এন্ট্রান্স পাশ করে মাত্র বাইশ বছর বয়সে জুলু চৌধুরীর আর্থিক সহায়তায় গ্রামে প্রথমবার স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন শনু পণ্ডিত।
সেটা প্রায় পঁচিশ বছর আগের কথা। কাছাকাছি দু-চার গ্রামে তখন স্কুল ছিল না। লেখাপড়ার সাথে গ্রামের লোকের যোগসূত্র ছিল না। সবেমাত্র এনট্রান্স পাশ করেছেন শনু পণ্ডিত। তখন তার বয়স বাইশ বছর। জুলু চৌধুরী তখন যুবক। গ্রামে থেকে জমিদারির তদারকি করতেন তিনি। একদিন তাস-দাবা খেলার আসরে স্কুল প্রতিষ্ঠার ইচ্ছে ব্যক্ত করেন শনু পণ্ডিত। জুলু চৌধুরী বেশ আগ্রহ দেখালেন প্রস্তাবটিতে এবং কাজ শুরু করার নির্দেশও দিলেন।
টাকা-পয়সা বিশেষ কিছু না দিলেও স্কুলের জন্য জমির বরাদ্দ দিয়েছিলেন তিনি। শহর থেকে ছুতোর মিস্ত্রি নিয়ে এসে গোটাকতক ছোট ছোট টুল ও টেবিলও দিয়েছিলেন। আর শনু পণ্ডিত স্কুলের জন্য তার একমাত্র সম্বল দুটুকরো ধানি জমি বিক্রি করে দেন। সেই অর্থে স্কুলের টিন, বেড়ার বাঁশ ও কাঠ কিনেছিলেন তিনি। ব্যয়ের পরিমাণ শনু পণ্ডিত বেশি করলেও স্কুলের নামকরণ করা হয় জুলু চৌধুরীর নামে আট হাত কাঠের মাথায় পেরেক গাঁথা ফলকের ওপর জুলু চৌধুরীর নাম জ্বলজ্বল করছে। সেই সময় থেকে পঁচিশ বছর যাবৎ গ্রামের সাধারণ লোকের ছেলেমেয়েদের জন্য শানু পণ্ডিত অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন। পঁচিশ বছরে টিনের চাল মরিচায় ক্ষয়ে গেছে। আকস্মিক ঝড়ে নড়বড়ে স্কুলঘরটি মুখ থুবড়ে ভেঙে পড়ে গেছে। শনু মাস্টারের স্বপ্ন ধূলায় লুটিয়ে পড়েছে। সরকারি অর্থ সহায়তার জন্য শহরে ছুটে গিয়ে অপমানিত হয়ে ফিরে আসতে হয়েছে তাকে। এমনকি এ বিষয়ে জুলু চৌধুরীও অর্থ-সহায়তা করেননি।
এভাবেই নিজের সর্বস্ব বিসর্জন দিয়ে পঁচিশ বছর আগে শনু পণ্ডিত গ্রামের একমাত্র স্কুলটি নির্মাণ করেছিলেন অশিক্ষিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য। নিজের জমি বিক্রি করে, জুলু চৌধুরীর কাছ থেকে সহায়তা নিয়ে তিনি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন যা আজ ঝড়ে ভেঙে পড়েছে। স্কুলের জন্য, গ্রামের মানুষকে শিক্ষিত করার জন্য শনু পণ্ডিত ব্যক্তি সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়েছেন। নিজে বিয়েও করেননি।
Related Question
View All"আশার মুখে ছাই!" উক্তিটিতে শনু পণ্ডিতের অর্থ সাহায্য না পাওয়ার হতাশাজনক মনোভাব প্রকাশ পেয়েছে।
গ্রামের স্কুলটির প্রতিষ্ঠাতা শনু পণ্ডিত। আচমকা ঝড়ে মুখ থুবড়ে ভেঙে পড়ে যায় শনু পণ্ডিতের স্বপ্নের স্কুলটি। স্কুলের টিনগুলো মরিচা ধরে ক্ষয়ে গেছে। নতুন করে বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করতে শনু পণ্ডিত শহরে সরকারি সহযোগিতার জন্য গিয়েছিলেন অনেক বড়ো আশা নিয়ে। কিন্তু শিক্ষা অফিসার তাকে কোনো অর্থ সহায়তা করেননি। এবং এক প্রকার অপমান করে তাকে তাড়িয়ে দিয়েছেন। এরপর তিনি জুলু চৌধুরীর কাছে সাহায্যের জন্য যান, তিনি প্রথমবার স্কুল তোলার সময় শনু পণ্ডিতকে অর্থ সহায়তা দিয়েছিলেন। কিন্তু তিনিও সাহায্য করতে অস্বীকৃতি জানান। কারও কাছ থেকে অর্থ সহায়তা না পেয়ে মনোবল ভেঙে পড়ে শনু পণ্ডিতের। ব্যর্থতার বেদনা নিয়ে তিনি হতাশাজনক উক্তিটি করেন।
ভাঙা স্কুল সারানোর ব্যাপারে শিক্ষা বিভাগের কর্মকর্তার আচরণ ছিল অমানবিক।
পঁচিশ বছর আগে নিজ উদ্যোগে ও জুলু চৌধুরীর সহায়তায় গ্রামের একমাত্র স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন শনু পণ্ডিত। বাইশ বছর বয়সি এনট্রান্স পাশ শনু পণ্ডিত এলাকার সাধারণ মানুষকে শিক্ষিত করার জন্য এই মহৎ কাজে হাত দিয়েছিলেন। কিন্তু আর্থিক সাহায্যের অভাবে মেরামত না করায় পঁচিশ বছর পর সেই স্কুলঘরটি আকস্মিক ঝড়ে ভেঙে পড়ে। শনু পণ্ডিত তখন ছুটে যান শহরের শিক্ষা বিভাগের বড় অফিসারের কাছে। কিন্তু তারা সহায়তার পরিবর্তে তাকে ধমক দেন। তারা রাজধানীতে হোটেল তোলা, আর সাহেবদের ছেলেদের জন্য ইংরেজি স্কুল তোলায় মোটা অল্প ব্যয়ের অজুহাত দেখান। শিক্ষা সহায়তা ফান্ডে কোনো অর্থ নেই বলেও জানান তারা। বারবার তাদের কাছে সাহায্য চাইতে যাওয়ায় তারা বিরক্ত। নিজের টাকা খরচ করে স্কুল চালানোর পরামর্শও দেন তারা। এমনকি টাকা না থাকলে স্কুল বন্ধ করে ঘরে বসে থাকার কথাও শোনান। তাদের ব্যবহার থেকে মনে হয়েছে, স্কুল মেরামতের জন্য অর্থ চাইতে যাওয়াটা শনু পণ্ডিতের বড় অন্যায় হয়েছে।
'নয়া পত্তন' গল্পের শনু পণ্ডিত চরিত্রটি উদারনৈতিক মানবকল্যাণকামী ইতিবাচক চরিত্র।
শনু পণ্ডিত গ্রামের একজন সাধারণ শিক্ষিত মানুষ। মাত্র বাইশ বছর বয়সে এনট্রান্স পাশ করে গ্রামের মানুষকে শিক্ষিত মানুষে পরিণত করার আকাঙ্ক্ষা পেয়ে বসে তার। জুলু চৌধুরীর মতো জমিদার ব্যক্তির সাথে পরামর্শ করে তিনি তার স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেন। জুলু চৌধুরীর দেওয়া অনাবাদি এক খণ্ড জমি আর ছোট টুল-টেবিলের সাথে নিজের সর্বস্ব দুখণ্ড ধানি জমি বিক্রির টাকায় কেনা টিন কাঠ বাঁশ দিয়ে তৈরি হয় স্কুল। আশপাশের দু-চার গ্রামে তখন স্কুল ছিল না। শনু পণ্ডিত নিজের সবটুকু দিয়ে স্কুল প্রতিষ্ঠা করে গ্রামের লোকেদের মাঝে শিক্ষার আলো বিলিয়ে দিলেন।
শনু পণ্ডিত ব্যক্তিগত সুখ-সাচ্ছন্দ্য সবকিছু বিসর্জন করে দিয়েছেন মানবকল্যাণে। সহায়-সম্পদ বিক্রি করার পর ত্যাগ করেছেন পরিবারের মায়া। অবিবাহিত কাটিয়ে দিয়েছে জীবনের সাতচল্লিশটি বছর।
কিন্তু পঁচিশ বছর পর আকস্মিক ঝড়ে মুখ থুবড়ে ভেঙে পড়ে তার স্বপ্নের মূলঘরটি। কিন্তু এই স্বপ্নবাজ মানুষটি থেমে থাকার পাত্র নন। শহরে গিয়ে সরকারের শিক্ষা বিভাগের কাছে অর্থ সহায়তা চেয়েছেন। তারা তাকে অর্থ সহায়তা না দিয়ে অপমান করে ফিরিয়ে দেন। এরপর তিনি প্রথমবার স্কুল প্রতিষ্ঠায় সহায়তাকারী জুলু চৌধুরীর কাছে অর্থ সাহায্য চেয়েও ব্যর্থ হন। শেষমেশ গ্রামের সাধারণ মানুষের সাহায্যে ছনের চালে গড়ে তোলেন নতুন স্কুল। নামও হয় এই অদম্য লোকটির নামে।
'নয়া পত্তন' গল্পের শনু পণ্ডিত অদম্য মানসিকতার অধিকারী। সকল ব্যর্থতার অপমানকে তিনি বুড়ো আঙুল দেখিয়েছেন। সাধারণ মানুষের দুয়ারে শিক্ষার আলো পৌছে দেওয়ার মহান সংকল্প তাকে উচ্চ মানবিক চরিত্র দান করেছে। সমাজে শনু পণ্ডিতের মতো অদম্য ইচ্ছাশক্তির মহৎ মানুষ দরকার।
"যাও ইস্কুল আমরাই দিমু" - বুড়ো হাশমত নিজেদের পরবর্তী প্রজন্মের শিক্ষিত হওয়ার কথা ভেবে কথাটি বলেছে।
শনু পণ্ডিত সাহায্য না পেয়ে গ্রামে ফিরে এলে প্রথমে অনেকেই স্কুল তুলে ফেলার কথা ভেবেছিল। তকু শেখ ও শনু পন্ডিতের কথায় সবার বোধ জাগে। কেননা বর্তমান যুগ শিক্ষা, জ্ঞান ও প্রযুক্তির যুগ। এ যুগে শিক্ষিত না হওয়া মানে পিছিয়ে থাকা। বুড়ো হাশমত সেই কথা বুঝতে পারে। ছেলে দুটো ও বাচ্চা নাতিটাকে অনেক আশা নিয়ে সে স্কুলে পাঠিয়েছিল। তার আশা ছিল আর কিছু না হোক, লেখাপড়া শিখে অন্তত কাচারির পিওন হতে পারবে ওরা। সেই আশা ধুলোয় মিশিয়ে দিতে দেওয়া যায় না। গভীরভাবে সেই কথা ভাবছিল বুড়ো হাশমত। তার মনের কোণে যেন ব্যর্থতায় পর্যবসিত হচ্ছে ছেলের সেই স্বপ্ন। তাই বৃদ্ধ হাশমত শনু পণ্ডিতের দলে যোগ দেয়। সকলে মিলে গায়ে খেটে তারা স্কুল প্রতিষ্ঠায় দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়। আলোচ্য উক্তিটিতে হাশমতের সেই মনোভাব প্রকাশ পেয়েছে।
জুলু চৌধুরী যৌবনকালে জনকল্যাণমূলক কাজ করলেও বর্তমানে তিনি ব্যাবসায়িক স্বার্থ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়া জমিদার শ্রেণির প্রতিনিধি।
জুলু চৌধুরী গাঁয়ের জমিদার। তার জমিতে গাঁয়ের অনেক বর্গাচাষি কাজ করে। তাদের সাথে জুলু চৌধুরীর হিসাব-নিকাশ পাকা। জমিদার হওয়ায় গ্রামের সবাইকে উপোস থাকতে হলেও জুলু চৌধুরীর পরিবার সেই তাড়না থেকে মুক্ত। এক কালে তিনি গ্রামেই থাকতেন। এখন শহরে বসবাস করছেন। সেখানে কলকারখানা তৈরি করে আর্থিক উন্নতির চেষ্টা করছেন তিনি।
সমাজের জনকল্যাণমূলক কাজে জুলু চৌধুরী আগে সাহায্য সহযোগিতা করতেন। পঁচিশ বছর আগে যখন শনু পণ্ডিত তার কাছে স্কুল তৈরির ইচ্ছা প্রকাশ করেন তখন তিনি এই মহান উদ্যোগে সাড়া দেন। অর্থ না দিলেও স্কুলঘরের জন্য অনাবাদি একখণ্ড জমি দিয়েছিলেন। শহর থেকে ছুতার মিস্ত্রি ডেকে গুটি কতক ছোট ছোট ট্রল-টেবিলও গড়িয়ে দেন। স্কুল করার জন্য শনু পণ্ডিত সবকিছু বিলিয়ে দিলেও নামফলকে নাম ওঠে জুলু চৌধুরীর স্কুল।
পঁচিশ বছর পর আকস্মিক ঝড়ে স্কুলটি ভেঙে পড়ে। শনু পণ্ডিত সরকারের কাছ থেকে টাকা না পেয়ে চৌধুরীর কাছে আর্থিক সহায়তার জন্য আসেন। বড় আশা করেই এসেছিলেন। কিন্তু জুলু চৌধুরী এক বাক্যে না করে দিয়েছেন। তিনি শহরে কারখানা প্রতিষ্ঠা করতে ব্যস্ত। গ্রামের মানুষ শিক্ষিত হোক তা আর তিনি এখন চান না।
সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে, জুলু চৌধুরী প্রথমবার গ্রামে স্কুল প্রতিষ্ঠায় সাড়া দিলেও বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে তার সেই জনকল্যাণ সাধনের ইচ্ছা নষ্ট হয়ে গেছে। এখন তিনি ব্যাবসা প্রতিষ্ঠান তৈরি করে নিজের সম্পদ বৃদ্ধিতে ব্যস্ত। তিনি চান না গ্রামের লোক শিক্ষিত হোক। জুলু চৌধুরী চরিত্রটি ইতিবাচক দিক থেকে নেতিবাচকতার দিকে ধাবিত হয়েছে।
নতুন স্কুল প্রতিষ্ঠায় গ্রামবাসী নিজ উদ্যোগে সামর্থ্য অনুযায়ী সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়।
স্কুল মেরামতে সরকারি সাহায্য না পাওয়া এবং জুলু চৌধুরীর অসহযোগিতামূলক আচরণ দেখে গ্রামবাসীরা মিলিতভাবে স্কুল সংস্কারে হাত দেয়। টাকা না থাকায় তাদের পক্ষে টিনের চালা দেওয়া সম্ভব হয় না। ফলে তারা টিনের বিকল্প হিসেবে ছন দিয়ে স্কুলঘর নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয়। স্কুলের চালা তৈরি করতে ত্রিশ আঁটি ছন দরকার পড়ে। তকু শেখ তিন আঁটি, কদম আলি দুই আঁটি দেওয়ার প্রস্তাব করে। তোরাব ছনের পরিবর্তে বাঁশ দিয়ে সাহায্য করার কথা বলে। সে সাত কুড়ি বাঁশ দান করে স্কুলঘরে। এছাড়াও অনেকে বেত ও অন্যান্য জিনিসপত্র দিয়ে সাহায্য করে। যাদের কিছু দেওয়ার মতো ছিল না তারা গায়ে খেটে স্কুল নির্মাণে সাহায্য করে। পরিত্যক্ত গাছের কাঠ খুঁটি হিসেবে ব্যবহার করার পরামর্শ দেয় অনেকে। এভাবে সকলের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সাহায্য ও সহযোগিতার মধ্য দিয়ে নতুন স্কুলঘরটি প্রতিষ্ঠিত হয়।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!