সামাজিকীকরণ হলো একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে মানুষ সমাজের রীতিনীতি, নিয়মকানুন ও মূল্যবোধ শেখে। জন্মের পর থেকেই মানব শিশু পরিবার, প্রতিবেশী, সমবয়সী ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এই প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করে। এর ফলে সে সমাজের একজন উপযোগী সদস্য হিসেবে গড়ে ওঠে।
সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ার মূল বৈশিষ্ট্য হলো এটি মানুষের ব্যক্তিত্ব গঠনে সহায়তা করে। এটি পরিবার, প্রতিবেশী, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক দল এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ব্যক্তির মূল্যবোধ, আচরণ ও চিন্তাধারা গঠনের প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়া সমাজের সঙ্গে মানুষের সামঞ্জস্য সাধনে সাহায্য করে।
পরিবার সামাজিকীকরণের প্রথম ও প্রধান মাধ্যম। শিশুর আবেগ, আচরণ, খাদ্যাভ্যাস, ধর্মচর্চা এবং পোশাক-পরিচ্ছদের মতো বিষয়গুলো পারিবারিক পরিবেশে গড়ে ওঠে। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সম্পর্কের মাধ্যমে শিশুর ব্যক্তিত্ব গঠন হয়। এজন্য পরিবারকে সামাজিকীকরণের সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম বলা হয়।
প্রতিবেশী শিশুর সামাজিকীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শিশুর চারপাশের মানুষের আচরণ, রীতিনীতি ও মূল্যবোধ তার আচরণে প্রভাব ফেলে। প্রতিবেশীদের সঙ্গে মেলামেশা করে শিশু সমাজের নিয়ম ও রীতিনীতি সহজে আয়ত্ত করে। এটি তার সামাজিক দক্ষতা বাড়ায়।
স্থানীয় সমাজের সাহিত্য, সাংস্কৃতিক সংঘ, বিজ্ঞান ক্লাব এবং খেলাধুলার ক্লাব শিশুর চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গি গঠনে সাহায্য করে। এসব সংগঠনে অংশগ্রহণ করে শিশু সহনশীলতা, বুদ্ধিবৃত্তি ও সৌন্দর্যবোধের বিকাশ ঘটায়। এতে শিশু স্থানীয় সমাজের অংশ হয়ে ওঠে এবং সামাজিক বন্ধন দৃঢ় হয়।
স্থানীয় সমাজের সাহিত্য, সংগঠন এবং ক্লাব শিশুর চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গি গঠনে ভূমিকা রাখে। এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে শিশু সহনশীলতা, সহযোগিতা ও সৃজনশীলতা শেখে। এটি তাকে সমাজের কার্যকর অংশীদার হতে সাহায্য করে।
সমবয়সী সঙ্গীরা খেলাধুলা ও অন্যান্য ক্রিয়াকলাপের মাধ্যমে শিশুর সামাজিকীকরণে ভূমিকা রাখে। খেলার মাধ্যমে তারা একে অপরের কাছ থেকে সহমর্মিতা, সহযোগিতা ও নেতৃত্বের গুণাবলি শেখে। তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক শিশুর আচরণ ও ব্যক্তিত্বের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শিশুদের ভাষা, পারস্পরিক সহযোগিতা, সহমর্মিতা ও দেশপ্রেম শেখায়। এখানে শিক্ষার্থীরা একে অপরের সঙ্গে মেলামেশার মাধ্যমে সমাজের নিয়ম ও মূল্যবোধ আয়ত্ত করে। এটি তাদের সামাজিক ও বৌদ্ধিক দক্ষতা উন্নত করে এবং ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করে।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শিশুদের ভাষা, সহযোগিতা, সহমর্মিতা এবং দেশপ্রেম শেখায়। এখানে শিশুরা একে অপরের সঙ্গে মেলামেশার মাধ্যমে সমাজের রীতিনীতি ও দায়িত্ববোধ শেখে। এটি তাদের ভবিষ্যৎ নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলে।
রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান নাগরিকদের সচেতন ও সংগঠিত করে সামাজিকীকরণে ভূমিকা রাখে। এটি মানুষের মধ্যে দায়িত্ববোধ জাগ্রত করে এবং নাগরিক অধিকার ও কর্তব্য পালনে উদ্বুদ্ধ করে। আন্দোলন ও নেতৃত্বের মাধ্যমে এটি সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে দায়িত্বশীল নাগরিক গড়ে তোলে।
সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ব্যক্তি সমাজের নিয়মকানুন, আদর্শ ও অভ্যাস আয়ত্ত করে। এটি ব্যক্তি ও সমাজের মধ্যে সম্পর্ক তৈরি করে। সমাজের বিভিন্ন উপাদান এই প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এর মাধ্যমে ব্যক্তি সমাজের সুনির্দিষ্ট কাঠামোর সাথে খাপ খাওয়াতে শেখে।
অনুকরণ হলো অন্যের কাজ বা আচরণ হুবহু নকল করার প্রক্রিয়া।
শিশুরা বড়দের আচরণ, ভাষা ও বাচনভঙ্গি অনুকরণ করে শিখে। এটি তাদের শেখার প্রাথমিক মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। বড়রাও নতুন পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নিতে অনুকরণের সাহায্য নেয়।
অভিভাবন হলো একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে ব্যক্তি ধ্যানধারণা ও তথ্য অপরের মধ্যে সঞ্চারিত করে। এটি শিক্ষা, রাজনীতি ও বাণিজ্যসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অভিভাবন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর আচরণ ও মানসিকতা গঠনে সাহায্য করে।
অঙ্গীভূতকরণ হলো শিশু বয়সে এলোমেলো আচরণ থেকে সচেতনভাবে প্রয়োজনীয় বিষয় আয়ত্ত করা। এটি শিশুর বিনোদন, শিক্ষা ও ব্যক্তিত্ব বিকাশে ভূমিকা রাখে। শৈশবে এটি খেলনা বা প্রিয় বস্তু থেকে শুরু হয়ে সামাজিক প্রকৃতি অর্জনে প্রসারিত হয়।
ভাষা হলো যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম, যা সামাজিকীকরণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভাষার মাধ্যমে মানুষ তার মনের ভাব প্রকাশ করে এবং জ্ঞান অর্জন করে। এটি ব্যক্তি ও সমাজের মধ্যে সম্পর্ক তৈরি করে এবং ব্যক্তিত্ব বিকাশে ভূমিকা রাখে।
অনুকরণের মাধ্যমে শিশু ভাষা, উচ্চারণ ও আচার-আচরণ শেখে। এটি তাদের শেখার সহজ ও কার্যকর মাধ্যম। বড়দের আচার-আচরণ দেখে শিশু নিজেকে সামাজিক পরিরেশের সাথে মানিয়ে নেয়।
অভিভাবন প্রক্রিয়ার উদাহরণ হলো শিক্ষা ও প্রচার কার্যক্রম। বিজ্ঞাপন ও রাজনৈতিক প্রচারণায় এই প্রক্রিয়া ব্যবহার হয়। এটি মানুষের আচরণ ও মানসিকতা গঠনে সহায়ক।
অঙ্গীভূতকরণের পরিধি বয়স ও অভিজ্ঞতার সাথে প্রসারিত হয়। শৈশবে এটি খেলনা ও বিনোদনমূলক উপকরণ থেকে শুরু হয়ে সামাজিক আচরণে বিস্তৃত হয়। এটি ব্যক্তি ও সমাজের মধ্যে যোগসূত্র স্থাপন করে।
ভাষার মাধ্যমে মানুষ যোগাযোগ স্থাপন, জ্ঞান অর্জন ও শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে। এটি তার সামাজিকীকরণ ও ব্যক্তিত্ব গঠনের প্রধান মাধ্যম। ভাষার মাধ্যমেই সংস্কৃতি ও সামাজিক মূল্যবোধ প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে সঞ্চারিত হয়।
বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষের সামাজিকীকরণ গ্রামীণ পরিবেশে হয়। এদেশের প্রায় ৮৫% লোক গ্রামে বাস করায় তাদের "আচরণ ও মূল্যবোধ গড়ে ওঠে গ্রামীণ পরিবেশে। পরিবার, প্রতিবেশী ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান গ্রামীণ সামাজিকীকরণে প্রধান ভূমিকা রাখে।
শহরের সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ায় গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এটি মানুষকে বিশ্বের সমকালীন তথ্য ও জ্ঞান-বিজ্ঞান সম্পর্কে সচেতন করে। গণমাধ্যমের মাধ্যমে শহরের মানুষ নতুন ধারণা ও প্রযুক্তি গ্রহণে সক্ষম হয়।
গ্রামে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিশুদের ভাষা, মূল্যবোধ ও সামাজিক আচরণ শেখায়। বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও পাঠ্যক্রম শিশুদের সামাজিক দক্ষতা গড়ে তুলতে সহায়তা করে। বর্তমানে টেলিভিশন ও ইন্টারনেটও শিক্ষার্থীদের সামাজিকীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
শহরের শিশুদের সামাজিকীকরণে পরিবার প্রথম ও প্রধান মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। পরিবারে শিশু ভাষা শেখা, আচরণ শেখা এবং মূল্যবোধ অর্জনের সুযোগ পায়। বাবা-মা এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের কাছ থেকে শিশুর সামাজিকীকরণের প্রাথমিক শিক্ষা হয়।
শহরের অধিকাংশ শিশু একক পরিবারে বেড়ে ওঠে, যেখানে যৌথ পরিবার থেকে পাওয়া পারস্পরিক সহযোগিতার অভিজ্ঞতা থাকে না। পরিবারের সদস্যসংখ্যা কম হওয়ায় শিশুরা সামাজিক আন্তঃক্রিয়ার সুযোগ কম পায়। ফলে তাদের আচরণে সহযোগিতার অভাব দেখা দেয়।
তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি গ্রাম ও শহরের সামাজিকীকরণের ব্যবধান কমিয়ে আনছে। এটি উভয় স্থানের মানুষকে একই সময়ে সমসাময়িক জ্ঞান ও ধারণায় সমৃদ্ধ করছে। ইন্টারনেট এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম গ্রাম ও শহরের শিশুদের মধ্যে অভিন্ন আচরণ ও চিন্তার প্রসার ঘটাচ্ছে।
গ্রামীণ লোকসংস্কৃতি যেমন পালাগান, যাত্রা, পুতুল নাচ ইত্যাদি শিশুদের বিনোদনের মাধ্যমে সামাজিকীকরণে সহায়তা করে। এগুলোর মাধ্যমে শিশুরা তাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হয়। এসব উপাদান সমাজের রীতিনীতি এবং মূল্যবোধ শেখাতে সাহায্য করে।
শহরের শিশুদের সামাজিকীকরণে খেলাধুলা বড় ভূমিকা রাখে। এটি শিশুদের মধ্যে সহমর্মিতা, সহযোগিতা ও দলগত মানসিকতা তৈরি করে। খেলাধুলার মাধ্যমে শিশুরা একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে শেখে এবং সামাজিক আচরণ রপ্ত করে।
গণমাধ্যম হলো এমন মাধ্যম যার মাধ্যমে জনগণের কাছে সংবাদ, মতামত ও বিনোদন পরিবেশন করা হয়। যেমন- সংবাদপত্র, বেতার, টেলিভিশন ও চলচ্চিত্র। এগুলো ব্যক্তি ও সমাজের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
গণমাধ্যম ব্যক্তি ও সমাজকে শিক্ষিত করতে এবং সামাজিকীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সংবাদপত্র; বেতার, টেলিভিশন এবং চলচ্চিত্র মানুষের আচরণ, মূল্যবোধ এবং জ্ঞানকে প্রভাবিত করে। এটি নাগরিকদের মধ্যে সহমর্মিতা, সহনশীলতা এবং দেশপ্রেম জাগ্রত করে।
সংবাদপত্র সামাজিকীকরণে জনশিক্ষার প্রধান মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। এটি সমাজ, রাষ্ট্র ও বিশ্ব সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা তৈরি করে এবং মানুষের মনের সংকীর্ণতা দূর করে। পাশাপাশি এটি পারস্পরিক সহমর্মিতা ও সহনশীলতার বোধও সৃষ্টি করে।
টেলিভিশন মানুষকে বিনোদন, শিক্ষা ও তথ্য সরবরাহ করে সামাজিকীকরণে ভূমিকা রাখে। এটি শিশু-কিশোরদের ওপর ইতিবাচক এবং নেতিবাচক উভয় প্রভাব ফেলতে পারে। এটি আকর্ষণীয় শিক্ষা ও তথ্যমূলক অনুষ্ঠান প্রচারের মাধ্যমে সামাজিক উন্নয়নে সহায়তা করে।
টেলিভিশন শিশুদের মানসিক বিকাশে ইতিবাচক ভূমিকা রাখে। শিক্ষামূলক ও বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান শিশুদের জ্ঞান বাড়ায় এবং সৃজনশীলতাকে উৎসাহিত করে। তবে সহিংসতা বা মিথ্যাচার প্রদর্শন শিশুর আচরণে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিশেষ করে ইন্টারনেট মানুষের মধ্যে সহজ যোগাযোগের সুযোগ তৈরি করেছে। এটি ভাব বিনিময় এবং জ্ঞান আহরণের মাধ্যমে সামাজিকীকরণকে ত্বরান্বিত করে। ফলে ব্যক্তি ও সমাজ উভয়ই পরিবর্তনশীল বিশ্বের সাথে খাপ খাইয়ে চলতে পারে।
ইন্টারনেট মানুষের মধ্যে দ্রুত তথ্য আদান-প্রদানের সুযোগ সৃষ্টি করে। এটি মানুষের দৈনন্দিন কাজকে সহজ করে এবং প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিতি ঘটায়। ইন্টারনেট শিক্ষার প্রসার, পেশাগত দক্ষতা এবং সামাজিক যোগাযোগকে সহজতর করে। এটি গ্রামীণ ও শহুরে মানুষের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ বৃদ্ধিতেও ভূমিকা রাখে।
ই-মেইল দ্রুত ও সহজ যোগাযোগের মাধ্যমে সামাজিকীকরণে সহায়তা করে। এটি ব্যক্তি ও সমাজকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সংযুক্ত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এর মাধ্যমে তথ্য বিনিময়ের পাশাপাশি সম্পর্ক উন্নয়নও সম্ভব হয়।
ফেসবুক ও টুইটার মানুষকে দেশ-বিদেশের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন ও মত বিনিময়ের সুযোগ দেয়। এটি বন্ধুত্ব সৃষ্টি এবং সামাজিক নেটওয়ার্কিং-এর মাধ্যমে সামাজিকীকরণে সহায়তা করে। তবে এ মাধ্যমগুলোর অপব্যবহার সমাজে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব শিক্ষার একটি বিশাল তথ্যভাণ্ডার সরবরাহ করে, যা মানুষের সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে। এটি মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে এবং সমসাময়িক জ্ঞান আহরণে সহায়তা করে।
ই-কমার্স পণ্য লেনদেনের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে অর্থনৈতিক সংযোগ স্থাপন করে। এটি ব্যক্তি ও ব্যবসায়িক সম্পর্ক উন্নয়নের পাশাপাশি আধুনিক সমাজে সামাজিকীকরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে কাজ করে।
তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির অপব্যবহার ব্যক্তি ও সমাজের জন্য ক্ষতিকর। ইন্টারনেট ও ফেসবুকের অতিরিক্ত ব্যবহার তরুণদের শিক্ষার ক্ষতি এবং মানসিক সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। তাই সচেতনভাবে এর ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
সুস্থ ও রুচিশীল চলচ্চিত্র মানুষের মধ্যে মূল্যবোধ ও মানবিকতা জাগিয়ে তোলে। এটি সামাজিকীকরণে সহায়তা করলেও সহিংসতা ও নেতিবাচক বিষয়বস্তু সমাজে অপরাধ প্রবণতা বাড়াতে পারে।
আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থার মাধ্যমে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সমাজ ও সংস্কৃতির একে অপরের ওপর প্রভাব বিস্তারকে বিশ্বায়ন বলে। এটি সারা বিশ্বকে একটি বিশ্বপল্লিতে রূপান্তরিত করেছে। বিশ্বায়নের ফলে মানুষ আন্তর্জাতিকভাবে যুক্ত হচ্ছে এবং নিজ সমাজের পাশাপাশি বৈশ্বিক সমাজের অংশ হয়ে উঠছে।
বিশ্বায়ন সামাজিকীকরণকে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে উন্নীত করে। এটি মানুষের কাছে অন্যান্য দেশের সমাজ ও সংস্কৃতি সম্পর্কে জানার সুযোগ সৃষ্টি করে। বিশ্বায়নের মাধ্যমে মানুষ বিভিন্ন ভাষা, জীবনধারা ও মূল্যবোধ গ্রহণ করে এবং নিজেকে আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়।
বিশ্বায়নের ফলে মানুষ নিজের সমাজের গণ্ডি ছাড়িয়ে বৈশ্বিক - সমাজের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। শিক্ষায় প্রযুক্তির ব্যবহার, বিভিন্ন দেশের রীতিনীতি ও সংস্কৃতির গ্রহণ এবং বৈশ্বিক সমস্যার প্রতি সচেতনতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এটি ব্যক্তিকে বিশ্ব নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার পাশাপাশি সামাজিকীকরণের ধরনেও পরিবর্তন এনেছে।
তথ্যপ্রযুক্তি বিশ্বায়নের একটি প্রধান মাধ্যম। ইন্টারনেট, স্যাটেলাইট ও মোবাইল প্রযুক্তি মানুষের মধ্যে দ্রুত যোগাযোগ স্থাপন করে। এর মাধ্যমে মানুষ ঘরে বসেই বৈশ্বিক তথ্য ও জ্ঞান অর্জন করতে পারে, যা বিশ্বায়নকে ত্বরান্বিত করে।
আন্তর্জাতিক ভাষা, বিশেষত ইংরেজি, মানুষের সামাজিকীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এটি ভাষাগত প্রতিবন্ধকতা দূর করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষের সঙ্গে ভাব বিনিময় সহজ করে। ইংরেজি শেখার মাধ্যমে মানুষ বৈশ্বিক সমাজের সাথে যুক্ত হয়ে নিজেদের উন্নত করতে পারে।
বিশ্বায়নের কারণে শিক্ষায় প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়েছে এবং আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। অনলাইন শিক্ষা, মাল্টিমিডিয়া উপকরণ এবং বৈশ্বিক গবেষণা তথ্য শিক্ষার্থীদের আরও দক্ষ করে তুলেছে। এটি শিক্ষার গণ্ডি বিশ্বব্যাপী প্রসারিত করেছে।
বিশ্বায়নের ফলে সংস্কৃতিতে বৈচিত্র্য এবং সংমিশ্রণ দেখা যায়। বিভিন্ন দেশের রীতিনীতি ও সংস্কৃতি একে অপরের ওপর প্রভাব ফেলে। এটি ইতিবাচক পরিবর্তন আনলেও, কখনো কখনো স্থানীয় সংস্কৃতির ওপর বিদেশি সংস্কৃতির আধিপত্য তৈরি করতে পারে।
গণমাধ্যম বিশ্বায়নকে ত্বরান্বিত করে মানুষের কাছে বৈশ্বিক তথ্য ও ধারণা পৌঁছে দেয়। টেলিভিশন, ইন্টারনেট এবং সংবাদপত্রের মাধ্যমে মানুষ বিশ্বের বিভিন্ন ঘটনা সম্পর্কে জানতে পারে। এটি মানুষের জীবনযাত্রায় বৈশ্বিক চিন্তাধারার প্রসার ঘটায়।
বিশ্বায়নের মাধ্যমে মানুষ বিভিন্ন দেশের রীতিনীতি, ভাষা-ও সংস্কৃতি সম্পর্কে সচেতন হয়। বৈশ্বিক সমস্যার সমাধানে অংশগ্রহণ এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগের মাধ্যমে নিজেকে বিশ্ব সমাজের অংশ হিসেবে গড়ে তোলে। এটি মানুষকে বিশ্ব নাগরিক হয়ে উঠতে সহায়তা করে।
স্যাটেলাইট প্রযুক্তি যোগাযোগ ব্যবস্থাকে উন্নত করে সামাজিকীকরণে সহায়তা করে। এটি মানুষের জন্য টেলিভিশন, ইন্টারনেট এবং মোবাইল ফোনের মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন তথ্য ও অভিজ্ঞতা সহজলভ্য করেছে। ফলে মানুষ বৈশ্বিক জ্ঞানের সঙ্গে যুক্ত হয়ে নিজের দক্ষতা বৃদ্ধি করতে পারে।
'ই-কমার্স'-এর পূর্ণরূপ ইলেকট্রনিক কমার্স।
যে পদ্ধতিতে অনলাইনে ক্রেতা-বিক্রেতার মধ্যে পণ্য লেন-দেন করা যায়, তাকে ই-কমার্স বলে।
ই-মেইল হলো খুব অল্প সময়ে ও কম খরচে দেশ-বিদেশে চিঠি ও তথ্য আদান-প্রদানের ইলেকট্রনিক মাধ্যম।
যখন একজন অপরজনের কাজ ও আচার-আচরণ হুবহু নকল করে তখন তাকে অনুকরণ বলে।
যে প্রক্রিয়ায় জন্মের পর থেকে মানবশিশু সমাজের নিয়মকানুন ও রীতিনীতি শিখতে থাকে, সেই প্রক্রিয়ায় সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়া।
ই-মেইল এর পূর্ণরূপ হচ্ছে ইলেক্ট্রনিক মেইল।
মানুষের যোগাযোগের অন্যতম প্রধান মাধ্যম হলো ভাষা।
জনগণের কাছে সংবাদ, মতামত ও বিনোদন পরিবেশন করা হয় যেসব মাধ্যমে তাকেই বলা হয় গণমাধ্যম।
টুইটার হলো সামাজিক যোগাযোগের একটি কার্যকর মাধ্যম।
সামাজিকীকরণের প্রথম ও প্রধান বাহন হলো পরিবার।
সামাজিকীকরণের সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী ও জনপ্রিয় মাধ্যম হচ্ছে- টেলিভিশন।
পরিবারের পর শিশুর সামাজিকীকরণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে থাকে স্থানীয় সমাজ।
ব্যক্তির সুষ্ঠু বিকাশের জন্য সামাজিকীকরণ প্রয়োজন।
যে প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রস্তাব ও তথ্যাদি অপরের কাছে পৌছে দেওয়া হয় তাই অভিভাবন।
সমাজের নিয়মনীতি, মূল্যবোধ, বিশ্বাস, আদর্শ ইত্যাদি আয়ত্ত করার প্রক্রিয়াকে সামাজিকীকরণ বলে।
সামাজিকীকরণ একটি জীবনব্যাপী চলমান প্রক্রিয়া।
আধুনিক যোগাযোগ মাধ্যমে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সমাজ ও সংস্কৃতি আমাদের ওপর প্রভাব ফেলেছে। এটিই হচ্ছে বিশ্বায়ন।
সামাজিকীকরণের সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী বাহন ইচ্ছে পরিবার।
সমবয়সী সঙ্গীদের সাথে মেলামেশার ফলে শিশুর মধ্যে সহমর্মিতা, সহযোগিতা, সহনশীলতা ও নেতৃত্বের গুণাবলি বিকশিত হয়।
অনুকরণের মাধ্যমে শিশু ভাষা, উচ্চারণ ও বাচনভঙ্গি ইত্যাদি আয়ত্ত করে থাকে।
বাংলাদেশের প্রায় ৮৫% লোক গ্রামে বাস করে।
শহরের অধিকাংশ শিশু বেড়ে ওঠে একক পরিবারে।
গ্রামাণ্যলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সামাজিকীকরণের অন্যতম প্রধান মাধ্যম।
শহরের মানুষের সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ায় পরিবার সবচেয়ে প্রথম ও প্রধান মাধ্যম।
শহরে গণমাধ্যম সামাজিকীকরণে শক্তিশালী ভূমিকা রাখে।
যে প্রযুক্তির সাহায্যে তথ্য সংরক্ষণ ও তা ব্যবহার করা যায় তাকে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বলে।
আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে সংবাদপত্র জনশিক্ষার একটি প্রধান মাধ্যম।
আজকের দিনে সারা পৃথিবীতেই টেলিভিশন সবচেয়ে শক্তিশালী ও জনপ্রিয় গণমাধ্যম।
অশ্লীল ও কুরুচিপূর্ণ চলচ্চিত্র সমাজের মানুষের মূল্যবোধ ও রুচির অবনতি ঘটায়।
ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব-এ যেকোনো বিষয় সম্পর্কে সবরকম তথ্য পাওয়া যায়।
www-এর পূর্ণরূপ হলো- World Wide Web (ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব)।
ফেসবুক ও টুইটারের সাহায্যে খুব সহজে দেশে বা বিদেশে যেকোনো মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ ও বন্ধুত্ব সৃষ্টি এবং মতামত ও ছবি বিনিময় করা যায়।
বিশ্বায়নের ফলে সারাবিশ্ব এখন বিশ্বপল্লিতে রূপান্তরিত হয়েছে।
সামাজিকীকরণ একটি চলমান প্রক্রিয়া। শৈশবে এ সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়া শুরু হয়ে আজীবন চলতে থাকে। পরিবর্তনশীল সমাজের সাথে খাপ খাইয়ে চলতে মানুষকে প্রতিনিয়তই সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। একমাত্র মৃত্যুর মধ্য দিয়েই সামাজিকীকরণের পরিসমাপ্তি ঘটে। তাই সামাজিকীকরণকে একটি জীবনব্যাপী প্রক্রিয়া বলা হয়ে থাকে।
সামাজিকীকরণ একটি জীবনব্যাপী চলমান প্রক্রিয়া। জন্মের পর হতে এ প্রক্রিয়া শুরু হয় এবং মৃত্যুর মাধ্যমে এর অবসান ঘটে। এ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ব্যক্তি সমাজ জীবনের কাঙ্ক্ষিত আচরণ উপযোগী হয়ে ওঠে। এ প্রক্রিয়ায় সমাজের নিয়মনীতি, মূল্যবোধ, বিশ্বাস, আদর্শ ইত্যাদি আয়ত্ত করে ব্যক্তি যেমন নিজের উন্নয়ন ঘটায়, তেমনি সমাজ উন্নয়নেও সহায়তা করে।
শিশুর সামাজিকীকরণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করায় 'পরিবারকে সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ার প্রধান বাহন বলা হয়। কেননা পরিবারে বসবাস করতে গিয়ে শিশু পরিবারের সদস্যদের প্রতি আবেগ, অনুভূতি, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জাগিয়ে তোলে। খাদ্যাভ্যাস, পোশাক-পরিচ্ছদ, ধর্মচর্চা, শিক্ষাগ্রহণ প্রভৃতি বিষয় সম্পর্কে পারিবারিক সংস্কৃতির প্রতিফলন সরাসরি ব্যক্তির ওপর পড়ে। এজন্যই বলা হয়, সামাজিকীকরণের সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী বাহন হচ্ছে পরিবার।
কাঙ্ক্ষিত ও সুস্থ জীবনের জন্য প্রত্যেক ব্যক্তিকে সমাজের কিছু সুনির্দিষ্ট নিয়মনীতি, আদর্শ-অভ্যাস আয়ত্ত করতে হয়। সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ব্যক্তি এগুলো আয়ত্ত করে। অর্থাৎ সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ব্যক্তি সমাজজীবনের কাঙ্ক্ষিত আচরণে সমাজ উপযোগী হয়ে গড়ে ওঠে। কাজেই ব্যক্তির সুষ্ঠু বিকাশের জন্য সামাজিকীকরণ প্রয়োজন।
স্থানীয় সমাজ বা সম্প্রদায় সামাজিকীকরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। এ সমাজের মধ্যেও শিশু ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠে। স্থানীয়ভাবে প্রতিষ্ঠিত বিধিনিষেধ ব্যক্তির মধ্যে মূল্যবোধ তৈরি করে, এ মূল্যবোধ ব্যক্তিকে সমাজের অনুকূলে আচরণ করতে শেখায়। কোনো কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলের ভাষা, আচার-আচরণ ওই সমাজে বসবাসরত ব্যক্তির আচরণে প্রতিভাত হতে দেখা যায়। ওই সমাজের গড়ে ওঠা মূল্যবোধও আচরণে প্রভাব ফেলে।
যখন একজন মানুষ আরেকজনের কাজ ও আচার-আচরণ হুবহু নকল করে তখন তাকে অনুকরণ বলে। শিশুরা সবসময়ই বড়দের অনুকরণ করে। অনুকরণের মাধ্যমে শিশু ভাষা, উচ্চারণ ও 'বাচনভঙ্গি ইত্যাদি আয়ত্ত করে থাকে। বড়রাও অনেক সময় অন্যকে অনুকরণের মাধ্যমে নতুন বা অচেনা পরিবেশে উপযোগী করে নিজেকে খাপ খাওয়ায়।
অভিভাবন এক ধরনের যোগাযোগ মাধ্যম বা প্রক্রিয়া। এ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রস্তাব বা তথ্যাদি অপরের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়। শিশুর মধ্যে যুক্তি বা জ্ঞানের পরিপক্বতা থাকে না। তাই তারা সহজে অভিভাবিত হয়ে যায়। সমাজজীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অভিভাবন প্রক্রিয়ার প্রয়োগ পরিলক্ষিত হয়।
সামাজিকীকরণের বিভিন্ন উপাদানের মধ্যে অঙ্গীভূতকরণ অন্যতম একটি উপাদান। অঙ্গীভূতকরণ শিশুর এক ধরনের বিনোদন। শিশু শৈশবে যা কিছু করে তা অঙ্গীভূতকরণের মাধ্যমেই করে। শিশুদের অঙ্গীভূতকরণ প্রক্রিয়া ক্রমশ প্রসারিত হতে থাকে এবং সে ধীরে ধীরে সামাজিক প্রকৃতি অর্জন করে।
শিশুদের যুক্তি বা জ্ঞানের পরিপক্কতা থাকে না বলে তারা সহজেই অন্যের দ্বারা প্রভাবিত-হয়। শিশুর সামাজিকীকরণে সমবয়সি বন্ধু বা সঙ্গীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শিশুদের সমবয়সীদের সাথে খেলাধুলার আকর্ষণ থাকে অপ্রতিরোধ্য। খেলার সাথীরা একে অপরের কাছ থেকে অনেক কিছু শিখে। কথাবার্তা, আচার-আচরণ ও চালচলনের ক্ষেত্রে তারা একে অন্যকে প্রভাবিত করে। এর মধ্য দিয়ে শিশুর মধ্যে সহমর্মিতা, সহযোগিতা, সহনশীলতা ও নেতৃত্বের গুণাবলি বিকশিত হয়।
গ্রামের মানুষের সামাজিকীকরণে লোকসংস্কৃতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ব্যক্তির সুষ্ঠু বিকাশের জন্য সামাজিকীকরণ প্রয়োজন। জন্মের পর থেকে মানব শিশু সমাজের নিয়মকানুন ও রীতিনীতি শিখতে থাকে। এসব রীতিনীতির মধ্যে লোকসংস্কৃতিও রয়েছে। লোকসংস্কৃতি হলো উৎসব, পালাগান, লোক নাটক, লোক সংগীত, যাত্রা, পুতুল নাচ। লৌকিক আচার প্রভৃতি। এসব লোকসংস্কৃতির মাধ্যমে সামাজিকীকরণের বিকাশ ঘটে।
নিজ সমাজ ও বিশ্বসম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা লাড় করার জন্য
আমাদের প্রতিদিন সংবাদপত্র পাঠ করা প্রয়োজন। সামাজিকীকরণের ক্ষেত্রে সংবাদপত্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে সংবাদপত্র জনশিক্ষার একটি প্রধান বাহন। এটি নিজ সমাজ ও বিশ্ব সম্পর্কে একটি স্বচ্ছ ধারণা সৃষ্টির মাধ্যমে আমাদের মনের সংকীর্ণতা দূর করে। আমাদের মধ্যে পারস্পরিক সহনশীলতা, সহমর্মিতা ও বিশ্বজনীনতা বোধ সৃষ্টি করে। এজন্য আমরা প্রতিদিন সংবাদপত্র পাঠ করব।
সুস্থ, রুচিশীল ও শিক্ষামূলক চলচ্চিত্র মানুষকে আনন্দ দেওয়ার পাশাপাশি তাদের মধ্যে মূল্যবোধ, মানবিকতা ও সহমর্মিতা বোধ জাগিয়ে তোলে। আবার অশ্লীল ও কুরুচিপূর্ণ চলচ্চিত্র সমাজের মানুষের মূল্যবোধ ও রুচির অবনতি ঘটায়। সমাজে যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
ই-মেইল হচ্ছে ইলেক্ট্রনিক মেইল কথাটার সংক্ষিপ্ত রূপ। এর মাধ্যমে খুব অল্প সময়ে ও কম খরচে দেশে-বিদেশে চিঠি ও তথ্য আদান-প্রদান করা যায়। ই-মেইল পৃথিবীব্যাপী যোগাযোগ ব্যবস্থার ক্ষেত্রে যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছে। ব্যক্তির সামাজিকীকরণ ও তার মাধ্যমে পরিবর্তনশীল বিশ্বের সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলতে বর্তমানে ই-মেইলের কোনো বিকল্প নেই।
যেকোনো বিষয় সম্পর্কে ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব বা www-তে সবরকম তথ্য পাওয়া যায়। শহরের একমাথা থেকে আরেক মাথায় পৌছানোর মানচিত্র থেকে শুরু করে কোথায় কোন জিনিস কত দামে পাওয়া যায় বা আজ কোথায় কী ঘটছে অথবা আবহাওয়া কেমন কিংবা এনসাইক্লোপিডিয়া সুদ্ধ দুনিয়ার তথ্যভান্ডার আজ www-এর দুনিয়ায় উন্মুক্ত। যা মানুষের শিক্ষা ও সামাজিকীকরণকে ব্যাপক প্রভাবিত করছে।
আজকের দিনে সারা পৃথিবীতে টেলিভিশন সবচেয়ে শক্তিশালী এ জনপ্রিয় গণমাধ্যম। কারণ মানুষের চিন্তাভাবনা ও জীবনযাপনকে এটি সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করে। টেলিভিশন বিনোদন ও শিক্ষামূলক নানা ধরনের অনুষ্ঠান প্রচার করে নাগরিকদের আনন্দ ও শিক্ষা দেয়। সাধারণ মানুষ বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের ওপর টেলিভিশনের প্রভাব খুব বেশি। তাই টেলিভিশনকে সবচেয়ে শক্তিশালী গণমাধ্যম বলা হয়।
বিশ্বায়ন হলো এমন একটি প্রক্রিয়া যা রাষ্ট্র ও সম্প্রদায়ের পুরনো কাঠামো ও সীমানাকে অবলুপ্ত করেছে। এটি রাষ্ট্রীয় সীমানার প্রাচীর ভেঙে অর্থনৈতিক যোগাযোগ ও লেনদেন, সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান, রাজনৈতিক মিথস্ক্রিয়া প্রভৃতি ক্ষেত্রে ব্যাপকতর পরিবর্তন নিয়ে এসেছে, যা সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করেছে। শিশুর জন্মের পর হতে মৃত্যু পর্যন্ত বিভিন্ন মাধ্যমে অভিজ্ঞতা অর্জন ও খাপ খাওয়ানোর প্রক্রিয়াই সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়া। বর্তমানে বিশ্বায়ন সামাজিকীকরণকে বিভিন্নভাবে প্রভাবিত করছে।
সামাজিকীকরণ মানুষের জীবনব্যাপী একটি চলমান প্রক্রিয়া। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত এ প্রক্রিয়া চলতে থাকে। এ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ব্যক্তি সমাজ জীবনের কাঙ্ক্ষিত আচরণ উপযোগী হয়ে গড়ে উঠে। এ প্রক্রিয়ায় সমাজের নিয়ম-নীতি, মূল্যবোধ, বিশ্বাস, আদর্শ ইত্যাদি আয়ত্ত করে ব্যক্তি যেমন নিজের উন্নয়ন ঘটায় তেমনি সমাজ উন্নয়নেও অংশগ্রহণ করে। তোমরা ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণিতে সামাজিকীকরণ সম্পর্কে ধারণা অর্জন করেছ। এ অধ্যায়ে শিশুর সামাজিকীকরণে কতিপয় উপাদানের প্রভাব, বাংলাদেশে গ্রাম ও শহরের সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়া এবং সামাজিকীকরণে বিশ্বায়নের প্রভাব সম্পর্কে অবহিত হবে।
এ অধ্যায় শেষে আমরা-
• সামাজিকীকরণে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও উপাদানের প্রভাব ব্যাখ্যা করতে পারব ;
• বাংলাদেশের গ্রাম ও শহরের সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়া তুলনা করতে পারব ;
• সামাজিকীকরণে গণমাধ্যম ও তথ্য এবং যোগাযোগ প্রযুক্তির প্রভাব বিশ্লেষণ করা ও এর ইতিবাচক ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ হব ;
• সামাজিকীকরণে বিশ্বায়নের প্রভাব ব্যাখ্যা করতে পারব এবং এ সম্পর্কে বাস্তব তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে প্রতিবেদন প্রণয়ন ও উপস্থাপন করতে পারব ;
• মানবিক ও সামাজিক গুণাবলি রপ্ত করে পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্ক উন্নয়নের যোগ্যতা অর্জন করব এবং শৃঙ্খলাপূর্ণ আচরণে উদ্বুদ্ধ হব ।
Related Question
View Allসামাজিকীকরণ হলো একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে মানুষ সমাজের রীতিনীতি, নিয়মকানুন ও মূল্যবোধ শেখে। জন্মের পর থেকেই মানব শিশু পরিবার, প্রতিবেশী, সমবয়সী ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এই প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করে। এর ফলে সে সমাজের একজন উপযোগী সদস্য হিসেবে গড়ে ওঠে।
সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ার মূল বৈশিষ্ট্য হলো এটি মানুষের ব্যক্তিত্ব গঠনে সহায়তা করে। এটি পরিবার, প্রতিবেশী, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক দল এবং অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ব্যক্তির মূল্যবোধ, আচরণ ও চিন্তাধারা গঠনের প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়া সমাজের সঙ্গে মানুষের সামঞ্জস্য সাধনে সাহায্য করে।
পরিবার সামাজিকীকরণের প্রথম ও প্রধান মাধ্যম। শিশুর আবেগ, আচরণ, খাদ্যাভ্যাস, ধর্মচর্চা এবং পোশাক-পরিচ্ছদের মতো বিষয়গুলো পারিবারিক পরিবেশে গড়ে ওঠে। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সম্পর্কের মাধ্যমে শিশুর ব্যক্তিত্ব গঠন হয়। এজন্য পরিবারকে সামাজিকীকরণের সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম বলা হয়।
প্রতিবেশী শিশুর সামাজিকীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শিশুর চারপাশের মানুষের আচরণ, রীতিনীতি ও মূল্যবোধ তার আচরণে প্রভাব ফেলে। প্রতিবেশীদের সঙ্গে মেলামেশা করে শিশু সমাজের নিয়ম ও রীতিনীতি সহজে আয়ত্ত করে। এটি তার সামাজিক দক্ষতা বাড়ায়।
স্থানীয় সমাজের সাহিত্য, সাংস্কৃতিক সংঘ, বিজ্ঞান ক্লাব এবং খেলাধুলার ক্লাব শিশুর চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গি গঠনে সাহায্য করে। এসব সংগঠনে অংশগ্রহণ করে শিশু সহনশীলতা, বুদ্ধিবৃত্তি ও সৌন্দর্যবোধের বিকাশ ঘটায়। এতে শিশু স্থানীয় সমাজের অংশ হয়ে ওঠে এবং সামাজিক বন্ধন দৃঢ় হয়।
স্থানীয় সমাজের সাহিত্য, সংগঠন এবং ক্লাব শিশুর চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গি গঠনে ভূমিকা রাখে। এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে শিশু সহনশীলতা, সহযোগিতা ও সৃজনশীলতা শেখে। এটি তাকে সমাজের কার্যকর অংশীদার হতে সাহায্য করে।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!