সালাত শব্দের অর্থ দোয়া, ইসতেগফার, রহমত ও তাসবিহ।
মানুষ ও অন্যান্য সৃষ্টির প্রতি উত্তম আচরণ করার মাধ্যমে ইবাদত পালন হয়।
ইবাদত দুই ধরনের। যথা- ১. হাক্কুল্লাহ ও ২. হাক্কুল ইবাদ। আল্লাহর সাথে প্রত্যক্ষভাবে সম্পৃক্ত ইবাদত হলো হাক্কুল্লাহ। আর আল্লাহর সকল সৃষ্টির সাথে সম্পৃক্ত ইবাদত হলো হাক্কুল ইবাদ। আল্লাহর সৃষ্টির প্রতি মানুষের সুনির্দিষ্ট কিছু দায়িত্ব ও কর্তব্য রয়েছে। এই দায়িত্ব ও কর্তব্য আল্লাহর নির্দেশ অনুসারে পালন করা হয় বলে এর মাধ্যমে মূলত আল্লাহরই ইবাদত করা হয়। আল্লাহ তায়ালা তার সৃষ্টির প্রতি উত্তম আচরণের নির্দেশ দিয়েছেন। তাই এদের প্রতি উত্তম আচরণ করা ইবাদত হিসেবে গণ্য হবে।
উদ্দীপকে উল্লেখিত জনাব রাহাত সাহেব সাওমের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন। সাওম ইসলামের পাঁচটি মৌলিক ইবাদতের মধ্যে অন্যতম। সাওম বা রোজা হলো নির্দিষ্ট সময়ে সুনির্দিষ্ট কার্যাবলি থেকে বিরত থাকা। সাওম সমাজের মানুষের মাঝে ব্যবধান দূর করে অন্যের দুঃখ-কষ্ট উপলব্ধি করতে সাহায্য করে। তাই সহানুভূতি, সহমর্মিতা, সাম্য, ভ্রাতৃত্ব ইত্যাদি প্রতিষ্ঠায় সাওমের ভূমিকা ব্যাপক। এটি যেমন সমাজে সমতা আনে তেমনি ব্যক্তির অন্তরকে পবিত্র রাখে। সাওম পালনের সময় ব্যক্তি মিথ্যাচার, গিবত, যৌনাচার ইত্যাদি থেকে নিজেকে বিরত রাখে। যার ফলে শয়তানের কু-মন্ত্রণা থেকে নিজেকে রক্ষা এবং সংযমের চর্চা করা যায়। এজন্যই রাসুল (স) বলেন, 'সাওম হলো ঢালস্বরূপ' (সহিহ বুখারি)। এর বর্ণনা রাহাতের বক্তব্যেও ফুটে ওঠে। উদ্দীপকের রাহাত এমন একটি ইবাদতের কথা বলে যা, সহানুভূতি, সাম্য ও ভ্রাতৃত্ব সৃষ্টি করে এবং পাপ-পুণ্যের মাঝে ঢাল হিসেবে কাজ করে। তার এ বক্তব্য নিঃসন্দেহে সাওমকে নির্দেশ করে। কারণ, সাওম পালনের মাধ্যমেই ব্যক্তি পাপ থেকে দূরে থাকতে পারে এবং ধনীরা অভাবীদের কষ্ট উপলব্ধি করতে পারে। তাই বলা যায়, ঢালস্বরূপ ইবাদত হিসেবে এখানে সাওমের প্রতিই ইঙ্গিত করা হয়েছে।
উদ্দীপকে উল্লেখিত জনাব সাফিনের বক্তব্যে জাকাতের বিষয়টি ফুটে উঠেছে। জাকাত একটি ফরজ ইবাদত। ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের মধ্যে জাকাত তৃতীয়। এটি একটি অর্থনৈতিক ইবাদত এবং ইসলামি অর্থব্যবস্থার মূল স্তম্ভ। জাকাতের মাধ্যমে সম্পদের সুষম বণ্টন, দারিদ্র্য বিমোচন ও বেকারত্ব হ্রাস করা সম্ভব। জাকাত দানের ফলে ধনীরা গরিব-দুঃখী মানুষের অভাব ও কষ্টের সাথে পরিচিত হয় এবং গরিব মানুষও তাদের সহানুভূতিতে মুগ্ধ হয়। ফলে ধনী- গরিব উভয়ের মাঝে এক সহযোগিতা ও সহানুভূতির সম্পর্ক তৈরি হয়। এজন্য রাসুল (স) বলেন, 'জাকাত ইসলামের সেতুবন্ধন' (মুসলিম)। সাফিনের বক্তব্যেও বিষয়টি ফুটে ওঠে।
উদ্দীপকের সাফিন তার বন্ধু রাহাতকে বলে! মানুষের মাঝে আর্থিক সমতা ও ভারসাম্য আনার জন্য একটি ইবাদত রয়েছে। যাকে ইসলামের সেতুবন্ধন বলা হয়েছে। সাফিনের বক্তব্যে ধনী-গরিবের সেতুবন্ধন হিসেবে বিবেচিত জাকাতের পরিচয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে জাকাত ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। জাকাতলব্ধ অর্থ পরিকল্পিত উপায়ে ব্যয় করা হলে সমাজে অভাব-অনটন থাকবে না। কেননা সমাজে ধনীদের কাছ থেকে জাকাত সংগ্রহ করে তা গরিবদের সচ্ছলতার জন্য ব্যয় করা হবে। জাকাতের অর্থ দ্বারা শিল্পকারখানা প্রতিষ্ঠা করে বেকার লোকদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা যায়। এতে করে আর্থিকভাবে অসচ্ছল মানুষ ধীরে ধীরে সচ্ছল হয়ে থাকে। ফলে সম্পদের প্রবাহ গতিশীল হয়। সুতরাং বলা যায়, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভারসাম্য প্রতিষ্ঠায় সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে জাকাত গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে।
Related Question
View Allযেসব ইবাদতের ওপর ইসলামের মূল কাঠামো দাঁড়িয়ে রয়েছে তাই মৌলিক ইবাদত।
মহানবি (স) ইসলামের মৌলিক ইবাদত হিসেবে চার রকমের ইবাদতের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, ইসলাম পাঁচটি স্তম্ভের ওপর প্রতিষ্ঠিত। সাক্ষ্য দেওয়া যে, আল্লাহ ব্যতীত কোনো মাবুদ নেই, মুহাম্মদ (স) তাঁর বান্দা ও রাসুল, সালাত কায়েম করা, জাকাত আদায় করা, হজ করা ও রমজানের রোজা পালন করা। এ পাঁচটি ইবাদতের মধ্যে প্রথমটি আকিদাগত বিষয়। বাকি চারটি হলো আনুষ্ঠানিক ইবাদত। আর মৌলিক ইবাদত বলতে সাধারণত এ চারটি ইবাদতকেই বোঝায়।
জনাব মিরাজের এরূপ অস্বীকৃতি ইসলামের দৃষ্টিতে কুফর। ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের অন্যতম সাওম। প্রত্যেক প্রাপ্ত বয়স্ক, সুস্থ, স্থায়ী অধিবাসী বা মুকিম এবং সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন মুসলিম নারী, পুরুষের ওপর রমজান মাসের রোজা রাখা ফরজ। জনাব মিরাজের মধ্যে এই ফরজ ইবাদতটি অস্বীকারের দৃষ্টান্ত লক্ষ করা যায়। জনাব মিরাজ নিজেকে মুসলমান বলে দাবি করেন। কিন্তু ক্ষুধা সহ্য করতে না পারার কারণে তিনি রোজা পালন করতে রাজি নন। অথচ শরিয়ত অনুমোদিত কোনো কারণ ছাড়া সাওম পালন না করা কবিরা গুনাহ। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন- হে মুমিনগণ! তোমাদের উপর সাওম পালন ফরজ করা হয়েছে যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর (আল বাকারা-১৮৩)।
কুরআনের এ আয়াতের আলোকে বোঝা যায়, এটি অবশ্যপালনীয়। শরিয়ত অনুমোদিত কোনো কারণে এটা পালন সম্ভব না হলেও পরে কাযা করতে হবে বা ফিদইয়া দিতে হবে। কেউ যদি ইসলামের এই ফরজ বিধানকে অস্বীকার করে তাহলে সে কাফির হয়ে যাবে। জনাব মিরাজ ইসলামের অন্যতম মৌলিক ইবাদত এবং বুনিয়াদি স্তম্ভ সাওম পালনে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। তাই তার মনোভাব কুফরির শামিল।
'আমি ক্ষুধা সহ্য করতে পারি না'- সাওম সম্পর্কে জনাব মিরাজের এরূপ মন্তব্য সম্পূর্ণরূপে শরিয়তসম্মত নয়। মানুষের অনন্ত ও স্থায়ী জীবন হলো পরকালীন জীবন। এই জীবনের সফলতাই প্রকৃত সফলতা। আর পরকালীন জীবনে সফলতার অন্যতম মাধ্যম হলো সাওম পালন করা। এ বিষয়টিই ইমাম সাহেবের মন্তব্যে পরিলক্ষিত হয়।
ইমাম সাহেব জনাব মিরাজের সাওম পালনে অস্বীকৃতির জবাবে বলেছেন, "হাশরের ময়দানে সাফল্য লাভ করতে হলে অন্যান্য মৌলিক ইবাদতের পাশাপাশি তোমাকে অবশ্যই সাওম পালন করতে হবে।” কথাটি অবশ্যই শরিয়তসম্মত এবং যৌক্তিক। এ পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবার পর সব মানুষ কিয়ামতের ময়দানে একত্রিত হবে। সূর্য অত্যন্ত নিকটবর্তী হওয়ায় এর প্রচণ্ড তাপ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য কোনো ছায়া থাকবে না। এমতাবস্থায় সাওম পালনকারীরা পাবে আরশের ছায়া। সেখানে তারা অত্যন্ত নিরাপদে থেকে বিচারের অপেক্ষায় থাকবে আর বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রেও তারা বিশেষ সুবিধা পাবে। কারণ সাওম সেদিন মহান আল্লাহর কাছে তাদের মুক্তির জন্য সুপারিশ করবে এবং আল্লাহ সেই সুপারিশ কবুল করবেন। অবশ্যই এজন্য সাওম পালনের পাশাপাশি অন্যান্য ফরজ ইবাদতগুলোও পালন করতে হবে। এ প্রসঙ্গে মহানবি (স) ইরশাদ করেন, সাওম ও কুরআন বান্দার জন্য সুপারিশ করবে। সাওম বলবে, হে প্রভু! আমি তাকে দিনের বেলায় পানাহার ও যৌন কামনা থেকে বিরত রেখেছি। কাজেই তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ কবুল করুন। আর কুরআন বলবে, হে প্রভু! আমি তাকে রাতের বেলায় ঘুম থেকে বিরত রেখেছি। কাজেই তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ কবুল করুন। তখন তাদের উভয়ের সুপারিশ কবুল করা হবে।
উপরের আলোচনার মাধ্যমে প্রমাণিত হয়, ইসলামের দৃষ্টিতে জনাব মিরাজ সাহেবের এরূপ মন্তব্য যথার্থ নয়।
ইবাদত প্রধানত দুই প্রকার। যথা: হাক্কুল্লাহ এবং হাক্কুল ইবাদ।
হাক্কুল ইবাদ বলতে মানুষের প্রতি মানুষের দায়িত্ব ও কর্তব্যকে বোঝায়। মানুষ সামাজিক জীব। তাই সমাজবদ্ধ হয়েই তাদেরকে বসবাস করতে হয়। আমরা পিতা-মাতা, ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজন, পাড়া- প্রতিবেশীদের নিয়ে সামাজিকভাবে এক সাথে বসবাস করি। একজনের দুঃখে অন্যজন সাড়া দিই। আপদে-বিপদে একে অপরকে সাহায্য-সহযোগিতা করি। পরস্পরের প্রতি এ সহানুভূতি ও দায়িত্বই হাক্কুল ইবাদ তথা বান্দার হক বা অধিকার।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!