উত্তরঃ
ড. এস. আর. রঙ্গনাথন প্রণীত গ্রন্থাগার বিজ্ঞানের পঞ্চনীতি (Five Laws of Library Science) বিশ্বের সকল আধুনিক গ্রন্থাগার ব্যবস্থার মূল ভিত্তি। এই নীতিগুলো বাহ্যিকভাবে পাঠককে সুবিধা প্রদানের উদ্দেশ্যে প্রণীত হলেও, গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে প্রতীয়মান হয় যে এগুলো মূলত গ্রন্থাগারিকদের কর্মপন্থা, দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনের দিকনির্দেশনা হিসেবে কাজ করে। এই নীতিগুলো মেনে চললে গ্রন্থাগারিকরা কার্যকরভাবে গ্রন্থাগার পরিচালনা করতে পারেন এবং এর মাধ্যমে পাঠকরা সর্বোচ্চ সুবিধা লাভ করেন।
প্রথম নীতি, "বই ব্যবহারের জন্য", গ্রন্থাগারিককে অনুপ্রাণিত করে যাতে তিনি বইগুলোকে কেবল সংগ্রহশালায় জমা না রেখে পাঠকের কাছে সহজে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। এর জন্য গ্রন্থাগারিককে উন্মুক্ত প্রবেশাধিকার (Open Access) নিশ্চিত করা, গ্রন্থাগারের সময়সীমা বৃদ্ধি করা এবং পাঠকদের জন্য একটি আরামদায়ক পরিবেশ তৈরি করা জরুরি। দ্বিতীয় নীতি, "প্রত্যেক পাঠককে তার বই দাও", গ্রন্থাগারিকের দায়িত্বকে নির্দেশ করে যে তিনি যেন প্রতিটি পাঠকের চাহিদা ও আগ্রহ অনুযায়ী সঠিক বইটি খুঁজে বের করতে সাহায্য করেন। এর জন্য গ্রন্থাগারিককে সংগ্রহ উন্নয়ন (Collection Development), রেফারেন্স সেবা প্রদান এবং পাঠকের প্রয়োজন উপলব্ধি করার ক্ষেত্রে সুদক্ষ হতে হয়।
তৃতীয় নীতি, "প্রত্যেক বইয়ের জন্য তার পাঠক", গ্রন্থাগারিককে নির্দেশ করে যে প্রতিটি বই যেন তার সঠিক পাঠকের কাছে পৌঁছায়। এর জন্য গ্রন্থাগারিককে বইগুলোর সঠিক শ্রেণিকরণ (Classification), ক্যাটালগিং (Cataloguing) এবং শেল্ফিং (Shelving) এর ব্যবস্থা করতে হয়, যাতে পাঠকরা সহজেই তাদের প্রয়োজনীয় বই খুঁজে পান। এছাড়াও, নতুন বই প্রদর্শন, বইমেলা আয়োজন এবং পাঠকদের সাথে বইয়ের সংযোগ স্থাপনে গ্রন্থাগারিকের ভূমিকা অপরিহার্য। চতুর্থ নীতি, "পাঠকের সময় বাঁচাও", গ্রন্থাগারিকের দক্ষতা ও ব্যবস্থাপনার উপর জোর দেয়। এই নীতি অনুযায়ী, গ্রন্থাগারিককে এমন ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হয় যাতে পাঠক দ্রুত তার কাঙ্ক্ষিত তথ্য বা বই পেতে পারে। এর জন্য আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার, সহজ ক্যাটালগিং সিস্টেম এবং দ্রুত তথ্য পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা গ্রন্থাগারিকের অন্যতম দায়িত্ব।
পঞ্চম নীতি, "গ্রন্থাগার একটি ক্রমবর্ধমান জীব", গ্রন্থাগারিককে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত থাকতে এবং গ্রন্থাগারকে সর্বদা সজীব ও আধুনিক রাখতে উৎসাহিত করে। এই নীতি গ্রন্থাগারিককে নতুন বই সংগ্রহ করা, অপ্রচলিত বই বাদ দেওয়া (Weeding), প্রযুক্তির সাথে তাল মিলিয়ে নতুন সেবা চালু করা এবং গ্রন্থাগারের ভৌত ও ডিজিটাল সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করতে নির্দেশনা দেয়। এভাবেই গ্রন্থাগার বিজ্ঞানের পঞ্চনীতি সরাসরি গ্রন্থাগারিকদের কর্মপরিধি, নীতিগত সিদ্ধান্ত এবং ব্যবহারিক দায়িত্ব পালনে পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করে, যার ফলস্বরূপ পাঠকরা একটি সমৃদ্ধ ও কার্যকর গ্রন্থাগার সেবার সুবিধা লাভ করেন।