উত্তরঃ
ভূ-পৃষ্ঠের অভ্যন্তরে যখন উত্তপ্ত গলিত পদার্থ, গ্যাস, ও বাষ্প প্রচণ্ড বেগে ভূ-পৃষ্ঠের দুর্বল ফাটল বা ছিদ্রপথ দিয়ে বেরিয়ে আসে, তখন তাকে অগ্ন্যুৎপাত বলে। এটি একটি বিধ্বংসী প্রাকৃতিক দুর্যোগ যা পৃথিবীর ভূ-প্রকৃতিতে ব্যাপক পরিবর্তন আনে এবং নতুন ভূমিরূপ গঠনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
উদ্দীপকে উল্লিখিত 'ঘটনা-২' হলো "মোচাকৃতি পর্বতের জ্বালামুখ দিয়ে লাভা নির্গত হয়", যা সরাসরি অগ্ন্যুৎপাতকেই নির্দেশ করে। এই অগ্ন্যুৎপাতের ফলে নির্গত লাভা, ছাই, শিলাখণ্ড, গ্যাস ইত্যাদি ভূ-পৃষ্ঠে জমা হয়ে নতুন ভূমিরূপ সৃষ্টি করে এবং বিদ্যমান ভূমিরূপের ব্যাপক পরিবর্তন ঘটায়। অগ্ন্যুৎপাত সংঘটিত হওয়ার স্থান এবং এর তীব্রতার উপর নির্ভর করে এই পরিবর্তনগুলোর ধরন ও মাত্রা ভিন্ন হতে পারে।
অগ্ন্যুৎপাত ভূ-পৃষ্ঠে নিম্নলিখিতভাবে ব্যাপক পরিবর্তন সাধন করে:
- নতুন ভূমিরূপ সৃষ্টি: অগ্ন্যুৎপাতের মাধ্যমে ভূপৃষ্ঠে জমা হওয়া লাভা শীতল ও কঠিন হয়ে বিভিন্ন ধরনের আগ্নেয় পর্বত (যেমন – মোচাকৃতি পর্বত), মালভূমি (যেমন – দাক্ষিণাত্য মালভূমি), এবং আগ্নেয় দ্বীপের (যেমন – হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জ) জন্ম দেয়। দীর্ঘ সময় ধরে অগ্ন্যুৎপাতের ফলে এই ভূমিরূপগুলো বিশাল আকার ধারণ করতে পারে।
- ভূমিরূপের ধ্বংসসাধন: প্রচণ্ড বিস্ফোরণের মাধ্যমে অগ্ন্যুৎপাত নিকটবর্তী এলাকার পুরাতন ভূমিরূপ ও জনবসতিকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দেয়। লাভা প্রবাহ, উষ্ণ গ্যাস ও ছাইয়ের বৃষ্টিতে ভূ-পৃষ্ঠের উপরিভাগ পুড়ে যায় এবং ভূ-প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য পরিবর্তিত হয়।
- উর্বর মৃত্তিকা সৃষ্টি: অগ্ন্যুৎপাতের ফলে সৃষ্ট লাভা শীতল হয়ে ভেঙে গিয়ে উর্বর আগ্নেয় মৃত্তিকা তৈরি করে। এই মৃত্তিকা কৃষিকাজের জন্য অত্যন্ত উপযোগী হওয়ায় অগ্ন্যুৎপাতের পরের দীর্ঘ সময়ে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পায়।
- জলাশয় সৃষ্টি: আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ বসে গিয়ে বা লাভা জমে পানি ধারণ করে জ্বালামুখ হ্রদ (যেমন – ইন্দোনেশিয়ার টোবা হ্রদ) সৃষ্টি করতে পারে, যা স্থানীয় ভূ-প্রকৃতির একটি নতুন বৈশিষ্ট্য যোগ করে।
- জলবায়ু ও পরিবেশের পরিবর্তন: অগ্ন্যুৎপাত থেকে নির্গত ছাই ও গ্যাস বায়ুমণ্ডলে মিশে গিয়ে সূর্যালোককে বাধা দেয়, যা তাপমাত্রা হ্রাস এবং দীর্ঘমেয়াদী জলবায়ু পরিবর্তনে ভূমিকা রাখে। সালফার ডাই অক্সাইড ও অন্যান্য বিষাক্ত গ্যাস বায়ুমণ্ডল ও জলরাশিকে দূষিত করে।
উপরিউক্ত আলোচনা থেকে এটি স্পষ্ট যে, উদ্দীপকের ঘটনা-২ এ ইঙ্গিতকৃত অগ্ন্যুৎপাত একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়া যা ভূ-পৃষ্ঠের গঠন, ভূ-প্রকৃতি, মৃত্তিকা, এমনকি জলবায়ুতেও সুদূরপ্রসারী এবং ব্যাপক পরিবর্তন ঘটায়। এই পরিবর্তনগুলো কখনো নতুন সৃষ্টির মধ্য দিয়ে, আবার কখনো ধ্বংসের মধ্য দিয়ে সংঘটিত হয়ে পৃথিবীর গতিময়তা ও বিবর্তনকে প্রমাণ করে।