উত্তরঃ
মহান আল্লাহ তায়ালা মানব জাতিকে নারী ও পুরুষ হিসেবে সৃষ্টি করেছেন। মানুষ হিসেবে নারী-পুরুষ উভয়েই সমমর্যাদার অধিকারী। কোথাও শুধু পুরুষকে আশরাফুল মাখলুকাত বলা হয়নি। কিন্তু ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বে পৃথিবীতে নারী জাতিকে অত্যন্ত অবজ্ঞার চোখে দেখা হতো। তাদের জীবন ও সম্ভ্রমের কোনো নিরাপত্তা ছিল না। তাদেরকে জীবন্ত কবর দেয়া হতো। বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীরা নারীদের শুধু ভোগের সামগ্রী হিসেবে ব্যবহার করেছে। তাদেরকে দাসী হিসেবে গণ্য করেছে। একমাত্র ইসলাম ধর্মই নারীকে তার যথাযথ স্থানে সমাসীন করে তাদের অধিকার নিশ্চিত করেছে। ইসলামে নারীর মর্যাদা অনেক। নিচে এ সম্পর্কে আলোচনা করা হলো :
ইসলামে নারীর মর্যাদা: ইসলামে নারীর বহুবিধ অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করা হয়েছে। যেমন-
ক. মাতা হিসেবে: মাতা হিসেবে একজন নারীর মর্যাদা সবার ঊর্ধ্বে। আল্লাহ ও তাঁর রসুলের পর পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি মর্যাদার অধিকারিণী হলেন মা। একজন মায়ের মর্যাদা সম্পর্কে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন, 'আমি মানুষকে তার পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহার করার নির্দেশ দিয়েছি। তার মা তাকে কষ্টের পর কষ্ট করে গর্ভে ধারণ করেন এবং দু'বছর পর্যন্ত স্তন্য পান করান।' এছাড়াও মাতার মর্যাদা ও অধিকার সম্পর্কে রসুলের একাধিক হাদিস বিদ্যমান। যথা- 'জননীর পদতলে সন্তানের বেহেশত।' এছাড়াও তিনি বলেন, 'আল্লাহ ও তাঁর রসুলের পরে সবচেয়ে অধিক সম্মান, মর্যাদা ও সদ্ব্যবহার পাবার যোগ্য হলেন মাতা।' এ ছাড়াও রসুল (স) জনৈক ব্যক্তির প্রশ্নের জবাবে পর পর তিন বার বলেন, 'তোমার নিকট অধিক হকদার হলেন তোমার মাতা।' রসুল (স) তাঁর দুধমাতা হালিমার সাথে উত্তম ব্যবহার করতেন। একবার তিনি আসলে রসুল (স) তাঁর নিজের গায়ের চাদর বিছিয়ে তাঁকে বসতে দেন। এভাবেই ইসলাম মাতা হিসেবে একজন নারীকে পূর্ণ অধিকার ও মর্যাদার আসনে বসিয়েছে।
খ. স্ত্রী হিসেবে: স্ত্রী হিসেবে একজন নারীর মর্যাদা অতি উচ্চে। স্ত্রীকে স্বামীর সমমর্যাদা প্রদান করেছে ইসলাম। স্ত্রীদের সাথে উত্তম আচরণ করা, তাদের ভরণপোষণ ও বাসস্থানের ব্যবস্থা করার মাধ্যমে তাদের অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, স্ত্রীদের ওপর স্বামীর যেমন অধিকার রয়েছে, তেমন স্বামীদের প্রতি স্ত্রীদেরও অধিকার রয়েছে। রসুল (স) তাঁর ঐতিহাসিক বিদায় হজ্জের ভাষণে স্ত্রীদের অধিকার নিশ্চিত করে বলেন, 'তোমরা স্ত্রীদের সাথে উত্তম ব্যবহার করবে।'
গ. কন্যা হিসেবে: কন্যা হিসেবে একজন নারীর অধিকার নিশ্চিত করেছে একমাত্র ইসলাম ধর্মই। ইসলামের পূর্বে কন্যা সন্তানদেরকে জীবন্ত কবর দেয়া হতো। ইসলাম এই প্রথা বাতিল করেছে। মহানবী (স) বলেন, 'যার কন্যা সন্তান জন্ম নেয়, কিন্তু তাকে জীবন্ত কবর দেয় না, লাঞ্ছিত করে না এবং পুত্র সন্তানকে তার থেকে বেশি ভালোবাসে না, আল্লাহ তায়ালা তাকে বেহেশতে প্রবেশ করাবেন।' রসুল (স) তাঁর কন্যা ফাতিমাকে জীবনের থেকে বেশি ভালোবাসতেন। তিনি কোথাও গেলে সবার শেষে তাঁর সাথে দেখা করতেন এবং ফিরে এসে সর্বপ্রথম তাঁর সাথেই দেখা করতেন। এ থেকে একজন কন্যা হিসেবে নারীর মর্যাদা কতটুকু তা অনুধাবন করা যায়।
ঘ. দাসী হিসেবে: দাসী হিসেবে একজন নারীর যে অধিকার প্রাপ্য তা নিশ্চিত করেছে একমাত্র ইসলাম। রসুল (স) বিদায় হজ্জের ভাষণে বলেন, 'তোমরা তোমাদের দাস-দাসীদের সাথে উত্তম ব্যবহার করো, তোমরা যা খাবে, তোমাদের দাসদাসীদেরকেও তা খাওয়াবে এবং তোমরা যা পরবে তাদেরকেও অনুরূপ পরাবে।'
ঙ. সমঅধিকার প্রদান: ইসলাম নারীকে পুরুষের সমান অধিকার প্রদান করেছে। তাদেরকে কোনোভাবে অবহেলিত করার কোনো সুযোগ ইসলামে নেই। পবিত্র কুরআনের ঘোষণা- 'হে আদম! তুমি ও তোমার স্ত্রী জান্নাতে বসবাস করতে থাকো এবং সেখান থেকে তোমরা দুজনে ইচ্ছামত পানাহার কর।' এই আয়াতে নারী ও পুরুষ উভয়কেই সমান অধিকার দেওয়া হয়েছে।
চ. শিক্ষা ক্ষেত্রে: রসুল (স) বলেন- 'নারী-পুরুষ সকল মুসলমানের ওপর বিদ্যার্জন করা ফরজ।' এখানে পুরুষের সাথে সাথে নারীদেরকেও শিক্ষা গ্রহণ করার কথা বলা হয়েছে। রসুল (স) নিজ পত্নীদের ইসলামের অনেক বিধি-বিধান শিক্ষা দিয়েছেন। পরবর্তীতে তাঁরা সাহাবাদের শিক্ষা দিয়েছেন। এ থেকে তাঁদের অধিকার ও মর্যাদা প্রমাণিত।
ছ. ব্যক্তিস্বাধীনতা : ইসলাম-পূর্ব সময়ে নারীদের কোনো ব্যক্তিস্বাধীনতা ছিল না। তারা ছিল পরাধীন, অন্যের দাসী। কিন্তু ইসলাম তাঁদের ব্যক্তিস্বাধীনতা নিশ্চিত করেছে। একজন মাতা, একজন স্ত্রী, একজন কন্যা হিসেবে যথাযোগ্য মর্যাদাদানের মাধ্যমে তাদের ব্যক্তিস্বাধীনতা প্রদান করা হয়েছে।
জ. অর্থনৈতিক মুক্তি: প্রাক-ইসলাম যুগে নারীর কোনো আর্থিক সচ্ছলতা ছিল না। তারা কোনো সম্পদের মালিক হতে পারত না, কিন্তু ইসলাম তাদের সেই অধিকার দিয়েছে। নারীরা তাদের মৃত পিতা-মাতা এবং স্বামীর পরিত্যক্ত সম্পদের অংশীদার হবে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা বলেন, 'পুরুষের জন্য অংশ রয়েছে যা তার পিতামাতা ও নিকট আত্মীয়রা রেখে গেছেন এবং নারীর জন্যও অংশ রয়েছে যা তার পিতামাতা ও নিকট আত্মীয়রা রেখে গেছেন।'
এছাড়া নারীদের মোহরানা প্রদানের মাধ্যমে তাদের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নিশ্চিত করা হয়েছে।
ঝ. রাজনৈতিক অধিকার: একজন নারীও রাষ্ট্রের যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতে পারবে। তারা রাজনৈতিক অধিকার তথা ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবে। ইচ্ছামতো নেতা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবে।
ঞ. ধর্মীয় স্বাধীনতা : ইসলাম নারী-পুরুষ সকলের জন্যই ধর্মীয় বিধানের ব্যবস্থা করেছে। ইসলামের সকল অনুশাসন নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্য। তারা স্বাধীনভাবে ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলতে পারবে। এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহর বাণী, 'পুরুষ বা স্ত্রী যেই হোক, ঈমান আনার মাধ্যমে যে সৎ কাজ করবে সেই জান্নাতে প্রবেশ করবে।' এছাড়াও পবিত্র কুরআন ও হাদিসে নারীদেরকে পুরুষদের সমান ধর্মীয় স্বাধীনতা প্রদান করা হয়েছে।
ট. বিবাহের ক্ষেত্রে: ইসলাম নারীদের বিবাহের ক্ষেত্রে যথেষ্ট স্বাধীনতা প্রদান করেছে। এক্ষেত্রে তাদেরকে কোনোভাবেই জোরজবরদস্তি করা যাবে না। তাদের ইচ্ছা ছাড়া বিবাহ শুদ্ধ হবে না। ইজাব-কবুলে তাদের মতামতের মূল্য দেয়া হয়েছে।
ঠ. সামরিক ক্ষেত্রে: ইসলাম সামরিক ক্ষেত্রেও নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেছে। নারীরা যুদ্ধের ময়দানে অংশগ্রহণ করতে পারবে। নারীরা যুদ্ধে পুরুষদের সেবা ও চিকিৎসার জন্য যেতে পারবে। ইসলামের অনেক যুদ্ধে মুসলিম নারীরা অংশগ্রহণ করে ইতিহাসে বিখ্যাত হয়ে আছেন।
ড. আইনগত মর্যাদা: আইনের দৃষ্টিতে নারী-পুরুষ সমান। ইসলামে উভয়ের জন্যই ভালো কাজের পুরস্কারের ব্যবস্থা এবং অন্যায় কাজের জন্য শাস্তি রয়েছে। নারীদেরকে এ ক্ষেত্রে কোনো প্রকার ছাড় দেওয়া হবে না।
পরিশেষে এ কথাই প্রমাণিত হয়, চির অবহেলিত নারী সমাজকে ইসলামই প্রথম যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করেছে। তাদের অধিকারগুলো নিশ্চিত করেছে। তাদেরকে দিয়েছে সার্বিক মুক্তি। বন্দি-শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করে স্বাধীনভাবে জীবনযাপনের অপূর্ব সুযোগ এনে দিয়েছে। এককথায় ইসলাম নারীদেরকে যে অধিকার ও মর্যাদা দিয়েছে, অন্য কোনো ধর্মে তা দেওয়া হয়নি।