উত্তরঃ
জ্ঞান শ্রেণিকরণ হলো জ্ঞানের বিভিন্ন শাখা-প্রশাখা, বিষয়বস্তু ও ধারণাকে একটি সুনির্দিষ্ট এবং যৌক্তিক বিন্যাসে সাজানোর প্রক্রিয়া। এর উদ্দেশ্য হলো জ্ঞানের জগতকে একটি কাঠামোবদ্ধ রূপে উপস্থাপন করা, যাতে তথ্য পুনরুদ্ধার ও ব্যবহার সহজ হয়।
পুস্তক শ্রেণিকরণ হলো গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত বই বা অন্যান্য উপকরণের বিষয়বস্তু অনুযায়ী সেগুলোকে একটি নির্দিষ্ট বিন্যাসে সাজানো, যাতে ব্যবহারকারীরা সহজেই তাদের কাঙ্ক্ষিত তথ্য খুঁজে পান। এটি জ্ঞান শ্রেণিকরণের ব্যবহারিক প্রয়োগ, যেখানে গ্রন্থের ভৌত রূপ ও বিষয়বস্তু উভয়ই বিবেচনা করা হয়।
জ্ঞান শ্রেণিকরণ (Knowledge Classification):
জ্ঞান শ্রেণিকরণ হলো জ্ঞানের সামগ্রিক জগতকে সুসংবদ্ধ ও যৌক্তিক উপায়ে বিন্যস্ত করার একটি পদ্ধতি। এর মূল লক্ষ্য হলো বিভিন্ন বিষয়, ধারণা ও তথ্যের মধ্যে বিদ্যমান সম্পর্ক চিহ্নিত করে সেগুলোকে একটি শ্রেণিবিন্যাসের অধীনে আনা। এটি কেবল গ্রন্থাগারেই নয়, বরং প্রতিটি জ্ঞানক্ষেত্রেই (যেমন – জীববিদ্যা, রসায়ন, ইতিহাস) ব্যবহৃত হয়, যেখানে ধারণাগুলোকে উচ্চ-থেকে-নিম্ন বা সাধারণ-থেকে-বিশেষ শ্রেণিতে ভাগ করা হয়। এর মাধ্যমে জ্ঞানের কাঠামো স্পষ্ট হয়, নতুন জ্ঞান সংযোজনে সুবিধা হয় এবং আন্তঃবিষয়ক সম্পর্ক স্থাপন সহজ হয়।
পুস্তক শ্রেণিকরণ (Book Classification):
পুস্তক শ্রেণিকরণ হলো গ্রন্থাগারের ভৌত বা ডিজিটাল উপকরণসমূহকে তাদের বিষয়বস্তু, আকার, ভাষা বা অন্যান্য বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী একটি নির্দিষ্ট স্কিম ব্যবহার করে সুবিন্যস্ত করা। এর প্রধান উদ্দেশ্য হলো গ্রন্থাগারের সংগ্রহকে ব্যবহারকারী-বান্ধব করে তোলা, যাতে সঠিক বই সঠিক স্থানে থাকে এবং সহজে খুঁজে পাওয়া যায়। এটি সাধারণত জ্ঞান শ্রেণিকরণের নীতিগুলোর উপর ভিত্তি করে তৈরি হয় কিন্তু এর বাস্তব প্রয়োগে বইয়ের ভৌত অবস্থানের উপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে গ্রন্থাগারের সম্পদ সঠিকভাবে সংগঠিত থাকে এবং ব্যবহারকারীরা দ্রুত তথ্য অ্যাক্সেস করতে পারেন।
বিভিন্ন ধরনের শ্রেণিকরণ স্কিমের নাম ও বৈশিষ্ট্য:
বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন ধরনের শ্রেণিকরণ স্কিম ব্যবহৃত হয়, যার প্রত্যেকটির নিজস্ব কাঠামো ও বৈশিষ্ট্য রয়েছে। নিচে কয়েকটি প্রধান স্কিমের নাম ও বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করা হলো:
-
ডিউই ডেসিমেল ক্লাসিফিকেশন (DDC - Dewey Decimal Classification):
- প্রবর্তন: মেলভিল ডিউই কর্তৃক ১৮৭৬ সালে প্রবর্তিত।
- কাঠামো: এটি একটি দশমিক শ্রেণিকরণ পদ্ধতি, যা জ্ঞানকে ১০টি প্রধান শ্রেণিতে (০-৯) বিভক্ত করে। প্রতিটি প্রধান শ্রেণি আবার ১০টি উপশ্রেণিতে বিভক্ত এবং এভাবে ডেসিমেল পয়েন্টের মাধ্যমে আরও সূক্ষ্মভাবে বিষয়বস্তুকে শ্রেণিকরণ করা হয়।
- বৈশিষ্ট্য: সরলতা, নমনীয়তা, সার্বজনীনতা এবং স্মারক গুণ। এটি বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও বহুল ব্যবহৃত শ্রেণিকরণ স্কিম। এর নোটেশন সংখ্যাভিত্তিক।
-
লাইব্রেরি অফ কংগ্রেস ক্লাসিফিকেশন (LCC - Library of Congress Classification):
- প্রবর্তন: ১৯০০ সালের দিকে যুক্তরাষ্ট্রের লাইব্রেরি অফ কংগ্রেস কর্তৃক তাদের নিজস্ব সুবিধার জন্য তৈরি।
- কাঠামো: এটি ২১টি প্রধান শ্রেণিতে (A-Z, I, O, W, X, Y বাদ দিয়ে) বিভক্ত, যা ইংরেজি বড় হাতের অক্ষর দ্বারা নির্দেশিত। প্রতিটি প্রধান শ্রেণি আবার অক্ষর ও সংখ্যার সমন্বয়ে গঠিত সাবডিভিশনে বিভক্ত।
- বৈশিষ্ট্য: LCC বিশেষ করে লাইব্রেরি অফ কংগ্রেসের বিশাল সংগ্রহকে দক্ষতার সাথে পরিচালনা করার জন্য ডিজাইন করা হয়েছিল। এটি DDC এর চেয়েও বেশি নির্দিষ্ট এবং একাডেমিক ও গবেষণা গ্রন্থাগারগুলোতে বেশি ব্যবহৃত হয়। এটি DDC-এর মতো সার্বজনীনতার চেয়ে নির্দিষ্টতা এবং ব্যাপকতাকে বেশি গুরুত্ব দেয়।
-
ইউনিভার্সাল ডেসিমেল ক্লাসিফিকেশন (UDC - Universal Decimal Classification):
- প্রবর্তন: পল ওটলেট এবং হেনরি লা ফন্টেন কর্তৃক DDC-এর ভিত্তিতে ১৯০৫ সালে প্রবর্তিত।
- কাঠামো: এটি DDC-এর মতো ১০টি প্রধান শ্রেণি ব্যবহার করে, তবে এর নোটেশন অনেক বেশি জটিল এবং বিস্তারিত। এটি বিভিন্ন যোজক চিহ্ন (যেমন +, :, /) ব্যবহার করে একাধিক বিষয়কে একটি শ্রেণিকরণে সংযুক্ত করতে পারে।
- বৈশিষ্ট্য: এটি DDC-এর একটি বর্ধিত ও আরও বিশ্লেষণাত্মক সংস্করণ। এটি গবেষণা গ্রন্থাগার এবং বিশেষায়িত তথ্য কেন্দ্রে বেশি ব্যবহৃত হয়, কারণ এটি আন্তঃবিষয়ক সম্পর্ককে দক্ষতার সাথে প্রকাশ করতে পারে। এটি আন্তর্জাতিক মানক সংস্থাগুলোতেও ব্যবহৃত হয়।
-
কোলন ক্লাসিফিকেশন (CC - Colon Classification):
- প্রবর্তন: এস. আর. রঙ্গনাথন কর্তৃক ১৯৩৩ সালে প্রবর্তিত।
- কাঠামো: এটি একটি বিশ্লেষণাত্মক-সিন্থেটিক বা ফ্যাসটেড (faceted) শ্রেণিকরণ পদ্ধতি। রঙ্গনাথন জ্ঞানের প্রতিটি বিষয়কে পাঁচটি মৌলিক বৈশিষ্ট্যের (PMEST - Personality, Matter, Energy, Space, Time) সমন্বয়ে বিভক্ত করেন।
- বৈশিষ্ট্য: CC তার ফ্যাসটেড কাঠামোর জন্য পরিচিত, যা ব্যবহারকারীকে নির্দিষ্ট বিষয়বস্তু অনুযায়ী নমনীয়ভাবে শ্রেণিকরণ তৈরি করতে দেয়। এটি ভারতের গ্রন্থাগারগুলোতে এবং কিছু বিশেষায়িত গবেষণা গ্রন্থাগারে ব্যবহৃত হয়। এর নোটেশন জটিল কিন্তু অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট।
DDC-স্কিমের standard sub-division এবং form class-গুলো কী?
DDC (Dewey Decimal Classification) স্কিমে Standard Subdivisions এবং Form Divisions (যা পূর্বে Form Classes নামে পরিচিত ছিল) হলো সহায়ক টেবিল যা প্রধান শ্রেণিবিন্যাসের বাইরে বিষয়বস্তুকে আরও বিশদভাবে বর্ণনা করতে ব্যবহৃত হয়। এগুলিকে "সাধারণ সহায়ক" (Common Auxiliaries) বলা হয় কারণ এগুলি যেকোনো DDC নম্বরের সাথে যুক্ত হতে পারে, যা বিষয়বস্তুর বিশেষ রূপ, বিন্যাস, ভৌগোলিক ক্ষেত্র, ঐতিহাসিক সময়কাল বা ভাষার মতো দিকগুলিকে নির্দেশ করে।
Standard Subdivisions (সাধারণ উপবিভাগ):
Standard Subdivisions (Table 1) হলো এমন কিছু সংখ্যাসূচক কোড যা একটি বিষয়ের ফর্ম, বিন্যাস, বা দৃষ্টিভঙ্গি বর্ণনা করে। এগুলি ডেসিমেল পয়েন্টের পর ০ (শূন্য) দিয়ে শুরু হয় এবং প্রধান DDC নম্বরের সাথে যুক্ত হয়। এর মাধ্যমে একই বিষয় বিভিন্ন রূপে উপলব্ধ হতে পারে তা বোঝানো হয়।
কিছু গুরুত্বপূর্ণ Standard Subdivisions নিচে দেওয়া হলো:
- 01 - দর্শন ও তত্ত্ব (Philosophy and theory): কোনো বিষয়ের মৌলিক ধারণা, দর্শন বা তত্ত্বগত আলোচনা বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। যেমন: 330.01 (অর্থনীতির দর্শন)।
- 02 - মিসেলানিয়া (Miscellany): বিভিন্ন ফর্মের বিষয়বস্তু (যেমন: কুইজ, রেসিপি, টিপস)।
- 03 - অভিধান, বিশ্বকোষ, কনকর্ডেন্স (Dictionaries, encyclopedias, concordances): কোনো বিষয়ের উপর ভিত্তি করে তৈরি অভিধান বা বিশ্বকোষ। যেমন: 610.3 (চিকিৎসাবিদ্যার বিশ্বকোষ)।
- 04 - নির্দিষ্ট বিষয়বস্তু সহ বিশেষ বিষয় (Special topics with specific content): নির্দিষ্ট গবেষণামূলক প্রবন্ধ বা বিভিন্ন উৎস থেকে সংগৃহীত বিষয়বস্তু।
- 05 - ক্রমিক প্রকাশনা (Serial publications): সাময়িকী, জার্নাল, বা পর্যায়ক্রমিক প্রকাশনা। যেমন: 505 (বিজ্ঞানের সাময়িকী)।
- 06 - সংস্থা ও ব্যবস্থাপনা (Organizations and management): কোনো বিষয়ের সাথে সম্পর্কিত সংস্থা, সমিতি বা তাদের ব্যবস্থাপনা। যেমন: 020.6 (গ্রন্থাগার সমিতির ব্যবস্থাপনা)।
- 07 - শিক্ষা, গবেষণা ও সংশ্লিষ্ট বিষয় (Education, research, related topics): কোনো বিষয়ের অধ্যয়ন, শিক্ষাদান বা গবেষণার পদ্ধতি। যেমন: 808.07 (রচনা শিক্ষার পদ্ধতি)।
- 08 - সংগ্রহ (Collections): কোনো বিষয়ের উপর বিভিন্ন লেখা বা উপকরণের সংগ্রহ। যেমন: 821.08 (ইংরেজি কবিতার সংকলন)।
- 09 - ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক চিকিৎসা, ব্যক্তি (Historical and geographical treatment, biography): কোনো বিষয়ের ঐতিহাসিক বিবর্তন, ভৌগোলিক অবস্থান বা এর সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জীবনী। যেমন: 940.09 (ইউরোপের ইতিহাসের ঐতিহাসিক পর্যালোচনা)।
Form Classes (বর্তমানে Form Divisions):
DDC-এর প্রথম সংস্করণগুলিতে 'Form Class' শব্দটি ব্যবহৃত হলেও, আধুনিক DDC সংস্করণগুলিতে এটিকে 'Form Divisions' বা আরও সাধারণভাবে 'Standard Subdivisions' এর অংশ হিসেবেই দেখা হয় (বিশেষত Table 1-এর ০৩, ০৫, ০৮)। 'Form' বা 'Form Class' সাধারণত সেই বিষয়বস্তুর বাহ্যিক বা উপস্থাপনার ধরন বোঝায়, বিষয়বস্তু কী তা নয়। উদাহরণস্বরূপ, একটি বিষয়ের অভিধান, বিশ্বকোষ, হ্যান্ডবুক, সাময়িকী বা সংকলন ইত্যাদি হলো এর ফর্ম।
ঐতিহাসিকভাবে, Form Divisions (যেমন 03 for dictionaries, 05 for serials, 08 for collections) সরাসরি বিষয়বস্তুর ফর্ম বা বিন্যাসকে নির্দেশ করত। বর্তমানে DDC এটিকে Table 1 (Standard Subdivisions) এর অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেছে। এর অর্থ হলো, DDC-তে "Form Class" বলতে আলাদা কোনো টেবিল বা শ্রেণি নেই; বরং এটি Standard Subdivisions-এর অন্তর্ভুক্ত কিছু নির্দিষ্ট এন্ট্রি, যা বিষয়বস্তুর উপস্থাপনা বা বিন্যাসকে নির্দেশ করে।
উদাহরণস্বরূপ, 03 (অভিধান), 05 (সাময়িকী) এবং 08 (সংগ্রহ) এর মতো Standard Subdivisions গুলিই মূলত পূর্বে ব্যবহৃত 'Form Classes' ধারণার আধুনিক প্রকাশ। এগুলি গ্রন্থাগারিকদের একটি নির্দিষ্ট বিষয়ের উপর উপলব্ধ বিভিন্ন ধরনের উপকরণ (যেমন - একটি অর্থনীতি বিষয়ক বিশ্বকোষ, বা পদার্থবিজ্ঞান বিষয়ক একটি মাসিক জার্নাল) সঠিকভাবে শ্রেণিকরণ করতে সহায়তা করে।