'একং সুদ বিপ্রা বহুধা বদন্তি'- অর্থ হচ্ছে, এক ব্রহ্মকেই মনীষীরা বিভিন্ন নামে ও রূপে অভিহিত করেন।
শ্রীচৈতন্য প্রবর্তিত প্রেমভক্তির ধর্মটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রচার করার মানসে ১৯৬৬ সালের জুলাই মাসে নিউইয়র্ক শহরে শ্রীল এ.সি. ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ (ISKCON) প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি বৈষ্ণব ধর্মের পরিপোষক। শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা, শ্রীমদ্ভাগবদ, শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত ইত্যাদি ধর্মগ্রন্থের ইংরেজি ভার্সন প্রকাশ করেন। তাঁর রচিত গ্রন্থের সংখ্যা প্রায় ৮০টি। বৈরাগ্যময় জীবনে এ সংগঠনের মাধ্যমে প্রভুপাদ সমাজ জীবন থেকে বিভিন্ন প্রকার পাপকর্ম দূর করতে সচেষ্ট হন। তাঁর অনুশীলিত 'হরে কৃষ্ণ' মহামন্ত্র কীর্তন জীবের মুক্তিলাভের অবলম্বন হয়ে জগতে নাম মাহাত্ম্য প্রচার করছে।
গীতা আমাদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াবার প্রেরণা দেয়। কারণ স্বয়ং ভগবানই যুগে যুগে দুষ্টের দমন, শিষ্টের পালন এবং ধর্ম রক্ষার জন্য পৃথিবীতে অবতার রূপে নেমে আসেন। তিনি বলেছেন-
যদা যদা হি ধর্মস্য গ্লানির্ভবতি ভারত।
অভ্যুত্থানমধর্মস্য তদাত্মানং সৃজম্যহম্।
পরিত্রাণায় সাধুনাং বিনাশায় চ. দুষ্কৃতাম্।
ধর্মসংস্থাপনার্থায় সম্ভবামি যুগে যুগে। গীতা- ৪/৭-৮
অর্থাৎ যখনই ধর্মের অধঃপতন হয় এবং অধর্মের অভ্যুত্থান ঘটে, তখনই সাধুদের পরিত্রাণ, দুষ্টলোকদের বিনাশ এবং ধর্ম সংস্থাপন করার জন্য আমি এ পৃথিবীতে অবতীর্ণ হই।
আত্মার ধ্বংস নেই। গীতার এই শিক্ষা আমাদের মৃত্যুকে ভয় না করে ভালো কাজে এগিয়ে যাওয়ার সাহস যোগায়। গীতায় বলা হয়েছে- ১. শ্রদ্ধাবান ও সংযমীই জ্ঞানলাভে সমর্থ হয়। ২. অনাসক্ত কর্মযোগী মোক্ষ লাভ করেন। ৩. জ্ঞানীভক্তই তাঁকে হৃদয়ে অনুভব করেন এবং ৪. এই বিশাল বিশ্বে যা কিছু আছে সবই ঈশ্বরের মধ্যে বিদ্যমান। গীতার এই কথা থেকে আমরা শ্রদ্ধা ও সংযম সাধনার দিকে মনোনিবেশ করি। জাগতিক বিষয়ের প্রতি নির্মোহ হওয়ার প্রেরণা পাই। ধর্ম অনুশীলনের কাজে বিচারে প্রবৃত্ত হই অর্থাৎ অর্থহীন গতানুগতিক পথ পরিহার করে তত্ত্বের মর্মার্থ বোঝবার চেষ্টা করি। সবকিছু ভগবান শ্রীকৃষ্ণের অন্তর্গত ভেদবুদ্ধি দূর করে দিয়ে অন্যকে ভালোবাসতে চেষ্টা করি। যে যেভাবে বা যে পথে ঈশ্বরকে ডাকতে চায় ডাকুক। ঈশ্বর সে ভাবেই তার ডাকে সাড়া দেন। এখানেই বেজে ওঠে ধর্মসমন্বয়ের সুর। গীতায় জ্ঞানের কথা বলা হয়েছে। একই সাথে বাস্তব জীবনে কীভাবে চলতে হবে সেই পথও দেখানো হয়েছে। তাই গীতার জ্ঞানের গুরুত্ব বাস্তব জীবনে অপরিসীম।
ভারতবর্ষে মানবসভ্যতার ক্রমবিকাশের সঙ্গে সঙ্গে সনাতন তথা হিন্দুধর্মের বিকাশ শুরু হয়েছে। চিন্তাশীল মুনি-ঋষিগণ মানুষের কল্যাণ চিন্তায়, ধর্মীয় আচার-আচরণে এমনকি পারমার্থিক চিন্তায় নতুন নতুন ধর্মীয় ভাব প্রবর্তন করেছেন। বৈদিক যুগে ধর্ম-কর্ম পালিত হতো যজ্ঞকর্মরূপে। যজ্ঞক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তখন দেবতাদের আরাধনা করা হতো। যজ্ঞকর্মের ফলে স্বর্গপ্রাপ্তি হতো, কিন্তু মানুষের মুক্তিলাভ হতো না। তাই বেদের পরে উপনিষদের যুগে মুক্তির চিন্তা প্রাধান্য পায়। মানুষ মুক্তিলাভের জন্য এক ব্রহ্মের আরাধনা করতে থাকে। এ সময় সমাজ-সংসার ত্যাগ করে সন্ন্যাস গ্রহণের প্রবণতা দেখা দেয়। কালক্রমে এ চিন্তার মধ্যেও মানুষ যেন সন্তুষ্ট হতে পারল না। এ অবস্থায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাব ঘটে। তখন ছিল দ্বাপর যুগ। সমাজজীবনে সন্ন্যাসের পরিবর্তে কর্মের দিকে মোড় ফেরানো হলো। তিনি ব্যাখ্যা করে বললেন, কর্মত্যাগ নয়, কর্ম করতে হবে ভোগের আকাঙ্ক্ষা বাদ দিয়ে। মনে করতে হবে সমস্ত জগৎ ভগবানের কর্মক্ষেত্র। এখানে মানুষ ভগবানেরই কর্ম করে যাচ্ছে এবং কর্মের ফলও ভগবানেরই প্রাপ্য। শ্রীমদভগবদগীতায় এই নিষ্কাম কর্মযোগের বিষয়টি বলিষ্ঠভাবে তুলে ধরা হয়েছে। কর্মযোগ অনুশীলন করে মানুষ মুক্তিলাভ করতে পারে। এরপর আসে ভক্তিবাদের কথা। মানুষ ভক্তিভরে ঈশ্বরকে সাকারে উপাসনা করতে থাকে। বহু দেব-দেবীর পূজা-পার্বণ হিন্দুসমাজে প্রচলিত হয়। এর ফলে অবশ্য ভিন্ন ভিন্ন দেব-দেবীর উপাসকগণ ভিন্ন ভিন্ন শ্রেণিতে বিভক্ত হয়ে পড়েন, যেমন- শাক্ত, শৈব, বৈষ্ণব ইত্যাদি। এ সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে অসহিষ্ণু ভাব দেখা দেয়। এরূপ অবস্থায় শ্রীচৈতন্যদেবের আবির্ভাব ঘটে। তিনি প্রেমভক্তিমূলক বৈষ্ণবধর্ম প্রচার করেন। এ ধর্মের প্রধান লক্ষ্য ভক্তির মাধ্যমে ভগবানের আরাধনা করা, সমাজে বর্ণভেদ দূর করা ও শান্তি স্থাপন করা। উনবিংশ শতকে হিন্দুধর্মের অনেক আচার- আচরণে সংস্কার সাধন করা হয়। মূর্তিপূজার পরিবর্তে আসে এক ব্রহ্মচিন্তা। স্থাপিত হয় ব্রাহ্মসমাজ। অপরদিকে, মূর্তিপূজার মাধ্যমেও যে মানুষ ঈশ্বর লাভ করতে পারে, এ ধারণাটি শ্রীরামকৃষ্ণের সাধনায় সুপ্রতিষ্ঠিত হয়। শ্রীরামকৃষ্ণ ও তাঁর শিষ্য স্বামী বিবেকানন্দের প্রচেষ্টায় হিন্দুধর্মে পুরাতন ও নতুন চিন্তাধারার সমন্বয় ঘটে।
সুতরাং বলা যায়, সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে ধর্ম চেতনায় ভাবগত অনেক পরিবর্তন ঘটেছে যা স্বাভাবিক।
Related Question
View Allভগবান স্বয়ং বা তাঁর কোনো দেব-দেবী মনুষ্যাদির মূর্তি ধারণ করে ভগবানের অপ্রাকৃত নিত্যধাম থেকে নেমে আসাকে অবতার বলা হয়। আর অবতার সম্পর্কে যে দার্শনিক চিন্তাভাবনা, তা অবতারবাদ নামে পরিচিত।
বেদ ও উপনিষদে বলা হয়েছে ব্রহ্ম বা ঈশ্বর এক ও অদ্বিতীয়। ব্রহ্ম বা ঈশ্বর একাধিক নয়। এই যে এক ঈশ্বরে বিশ্বাস, তাকে একেশ্বরবাদ বলে। আবার অবতার ও দেব-দেবী একই ঈশ্বরের বিভিন্ন প্রকাশ, ঈশ্বর এক ও অদ্বিতীয় এ বিশ্বাসই একেশ্বরবাদ। সুতরাং একেশ্বরবাদ হিন্দুধর্মের একটি বিশ্বাস।
শংকর স্বামী স্বরূপানন্দের মতাদর্শের দ্বারা প্রভাবিত হয়। ১৮৯৩ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশের চাঁদপুর শহরে শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংস বাংলাদেশের চাঁদপুর শহরে আবির্ভূত হন। তিনি 'অযাচক আশ্রম' এর প্রতিষ্ঠাতা। এ আশ্রমে অন্যের কাছ থেকে কোনো চাঁদা নেওয়া হয় না; এরা নিজেদের অর্থের সংস্থান নিজেরাই করেন। ১৯৮৪ খ্রিষ্টাব্দের ১ জানুয়ারি স্বামী স্বরূপানন্দের আদর্শকে রূপদান করার লক্ষ্যে চরিত্র গঠন আন্দোলন শুরু হয়। এর মূল আবেদন, "আমি ভালো মানুষ হব এবং অপরকে ভালো হতে সহায়তা দিব।" শংকর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা শেষে অযাচক আশ্রমের শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ হয়ে সমাজের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করেন।
উদ্দীপকের আলোচিত মহাপুরুষ হচ্ছেন শ্রীশ্রী স্বামী স্বরূপানন্দ পরমহংস। তিনি ১৮৯৩ খ্রিষ্টাব্দে বাংলাদেশের চাঁদপুর শহরে আবির্ভূত হন। তিনি 'অযাচক আশ্রম' এর প্রতিষ্ঠাতা। অযাচক আশ্রমের বৈশিষ্ট্য হল ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সমবেত উপাসনায় চরিত্র, গঠন, সমাজ সংস্কার, ব্রহ্মচর্য স্বাবলম্বন ও জগতের কল্যাণের কাজে নিযুক্ত থাকা। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নিকট হতে অর্থ যাচঞা না করা এ সংগঠনের আদর্শ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশ্বধর্ম ও সংস্কৃতি বিভাগের সহযোগিতায় ১৯১৪ খ্রিষ্টাব্দের ১ জানুয়ারি স্বামী স্বরূপানন্দের আদর্শকে রূপদান করার লক্ষ্যে চরিত্র গঠন আন্দোলন শুরু হয়। এর মূল আবেদন, "আমি ভালো মানুষ হব এবং অপরকে ভালো হতে সহায়তা দিব।" স্বামী স্বরূপানন্দের মতাদর্শ থেকে আমরা এ শিক্ষা পাই যে, সকলকে সমানভাবে ভালোবাসতে হবে। স্বামী স্বরূপানন্দ রচিত গ্রন্থাদি ও সংগীত সমাজের কল্যাণ সাধনে বিশেষ অবদান রাখতে সমর্থ হয়েছে।
কারও অনিষ্ট কামনা না করে সকলকে মন থেকে ভালোবাসাকেই অহিংসা বলে।
হরিচাঁদ ঠাকুরের ধর্মনীতি থেকে মতুয়া ধর্মের উদ্ভব হলো। হরিচাঁদ ঠাকুর ১৮১২ খ্রিষ্টাব্দে আবির্ভূত হয়ে হিন্দু সমাজে সকল ধর্ম ও বর্ণের মানুষকে এক হরিণামে যেতে থাকার আহ্বান জানান। এ ধর্মের মূলমন্ত্র হচ্ছে ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে হরিণামে মেতে থাকা। হরিণামই জগতে কল্যাণ, শান্তি, সমৃদ্ধি প্রতিষ্ঠা করতে আবশ্যক।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!