১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শাহাদাতবরণ করেন।
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করার পর বাংলাদেশে গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। ১৯৯০ সাল পর্যন্ত সামরিক, বেসামরিক আদলে সেনাশাসন অব্যাহত ছিল। ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর জেনারেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের পদত্যাগের মধ্য দিয়ে গণতন্ত্রের পুনর্যাত্রা শুরু হয়। ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি সকল দলের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশে সরকার পরিবর্তনের গণতান্ত্রিক ধারা চালু হয়। জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের শাসনব্যবস্থা পরিচালনার পথ উন্মুক্ত হয়। রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার থেকে সংসদীয় সরকার পদ্ধতি দেশে পুনঃপ্রবর্তন ও সংবিধানে তা অন্তর্ভুক্ত হয়। একেই গণতন্ত্রের পুনঃযাত্রা বলে অভিহিত করা হয়।
উদ্দীপকে জেনারেল জামান বিরোধী আন্দোলনের সাথে পাঠ্যপুস্তকের হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের শাসনকালের প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে।
উদ্দীপকে জেনারেল জামান অবৈধভাবে ক্ষমতা গ্রহণ করে অপশাসন শুরু করে। তার অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে গণতান্ত্রিক ঐক্যজোট সাধারণ জনগণকে সঙ্গে নিয়ে জেনারেল জামানকে পদত্যাগে বাধ্য করে। তদুপ পাঠ্যপুস্তকে হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের সামরিক শাসন প্রতিহত করার জন্য ১৯৮৩ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ১৫ দলীয় ঐক্যজোট এবং বিএনপির নেতৃত্বে ৭ দলীয় ঐক্যজোট গঠিত হয়। সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলনকে প্রতিহত করার লক্ষ্যে ৫ দফা দাবি ঘোষণা করে। ৫ দফা কর্মসূচির মূল দাবি ছিল অবিলম্বে সামরিক শাসন প্রত্যাহার, সেনাবাহিনীকে ব্যারাকে ফিরিয়ে নেওয়া এবং যেকোনো নির্বাচনের আগে সার্বভৌম জাতীয় সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠান। এ আন্দোলনে রাজনৈতিক দল ছাড়াও ছাত্র, শিক্ষক, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, আইনজীবী, সাংবাদিক, কৃষিবিদ, কৃষক-শ্রমিকসহ সর্বস্তরের শ্রেণি ও পেশার জনগণ অংশগ্রহণ করে। তাই এ আন্দোলন গণআন্দোলন থেকে ক্রমান্বয়ে গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। ১৯৮৭ সালে ৮ দল, ৭ দল ও ৫ দল জেনারেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের পদত্যাগের দাবিতে একমত পোষণ করে এবং সকল জোট ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন শুরু করে। তিন জোটের হরতাল এবং 'ঢাকা অবরোধ' কর্মসূচির ফলে জেনারেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ বিরোধী আন্দোলন তীব্র থেকে তীব্রতর হতে থাকে। আন্দোলনের এক পর্যায়ে ১৯৮৭ সালের ১০ নভেম্বর নূর হোসেন বুকে ও পিঠে 'গণতন্ত্র মুক্তি পাক, স্বৈরাচার নিপাত যাক' স্লোগান লিখে ঢাকার জিপিও-এর নিকট জিরো পয়েন্টে পুলিশের গুলিতে নিহত হন। এতে আন্দোলনকারী জনগণ ক্ষুব্ধ হয়। ১৯৯০ সালে ২৭ নভেম্বর বিএএ নেতা ডা. সামসুল আলম মিলন গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ এরশাদবিরোধী আন্দোলকে চরম রূপ দেয়। ২৯ নভেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকবৃন্দ একযোগে পদত্যাগ করে। পাশাপাশি অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকবৃন্দও পদত্যাগের ঘোষণা দেন। সংগঠিত হয় এরশাদ বিরোধী ৯০-এর গণঅভ্যুত্থান। এসময় বিভিন্ন রাজনৈতিক দল একটি অভিন্ন কর্মসূচিতে ঐক্যবদ্ধ হলে ১৯৯০-এর ৪ ডিসেম্বর জেনারেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ ক্ষমতা থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দেন। ৬ ডিসেম্বর সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি শাহাবুদ্দিনের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের হাতে এরশাদ ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। সুতরাং দেখা যায়, উদ্দীপকের জামান বিরোধী আন্দোলনের প্রতিচ্ছবি হলো জেনারেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ বিরোধী আন্দোলন। উভয় আন্দোলনের মাধ্যমে স্বৈরাচারী শাসকদের পতন ঘটানো হয়েছিল।
উদ্দীপকে যে আর্থসামাজিক ও সাংস্কৃতিক উন্নয়নের কথা বলা হয়েছে বর্তমান বাংলাদেশের দিকে লক্ষ করলে দেখা যায় যে, গত ৪৬ বছরে বাংলাদেশ সরকারি বিভিন্ন নীতি ও কৃষক-শ্রমিকসহ সকলের সম্মিলিত চেষ্টায় দারিদ্র্যের হার ৭০ শতাংশ থেকে ২৪ শতাংশে নেমে এসেছে। ইতিমধ্যে বাস্তবায়িত পাঁচটি পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা, একটি দ্বিবার্ষিক পরিকল্পনার প্রধান লক্ষ্য ছিল দারিদ্র্য বিমোচন। দারিদ্র্য হ্রাসের মাধ্যমে বাংলাদেশের মানব উন্নয়নসূচকে ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটেছে। বাংলাদেশের মানব উন্নয়নসূচক দক্ষিণ এশিয়ার পাকিস্তান, নেপাল, আফগানিস্তানের তুলনায় ভালো। বাংলাদেশে দারিদ্র্য বিমোচনে উন্নয়ন সহযোগীদের পরামর্শক্রমে প্রণীত 'জাতীয় দারিদ্র্য নিরসন কৌশলপত্র' ও 'জাতীয় দারিদ্র্য নিরসন কৌশলপত্র-২, দিন বদলের পদক্ষেপ' বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। ২০২১ সাল নাগাদ বাংলাদেশকে একটি শক্তিশালী মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তরিত করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে সরকার। বিশেষত শিক্ষার প্রসার, শিশু মৃত্যুহার হ্রাস ও নারীর ক্ষমতায়নে বাংলাদেশ বিশ্বের প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করেছে বলে মত প্রকাশ করেছেন নোবেল পুরস্কার বিজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. অমর্ত্য সেন। নারীর ক্ষমতায়ন ও স্বাস্থ্যরক্ষায় বাংলাদেশ সরকার মাতৃত্বকালীন ভাতা প্রদান, টিকাদান দুঃস্থ নারীদের সহায়তা প্রকল্প, নারী শিক্ষা বিস্তারে উপবৃত্তি দান প্রকল্প ইত্যাদি গ্রহণ করেছে। ২০১০ সালে প্রণীত হয়েছে 'পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ ও সুরক্ষা আইন'। নারীর ক্ষমতায়ন ও অধিকার রক্ষায় এ আইন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। প্রান্তিক ও গ্রামীণ জনগণের খাদ্য নিরাপত্তা দিতে সরকার বিভিন্ন ধরনের কর্মসূচি যেমন- কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচি, ভিজিএফ, ভিজিডি, টিআর প্রভৃতি চালু করেছে। শিশুদের সুরক্ষা ও তাদের জীবন বিকাশের জন্য সরকার ২০১১ সালে প্রণয়ন করেছে জাতীয় শিশু নীতি-২০১১। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি যে বাংলা ভাষার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির জন্য এদেশের ছাত্র ও সাধারণ মানুষ রক্ত দিয়েছিল তা আজ বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালন করছে। বাংলাদেশের বাংলা বর্ষবরণ উদযাপনে যে মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয় তা ইউনেস্কোর বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান পেয়েছে। ফলে আমাদের দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
Related Question
View Allবাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে 'গণযুদ্ধ' বা 'জনযুদ্ধ' নামে আখ্যা দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে মুজিবনগর সরকার গঠন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মুক্তিযুদ্ধকে সঠিকভাবে পরিচালনা, সুসংহত করা এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিশ্বজনমত গঠনের লক্ষ্যে ১৯৭০-এর নির্বাচনে নির্বাচিত জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের প্রতিনিধিদের নিয়ে ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠন করা হয়। ওই দিনই আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষিত হয় 'বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা আদেশ'।
আরিফার বাবা স্বাধীন বাংলা বেতারের শিল্পী ছিলেন। স্বাধীন বাংলা বেতার একটি গণমাধ্যম। অর্থাৎ, আরিফার বাবা গণমাধ্যমে কাজ করতেন। মুক্তিযুদ্ধে উক্ত মাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে গণমাধ্যমের ভূমিকা অপরিসীম। সংবাদপত্র ও স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র এ ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। ২৬ মার্চ চট্টগ্রাম বেতারের শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীরা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র চালু করেন। পরে এটি মুজিবনগর সরকারের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র সংবাদ, দেশাত্মবোধক গান, মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বগাথা, রণাঙ্গনের নানা ঘটনা ইত্যাদি দেশ ও জাতির সামনে তুলে ধরে সাধারণ মানুষকে যুদ্ধের প্রতি অনুপ্রাণিত করে। এছাড়া মুক্তিযোদ্ধাদের সাহস জুগিয়ে বিজয়ের পথ সুগম করে। এছাড়া মুজিবনগর সরকারের প্রচার সেলের তত্ত্বাবধানে 'জয় বাংলা' পত্রিকা মুক্তিযুদ্ধে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। অতএব বলা যায়, আরিফার বাবার মতো সংস্কৃতিকর্মী এবং প্রচারমাধ্যম মুক্তিযুদ্ধকে এগিয়ে নিয়ে যেতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
স্বাধীনতা অর্জন ত্বরান্বিত করার ক্ষেত্রে আরিফার মায়ের মতো অনেক নারীর ভূমিকাই ছিল তাৎপর্যপূর্ণ।
উদ্দীপকে উল্লিখিত আরিফার মা মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে খাবার সরবরাহ করতেন। মাঝে মাঝে সেখানে গিয়ে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের সেবা করতেন। আরিফার মায়ের ন্যায় মুক্তিযুদ্ধে নারীদের ভূমিকা ছিল গৌরবোজ্জ্বল। ১৯৭১ সালের মার্চের প্রথম থেকেই দেশের প্রতিটি অঞ্চলে যে সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়, তাতে নারীদের বিশেষ করে ছাত্রীদের অংশগ্রহণ ছিল স্বতঃস্ফূর্ত। মুক্তিযোদ্ধা শিবিরে পুরুষের পাশাপাশি নারীরা অস্ত্রচালনা ও গেরিলা যুদ্ধের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। অপরদিকে, সহযোদ্ধা হিসেবে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের সেবা-শুশ্রুষা, মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয়দান ও তথ্য সরবরাহ করে যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এদেশের অগণিত নারী মুক্তিসেনা। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী কর্তৃক ধর্ষিত হন প্রায় তিন লক্ষ মা-বোন। তারাও মুক্তিযোদ্ধাদের সহযাত্রী এবং ত্যাগের স্বীকৃতি হিসেবে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সরকারিভাবে তাদেরকে 'বীরাঙ্গনা' উপাধিতে ভূষিত করেন।
উপরিউক্ত আলোচনার আলোকে বলা যায়, স্বাধীনতা অর্জন ত্বরান্বিত করার ক্ষেত্রে আরিফার মায়ের মতো অনেক নারীই তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
যে তহবিল থেকে প্রসূত নারীদের অনুদান প্রদান করা হয় সেই তহবিল হচ্ছে 'ল্যাকটেটিং মাদার সহায়তা তহবিল'।
কোনো দেশের সংবিধান রচনার জন্য নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে যে পরিষদ বা কমিটি গঠন করা হয়, তাকে গণপরিষদ (Constituent Assembly) বলে। যেমন- স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান রচনার জন্য ১৯৭২ সালের ২৩ মার্চ বঙ্গবন্ধু 'বাংলাদেশ গণপরিষদ' নামে একটি আদেশ জারি করেন। এ আদেশবলে ১৯৭০ সালের নির্বাচনে জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচিত সদস্যগণ গণপরিষদের সদস্য বলে পরিগণিত হন।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!