উত্তরঃ
ভূমিকা
বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চিরকল্যাণকর
অর্ধেক তার করিয়াছে নারী অর্ধেক তার নর।
— কাজী নজরুল ইসলাম
সভ্যতার অসাধারণ সাফল্যের পেছনে নারী ও পুরুষের সমান অবদান রয়েছে। নারীদের অংশগ্রহণ ছাড়া সমাজের উন্নয়ন কল্পনাও করা যায় না। তবে যুগ যুগ ধরে নারীরা অবহেলা ও শোষণের শিকার হয়ে এসেছে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় সামাজিক কুসংস্কার, ধর্মীয় গোঁড়ামি ও বৈষম্যের কারণে নারীরা অনেক সময় তাদের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছে। তাদের প্রতিভা বিকাশের সুযোগ অনেকাংশে সীমিত হয়েছে। নারীর পূর্ণ মর্যাদা প্রদান, মেধা ও শ্রমকে শক্তিতে রূপান্তর এবং স্বনির্ভরশীলতা অর্জনের মাধ্যমে সমাজ ও রাষ্ট্র সর্বত্র নারীর ক্ষমতায়ন সম্ভব।
নারীর ক্ষমতায়ন
নারীর ক্ষমতায়ন বলতে বোঝানো হয় একজন নারীর স্বকীয়তা, নিজস্বতা এবং স্বয়ংসম্পূর্ণতার বিকাশ। নারীর ও পুরুষের মধ্যে সমতা প্রতিষ্ঠাই নারীর ক্ষমতায়নের মূল লক্ষ্য। নারীদের ক্ষমতা বিকাশের সুযোগ প্রদান, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সকল ক্ষেত্রে সমান অধিকার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। নারীদের শিক্ষিত ও দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করা এবং সমাজ ও অর্থনীতিতে তাদের অবদানকে যথাযথ সম্মান দেওয়া দরকার। নারীদের প্রতি নির্যাতন প্রতিরোধ করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তখনই নারীর ক্ষমতায়ন সফল হবে।
সংবিধানে নারীর অধিকার
বাংলাদেশের সংবিধানে নারীদের সঠিক স্থান ও অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। সংবিধানের ১৯ নং অনুচ্ছেদে উল্লেখ আছে, “জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে মহিলাদের অংশগ্রহণ ও সুযোগের নিশ্চয়তা রাষ্ট্র দিবে।” ২৭ নং ধারায় বলা হয়েছে, “সকল নাগরিক আইন সমান এবং আইনের সুরক্ষা পাবেন।” এছাড়াও ২৮, ২৯ ও ৬৫ নং ধারায় নারীর সমান অধিকারের বিধান রয়েছে। নারীদের জন্য জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত আসন রয়েছে এবং স্থানীয় শাসন ব্যবস্থায়ও প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা হয়েছে।
বিশ্বে নারীর অবস্থা
পশ্চিমা দেশগুলোতে নারীর ক্ষমতায়নের বিষয়টি তুলনামূলকভাবে এগিয়ে। জাতিসংঘ নারীর উন্নয়ন ও ক্ষমতায়ন নিয়ে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। ১৯৭৫ সালকে ‘বিশ্ব নারী বর্ষ’ ঘোষণা করে এবং পরবর্তীতে নারী দশক ঘোষণা করা হয়। প্রথম থেকে চতুর্থ বিশ্ব নারী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে নারীর অধিকারের প্রসারে। উন্নত দেশগুলোর নারী শিক্ষা, অর্থনীতি ও রাজনীতিতে সমানভাবে অংশ নিচ্ছে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশে নারীরা অনেক ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হলেও অগ্রগতি লক্ষণীয়। স্বাধীনতা সংগ্রামে নারীদের অবদান এবং নারী পুনর্বাসন, প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় নারীর নিরাপত্তা, দারিদ্র্য বিমোচন ও সমঅংশগ্রহণ নিশ্চিতকরণে কাজ করছে। তৈরি পোশাক খাতের নারীদের অবদান দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ।
নারীর প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক অবস্থান
বাংলাদেশে মহিলাদের জন্য ৫০টি আসন সংরক্ষিত থাকলেও সরাসরি নির্বাচিত নারীর সংখ্যা কম। কর্মক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ সীমিত। সরকারি চাকরিতে নারীদের সংখ্যা তুলনামূলক কম। কৃষি, ম্যানুফ্যাকচারিং, পরিবহন ও বিপণন খাতে নারীদের অবস্থান উল্লেখযোগ্য হলেও উন্নয়নের সুযোগ আরও বাড়ানো প্রয়োজন।
নারীর ক্ষমতায়নের বাধা
তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশে নারীর ক্ষমতায়ন সন্তোষজনক নয়। সামাজিক কুসংস্কার, শিক্ষার অভাব, নিরাপত্তার ঘাটতি, এবং সংকীর্ণ চিন্তাভাবনা নারীদের উন্নয়নের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে।
করণীয়
নারীদের শিক্ষা বাড়ানো এবং আইনি ও রাজনৈতিক অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে।
সামাজিক অবকাঠামোতে নারী-পুরুষের সমতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
ধর্মীয় বাণী ও নৈতিক শিক্ষার মাধ্যমে নারীদের মর্যাদা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।
নারীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ উৎসাহিত করতে হবে।
স্বাস্থ্য, প্রশিক্ষণ ও সাংস্কৃতিক উন্নয়নে নারীদের সুযোগ দিতে হবে।
কর্মস্থলে নিরাপত্তা ও সমান মজুরি নিশ্চিত করতে হবে।
সরকারী উদ্যোগ
সরকার নারীর ক্ষমতায়ন এবং উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। সরকারি চাকরিতে নারীর জন্য কোটা নির্ধারণ, মহিলা বিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠন, প্রাথমিক শিক্ষায় নারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি, এবং আইনি সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ এসব উদ্যোগের মধ্যে রয়েছে।
নারী নির্যাতন প্রতিরোধ
নারীর ক্ষমতায়নের জন্য নারী নির্যাতন বন্ধ করা প্রয়োজন। সচেতনতা বৃদ্ধি, কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা, নিরাপদ আশ্রয় ও আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি।
উপসংহার
“কোনো কালে একা হয়নিকো জয়ী পুরুষের তরবারি
প্রেরণা দিয়েছে সাহস দিয়েছে বিজয়লক্ষ্মী নারী।”
— কাজী নজরুল ইসলাম
নারীরা সমাজের অর্ধেক অংশ, তাদের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। নারীর ক্ষমতায়ন ছাড়া সমৃদ্ধ ও উন্নত সমাজ গড়া সম্ভব নয়। সংগ্রহ: Satt academy