কোনো জায়গার গড় জলবায়ুর দীর্ঘমেয়াদি ও অর্থপূর্ণ পরিবর্তন যার ব্যাপ্তিকাল কয়েক যুগ থেকে কয়েক লক্ষ বছর পর্যন্ত হতে পারে, তাকে জলবায়ুর পরিবর্তন বলে। ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বৃদ্ধি বা উষ্ণায়নের কারণে সারা পৃথিবীতেই জলবায়ুর পরিবর্তন লক্ষ করা যায়।
জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে উষ্ণমণ্ডলীয় দেশে শুষ্ক মৌসুমে ফসলের উৎপাদন হ্রাস পায়। এছাড়া বর্ষাকালে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত, বন্যা ও জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। শুষ্ক মৌসুমে অনাবৃষ্টি ও অত্যধিক খরা, শিলাবৃষ্টি, সাইক্লোন ও জলোচ্ছ্বাসের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘটে। এছাড়া শীত মৌসুমে হঠাৎ শৈত্য ও উষ্ণ প্রবাহ এবং ঘন কুয়াশা লক্ষ করা যায়।
বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান এবং বৈশ্বিক উষ্ণায়ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ সংঘটনের কারণ। বাংলাদেশের জীবন ও অর্থনীতির ওপর এসব দুর্যোগের প্রভাব লক্ষ করা যায়। এক্ষেত্রে বাংলাদেশে কয়েকটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলো- বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, টর্নেডো, ভূমিকম্প, খরা, নদীভাঙন প্রভৃতি।
বিজ্ঞানের বিস্ময়কর অগ্রগতির মাধ্যমে পৃথিবীর মানুষ একদিকে যেমন তার জীবনকে করেছে সুখ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় অন্যদিকে তেমনি পৃথিবীর প্রাকৃতিক পরিবেশকে করেছে ক্ষতিগ্রস্ত ও ভারসাম্যহীন। জনসংখ্যার বিস্ফোরণ, বৃক্ষনিধন ও ইঞ্জিনচালিত যানবাহনসহ বড়ো বড়ো শিল্প-কারখানার কারণে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে সৃষ্টি হয় নানা সমস্যার। এসবের ফলে পৃথিবীতে তাপমাত্রা বাড়ছে। একেই বলা হয় বৈশ্বিক উষ্ণায়ন।
বৈশ্বিক সমস্যাগুলোর একটি হলো 'গ্রিনহাউস প্রতিক্রিয়া'। এটি একটি জটিল সমস্যা। গ্রিনহাউস মূলত কতকগুলো গ্যাসের সমন্বয়ে গঠিত একটি আচ্ছাদন। গ্রিনহাউস গ্যাসকে তাপ বৃদ্ধিকারক গ্যাসও বলে। এই গ্যাস পৃথিবীর চারপাশে বায়ুমন্ডলে চাদরের মতো আচ্ছাদন তৈরি করে আছে।
গ্রিনহাউস গ্যাস পৃথিবীকে ঘিরে চাদরের মতো একটি আচ্ছাদন তৈরি করেছে। সূর্যের তাপ এই চাদর শোষণ করে এবং তা পৃথিবীপৃষ্ঠে ছড়িয়ে দেয়। পৃথিবীপৃষ্ঠ দ্বারা গৃহীত এ তাপমাত্রা স্বাভাবিকভাবে রাতের বেলা প্রতিফলিত হয়ে, মহাশূন্যে মিলিয়ে যায় এবং এভাবেই পৃথিবী ঠান্ডা হয়। কিন্তু বায়ুমণ্ডলে নির্দিষ্ট কিছু গ্যাসের পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রতিফলিত তাপ সম্পূর্ণভাবে মহাশূন্যে মিলিয়ে 'না যেয়ে বায়ুমণ্ডলকে উত্তপ্ত করে।
বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে বায়ুমণ্ডল ও পৃথিবী ক্রমাগত উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের পানির উচ্চতা বাড়ছে এবং উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এছাড়া নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ সংঘটিত হচ্ছে।
বায়ুর মূল উপাদান হলো নাইট্রোজেন ও অক্সিজেন। এছাড়া বায়ুতে সামান্য পরিমাণে কার্বন ডাই অক্সাইড, মিথেন ও নাইট্রাস অক্সাইড আছে। আরও আছে জলীয় বাষ্প ও ওজোন গ্যাস। বায়ুমন্ডলের এই গৌণ গ্যাসগুলোকেই গ্রিনহাউস গ্যাস বলা হয়।
প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট গ্রিনহাউস গ্যাস ছাড়াও মানবসৃষ্ট কিছু গ্রিনহাউস গ্যাস রয়েছে। যেমন- ১. সিএফসি (ক্লোরো ফ্লোরো কার্বন), ২. এইচসিএফসি (হাইড্রো ক্লোরো ফ্লোরো কার্বন) ও ৩. হ্যালন গ্যাস।
বিভিন্ন প্রকার গ্রিনহাউস গ্যাসগুলোর মধ্যে গত এক শতাব্দীতে বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমাণ বেড়েছে শতকরা ২৫ ভাগ। একইভাবে নাইট্রাস অক্সাইডের পরিমাণও শতকরা
ওজোন স্তর হচ্ছে পৃথিবীর বায়ুমন্ডলের একটি স্তর, যেখানে তুলনামূলকভাবে বেশি মাত্রায় ওজোন গ্যাস থাকে। বায়ুমন্ডলের অনেকগুলো স্তর আছে। স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারের পরের স্তরটি হলো ওজোন স্তর। যা ২০ কি.মি. পর্যন্ত বিস্তৃত। এই স্তরের পুরুত্ব স্থানভেদে এবং মৌসুমভেদে কমবেশি হয়।
ওজোন স্তর সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি শোষণ করে পৃথিবীর জীবজগৎকে রক্ষা করে। এছাড়া ওজোন স্তর একটি অদৃশ্য ঢাল হিসেবে কাজ করে। ওজোন স্তর না থাকলে পৃথিবীতে প্রাণের অস্তিত্ব থাকত না। ওজোন স্তর ক্ষয়ের কারণে ভূপৃষ্ঠে অতিবেগুনি রশ্মির প্রভাব শতকরা পাঁচ ভাগ বৃদ্ধি পেয়েছে।
জীবাশ্ম জ্বালানি এক প্রকার জ্বালানি, যা বায়ুর অনুপস্থিতিতে আবাত পচন প্রক্রিয়ায় তৈরি হয়। এ প্রক্রিয়ায় জ্বালানি তৈরি হতে মিলিয়ন বছর লাগে। কয়েকটি জীবাশ্ম জ্বালানি হলো- কয়লা, প্রাকৃতিক গ্যাস, খনিজ তেল ইত্যাদি।
বিশ্বের উন্নত দেশগুলো অধিক হারে জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার করে পরিবেশ নষ্ট করছে। তাছাড়া এসব দেশ পারমাণবিক চুল্লি ব্যবহার করে, যা থেকে প্রচুর বর্জ্য সৃষ্টি হয়। এই বর্জ্যও গ্রিনহাউস গ্যাস বৃদ্ধি করছে, তবে বৈশ্বিক উষ্ণায়নে এর ভূমিকা অতি সামান্য। শিল্প-কারখানার বর্জ্য ও কালো ধোঁয়া থেকেও প্রচুর পরিমাণে পারদ, সিসা ও আর্সেনিক নির্গত হয়। এগুলো বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণ।
মহাসমুদ্রকে পৃথিবীর মানব দেহের ফুসফুসের সাথে তুলনা করা যায়। বিশ্বের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে মহাসমুদ্রের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু সমুদ্রে তেজস্ক্রিয় বর্জ্য নিক্ষেপ করার ফলে তা দূষিত হচ্ছে এবং এ দূষিত বাষ্প বাতাসে মিশ্রিত হয়েও বৈশ্বিক উষ্ণায়নে ভূমিকা রাখছে। এজন্য আমরা সমুদ্রে বর্জ্য ফেলব না।
আমরা জানি, সবুজ উদ্ভিদ বাতাস থেকে কার্বন ডাই অক্সাইড গ্রহণ করে এবং আমাদের জন্য অক্সিজেন ত্যাগ করে। কিন্তু ব্যাপকহারে বৃক্ষ নিধন বা বন উজাড়করণের ফলে বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমাণ বেড়ে গেছে। ফলে বায়ুমণ্ডলে ওজোন স্তর ক্ষয়কারী সিএফসি গ্যাস অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।
বর্তমান বিশ্বে ব্যাপক হারে নগর গড়ে উঠেছে। মানুষ কাজের খোঁজে শহুরে ছুটছে। ফলে শহরে জনসংখ্যার চাপ ও বিভিন্ন প্রকার যানবাহনের সংখ্যা বাড়ছে। এসব যানবাহনের নির্গত কালো ধোঁয়া হচ্ছে কার্বন ডাই অক্সাইড।
কৃষিতে যান্ত্রিক সেচ, নাইট্রোজেন সার, কীটনাশক প্রভৃতি ব্যবহার করা হয়। এসবের ফলেও বায়ুমণ্ডলের ওজোন স্তর ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যার প্রভাবে বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়ছে।
বৈশ্বিক উষ্ণায়নের তিনটি ক্ষতিকর প্রভাব হলো- ১. বাংলাদেশের উপকূলবর্তী অঞ্চলসমূহের ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ২. সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হচ্ছে। ৩. উপকূলীয় এলাকার কৃষি জমিতে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পেয়েছে।
সমুদ্রের পানির উচ্চতা বেড়ে যাওয়ার ফলে উপকূলবর্তী অঞ্চলসমূহে সমুদ্রের পানি ঢুকে পড়ে। ফলে উপকূলীয় এলাকার কৃষি জমিতে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পেয়েছে। জমির উর্বরাশক্তি কমে গেছে। অনেক রকম মিঠা পানির মাছ হারিয়ে যাচ্ছে। ধ্বংস হচ্ছে গাছপালা। এরই প্রভাব মানুষের জীবন-জীবিকার ওপর পড়ছে।
প্রাকৃতিক কোনো দুর্ঘটনা বা বিপর্যয় যখন কোনো জনপদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে বিপর্যস্ত করে তোলে, তখন তাকে আমরা প্রাকৃতিক দুর্যোগ বলি। প্রাকৃতিক দুর্যোগ হঠাৎ করে আসে। এর ওপর সাধারণ মানুষের হাত থাকে না। যেমন- বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, টর্নেডো, ভূমিকম্প ইত্যাদি।
সমুদ্রে সৃষ্ট দুটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ হচ্ছে 'আইলা' ও 'সিডর'। এ দুটি প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে আমাদের দেশের উপকূলবর্তী এলাকায় প্রাণহানি ও সম্পদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। খাবার পানির তীব্র অভাব দেখা দেয়। ইতোমধ্যে সুন্দরবনের প্রায় এক-চতুর্থাংশ বন নষ্ট হয়েছে। এর ফলে জীববৈচিত্র্য ও মৎস্য সম্পদের ক্ষতি হয়েছে।
উষ্ণায়নের কারণে পৃথিবীপৃষ্ঠে তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি সরাসরি পৃথিবীতে আসার ফলে মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর বিভিন্ন প্রকারের মারাত্মক রোগ সৃষ্টি হয়। উষ্ণায়নের ফলে মানুষের ক্যান্সার, চর্মরোগসহ নানা ধরনের নতুন নতুন রোগের আবির্ভাব ঘটে।
কোনো প্রাকৃতিক বা মানবসৃষ্ট অবস্থা যখন অস্বাভাবিক ও অসহনীয় পরিবেশের সৃষ্টি করে এবং এর ফলে শস্য ও সম্পদের অনেক ক্ষয়ক্ষতি ও ব্যাপক প্রাণহানি ঘটে এবং পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয় তখন তাকে দুর্যোগ হিসেবে বিবেচনা করা যায়।
দুর্যোগ দুই ধরনের। প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং মানবসৃষ্ট দুর্যোগ। প্রাকৃতিক দুর্যোগ আকস্মিকভাবে ঘটে এবং তার ওপর সাধারণত মানুষের হাত থাকে না। কিন্তু মানবসৃষ্ট দুর্যোগ অনেকটা মানুষের কর্মকাণ্ডের ফল এবং মানুষ সচেতন ও সতর্ক থাকলে তা থেকে রক্ষা পেতে পারে।
মানুষের অসচেতনতা বা দূরদৃষ্টির অভাবে যে দুর্যোগ সৃষ্টি হয় এবং যা মানুষের প্রাণহানি ঘটানোর পাশাপাশি তার স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে বিপর্যস্ত করে, পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করে এবং সমাজকে অস্থিতিশীল করে তোলে; তাকে মানবসৃষ্ট দুর্যোগ বলে। যেমন- যুদ্ধবিগ্রহ, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, বনভূমি বিনাশ, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি, মরুকরণ, অগ্নিকাণ্ড, দূষণ প্রভৃতি।
পাঁচটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলো- বন্যা; ঘূর্ণিঝড়, ভূমিকম্প, নদীভাঙন, সুনামি এবং মানবসৃষ্ট পাঁচটি দুর্যোগ হলো- যুদ্ধবিগ্রহ, বনভূমি বিনাশ, মরুকরণ, অগ্নিকান্ড ও দূষণ।
পৃথিবীতে যত রকম প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘটে তার মধ্যে ভূমিকম্পই সবচেয়ে অল্প সময়ে সবচেয়ে বেশি ধ্বংসযজ্ঞ ঘটায়। ভূমিকম্পের ব্যাপারে কোনো আগাম সতর্ক সংকেত দেওয়া সম্ভব নয়। ভূমিকম্পের সময় কিছু বুঝে উঠার আগেই একটি বা কয়েকটি ঝাঁকুনিতে পুরো এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। একই স্থানে সাধারণত পর পর কয়েকবার বড়, মাঝারি ও মৃদু ধরনের ভূমিকম্প হতে পারে।
বাংলাদেশ ভূমিকম্প ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। বিশেষ করে ঢাকা, সিলেট, রংপুর ও চট্টগ্রাম অঞ্চলে এই ঝুঁকি বেশি। চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চলে ইদানীং প্রায়ই মৃদু ভূমিকম্প হচ্ছে। তবে ভূমিকম্প প্রতিরোধের কোনো ব্যবস্থা এখনও মানুষের জানা নেই।
সুনামি একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগের নাম। এটি মূলত জাপানি শব্দ। যার অর্থ হলো 'সমুদ্র তীরের ঢেউ'। সমুদ্রের তলদেশে প্রচণ্ড ভূমিকম্প বা অগ্ন্যুৎপাতের ফলে, কিংবা অন্য কোনা কারণে, ভূআলোড়নের সৃষ্টি হলে বিস্তৃত এলাকা জুড়ে প্রবল ঢেউয়ের সৃষ্টি হয়। এই প্রবল ঢেউ উপকূলে এসে তীব্র বেগে আছড়ে পড়ে। এই 'সামুদ্রিক ঢেউয়ের গতিবেগ ঘন্টায় ৮০০ থেকে ১৩০০ কিলোমিটার পর্যন্ত হতে পারে।
সুনামির কারণে সমুদ্রের পানি জলোচ্ছ্বাসের আকারে ভয়ংকর গতিতে উপকূলের ১০ কিলোমিটারের মধ্যে ঢুকে পড়তে পারে। এর ফলে ষল্প সময়ের মধ্যেই উপকূলের ঘর-বাড়ি, দালান, রেলপথ, রাস্তাঘাট, বৈদ্যুতিক যোগাযোগব্যবস্থা প্রভৃতি ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। ২০১১ সালে জাপানের উত্তর-পূর্ব এলাকায় ভয়াবহ সুনামি সংঘটিত হয়। এর ফলে জাপানের পাঁচটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
পাহাড়ের মাটি ধসে পড়াকেই ভূমিধস বলা হয়। যেসব পাহাড় বেলে পাথর বা শেল কাদা নিয়ে গঠিত, ভারি বৃষ্টিপাত হলে সেসব পাহাড়ে ভূমিধস ঘটতে পারে। সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি ও ভারি বৃষ্টিপাতের কারণেই ভূমিধস ঘটে থাকে। তাছাড়া মানুষের ব্যাপকহারে গাছপালা ও পাহাড় কাটার কারণেও ভূমিধস ঘটে থাকে।
অগ্নিকাণ্ড যেমন প্রাকৃতিক কারণে ঘটে তেমনি মানুষের অসাবধানতার ফলে বা দুর্ঘটনাজনিত কারণেও ঘটতে পারে। প্রচন্ড দাবদাহের কারণে কোনো কোনো দেশে বনাঞ্চলে অগ্নিকাণ্ড ঘটতে দেখা যায়। একে দাবানল বলে। এর ফলেও বৃক্ষসম্পদ নষ্ট হয়, নষ্ট হয় জীববৈচিত্র্য।
দুর্ঘটনাজনিত অগ্নিকান্ড সাধারণত শিল্পকারখানা, তেলশোধনাগার, গার্মেন্টস শিল্প, পাটকল, রাসায়নিক গুদাম বা কারখানা, এমনকি বসতবাড়ি, দোকানপাট, অফিস ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে ঘটতে দেখা যায়। এছাড়াও আমাদের দেশে গ্রাম ও শহরাঞ্চলে জ্বলন্ত চুলা, কুপি, মশার কয়েল, সিগারেটের আগুন, হারিকেন, বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট প্রভৃতি থেকেও অসাবধানতাবশত অগ্নিকান্ডের সূত্রপাত ঘটে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ মূলত প্রাকৃতিক কারণে ঘটে থাকে। একটি দেশের ভৌগোলিক অবস্থান, জলবায়ুগত প্রভাব, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন তথা সামগ্রিক প্রাকৃতিক পরিবেশের কারণে এ দুর্যোগ ঘটে থাকে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ভৌগোলিক অবস্থান, জলবায়ু, ভূমির গঠন, নদী-নালা ইত্যাদিকে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণ হিসেবে বিবেচনা করা যায়।
বাংলাদেশের অধিকাংশ ভূভাগ প্লাবন সমভূমি দ্বারা গঠিত। এছাড়া ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে বাংলাদেশ, ভারত ও মিয়ানমার প্লেটের (পৃথিবীর অভ্যন্তরে বিদ্যমান বিশাল পাত) সীমানার কাছে অবস্থিত হওয়ায় এদেশ ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে অবস্থিত।
বাংলাদেশে প্রায় প্রতিবছরই কমবেশি প্রাকৃতিক দুর্যোগ হয়ে থাকে। এর মধ্যে বন্যা অন্যতম। ১৯৮৮, ১৯৯৮, ২০০২, ২০০৪ ও ২০০৯ সালের সংঘটিত বন্যা ছিল ভয়াবহ। এসব বন্যার কারণে ক্ষেতের ফসল, ঘরবাড়ি, গবাদি পশু, গাছপালা, মাছের খামার, শিল্প-কারখানা, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছিল।
প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে বায়ু ও পানি দূষিত হয়, যা জনজীবনের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে। বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, টর্নেডো প্রভৃতি দুর্যোগের ফলে আবর্জনা, জীবজন্তুর মরদেহ, মলমূত্র প্রভৃতি আমাদের আশপাশের পানি ও বায়ুকে দূষিত করে। ফলে বিভিন্ন ধরনের রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়।
আমাদের দেশে শহরকেন্দ্রিক বস্তি গড়ে ওঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ এই প্রাকৃতিক দুর্যোগ। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণ বাংলাদেশের উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর একটি বড়ো অংশ সহায়সম্বল হারিয়ে আর্থসামাজিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়। এসব বিপর্যয়ে হাজার হাজার মানুষ বসতবাড়ি, সহায়-সম্বল হারিয়ে নতুন কর্মসংস্থানের তাগিদে শহরকেন্দ্রিক বস্তি গড়ে তুলতে বাধ্য হয়।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘূর্ণিঝড় বা জলোচ্ছ্বাসের সময় প্রবল বাতাসে উপকূলীয় গাছপালার অনেক ক্ষতি হয়। আবার জলোচ্ছ্বাসের কারণে জমিতে লবণাক্ততা বেড়ে যায় ফলে অনেক মাছ মারা যায়। এই লবণাক্ত পানির কারণে জমির উর্বরাশক্তি কমে যায় এবং এসব জমিতে ফসল হয় না। তাছাড়া লবণাক্ত পানির কারণে মিঠাপানির মাছের প্রজাতি ধ্বংস হয়ে যায়।
দুর্যোগ মোকাবিলাকে তিনটি পর্যায়ে ভাগ করা হয়েছে। এগুলো হলো-
১. দুর্যোগপূর্ব করণীয়,
২. দুর্যোগকালীন করণীয় ও
৩. দুর্যোগপরবর্তী করণীয়।
ভৌগোলিক অবস্থান ও প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যের কারণে বাংলাদেশ একটি দুর্যোগপ্রবণ অঞ্চল। এদেশের মানুষ যুগ যুগ ধরে দুর্যোগের সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে আছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগকে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই রোধ করা যায় না, তবে উপর্যুক্ত পূর্বপ্রস্তুতি এবং কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করে এসব দুর্যোগে প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব।
বন্যা ও ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় দুর্যোগপূর্ব তিনটি করণীয়-
১. ঘরের ভিতরে উঁচু মাচা বা পাটাতন তৈরি করে তার ওপর খাদ্যশস্য, বীজ ইত্যাদি সংরক্ষণ করতে হবে, যাতে ঘরে পানি ঢুকলেও এগুলো নষ্ট না হয়।
২. পরিবারের প্রতিটি সদস্যকে সাঁতার শেখার ব্যাপারে উৎসাহী করতে হবে।
৩. বন্যা বা ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের মৌসুমের আগে বসতভিটা মেরামত, বিশেষ করে খুঁটি মজবুত করতে হবে।
দুর্যোগকালীন দুইটি করণীয়-
১. দুর্যোগে বিশুদ্ধ পানি বা নিরাপদ পানি পান করতে হবে। যে টিউবওয়েলের মুখ পানিতে ডোবেনি এমন টিউবওয়েলের পানি পানের জন্য নিরাপদ। প্রয়োজনে পানি ভালোভাবে ফুটিয়ে কিংবা পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট বা ফিটকারি ব্যবহার করে পান করতে হবে।
২. যেকোনো দুর্যোগের সময় ছোটো শিশুদের প্রতি বিশেষ খেয়াল রাখতে হবে। অসুস্থ, প্রতিবন্ধী, গর্ভবতী নারী ও বৃদ্ধদের প্রতি অধিক যত্নশীল হতে হবে।
দুর্যোগ পরবর্তী সময়ে দুইটি করণীয়-
১. বন্যার পানি নেমে গেলে বা ঝড় পুরাপুরি থেমে গেলে আশ্রয়কেন্দ্র ছেড়ে নিজ নিজ বাড়িতে ফিরে যেতে হবে।
২. ঘরবাড়ি পরিষ্কার ও মেরামত করে বাসযোগ্য করে তুলতে হবে, এজন্য প্রয়োজনে ব্লিচিং পাউডার ব্যবহার করতে হবে।
কোথাও নদীভাঙনের আশঙ্কা দেখা দিলে প্রথমেই জীবন ও সম্পদ রক্ষার প্রস্তুতি নিতে হবে। কোথায় আশ্রয় নেওয়া যায় তা আগে থেকেই ঠিক করতে হবে। তাছাড়া সময় থাকতে শিশু, বৃদ্ধ, গর্ভবতী নারী, প্রসূতি ও প্রতিবন্ধীদের 'নিরাপদ আশ্রয়ে বা আত্মীয়ের বাড়ি পাঠাতে হবে। বাড়ির হাঁস, মুরগি, গরু, ছাগল নিরাপদ স্থানে সরিয়ে রাখতে হবে। ঘরের মূল্যবান সামগ্রী ও দলিলপত্র আগে থেকে নিরাপদ স্থানে সরাতে হবে।
নদীভাঙনের আগেও আমরা কতকগুলো পদক্ষেপ নিতে পারি, যা আমাদেরকে নিরাপদ রাখবে। নদীর পাড়ে কোনো কিছু নির্মাণ করতে হলেও তা এমনভাবে করতে হবে যেন সেটা সহজেই সরিয়ে নেওয়া যায়। তাছাড়া নদীর পাড়ে এমন ধরনের গাছ লাগাতে হবে যেগুলোর শিকড় মাটির খুব গভীরে চলে যায়। নদীভাঙনের উপক্রম দেখলে আমাদের সবসময় নদীর অবস্থা পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
খরা মোকাবিলায় আমরা কয়েকটি পদক্ষেপ নিতে পারি, যেমন খরার আগে এসব অঞ্চলে পুকুর ও খাল খনন করতে হবে। তাছাড়া যেখানে যেখানে সম্ভব বৃষ্টির পানি ধরে রাখতে হবে। দুর্যোগকালের সময়ের জন্য শুকনো খাবার ও নগদ অর্থ মজুদ রাখতে হবে। একইভাবে গবাদি পশুর জন্যও খাবার মজুদ করে রাখা প্রয়োজন। যেসব ফসল চাষে খুব বেশি পানির দরকার হয় না খরাপ্রবণ এলাকায় সেসব ফসল চাষ করতে হবে।
খরা কেটে যাবার পর কৃষিকাজে রাসায়নিক সারের বদলে জৈব সার ব্যবহার করতে হবে। আগাছা ও জ্যাল পরিষ্কার করে জমিতে পানির অপচয় কমাতে হবে। এ সময়ে গভীর করে জমি চায়, করতে হবে। মাটির গভীরে শিকড় প্রবেশ করে এমন ফসল চাষ করতে হবে এবং বেশি করে গাছ লাগাতে হবে।
বাংলাদেশের যেসব অঞ্চল, বেশি ভূমিকম্প ঝুঁকির মধ্যে আছে, সেসব এলাকাগুলোকে বলা হয় ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা। যেমন- ফরিদপুর, রংপুর, বগুড়া, টাঙ্গাইল, ঢাকা, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার। তবে দেশের অন্য এলাকাগুলোতেও যে ভূমিকম্পের আশঙ্কা নেই তা নয়।
ভূমিকম্প মোকাবিলায় ভূমিকম্পপূর্ব প্রস্তুতি হলো- বাড়িতে প্রধান দরজা ছাড়াও জরুরি অবস্থায় বের হওয়ার জন্য একটি বিশেষ দরজা থাকা প্রয়োজন। এছাড়াও বাড়িতে প্রাথমিক চিকিৎসা সামগ্রী, হেলমেট, টর্চ প্রভৃতি মওজুদ রাখতে হবে। বাড়িতে ভূমিকম্পের সময় আশ্রয় নেওয়া যায় এমন একটি মজবুত টেবিল রাখতে হবে। ব্যবহারের পর বৈদ্যুতিক বাতি ও গ্যাস সংযোগ বন্ধ করে রাখতে হবে।
ভূমিকম্প হওয়ার পরে আহত লোকজনকে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। সাধ্যমতো উদ্ধার কর্মকাণ্ডে সহায়তা করতে হবে। এ ব্যাপারে ফায়ার ব্রিগেড অর্থাৎ অগ্নিনির্বাপক দল ও অ্যাম্বুলেন্সের সাহায্য নিতে হবে। দুর্গত মানুষের জন্য অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র, খাবার ও পানির ব্যবস্থা করতে হবে।
গ্রিন হাউস গ্যাস সূর্যের তাপ শুষে নিয়ে তা পৃথিবীপৃষ্ঠে ছড়িয়ে দিলে পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায়। একেই বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বলা হয়।
গ্রিন হাউস হলো কতকগুলো গ্যাসের সমন্বয়ে গঠিত একটি -আচ্ছাদন, যা পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধি করে থাকে।
মানুষের অসচেতনতা বা দূরদৃষ্টির অভাবে যে দুর্যোগ সৃষ্টি হয় এবং যা মানুষের প্রাণহানি ঘটানোর পাশাপাশি তার স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে বিপর্যস্ত করে, পরিবেশের ভারসাম্য বিনষ্ট করে এবং সমাজকে অস্থিতিশীল করে তোলে, তাকে মানবসৃষ্ট দুর্যোগ বলে।
প্রচন্ড দাবদাহের কারণে কোনো কোনো দেশের বনাঞ্চলে অগ্নিকাণ্ড ঘটতে দেখা যায়, যাকে দাবানল বলে।
সুনামি শব্দের অর্থ 'সমুদ্র তীরের ঢেউ'।
পাহাড়ের মাটি ধসে পড়াকে ভূমিধস বলে।
কোনো প্রাকৃতিক বা মানবসৃষ্ট অবস্থা যখন অস্বাভাবিক ও অসহনীয় পরিবেশ সৃষ্টির ফলশ্রুতিতে শস্য ও সম্পদের অনেক ক্ষয়ক্ষতি ও ব্যাপক প্রাণহানি ঘটে এবং পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয় তখন তাকে দুর্যোগ বলা হয়।
প্রাকৃতিক কোনো দুর্ঘটনা বা বিপর্যয় যখন কোনো জনপদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে বিপর্যস্ত করে তোলে তখন তাকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বলে।
সুনামি একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগের নাম।
বায়ুমন্ডলের একটি স্তর হলো ওজন স্তর।
এইচসি-এফসি এর পূর্ণরূপ হলো হাইড্রো ক্লোরো ফ্লোরো কার্বন।
সিএফসি এর পূর্ণরূপ হলো- ক্লোরো ফ্লোরো কার্বন।
ভূপৃষ্ঠের নিকটবর্তী বায়ুমণ্ডলীয় স্তরের নাম ট্রপোস্ফিয়ার।
পৃথিবীর ফুসফুস বলা হয় মহাসমুদ্রকে।
গ্রিনহাউস গ্যাসকে গৌণ গ্যাস বলে।
সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ট্রপোস্ফিয়ারের গড় উচ্চতা ১২ কিলোমিটার।
ভূপৃষ্ঠ থেকে বায়ুমণ্ডলের নিকটবর্তী স্তর হলো ট্রপোস্ফিয়ার।
সুনায়ি শব্দটি জাপানি ভাষার শব্দ।
ওজোন স্তর ২০ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত।
দুর্যোগ দুই প্রকার। যথা- ১. প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও ২. মানবসৃষ্ট দুর্যোগ।
সিএফসি এক ধরনের গ্যাস। সিএফসির পূর্ণরূপ হলো ক্লোরো ফ্লোরো কার্বন।
পরিবেশ দূষণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ বন উজাড়করণ।
বায়ুর মূল উপাদান হলো নাইট্রোজেন ও অক্সিজেন।
ভূমিকম্প হচ্ছে ভূমির কম্পন। ভূঅভ্যন্তরে যখন একটি শিলা অন্য একটি শিলার উপর ওঠে আসে তখন ভূমি কম্পনের ফলে ভূমিকম্প হয়ে থাকে।
গ্রিন হাউস গ্যাসের অপর নাম তাপ বৃদ্ধিকারক গ্যাস।
ট্রাপোস্ফিয়ার স্তরটির গড় উচ্চতা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১২ কি. মি.।
ওজোন স্তর ক্ষয়ের কারণে ভূপৃষ্ঠে অতিবেগুনি রশ্মির প্রভাব শতকরা পাঁচ ভাগ বৃদ্ধি পেয়েছে।
সুনামিতে সামুদ্রিক ঢেউয়ের গতিবেগ ঘণ্টায় ৮০০ থেকে ১৩০০ কিলোমিটার পর্যন্ত হতে পারে।
২০১১ সালে জাপানের উত্তর-পূর্ব এলাকায় ভয়াবহ সুনামি সংঘটিত হয়।
পৃথিবীপৃষ্ঠ দ্বারা গৃহীত সূর্যের তাপ স্বাভাবিকভাবে রাতের বেলায় প্রতিফলিত হয়ে মহাশূন্যে মিলিয়ে যায় এবং এভাবেই পৃথিবী ঠাণ্ডা হয়। কিন্তু বায়ুমণ্ডলে নির্দিষ্ট কিছু গ্যাসের পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রতিফলিত তাপ সম্পূর্ণভাবে মহাশূন্যে মিলিয়ে না গিয়ে বায়ুমন্ডলকে উত্তপ্ত করে। এভাবে পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়ছে। যাকে বলা হয় বৈশ্বিক উষ্ণায়ন। এককথায় বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বলতে গ্রিন হাউস গ্যাসের প্রভাবে পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়াকে বোঝায়।
বায়ুমণ্ডলের বিভিন্ন ক্ষতিকর গ্যাস বৃদ্ধিই মূলত বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রধান কারণ। বায়ুমণ্ডলে নাইট্রোজেন ও অক্সিজেন ছাড়াও সামান্য পরিমাণে কার্বন ডাইঅক্সাইড, মিথেন ও নাইট্রাস অক্সাইড আছে। এই গৌণ গ্যাসগুলোকে বলা হয় গ্রিন হাউস গ্যাস। মানুষ সৃষ্ট বিভিন্ন গ্যাসের সাথে সাথে প্রকৃতিগত এই সকল গ্যাসের ক্রমাগত বৃদ্ধি ঘটছে।
ব্যাপক হারে বৃক্ষ নিধন করাই হলো বন উজাড়করণ। পরিবেশ দূষণের পিছনে যে কারণটি সবচেয়ে বেশি দায়ী তা হলো বন উজাড়করণ। আমরা জানি, সবুজ উদ্ভিদ বাতাস থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্রহণ করে এবং আমাদের জন্য অক্সিজেন ত্যাগ করে। কিন্তু ব্যাপকহারে বন উজাড়করণের ফলে বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ বেড়ে গেছে।
মহাসমুদ্র হলো পৃথিবীর ফুসফুস। বিশ্বের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে মহাসমুদ্রের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। সাগর ও উপসাগরের সাথে সম্পৃক্ত নদী, খাল-বিল, হাওর, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে। সাগর, উপসাগর, নদনদীগুলো অতিরিক্ত উষ্ণায়নকে শোষণ করে তাপমাত্রাকে সহনীয় পর্যায়ে রাখে। এককথায় বৈশ্বিক উষ্ণায়ন রোধে মহাসমুদ্রের ভূমিকা অপরিসীম।
মানুষের অপকর্ম বা দূরদৃষ্টির অভাবে যে দুর্যোগ সৃষ্টি হয়. এবং যা মানুষের প্রাণহানি ঘটানোর পাশাপাশি তার স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে বিপর্যস্ত করে, পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করে এবং সমাজকে অস্থিতিশীল করে তোলে তাকে মানব সৃষ্ট দুর্যোগ বলে। যেমন- যুদ্ধবিগ্রহ, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, বনভূমি বিনাশ, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা জলাবদ্ধতা সৃষ্টি ও মরুকরণ অগ্নিকাণ্ড ইত্যাদি মানবসৃষ্ট দুর্যোগ অনেকটা মানুষের কর্মকান্ডের ফল এবং মানুষ সচেতন ও সতর্ক থাকলে তা থেকে আত্মরক্ষা করতে পারে।
সাধারণত বেলে পাথর, শেল, কাদা দিয়ে গঠিত পাহাড়ে দীর্ঘমেয়াদি ও ভারী বর্ষণের কারণে ভূমিধস ঘটে থাকে। তাছাড়া পাহাড়ের পাদদেশের মাটি কাটলে কিংবা পাহাড়ের ওপর গর্ত করলে ভূমিধসের ঘটনা ঘটতে পারে। পাহাড়ের গাছপালা কেটে ফেলালেও ভূমিধস হতে পারে।
ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশ ভূমিকম্প ঝুঁকি অঞ্চলের মধ্যে রয়েছে। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল ও উত্তর-পূর্বাঞ্চল যেমন- ঢাকা, সিলেট, রংপুর ও চট্টগ্রাম অঞ্চল সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে আছে। চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চলে ইদানীং প্রায়ই মৃদু ভূমিকম্প হচ্ছে। ২০১১ সালের ১৮ই সেপ্টেম্বর সংঘটিত ভূমিকম্প ছিল বেশ ভয়াবহ। এতে সারা বাংলাদেশ কেঁপে ওঠে। এছাড়া ভারত ও মিয়ানমারের সীমানা প্লেটে অবস্থিত হওয়ায় বাংলাদেশে ভূমিকম্পের ঝুঁকি বেশি।
পরিবেশ দূষণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ বন উজাড়করণ। ব্যাপকহারে বন উজাড়করণের ফলে বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাইঅক্সাইডের পরিমাণ বেড়ে গেছে। ফলে বায়ুমণ্ডলে ওজোন স্তর ক্ষয়কারী সিএফসি গ্যাস অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে অতিবেগুনি রশ্মি প্রবেশ করে পরিবেশকে করে ভারসাম্যহীন। তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়ে জনজীবন হয় বিপর্যস্ত।
৩ ও ৪নং সতর্ক সংকেত পর্যন্ত আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে ৫নং বিপদ সংকেত শোনার পর শিশু, বৃদ্ধ, প্রতিবন্ধী ও! মেয়েদের আশ্রয়কেন্দ্রে পাঠিয়ে দিতে হবে এবং মহাবিপদ সংকেত শোনার পর সবাইকে অবশ্যই আশ্রয়কেন্দ্রে গিয়ে আশ্রয় নিতে হবে।
বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে দুর্যোগপ্রবণ এলাকাগুলোর একটি। আমরা জানি যে, ভূ-পৃষ্ঠের তাপমাত্রা বৃদ্ধি বা উষ্ণায়নের কারণে সারা পৃথিবীতেই আজ জলবায়ুর পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। জলবায়ুর এই পরিবর্তনের ফলে উষ্ণমণ্ডলীয় দেশে শুষ্ক মৌসুমে ফসলের উৎপাদন হ্রাস পায়। এছাড়া বর্ষাকালে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত, বন্যা ও জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। শুষ্ক মৌসুমে অনাবৃষ্টি ও অত্যধিক খরা, শিলাবৃষ্টি, ভূমিক্ষয়, টর্নেডো, সাইক্লোন ও জলোচ্ছ্বাসের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘটে এবং উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পায়। শীত মৌসুমে হঠাৎ শৈত্য ও উষ্ণ প্রবাহ এবং ঘন কুয়াশা লক্ষ করা যায়। এ ছাড়া এ দেশে সংগঠিত প্রাকৃতিক দুর্যোগসমূহের মধ্যে ভূমিকম্প অন্যতম। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান এবং বৈশ্বিক উষ্ণায়ন এ দুর্যোগ সংঘটনের কারণ । বাংলাদেশের জীবন ও অর্থনীতির উপর এইসব দুর্যোগের প্রভাব লক্ষ করা যায়।
এ অধ্যায় পাঠ শেষে আমরা-
• বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ধারণা ব্যাখ্যা করতে পারব ;
• বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণ ও প্রভাব বিশ্লেষণ করতে পারব;
• দুর্যোগের ধারণা ব্যাখ্যা করতে পারব;
• দুর্যোগের ধরন উল্লেখ করতে পারব;
• বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ যথা- ভূমিকম্প, সুনামি, ভূমিধস ও অগ্নিকাণ্ড ইত্যাদি সম্পর্কে বর্ণনা করতে পারব;
• বাংলাদেশের প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণ বর্ণনা করতে পারব ;
• বাংলাদেশের জীবন ও অর্থনীতির উপর এসব দুর্যোগের প্রভাব বিশ্লেষণ করতে পারব;
• প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রতিরোধ, দুর্যোগে করণীয়, জীবন ও জীবিকা রক্ষায় উপযোগী পদক্ষেপের পরামর্শসহ পরিকল্পনা তৈরি করতে পারব ;
• পরিবেশ বিষয়ে সচেতন হব।
Related Question
View Allকোনো জায়গার গড় জলবায়ুর দীর্ঘমেয়াদি ও অর্থপূর্ণ পরিবর্তন যার ব্যাপ্তিকাল কয়েক যুগ থেকে কয়েক লক্ষ বছর পর্যন্ত হতে পারে, তাকে জলবায়ুর পরিবর্তন বলে। ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বৃদ্ধি বা উষ্ণায়নের কারণে সারা পৃথিবীতেই জলবায়ুর পরিবর্তন লক্ষ করা যায়।
জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে উষ্ণমণ্ডলীয় দেশে শুষ্ক মৌসুমে ফসলের উৎপাদন হ্রাস পায়। এছাড়া বর্ষাকালে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত, বন্যা ও জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। শুষ্ক মৌসুমে অনাবৃষ্টি ও অত্যধিক খরা, শিলাবৃষ্টি, সাইক্লোন ও জলোচ্ছ্বাসের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘটে। এছাড়া শীত মৌসুমে হঠাৎ শৈত্য ও উষ্ণ প্রবাহ এবং ঘন কুয়াশা লক্ষ করা যায়।
বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান এবং বৈশ্বিক উষ্ণায়ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ সংঘটনের কারণ। বাংলাদেশের জীবন ও অর্থনীতির ওপর এসব দুর্যোগের প্রভাব লক্ষ করা যায়। এক্ষেত্রে বাংলাদেশে কয়েকটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলো- বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, টর্নেডো, ভূমিকম্প, খরা, নদীভাঙন প্রভৃতি।
বিজ্ঞানের বিস্ময়কর অগ্রগতির মাধ্যমে পৃথিবীর মানুষ একদিকে যেমন তার জীবনকে করেছে সুখ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় অন্যদিকে তেমনি পৃথিবীর প্রাকৃতিক পরিবেশকে করেছে ক্ষতিগ্রস্ত ও ভারসাম্যহীন। জনসংখ্যার বিস্ফোরণ, বৃক্ষনিধন ও ইঞ্জিনচালিত যানবাহনসহ বড়ো বড়ো শিল্প-কারখানার কারণে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে সৃষ্টি হয় নানা সমস্যার। এসবের ফলে পৃথিবীতে তাপমাত্রা বাড়ছে। একেই বলা হয় বৈশ্বিক উষ্ণায়ন।
বৈশ্বিক সমস্যাগুলোর একটি হলো 'গ্রিনহাউস প্রতিক্রিয়া'। এটি একটি জটিল সমস্যা। গ্রিনহাউস মূলত কতকগুলো গ্যাসের সমন্বয়ে গঠিত একটি আচ্ছাদন। গ্রিনহাউস গ্যাসকে তাপ বৃদ্ধিকারক গ্যাসও বলে। এই গ্যাস পৃথিবীর চারপাশে বায়ুমন্ডলে চাদরের মতো আচ্ছাদন তৈরি করে আছে।
গ্রিনহাউস গ্যাস পৃথিবীকে ঘিরে চাদরের মতো একটি আচ্ছাদন তৈরি করেছে। সূর্যের তাপ এই চাদর শোষণ করে এবং তা পৃথিবীপৃষ্ঠে ছড়িয়ে দেয়। পৃথিবীপৃষ্ঠ দ্বারা গৃহীত এ তাপমাত্রা স্বাভাবিকভাবে রাতের বেলা প্রতিফলিত হয়ে, মহাশূন্যে মিলিয়ে যায় এবং এভাবেই পৃথিবী ঠান্ডা হয়। কিন্তু বায়ুমণ্ডলে নির্দিষ্ট কিছু গ্যাসের পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রতিফলিত তাপ সম্পূর্ণভাবে মহাশূন্যে মিলিয়ে 'না যেয়ে বায়ুমণ্ডলকে উত্তপ্ত করে।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!