বাংলা সাহিত্যে হুমায়ূন আহমেদ কথাসাহিত্যিক হিসেবে সমধিক খ্যাত। আধুনিক ঔপন্যাসিকদের মধ্যে তিনি শ্রেষ্ঠ ও সর্বাধিক জনপ্রিয়। তাঁর সংলাপপ্রধান গল্প ও উপন্যাসে খুব অল্প বাক্যে তিনি একটি চরিত্র ফুটিয়ে তুলতে পারতেন এবং অতিবাস্তব বিষয়গুলি এমনভাবে অনায়াসে বিশ্বাসযোগ্য করে উপস্থাপন করতেন যেন মনে হয় যাদু বাস্তবতা। যথেষ্ট সমাজসচেতন হয়েও তাঁর রচনায় কোনো রাজনৈতিক প্রণোদনা নেই।
হুমায়ূন আহমেদ ১৩ নভেম্বর, ১৯৪৮ সালে কৃষ্ণপক্ষের শনিবার রাত ১০.৩০ মিনিটে নেত্রকোনার মোহনগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন। পৈতৃক নিবাস নেত্রকোনার কুতুবপুর।
তাঁর ডাক নাম কাজল। পিতৃপ্রদত্ত নাম শামসুর রহমান।
কথাসাহিত্যিক জাফর ইকবাল ও কার্টুনিস্ট আহসান হাবীব তাঁর ভাই।
তিনি পলিমার কেমিস্ট্রি বিষয়ের উপর পিএইচডি ডিগ্রি লাভকরেন।
তিনি ১৯৭৩ সালে ময়মনসিংহের বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভৌতরসায়নের প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরবর্তীতে ১৯৭৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন বিভাগে যোগ দেন।
বাংলা কল্পবিজ্ঞান সাহিত্যের পথিকৃৎ হুমায়ূন আহমেদ। ‘তোমাদের জন্য ভালোবাসা' (১৯৭৩) প্রথম বাংলা কল্পবিজ্ঞান সাহিত্য।
হুমায়ুন আহমেদ এর সৃষ্ট লজিক ও অ্যান্টি লজিক নিয়ে কাজ করা দুটি অমর চরিত্র মিসির আলী ও হিমু। মিসির আলী বাস্তববাদী, যুক্তিনির্ভর ও রহস্যময় চরিত্র। মিসির আলী চরিত্রের প্রথম উপন্যাস 'দেবী' (১৯৮৫)। হিমুর আসল নাম হিমালয়। পকেটবিহীন হলুদ পাঞ্জাবী তার পোশাক। নব্বইয়ের দশকে ‘ময়ূরাক্ষী' (১৯৯০) উপন্যাসের মধ্য দিয়ে হিমুর আত্মপ্রকাশ ।
গাজীপুরের ‘নুহাশ পল্লী' তাঁর নির্মিত বাগানবাড়ি।
তিনি ‘বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার' (১৯৮১), ‘একুশে পদক' (১৯৯৪) লাভ করেন ।
তাঁর উপন্যাসসমূহ:
‘নন্দিত নরকে' (১৯৭২): এটি প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস হলেও তাঁর লেখা দ্বিতীয় উপন্যাস। ১৯৭০ সালে তিনি যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন বিভাগে অধ্যয়নরত এবং হাজী মুহম্মদ মুহসীন হলের আবাসিক ছাত্র, তখন তিনি এটি রচনা করেন। এটি প্রখ্যাত সাহিত্যিক আহমদ ছফার উদ্যোগে ১৯৭২ সালে প্রকাশিত হয় এবং এ উপন্যাসটির ভূমিকা স্বপ্রণোদিত হয়ে লিখে দেন অধ্যাপক আহমদ শরীফ। চরিত্র: রাবেয়া।
‘শঙ্খনীল কারাগার’ (১৯৭৩): বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহের প্রভাষক থাকাকালে তিনি এ উপন্যাসটি রচনা করেন।
‘কোথাও কেউ নেই' (১৯৯২) : চরিত্র- বাকের ভাই ।
‘কে কথা কয়' (২০০৬): উপন্যাসটি অটিজম নিয়ে রচিত। এ উপন্যাসে গণিতে আগ্রহী দশ-এগারো বছর বয়সী অটিস্টিক শিশু কমল ও ২৭ বছর বয়সী বেকার যুবক মতিন নামের চরিত্রকে কেন্দ্র করে একটি শিশুর আত্মানুসন্ধান ও সত্যান্বেষণের প্রয়াস লক্ষ করা যায়। উপন্যাসের শেষে কমল সত্যান্বেষণে ব্যস্ত হয়ে পড়ে এবং মতিন সত্যের জন্য জীবন উৎসর্গ করে। উজবেক কবি নদ্দিউ নতিম নামে এক কাল্পনিক চরিত্রও রয়েছে।
'দেয়াল' (২০১২) : এটি রাজনৈতিক উপন্যাস। (সর্বশেষ উপন্যাস)
'আগুনের পরশমণি' (১৯৮৬): ঢাকায় গেরিলা অপারেশন,গেরিলাদের গোপন তৎপরতা, স্বাধীনতা সমর্থনকারী ও বিরোধিতাকারী চরিত্রের মাধ্যমে মহান মুক্তিযুদ্ধের চিত্র উপস্থাপিত হয়েছে এ উপন্যাসে। এ উপন্যাসের কেন্দ্রবিন্দু ঢাকা শহরের একটি বাড়ি। মতিন সাহেব তার স্ত্রী সুরমা, দুই মেয়ে রাত্রি আর অপালা, গৃহকর্মী বিন্তিকে নিয়ে থাকেন এ বাড়িতে। তাদের বাসায় সাময়িক সময়ের জন্য থাকতে আসেন মতিন সাহেবের বন্ধুর ছেলে বদিউল আলম বদি। সে একজন মুক্তিযোদ্ধা। রাত্রি প্রথমদিকে বদিকে অপছন্দ করলেও শেষে ভালোবেসে ফেলেন। একদিন পাক বাহিনির সাথে যুদ্ধ করতে গিয়ে আহত হয় বদি। কারফিউ থাকার কারণে বদিকে ডাক্তারের কাছে নেয়া সম্ভব হয়ে উঠে না। ভোর হলে নিতে পারবে বদিকে ডাক্তারের কাছে। শুরু হয় অপেক্ষমান এক রজনীর। এভাবেই শেষ হয় উপন্যাসের কাহিনি। উপন্যাসটির চলচ্চিত্ররূপ আটটি শাখায় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করে।
'১৯৭১' (১৯৮৬): এটি মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস।
'জোছনা ও জননীর গল্প' (২০০৪): উপন্যাসটি মুক্তিযুদ্ধের প্রামাণ্য দলিল। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের পুরো নয় মাসের বর্ণনা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে উঠে এসেছে এ উপন্যাসটিতে। মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত, মুক্তিযুদ্ধের বিবরণ, ঐতিহাসিক চরিত্র ও তার ভূমিকা, ঔপন্যাসিকের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণকে উপজীব্য করে রচিত হয়েছে উপন্যাসটি।
'শ্যামল ছায়া' (২০০৩): এটি মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস। ১৯৭১ সালের মার্চে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হলে অনেকেই নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ছুটতে থাকে। এমনই একদল আশ্রয় সন্ধানীর পলায়নের কাহিনি উপন্যাসটির মূল বিষয়। ২০০৪ সালে উপন্যাসটি নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মিত হয়। 'সূর্যের দিন', 'সৌরভ', 'নির্বাসন', 'অনিল বাগচীর একদিন'।
তাঁর যে সকল উপন্যাস অবলম্বনে চলচ্চিত্র চিত্রায়িত হয়ঃ
'শঙ্খনীল কারাগার' (১৯৯২), 'আগুনের পরশমণি' (১৯৯৪), 'শ্রাবণ মেঘের দিন' (১৯৯৯), 'দুই দুয়ারী' (২০০০), 'চন্দ্রকথা (২০০৩), 'শ্যামল ছায়া' (২০০৪), 'দূরত্ব' (২০০৬), 'নন্দিত নরকে' (২০০৬), 'নিরন্তর' (২০০৬), 'নয় নম্বর বিপদ সংকেত' (২০০৬), 'দারুচিনি দ্বীপ' (২০০৭), 'সাজঘর' (২০০৭), 'আমার আছে জল' (২০০৮), 'প্রিয়তমেষু' (২০০৯), 'ঘেঁটুপুত্র কমলা' (২০১২-এটি তাঁর নির্মিত সর্বশেষ চলচ্চিত্র), 'অনিল বাগচীর একদিন' (২০১৫- এটি তাঁর মৃত্যুর পরে নির্মিত হয়)। [ব্রাকেটে দেয়া সালগুলো চলচ্চিত্র নির্মিত হওয়ার সময়কাল, উপন্যাস প্রকাশের সাল নয়]
জনপ্রিয় লেখক হুমায়ূন আহমেদ এর মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী বাংলাদেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ভিত্তিক উপন্যাস 'দেয়াল' (২০১২)। এটি তাঁর রচিত সর্বশেষ উপন্যাস যা লেখকের মৃত্যুর পরে প্রকাশিত হয়। গ্রন্থাকারে প্রকাশের পূর্বেই এটি নিয়ে বিতর্ক শুরু হয় এবং তা আদালত পর্যন্ত গড়ায়। পরবর্তীতে হাইকোর্টের নির্দেশে এর কিছু অংশ পরিমার্জন করে প্রকাশ করা হয়। এ উপন্যাসে লেখার মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী বাংলাদেশের সামাজিক ও রাজনৈতির চরিত্র ও ঘটনাবলি নিজ ভাষা ও কল্পনাপ্রসূত ঢঙে চিত্রায়িত করেছেন। এখানে লেখক বিভিন্ন চরিত্রের মাধ্যমে সমসাময়িকভাবে নিজেকেও উপস্থাপন করেছেন উল্লেখযোগ্য চরিত্র: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, খালেদ মোশাররফ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, জিয়াউর রহমান, অর্থের তাহের, অবন্তি, চা বিক্রেতা কাদের বাঙ্গালি।