তৃতীয় বিশ্বের দেশসমূহে বিশ্বব্যাংকের ভূমিকা আলোচনা করুন।

Updated: 2 weeks ago
উত্তরঃ

বিশ্বব্যাংক উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত দেশগুলোর অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে অর্থায়ন, কারিগরি সহায়তা ও নীতিগত পরামর্শ প্রদানকারী একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান। অবকাঠামোগত ঘাটতি, দারিদ্র্য, বেকারত্ব, দুর্বল স্বাস্থ্য ও শিক্ষা ব্যবস্থা এবং জলবায়ুজনিত ঝুঁকির মতো বহুমাত্রিক সমস্যায় আক্রান্ত তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় বিশ্বব্যাংকের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

তৃতীয় বিশ্বের দেশসমূহে বিশ্বব্যাংকের ভূমিকা:

  • উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থায়ন: বিশ্বব্যাংক তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোকে অবকাঠামো ও জনকল্যাণমূলক উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে ঋণ ও আর্থিক সহায়তা প্রদান করে। সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎ, পানি সরবরাহ, স্যানিটেশন, যোগাযোগ ও নগর অবকাঠামো উন্নয়নে এ অর্থায়ন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এসব প্রকল্প উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, যোগাযোগব্যবস্থা সহজীকরণ এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণে সহায়তা করে। বিশেষ করে যেসব দেশে অভ্যন্তরীণ সঞ্চয় ও বিনিয়োগের সক্ষমতা সীমিত, সেখানে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের সুযোগ সৃষ্টি করে।
  • দারিদ্র্য বিমোচন: দারিদ্র্য বিমোচন বিশ্বব্যাংকের অন্যতম প্রধান উন্নয়ন অগ্রাধিকার। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর আয় বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সামাজিক নিরাপত্তা এবং মৌলিক সেবা পাওয়ার সুযোগ সম্প্রসারণে বিভিন্ন প্রকল্পে অর্থায়ন করা হয়। দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে উন্নয়নের মূলধারায় অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে এসব কর্মসূচি সামাজিক বৈষম্য কমাতে সহায়তা করে। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদে মানবিক সক্ষমতা ও জীবনযাত্রার মান উন্নত করার সুযোগ তৈরি হয়।
  • শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন: তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর উন্নয়নের অন্যতম প্রধান বাধা হলো দক্ষ মানবসম্পদের ঘাটতি। বিশ্বব্যাংক বিদ্যালয়ের অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ, শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং শিক্ষক প্রশিক্ষণে সহায়তা প্রদান করে। পাশাপাশি কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা এবং দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচির মাধ্যমে কর্মমুখী মানবসম্পদ তৈরিতে সহযোগিতা করে। শিক্ষায় বিনিয়োগের ফলে দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদনশীলতা, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধি পায়।
  • স্বাস্থ্য ও পুষ্টি খাতে সহায়তা: বিশ্বব্যাংক তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর স্বাস্থ্য অবকাঠামো ও সেবা ব্যবস্থার উন্নয়নে অর্থায়ন ও কারিগরি সহায়তা প্রদান করে। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, মাতৃ ও শিশুর স্বাস্থ্য, পুষ্টি, রোগ প্রতিরোধ এবং স্বাস্থ্যসেবায় দরিদ্র জনগোষ্ঠীর প্রবেশাধিকার বৃদ্ধিতে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। উন্নত স্বাস্থ্যব্যবস্থা কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী গড়ে তুলতে সহায়তা করে এবং স্বাস্থ্যব্যয়ের কারণে দরিদ্র হয়ে পড়ার ঝুঁকি কমায়। ফলে স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ মানবসম্পদ উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতার সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত।
  • কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তা: তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থান কৃষির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। বিশ্বব্যাংক সেচব্যবস্থা, কৃষি অবকাঠামো, আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি, কৃষকের দক্ষতা উন্নয়ন এবং কৃষিপণ্য সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণে সহায়তা করে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় খরা, বন্যা ও লবণাক্ততা-সহনশীল কৃষি ব্যবস্থার উন্নয়নেও সহায়তা করা হয়। এর মাধ্যমে কৃষির উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, কৃষকের আয় উন্নয়ন এবং খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার সুযোগ সৃষ্টি হয়।
  • কর্মসংস্থান ও বেসরকারি খাতের উন্নয়ন: দারিদ্র্য ও বেকারত্ব মোকাবিলায় কর্মসংস্থান সৃষ্টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বব্যাংক ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের বিকাশ, উদ্যোক্তা সৃষ্টি, দক্ষতা উন্নয়ন এবং বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নে সহায়তা করে। একটি কার্যকর বেসরকারি খাত গড়ে উঠলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং উৎপাদন ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি পায়। একই সঙ্গে উদ্যোক্তাদের জন্য অর্থায়ন ও ব্যবসায়িক পরিবেশ উন্নত হলে অর্থনীতিতে বেসরকারি বিনিয়োগের ভূমিকা আরও শক্তিশালী হয়।
  • সুশাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি: দুর্বল প্রশাসন, অদক্ষতা ও জবাবদিহির ঘাটতি তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশের উন্নয়নের পথে বড় বাধা। বিশ্বব্যাংক সরকারি প্রতিষ্ঠানের দক্ষতা বৃদ্ধি, জনসেবা ব্যবস্থার উন্নয়ন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা এবং উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যবস্থাপনা সক্ষমতা বৃদ্ধিতে কারিগরি সহায়তা প্রদান করে। নীতিনির্ধারণ ও প্রকল্প বাস্তবায়নে তথ্যভিত্তিক ব্যবস্থাপনা ও কার্যকর প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়। এর ফলে সীমিত সম্পদের অধিক কার্যকর ব্যবহার এবং উন্নয়ন কর্মসূচির বাস্তবায়ন সক্ষমতা বৃদ্ধি পেতে পারে।
  • পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা: জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো তুলনামূলকভাবে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। বিশ্বব্যাংক জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামো, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ সংরক্ষণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং অভিযোজনমূলক কর্মসূচিতে অর্থায়ন ও কারিগরি সহায়তা দেয়। একই সঙ্গে পানি ব্যবস্থাপনা, উপকূলীয় সুরক্ষা ও দুর্যোগপ্রবণ জনগোষ্ঠীর সক্ষমতা বৃদ্ধিতেও সহায়তা করা হয়। ফলে উন্নয়ন কার্যক্রমের সঙ্গে পরিবেশগত স্থায়িত্ব ও জলবায়ু সহনশীলতার সমন্বয় ঘটানো সম্ভব হয়।
  • প্রযুক্তি ও কারিগরি সহায়তা: বিশ্বব্যাংকের ভূমিকা শুধু ঋণ বা অর্থায়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; উন্নয়ন প্রকল্প প্রণয়ন, বাস্তবায়ন, পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়নেও এটি কারিগরি সহায়তা প্রদান করে। উন্নয়নশীল দেশগুলো বিশ্বব্যাংকের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা, গবেষণালব্ধ জ্ঞান ও আধুনিক ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি গ্রহণের সুযোগ পায়। প্রযুক্তিগত দক্ষতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়লে একই ধরনের উন্নয়ন প্রকল্প ভবিষ্যতে আরও দক্ষতার সঙ্গে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়।
  • আঞ্চলিক ও অর্থনৈতিক সংযোগ বৃদ্ধি: বিশ্বব্যাংক আঞ্চলিক যোগাযোগ, পরিবহন অবকাঠামো, বাণিজ্য ও সীমান্তসংলগ্ন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের উন্নয়নে সহায়তা করে। উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা পণ্য ও মানুষের চলাচল সহজ করে এবং বাজার সম্প্রসারণে সহায়তা করে। একই সঙ্গে আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সংযোগ বৃদ্ধি পেলে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো প্রতিবেশী ও আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে আরও কার্যকরভাবে যুক্ত হতে পারে। এর ফলে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হয়।
  • সামাজিক সুরক্ষা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন: দারিদ্র্য ও অর্থনৈতিক বৈষম্য কমাতে বিশ্বব্যাংক সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে সহায়তা করে। নারী, শিশু, দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ও সামাজিক সেবায় প্রবেশাধিকার বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। এর ফলে উন্নয়নের সুফল সমাজের অপেক্ষাকৃত দুর্বল অংশের কাছেও পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হয়।

সীমাবদ্ধতা ও সমালোচনা বিশ্বব্যাংকের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর কার্যক্রম নিয়ে কিছু সমালোচনা রয়েছে। ঋণের শর্ত, ঋণ পরিশোধের চাপ, প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা এবং কিছু ক্ষেত্রে স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে উন্নয়ন পরিকল্পনার অসামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তাই বিশ্বব্যাংকের সহায়তা গ্রহণের ক্ষেত্রে দেশের নিজস্ব উন্নয়ন অগ্রাধিকার, আর্থিক সক্ষমতা, পরিবেশগত ভারসাম্য ও সামাজিক স্বার্থ বিবেচনা করা প্রয়োজন।

10

Related Question

View All
উত্তরঃ

BRRI= Bangladesh Rice Research Institute

BRRI is located in Joydevpur, Gazipur. 

Ab. Rahim
Ab. Rahim
3 years ago
2.1k
শিক্ষকদের জন্য বিশেষভাবে তৈরি

১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!

শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!

প্রশ্ন এডিট করা যাবে
জলছাপ দেয়া যাবে
ঠিকানা যুক্ত করা যাবে
Logo, Motto যুক্ত হবে
অটো প্রতিষ্ঠানের নাম
অটো সময়, পূর্ণমান
প্রশ্ন এডিট করা যাবে
জলছাপ দেয়া যাবে
ঠিকানা যুক্ত করা যাবে
Logo, Motto যুক্ত হবে
অটো প্রতিষ্ঠানের নাম
অটো সময়, পূর্ণমান
অটো নির্দেশনা (এডিটযোগ্য)
অটো বিষয় ও অধ্যায়
OMR সংযুক্ত করা যাবে
ফন্ট, কলাম, ডিভাইডার
প্রশ্ন/অপশন স্টাইল পরিবর্তন
সেট কোড, বিষয় কোড
অটো নির্দেশনা (এডিটযোগ্য)
অটো বিষয় ও অধ্যায়
OMR সংযুক্ত করা যাবে
ফন্ট, কলাম, ডিভাইডার
প্রশ্ন/অপশন স্টাইল পরিবর্তন
সেট কোড, বিষয় কোড
এখনই শুরু করুন ডেমো দেখুন
৫০,০০০+
শিক্ষক
৩০ লক্ষ+
প্রশ্নপত্র
মাত্র ১৫ পয়সায় প্রশ্নপত্র
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন তৈরি করুন আজই

Complete Exam
Preparation

Learn, practice, analyse and improve

1M+ downloads
4.6 · 8k+ Reviews