজালের বিষয়ে কোনোরকম ছাড় দিতে নারাজ, যেকোনো কিছুর বিনিময়ে তারা নিরাপদ খাদ্য পেতে চায়। নিরাপদ খাদ্য পেতে তারা খরচের কথা চিন্তা করে না। ফলে তাদের খাদ্যের সরবরাহ ভালো। তাদের খাদ্য ক্রয়-বিক্রয়ও অনেক ভালো।
কিন্তু বাংলাদেশে ঠিক এর ব্যতিক্রম অবস্থা। বাংলাদেশে জনসংখ্যা অনেক বেশি হলেও এই খাদ্য সরবরাহ করার পরও মানুষ প্রচুর অপচয় করে। এই অপচয় রোধে বিক্রেতারা খাদ্যে পচনশীলতা দূর করতে ফরমালিনের মতো বিষও প্রয়োগ করে। বাংলাদেশে বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের ফল, সবজি, মাছ, মাংস ইত্যাদি সব খাদ্যে পচনশীলতা দূর করতে ফরমালিন প্রয়োগ করছে, যা স্বাস্থ্যের জন্য চরম ক্ষতিকর। খাদ্যের এই ভেজাল দিন দিন মনে হয় আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে সরকার বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করলেও আশু প্রতিক্রিয়া তেমন দেখা যাচ্ছে না। তাই বলা যায়, উদ্দীপকের শেষ উক্তিটি বাংলাদেশের জন্য প্রযোজ্য নয়।
খাদ্য নিরাপত্তা হলো নির্ভরশীল স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্যের পর্যাপ্ত যোগান যা ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে বিদ্যমান থাকে।
কোনো নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠী কর্তৃক শরীরের প্রয়োজনীয় উপাদান প্রাপ্তির লক্ষ্যে নির্দিষ্ট খাদ্যদ্রব্য গ্রহণকেই খাদ্যের ব্যবহার বলে।
শরীরে প্রয়োজনীয় খাদ্য উপাদানের ঘাটতি পূরণের লক্ষ্যে যে সব খাদ্য গ্রহণ করা হয়, তার আত্তীকরণের উপর নির্ভর করে খাদ্যের ব্যবহার। খাদ্যভোগের ধরন, পুষ্টিমান, স্বাস্থ্য এবং খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়গুলো সামাজিক, সাংস্কৃতিক উপাদান; যেমন- খাদ্যে প্রাপ্যতা খাদ্যের ক্রয়ক্ষমতা এবং তার ব্যবহারের উপর নির্ভর করে। দারিদ্র্য, লিঙ্গ, বয়স, কাঠামো ও সামর্থ্য, ভৌগোলিক অবস্থান, সংস্কৃতি চর্চা খাদ্যভোগের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে কাজ করে।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!