'ডেভিড কপারফিল্ড' গল্পে মাত্র ছয় মাস বয়সে ডেভিড তার বাবাকে হারায়। ছোটবেলা থেকেই সে ছিল অনুভূতিশীল ও কল্পনাপ্রবণ। বাবার মৃত্যুর পর মা ক্লারার সঙ্গে ডেভিডের দিনগুলো ভালোই কাটছিল। কিন্তু তার মা যখন মার্ডস্টোন নামের নিষ্ঠুর স্বভাবের লোকটিকে বিয়ে করেন তখন থেকেই তার জীবনে নেমে আসে অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্ট। মার্ডস্টোনের সঙ্গে ডেভিডদের বাসায় স্থায়ীভাবে বাস করতে আসে মার্ডস্টোনের বোন। তারা দুজনেই ছিল বদমেজাজি। ডেভিড প্রথমে তার মায়ের কাছেই পড়ত। কিন্তু সৎবাবা মার্ডস্টোন পড়ানোর ব্যাপারট। নিজের হাতে নেওয়ার জন্য উৎসাহী হয়ে ওঠেন। তিনি ডেভিডের ওপর বিরূপ আচরণ করতেন, তাই সে তাকে দেখলেই সব পড়া ভুলে যেত। মায়ের কাছে পড়া বলার সময় কোথাও আটকে গেলে তার মা তাকে আদর করে চেষ্টা করার জন্য বলতেন। কিন্তু মার্ডস্টোন তেমনটা না করে বিরক্ত হয়ে যেতেন, যাতে ডেভিডের মন খারাপ হয়ে যেত। আবার ঠিকমতো পড়া দিতে পারলেও সে মার্ডস্টোনের মন পেত না, বরং তিনি তাকে কঠিন অঙ্ক কষতে দিতেন। একদিন তিনি একটি বেত নিয়ে ডেভিডের ওপর অত্যাচার করেন। বেত দিয়ে ডেভিডকে অনেকক্ষণ আঘাত করার পর ডেভিড যখন আর সহ্য করতে পারছিল না, তখন সে মার্ডস্টোনের হাতে কামড় বসিয়ে বাঁচতে চেষ্টা করে। পরে তিনি তাকে আরও বেশি করে বেত দিয়ে নির্মম আঘাত করেন। মারতে মারতে যখন ক্লান্ত হয়ে পড়েন, তখন একটি ঘরে ডেভিডকে তালা লাগিয়ে আটকে রাখেন। এভাবেই মার্ডস্টোন ডেভিডের ওপর নিষ্ঠুর আচরণ করেন।
Related Question
View Allমাত্র ছয় মাস বয়সে পিতাকে হারানো ডেভিডের জীবন তার মায়ের সঙ্গে সুখেই অতিবাহিত হচ্ছিল। বাড়ির কাজের মেয়ে পেগোটি ও মায়ের সঙ্গে অতিবাহিত করা ডেভিডের ছিমছাম সুখের জীবনে প্রথম ধাক্কা আসে আট বছর বয়সে। ডেভিডের যখন আট বছর বয়স তখন তার মা আবার বিয়ে করেন। ডেভিডের সৎবাবা মার্ডস্টোন সাহেব ছিলেন দশাসই পুরুষ; তার মস্ত জুলফি, পুরু গোঁফ এবং জোড়া ভুরু। তাকে দেখে প্রথম থেকেই ডেভিডের নিজের মানুষ বলে মনে হয়নি। মার্ডস্টোনের সঙ্গে তার বোনও ডেভিডদের সঙ্গে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে আসেন। কড়া মেজাজের এই দুজন মানুষ ডেভিডের জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে।
তাই বলা যায়, ডেভিডের সুখের জীবনে প্রথম ধাক্কা আসে তার আট বছর বয়সে মায়ের দ্বিতীয় বিয়ের পর।
ধৈর্য ও সংগ্রামশীলতার মধ্য দিয়েই মানুষকে টিকে থাকতে হয়, কারণ মানুষের জীবনযাত্রা সব সময় সহজ ও নির্বিঘ্ন নয়। জীবনের প্রতিটি ধাপে মানুষকে নানা ধরনের প্রতিযোগিতা, বিপদ ও বাধার সম্মুখীন হতে হয়। এসব প্রতিবন্ধকতা মোকাবিলা করতে ধৈর্য ও সংগ্রামের প্রয়োজন অপরিহার্য। 'ডেভিড কপারফিল্ড' গল্প থেকে আমরা এ শিক্ষা গ্রহণ করতে পারি।
'ডেভিড কপারফিল্ড' গল্পটি গড়ে উঠেছে ডেভিড নামের এক বালকের জীবনকাহিনিকে কেন্দ্র করে। মাত্র ছয় মাস বয়সে বাবাকে হারানো ডেভিড মায়ের সঙ্গে বেশ স্বাচ্ছন্দ্যেই জীবন পার করছিল। কিন্তু তার আট বছর বয়সে মায়ের দ্বিতীয় বিয়ের পর থেকে তার জীবনে শুরু হয় দুঃখের রাত। তার কড়া মেজাজের সৎবাবা দুর্বিষহ করে তোলে তার জীবন। মায়ের কোল ঘেঁষে যে পড়া ডেভিড নিমিষেই বলে দিতে পারত, সৎবাবার সামনে পড়লে তা নিমিষেই ভুলে যেত। ডেভিডের ওপর তার সৎবাবা দিনের পর দিন অত্যাচার করে যেতে থাকে। এক্ষেত্রে তার মা হয়ে পড়েন অসহায়। ডেভিড ধৈর্য ধরে সব সয়ে যায়। একপর্যায়ে লন্ডনের একটি আবাসিক স্কুল সালেম হাউসে ভর্তি করিয়ে ডেভিডকে বাড়িছাড়া করে দেওয়া হয়। জনাকীর্ণ লন্ডন শহরে ডেভিড হয়ে পড়ে একা ও নিঃসঙ্গ। তবু সে ধৈর্য হারায়নি। জীবনের সমস্ত প্রতিকূলতাকে মেনে নিয়ে জীবনকে চালিয়ে নিতে চেয়েছে। বাড়িতে সৎবাবার নিপীড়নের সম্মুখীন হওয়া ডেভিড সালেম হাউসে গেলে সেখানেও নিপীড়নের সম্মুখীন হয়। তবে সেখানে সে একজন হৃদয়বান মানুষের দেখা পায়। তিনি ছিলেন ডেভিডের নিরীহ শিক্ষক মেল সাহেব। তবে সালেম হাউসে কিছু মন্দ স্বভাবের অধিকারী মানুষের জন্য মেল সাহেবকে সেখান থেকে বিতাড়িত হতে হয়।
লন্ডনের আবাসিক স্কুল সালেম হাউসের একজন নিরীহ শিক্ষক মেল সাহেব। লন্ডন শহরে এসে এই একটি মানুষকে হৃদয়বান মনে হয়েছে ডেভিডের। সালেম হাউসের শিক্ষক হলেও মেল সাহেব ছিলেন হতদরিদ্র। এমনকি তার মা একটি দাতব্যালয়ে থেকে জীবিকা নির্বাহ করেন। স্কুলের ছাত্র স্টিরফোর্ড মেল সাহেবকে ভিক্ষুক বলে অপমান করে। তার মায়ের কথা স্টিরফোর্ড জানতে পারে ডেভিডের কাছ থেকে। মেল সাহেবের মায়ের দাতব্যালয়ে অন্যের আশ্রয়ে বেঁচে থাকার কথা জানাজানি হলে সালেম হাউসের মানহানি হবে বলে সালেম হাউসের দায়িত্বরত ক্রিকল সাহেব মেল সাহেবকে সেখান থেকে অব্যাহতি নিয়ে চলে যেতে বলেন। মেল সাহেব তখনই সেখান থেকে বেরিয়ে পড়েন। মূলত মেল সাহেবের মা দাতব্যালয়ে থাকার কারণে তাকে সালেম হাউস থেকে বের করে দেওয়া হয়।
চার্লস ডিকেন্সের জনপ্রিয় উপন্যাস 'ডেভিড কপারফিল্ড'-এর বাংলা অনুবাদ করেন আখতারুজ্জামান ইলিয়াস। তাঁর অনুবাদকৃত গ্রন্থ থেকে আলোচ্য অংশটি গ্রহণ করা হয়েছে। গল্পটিতে দেখা যায়, ডেভিডের সৎবাবা মার্ডস্টোন একদিন তার মুখ চেপে ধরে তাকে বেত্রাঘাত করতে থাকে। ডেভিড সহ্য করতে না পেরে একপর্যায়ে তার সৎবাবার বুড়ো আঙুলটি কামড়ে দেয়। পরে ডেভিডকে লন্ডনের আবাসিক স্কুল সালেম হাউসে পাঠিয়ে দেওয়া হলে সেখানেও তার সৎবাবা মার্ডস্টোনের নির্দেশে ডেভিডকে উদ্দেশ্য করে একটি বোর্ডে লিখে দেওয়া হয়, 'সাবধান এটা কামড়ায়'।
'ডেভিড কপারফিল্ড' হচ্ছে একজন বালকের জীবনের করুণ কাহিনি। পিতৃহারা এই বালকের নাম ডেভিড। মা ক্লারা এবং বাড়ির কাজের মেয়ে পেগোটির সঙ্গে খুব যায়েই জীবন কাটছিল তার। কিন্তু ডেভিডের আট বছর বয়সে মা দ্বিতীয় বিয়ে করলে তার জীবনের করুণ কাহিনি শুরু হয়। কড়া মেজাজের সৎবাবা মার্ডস্টোন সাহেবকে দেখে বালক ডেভিড সর্বদা শঙ্কিত হয়ে পড়ত। যে পড়া সে মায়ের কাছে অবলীলায় বলে দিতে পারত, মার্ডস্টোন ও তার বোন সামনে থাকলে সেই পড়া ডেভিড নিমিষেই ভুলে যেত। পড়া না পারার কারণে ডেভিডের সৎবাবা তার ওপর অত্যাচার করতে শুরু করেন। একদিন হঠাৎ ডেভিডের মুখ চেপে ধরে পিঠে বেত্রাঘাত করতে থাকেন মার্ডস্টোন। ডেভিড সহ্য করতে না পেরে তার মুখে চেপে ধরা মার্ডস্টোনের বুড়ো আঙুল সে কামড়ে দেয়। তারপরেই তার জীবনে নেমে আসে অবর্ণনীয় নির্যাতন। একটি অন্ধকার ঘরের মধ্যে তাকে পাঁচ দিন আটকে রাখা হয়। এখানেই শেষ নয়। তারপর তাকে লন্ডনের একটি আবাসিক স্কুলে পাঠিয়ে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করে অনেকটা নির্বাসিত করা হয়। লন্ডনের আবাসিক স্কুল সালেম হাউসে শিক্ষক মেল সাহেবের সঙ্গে যাওয়ার সময় ডেভিড লক্ষ করে সেখানে একটি সাইনবোর্ডে সুন্দর করে লেখা আছে, 'সাবধান এটা কামড়ায়'। পাশে কোনো কুকুর আছে ভেবে সে দাঁড়িয়ে পড়লে মেল সাহেব তাকে জানান যে, এখানে কোনো কুকুর নেই বরং কুকুর বলা হয়েছে তোমাকেই। শুধু তাই নয়, ডেভিডের সৎবাবা নির্দেশ দিয়েছেন যেন এই সাইনবোর্ডটা ডেভিডের পিঠের সঙ্গে আটকে দেওয়া হয়। মেল সাহেবের অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাকে সেটা করতে হয়। সৎবাবার এমন কর্মকাণ্ডে ডেভিড একেবারে দমে যায়, লজ্জায় ও ভয়ে কুঁকড়ে যেতে থাকে সে।
তাই বলা যায়, 'ডেভিড কপারফিল্ড' গল্পে বালক ডেভিডের জীবনে তার সৎবাবা যে উৎপাত শুরু করে তারই নিদর্শন এই সাইনবোর্ডটি। অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে সৎবাবার আঙুল কামড়ে দেওয়ায় ডেভিডকে তুলনা করা হয়েছে কুকুরের সঙ্গে। লন্ডনের মতো জনাকীর্ণ শহরেও একাকী ডেভিডের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলতে তার সৎবাবা মার্ডস্টোন সাইনবোর্ডে লিখে দেন- 'সাবধান এটা কামড়ায়'।
সৎবাবা মার্ডস্টোনের বেত্রাঘাত সহ্য করতে না পেরে একবার ডেভিড তার আঙুল কামড়ে দেয়। এটাই তার জীবনের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। বাড়ি থেকে নির্বাসিত হয়েও তার মুক্তি মেলেনি। লন্ডনের সালেম হাউসে চলে যাওয়ার পরেও মার্ডস্টোনের নির্দেশে তার পিঠে এঁটে দেওয়া হয় 'সাবধান এটা কামড়ায়' লেখা একটি সাইনবোর্ড। লজ্জায়, দুঃখে ও ভয়ে ডেভিড কুঁকড়ে যেতে থাকলেও তার করার কিছুই ছিল না। তার পিঠে সাইনবোর্ড দেখে অনেকে তাকে খ্যাপাত, অনেকে ভয় পেত, আবার কেউ কেউ বুনো মানুষের মতো নাচতে নাচতে কুকুর কুকুর বলে চিৎকার করত। তবে স্কুলের বেশিরভাগ ছেলেই তেমন কোনো উৎপাত করেনি। এভাবেই পিঠে সাইনবোর্ড ধারণ করে অতিবাহিত হচ্ছিল ডেভিডের জীবন। তবে স্কুলের শিক্ষক ক্রিকল সাহেব একদিন ডেভিডকে বেদম প্রহার করতে গিয়ে লক্ষ করেন পিঠে সাঁটা ওই সাইনবোর্ডের কারণে বেতের বাড়ি ঠিক জুতমতো লাগানো যাচ্ছে না। তাই ক্লাসেই ক্লিকল সাহেব ডেভিডের পিঠ থেকে সাইনবোর্ডটি খুলে নেন।
সৎবাবা মার্ডস্টোনের আঙুল কামড়ে দেওয়ার পর ডেভিডকে বাড়ি ছেড়ে লন্ডন শহরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। লন্ডনে জনসমুদ্রের ঢেউ থাকলেও ডেভিডের আপন বা কাছের বলতে কেউ ছিল না। তাই লন্ডনের মতো জনাকীর্ণ শহরেও ডেভিড একা হয়ে পড়ে।
বাড়ির কাজের মেয়ে পেগোটি ও মায়ের সঙ্গে আরামেই দিন যাচ্ছিল বালক ডেভিডের। কিন্তু তার মায়ের দ্বিতীয় বিয়ের পরপরই তার জীবনের করুণ ইতিহাস শুরু হয়। সৎবাবা মার্ডস্টোন দিনের পর দিন অত্যাচার করতে থাকে তার ওপর। একদিন প্রহার সহ্য করতে না পেরে মার্ডস্টোনের আঙুল কামড়ে দিলে তার জীবন হয়ে পড়ে দুর্বিষহ। তাকে পাঁচদিন একটা অন্ধকার ঘরে আটকে রাখা হয়। পেগোটির মাধ্যমে সে জানতে পারে লন্ডনের একটি আবাসিক স্কুলে ভর্তি করিয়ে তাকে বাড়ি থেকে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। তার কাছের মানুষ পেগোটি ও মা ক্লারাকে ছেড়ে ঘোড়ার গাড়িতে করে যাত্রা করে ডেভিড। চোখের পানিতে রুমাল ভিজে যায় তার। আধমাইল পেরিয়ে গাড়ি থামলে পেগোটি এসে তাকে জড়িয়ে ধরে। ডেভিডকে সে একটি কাগজের টুকরোর সঙ্গে কিছু টাকা দেয়। তারপর সে লন্ডনগামী কোচে উঠে পড়ে। ঘোড়ায় টানা সেই কোচে রাতটা আরামে কাটেনি ডেভিডের। কারণ তার দুপাশে দুজন সারা রাত তার ঘাড়ে মাথা রেখে ঘুমিয়েছে। পরের দিন সকাল হতেই সে লন্ডনে পৌঁছে যায়। সবার স্বপ্নের শহর লন্ডন। ডেভিডেরও স্বপ্নের শহর ছিল। কিন্তু লন্ডন শহরে পৌছানোর পরে ডেভিডের মনে হয়েছে সে একেবারে একা। রবিনসন ক্রুসোর চাইতেও একা। কারণ রবিনসন ক্রুসো একা ছিল একটি নির্জন দ্বীপে। সেখানে কেউ তার একাকিত্ব দেখেনি। কিন্তু ডেভিড একা হয়ে পড়েছে লন্ডনের মতো জনাকীর্ণ শহরে। ডেভিডের একাকিত্ব ও নিঃসঙ্গতা যেন সবাই প্রত্যক্ষ করেছে। মূলত লন্ডন শহরে লোকে লোকারণ্য হলেও ডেভিডের খোঁজ নেওয়ার মতো বা তার সঙ্গে কথা বলার মতো কেউ ছিল না। তাই সে একেবারে একা হয়ে পড়ে।
পরিশেষে বলা যায়, লন্ডনের মতো বড়ো শহরে পর্যাপ্ত জনসমাগম থাকলেও সবাই ব্যস্ত জীবনযাপন করে। কেউ কারও খোঁজ নেয় না। তাই অপরিচিত ডেভিডের দিকে তাকানোর সময় কারও নেই। বাড়িতে কাছের মানুষ মা ও পেগোটিকে ছেড়ে গিয়ে অপরিচিত লন্ডন শহরে ডেভিড তাই একা হয়ে পড়ে।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!