বাবর' শব্দের অর্থ সিংহ।
সম্রাট জাহাঙ্গীর ছিলেন ন্যায়বিচারক- উক্তিটি যথার্থ।
সম্রাট জাহাঙ্গীর মজলুম প্রজাদের অভিযোগ শুনে এর প্রতিবিধানের উদ্দেশ্যে আগ্রা দুর্গের শাহ বুরিজি থেকে যমুনা নদীর তীর পর্যন্ত একটি প্রস্তর স্তম্ভের ৩০ গজ লম্বা একটি ঘণ্টাযুক্ত 'ন্যায় শৃঙ্খল' টানিয়ে দেন। যে কোনো ব্যক্তি এই শিকল টেনে অভিযোগ বিষয়ে সম্রাটের দৃষ্টি আকর্ষণ করলে সম্রাট তার প্রতিকারের ব্যবস্থা করতেন। এভাবে তিনি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় ব্যবস্থা গ্রহণ করেন।
উদ্দীপকে উল্লিখিত কদম আলীর সাথে ভারতীয় উপমহাদেশের আফগান শাসক শেরশাহের শাসন ক্ষমতা দখলের মিল পাওয়া যায়।
মুঘল শাসনের ধারাবাহিকতায় একটি ছেদ টেনে শেরশাহ ১৫৪০ খ্রিস্টাব্দে ভারতে আফগান তথা শুর বংশের শাসনের সূত্রপাত করেন। নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যদিয়ে তিনি নিজ প্রতিভা, অধ্যবসায় ও পরিশ্রম দ্বারা সামান্য অবস্থা থেকে দিল্লির সিংহাসনে আরোহণ করেন। ক্ষমতা গ্রহণ করেই তিনি সাম্রাজ্যের উন্নতিকল্পে বহুমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। উদ্দীপকের কদম আলীর ক্ষেত্রেও এ বিষয়গুলো পরিলক্ষিত হয়। উদ্দীপকে আমরা দেখতে পাই যে, সরাইল উপজেলার চেয়ারম্যান পদে সামাদ পরিবার ঐতিহ্যগতভাবে বহু বছর ধরে নির্বাচিত হয়ে আসছে। হঠাৎ করে কদম আলী পরিবার ভাগ্যান্বেষণে সরাইলে এসে বসতি স্থাপন করে। কদম আলীর সহজ-সরল জীবনযাপন, সাহসিকতা, নীতি-নৈতিকতা, সত্যবাদিতা, বিচক্ষণতা ও চারিত্রিক মাধুর্য উপজেলাবাসীকে আকৃষ্ট করে। স্থানীয় জনগণ পরবর্তী নির্বাচনে তাকে বিপুল ভোটে চেয়ারম্যান নির্বাচিত করে। সামাদ পরিবারের ন্যায় ভারতীয় উপমহাদেশে মুঘল পরিবার বংশানুক্রমিক ক্ষমতা ভোগ করে আসছিল। আর কদম আলী পরিবারের মতোই শেরশাহও ১৫২৭খ্রিস্টাব্দের এপ্রিল মাসে ভাগ্যান্বেষণে ভারতীয় উপমহাদেশের আগ্রায় আসেন এবং মুঘল সম্রাট বাবরের অধীনে চাকরি নেন। পূর্বাঞ্চল অভিযানে বাবরকে সহায়তা করে তিনি মুঘল সম্রাটের বিশেষ প্রীতিভাজন হন। পরবর্তীতে তিনি ভারতবর্ষ থেকে মুঘলদের বিতাড়িত করতে নিজের শক্তি বৃদ্ধি করেন শেষ পর্যন্ত মুঘল সম্রাট হুমায়ূনকে প্রথমে চৌসার যুদ্ধে (১৫৩৯ খ্রি.) এবং পরে কনৌজের যুদ্ধে (১৫৪০ খ্রি.) পরাজিত করে মুঘল সাম্রাজ্যের পতন ঘটিয়ে তিনি ভারতবর্ষে নিজ শাসন প্রতিষ্ঠা করেন। তাই বলা যায়, উদ্দীপকের কদম আলীর মতো শেরশাহও তার তীক্ষ্ণ মেধা, অপরিমিত সাহস, আত্মবিশ্বাস ও বিচক্ষণতার মাধ্যমে ভারতীয় উপমহাদেশের শাসন ক্ষমতা গ্রহণ করেন।
উদ্দীপকের কদম আলীর চেয়ে উক্ত আফগান শাসক অর্থাৎ শেরশাহ প্রশাসনিক ক্ষেত্রে আরও বেশি বিচক্ষণ ও দূরদর্শী ছিলেন- উক্তিটি যথার্থ।
উদ্দীপকের কদম আলী উপজেলার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়ে উপজেলার আইন-শৃঙ্খলা, সুশাসন, জননিরাপত্তা, বিচার ও সালিশ ব্যবস্থার উন্নয়ন, রাস্তাঘাট নির্মাণ, রাজস্ব আদায়সহ সকল ক্ষেত্রে অসামান্য অবদান রাখেন। প্রশাসনিক ক্ষেত্রে কদম আলীর এ সকল কর্মকান্ডের চেয়ে আফগান শাসক শেরশাহ আরও বেশি বিচক্ষণ ও দূরদর্শী ছিলেন। কেননা তিনি তার প্রশাসন ব্যবস্থায় উল্লিখিত পদক্ষেপগুলো গ্রহণের পাশাপাশি শাসনব্যবস্থাকে সুসংহত করতে আরও বেশি কৃতিত্বের পরিচয় দেন।
উদ্দীপকের কদম আলীর চেয়ে প্রশাসনিক ক্ষেত্রে শেরশাহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। তিনি ভারতের প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় শাসনপ্রণালির শ্রেষ্ঠ নীতিগুলো গ্রহণ করে একটি যুগোপযোগী ও ন্যায়সংগত শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলেন। তিনি সুষ্ঠুভাবে প্রশাসনিক ব্যবস্থা পরিচালনার স্বার্থে কেন্দ্রীয় সরকারকে দিউয়ান-ই-উযারত, (সরকারি আয়-ব্যয় নিয়ন্ত্রণ), দিউয়ান-ই-আরজ, (সেনাবাহিনী তত্ত্বাবধান) দিউয়ান-ই-রিসালাত (পররাষ্ট্র সংক্রান্ত কাজ তদারকি) এবং দিউয়ান-ই-ইনশা (সরকারি আদেশ-নির্দেশ জারি ও যোগাযোগ সংক্রান্ত কাজ)-এ চারটি প্রধান ভাগে বিভক্ত করেন। এছাড়া শাসনকাজের সুবিধার জন্য প্রশাসনে বিকেন্দ্রীকরণ নীতি গ্রহণ করে সাম্রাজ্যে প্রাদেশিক ও আঞ্চলিক শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলেন। তিনি তার সাম্রাজ্যকে 'সরকার' নামক ৪৭টি প্রশাসনিক ইউনিটে ভাগ করেন। প্রতিটি সরকারকে তিনি কয়েকটি পরগনায় বিভক্ত করেন। এভাবে শেরশাহ সাম্রাজ্যের সংহতি বিধানে একটি সুনিয়ন্ত্রিত ও শক্তিশালী প্রশাসনব্যবস্থা গড়ে তোলেন। আর এ বিষয়গুলো উদ্দীপকের কদম আলীর ক্ষেত্রে অনুপস্থিত।
উপর্যুক্ত আলোচনায় দেখা যায় যে, শেরশাহ প্রশাসনিক ক্ষেত্রে বাস্তবধর্মী এবং যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে উদ্দীপকের কদম আলীর চেয়ে অনেক বেশি বিচক্ষণতা ও দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছেন।
Related Question
View Allহুমায়ুন অর্থ ভাগ্যবান।
'মোজা' শব্দ থেকে মোঙ্গল এবং মোঙ্গল থেকে মুঘল নামের উৎপত্তি ঘটেছে। তারা আদি বাসভূমি মঙ্গোলিয়া ছেড়ে মধ্য এশিয়ার পশ্চিম অঞ্চলে বসতি স্থাপন করে মুঘল নামে পরিচিতি লাভ করে। ১৫২৬ খ্রি. মুঘলরা ভারতের সুলতান ইব্রাহিম লোদিকে পরাজিত করে ভারতবর্ষের শাসক হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করেন। মূলত এরপর থেকেই মুঘলরা একটি বৃহৎ জাতিগঠনে অবদান রাখতে শুরু করে।
উদ্দীপকের সাথে ভারতবর্ষের মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা জহির উদ্দিন মুহাম্মদ বাবরের মিল খুঁজে পাওয়া যায়।
১৪৯৪ খ্রিষ্টাব্দে পিতার আকস্মিক মৃত্যুর পর মাত্র ১১ বছর বয়সে বাবর ফারগানার সিংহাসনে উপবিষ্ট হন। সিংহাসন লাভের পর পরই তার দুই পিতৃব্য ও আত্মীয়স্বজন এবং উজবেক নেতা সাইবানি খানের রিরোধিতার মুখে পড়েন। ১৪৯৭ খ্রিস্টাব্দে বাবর সমরখন্দ দখল করেন। কিন্তু ভাগ্যবিপর্যয়ে পতিত হয়ে তিনি সমরখন্দ হারান। ১৪৯৮ খ্রিস্টাব্দে ফারগানাও হস্তচ্যুত হয়। অর্থাৎ দাবার ছকের রাজার মতো বাবর স্থান থেকে স্থানান্তর ঘুরে বেড়াতে লাগলেন। কিন্তু ১৫০০ খ্রিস্টাব্দে তিনি ফারগানা পুনরুদ্ধার করেন।
১৫০২ খ্রিস্টাব্দে সমরখন্দ অধিকার করেন। পরবর্তীকালে ১৫০৩ খ্রিষ্টাব্দে আরচিয়ানের যুদ্ধে সাইবানি খানের কাছে পরাজিত হয়ে ফারগানা ও সমরখন্দ থেকে বিতাড়িত হন। এ সময় কাবুলের অভ্যন্তরীণ অরাজকতার সুযোগে ১৫০৪ খ্রিস্টাব্দে কাবুল অধিকার করে বাদশাহ উপাধি নিয়ে রাজত্ব করতে থাকেন। ১৫১১ খ্রিস্টাব্দে পারস্যের শাহ ইসমাইল সাফাভীর সহযোগিতায় সমরখন্দ দখল করলেও ১৫১২ খ্রিস্টাব্দে তা আবারও হাতছাড়া হয়ে যায়। এরপর ১৫২৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত তিনি কাবুলেই রাজত্ব করেন। কিন্তু অসাধারণ সাহসী বাবর এতেই সন্তুষ্ট থাকেননি। ১৫২৬ খ্রি. তিনি পানিপথের প্রথম যুদ্ধে সুলতান ইব্রাহিম লোদিকে পরাজিত করে দিল্লির সুলতানি সাম্রাজ্যের ধ্বংসস্তূপের ওপর মুঘল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন।
তাই বলা যায়, উদ্দীপকের ভাগ্য বিড়ম্বিত যুবুক ইরফান ও ভারতবর্ষে মুঘল শাসনের প্রতিষ্ঠাতা বাবরই অধিক সাদৃশ্যপূর্ণ।
উদ্দীপকে সম্রাট বাবরের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে।
সম্রাট বাবর কেবল নির্ভীক সৈনিক, দক্ষ সেনাধ্যক্ষ, সুদক্ষ অস্ত্র পরিচালক, প্রশংসনীয় ঘোড়সওয়ারই ছিলেন না; বরং আলেকজান্ডারের মতো দেশ জয়ের নেশায় বিভোর থাকতেন। পানিপথের প্রথম যুদ্ধ, খানুয়ার যুদ্ধ এবং গোগরার যুদ্ধে তার সাফল্য তাকে ভারতীয় সমর ইতিহাসে উচ্চাসনে- অধিষ্ঠিত করেছে। বাবর মাত্র ১১ বছর বয়স থেকে নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হন। বাধাবিপত্তি অতিক্রম করে তিনি প্রথমে কাবুলে এবং পরে ভারতবর্ষে মুঘল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন। শুধু প্রতিষ্ঠা করেই ক্ষান্ত হননি, তার ভিত্তি সুদৃঢ় করে একে একটি শক্তিশালী সাম্রাজ্যে পরিণত করেন।
বাবরের চার বছরের শাসনামলে যুদ্ধবিগ্রহ কেটে যায়। এ অবস্থায় নবপ্রতিষ্ঠিত মুঘল সাম্রাজ্যের শাসনব্যবস্থায় কোনো প্রকার পরিবর্তন ও সংস্কার সাধন করা তার পক্ষে সম্ভব হয়নি। তথাপি তিনি নিজেকে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা হ্রাস করেন। প্রাদেশিক শাসনকার্য পরিচালনার জন্য প্রত্যেক প্রদেশে একজন ওয়ালি (প্রাদেশিক কর্মকর্তা), একজন দিওয়ান (রাজস্ব কর্মকর্তা), শিকদার (সামরিক কর্মকর্তা) এবং কোতওয়াল (নগরকর্তা) ছিল। তিনি প্রশাসনিক কাজে তুর্কি, আফগান ও হিন্দুদের সমান সুযোগ দিতেন। সমগ্র সাম্রাজ্যে ১৫ মাইল অন্তর তিনি ডাক চৌকির ব্যবস্থা করেন। প্রজারঞ্জক বাবর দিল্লি ও আগ্রায় ২০টি উদ্যান, বহু পাকা নর্দমা, সেতু, অট্টালিকা নির্মাণ করেন।
পরিশেষে বলতে পারি, সম্রাট বাবর শুধুমাত্র একজন বিজেতা হিসেবেই প্রশংসার দাবিদার নন, বরং একজন দক্ষ প্রশাসক হিসেবেও তিনি কৃতিত্বের দাবিদার। তাই সার্বিকভাবে বাবরের শাসনকাল কৃতিত্বপূর্ণ একথা নিঃসন্দেহেই বলা যায়।
দিল্লির সর্বশেষ সুলতানের নাম ফিরোজশাহ তুঘলক।
ফিরোজশাহ তুঘলক দিওয়ান-ই-বন্দেগান গঠন করেন কারণ, তিনি ছিলেন ক্রীতদাসদের প্রতি অনুরক্ত। তাই তিনি সিংহাসনে আরোহনের পর একটি বিরাট ক্রীতদাস বিভাগ গড়ে তোলেন। তার আমলে ক্রীতদাসের সংখ্যা ছিল ১,৮০,০০০, যার মধ্যে ৪০,০০০ ক্রীতদাস সুলতানের প্রাসাদে অবস্থান করত। সুলতান তাদের বিভিন্ন সেবা ও সুযোগ-সুবিধার জন্যই 'দিওয়ান-ই-বন্দেগান' গঠন করেন।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!