উত্তরঃ
"তাহেরা আধুনিক ব্যক্তিত্বশীল প্রতিবাদী নারী চরিত্রের প্রতিনিধি।"- 'বহিপীর' নাটকের ঘটনাপ্রবাহ ও তাহেরা চরিত্রের স্বভাবসুলভ বৈশিষ্ট্যের আলোকে আলোচ্য উক্তিটি যুক্তিযুক্ত।
সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ তার 'বহিপীর' নাটকের চরিত্রসমূহকে আধুনিক মানববৈশিষ্ট্যের আদলে গড়ে তুলেছেন। তার অন্যতম কৃতিত্ব তাহেরা চরিত্রচিত্রণে। এই চরিত্রের মধ্যে লেখক বিশ শতকের নারীজাগরণকে ধারণ করেছেন।
মা-মরা মেয়ে তাহেরা। শৈশব থেকে সে সৎমায়ের সংসারে বড় হয়েছে। তাই সে স্বাভাবিক স্নেহ-মমতা থেকে বঞ্চিত। বাবা তার দায়িত্ব পালন করলেও সেই দায়িত্বের মধ্যে মমত্ববোধ ছিল না। শেষ পর্যন্ত সৎমায়ের কুপরামর্শে বাবা তাকে পঞ্চাশোর্ধ্ব বৃদ্ধ পিরের সাথে নিজের মতামতকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে বিয়ে দেয়। এই বিয়ে না মেনে তাহেরা বাড়ি ত্যাগ করে জমিদারের বজরায় আশ্রয় নেয়। নাটকীয়ভাবে ঝড়ের কবলে মরমর অবস্থায় বহিপীরও সেই বজরায় আশ্রয় নেন। বহিপীর তাহেরাকে নানা কূটচক্রান্তের আশ্রয়ে আয়ত্তে নিতে চাইলেও তাহেরা বিচক্ষণতার সাথে সবকিছু অস্বীকার করে। শেষপর্যন্ত জমিদারপুত্র হাশেম আলির হাত ধরে অনিশ্চিত অজানায় পাড়ি জমায় সে।
তাহেরা শুরু থেকেই তার প্রতি বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী। নিজের অমতে বৃদ্ধ বহিপীরের সাথে বিয়ে সে মানে না। কেননা বহিপীরের প্রথম স্ত্রীও নিঃসন্তান ও বিপত্নীক। ফলে তাহেরা এ বিয়েতে রাজি হওয়া মানে তার পুরো স্বপ্নময় ভবিষ্যৎকে অন্ধকারে ঠেলে দেওয়া। তাই সে বাড়ি ত্যাগ করেছে। বহিপীর তাকে বিবিসাহেব ডাকলে সে তৎক্ষণাৎ এর প্রতিবাদ করেছে। সে দৃঢ়কণ্ঠে উচ্চারণ করে, বিয়েতে তার মত ছিল না। তাই আইনত তারা স্বামী-স্ত্রী নয়।
তাহেরা চিন্তা-চেতনার দিক থেকেও অনেকাংশে আধুনিক ও ব্যক্তিত্ববান। সমাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে সে সোচ্চার। নারী হলেও নারীসুলভ গৃহমুখী বৈশিষ্ট্য তাকে আকৃষ্ট করতে পারেনি। শুরু থেকেই সে নিজের সিদ্ধান্তে অনমনীয়। প্রয়োজনে সে নদীতে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করতে প্রস্তুত, তবু বহিপীরের সাথে গিয়ে ব্যক্তিত্বকে বিসর্জন দেবে না। আবার জমিদারপুত্র হাশেম আলি তাকে ঝোঁকের বশে বিয়ে করতে চাইলে তাতেও সে প্রথম প্রস্তাবেই রাজি হয়নি।
সুতরাং উপর্যুক্ত আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বলা যায় যে, তাহেরা আধুনিক ব্যক্তিত্বশীল, প্রতিবাদী নারী চরিত্রের প্রতিনিধি।