ভারতের উত্তর ও পূর্বাঞ্চলে সিপাহিদের নেতৃত্বে ১৮৫৭ সালে যে সশস্ত্র বিদ্রোহ সংঘটিত হয় তাকে ভারতের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম বলে।
স্বদেশী আন্দোলনের ফলে ভারতবর্ষে বিভিন্ন দেশীয় শিল্প প্রতিষ্ঠান ও কলকারখানা স্থাপিত হওয়ায় দেশীয় শিল্পের উন্নতি হয়।
স্বদেশী আন্দোলনের একটি ইতিবাচক দিক হলো অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি। এর ফলে দেশি শিল্প প্রতিষ্ঠান ও কলকারখানা স্থাপনের প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধি পায় এবং এদেশীয় ধনী ব্যক্তিরা কলকারখানা স্থাপন করতে থাকেন। যেমন- লবণ, চিনি, সাবান, কাগজ, দেশি তাঁতবস্ত্র, চামড়াজাত দ্রব্য ইত্যাদি উৎপাদনের জন্য কারখানা স্থাপিত হয়। একদিকে বিলেতি পণ্য বর্জন অন্যদিকে দেশীয় কলকারখানা স্থাপন মানুষকে দেশি পণ্য ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করে। এভাবেই স্বদেশী আন্দোলনের ফলে দেশীয় শিল্পের উন্নতি সাধিত হয়।
দৃশ্য-১-এ বর্ণিত বিভক্তির ঘটনার সাথে পাঠ্যপুস্তকের বঙ্গভঙ্গের মিল রয়েছে।
বঙ্গভঙ্গ আধুনিক বাংলার ইতিহাসের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা। লর্ড জর্জ নাথানিয়েল কার্জন (১৮৫৯-১৯০৫) ভারতের ভাইসরয় থাকার সময় ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ কার্যকর হয়। ভারতের একক প্রদেশ হিসেবে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যা নিয়ে ১৭৬৫ সালে গঠিত 'বাংলা প্রেসিডেন্সি' ছিল আয়তনের দিক থেকে বিশাল। ১৯০৩ সালে প্রকাশিত ব্রিটিশ গেজেটিয়ারে দেখা যায়, বাংলার গর্ভনরকে সে সময় ৭ কোটি ৭৫ লাখ লোকসংখ্যার ১,৮৯,০০০ বর্গমাইল এলাকা শাসন করতে হতো। শাসনের সুবিধার্থে ব্রিটিশ সরকারের কাছে এ প্রদেশ ভেঙে সীমানা পুনর্বিন্যাসের প্রস্তাব তোলা হয়। এ প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে বঙ্গভঙ্গ বাস্তবায়ন করে পূর্ববাংলা ও আসাম নামে নতুন আরেকটি প্রদেশ করা হয়। তখন বাংলার বৃহত্তম শহর পশ্চিমবঙ্গের কোলকাতা ছিল গোটা ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী। প্রধান শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য, উচ্চশিক্ষা সবকিছু কোলকাতাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠায় বিশাল পূর্ববাংলা রয়ে যায় সরকারের নজরের বাইরে। ফলে আর্থ-সামাজিক দিক থেকে পূর্ববাংলা অনেক পেছনে পড়ে যায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর লর্ড কার্জন বাংলা ভাগ করেন। তবে এর কারণ সম্পর্কে ইংরেজদের 'ভাগ কর ও শাসন কর' কূটকৌশলের কথাও বলা হয়।
উদ্দীপকের দৃশ্য-১-এ দেখা যায়, রংপুর দীর্ঘদিন রাজশাহী বিভাগের অন্তর্ভুক্ত ছিল। শাসনকার্য পরিচালনার সুবিধার জন্য রাজশাহী বিভাগকে ভেঙে রাজশাহী ও রংপুর নামে দুটি আলাদা বিভাগ করা হয়। তাই বলা যায়, দৃশ্য-১-এর ঘটনায় পাঠ্যপুস্তকের বঙ্গভঙ্গের প্রতিফলন ঘটেছে।
দৃশ্য-২-এ যে আন্দোলনের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে তা হলো স্বদেশী আন্দোলন। এ আন্দোলন ভারতবর্ষে ব্যাপকতা লাভ করেছিল এবং বাংলার অর্থনৈতিক অগ্রগতিতেও সহায়ক ভূমিকা পালন করেছিল।
১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের পর হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদে ১৯০৫ সালের ১৭ জুলাই ইংরেজদের বিরুদ্ধে 'বয়কট' প্রস্তাব গৃহীত হয়। এর মাধ্যমে বিলেতি পণ্য বয়কট, বিলেতি পণ্যে অগ্নি সংযোগ ও ছাত্রদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বর্জন প্রভৃতি কর্মসূচি গৃহীত হয়। বিভিন্ন স্থানে সভা-সমিতির মাধ্যমে বিলেতি পণ্য বর্জন ও দেশীয় পণ্য ব্যবহারের শপথ নেওয়া হয়। কংগ্রেস নেতারা গ্রামগঞ্জে, শহরে, প্রকাশ্য সভায় বিলেতি পণ্য পুড়িয়ে ফেলা এবং দেশি পণ্য ব্যবহারের জন্য জনগণকে উৎসাহিত করতে থাকেন। যা বাংলায় ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে এবং বিলেতি পণ্যের চাহিদা কমে যায়। ব্রিটিশ সরকারের বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদে গড়ে ওঠা স্বদেশী আন্দোলনের পেছনে একটি সূক্ষ্ম অর্থনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল, আর তা হলো দেশীয় শিল্পের বিকাশ এবং দেশকে স্বনির্ভরশীল করে তোলা। এ আন্দোলনের মাধ্যমে জনগণকে একদিকে দেশীয় পণ্য ব্যবহারে উৎসাহিত করা হয়, অন্যদিকে বিলেতি পণ্য বর্জনের কথাও বলা হয়। এ সময় কিছু আধুনিক শিল্প প্রতিষ্ঠান, যেমন- বেঙ্গল ক্যামিকেল প্রতিষ্ঠিত হয়, বিখ্যাত টাটা কোম্পানি তাদের কারখানা স্থাপন করে। তাছাড়া আরও ছোটখাটো দেশীয় শিল্পকারখানা এ সময় প্রতিষ্ঠিত হয়, যা দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য অর্জন সত্ত্বেও মুসলিম সমাজ দূরে থাকার কারণে স্বদেশী আন্দোলন জাতীয় রূপ লাভে ব্যর্থ হয়। গোপনে সশস্ত্র সংগ্রামের পথে অগ্রসর হলে এ আন্দোলন জনসম্পৃক্ততা হারায়। এছাড়া দরিদ্র সমাজ, নিম্নবর্ণের হিন্দুরা এ আন্দোলনের মর্ম উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়। এর ওপর চলে ইংরেজ সরকারের চরম দমননীতি, পুলিশ অত্যাচার। ফলে আন্দোলন সর্বজনীন এবং জাতীয় রূপ লাভে ব্যর্থ হয় এবং শেষ পর্যন্ত ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।
উদ্দীপকের দৃশ্য-২-এ দেখা যায়, 'ক' দেশের জনগণ বিদেশি শাসকের কর্মকাণ্ডে অসন্তুষ্ট হয়ে একটি আন্দোলন গড়ে তোলে। তারা সরকারি চাকরি, পদবি, স্কুল-কলেজ ইত্যাদি বর্জন করেন। তারা দেশীয় জিনিসের প্রচলন বৃদ্ধি করে বিদেশি পণ্য বর্জন করেন। উপরে আলোচিত স্বদেশী আন্দোলনের গতিধারায়ও এমনটি দেখা যায়। পরিশেষে বলা যায়, স্বদেশী আন্দোলন নানা সীমাবদ্ধতার ফলে পুরোপুরি সফল না হলেও এ আন্দোলনের প্রভাবেই দেশীয় শিল্প প্রতিষ্ঠান ও কলকারখানা স্থাপনের প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধি পায়। ফলে এদেশের অর্থনীতি অনেকটা সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে।
Related Question
View Allমুঘল সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহকে রেঙ্গুনে নির্বাসিত করা হয়।
স্বত্ববিলোপ নীতি লর্ড ডালহৌসি কর্তৃক প্রবর্তিত এক প্রকার নীতি, যাতে দত্তক পুত্র সম্পত্তির উত্তরাধিকার হতে পারে না।
লর্ড ডালহৌসি স্বত্ববিলোপ নীতি প্রয়োগ করে সাতারা, ঝাঁসি, নাগপুর, সম্বলপুর, ভগৎ, উদয়পুর, করাউলি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যভুক্ত করেন। স্বত্ববিলোপ নীতি অনুযায়ী দত্তক পুত্র সম্পত্তির উত্তরাধিকার হতে পারে না। তাছাড়া এ নীতির প্রয়োগ করে নানা সাহেবের ভাতা বন্ধ করে দেওয়া হয়। অপশাসনের অজুহাতে অযোধ্যাকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যভুক্ত করা হয়।
উদ্দীপকে বঙ্গভঙ্গের প্রশাসনিক কারণটি ফুটে উঠেছে।
লর্ড কার্জনের শাসনামলে বঙ্গভঙ্গ ছিল একটি প্রশাসনিক সংস্কার। উপমহাদেশের এক-তৃতীয়াংশ লোক বাস করত বাংলা প্রেসিডেন্সিতে । কলকাতা থেকে পূর্বাঞ্চলের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা ও শাসনকার্য সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করা ছিল কঠিন কাজ। যে কারণে লর্ড কার্জন এত বড় অঞ্চলকে একটিমাত্র প্রশাসনিক ইউনিটে রাখা যুক্তিসংগত মনে করেন নি। তাই ১৯০৩ সালে বাংলা প্রদেশকে দুভাগ করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেন এবং ১৯০৫ সালে তা কার্যকর হয়।
উদ্দীপকের সালেহপুর ইউনিয়ন আয়তনে অনেক বড় হওয়ার কারণে বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ব্যাহত হচ্ছিল। তাই এটিকে দুটি আলাদা ইউনিটে ভাগ করা হয়। সুতরাং বলা যায়, উদ্দীপকে বঙ্গভঙ্গের প্রশাসনিক জটিলতা নিরসনের কারণটি ফুটে উঠেছে।
উদ্দীপকটি বঙ্গভঙ্গের প্রশাসনিক কারণের ইঙ্গিত বহন করে। এটি ছাড়াও বঙ্গভঙ্গের পেছনে আরও কারণ ছিল বলে আমি মনে করি।
বঙ্গভঙ্গের অন্যতম কারণ ছিল আর্থ-সামাজিক। তৎকালীন সময়ে শিল্প- কারখানা, ব্যবসা-বাণিজ্য, অফিস-আদালত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সবকিছুই কোলকাতাকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল। উন্নত সবকিছুই কোলকাতার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। ফলে পূর্ব বাংলার উন্নতি ব্যাহত হয়। এ অবস্থা বিবেচনা করে লর্ড কার্জন বঙ্গভঙ্গ করেন।
লর্ড কার্জন ছিলেন রাজনৈতিক বিষয় সম্পর্কে সতর্ক। বাঙালি মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবী শ্রেণি ক্রমশ জাতীয়তাবাদ ও রাজনীতি সচেতন হয়ে উঠেছিল, যা তার দৃষ্টি এড়ায়নি। তাই কোলকাতাকেন্দ্রিক ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনকে থামিয়ে দেওয়া ছিল বঙ্গভঙ্গের অন্যতম কারণ। ব্রিটিশদের Divide and rule policy (বিভেদ ও শাসন নীতি) প্রয়োগ করে ব্রিটিশ স্বার্থকে টিকিয়ে রাখাও বঙ্গভঙ্গের অন্যতম কারণ ছিল।
পরিশেষে বলা যায়, শুধু প্রশাসনিক কারণেই নয়, উল্লিখিত বিষয়গুলোও বঙ্গভঙ্গের জন্য দায়ী ছিল।
লর্ড ডালহৌসি দিল্লির মুঘল সম্রাটের পদ বিলুপ্ত করেন।
হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের সিপাহিদের ব্যবহারের জন্য 'এনফিল্ড' রাইফেলের প্রচলন করা হয়। এ রাইফেলের টোটা দাঁত দিয়ে কেটে বন্দুকে প্রবেশ করাতে হতো। সৈন্যদের মাঝে ব্যাপকভাবে এ গুজব ছড়িয়ে পড়ল যে, এই টোটায় গরু ও শূকরের চর্বি মিশ্রিত আছে। ফলে উভয়ই ধর্মনাশের কথা ভেবে বিদ্রোহী হয়ে ওঠে।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!