অধ্যাপক গেটেলের মতে, আধুনিক রাষ্ট্রের ঐক্যের ভিত্তি হলো মনস্তাত্ত্বিক।
জাতীয়তার অন্যতম উপাদান হলো ভৌগোলিক ঐক্য নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে বসবাসকারীরা খুব সহজেই জাতীয়তাবোধ উদ্বুদ্ধ হতে পারে, জাতি গঠনের অন্যান্য উপাদান থাকলেও কেবল ভৌগোলিক নির্দিষ্ট ভূখণ্ড না থাকায় ইহুদিরা ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আগে পর্যন্ত কোনো জাতি গঠন করতে পারে নি। আবার একই ভূখণ্ডের মধ্যে বসবাস করে। অন্যান্য উপাদানে মিল থাকা সত্ত্বেও অনেক দেশ বিচ্ছিন্ন জাতি গঠন করে থাকে।
জনাব আশ্রাফ-উদ-দৌলার স্ত্রীর দেওয়া বইটিতে পাঠ্যপুস্তকের যে ধারণার প্রতিফলন ঘটেছে তা হলো জাতির ধারণা, রাজনৈতিক চেতনার দ্বারা সংঘবদ্ধ সমাজকেই জাতি বলা হয়। নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে বসবাসকারী জনসমষ্টি যাদের মধ্যে ধর্ম, ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যের ঐক্য রয়েছে এবং যারা সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ঐক্যের বন্ধনে আবদ্ধ তারাই জাতি, একটি জনসমাজ তখনই জাতি হিসেবে পরিচিতি পেতে পারে যখন তারা জাতীয়তাবোধে উদ্বুদ্ধ হয় এবং রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত হয়ে স্বাধীন
হওয়ার চেষ্টা করে বা স্বাতন্ত্র্যবোধ বজায় রাখতে সচেষ্ট থাকে। লর্ড ব্রাইসের মতে, “জাতি হলো রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত এমন এক জাতীয়তা, যা স্বাধীন বা স্বাধীনতা অর্জনের চেষ্টারত।”
ফাহমিদার দেওয়া বইটির আলোচ্য বিষয়ের সাথে জাতীয়তার মধ্যে পার্থক্য বিরাজমান। তার কারণ বইটির আলোচনায় প্রমাণিত হয় বইটি জাতির ধারণার ওপর লেখা আর জাতির সাথে জাতীয়তার পার্থক্য সুস্পষ্ট। যা নিচে বিশ্লেষণ করা হলো-
জাতি ও জাতীয়তার মধ্যে আগে কোনো পার্থক্য করা হতো না। শব্দগত অর্থেও এদের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। কিন্তু বর্তমানে শব্দ দুটিকে সুস্পষ্ট পার্থক্য রেখা দ্বারা পৃথক করা হয়।
লর্ড ব্রাইসের মতে, “জাতীয়তা যেখানে ভাষা, সাহিত্য, ধ্যানধারণা এবং প্রজ্ঞা ও ঐতিহ্যের বন্ধনে আবদ্ধ জনসমষ্টিকে বোঝায়, যারা অন্যদের থেকে নিজেদের আলাদাভাবে, সেখানে জাতি বলতে বোঝানো হয় রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত জনসমষ্টিকে, যারা স্বাধীন বা স্বাধীনতা লাভের জন্য সংগ্রামরত।
জাতি ও জাতীয়তার মধ্যে যে পার্থক্য দেখা যায় তা হলো-
১. জাতীয়তার জন্য রাজনৈতিক সংগঠনের দরকার হয় না, কিন্তু জাতি গঠনে সংগঠন আবশ্যক।
২. জাতীয়তার ধারণা সুসংহত নয় কিন্তু জাতি সুসংগঠিত।
৩. জাতীয়তা মানসিক সত্তা, জাতি একটি বাস্তব সত্তা।
৪. জাতীয়তাবোধ স্বাধীনতা সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ হয়ে 'জাতি' বোধে পরিণত হয়।
Related Question
View AllNationality' শব্দের অর্থ জাতীয়তা।
জাতীয়তাবাদ একটি মহান আদর্শ, যা মূলত এক প্রকার মানসিক অনুভূতি। বিভিন্ন উপাদান থেকে এর উৎপত্তি। কিন্তু এ জাতীয়তাবাদ যদি এমন হয় যে, তা অন্য জাতিকে ঘৃণা করতে শেখায়, নিজেকে শ্রেষ্ঠ ভাবতে শেখায় এবং অন্যকে নিজের অধীন রাখার মতো হীনমানসিকতাকে জাগিয়ে তোলে, তবে তা হবে উগ্র জাতীয়তাবাদ। এটি একটি বিবৃত মানসিকতা যা ব্যক্তিকে অন্ধ দেশপ্রেমে প্রলুব্ধ করে। জার্মানির হিটলার, ইতালির মুসোলিনী এরূপ জাতীয়তাবাদী আদর্শে বিশ্বাসী ছিল, যার ফলাফল প্রলয়ঙ্করী দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ।
বাঙালি জাতীয়তাবাদ একটি ঐতিহাসিক বিষয়। এর বিকাশ ঘটেছে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনকে ভিত্তি করে, যা প্রধান শিক্ষক উদ্দীপকে উল্লেখ করেছেন। বাঙালি জাতীয়তাবাদের উদ্ভব ও বিকাশের পর্যায়ে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন এক মাইলফলক। বাঙালি দামাল ছেলেরা ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে নিজেদের বুকের তাজা রক্ত দিয়ে এক ইতিহাস রচনা করে। এ ভিত্তিতেই রচিত হয় বাঙালি জাতীয়তাবাদ বিকাশ। ৫২'র ভাষা আন্দোলন ছিল স্বাধিকার আদায়ের প্রথম ধাপ। এ আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে ৫৪'র নির্বাচন, ৬২'র শিক্ষা আন্দোলন, ৬৬'র ছয় দফা, ৬৯'র গণঅভুত্থান, ৭০'র নির্বাচন এবং ৭১'র স্বাধীনতা অর্জিত হয়। এ দীর্ঘ পথপরিক্রমায় বাঙালির ভাষাভিত্তিক জাতীয়তার ভিত্তি সুদৃঢ় হয়েছে। বাঙালি জাতি এক ঐক্যবদ্ধ জাতিতে পরিণত হয়। স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং বিজয় অর্জনে এটি আমাদের অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে।
জাতীয়তা একটি বহুমাত্রিক বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন প্রত্যয়। এটি গড়ে ওঠার পেছনে অনেকগুলো factor কাজ করে থাকে। উদ্দীপকে প্রধান অতিথি যে কথাটি বলেছেন, তা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কেননা শুধু ভাষাগত মিল একটি জাতীয়তা নির্মাণের একমাত্র ভিত্তি হতে পারে না। যেমন- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, নিউজিল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা প্রভৃতি দেশের ভাষা ইংরেজি হলেও তারা প্রত্যেকে আলাদা আলাদা জাতি। বাংলাদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গের লোকজনের ভাষা এক হওয়া সত্ত্বেও এরা আলাদা দুটি জাতি। আবার ভারত বহু ভাষাভাষীর জনগোষ্ঠীর দেশ হলেও তাদের জাতীয়তা এক। এভাবে ভাষাগত সাদৃশ্য বা বৈসাদৃশ্য একরূপ জাতীয়তা সৃষ্টি বা আলাদা করতে ভূমিকা পালন নাও করতে পারে। জাতীয়তা নির্মাণের পথ অত্যন্ত জটিল ধারায় আবর্তিত হয়।
জাতীয়তা নির্ধারণের অন্যান্য যেসব উপাদান রয়েছে তার মধ্যে প্রধান হলো একই ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, ধর্ম, সাহিত্য, ভৌগোলিক ঐক্য, মনস্তাত্ত্বিক ঐক্য, রাজনৈতিক ঐক্য, অর্থনৈতিক অভিন্ন উদ্দেশ্য ইত্যাদি। পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চল থেকে, বিভিন্ন ভাষা, ধর্ম ও সংস্কৃতির লোক জড়ো হয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘদিন বসবাস করছে। অর্থনৈতিক ও সামাজিক ঐক্য তাদেরকে একই সূত্রের বন্ধনে আবদ্ধ করেছে এবং শক্তিশালী জাতীয়তা নির্মাণে সহায়তা করেছে। তাদের সবার জাতীয়তা নির্ধারিত হয়েছে মার্কিনী। এরূপ কালের পরিক্রমায় দীর্ঘ পরিসরে মানুষের জীবনধারার প্রেক্ষিতে একটি জাতীয়তা গড়ে উঠেছে।
অনুরূপভাবে বাংলাদেশের ভূখণ্ডে বসবাসকারী মানুষের মধ্যেও ইতিহাসের বিবর্তন ধারায় গড়ে উঠেছে জাতীয় চেতনা। এ চেতনা থেকেই সৃষ্টি হয়েছে জাতীয়তাবোধ। পৃথিবীর অধিকাংশ দেশেই এরূপ লক্ষ করা যায়। Activate
১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান এবং ১৫ আগস্ট ভারত স্বাধীনতা লাভ করে।
জাতীয়তাবোধে উদ্বুদ্ধ জনসমষ্টির রাষ্ট্রগুলোকে জাতি-রাষ্ট্র বলা হয়। জাতীয়তার উপাদানগুলোর মাধ্যমে সংগঠিত ও স্বাধীন হয়ে এরূপ রাষ্ট্র গঠিত হয়। জাতিরাষ্ট্র ধারণার প্রবক্তা ম্যাকিয়েভেলি। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি ইত্যাদি জাতি-রাষ্ট্র।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!