শিশুমনের নানা সংকল্প, রহস্য, কৌতূহল ও উদ্দীপনাকে নিয়ে যাঁরা বাংলা সাহিত্যে অনন্য স্বাক্ষর রেখেছেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন- কাজী নজরুল ইসলাম। যিনি 'জাগো সুন্দর' নাটিকাটিতে শিশুমনের নানা কৌতূহল ও সৃষ্টিশীলতাকে কল্পনাশ্রয়ে প্রকাশ করতে যথেষ্ট ভূমিকা রেখেছেন।
নাট্যকারের অসাধারণ সৃষ্টি 'জাগো সুন্দর' নাটিকা, যেখানে শিশু-কিশোর মনের নানা চঞ্চলতা, আবেগ, আবিষ্কার, সৃজনশীলতা ও কৌতূহলের দিকটি প্রাধান্য পেয়েছে। কৌতূহলোদ্দীপক দলের নেতা কঙ্কণ, যার দলের উৎসুক সদস্যবৃন্দ হলো- কল্পনা, জামাল, ওংকার, চাকাম-ফুসফুস (ন্যাড়া), বেণু ও গৃহকর্মী। স্বপ্নের বিভোরতায় ও কল্পনার আনন্দে এই দলের সদস্যরা অনেক কিছুই হতে চায়, করতে চায়, দেখতে চায় ও উদ্ঘাটনে ডুবে থাকতে চায়।
আবিষ্কারের নেশায় মত্ত হওয়া এই দলের সদস্যবৃন্দ একদিন বাসার ছাদে ঘুমিয়ে পড়ে। ডানাকাটা পরি এসে দলের সদস্যদের চিন্তা বাস্তবায়িত করার জন্য দায়িত্ব নেয়। ফলে নানা অজানা ও রহস্যেঘেরা স্থান দেখতে আর বাধা থাকে না। পরি কঙ্কণের দলের সদস্যদের সাগরের দেশে নিয়ে যায়। সেখানকার পরিবেশ, সৌন্দর্য, রহস্যঘেরা স্থান, মণি-মুক্তা ও বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণী অবলোকন করায়। সেখান থেকে আবার চাঁদের দেশে যাওয়ার জন্য কিশোর মনে কৌতূহলের অভিনব চমক উদয় হয়। চিন্তার বাস্তব রূপ দিতে পরি এসে উপস্থিত হয়। ডানাকাটা পরির রথে চড়ে অভিযাত্রী সংকল্পকারীর দল রওনা দেয় মহাকাশে। যাওয়ার পথে সুন্দর পরিবেশ, অসীম শূন্যতার নীরবতা ও মহাশূন্যের নানা রহস্যোদ্দীপক বিষয় জেনে প্রতিটি কিশোরের মন আনন্দিত হয়ে ওঠে। আবিষ্কারের নেশা আরও বৃদ্ধি পায়। অজানা রহস্য উদ্ঘাটনের মানসিকতা দৃঢ়তা লাভ করে। এরপর পরির সহযোগিতায় কঙ্কণের দল ছুটে চলে মঙ্গলগ্রহের পানে। যাওয়ার পথে নানা বিষয় দেখে পুলকিত হয় তারা। রহস্য উদ্ঘাটন করে খুশিতে আত্মহারা হয়ে ওঠে দলের একেক সদস্য। এক সময় মঙ্গলগ্রহে অনুপ্রবেশের সন্ধিক্ষণ চলে আসে। সেখানকার রহস্যঘেরা মাটি, পাথর ও উত্তপ্ত পরিবেশ দলের প্রত্যেককে নতুন কিছু উপহার দেয়।
আবার কিশোর দলের কৌতূহলী সদস্যবৃন্দ কেউ কেউ সওদাগর হতে চায় আবার কেউ হতে চায় বণিক। কঙ্কণের দলের কৌতূহলোদ্দীপক এসব শিশুদের মধ্যে অনেকেই গবেষণা করতে চায়, অনেকে বিজ্ঞানী হতে চায় আবার অনেকে রাখাল হয়ে বনজঙ্গল ঘুরে নানা রহস্য উদ্ঘাটনের প্রবণতা মনে পোষণ করে রাখে। এভাবে শিশুমনের নানা দিক কল্পনার স্রোতে ভাসতে ভাসতে স্বপ্নের মাধ্যমে যেন বাস্তবতার অবয়ব পায়। শিশুমন সত্যিই বৈচিত্র্যময়, কল্পনাময়, আবেগময় ও আবিষ্কারের নেশায় মত্ত। নতুন কিছু করা বা জানার পিছনে তাদের জিজ্ঞাসা নিত্যদিনের। একপর্যায়ে রাতের ঘনঘোরে অন্ধকার যখন শেষ হয়ে ভোরের সূর্যের আলো কিশোর দলের উপরে উপচে পড়ছে ঠিক তখন গৃহকর্মীর ডাকে প্রত্যেকে কল্পনার জগৎ থেকে বাস্তব জগতে পদার্পণ করে।
কিশোর মনের নানান চিন্তা, কল্পনা, অনুভূতি, আবিষ্কার ও সৃজনশীলতা 'জাগো সুন্দর' নাটিকাটিতে নাট্যকার স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। শিশুমনের রহস্যের শেষ নেই, কল্পনার শেষ নেই তেমনি শেষ নেই আবিষ্কারের নেশার।
Related Question
View Allবেণু পুকুরের কাছে নামিয়ে দিতে বলেছে।
বেণু কল্পনাকে সকাল বেলার ঘুম-জাগানো পাখি হতে ইচ্ছে করে বলে জানিয়েছে।
'জাগো সুন্দর' নাটিকায় কল্পনা বেণুর কাছে তার ইচ্ছার কথা জানতে চায়। বেণু তখন তার ইচ্ছার কথা জানায়। সে বলে- "আমি হবো সকাল বেলার পাখি/ সবার আগে কুসুমবাগে উঠব আমি ডাকি। সূয্যি মামা জাগার আগে উঠব আমি জেগে/ 'হয়নি সকাল, ঘুমো এখন' মা বলবেন রেগে।” বেণু তখন মাকে বলবে যে, তুমি আলসে মেয়ে, তুমিই ঘুমিয়ে থাক। সকাল হয়নি বলে কি সকাল হবে না? আর আমরা না জাগলে কেমনে সকাল হবে? তখন ঝরনা-মাসি যদি তাকে খুকি বলে ডাকে সে তাকে বলবে- সে খুকি নয়, সে ঘুম-জাগানো পাখি।
উদ্দীপকটি 'জাগো সুন্দর' নাটিকার ন্যাড়ার নাম বদল করে 'চাকাম-ফুসফুস' রাখার দিকটির সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ।
নাম মানুষের পরিচয়ের প্রধান দিক। প্রিয়জনরা অনেক সময় প্রকৃত নামে না ডেকে অন্য একটা ছোট নামে ডাকে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ব্যক্তির আচরণ অনুসারে সেই নামকরণ হয়ে থাকে।
উদ্দীপকে পটলবাবু তার বাড়ির চাকর চিরঞ্জীবকে চেরা বলে ডাকেন। আর পাড়ার লোকেরা তার নাম দিয়েছে পটলচেরা। কারণ সে পটলবাবু ওরফে প্রোফেসর পি. সি. চাকলাদারের সন্তানহীন সংসারে সব সময়ের সঙ্গী চিরঞ্জীব। এ বিষয়টি 'জাগো সুন্দর' নাটিকার ন্যাড়ার নাম বদল করে 'চাকাম-ফুসফুস' রাখার দিকটির সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। একটু ভয়ের কথা শুনলে ন্যাড়ার ফুসফুস চুপসে গিয়ে বুকে গর্ত হয়ে যায় এবং মুখ শুকিয়ে গিয়ে চাকাম চুকুম শব্দ করতে থাকে। এ কারণে ওংকার ন্যাড়াকে 'চাকাম-ফুসফুস' নাম দিয়েছে।
উদ্দীপকে 'জাগো সুন্দর' নাটিকার একটি বিষয়ের প্রতিফলন ঘটেছে, পুরো বিষয় প্রতিফলিত হয়নি। মন্তব্যটি যথার্থ।
কল্পনাশক্তি মানুষের অমূল্য সম্পদ। কল্পনায় মানুষ আকাশ-পাতাল, সাগর-নদী, অজানা-অচেনা দেশে-নৃগরে ঘুরে আসতে পারে।
'জাগো 'সুন্দর' নাটিকায় কিশোর কঙ্কণের দল স্বপ্ন-কল্পনায় এক পরির সহযোগিতায় সাগর তলের অজানা দেশে যায়। তারা রকেটে চেপে চাঁদের দেশে ও মঙ্গল গ্রহে যেতে চায়। তারা হতে চায় সওদাগর, বিজ্ঞানী, সকাল বেলার পাখি, গ্রামের রাখাল ছেলে প্রভৃতি। স্বপ্নে পরির পুষ্পরথে চড়ে কল্পনার বহু দেশ ঘুরে আসে। উদ্দীপকে এসব বিষয়ের কোনোটিই প্রকাশ পায়নি। উদ্দীপকে কেবল নাটিকার কিশোর কঙ্কণের দলের ন্যাড়ার নায় 'চাকাম- ফুসফুস' রাখার দিকটি প্রকাশ পেয়েছে। এখানে চিরঞ্জীবের নাম চেরা বা পটলচেরা রাখা হয়েছে।
জাগো সুন্দর' নাটিকায় পরি কল্পনা কিশোর দলকে বড় হয়ে সাগর জয় করতে বলেছে। কিশোর দলটি ঘরের ছাদে একসঙ্গে ঘুমিয়ে স্বপ্নে চাঁদ ও মঙ্গল গ্রহে যেতে চেয়েছে। এসব বিষয় উদ্দীপকে নেই। তাই প্রশ্নোক্ত মন্তব্যটি যথার্থ।
কল্পনাশক্তি মানুষের এক অমূল্য সম্পদ। এই কল্পনাশক্তি ব্যবহার করে রচিত হয়েছে 'জাগো সুন্দর' নাটিকা। নাটিকার অন্যতম চরিত্র কঙ্কণের কল্পনার মধ্যে বিরাজ করে এক পরি। কঙ্কণ তার কল্পনার মাধ্যমে ভেবেছে মনের ভেতরে এক ডানাওয়ালা সুন্দরী পরি বাস করে। সেই পরি জাদু জানে এবং সে এক নিমেষে কঙ্কণকে নিয়ে যেখানে খুশি সেখানে নিয়ে যেতে পারে। গত রাতে সে ছাদে বসে চাঁদের দিকে চেয়ে কল্পনা করেছে তার মনের মধ্যকার সেই পরি তাকে নিয়ে এক নিমেষে চাঁদের দেশে উড়ে যাবে। তাই বলা যায়, কঙ্কণের মনের পরি ছিল আলাদিনের চেরাগের মতো। আলাদিনের দৈত্য যেমন তার মনিবের সব ইচ্ছে নিমিষেই পূরণ করে দিতে পারত তেমনই কঙ্কণের মনের পরিও নিমেষেই তাকে নিয়ে যেখানে ইচ্ছে সেখানে যেতে পারত।
'জাগো সুন্দর' নাটিকাটি রচিত হয়েছে কঙ্কণ নামে এক কিশোর ও তার দলের কয়েকজনের কল্পনাশক্তিকে আশ্রয় করে। শিশুরা কল্পনাপ্রবণ হয়ে থাকে। এ নাটিকায় দেখা যায়, কল্পনা, কঙ্কণ, ওংকার, কামাল ও বেণু কল্পনালোকের মধ্য দিয়ে সমুদ্রতলে বেড়িয়ে এসেছে, যেতে চায় চাঁদের দেশ ও মঙ্গলগ্রহে। কিন্তু তারা শেষ পর্যন্ত মাটির পৃথিবীকে ভালোবেসে মাটির পৃথিবীতেই থাকতে চায়।
স্বভাবতই কল্পনাপ্রবণ শিশুরা ভালোবাসে স্বপ্ন দেখতে। তাদের চোখে থাকে অদেখাকে দেখার ও অজানাকে জানার অসীম আকাঙ্ক্ষা। 'জাগো সুন্দর' নাটিকার প্রত্যেকটি চরিত্রই শিশু-কিশোর। তাদের মধ্যেও রয়েছে অদেখাকে দেখার ও অজানাকে জানার অসীম আকাঙ্ক্ষা। তারা তাদের কল্পনাশক্তির মধ্য দিয়ে সমুদ্রতলদেশ থেকে ঘুরে আসে। ভ্রমণ করে আসে মঙ্গলগ্রহ ও চাঁদের দেশ থেকে। তবে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় নাটিকাটিতে যতই হাসি-ঠাট্টা ও অবাস্তব কাহিনি থাকুক না কেন, নাটিকাটির মূলে রয়েছে স্বাধীনতার মূলমন্ত্র। কাজী নজরুল ইসলাম ঔপনিবেশিক শাসন থেকে স্বদেশকে মুক্ত করতে এ নাটিকার মধ্যে কৌতুকের ছলে বপন করে দিয়েছেন স্বাধীনতার বীজ। স্বদেশকে পরাধীনতার হাত থেকে রক্ষা করতে বেণু হতে চায় 'ঘুম জাগানো পাখি', চল চল চল, ঊর্ধ্ব গগনে বাজে মাদল বলে সকল মানুষকে নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করে কঙ্কণ হতে চায় মাটির রাজা, ওংকার হতে চায় গাঁয়ের রাখাল ছেলে। অর্থাৎ কল্পনায় বিরাজ করলেও শেষ পর্যন্ত সবাই থাকতে চায় মাটির পৃথিবীর সান্নিধ্যে। খেয়াল করলে দেখা যায়, এ নাটিকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে শিশুরা সমুদ্রতল বিজয় করে, চাঁদের দেশে ও মঙ্গলগ্রহে ঘুরে এসে পৃথিবীতেই অবস্থান করতে চায়। এই মাটির পৃথিবীকে তারা তুলনা করেছে মায়ের সঙ্গে। যা সম্ভব হয়েছে লেখকের প্রবল দেশপ্রেমের চেতনা থেকে।
পরিশেষে বলা যায়, হাসি-ঠাট্টা, কৌতুক ও কিছু অবাস্তব ঘটনার অবতারণা থাকলেও 'জাগো সুন্দর' নাটিকার মধ্যে সবকিছু ছাপিয়ে লেখক মাটির পৃথিবীকেই সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে মাটির পৃথিবীতেই বিরাজ করতে চেয়েছেন।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!
