শেরশাহ সম্রাট বাবরের সেনাবাহিনীর সেনা নায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে ১৫৩৯ সালে চৌসারের যুদ্ধে দূর্বল হুমায়ুনকে পরাজিত করে শেরখান শেরশাহ উপাধি ধারন করেন। তিনি নিজেকে বিহারের স্বাধীন সুলতান হিসেবে ঘোষণা করেন। ১৫৪০ সালে তিনি বাংলা দখল করেন এবং হুমায়ুনকে পরাজিত করে দিল্লি। অধিকার করে উপমহাদেশে আফগান সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন।
ভারতের ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এবং দূরদর্শী শাসক ছিলেন শেরশাহ সূরী। মুঘলদের ১৫ বছরের জন্য ভারত ছাড়া করে তিনি যে প্রশাসনিক কাঠামো তৈরি করেছিলেন, তা পরবর্তীকালে মুঘল সম্রাট আকবর এবং ব্রিটিশ সরকারও অনুসরণ করেছিল। তাঁর সম্পর্কে বিস্তারিত নিচে দেওয়া হলো:
শেরশাহ সূরী ও শূর রাজবংশ (১৫৪০–১৫৫৫ খ্রি.) শেরশাহ সূরী ছিলেন ভারতের দ্বিতীয় আফগান সাম্রাজ্যের (সূর বংশ) প্রতিষ্ঠাতা। তাঁর প্রকৃত নাম ছিল ফরিদ খাঁ। একটি বাঘকে একা হত্যা করার পর বিহারের সুবাদার তাঁকে 'শের খাঁ' উপাধি দেন। ১৫৩৯ সালে চৌসার যুদ্ধে এবং ১৫৪০ সালে কনৌজের যুদ্ধে মুঘল সম্রাট হুমায়ুনকে পরাজিত করে তিনি দিল্লির সিংহাসন দখল করেন। যদিও তিনি মাত্র পাঁচ বছর (১৫৪০-১৫৪৫) শাসন করার সুযোগ পেয়েছিলেন, কিন্তু এই অল্প সময়েই তিনি এমন সব বৈপ্লবিক সংস্কার করেন যা তাকে ইতিহাসের অমর এক শাসকে পরিণত করে।
শেরশাহের উল্লেখযোগ্য সংস্কারসমূহ:
১. যোগাযোগ ব্যবস্থা: তিনি পূর্ববঙ্গের সোনারগাঁও থেকে ভারতের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তের সিন্ধু নদ পর্যন্ত প্রায় ৪,৮০০ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি রাস্তা নির্মাণ করেন, যা বর্তমানে 'গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড' (G.T. Road) নামে পরিচিত। রাস্তার ধারে যাত্রীদের বিশ্রামের জন্য তিনি অসংখ্য 'সরাইখানা' নির্মাণ করেন।
২. ডাক ও মুদ্রাব্যবস্থা:
তিনি ঘোড়ার পিঠে ডাক আদান-প্রদান বা 'ঘোড়ার ডাক' প্রথা প্রবর্তন করেন।
তিনি বর্তমানে আমাদের প্রচলিত মুদ্রার নাম 'রুপিয়া' (Rupia) বা টাকার প্রবর্তন করেন। তাঁর প্রবর্তিত রৌপ্য মুদ্রার নাম ছিল 'রূপী' এবং তাম্র মুদ্রার নাম ছিল 'দাম'।
৩. রাজস্ব ও ভূমি সংস্কার: তিনি কৃষকদের ওপর জবরদস্তি না করে জমির উর্বরতা অনুযায়ী খাজনা নির্ধারণ করেন। ভূমি মালিকানার দলিল হিসেবে তিনি 'পাট্টা' এবং কৃষকদের পক্ষ থেকে অঙ্গীকারপত্র হিসেবে 'কবুলিয়ত' প্রথা চালু করেন।
৪. পুলিশ ও বিচার ব্যবস্থা: তিনি অপরাধ দমনের জন্য 'স্থানীয় দায়িত্ব' নীতি চালু করেন। কোনো এলাকায় চুরি বা ডাকাতি হলে ওই এলাকার গ্রামপ্রধানকে অপরাধী ধরার দায়িত্ব নিতে হতো, অন্যথায় তাকেই ক্ষতিপূরণ দিতে হতো।
আরও কিছু তথ্য জেনে নেইঃ
- সম্রাট শেরশাহ গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড (সড়ক-ই-আজম) নির্মাণ করেন।
- গ্রান্ড ট্রাঙ্ক রোডটি সোনারগাঁও থেকে সিন্ধু নদ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।
- তিনি ভারতবর্ষে 'ঘোড়ার ডাক' প্রচলন করেন।
- ভারতবর্ষে 'দাম' নামে তাম্র মুদ্রার প্রচলন করেন।
- তিনি রুপিয়া নামে একধরনের মুদ্রারও প্রচলন করেছিলেন।
- আফগান দুর্গ নির্মাণ করেন (ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার)।