"পরোপকারই পরম ধর্ম" অর্থাৎ, অন্যের মঙ্গল সাধন করাই শ্রেষ্ঠ ধর্ম। এই উক্তির মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে যে প্রকৃত ধর্ম শুধু নিজের স্বার্থে সীমাবদ্ধ নয়, বরং অন্যের কল্যাণে নিবেদিত হওয়াই প্রকৃত ধর্মের পরিচায়ক।
ব্যাখ্যা:
মানবজীবনের আসল সৌন্দর্য পরোপকারে। যারা নিঃস্বার্থভাবে অন্যের কল্যাণ করে, তারা সমাজে শ্রদ্ধার পাত্র হন এবং প্রকৃত ধর্মের সাধক হিসেবে বিবেচিত হন।
১. মানবতার মূলনীতি: সমাজে শান্তি ও সৌহার্দ্য বজায় রাখতে হলে মানুষকে একে অপরের সাহায্যে এগিয়ে আসতে হবে। পরোপকারের মধ্যেই মানুষের সত্যিকারের মূল্যবোধ প্রকাশ পায়।
২. ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ: সকল ধর্মেই পরোপকারের গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ইসলাম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ প্রতিটি ধর্মেই বলা হয়েছে যে নিঃস্বার্থভাবে মানুষের উপকার করাই প্রকৃত ধর্মের অংশ।
৩. ব্যক্তিগত ও সামাজিক উপকারিতা: যারা পরোপকারী, তারা সমাজে সম্মানিত হন। অন্যের সেবায় আত্মনিয়োগ করলে মানুষ মানসিক শান্তি ও পরিতৃপ্তি লাভ করে, যা জীবনের প্রকৃত সার্থকতা।
উদাহরণ:
মাদার তেরেসা সারাজীবন দরিদ্র ও অসহায়দের সেবায় আত্মনিয়োগ করেছেন।
হাজী মুহাম্মদ মহসিন তাঁর সম্পদ দান করে দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি জাতির মুক্তির জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন।
উপসংহার:
পরোপকার ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনে। প্রকৃতপক্ষে, স্বার্থপরতা মানুষকে সংকীর্ণ করে তোলে, আর পরোপকার মানুষকে মহান করে। তাই বলা হয়, "পরোপকারই পরম ধর্ম।"
"যার ভিতরে ভয়, সে-ই বাইরে ভয় পায়"—এই কথার মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে যে একজন মানুষের মনে যদি ভয় বা দ্বিধা থাকে, তাহলে সে বাস্তব জীবনেও সেই ভয়ের প্রকাশ ঘটাবে। অর্থাৎ, অন্তরের দুর্বলতা বাহ্যিক আচরণে প্রতিফলিত হয়।
উত্তরঃ
"যার ভিতরে ভয়, সে-ই বাইরে ভয় পায়"—এই কথার মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে যে একজন মানুষের মনে যদি ভয় বা দ্বিধা থাকে, তাহলে সে বাস্তব জীবনেও সেই ভয়ের প্রকাশ ঘটাবে। অর্থাৎ, অন্তরের দুর্বলতা বাহ্যিক আচরণে প্রতিফলিত হয়।
তাৎপর্য:
১. মনের শক্তিই আসল শক্তি – যদি কেউ আত্মবিশ্বাসী হয় এবং মনে সাহস রাখে, তাহলে বাইরের কোনো বিপদ বা প্রতিকূলতা তাকে সহজে দমিয়ে দিতে পারবে না। – কিন্তু যার মনে সবসময় ভয় বা সন্দেহ কাজ করে, সে সামান্য সমস্যাতেও আতঙ্কিত হয়ে পড়ে।
২. ভীতু মন দুর্বলতা সৃষ্টি করে – ভয়ের কারণে মানুষ বাস্তব জীবনে দৃঢ়ভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। – যারা মনে মনে ভীতু, তারা যেকোনো চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে ভয় পায় এবং পিছিয়ে যায়।
৩. মানসিক প্রস্তুতির গুরুত্ব – জীবনসংগ্রামে সফল হতে হলে ভয়কে জয় করা জরুরি। – আত্মবিশ্বাস, ধৈর্য ও সাহস থাকলে যে কোনো কঠিন পরিস্থিতি সহজে মোকাবিলা করা যায়।
৪. উদাহরণ: – পরীক্ষার আগে যে শিক্ষার্থী মনে করে সে ব্যর্থ হবে, সে পরীক্ষার হলে গিয়ে বেশি নার্ভাস হয়ে পড়ে। – যে যোদ্ধা মনে ভয় পোষণ করে, সে যুদ্ধক্ষেত্রে সহজেই পরাজিত হয়। – কোনো বক্তা যদি মনে করে, তার কথা শ্রোতারা গ্রহণ করবে না, তবে বক্তৃতার সময় সে আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলবে।
উপসংহার:
ভয় মানুষকে ভেতর থেকে দুর্বল করে তোলে। তাই বাহ্যিক জগতে শক্তিশালী হতে হলে প্রথমে মনে সাহস আনতে হবে। আত্মবিশ্বাস ও ধৈর্য থাকলে বাহ্যিক কোনো বিপদ বা প্রতিকূলতাই মানুষকে দুর্বল করতে পারবে না।
'ঠিক যেন ফুলদানিতে জল দিয়া ভিজাইয়া রাখা বাসি ফুলের মতো।' – এই উক্তিটি বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কালজয়ী ছোটগল্প 'একরাত্রি' থেকে নেওয়া হয়েছে। গল্পে রামনাথ তার স্ত্রী সুরবালার প্রতি এক ধরনের করুণা মিশ্রিত কর্তব্যবোধ অনুভব করেন, কিন্তু তাদের দাম্পত্যে ভালোবাসার সজীবতা ও আবেগ অনুপস্থিত। এই উপমাটি সেই অনুভূতির গভীরতা প্রকাশ করে।
এখানে 'বাসি ফুল' বলতে দাম্পত্য জীবনের সেই অবস্থাটিকে বোঝানো হয়েছে, যেখানে ভালোবাসার সজীবতা, সতেজতা ও প্রাণবন্ততা হারিয়ে গেছে। ফুল যেমন বাসি হয়ে গেলে তার সৌন্দর্য ও সৌরভ হারায়, তেমনি রামনাথের মনে সুরবালার প্রতি কোনো তীব্র প্রেম বা আকর্ষণ অবশিষ্ট নেই। 'ফুলদানিতে জল দিয়া ভিজাইয়া রাখা' উপমাটির মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে যে, তাদের সম্পর্কটি কেবল সামাজিক রীতি বা কর্তব্যবোধের কারণে টিকে আছে, কৃত্রিম উপায়ে টিকিয়ে রাখা হয়েছে। এটি ভালোবাসার স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ নয়, বরং এক ধরনের প্রচেষ্টা মাত্র।
এই উক্তিটির মাধ্যমে রামনাথের অন্তরের দোটানা ও সুরবালার প্রতি তার অনুভূতি অত্যন্ত নিপুণভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। তিনি সুরবালাকে ভালোবাসেন না, কিন্তু তাকে অবহেলাও করতে পারেন না। তাদের সম্পর্কটি দায়বদ্ধতা ও করুণার উপর দাঁড়িয়ে, যেখানে প্রেম ও আবেগ অনুপস্থিত। এই বিশ্লেষণ গল্পে রামনাথের মানসিক জটিলতা এবং তাদের দাম্পত্য জীবনের বিষাদময় চিত্রকে পাঠকের সামনে স্পষ্ট করে তোলে।
আঠারো বছর বয়স দুঃসহ কারণ এই বয়স একদিকে যেমন অফুরন্ত প্রাণশক্তি ও সাহসের প্রতীক, তেমনই অন্যদিকে বিপদ, বিপর্যয় ও পথভ্রষ্টতার সম্ভাবনায় ভরা এক অস্থির ও জটিল সময়।
কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য তাঁর বিখ্যাত কবিতা 'আঠারো বছর বয়স'-এ এই বয়সকে 'দুঃসহ' বলে অভিহিত করেছেন কারণ এটি এমন এক সন্ধিক্ষণ যেখানে তরুণ-তরুণীরা অপরিণত বুদ্ধি এবং অপরিমিত আবেগ নিয়ে জীবনকে জয় করতে চায়। এ বয়সে যেমন নতুন কিছু সৃষ্টির অদম্য স্পৃহা থাকে, তেমনি ভুল পথে চালিত হওয়ার বা সর্বনাশের গভীরে তলিয়ে যাওয়ার প্রবল সম্ভাবনাও থাকে। কবি এই বয়সকে 'তীর বেগে ধেয়ে চলে', 'তীব্র আর ধারালো' এবং 'রক্তের প্রবল প্রতাপ' হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যা একইসাথে ক্ষমতা ও বিপদের ইঙ্গিত দেয়। এ সময় মন থাকে অস্থির, আবেগের বশে ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা দেখা যায় এবং সামাজিক ও ব্যক্তিগত নানা টানাপোড়েন একজন তরুণকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে। তাই, আশাবাদ, সংগ্রাম ও সম্ভাবনার পাশাপাশি এই বয়স তার অন্তর্নিহিত অস্থিরতা, ঝুঁকি ও চ্যালেঞ্জের কারণে 'দুঃসহ' হয়ে ওঠে।
উদ্ধৃত চরণ দুটির মাধ্যমে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর "সোনার তরী" কবিতার মূল ভাবটি প্রকাশ করেছেন। এখানে "ছোট সে তরী" বলতে জীবন ও সময়ের ক্ষণস্থায়ী মাধ্যমকে বোঝানো হয়েছে এবং "আমারি সোনার ধানে গিয়েছে ভরি" বলতে কবির সমস্ত সৃষ্টি, শিল্পকর্ম, গান, কবিতা ইত্যাদি মহৎ কীর্তিকে বোঝানো হয়েছে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিখ্যাত কবিতা "সোনার তরী"-এর এই দুটি চরণ গভীর দার্শনিক অর্থ বহন করে। "ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই-ছোট সে তরী / আমারি সোনার ধানে গিয়েছে ভরি" চরণ দুটির মাধ্যমে কবি বোঝাতে চেয়েছেন যে, ব্যক্তি মানুষের জীবন ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু তার সৃষ্টিকর্ম অমর। কবি তার জীবনের সমস্ত সাধনা, মেধা ও শ্রম দিয়ে যে "সোনার ধান" (অর্থাৎ, তার সাহিত্যকর্ম) ফলিয়েছেন, সেই ধান নিয়ে যাওয়ার জন্য তরীটি প্রস্তুত। তরীটি অর্থাৎ জীবন ও সময়, কবির সমস্ত সৃষ্টিকে স্থান দিয়েছে, কিন্তু তরীটিতে স্বয়ং কবির জন্য কোনো ঠাঁই নেই।
এটি কবিগুরুর সেই উপলব্ধিকে নির্দেশ করে যেখানে শিল্পী বা স্রষ্টা নিজে মরণশীল হলেও তার সৃষ্টিকর্ম চিরকাল ধরে বেঁচে থাকে। শিল্পীর নশ্বর দেহ কালের অতলে হারিয়ে গেলেও তার শিল্প বা মহৎ সৃষ্টি অমরত্ব লাভ করে এবং উত্তর প্রজন্মের কাছে প্রেরণার উৎস হয়ে থাকে। এখানে "তরী" প্রতীকী অর্থে সময়, জগৎ বা এক মহাজাগতিক প্রবাহকে বোঝায় যা মহৎ কীর্তিকে ধারণ করে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে চলে, কিন্তু ব্যক্তি নশ্বর। এই চরণ দুটি শিল্পের অমরত্ব এবং শিল্পীর নশ্বরতার এক চিরন্তন সত্যকে তুলে ধরে।
বিবিসির জরিপে (২০০৪) সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙালির তালিকায় ২য় স্থান প্রাপ্ত নোবেল জয়ী বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন বাংলা সাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতিভা, সব্যসাচী লেখক, কবি, নাট্যকার, ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, প্রাবন্ধিক, দার্শনিক, সঙ্গীত রচয়িতা, সুরস্রষ্টা, গায়ক, চিত্রশিল্পী, অভিনেতা, সমাজসেবী, শিক্ষাবিদ, গ্রামীণ ক্ষুদ্রঋণ ও গ্রাম উন্নয়ন প্রকল্পের পথিকৃৎ। ১৯৩০ সালে জার্মানিতে আইনস্টাইনের সাথে সাক্ষাৎ হয়। সাক্ষাতে তিনি দর্শন, মানুষ ও বিজ্ঞান নিয়ে আলোচনা করেন।
রবীন্দ্রনাথের পরিবারটি পিরালি ব্রাহ্মণ [বিধর্মীদের সংস্পর্শে এসে জাত হারানো ব্রাহ্মণরা হলেন পিরালি ব্রাহ্মণ]। (পারিবারিক উপাধি কুশারি)। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পূর্বপুরুষ জগন্নাথ কুশারি পিরালি ব্রাহ্মণ মেয়ে বিয়ে করলে হিন্দু ধর্ম থেকে বিচ্যুত হয় এবং সমাজচ্যুত করা হয়। তার ছেলে পঞ্চানন কুশারি ১৮ শতকের শুরুতে খুলনার দক্ষিণড়িতি থেকে কলকাতার গোবিন্দপুরে এসে জেলে পাড়ার পুরোহিতের কাজ করা শুরু করেন। ফলে অনেকে ঠাকুর বলে ডাকেন। এছাড়াও ইংরেজদের বাণিজ্য তরীতে দ্রব্য উঠা-নামার কাজ করলে ইংরেজরাও তাকে ঠাকুর বলে ডাকতেন। তারই উত্তর প্রজন্ম দ্বারকানাথ ঠাকুর ইংরেজনে কাছ থেকে অর্থের পাশাপাশি 'প্রিন্স' উপাধি লাভ করেন ক্রমান্বয়ে শত বছরের ব্যবধানে জেলে সম্প্রদায়ের পুরোহিত থেকে কলকাতার প্রভাবশালী পরিবারে পরিণত হয়।
ঠাকুর পরিবারে জমিদারি ছিল বাংলাদেশের কুষ্টিয়া জেলার শিলাইদহ, সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুর ও নওগাঁ জেলার আত্রাই উপজেলার কালিগ্রাম নামক তিনটি জমিদারি ছিল জোড়াসাঁকোর ঠাকুন পরিবারের। এর মধ্যে উত্তরাধিকার সূত্রে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কালিগ্রাম জমিদারির দায়িত্ব পান। ১৩ জুন, ১৮৯১ সালে তিনি জমিদারি দেখাশোনার জন্য কালিগ্রামে প্রথম আসেন ২৭ জুলাই, ১৯৩৭ সালে তিনি শেষবার কালিগ্রামে আসেন এবং কালিগ্রাম ইউনিয়নের পতিসরে অবস্থিত তার পুত্রের নামে 'কালিগ্রাম রথীন্দ্রনাথ ইনস্টিটিউশন' নামক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি নোবেল পুরস্কারের অর্থ দিয়ে প্রতিষ্ঠিত করেন।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ৭ মে, ১৮৬১ সালে (২৫ বৈশাখ, ১২৬৮ বঙ্গাব্দ) কলকাতার জোড়াসাঁকোর বিখ্যাত ঠাকুর পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মশতবার্ষিকী পালিত হয় ১৯৬১ সালে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পিতামহ: প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর; পিতামহি: দিগম্বরী দেবী; পিতা: দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর; মাতা: সারদা দেবী। তিনি পিতা-মাতার ১৫জন সন্তানের মধ্যে ১৪তম সন্তান এবং ৮ম পুত্র। রবীন্দ্রনাথের বাবা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ফারসি কবি হাফিজ ও শেখ সাদীর অনুরাগী ছিলেন।
তিনি ৯ ডিসেম্বর, ১৮৮৩ সালে ঠাকুরবাড়ীর অধস্তন কর্মচারী বেণীমাধব রায় চৌধুরীর কন্যা ভবতারিণী দেবীকে বিয়ে করেন। বিয়ের পর রবীন্দ্রনাথ নাম রাখেন মৃণালিনী দেবী। স্ত্রী ভবতারিণী দেবী খুলনার দক্ষিণডিহি গ্রামের মেয়ে।
তিনি 'সাধনা' (১৮৯৪), 'ভারতী' (১৮৯৮), 'বঙ্গদর্শন' (১৯০১), 'তত্ত্ববোধিনী' (১৯১১) পত্রিকা সম্পাদনা করেন।
সাহিত্যিক জীবনের শুরুতে তিনি বিহারীলাল চক্রবর্তীর অনুসারী ছিলেন। পরবর্তীতে তাঁর সাহিত্যে মধ্যযুগীয় বৈষ্ণব পদাবলি, উপনিষদ, দোঁহাবলি, লালনের বাউল গান ও রামপ্রসাদ সেনের শাক্ত পদাবলির প্রভাব পরিলক্ষিত হয়।
তাঁর শ্রেষ্ঠ কাব্য সংকলনের নাম 'সঞ্চয়িতা'।
হিন্দু-মুসলমান মিলনের লক্ষ্যে রবীন্দ্রনাথ 'রাখিবন্ধন' উৎসবের সূচনা করেন।
ব্রিটিশ সরকার ৩ জুন, ১৯১৫ সালে রবীন্দ্রনাথকে 'নাইটহুড' বা 'স্যার' উপাধি প্রদান করেন। পরবর্তীতে ১৩ এপ্রিল, ১৯১৯ সালে পাঞ্জাবের অমৃতসরের জালিয়ানওয়ালাবাগের হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে তা বর্জন করেন।
তিনি ৭ আগস্ট, ১৯৪১ সালে (২২ শ্রাবণ, ১৩৪৮ বঙ্গাব্দ) দুপুর ১২টা ১০ মিনিটে মৃত্যুবরণ করেন।
ব্রহ্মচর্যাশ্রম প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯০১ সালে শান্তিনিকেতন (বোলপুরে)। পরবর্তীতে এটি ১৯২১ সালে 'বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়' এ রূপান্তরিত হয়।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রথম প্রকাশিত রচনাবলি:
প্রথম প্রকাশিত কবিতা
'হিন্দু মেলার উপহার' (২৫/০২/১৮৭৪): তাঁর মাত্র ১৩ বছর বয়সে কবিতাটি অমৃতবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত হয় [সূত্র: বাংলা একাডেমি চরিতাভিধান।]
'অভিলাষ' (১৮৭৪): এটি প্রকাশিত হয় 'তত্ত্ববোধিনী' পত্রিকায় (সূত্র: বাংলাপিডিয়া)। তিনি মাত্র ৮ বছর বয়সে কবিতা লেখা শুরু করেছিলেন।
প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ
'কবি-কাহিনী' (১৮৭৮), এটি তাঁর ১৭ বছর বয়সে প্রকাশিত হয়। এ কাব্যের কবিতাগুলি 'ভারতী' পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।
প্রথম অপ্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ
'পৃথ্বীরাজের পরাজয়'। ১২৭৯ বঙ্গাব্দের ফাল্গুন মাসে রবীন্দ্রনাথ তাঁর বাবার সাথে বোলপুর-শান্তিনিকেতনে যান এবং সেখানেই বীররসাত্মক এ কাব্য রচনা করেন। এ কাব্যটি সম্পর্কে তাঁর 'জীবনস্মৃতি'তে বিস্তারিত পাওয়া যায়।
প্রথম প্রকাশিত কবিতার লাইন
মীনগণ দীন হয়ে ছিল সরোবরে / এখন তাহারা সুখে জলে ক্রীড়া করে।
প্রথম প্রকাশিত নাটক
'বাল্মীকি প্রতিভা' (১৮৮১), এটি তাঁর গীতিনাট্য। অধিকাংশের মতে, রবীন্দ্রনাথের প্রথম প্রকাশিত নাটক 'রূদ্রচণ্ড' (১৮৮১)। কিন্তু 'রূদ্রচণ্ড' নাটক নয়, নাটিকা। রবীন্দ্রনাথ নিজেই বাল্মীকির ভূমিকায় অভিনয় করেন।
প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস
'বৌ-ঠাকুরাণীর হাট' (১৮৮৩), এটি ঐতিহাসিক উপন্যাস। উৎসর্গ করেন সৌদামিনী দেবীকে।
প্রথম প্রকাশিত ছোটগল্প
'ভিখারিণী' (১৮৭৭)
প্রথম প্রকাশিত প্রবন্ধগ্রন্থ
'বিবিধপ্রসঙ্গ' (১৮৮৩)
প্রথম প্রকাশিত রচনা সংকলন
'চয়নিকা' (১৯০৯)
প্রথম সম্পাদিত পত্রিকা
'সাধনা' (১৮৯৪)
সর্বশেষ প্রকাশিত ছোটগল্প
'ল্যাবরেটরী' (১৯৪০)
সর্বশেষ রচিত গল্প
'মুসলমানীর গল্প'
বনফুল:
'বনফুল' (১৮৮০): এটি রবীন্দ্রনাথ রচিত প্রথম সম্পূর্ণ কাব্য। কিন্তু প্রকাশের দিক দিয়ে দ্বিতীয়। গ্রন্থাগারে প্রকাশিত হওয়ার ৪ বছর পূর্বে অর্থাৎ ১৫ বছর বয়সে রচনা করেন। এ কাব্যের কবিতাগুলি ১৮৭৬ সালেই 'জ্ঞানাঙ্কুর' ও 'প্রতিবিম্ব' পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়। কিন্তু গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয় ১৮৮০ সালে। তাই 'বনফুল'কে প্রথম কাব্যগ্রন্থ বলা যায় না। যদিও অনেকে এটিকে প্রথম কাব্যগ্রন্থ বলে থাকেন কিন্তু তা সঠিক নয়। ৮টি সর্গে বিভক্ত এ কাব্যের কবিতায় বিহারীলাল চক্রবর্তীর প্রভাব পরিলক্ষিত হয়।
'গীতাঞ্জলি' কাব্য ১৯১০ সালে প্রকাশিত হয় ।
গীতাঞ্জলির অনুবাদ Song Offerings নামে ১৯১২ সালে ইংল্যান্ড থেকে প্রকাশিত হয়।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 'গীতাঞ্জলি' কাব্যগ্রন্থের জন্য নোবেল পুরস্কার পাননি। তিনি ১৯১৩ সালের নভেম্বর মাসে নোবেল পুরস্কার পান 'গীতাঞ্জলি'র ইংরেজি অনুবাদ Song Offerings এর জন্য। নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির সময় তাঁর বয়স ছিল ৫২ বছর। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রথম ভারতীয় এবং সাহিত্যে একমাত্র নোবেলজয়ী বাঙালি।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নোবেল চুরি হয়ে যায় শান্তি নিকেতন থেকে ২৪ মার্চ, ২০০৪ সালে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মোট কাব্যগ্রন্থ ৫৬টি।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মোট নাটক ২৯টি, কাব্যনাট্য ১৯টি।
বাংলা ছোটগল্পের জনক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
রবীন্দ্রনাথের মোট ছোটগল্প ১১৯টি।
রবীন্দ্রনাথের প্রবন্ধ গ্রন্থঃ 'কালান্তর' (১৯৩৭): এটি ভারতবর্ষীয় রাজনৈতিক সমস্যা বিষয়ক বিভিন্ন প্রবন্ধের সংকলন। 'পঞ্চভূত' (১৮৯৭): এ প্রবন্ধগুলি 'সাধনা' পত্রিকায় 'পঞ্চভূতের ডায়রি' নামে প্রকাশিত হতো। পত্রিকায় প্রকাশের সময় লেখকের নাম ছাপা হতো 'লেখক ভূতনাথ বাবু'। 'বিচিত্রপ্রবন্ধ' (১৯০৭): এ গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত প্রবন্ধ 'লাইব্রেরি'। 'বিবিধ প্রসঙ্গ' (১৮৮৩), 'সাহিত্য' (১৯০৭), 'শিক্ষা' (১৯০৮), 'মানুষের ধর্ম
রবীন্দ্রনাথের ভ্রমণকাহিনিঃ 'য়ুরোপ প্রবাসীর পত্র (১৮৮১): এটি তাঁর প্রথম প্রকাশিত ভ্রমণকাহিনি। এটি চলিত ভাষায় লিখিত। 'য়ুরোপ প্রবাসীর ডায়রি' (১৮৯১), 'জাভা যাত্রীর পর (১৯২৯), 'জাপান যাত্রী' (১৯১৯), 'রাশিয়ার চিটিং (১৯৩১), 'পারস্যে' (১৯৩৬)।
রবীন্দ্রনাথের ধ্বনিবিজ্ঞানের উপর লেখা গ্রন্থের নাম 'শব্দতত্ত্ব' (১৯০৯)।
রবীন্দ্রনাথের বিজ্ঞানবিষয়ক গ্রন্থের নাম 'বিশ্বপরিচয়' (১৯৩৭)। এটি সত্যেন্দ্রনাথ বসুকে উৎসর্গ করেন।
রবীন্দ্রনাথের পত্র সংকলনগুলোঃ 'ছিন্নপত্র' (১৯১২): এতে মোট ১৫১টি পত্র আছে। এর প্রথম ৮টি পত্র শ্রীশচন্দ্র মজুমদারকে এবং ১৪৩টি স ভ্রাতুষ্পুত্রী ইন্দিরা দেবীকে লেখা। 'ভানুসিংহের পত্রাবলী': এটি রানু অধিকারীকে লেখেন। 'পথে ও পথের প্রান্তে': নির্মলকুমারী মহলানবিশকে লেখা ।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চিত্রকলাঃ ৭০ বছর বয়সের পর তিনি ছবি আঁকা শুরু করেন। তার অঙ্কিত ছবি ও স্কেচের সংখ্যা প্রায় ২০০০টি। নিজের আর ছবিগুলোকে তিনি 'শেষ বয়সের প্রিয়া' বলে আখ্যায়িত করেছেন।
রবীন্দ্রনাথের আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থের নামঃ 'জীবনস্মৃতি' (১৯১২): এতে রবীন্দ্রনাথের বাল্যকাল থেকে পঁচিশ বছর বয়স পর্যন্ত সময়ের ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। 'চরিত্রপূজা' (১৯০৭), 'ছেলেবেলা' (১৯৪০)।
রবীন্দ্রনাথের সনেট জাতীয় রচনা বাংলার মাটি বাংলার জল।
বাংলাদেশের জাতীয় সংগীতের রচয়িতা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
সমাজে বসবাস করতে হলে মানুষকে একে অপরের সাথে সম্পর্ক বজায় রেখে চলতে হয় এবং সমাজে শত্রু-মিত্র উভয়ের সাথেই কোন না কোনভাবে মেলামেশা হয়। কিন্তু এক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয় সেটি হল শিক্ষা। মানুষের বন্ধু নির্বাচনের ক্ষেত্রে শিক্ষার মানদণ্ডটি অতীব জরুরি। কেননা, অশিক্ষিত বন্ধুর যত আন্তরিকতাই থাক না কেন, সে যে কোন মুহূর্তে নিজের অজ্ঞতাবশত অনেক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। বলা হয়, মূর্খ ব্যক্তি পশুর সমান। ভালোমন্দ বিচার করার যথাযথ ক্ষমতা তার নেই। অনেক সময় বন্ধুর ভালোর জন্য কিছু করলেও তার অজ্ঞতার কারণে তা বন্ধুর ক্ষতি বয়ে আনতে পারে। এজন্য তাকে দোষও দেওয়া যায় না। অন্যদিকে, শত্রুকে আমরা সাধারণত অনিষ্টের কারণ হিসেবেই বিবেচনা করি। কিন্তু তুলনামূলক বিচারে দেখা যায়, একজন মুর্খ বন্ধু অজ্ঞতাবশত যা করতে পারে, একজন শিক্ষিত শত্রু সজ্ঞানে তেমনটি করতে পারে না। জ্ঞানের নির্মল পরশ অন্তত তাকে এ কাজ থেকে ফিরিয়ে রাখতে পারে। যদি অনিষ্ট সে করে তবে সেটা হবে তার দুরাচার। আর মানুষ সব সময়ই শত্রুর দুরাচার সম্পর্কে সজাগ থাকে। ফলে শত্রুর এ চেষ্টা সফল নাও হতে পারে। কিন্তু বন্ধুর ব্যাপারে কোন সন্দেহ না থাকায় মানুষ এতটা সতর্ক থাকে না। অথচ এ অসতর্কতার ফাঁকে মূর্খ বন্ধুর অজ্ঞতাই তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়াতে পারে।
তাই বন্ধু নির্বাচনে জ্ঞান, প্রজ্ঞা আর শিক্ষাকে গুরুত্ব দিতে হবে। কেননা, জ্ঞান আলো এবং মূর্খতা অন্ধকারের সমতুল্য। আলোতে অনেক বিপদেও নিরাপদ থাকা যায়, অন্যদিকে অন্ধকারে সর্বদাই বিপদের আশঙ্কা থাকে
"ভাবের ললিত ক্রোড়ে না রাখি নিলীন, কর্মক্ষেত্রে করি দাও সক্ষম স্বাধীন।"
এটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের "যতদিন ছিলে" কবিতার একটি অংশ।
**ভাব-সম্প্রসারণ:**
এই উদ্ধৃতিটি একটি গভীর জীবনদর্শনের প্রতিফলন। এখানে 'ভাবের ললিত ক্রোড়ে না রাখি নিলীন' বলতে বোঝানো হচ্ছে যে, ব্যক্তিগত চিন্তা, অনুভূতি বা ভাবনাগুলোকে শুধুমাত্র মনস্তাত্ত্বিক বা আবেগগতভাবে না রেখে বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করতে হবে। 'নিলীন' শব্দের মাধ্যমে এখানে অভ্যন্তরীণ চিন্তা বা অনুভূতির গভীরতা প্রকাশ করা হয়েছে, যা শুধুমাত্র অন্তরেও লুকিয়ে থাকলে চলবে না। অন্যদিকে, 'কর্মক্ষেত্রে করি দাও সক্ষম স্বাধীন' বাক্যে বলা হচ্ছে যে, আমাদের দক্ষতা, কর্মক্ষমতা ও স্বাধীনতা কার্যক্ষেত্রে প্রয়োগ করা উচিত। কর্মক্ষেত্রে আমরা যে সিদ্ধান্ত নিতে পারি এবং যে কাজ করতে পারি, তা যেন আমাদের স্বাধীনতা ও দক্ষতার ভিত্তিতে হয়। এখানে স্বাধীনতার সাথে সক্ষমতার সম্মিলন প্রস্ফুটিত হচ্ছে, যেখানে ব্যক্তি নিজের দক্ষতা অনুযায়ী স্বাধীনভাবে কাজ করার স্বাধীনতা পায়। সংক্ষেপে, এই উদ্ধৃতিটি আমাদেরকে উৎসাহিত করে যে, আমাদের অভ্যন্তরীণ ভাবনা বা চিন্তাকে শুধু মনে সীমাবদ্ধ না রেখে, বাস্তব জীবনের কাজে লাগিয়ে কার্যকরীভাবে ব্যবহারের মাধ্যমে কর্মক্ষেত্রে নিজের সক্ষমতা ও স্বাধীনতা প্রমাণ করতে হবে।
উত্তরঃ
আমরা সবসময় ভাবের গহনায়, অনুভূতির গভীরতায় হারিয়ে থাকি, যেখানে কোনো এক নিস্তব্ধতা বা মাধুর্য লুকিয়ে থাকে। কিন্তু কর্মক্ষেত্রে, বাস্তব জীবনে সেই ভাবনার পরিবর্তে আমাদের প্রমাণিত করতে হয় আমাদের ক্ষমতা এবং স্বাধীনতার। সেখানে ভাবের বন্দি হয়ে থাকার সুযোগ নেই। আমরা যদি শুধু ভাবনায় নিমজ্জিত থাকি, তবে বাস্তবতার চাহিদার সাথে তাল মিলিয়ে চলতে পারব না।
এখানে "ভাবের ললিত ক্রোড়ে" বলতে বোঝানো হচ্ছে যে আমরা আমাদের ভাবনাগুলোকে এতটাই গুরুত্ব দিই যে সেগুলো আমাদের কর্মক্ষমতা বা স্বাধীনতার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু বাস্তবিকভাবে আমাদের শক্তি এবং স্বাধীনতা আমাদের কাজের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়। আমাদের উচিত আমাদের ভাবনার সাথে সাথে কর্মক্ষেত্রে সক্রিয়ভাবে কাজ করা, যাতে আমাদের সক্ষমতা এবং স্বাধীনতা স্বতন্ত্রভাবে প্রকাশ পায়।
এইভাবে, কবি আমাদের শেখাতে চাইছেন যে ভাবনা ও কর্মের মধ্যে সমন্বয় প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। ভাবনার সৌন্দর্য বা গভীরতা তার স্থানেই মূল্যবান, কিন্তু কর্মক্ষেত্রে দক্ষতা ও স্বাধীনতার প্রয়োগই আসল বিষয়।
“যত মত তত পথ” – এই প্রবাদটি মানব সমাজের বৈচিত্র্য, চিন্তার স্বাধীনতা এবং সত্য উপলব্ধির বহুবিধ পন্থাকে নির্দেশ করে। জগৎ ও জীবনের জটিলতা এত গভীর যে, একটি মাত্র দৃষ্টিকোণ থেকে এর সম্পূর্ণতা অনুধাবন করা অসম্ভব। মানুষ যেহেতু স্বতন্ত্র সত্তা, তাদের চিন্তাভাবনা, অভিজ্ঞতা, বিশ্বাস এবং মূল্যবোধ ভিন্ন হওয়া স্বাভাবিক। এই ভিন্নতা থেকেই জন্ম নেয় বহুমুখী মতাদর্শ।
সৃষ্টির প্রতিটি বস্তুর মধ্যেই রয়েছে বৈচিত্র্য। জীবজগৎ থেকে শুরু করে সামাজিক রীতিনীতি, ধর্ম, দর্শন – সবকিছুতেই এই বৈচিত্র্যের প্রকাশ লক্ষ্য করা যায়। মানুষ নিজেদের পারিপার্শ্বিকতা, শিক্ষা ও রুচি অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন পথ বেছে নেয় তাদের লক্ষ্য অর্জনের জন্য। আধ্যাত্মিক সাধনার ক্ষেত্রে যেমন বিভিন্ন ধর্ম ও মতবাদ ঈশ্বর বা পরম সত্যে পৌঁছানোর ভিন্ন ভিন্ন পথ নির্দেশ করে, তেমনই সামাজিক বা বৈজ্ঞানিক গবেষণায় একটি সমস্যার সমাধানে একাধিক দৃষ্টিভঙ্গি ও পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়।
একক মতবাদ বা পথকে সর্বশ্রেষ্ঠ মনে করে অন্য সব মত ও পথকে অস্বীকার করা এক সংকীর্ণ মানসিকতার পরিচায়ক। বস্তুত, যত বেশি মত থাকবে, ততই চিন্তার ক্ষেত্র প্রসারিত হবে, নতুন নতুন ধারণার উন্মোচন হবে এবং সমাজের প্রগতি ত্বরান্বিত হবে। সুস্থ সমাজ ও উন্নত রাষ্ট্র গঠনে পরমতসহিষ্ণুতা এবং ভিন্ন মতের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ অত্যন্ত জরুরি। ভিন্ন মতের অস্তিত্বকে স্বীকার করে নিলেই কেবল মানবিক মূল্যবোধ ও সহাবস্থান সম্ভব। এই প্রবাদটি মূলত সহনশীলতা, উদারতা এবং বহুত্ববাদের মহিমাকে তুলে ধরে।
গতিময়তাই জীবনের ধর্ম। যে ব্যক্তি বা জাতি গতিহীন ও নিষ্ক্রিয়, সে জীবনযুদ্ধে টিকে থাকতে পারে না। কর্মহীন জীবন যেমন অর্থহীন, তেমনি গতিহীন জাতিও একসময় স্থবির হয়ে পড়ে। পঙ্কিলতা ও শৈবাল যেমন নদীর স্রোতধারাকে রুদ্ধ করে দেয়, তেমনি প্রাচীন ও জীর্ণ লোকাচার বা অন্ধ বিশ্বাস একটি জাতির অগ্রগতিকে পদে পদে ব্যাহত করে।
নদী তার স্বাভাবিক ধর্মেই বহমান থাকে। কিন্তু যখন তার স্রোত কমে যায়, তখন চারপাশ থেকে আসা শৈবাল ও আবর্জনা জমে তার গতিকে সম্পূর্ণ থামিয়ে দেয়। এর ফলে নদী তার নিজস্বতা হারায় এবং একসময় নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। একইভাবে, যে জাতি সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারে না, নতুন জ্ঞান ও প্রগতিকে গ্রহণ করতে অনীহা দেখায়, তারাই ধীরে ধীরে জীবনশক্তি হারিয়ে ফেলে। জীর্ণ ও অপ্রয়োজনীয় লোকাচার, কুসংস্কার ও অন্ধ বিশ্বাস তখন সেই জাতির অগ্রগতির পথে বিশাল বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
সমাজ ও জীবনের জন্য কল্যাণকর নয় এমন প্রথা বা বিশ্বাসকে আঁকড়ে ধরে থাকলে কোনো জাতিই উন্নতির শিখরে পৌঁছাতে পারে না। জাতির প্রাণশক্তি ও মননশীলতা সচল না থাকলে তা স্থবির হয়ে পড়ে এবং কালের বিবর্তনে পিছিয়ে যায়। তাই জাতীয় জীবনে গতিশীলতা বজায় রাখা এবং কুসংস্কার ও জীর্ণ লোকাচারকে পরিহার করা অপরিহার্য। এর মাধ্যমেই একটি জাতি প্রগতি ও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যেতে পারে।
কবির কাছে কবিতা কেবল ছন্দ, সুর বা কল্পনার বিলাসিতা নয়, বরং তা জীবনের প্রতিচ্ছবি। যখন জীবন কঠিন সংগ্রামে আচ্ছন্ন হয়, ক্ষুধার জ্বালা যখন সমস্ত সৌন্দর্যবোধকে গ্রাস করে, তখন সুন্দরের প্রতি মন উদাসীন হয়ে পড়ে। কবির উল্লেখিত পঙক্তিটি এই নির্মম বাস্তবতাকে তুলে ধরে।
পূর্ণিমার চাঁদ আবহমানকাল ধরে সৌন্দর্য, স্নিগ্ধতা ও প্রেমের প্রতীক। কিন্তু যখন জীবন রুক্ষ ও কঠিন হয়, যখন অভাব ও দারিদ্র্য গ্রাস করে, তখন সেই পরম সুন্দর চাঁদকেও পোড়া রুটির মতো মনে হয়। এখানে 'ঝলসানো রুটি' প্রতীকী অর্থে ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও জীবনের কঠোর বাস্তবতার ইঙ্গিত দেয়। একসময় যা মনকে মুগ্ধ করত, তা এখন আর মনকে টানতে পারে না। কারণ জীবন যখন খাদ্যসংস্থান ও মৌলিক চাহিদার সংগ্রামে নিমজ্জিত, তখন মানুষের কাছে শিল্প-সাহিত্য বা কল্পনার জগতের আবেদন গৌণ হয়ে পড়ে।
এই পঙক্তিটির মাধ্যমে কবি দেখাতে চেয়েছেন যে, চরম অভাব ও ক্ষুধা মানুষের সংবেদনশীলতা ভোঁতা করে দেয়। শিল্প বা কবিতার বিমূর্ত সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য একটি সুস্থ ও স্বচ্ছন্দ মন প্রয়োজন। কিন্তু যখন মৌলিক চাহিদা পূরণে ব্যর্থতা আসে, তখন মানুষের মন থেকে সকল কাব্যিকতা ও রোমান্টিকতা বিদায় নেয়, এবং বাস্তবতার কঠোর আঘাত সমস্ত কল্পনাকে চূর্ণ করে দেয়। তাই কবি কবিতার প্রতি সাময়িক ছুটি ঘোষণা করে বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছেন, যেখানে পূর্ণিমার চাঁদও তার রূপ হারিয়ে 'ঝলসানো রুটি'তে রূপান্তরিত হয়। এই লাইনটি বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গির কঠোর প্রকাশ এবং ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের এক মর্মান্তিক চিত্র।