কোনো বিশেষ উদ্দেশ্য সাধনের জন্য বস্তুসমূহ বা ঘটনাবলিকে সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্যের ভিত্তিতে একত্রে সন্নিবেশিত করার মানসিক প্রক্রিয়াকে শ্রেণিকরণ বলে।
শ্রেণিকরণ হচ্ছে এমন এক ধরনের মানসিক প্রক্রিয়া, যাতে কোনো বিশেষ উদ্দেশ্য সাধনের জন্য বিভিন্ন বস্তু বা ঘটনাবলিকে সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্যের ভিত্তিতে এক-একটি দলে বিন্যস্ত করা হয়। ফলে একটি বস্তু বা প্রাণী কোন শ্রেণিভুক্ত তা আমরা যেকোনো সময় অতি সহজে নির্ণয় করতে সক্ষম হই। উল্লেখ্য, শ্রেণিকরণের এই প্রক্রিয়াটি নিম্নতর শ্রেণি থেকে ক্রমান্বয়ে উচ্চতর শ্রেণির দিকে অগ্রসর হয়।
উদাহরণস্বরূপ, প্রাণিজগতে মেরুদণ্ড থাকা ও না থাকার ভিত্তিতে প্রাণিকুলকে মেরুদন্ডী ও অমেরুদণ্ডী এ দুই শ্রেণিতে বিন্যস্ত করা যায়।
উদ্দেশ্যের ভিত্তিতে শ্রেণিকরণ দুই প্রকার; যথা :
১ । প্রাকৃতিক শ্রেণিকরণ: যে শ্রেণিকরণে বস্তু বা বিষয়সমূহ সম্পর্কে সাধারণ জ্ঞান লাভের উদ্দেশ্যে বিন্যস্ত করা হয়, তাকে প্রাকৃতিক শ্রেণিকরণ বলে। যেমন: প্রাণিজগতে মেরদণ্ড থাকা ও না থাকার ভিত্তিতে প্রাণিকুলকে মেরুদন্ডী ও অমেরুদণ্ডী- এ দুই শ্রেণিতে বিন্যস্ত করা যায়।
প্রাকৃতিক শ্রেণিকরণের উদ্দেশ্য হচ্ছে, যে বস্তুগুলোর শ্রেণিবিভাগ করা হয় তাদের সম্পর্কে সাধারণ জ্ঞান লাভ। এ শ্রেণিকরণকে প্রাকৃতিক শ্রেণিকরণ বলার কারণ হলো, যে মৌলিক সাদৃশ্যের ভিত্তিতে আমরা এ প্রকারের শ্রেণিকরণ করি সে মৌলিক সাদৃশ্যটি স্বয়ং প্রকৃতিই সরবরাহ করে। অর্থাৎ মৌলিক ও অপরিহার্য সাদৃশ্যগুলো প্রকৃতিতেই বিদ্যমান এবং সেগুলো আমাদের মনগড়া নয়।
২ । কৃত্রিম শ্রেণিকরণ: যে শ্রেণিকরণে বিশেষ কোনো ব্যবহারিক উদ্দেশ্য সাধনের জন্য বস্তু বা বিষয়সমূহকে বিন্যস্ত করা হয় তাকে কৃত্রিম শ্রেণিকরণ বলে। যেমন: যখন মালী ফুলের গাছগুলো পরিচর্যার উদ্দেশ্যে বড় ও ছোট গাছ হিসেবে শ্রেণিকরণ করে তখন তা হয় কৃত্রিম শ্রেণিকরণ। এরকম শ্রেণিকরণের উদ্দেশ্য হচ্ছে কোনো বিশেষ ব্যক্তি বা সম্প্রদায়ের উদ্দেশ্য সাধন বা কোনো বিশেষ ব্যবহারিক উদ্দেশ্য সাধন। তাই একে ব্যবহারিক শ্রেণিকরণও বলে।
বাস্তব জীবনে শ্রেণিকরণের প্রয়োগ অনেক ব্যাপক। শ্রেণিকরণ নানাভাবে প্রকৃতির বিভিন্ন বস্তু বা ঘটনাকে বর্ণনা করে। যেমন:
শ্রেণিকরণ প্রকৃতিকে সুষ্ঠুভাবে ও সুস্পষ্টভাবে অনুধাবনের সহায়ক। কেননা বস্তু নিয়ে অনুধাবনের মানে তাদের সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্য উপলব্ধি। বস্তু নির্ণয়কে শ্রেণিকরণ প্রক্রিয়ায় বিন্যস্ত করা হলে আমরা তাদের সম্পর্কে একটি সুস্পষ্ট ধারণা লাভ করি এবং এক শ্রেণির বস্তুকে অন্য শ্রেণির বস্তু বলে ভুল করি না। শ্রেণিকরণ স্মৃতিকে সহায়তা করে। যেমন: প্রকৃতিতে অগণিত বস্তু আছে, আর অসংখ্য বস্তুর প্রত্যেকেরই নিজস্ব বৈশিষ্ট্য আছে। এসব বস্তুর প্রত্যেকেরই নিজস্ব বৈশিষ্ট্যসহ মনে রাখা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। আমরা কেবল শ্রেণিচরিত্রের উপলব্ধি দ্বারাই তাদের মনে রাখতে পারি। শ্রেণিকরণে বস্তুসমূহকে তাদের সাধারণ, মৌলিক ও অপরিহার্য গুণাবলির ভিত্তিতে শ্রেণিবিন্যস্ত করা হয়। যেমন:
১। গবেষণার জন্য বিভিন্ন প্রকারে উদ্ভিদ বা প্রাণীকে বা জীবজন্তুকে কোনো শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত করতে হয়। যেমন: জলজ প্রাণী, স্থলজ প্রাণী, উভচর প্রাণী, আবার সপুষ্পক উদ্ভিদ, অপুষ্পক উদ্ভিদ ইত্যাদি।
২। ব্যবহারিক সুবিধার জন্য গ্রন্থাগারিক বইসমূহকে বিভিন্ন শ্রেণিভুক্ত করে নেন। যেমন: লেখক বা বইয়ের নামের আদ্যাক্ষরের ভিত্তিতে বইসমূহকে শ্রেণিভুক্ত করা।
এরূপ বিভিন্নভাবে বাস্তব জীবনের বস্তু বা ঘটনাকে বর্ণনা করতে শ্রেণিকরণের প্রয়োগ দেখানো যায়।
Related Question
View Allবিশেষ কোনো উদ্দেশ্য সাধনের নিমিত্তে জাগতিক বিষয়বস্তুকে তাদের মধ্যকার পারস্পরিক সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্যের ভিত্তিতে মানসিকভাবে একত্রিত করার প্রক্রিয়াই হচ্ছে শ্রেণিকরণ।
শ্রেণিকরণের স্বরূপ বিশ্লেষণ করলে এর গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বৈশিষ্ট্য পাওয়া যায়। যথা : (১) শ্রেণিকরণ এক ধরনের মানসিক প্রক্রিয়া। (২) শ্রেণিকরণের ভিত্তি হলো সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্য। (৩) শ্রেণিকরণ হলো শৃঙ্খলাবদ্ধকরণ বা সুবিন্যস্তকরণ। (৪) শ্রেণিকরণে বিশেষ কোনো উদ্দেশ্য নিহিত থাকে। (৫) শ্রেণিকরণ প্রক্রিয়াটি ব্যাখ্যার সাথে জড়িত।
উদ্ভিদবিদ্যার অধ্যাপক রহমান সাহেব সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে হাঁটতে এসে বিভিন্ন গাছপালা দেখেন। এর মধ্যে কিছু গাছে ফুল ফোটে, কিছু গাছে ফল ধরে, আবার কিছু গাছ ফুল-ফল ছাড়াই মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। প্রকৃতির এ বৈচিত্র্যপূর্ণ গাছপালা দেখেই তিনি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন যে, উদ্যানে দুই শ্রেণির উদ্ভিদ রয়েছে। যার কিছু সপুষ্পক উদ্ভিদ এবং কিছু অপুষ্পক উদ্ভিদ। রহমান সাহেব তার ব্যবহারিক সুবিধা বা বিশেষ উদ্দেশ্য সাধনের জন্য এই শ্রেণিকরণটি করেছেন।
সাধারণত ব্যবহারিক সুবিধা বা বিশেষ উদ্দেশ্য সাধনের জন্য গুরুত্বহীন ও বাহ্যিক সাদৃশ্যের ভিত্তিতে জাগতিক বস্তু বা ঘটনাবলিকে বিভিন্ন শ্রেণিতে বিন্যস্ত করার মানসিক প্রক্রিয়াকে কৃত্রিম শ্রেণিকরণ বলে। বস্তুত কৃত্রিম শ্রেণিকরণে কোনোরূপ প্রাকৃতিক বা বৈজ্ঞানিক নিয়ম অনুসরণ করা হয় না। এ জন্য একে অবৈজ্ঞানিক শ্রেণিকরণ বলা হয়। মূলত ব্যবহারিক বা প্রায়োগিক সুবিধা সৃষ্টি করা হচ্ছে এরূপ শ্রেণিকরণের প্রধান কাজ।
সর্বোপরি সব দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, রহমান সাহেবের শ্রেণিকরণটি কৃত্রিম।
প্রাকৃতিক ও কৃত্রিম শ্রেণিকরণের মধ্যকার পার্থক্যকে আমি যুক্তিসংগত বলে স্বীকার করি না। কারণ প্রাকৃতিক ও কৃত্রিম শ্রেণিকরণের পার্থক্যসমূহ গুণগত নয়, উদ্দেশ্যগত। এজন্য এদের মধ্যে সুনির্দিষ্ট কোনো রেখা টানাও ঠিক নয়।
বস্তুত বিশেষ দৃষ্টিকোণ থেকে এক অর্থে সব শ্রেণিকরণই প্রাকৃতিক, আবার অন্য অর্থে সব শ্রেণিকরণই কৃত্রিম। সব শ্রেণিকরণই প্রাকৃতিক হওয়ার কারণ হিসেবে বলা যায়, যেকোনো বিষয়ের শ্রেণিকরণ করতে গিয়ে প্রযোজ্য সাদৃশ্যের বিষয়গুলোকে আমরা আমাদের মনের উপর নির্ভরশীল বলে মনে করি। প্রকৃতপক্ষে সেগুলো প্রকৃতিতেই বিদ্যমান থাকে। অর্থাৎ এসব সাদৃশ্য মনবহির্ভূত এবং এগুলো বহির্জগতে স্বাধীন ও স্বতন্ত্রভাবে বিরাজ করে। আমাদের মন কেবল সাদৃশ্যের বিষয়গুলোকে নির্বাচন করে সেগুলোর ভিত্তিতে জাগতিক বস্তুসমষ্টি বা ঘটনাবলিকে শ্রেণিবদ্ধ করে মাত্র। অন্যদিকে সব শ্রেণিকরণকেই কৃত্রিম বলার কারণ হিসেবে বলা যায়, সব শ্রেণিকরণই মানুষ কর্তৃক সৃষ্ট। অর্থাৎ মানুষই নিজেদের প্রযোজন অনুযায়ী প্রকৃতিতে বিদ্যমান বস্তু বা ঘটনাবলিকে নির্বাচন করে সেগুলোকে শ্রেণিবদ্ধ করে। কারণ প্রকৃতির এমন কোনো নিজস্ব শক্তি নেই, যার ফলে প্রকৃতির বস্তুসমষ্টি বা ঘটনাবলি নিজে নিজেই শ্রেণিবদ্ধ হতে পারে। এককথায়, প্রকৃতিতে বস্তু বা ঘটনাবলি যেভাবে থাকার সেভাবেই থাকে। এমনকি মানুষও তাদেরকে বিভিন্ন জায়গা থেকে তুলে এনে পাশাপাশি শ্রেণিবদ্ধ করে না; বরং এগুলোকে মানুষ শ্রেণিবদ্ধ করে মনে মনে। কাজেই শ্রেণিকরণটি ঘটে মানুষের মনে মনে, বাস্তবে নয়। আর এদিক থেকেই বলা যায়, সব শ্রেণিকরণই মানুষ কর্তৃক সৃষ্ট, সুতরাং তা কৃত্রিম।
তাই প্রাকৃতিক ও কৃত্রিম শ্রেণিকরণের মধ্যে পার্থক্যকে আমি যথার্থ বলে মনে করি না।
শ্রেণিকরণের ভিত্তি হচ্ছে সংজ্ঞা, কিন্তু মতান্তরে লক্ষণ।
শ্রেণিকরণের মাধ্যমে কোনো বিশেষ উদ্দেশ্য সাধনের নিমিত্তে জাগতিক বস্তু বা ঘটনাবলিকে সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্যের ভিত্তিতে বিভিন্ন শ্রেণিতে বিন্যস্ত করা হয়। তবে অনেক সময় কয়েকটি শ্রেণির মধ্যে একই গুণ বিভিন্ন মাত্রায় বিদ্যমান থাকে। এ অবস্থায় সেই শ্রেণিগুলোকে আবার গুণের মাত্রা অনুসারে শ্রেণিবিন্যাস করা হয়। আর এভাবে শ্রেণিবিন্যাস করার প্রক্রিয়াই হচ্ছে ক্রমিক শ্রেণিকরণ।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!