আধুনিককালে জাতি বলতে আমরা বুঝি এমন এক জনসমষ্টিকে, যারা কতকগুলো ঐক্যসূত্রে আবদ্ধ এবং সে ঐক্যসূত্র এত প্রবল ও বাস্তব যে, তারা একত্রে বসবাস করতে চায়, বিচ্ছিন্ন হলে অসন্তুষ্ট হয়। তাদের সাথে একই ঐক্যসূত্রে আবদ্ধ নয় এমন কোনো জনগোষ্ঠীর শাসন তারা সহ্য করে না।
খায়রুল কবির জাতিতে বাঙালি। আর জাতীয়তার দিক থেকে সে বাংলাদেশি। এ উক্তি দুটির আলোকে জাতি ও জাতীয়তার পার্থক্যসমূহ নিচে উপস্থাপন করা হলো-
পার্থক্যের বিষয় | জাতি | জাতীয়তা |
১. সংজ্ঞা | জাতি হলো সেসব জনসমষ্টি যা রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান দ্বারা সংগঠিত এবং স্বাধীনতা লাভ করেছে বা স্বাধীনতা লাভে আগ্রহী। | জাতীয়তা হলো সেই জনসমষ্টি যারা একই ভাষা, সাহিত্য, আদর্শ, আচার-ব্যবহার ও ঐতিহ্যের ঐক্যসূত্রে আবদ্ধ। |
২. সৃষ্টি ও গঠন | জাতি গঠনের পূর্বশর্ত হচ্ছে জাতীয়তাবোধ। | জাতীয়তাবোধ সৃষ্টিতে কতকগুলো সাধারণ সূত্রে মিল থাকা জরুরি। |
৩. ধারণা | জাতি একটি বাস্তব ধারণা। | জাতীয়তা একটি মানসিক ধারণা। |
৪. রাজনৈতিক সংগঠনের প্রয়োজনীয়তা | জাতি গঠনে রাজনৈতিক সংগঠন বর্তমান। | জাতীয়তায় রাজনৈতিক সংগঠনের প্রয়োজন নেই। |
৫. সুসংহত | জাতি সুসংহত, স্বাধীন কিংবা স্বাধীনতা সংগ্রামে লিপ্ত। | জাতীয়তা খুব বেশি সুসংহত নয়। |
৬. শর্ত ও সূত্র | জাতি গঠনের শর্ত হলো | জাতীয়তাবোধের সৃষ্টিতে কিছু সাধারণ |
পার্থক্যের বিষয় | জাতি | জাতীয়তা |
| জাতীয়তাবোধ। | সূত্রে মিল থাকা দরকার। যেমন-ভাষা, কৃষ্টি ইত্যাদি |
৭. উৎপত্তি | জাতির উৎপত্তি অনেক প্রাচীন। | আধুনিককালে জাতীয়তার উৎপত্তি। |
৮. আদর্শগত | জাতি একটি সুসংগঠিত আদর্শ। | জাতীয়তা জাতির আদর্শ হিসেবে বিবেচিত হয়। |
৯. চেতনাগত | জাতি হলো বিশেষ কতকগুলো চেতনার সমন্বিত ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া। | জাতীয়তা হলো এসব চেতনার প্রাথমিক অবস্থা। |
অতএব বলা যায়, জাতি ও জাতীয়তার মধ্যে পার্থক্য কিছু থাকলেও উৎপত্তিগত অর্থে উভয়ের মধ্যেই মিল রয়েছে। তাই বলা যায়, উভয়ের চলার পথ এক ও অভিন্ন।
বাংলাদেশের ইতিহাস পর্যালোচনায় বলা যায়, জাতি গঠনে ভাষার গুরুত্ব অপরিসীম। উদ্দীপকের এ বিষয়টির সত্যতা মেলে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন পর্যালোচনায়। এ আন্দোলনের পথ ধরে বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশ ঘটেছিল এবং জন্ম হয়েছিল বাঙালি জাতির। উদ্দীপকের উক্তিটির সপক্ষে নিচে জাতি গঠনে ভাষার গুরুত্ব পর্যালোচনা করা হলো-
ভাষা মানুষের মনের ভাব প্রকাশের প্রধান বাহন। ভাষার সাহায্যে একজন আর একজনের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করতে পারে। ভাষা দ্বারা সৃষ্ট সাহিত্যের মধ্যেই জনসমষ্টির সামগ্রিক দিক ফুটে ওঠে। কোনো একটি সমাজের অন্তর্ভুক্ত সব মানুষই একটি ভাষায় কথা বলে। একই সাহিত্য তাদেরকে সমানভাবে অনুপ্রাণিত এবং আকৃষ্ট করে তোলে এবং তাদের মধ্যে জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ঘটায়। প্রত্যেকে একই ভাষার লোক হওয়ায় তাদের মধ্যে সহজেই ভাবের আদান-প্রদান সম্ভব হয় এবং তাদের মধ্যে ঐক্য গড়ে ওঠে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, সুইজারল্যান্ডে তিনটি ভাষা, চীনে বহু ভাষা এবং বেলজিয়ামে দুটি ভাষা প্রচলিত থাকলেও তারা সবাই একটি জাতিতে পরিণত হয়েছে। এজন্য বেলজিয়ামে একটি জাতি, সুইজারল্যান্ডে একটি জাতি এবং চীনে একটি জাতি গড়ে উঠেছে। ভাষার ঐক্য জাতি গঠনে ব্যাপক সাহায্য করে। একই ভাষাভাষী জনসমষ্টি ও একই সাহিত্যের পাঠকবৃন্দ স্বভাবতই দৃঢ় ঐক্যবদ্ধ। একই ভাষার মানুষ শিক্ষা, সাহিত্য, চিকিৎসা, বিজ্ঞান, খেলাধুলা, আমোদ-প্রমোদ প্রভৃতি ক্ষেত্রে সাবলীলভাবেই নিজেদেরকে বুঝতে পারে। পরস্পরের প্রতি তারা একটা মমতা অনুভব করে, অনুপ্রাণিত হয় পরস্পরের সাথে থাকতে। সুতরাং জাতি গঠনে ভাষার গুরুত্ব অপরিসীম।
পরিশেষে বলা যায়, ভাষাগত ঐক্য জাতি গঠনের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান বটে, কিন্তু অপরিহার্য উপাদান নয়। কারণ বিভিন্ন ভাষাভাষী লোক একই জাতীয়তায় আবদ্ধ হতে পারে। আবার একই ভাষ্যভাষী লোক বিভিন্ন জাতীয়তায় বিভক্ত হতে পারে। তবে ভাষা ভাব প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে একটি জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রবল ঐক্যানুভূতির উপাদান হিসেবে কাজ করে। যার প্রকৃষ্ট উদাহরণ ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন ও তৎপরবর্তী আন্দোলনসমূহ এবং বাঙালি জাতিসত্তার বিকাশ
Related Question
View AllNationality' শব্দের অর্থ জাতীয়তা।
জাতীয়তাবাদ একটি মহান আদর্শ, যা মূলত এক প্রকার মানসিক অনুভূতি। বিভিন্ন উপাদান থেকে এর উৎপত্তি। কিন্তু এ জাতীয়তাবাদ যদি এমন হয় যে, তা অন্য জাতিকে ঘৃণা করতে শেখায়, নিজেকে শ্রেষ্ঠ ভাবতে শেখায় এবং অন্যকে নিজের অধীন রাখার মতো হীনমানসিকতাকে জাগিয়ে তোলে, তবে তা হবে উগ্র জাতীয়তাবাদ। এটি একটি বিবৃত মানসিকতা যা ব্যক্তিকে অন্ধ দেশপ্রেমে প্রলুব্ধ করে। জার্মানির হিটলার, ইতালির মুসোলিনী এরূপ জাতীয়তাবাদী আদর্শে বিশ্বাসী ছিল, যার ফলাফল প্রলয়ঙ্করী দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ।
বাঙালি জাতীয়তাবাদ একটি ঐতিহাসিক বিষয়। এর বিকাশ ঘটেছে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনকে ভিত্তি করে, যা প্রধান শিক্ষক উদ্দীপকে উল্লেখ করেছেন। বাঙালি জাতীয়তাবাদের উদ্ভব ও বিকাশের পর্যায়ে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন এক মাইলফলক। বাঙালি দামাল ছেলেরা ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে নিজেদের বুকের তাজা রক্ত দিয়ে এক ইতিহাস রচনা করে। এ ভিত্তিতেই রচিত হয় বাঙালি জাতীয়তাবাদ বিকাশ। ৫২'র ভাষা আন্দোলন ছিল স্বাধিকার আদায়ের প্রথম ধাপ। এ আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে ৫৪'র নির্বাচন, ৬২'র শিক্ষা আন্দোলন, ৬৬'র ছয় দফা, ৬৯'র গণঅভুত্থান, ৭০'র নির্বাচন এবং ৭১'র স্বাধীনতা অর্জিত হয়। এ দীর্ঘ পথপরিক্রমায় বাঙালির ভাষাভিত্তিক জাতীয়তার ভিত্তি সুদৃঢ় হয়েছে। বাঙালি জাতি এক ঐক্যবদ্ধ জাতিতে পরিণত হয়। স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং বিজয় অর্জনে এটি আমাদের অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে।
জাতীয়তা একটি বহুমাত্রিক বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন প্রত্যয়। এটি গড়ে ওঠার পেছনে অনেকগুলো factor কাজ করে থাকে। উদ্দীপকে প্রধান অতিথি যে কথাটি বলেছেন, তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কেননা শুধু ভাষাগত মিল একটি জাতীয়তা নির্মাণের একমাত্র ভিত্তি হতে পারে না। যেমন- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, নিউজিল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা প্রভৃতি দেশের ভাষা ইংরেজি হলেও তারা প্রত্যেকে আলাদা আলাদা জাতি। বাংলাদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গের লোকজনের ভাষা এক হওয়া সত্ত্বেও এরা আলাদা দুটি জাতি। আবার ভারত বহু ভাষাভাষীর জনগোষ্ঠীর দেশ হলেও তাদের জাতীয়তা এক। এভাবে ভাষাগত সাদৃশ্য বা বৈসাদৃশ্য একরূপ জাতীয়তা সৃষ্টি বা আলাদা করতে ভূমিকা পালন নাও করতে পারে। জাতীয়তা নির্মাণের পথ অত্যন্ত জটিল ধারায় আবর্তিত হয়।
জাতীয়তা নির্ধারণের অন্যান্য যেসব উপাদান রয়েছে তার মধ্যে প্রধান হলো একই ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, ধর্ম, সাহিত্য, ভৌগোলিক ঐক্য, মনস্তাত্ত্বিক ঐক্য, রাজনৈতিক ঐক্য, অর্থনৈতিক অভিন্ন উদ্দেশ্য ইত্যাদি। পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চল থেকে, বিভিন্ন ভাষা, ধর্ম ও সংস্কৃতির লোক জড়ো হয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘদিন বসবাস করছে। অর্থনৈতিক ও সামাজিক ঐক্য তাদেরকে একই সূত্রের বন্ধনে আবদ্ধ করেছে এবং শক্তিশালী জাতীয়তা নির্মাণে সহায়তা করেছে। তাদের সবার জাতীয়তা নির্ধারিত হয়েছে মার্কিনী। এরূপ কালের পরিক্রমায় দীর্ঘ পরিসরে মানুষের জীবনধারার প্রেক্ষিতে একটি জাতীয়তা গড়ে উঠেছে।
অনুরূপভাবে বাংলাদেশের ভূখণ্ডে বসবাসকারী মানুষের মধ্যেও ইতিহাসের বিবর্তন ধারায় গড়ে উঠেছে জাতীয় চেতনা। এ চেতনা থেকেই সৃষ্টি হয়েছে জাতীয়তাবোধ। পৃথিবীর অধিকাংশ দেশেই এরূপ লক্ষ করা যায়। Activate
১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান এবং ১৫ আগস্ট ভারত স্বাধীনতা লাভ করে।
জাতীয়তাবোধে উদ্বুদ্ধ জনসমষ্টির রাষ্ট্রগুলোকে জাতি-রাষ্ট্র বলা হয়। জাতীয়তার উপাদানগুলোর মাধ্যমে সংগঠিত ও স্বাধীন হয়ে এরূপ রাষ্ট্র গঠিত হয়। জাতিরাষ্ট্র ধারণার প্রবক্তা ম্যাকিয়েভেলি। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি ইত্যাদি জাতি-রাষ্ট্র।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!