সর্বপ্রাচীন ধর্মগ্রন্থ ঋগ্বেদে ঈশ্বর সম্পর্কে বলা হয়েছে- "একং সদ বিপ্রা রহুধা বদন্তি।" অর্থাৎ সদ্ বস্তু বা পরমেশ্বর এক। বিপ্র বা জ্ঞানী ব্যক্তিরা তাঁর বহু নাম দিয়েছেন।
সগুণ ঈশ্বর বলতে গুণযুক্ত ঈশ্বরকে বোঝায়। অর্থাৎ যিনি জ্ঞান, শক্তি, করুণা, প্রেম ইত্যাদি গুণে পরিপূর্ণ এবং নানারূপে প্রকাশিত হন, তিনি সগুণ ঈশ্বর। দেব-দেবীরা সগুণ ঈশ্বরের রূপ। যেমন- শক্তির রূপ দেবী দুর্গা, বিদ্যার রূপ সবম্বতী, ধনের রূপ লক্ষ্মী।
নির্গুণ ঈশ্বর বলতে সেই ঈশ্বরকে বোঝায়, যিনি কোনো নির্দিষ্ট গুণ বা রূপের মধ্যে সীমাবদ্ধ নন। তিনি রূপহীন, আকৃতিহীন ও সমস্ত গুণের অতীত। নির্গুণ ঈশ্বর ব্রহ্ম। তিনি সর্বত্র বিরাজ করেন এবং সমস্ত সৃষ্টির প্রাণস্বরূপ।
ঈশ্বরকে খোঁজার জন্য দূরে যাওয়ার প্রয়োজন নেই, কারণ তিনি সর্বত্র বিরাজ করেন। অর্থাৎ প্রকৃতি, জীবজগৎ ও আমাদের
অন্তরে- সব জায়গাতেই তাঁর উপস্থিতি রয়েছে।
জন্মান্তর হলো এক জীবের মৃত্যু হয়ে তাঁর আত্মা নতুন দেহে জন্ম নেওয়ার প্রক্রিয়া। আমাদের পূর্বজন্মের কর্ম-ভালো বা মন্দ-পরবর্তী জীবনের ভাগ্য নির্ধারণ করে। তাই জন্মান্তর আমাদের শেখায়, সবসময় সৎ ও ভালো কাজ করা উচিত।
পুত্রশোকে আকুল গান্ধারী শ্রীকৃষ্ণকে বলেছিলেন, “দেখো আমি আমার বহু পূর্ব জন্মের কথা স্মরণ করতে পারি। আমার মনে পড়ে না, আমি কোনো পাপ করেছি। যে পাপের ফলে আমার শত পুত্রের মৃত্যু হতে পারে। কেন আমাকে শত পুত্রের মৃত্যুশোক সইতে হলো?"
গান্ধারীর শতপুত্রের মৃত্যু হয়েছিল পূর্ব জন্মের কর্মফলের কারণে। গান্ধারী তার কোনো এক পূর্বজন্মে খেলাচ্ছলে শত পতঙ্গকে বিদ্ধ করেছিলেন এবং তাদের মেরে মালা গেঁথেছিলেন। সেই পাপের ফল হিসেবে এই জন্মে তার শতপুত্রের মৃত্যু হয়েছে।
আত্মার বৈশিষ্ট্যসমূহ নিম্নরূপ-
১. আত্মা অবিনাশী। অর্থাৎ আত্মার মৃত্যু নেই।
২. এটি দেহ ত্যাগ করে অন্য দেহ গ্রহণ করতে পারে।
৩.আত্মার পথ পূর্বজন্মের কর্মফলের ওপর নির্ভর করে।
৪.ভালো কাজ ও ঈশ্বর স্মরণ করলে আত্মা পুনর্জন্ম থেকে মুক্তি পায়।
নিত্যকর্ম ছয় প্রকার। যথা- প্রাতঃকৃত্য, পূর্বাহ্ণকৃত্য, মধ্যাহ্নকৃত্য, অপরাহ্ণকৃত্য, সায়ংকৃত্য ও রাত্রিকৃত্য।
প্রাতঃকালে যে কাজ করা হয় তাকে প্রাতঃকৃত্য বলে। এ সময় যা যা করতে হয় তা নিচে তুলে ধরা হলো-
১. সূর্যদয়ের আগে ঘুম থেকে উঠতে হয়।
২. বিছানায় বসে দেবদেবীর নাম স্মরণ করতে হয়।
৩. দেবী দুর্গার নাম নিতে হয়।
৪. দেবদেবী বা ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে মন্ত্র উচ্চারণ করতে হয়।
সকাল এবং দুপুরের মধ্য সময়ে যে কৃত্য করা হয় তাকে পূর্বাহ্ণকৃত্য বলে। এই সময়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হয়ে প্রার্থনা, পূজা, আহার ও অধ্যয়ন করতে হয়। সকলের এটা পালন করা উচিত, কারণ, এতে নিয়ম-শৃঙ্খলা বজায় থাকে, শরীর ও মন ভালো থাকে এবং দৈনন্দিন জীবন শৃঙ্খল হয়।
মধ্যাহ্নকৃত্য হলো পূর্বাহ্ণের পর এবং অপরাহের পূর্ব পর্যন্ত সময়ের কৃত্য বা কাজ। এ সময় দুপুরের খাওয়া-দাওয়া এবং বিশ্রাম করা হয়।
অপরাহকৃত্য বলতে দুপুরের পর থেকে সন্ধ্যার পূর্ব পর্যন্ত সম্পন্ন হওয়া কাজগুলোকে বোঝায়। এই সময়ে নিজের ও পরিবারের প্রয়োজনীয় কাজগুলো করতে হয়। খেলাধুলা ও ব্যায়ামের জন্য এটাই উপযুক্ত সময়।
রাত্রিকৃত্য বলতে সন্ধ্যার পর থেকে ঘুমাতে যাওয়ার পূর্ব পর্যন্ত সময়ের কাজগুলোকে বোঝায়। ঘুমানোর আগে শ্রীবিষ্ণুর 'পদ্মলাভ' নাম স্মরণ করতে হয়।
ঋগ্বেদের স্ত্রোত্রটির সরলার্থ নিচে লেখা হলো-
সরলার্থ: বায়ুসমূহ মধু বহন করছে; নদীসমূহ মধু ক্ষরণ করছে; ওষধিসমূহ আমাদের নিকট মধুময় হোক। মধুময় হোক দিন ও রাত্রি; মধুময় হোক পৃথিবীর ধূলিকণা, পিতৃসম দ্যুলোক আমাদের নিকট মধুময় হোক। বনস্পতি আমাদের নিকট মধুময় হোক; মধুময় হোক সূর্য; গোসমূহ আমাদের নিকট মধুময় হোক।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার স্তোত্রটি নিচে লেখা হলো-তুমাদিদেবঃ 'পুরুষঃ পুরাণস্কমস্য বিশ্বস্য পরং নিধানম্। বেত্তাসি বেদ্য পরঞ্চ ধাম ত্বয়া ততং বিশ্বমনন্তরূপ।। (১১/৩৮)
শ্রীশ্রীচণ্ডীর স্তোত্রটি নিচে সরলার্থসহ লেখ হলো-সৃষ্টি-স্থিতি-বিনাশানাং শক্তিভূতে সনাতনি। গুণাশ্রয়ে গুণময়ে নারায়ণি নমোহন্তু তে।। (১১/১১)
সরলার্থ: হে নারায়ণি! তুমি সৃষ্টি, স্থিতি ও বিনাশের শক্তিস্বরূপা, তুমি নিত্যা, তুমি সমস্ত গুণের আশ্রয়, তুমি গুণময়ী, তোমাকে নমস্কার।
সত্যসুন্দর' হলেন স্রষ্টা বা সৃষ্টিকর্তা (ঈশ্বর)। এই বিশ্বের অপরূপ বৈচিত্র্য যেমন- বৃক্ষ-লতা, পশু-পাখি, নদী-সাগর, গ্রহ-নক্ষত্র সবকিছুই তাঁর সৃষ্টি। এই বিশালতা ও বৈচিত্র্যের স্রষ্টাকে জানতে এবং বুঝতে চেষ্টা করাই মানুষের স্বাভাবিক ইচ্ছা, তাই তাঁকে জানতে হবে ও বুঝতে হবে।
ঈশ্বর এত বড়ো, এত বিরাট, এত শক্তিমান যে, কোনো আকৃতির মধ্যে তাঁকে বাধা যায় না। তিনি সর্বব্যাপী এবং অসীম। এই কারণে হিন্দুধর্মে ঈশ্বরকে নিরাকার রূপে ভাবা হয়। মুনি-ঋষিরা এই নিরাকার ঈশ্বরের নাম দিয়েছেন ব্রহ্ম।'
ঈশ্বর সর্বশক্তিমান, তিনি ইচ্ছা করলে যেকোনো রূপ ধারণ করতে পারেন। যখন তিনি তাঁর বিভিন্ন শক্তি বা গুণের প্রতীক রূপে বিশেষ আকার বা রূপ ধারণ করেন, তখন তাঁকে সাকার বলা হয়। এই বিভিন্ন রূপধারী ঈশ্বরই হলেন দেব-দেবী।
কর্মফল হলো মানুষের নিজের কর্মের ফল। মানুষ যেমন কর্ম করে; তেমন ফল ভোগ করে। অর্থাৎ যে ব্যক্তি ভালো কাজ করে সে পুরস্কার পায়। আবার যে খারাপ কাজ করে সে শাস্তি পায়। এই কর্মফল জন্মান্তরেও ভোগ করতে হয়। তাই সর্বদা ভালো কাজ করা উচিত।
হিন্দুধর্ম বিশ্বাস অনুযায়ী, মৃত্যুর পর আবার জন্ম আছে। একে বলা হয় জন্মান্তর। আমাদের মৃত্যু হয়; কিন্তু আত্মা অবিনাশী। তাই মৃত্যুর পর আত্মা নতুন দেহ ধারণ করে। এই জন্মান্তর ঘটে কর্মফলের কারণে। অর্থাৎ যে ভালো কর্ম করে, মৃত্যুর পর তার ভালো জন্ম হয়। যে মন্দ কর্ম করে, তার মন্দ জন্ম হয়।
গান্ধারীকে জাতিস্মর বলা হয় কারণ তিনি পূর্ব জন্মের কথা স্মরণ করতে পারতেন। সাধারণ মানুষ জন্মান্তরের কথা মনে রাখতে পারে না, কিন্তু জাতিস্মরা পারে। একবার গান্ধারীও শ্রীকৃষ্ণের সাথে কথোপকথনে নিজের আগের জন্মের কথা উল্লেখ করেছিলেন।
আত্মা হলো জীবনের মূল সভা। আমাদের প্রত্যেকের মধ্যে আত্মা আছে। আত্মা আছে বলেই আমরা বেঁচে আছি। আত্মা চলে গেলে আমাদের দেহ পড়ে থাকে। অর্থাৎ আমাদের মৃত্যু হয়; কিন্তু আত্মা অবিনাশী। আত্মার মৃত্যু নেই। আত্মা অন্য দেহ ধারণ করে।
আত্মার এক দেহ ছেড়ে অন্য দেহে যাওয়ার ব্যাপারটি ঘটে কর্মফল অনুসারে। তবে কেউ যদি ভালো কর্ম করে এবং মৃত্যুর সময় কেবল ঈশ্বরের কথা স্মরণ করে তাহলে তার আর জন্ম হয় না। তখন তার মোক্ষ প্রাপ্তি ঘটে।
রাত্রিকৃত্যে যা করতে হয়-
১. এই সময় অধ্যয়ন এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাজ করতে হয়।
২. রাত্রের আহার করতে হয় এবং আহারের পর ঘুমাতে যেতে হয়।
৩. ঘুমানোর আগে শ্রী বিষ্ণুর 'পদ্মনাভ' নাম স্মরণ করতে হয়।
স্তব-স্তোত্র ও প্রার্থনায় আমাদের-
১. মন-প্রাণ ভালো হয়।
২. দেবতার সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপিত হয়।
৩. 'কণ্ঠ সুন্দর হয়, পরিশীলিত হয়।
তুমাদিদেবঃ পুরুষঃ পুরাণস্তমস্য বিশ্বস্য পবং নিধানম্।
বেত্তাসি বেদ্যঞ্জ পরও ধাম ত্বয়া ততং বিশ্বমনন্তরূপ। (১১/৩৮)
সরলার্থ: হে অনন্তরূপ, তুমি আদিদেব ও পুরাণ পুরুষ; তুমি এই বিশ্বের- পরম আশ্রয়; তুমি জ্ঞাতা, তুমি জ্ঞেয়, তুমি পরম ধাম এবং তোমার দ্বারা র্যাপ্ত সমগ্র জগৎ।
Related Question
View Allঈশ্বর সত্যসুন্দর, আনন্দময় ও মঙ্গলময় l
হিন্দুধর্ম সনাতন ধর্ম নামেও পরিচিত।
যে ব্যক্তি ভালো কাজ করেন তিনি পুরস্কার পান।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!