স্বদেশ প্রেম
ভূমিকাঃ
স্বদেশ প্রেম মানুষের মহৎ গুণাবলীর অন্যতম। একজন মানুষ যে দেশে জন্মগ্রহণ করেছেন, যে দেশের মাটি, আলো বাতাসে তার জীবন বিকশিত হয়েছে সেটাই হলো তার স্বদেশ। স্বদেশের প্রতি প্রেম ভালবাসা থাকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ জীবনের সফলতার জন্য, দেশ ও জাতির কল্যাণের ক্ষেত্রে স্বদেশ প্রেমের বৈশিষ্ট্যকে প্রাধান্য দিতে হবে। একজন স্বদেশ প্রেমের প্রতি সদা সর্বদা সচেতন হতে হবে। মাতৃভূমির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা প্রকাশ করতে গিয়ে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন,
ও আমার দেশের মাটি,
তোমার 'পরে ঠেকাই মাথা।
তোমাতে বিশ্বময়ী,
তোমাতে বিশ্ব মায়ের আঁচল পাতা।
স্বদেশপ্রেম কীঃ
স্বদেশ প্রেম হল নিজের দেশের প্রতি, জাতির প্রতি, ভাষার প্রতি গভীর ভালোবাসা ও আকর্ষণ অনুভব করাকে বোঝায়। এছাড়াও নিজ দেশের প্রতি প্রবল অনুরাগ, নিবিড় ভালোবাসা ও যথার্থ আনুগত্যকে দেশপ্রেম বলে। গর্ভধারণকারিনী জননী যেমন তার সন্তানকে ভীষণভাবে ভালবাসে, এমনিভাবে দেশ মাটি কাকেও মানুষ জন্মলগ্ন থেকেই শ্রদ্ধা করতে ও ভালোবাসতে শেখে। দেশ ও দেশের প্রতি মানুষের যে আকর্ষণ ও ভালবাসা তা থেকেই জন্ম দেশপ্রেমের। জননী, জন্মভূমি স্বর্গের চাইতেও গরীয়সী এবং মহিমায় দীপ্ত। তাইতো কবি দীজেন্দ্রলাল রায়ের সেই গানটি আজও স্বদেশপ্রেমী মানুষের প্রার্থনা...
আমার এ দেশেতেই জন্ম যেন,
এই দেশেতেই মরি।
স্বদেশপ্রেমের উৎস:
প্রতিটা মানুষ নিজেকে অনেক ভালোবাসে। আর নিজের প্রতি অনেক ভালোবাসা থেকেই জন্ম নেয় স্বদেশের প্রত্যেকটি জীবের মধ্যেই এই স্বদেশ প্রতি ভালবাসা বিদ্যমান পশু বনভূমি ছেড়ে লোকালয়ে ছটফট করে। আবার পাখিকে নীড়চৎ করলে তার মর্মভেদী আর্তনাদ বাতাস ভারি করে তোলে। নিজ আবশ্যের প্রতি ভালবাসা থেকেই এটি হয়। আর নিজ আবাসের প্রতি ভালোবাসা থেকেই জন্ম নেয় স্বদেশের প্রতি ভালোবাসা। স্বদেশের মাটি, বাতাস, পানির সঙ্গে আমরা অবিচ্ছেদ্য বন্ধনে আবদ্ধ। তাই এগুলির প্রতি মমত্ববোধ থেকেই সৃষ্টি হয় স্বদেশপ্রেম।
স্বদেশপ্রেমের বৈশিষ্ট্য
আশ্রস্থলের প্রতি আকর্ষণ জীবনের স্বভাব যার ধর্ম। গরুর জন্য গোয়াল, বাঘের জন্য গুহা, পাখির জন্য নীড় প্রত্যেকের নিজস্ব আবসস্থল আছে। মানুষের স্বদেশ প্রেম একটি বিশেষ আদর্শাড়িত আন্তরিক প্রেরণা। অন্যান্য প্রাণীর ঐতিহ্যবোধ নেই, নেই সংস্কৃতি চেতনা-মানুষের এগুলো আছে। সেই সাথে আছে ইতিহাসের পাতা থেকে আহরিত জ্ঞান। তাই দেশের মাটির প্রতি মমত্ববোধের সাথে মিশে থাকে শ্রদ্ধা, প্রীতি ও গৌরববোধের আকাঙ্ক্ষা। কবির ভাষায়......
স্বদেশ প্রেম যত সেই মাত্র অবগত,
বিদেশেতে অধিবাস যার,
ভাব তুলি ধ্যানে ধলে,
চিত্রপটে চিত্র করে,
স্বদেশের সকল ব্যাপার।
স্বদেশপ্রেমের স্বরূপ
মানুষ সমগ্র বিশ্বের বাসিন্দা হলেও একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে সে বেড়ে ওঠে। একটি বিশেষ দেশের অধিবাসী হিসেবে এসে পরিচয় লাভ করেন। এ দেশি তার জন্মভূমি, তার স্বদেশ। মানুষ স্বদেশে জন্মগ্রহণ করে ও স্বদেশের ভালোবাসায় লালিত-পালিত হয়। নিজেকে প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার সকল উপাদান সে স্বদেশের গৌরবে গৌরবান্বিত হয় এবং স্বদেশের অপমানে অপমানিত হয়। স্বদেশের স্বাধীনতা ও মান-মর্যাদা রক্ষার জন্যই নিজের প্রাণ উৎসর্গ করতে প্রস্তুত থাকেন। তাই কবি লিখেছেন.......
মিছা মনিমুক্তা হেম স্বদেশের প্রিয়,
প্রেম তার চেয়ে রত্ন নয় আর।
স্বদেশপ্রেমের অভিব্যক্তি:
স্বদেশের বিপর্যয়ের মুহূর্তে স্বদেশের প্রতি আমাদের ভালোবাসা প্রকাশ পায়। দেশের দুর্দিনে দেশপ্রেমের পূর্ণ বিকাশ ঘটে এবং জন্মভূমি জননীর মতো সন্তানের দিকে কাতর নয়নে তাকায়, আর জননীর বেদনায় সন্তানের হৃদয় হয় বিদীর্ণ। জলাশয় থেকে বিচ্ছিন্ন করলে মাছ যেমন জলের গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারে তেমনি প্রবাস জীবনে ও মানুষের ভেতর স্বদেশপ্রীতি মূর্ত হয়ে ওঠে। দীর্ঘ প্রবাস জীবনের পর স্বদেশে ফিরে এলে মনের অজান্তেই বেজে ওঠে......
আমার কুঠির খানি,
সে যে আমার হৃদয় রাণী।
স্বদেশপ্রেমের প্রকাশ:
স্বদেশপ্রেম মানব হৃদয়ে লালিত হয়। আর স্বদেশপ্রেম প্রকাশ পায় জাতীয় জীবনের দুঃসময়ে মানুষের কর্মের মাধ্যমে। স্বদেশের স্বাধীনতা রক্ষায়, স্বদেশের মানুষের কল্যাণ সাধনে মানুষের মনে স্বদেশপ্রেম জেগে উঠে। যারা দেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করেছেন এবং দেশের জন্য সংগ্রাম করেছেন তাদের নাম ও কীর্তি চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তাদের সে প্রেম ও আত্মত্যাগ ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করবে চিরকাল। স্বদেশের তরে জীবন উৎসর্গকারীরা সারা বিশ্বের শ্রেষ্ঠ সন্তান। তাই ভাষায় লিখেছেন......
ও আমার দেশের মাটি,
তোমার পরে ঠেকাই মাথা,
তোমাতে বিশ্বমায়ীর তোমাতে বিশ্বমায়ের আঁচল পাতা।
স্বদেশপ্রেমের ভিন্নতর বহিঃপ্রকাশ:
কেবল দেশকে ভালোবাসার মধ্যে স্বদেশপ্রেম সীমাবদ্ধ নয়। দেশকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে এগিয়ে নেওয়া যেমন শিল্পসাহিত্য, বিজ্ঞান, অর্থনীতি, সমাজনীতি প্রভৃতির ক্ষেত্রে অবদান রাখাও স্বদেশপ্রেমের বহিঃপ্রকাশ। সম্প্রতি ২৬ শে মার্চ জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে লাখো কণ্ঠে সোনার বাংলা গাইতে ২ লক্ষ ৫৪ হাজার ৬৮১ জন মানুষের একত্রিত হওয়া স্বদেশপ্রেমেরই বহিঃপ্রকাশ। দেশের কল্যাণ ও অগ্রগতিতে ভূমিকা রেখে বিশ্বসভ্যতায় গৌরব বাড়ানো যায়।
স্বদেশপ্রেম ও বিশ্বপ্রেম:
স্বদেশকে ভালোবাসার মধ্য দিয়ে বিশ্বকে ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ ঘটে। স্বদেশপ্রেম কখনোই বিশ্ব প্রেমের বাধা হয় না। দেশপ্রেম যদি বিশ্ববন্ধুত্ব ও ভ্রাতৃত্বের সহায়ক না হয় তবে তা প্রকৃত দেশপ্রেম হতে পারে না। জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকলকেই দেশপ্রেমের চেতনায় উৎসাহিত হতে হবে। যে নিজের দেশকে ভালোবাসে না সে অন্য দেশ, ভাষা, গোষ্ঠী যথা মানুষকে ভালবাসতে পারবেনা। তাই দেশপ্রেমের মধ্য দিয়েই বিশ্ব প্রেমের প্রকাশ ঘটে।
স্বদেশপ্রেম ও বিশ্বপ্রেমের মধ্যে পার্থক্য
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতে, জাতীয়তা ও স্বদেশপ্রেম যখন সুঙ্কীর্ণতার অন্ধকূপে বন্দি হয়ে উগ্র ছিন্নমস্ত রূপ ধারণ করে, তখন বিশ্বপ্রেম পদদলিত হয়। স্বদেশকে একমাত্র পরম প্রিয় মনে করে আমরা বিশ্বকে শত্রু মনে করি এবং তাকে ধ্বংস করার জন্য ধাবিত হয়। তখন শুভ বিচার-বুদ্ধি স্বদেশপ্রেমের অন্ধ আবেগে লুপ্ত হয়। তার ফলে পরপর হানাহানি এবং অবারিত রক্তক্ষয় অনিবার্যরূপে দেখা যায়। আর, নানা মারণাস্ত্র আবিষ্কার-এর জন্য সে হানাহানি অচিরেই ধারণ করে এক বিভীষিকাময় রূপ।
সাহিত্যের আয়নায় দেশপ্রেম:
নানা কবি সাহিত্যিক তাদের কবিতা, কাব্য, নাটক, গান, উপন্যাস প্রভৃতি লেখনির মাধ্যমে তাদের দেশপ্রেমকে ফুটিয়ে তুলেছেন। আধুনিক এই যুগে বাংলা সাহিত্যে দেশপ্রেমের বিকাশ ঘটে ব্রিটিশ আমল থেকে। নীলদর্পণ, আনন্দমঠ, মেঘনাদ বধ প্রভৃতি গ্রন্থে দেশপ্রেমের প্রকাশ ঘটেছে। তাছাড়া রবীন্দ্রনাথ, নজরুল ইসলাম, জীবনানন্দ দাশ, প্রমুখের সাহিত্যে দেশ প্রেমের প্রকাশ ঘটেছে।
ছাত্র জীবনে স্বদেশপ্রেমের শিক্ষা:
স্বদেশ প্রেম মানুষের সহযাত প্রবৃতি হওয়া সত্বেও এই গুনটি তাকে অর্জন করতে হয়। সেজন্য ছাত্র জীবন থেকে দেশপ্রেমের দীক্ষা গ্রহণ করতে হয়। দেশের মাটি ও মানুষকে ভালবাসতে হবে। ছাত্র জীবনে ছাত্ররা যেই দেশপ্রেম অর্জন করে সেটি মনে আজীবন ধরে লালিত হয়। বর্ধমানের ছাত্রছাত্রীরা আগামী দিনের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ। দেশের ভালো-মন্দ ভবিষ্যতে তাদের উপরে নির্ভরশীল। ছাত্র-ছাত্রীদেরকেই এগিয়ে আসতে হবে দেশের বিপদে আপদে। প্রয়োজনে দেশের স্বার্থে ছাত্রদেরকে জীবন উৎসর্গ করতে হবে। যেমনটা ছাত্রছাত্রীরা করেছিল ১৯৫২ সালের মাতৃভাষা মর্যাদার রক্ষার আন্দোলনে বুকের তাজা রক্ত দিয়ে এবং ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে অকাতরে প্রাণ উৎসর্গ করে।
বাঙালির স্বদেশপ্রেম
এ পৃথিবীতে যুগে যুগে অসংখ্য দেশ প্রেমিক জন্মেছেন। তারা নিজ দেশের জন্য আত্মত্যাগ স্বীকার করে নিজ দেশ ও বিশ্বের কাছে অমর হয়েছেন। আর বাংলাদেশেও তার দৃষ্টান্ত রয়েছে। ১৯৫২ সালে পাকিস্তানে স্বৈরশাসকের হাতে বাংলা ভাষার জন্য রফিক, রফিক, সালাম, জব্বার, বরকতের আত্মদান। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের আত্মদান করেছেন অসংখ্য ছাত্র, শিক্ষক, কৃষক, শ্রমিক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, মা-বোন সহ সাধারণ মানুষ। এখনো দেশের লক্ষ কোটি জনতা দেশের সামান্য ক্ষতির আশঙ্কায় বজ্র কন্ঠে গর্জে ওঠে। তাই বলা হয়.......
উদয়ের পথে শুনি কার বাণী,
ভয় নাই ওরে ভয় নাই,
নিঃশেষে প্রাণ, যে করিবে দান,
ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই
স্বদেশপ্রেম শিক্ষা:
মানুষ দেশকে ভালবাসতে খেলেই দেশের কল্যাণের জীবন উৎসর্গ করার মনোবৃত্তি স্বদেশপ্রেম মানুষের সহজাত এক প্রবৃত্তি, এরপরেও এই স্বদেশ প্রেমের গুণটি অর্জন করতে হয়। এই স্বদেশ প্রেমের গুণ অর্জনের জন্য দেশের সুদিনে দেশের উন্নয়নে তৎপর থাকা প্রয়োজন। এছাড়া দেশের দুর্দিনে এবং দেশের স্বাধীনতা রক্ষার ক্ষেত্রেও জীবন উৎসর্গ করার মনোবৃত্তি গড়ে তুলতে হবে। নিজ দেশের মাটি এবং মানুষকে ভালবাসতে শিখতে হবে। আর এর মাধ্যম দিয়েই স্বদেশ প্রেমের মহৎ শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়া যাবে।
স্বদেশপ্রেমের উপায়:
স্বদেশের উপকারে নাই যার মন,
কে বলে মানুষ তারে পশু সে জন।
পবিত্র ইসলাম ধর্মে বলা হয়েছে "দেশপ্রেম ঈমানের অঙ্গ'। এই পৃথিবীতে এমন কোন ধর্ম নেই, যেই ধর্মের দেশকে ভালোবাসার নির্দেশ দেওয়া হয়নি। দেশ ও জাতির কল্যাণে আত্মত্যাগকে সবচাইতে মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। দেশের প্রত্যেক নাগরিকই নিজ নিজ কর্মের সীমারেখায় স্বদেশপ্রেমের পরিচয় দেয়। স্বীয় দায়িত্ব সুষ্ঠুভাবে পালন করার মধ্যে দেশপ্রেম নিহিত। জাতির জন্য দেশের জন্য প্রত্যেক মানুষের, তা সে ছোটই হোক কি বড়ই হোক-তার কিছু না কিছু করার আছে। জাতির জন্য যদি কিছু অবদান রাখা যায় তাহলে তাতে দেশপ্রেমের নিদর্শন থাকে। কিন্তু উগ্র স্বদেশপ্রেম মানবজাতির জন্য ক্ষতিকর। অন্ধ স্বদেশপ্রেম মানুষকে সংকীর্ণ করে জাতিতে জাতিতে বিরোধের সৃষ্টি করে এবং মানুষের জন্য সর্বনাশ ডেকে আনে। অন্যদিকে মানবিকতার চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে হয়ে অনেক মহামানব বিশ্ববরেণ্য হয়েছে। তাদের স্বদেশ প্রেম বিশ্ব প্রেমে রূপান্তরিত হয়েছে।
স্বদেশপ্রেমের প্রভাব:
স্বদেশপ্রেমের মহৎ চেতনায় মন ও মানসিকতা সার্থক রূপে বিকশিত হয়। তার মন থেকে সংকীর্ণতা, স্বার্থপরতা দূর হয়। স্বদেশপ্রেম জাতির জন্য কল্যাণ নিয়ে আসে এবং তার ফলে জনসেবার মনোভাব সৃষ্টি হয়। স্বদেশপ্রেম মানুষকে উদার করে, আত্মসুখ বিসর্জনের অনুপ্রেরণা দান করে ও পরের জন্য স্বার্থ ত্যাগ করতে উদ্বুদ্ধ করে থাকে। তাই বিশ্বের শ্রেষ্ঠ সন্তানরা স্বদেশের ফলে জীবন উৎসর্গ করেছেন। স্বদেশ প্রেমের চেতনায় অনুপ্রাণিত হয়ে মহান ব্যক্তিরা নিজেদের উৎসর্গ করে গেছেন। স্বাধীনতার জন্য যারা জীবন দিয়েছে তারা রেখে গেছেন স্বদেশ প্রেমের অবদান। যেমনটি কবি সাহিত্যিক লেখনীর মাধ্যমে স্বদেশপ্রেমের স্বাক্ষর রেখে গিয়েছেন। রাজনীতিবিদ, শিক্ষক, বিজ্ঞানী, চিকিৎসক ইত্যাদি অগণিত পেশায় নিবেদিত প্রাণ মানুষ মানুষের কল্যাণে তাদের কাজ করে গিয়েছেন। এবং তারা দেশের প্রতি ভালবাসার পরিচয় দিয়েছেন ও নিজেদেরও অমর করে নিয়েছেন স্বদেশ প্রেমের মাধ্যমে। তারা কেবল নিজেরাই এই কাজ করেনি, জাতিকেও এই কাজে অনুপ্রাণিত করে গিয়েছেন।
স্বদেশপ্রেমের দৃষ্টান্ত:
যুগে যুগে অসংখ্য মনীষী স্বদেশের কল্যাণে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন। এই উপমহাদেশে মহাত্মা গান্ধী, শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং নাম না জানা লক্ষ লক্ষ শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধা দেশের জন্য জীবন দিয়ে অমর হয়েছেন। বিশ্ব অনলাইনে দেশ প্রেমের ক্ষেত্রে দৃষ্টান্ত রেখেছেন চীনের মাওসেতুং, রাশিয়ার লেলিন ও স্ট্যাইলিন, আমেরিকার জর্জ ওয়াশিংটন প্রমুখ ব্যক্তি। তাদের সবার নাম সারা বিশ্বের ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে স্বদেশপ্রেমের জন্যই।
স্বদেশপ্রেম ও রাজনীতি
বস্তুত রাজনীতিদের প্রথম ও প্রধান শর্তই হচ্ছে স্বদেশপ্রেম। স্বদেশপ্রেমের পবিত্র বেদিমূলেই রাজনীতির পাঠ। স্বদেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ রাজনীতিবিদ দেশের সদাজাগ্রত প্রহরী। তবে বর্তমান রাজনৈতিক দল অথবা রাজনীতিবিদদের চেহারা ভিন্ন। অধিকাংশ রাজনৈতিক দলে মহওর, বহওর কল্যাণবোধ থেকে ভ্রষ্ট। ব্যক্তিক ও দলীয় স্বার্থচিন্তায় অনেক ক্ষেত্রে প্রবল। দেশের স্বার্থে, জাতির স্বার্থে, মানুষের প্রয়োজনে সর্বস্ব বিলিয়ে দেওয়ার সাধনা, স্বদেশপ্রেমের অঙ্গীকার ও সার্থকতা, এখনো প্রায় অনুপস্থিত।
বর্তমান সামাজিক পরিস্থিতি ও দেশপ্রেম:
বর্তমানের এই আধুনিক সমাজে মানুষের মধ্যে দেশপ্রেমের চেতনা দিন দিন লোপ পাচ্ছে। বর্তমানে মানুষ দিন দিন আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়ছে এবং নিজের স্বার্থের দিকে বেশি ঝোঁকে পড়ছে। দেশ ও দেশের মানুষের কথা না ভেবে দেশের ক্ষতি করে নিজেদের উদরপূর্তি করছে। তারা দেশপ্রেমের চেতনাকে ভুলে গিয়ে নিজ স্বার্থকে বড় করে দেখছে। এই ধরনের মানসিকতার ফলে ধনীরা আরো ধনী হচ্ছে আর গরিবরা আরো দিন দিন গরীব হচ্ছে। সেজন্য এই ধরনের মানসিকতা থেকে আমাদের বেরিয়ে এসে দেশের ও দেশের উন্নয়নে কাজ করে যেতে হবে।
উপসংহার:
স্বাধীনতাহীনতায় কে বাঁচিতে চায় হে
কে বাঁচিতে চায়,
দাসত্বশৃংখল বল কে পরিবে পায়,
হে কে পরিবে পায়।
স্বদেশপ্রেম মানব জীবনে একটি শ্রেষ্ঠ গুণ ও অমূল্য সম্পদ। একটি মহৎ গুণ হিসেবে প্রত্যেক মানুষের মধ্যেই স্বদেশপ্রেম থাকা উচিত। অর্থাৎ, স্বদেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে দেশ ও জাতির জন্য কিছু না কিছু অবদান রাখা প্রত্যেকটি স্বদেশপ্রেমিক নাগরিকের একান্ত দায়িত্ব কর্তব্য। তাই আমাদের সকলকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে। স্বার্থপরতা ত্যাগ করে দেশের কল্যাণে সর্বস্ব বিলিয়ে দিতে হবে। তবেই দেশ, সামাজিক, অর্থনৈতিক দিক থেকে অগ্রসর হতে সক্ষম হতে পারবে।
ডিজিটাল বাংলাদেশ
ভূমিকা: বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল রাষ্ট্র। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা হয়েছিল ১৯৭১ সালে। তারপর থেকে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটিকে গড়ে তোলার সংগ্রাম শুরু। স্বাধীনতার ৪৭ বছর অতিবাহিত হওয়ার পরও আমরা উন্নয়নশীলতার গণ্ডি থেকে বের হতে পারি নি। আসে কি আশানুরূপ অগ্রগতি। এর পেছনে প্রতিবন্ধক হয়ে আছে আমাদের আলস্য, নৈতিকতার অভাব, কাজের চেয়ে বেশি কথা বলার প্রবণতা এবং আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে অগ্রসর না হওয়া ইত্যাদি। ফলে আমাদের সবকিছুই হচ্ছে মন্থর গতিতে। এই মন্থরতা কাটিয়ে দেশের কর্মকাণ্ডে গতিশীলতা সৃষ্টিতে ডিজিটাল পদ্ধতি কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে। ডিজিটাল পদ্ধতি বাংলাদেশের সকল কর্মকাণ্ডের সাথে ক্রমান্বয়ে প্রযুক্তির ব্যবহার সংযুক্ত হলেই গড়ে ওঠবে ডিজিটাল বাংলাদেশ।
ডিজিটাল বাংলাদেশ কী?: আমাদের প্রধানমন্ত্রি বাংলাদেশকে ২০২০ সালের মধ্যে 'ডিজিটাল বাংলাদেশ হিসেবে গড়ে তোলার ঘোষণা দিয়েছেন। এ ডিটিজাল বাংলাদেশ বলতে আমরা সংক্ষেপে যা বুঝতে পারি তা হলো- সারা দেশে কর্মকাণ্ডকে আধনিক কম্পিউটার নেটওয়ার্ক ও ইন্টারনেট সিস্টেমের মাধ্যমে অর্থাৎ আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার দিয়ে গতিশীল করে তোলা। সরকারি অফিস-আদালত, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়, রাজপথ ও হাইওয়ে রোডগুলোর গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সিসিটিভি ক্যামেরা বসিয়ে কম্পিউটারের ইন্টারনেট সিস্টেমে এক জায়গায় বসে বাংলাদেশের কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে আনা যায়। অর্থাৎ সমগ্র বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ কর্মকাণ্ড এবং বহির্বিশ্বেকে কম্পিউটার নেটওয়ার্কের আওতায় নিয়ে আসতে পারলে বাংলাদেশের সর্বক্ষেত্রে যে সফলতা অর্জিত হবে, তাকেই আমরা বলতে পারি ডিজিটাল বাংলাদেশ। ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প উদ্বোধন করাকে আমরা ডিজিটাল বাংলাদেশের অংশ হিসেবে গ্রহণ করতে পারি।
শিক্ষা ক্ষেত্রে: শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড। তাই ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার ক্ষেত্রে প্রথমেই শিক্ষার ওপর গুরুত্ব আরোপ করা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে শিক্ষকের লেকচার বা বক্তব্য ভিডিও করে প্রজেক্টরের মাধ্যমে দেওয়ালে সাদা পর্দায় তা প্রদর্শন করা যায়। এটি শিক্ষাখৃীদের মনোযোগ আকর্ষণের সহজ পদ্ধতি। কোনো শিক্ষকের শারীরিক সমস্যা দেখা দিলেও এ পদ্ধতিতে সহজে কাজ সম্পন্ন হতে পারে। ইন্টারনেট সংযোগ থাকলে এ পদ্ধতিতে ঘরে বসেও শিক্ষা গ্রহণ করা যায়। নিজস্ব বই না থাকলেও, লাইব্রেরিতে যাওয়ার প্রয়োজন হয় না- ইন্টারনেটের ওয়েবসাইট থেকে খুঁজে নিয়ে তা পড়ে ফেলা যায়। এভাবে ডিজিটাল পদ্ধতি শিক্ষাক্ষেত্রে উৎকর্ষ বয়ে আনতে পারে। তবে একে সর্বজনীন করার জন্য ব্যাপক সরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন।
চিকিৎসা ক্ষেত্রে: চিকিৎসা নাগরিকের মৌলিক চাহিদাগুলোর একটি। চিকিৎসা ক্ষেত্রে আধুনিক বিজ্ঞান এক নতুন বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছে। বিজ্ঞানীদের সাধনায় একদিকে যেমন আবিষ্কৃত হযেছে না। জটিল রোগের ঔষধ, তেমনি চিকিৎসার পদ্ধতিও ক্রমে ক্রমে সহজ হয়ে আসছে। এক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে ইন্টারনেট সংযোগ স্থাপিত হলে ডাক্তারের কাছে সরাসরি উপস্থিত না হয়ে ও অনলাইন ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ফি পরিশোধ করে ব্যবস্থাপত্র গ্রহণ করা যায়। যেকোনো ধরনের শারীরিক সমস্যায় ঘরে বসে ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে চিকিৎসা করা যেতে পারে। বিষয়টি সরকারি উদ্যোগে সর্বজনীন হয়ে উঠলে এক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে ডিজিটাল বাংলাদেশ।
কৃষিক্ষেত্রে: বাংলাদেশের শতকরা প্রায় ৯০ জন লোক কৃষির ওপর নির্ভরশীল। বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চাষাবাদের ফলে কৃষিতে যুগান্তকারী পরিবর্তন এসেছে। বিজ্ঞানের বদৌলতে উদ্ভাবিত হয়েছে উন্নত জাতের বীজ, পরিবেশ বাবন্ধব সার ও উচ্চ ফলনশীল প্রজাতির শস্য। অনাবৃষ্টি থেকে রক্ষার জন্য কৃত্রিম বৃষ্টিপাতের বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাও উদ্ভাবিত হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের কৃষকসমাজ অধিকাংশ নিরক্ষর হওয়ার কারণে সবকিছুর সফল ব্যবহার করতে পারছে না। তাই কৃষকদের যথার্থ প্রশিক্ষণ দিয়ে উপযুক্ত করে তুলতে পারলে ইন্টারনেটের মাধ্যমে ওয়েভসাইট থেকে নানা বিষয় জেনে নিয়ে তা কাজে লাগাতে পারে। তাহলে এক্ষেত্রেও ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে উঠতে পারে।
অফিস-আদালতে: বাংলাদেশের অধিকাংশ অফিস-আদালতে কাজের গতি অত্যন্ত মন্থর এবং সর্বক্ষেত্রে ওঁৎ পেতে আছে দুর্নীতির কালো থাবা। অফিসগুলোতে সি সি ক্যামেরা স্থাপন করে ইন্টারনেটের মাধ্যমে কম্পিউটার নেটওয়ার্কের আওতায় এনে একস্থানে বসে প্রশাসনকে গতিশীল, কর্মমুখি ও দুর্নীতিমুক্ত করা যায়। এ ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে চালু করা হলে কেউ আর অফিসে বসে কাজ রেখে আরামপ্রিয়-মগ্ন হবে না এবং ঘুষ-দুর্নীতির সন্ধানে ব্যস্ত রাখবে না নিজেকে। তখনই কুশাসনের পরিবর্তে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হবে এবং গড়ে উঠবে ডিজিটাল বাংলাদেশ।
নিরাপত্তা বিধানে: নিরাপত্তা সর্বক্ষেত্রেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যে জাতির কোনো নিরাপত্তা নেই সে জাতি কখনোই উন্নতির দিকে এগিয়ে যেতে পারে না। এক্ষেত্রে সি সি ক্যামেরা স্থাপন ও ইন্টারনেটের সাথে কম্পিউটার নেটওয়ার্কের সংযোগ সাধন করে নিরাপত্তা বিধান করা সম্ভব। কেননা, দুষ্কৃতিকারীরা কোনো অঘটন ঘটিয়ে সাময়িকভাবে পালিয়ে গেলেও পরবর্তীকালে ক্যামেরার বদৌলতে ধরা পড়তে বাধ্য। এর জন্য যদি দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হয়, তবে অন্যরাও এ কাজ থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে নেবে। নিশ্চিত হবে জাতির নিরাপত্তা। আর জাতির নিরাপত্তা নিশ্চিত হলেই গতিশীল হবে ডিজিটাল বাংলাদেশ।
ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে: ক্রয়-বিক্রয় মানুষের জীবনে একটি নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। বিভিন্ন প্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী কেনার জন্য প্রতিদিনই আমাদের হাটে বাজারে বা কোনো শপিংমলে যেতে হয়। কম্পিউটার নেটওয়ার্কের বিস্তার ঘটানো হলে ঘরে বসে ক্রয়-বিক্রয় করা যাবে এবং বর্তমানে সীমিত আকারে তা হচ্ছে। প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র পছন্দ করা, দাম-দস্তুর করা এবং অনলাইন ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে মূল্য পরিশোধ করে দ্রব্যসামগ্রী ঘরে বসে পেয়ে যাওয়া সবই সম্ভব। শুধু দেশই নয়, বিদেশের সাথেও একটি কার্যকর হবে ইন্টারনেটের মাধ্যমে। এ পদ্ধতি ব্যাপকভাবে চালু হলেই ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হবে।
যোগাযোগের ক্ষেত্রে: যোগাযোগ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যোগাযোগ ব্যবস্থা গতিশীল না হলে দেশের সার্বিক উন্নতি বাধাগ্রস্ত হয়। বর্তমানে কম্পিউটার নেটওয়ার্কের সাহায্যে ইন্টারনেটের মাধ্যমে যোগাযোগ ব্যবস্থার অনেককিছুই নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। বিশেষ করে আকাশ পথ এখন কম্পিউটার দ্বারা নিয়ন্ত্রিণ করা হচ্ছে। বিভিন্ন গ্রহে রকেট উৎক্ষেপণ করা হলে যোগাযোগ থাকছে কম্পিউটার নেটওয়ার্কের সাথে। নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে সমুদ্র পথ। মুহূর্তের মধ্যে একদেশের সাথে আরেক দেশের যোগাযোগ স্থাপিত হচ্ছে ইন্টারনেটের মাধ্যমে। এ ব্যবস্থার মাধ্যমে সারা দেশকে হাতের মুঠোয় নিয়ে আসা যায়।
প্রকাশনার ক্ষেত্রে: প্রকাশনার ক্ষেত্রে অনেক আগেই কম্পিউটার সিস্টেম চালু হয়েছে আমাদের দেশে। আগে যে বইটি ছেপে বের হতে দু মাস সময় লাগত, বর্তমানে তা দু দিনেই সম্ভব। বাংলাদেশের কোনো বাংলা বই বিদেশ থেকে প্রকাশ করতে চাইলে এখন আর কোনো সমস্যাই নেই। সবকিছু ফাইনাল করে কয়েক মিনিটের মধ্যে তা নির্ধারিত দেশে পাঠিয়ে দেওয়া যায় এবং সে দেশের কোনো বই এ পদ্ধতিতে নিয়ে এসে আমাদের দেশে দ্রুত গতিতে প্রকাশ করা যায়।
সংবাদপত্রের ক্ষেত্রে: সংবাদপত্রে ক্ষেত্রে কম্পিউটার এখন ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ইন্টারনেটের মাধ্যমে একটি সংবাদপত্র একই সময়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে প্রকাশিত হচ্ছে। তাই এখন আর ঢাকা থেকে যানবাহনের মাধ্যমে চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী বা সিলেটে পত্রিকা পাঠাতে হচ্ছে না। বিশেষ করে প্রথম শ্রেণির পত্রিকাগুলোর ক্ষেত্রে এ ব্যবস্থা কার্যকরী হচ্ছে। আবার বিদেশি পত্রিকাগুলো আমরা পড়তে পারছি ইন্টারনেটের মাধ্যমে। অনেক আগের পত্রিকাও খুঁজে বের করে নেওয়া যাচ্ছে ওয়েবসাইট থেকে।
বিনোদনের ক্ষেত্রে: বিনোদনের ক্ষেত্রে কম্পিউটার নেটওয়ার্ক ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। খেলাধুলা, সিনেমা ইত্যাদি থেকে শুরু করে নানা ধরনের আনন্দ উপভোগ করা যাচ্ছে কম্পিউটারের মাধ্যমে। খেলা যাচ্ছে নানা ধরনের গেম। ইন্টারনেটের সাহায্যে অন্য কোনো দেশে চলমান খেলার ফলাফল মুহূর্তের মধ্যেই জানা যাচ্ছে।
ব্যাংক ব্যবস্থার ক্ষেত্রে: কম্পিউটার সিস্টেম ব্যাংক ব্যবস্থাকে গতিশীল করে তুলেছে। বেশ কয়েকটি ব্যাংকে চালু হয়েছে অনলাইন সিস্টেম। এখন আর ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম বা দুর দুরান্তের কোনো জেলায় নগদ টাকা বহন করে নিয়ে যেতে হয় না। কম্পিউটারের সাহায্যে অনলাইন ব্যাংক ব্যবস্থার মাধ্যমে স্থানীয়ভাবে তা সমাধা করা যায় ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে। একজনের হিসাব থেকে অন্য কারও হিসেবে মুহূর্তের মধ্যে টাকা পাঠানো যায়। সকল ব্যাংক এ ব্যবস্থা প্রবর্তিত হলে গড়ে উঠবে ডিজিটাল বাংলাদেশ।
অনলাইন তথ্য কেন্দ্র স্থাপন: বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি তথ্যসেবা জনসাধারণের দোর-গোড়ায় পৌঁছে দেওয়া সম্ভব অনলাইন তথ্যকেন্দ্র স্থাপনের মাধ্যমে। এসব তথ্যকেন্দ্র থেকে মানুষ বিভিন্ন ডাটা বা তথ্য সংগ্রহ করতে পারবে। জানতে পারবে সর্বশেষ প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থা ও অবস্থান। বর্তমানে নির্বাচন কমিশন প্রতিটি উপজেলায় সার্ভার স্টেশন প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে। এ সার্ভার স্টেশন চালু হলে ভোটাররা তাদের নিজ উপজেলায় বসে নতুন ভোটার হওয়া, ভুল সংশোধন, পরিবর্তনসহ যাবতীয় তথ্য আপডেট করতে পারবে। অন্যান্য সেক্টরেও এ ধরনের সার্ভার স্টেশন চালু হলে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে ওঠার স্বপ্ন বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত হবে।
উপসংহার: বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল রাষ্ট্র। দেশটিকে উন্নতির দিকে নিয়ে যেতে হলে সর্বক্ষেত্রে উন্নয়ন ঘটাতে হবে। আর উন্নয়ন ঘটাতে হলে কাজের কোনো বিকল্প নেই। কাজের মধ্যদিয়েই ভালোবাসতে হবে দেশকে। প্রশাসনকে করে তুলতে হবে কার্যকর ও গতিশীল। আধুনিক বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে অগ্রসর হতে হবে। তবেই প্রতিষ্ঠিত হবে ডিজিটাল বাংলাদেশ।
জাতীয় জীবনে বিজয় দিবসের তাৎপর্য
উপস্থাপনা:
১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় দিন। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের মধ্যরাত থেকে শুরু হয়ে দীর্ঘ নয় মাস ধরে চলে এ দেশের মুক্তিযুদ্ধ। যুদ্ধ শেষ হয় ১৬ ডিসেম্বরে। মুক্তিযুদ্ধের বিজয় অর্জিত হয় এই দিনে। তাই প্রতি বছর এই দিনটি যথাযথ মর্যাদায় জাতীয় উৎসব হিসেবে পালিত হয়।
মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণা:
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে বর্বর হত্যাযজ্ঞ চালায়। মধ্যরাতের পর তারা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতার করে। তবে গ্রেফতারের আগে ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। এরপর শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ।
মুক্তিবাহিনী রুখে দাঁড়িয়ে গণহত্যাকারী পাকিস্তানি সেনাদের প্রতিহত করতে থাকে। প্রতিবেশী ভারত অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দিয়ে মুক্তিবাহিনীকে সহায়তা করে। অবশেষে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি সৈন্যবাহিনী আত্মসমর্পণ করে। জয় হয় বাঙালির। জন্ম নেয় স্বাধীন বাংলাদেশ।
বিজয়ের প্রকৃত অর্থ:
প্রতি বছর ১৬ ডিসেম্বর আমাদের জীবনে নিয়ে আসে সংগ্রামী বিজয়ের স্মৃতি। জীবনকে গৌরবান্বিত তোলার শপথ এ পবিত্র দিনটি থেকেই আমাদেরকে গ্রহণ করতে হবে। বিজয় অর্জন বড় কথা নয়, তার সুফলকে জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়াই বড় কথা। 'স্বাধীনতা অর্জন করার চেয়ে স্বাধীনতা রক্ষা করা কঠিন'- এ আপ্তবাক্যটিকে আমাদের ভুলে গেলে বিজয় দিবসের তাৎপর্য অর্থহীন হয়ে পড়ে।
পটভূমি:
১৯৭১ সালে নয় মাসের রক্তঝরা সংগ্রামের পর ১৬ই ডিসেম্বরে মহান বিজয় সাধিত হয়েছে। কিন্তু এই স্বাধীনতা মূলত এই নয় মাসের ফসল নয়, এর শুরু হয়েছে অনেক আগে। ১৯৪৭ সালের আগ পর্যন্ত আমাদের দেশ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। প্রায় দশ বছর শাসনের পর ব্রিটিশরা ভারতবর্ষের স্বাধীনতা দিলে বাংলাদেশ হয় পাকিস্তান রাষ্ট্রের অংশ।
পাকিস্তান রাষ্ট্রটি ছিল দুটি আলাদা ভূখণ্ডে বিভক্ত। পূর্ববাংলা পরিচিত ছিল পূর্ব পাকিস্তান নামে। অন্যটি ছিল পশ্চিম পাকিস্তান। প্রথম থেকেই পাকিস্তানের শাসন ক্ষমতা ছিল পশ্চিম পাকিস্তানিদের হাতে। তারা পূর্ব পাকিস্তানিদের সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণ করত।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন এবং মাতৃভাষা প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে এদেশের মানুষ প্রথম তাদের স্বাধিকার প্রতিষ্ঠায় উদ্বুদ্ধ হয়। পশ্চিম পাকিস্তানিদের অত্যাচার, দুঃশাসন পূর্বপাকিস্তানের মানুষ মুখ বুজে সহ্য করেনি। '৬২, '৬৬-এর ছাত্র আন্দোলন এবং '৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে তারা বুঝিয়ে দেয় বাঙালি কারো হাতে বন্দি থাকতে রাজি নয়।
বিজয় দিবসের প্রেক্ষাপট:
১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসন থেকে স্বাধীনতা লাভ করে পাকিস্তান রাষ্ট্র। বর্তমান বাংলাদেশ পূর্ব পাকিস্তান নামে তখন উক্ত রাষ্ট্রের একটি প্রদেশ ছিল পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের নেতৃবৃন্দ। তাদের দুঃশাসন ও অর্থনৈতিক শোষণে এদেশের মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে পূর্ব-পাকিস্তানে আওয়ামী লীগ একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করলেও তাদের নিকট শাসনভার না দিয়ে চালাতে থাকে ষড়যন্ত্র।
১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকার ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে 'এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম' বলে জাতিকে মুক্তির সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহ্বান জানান। সারা বাংলায় শুরু হয় তুমুল আন্দোলন। ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাতে পাক সেনাবাহিনী এদেশের মানুষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে ব্যাপক গণহত্যা চালায়।
একই রাতে তারা বঙ্গবন্ধুর ধানমন্ডিস্থ বাসভবনে হামলা চালায়। কিন্তু গ্রেফতারের আগেই ২৬শে মার্চ প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। দীর্ঘ নয় মাস মুক্তিযুদ্ধ চলে। অবশেষে ১৬ই ডিসেম্বর পাক সেনাবাহিনীর প্রধান আত্মসমর্পণ করলে এদেশের চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয়। এ কারণে ১৬ই ডিসেম্বর বাংলাদেশের বিজয় দিবস।
স্বাধীনতা সংগ্রাম:
স্বাধীনতা ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে এদেশের সর্বস্তরের জনগণ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। মাতৃভূমিকে শৃঙ্খলমুক্ত করার জন্য জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করে এদেশের জনগণ। পাকিস্তানিদের হাত থেকে রেহাই পায়নি এ দেশের শিশু, বৃদ্ধ, যুবক, নারী। ঘরবাড়ি, দোকানপাট সবকিছু তাদের গোলার আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যায়।
এসব অত্যাচারের মুখে বাঙালিরাও বসে থাকেনি। দেশের সবখানে ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্ট, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলস, পুলিশ, আনসার, ছাত্র, যুবক, শ্রমিক, কৃষকসহ সাধারণ জনতাকে নিয়ে গঠিত হয় মুক্তিবাহিনী। মুক্তিবাহিনী দেশের সীমান্তে এবং দেশের ভিতরে যুগপৎভাবে শত্রুদের ওপর আক্রমণ চালাতে থাকে।
বিজয় দিবসের কর্মকান্ড:
দিবসটির সূচনা হয় একুশবার তোপধ্বনির মাধ্যমে। ভোর বেলা থেকেই সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে লাখ লাখ মানুষের সমাগম হয়। সবাই মুক্তিযুদ্ধের বীর শহিদদের প্রতি সম্মান জানাতে সেখানে সমবেত হয়। প্রতিটি বাড়ি, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। রাস্তাঘাট বর্ণাঢ্য সাজে সাজানো হয়।
সন্ধ্যাবেলায় বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও স্থাপনায় আলোকসজ্জা করা হয়। বেতার ও টেলিভিশন বিশেষ অনুষ্ঠানমালা প্রচার করে। পত্রপত্রিকাগুলো বিশেষ ক্রোড়পত্র ও সাময়িকী প্রচার করে। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে আগত ছাত্রছাত্রীরা জাতীয় স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত কুচকাওয়াজে অংশগ্রহণ করে। তারা এ সময় বিভিন্ন ধরনের শারীরিক কসরৎ প্রদর্শন করে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে অংশগ্রহণকারীদের অভিবাদন গ্রহণ করেন এবং শারীরিক কসরৎসহ বিভিন্ন খেলাধুলা উপভোগ করেন। এ দিনে মসজিদে মসজিদে মুক্তিযুদ্ধে আত্মদানকারী শহিদদের জন্য মিলাদ ও বিশেষ মোনাজাত করা হয়।
অন্যান্য ধর্মীয় উপাসনালয়েও একইভাবে শহিদদের বিদেহী আত্মার উদ্দেশ্যে শান্তি কামনা করে প্রার্থনা করা হয়। দেশের সকল শিশুসদন, জেলখানা, হাসপাতাল ও ভবঘুরে কেন্দ্রে এ দিনে উন্নতমানের খাবার পরিবেশন করা হয়। দেশের বিভিন্ন স্থানে, পাড়ায়-মহল্লায় সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
বিজয়ের সেই পরিবেশ:
ঢাকায় ১৬ই ডিসেম্বর পাকবাহিনী আত্মসমর্পণের ঘোষণা দেয়। আত্মসমর্পণের দৃশ্য দেখার উদ্দেশে হাজার হাজার নারী-পুরুষ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের দিকে এগিয়ে আসতে থাকে। জনপদে কোথাও তিলমাত্র ঠাঁই নেই। মৃদু চলার গতিতে আনন্দের আতিশয্যে তারা আকাশ-বাতাস মুখরিত করে তোলে।
তাদের হৃদয়ভরা আবেগ প্রকাশ পাচ্ছিল। আজ জাগ্রত জনতার বিজয় দিবস। আজ নব উদ্যমের জোয়ার এসেছে বাংলাদেশের ঘরে ঘরে। বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা শহর খুশিতে যেন ফেটে পড়ে। সমগ্র ঘরবাড়ি, দালান-কোঠার শীর্ষদেশে শোভা পায় রক্তরঙিন বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা।
বিজয় দিবসের ইতিহাস:
বিজয় মহান, কিন্তু বিজয়ের জন্য সংগ্রাম মহত্তর। প্রতিটি বিজয়ের জন্য কঠোর সংগ্রাম প্রয়োজন। আমাদের বিজয় দিবসের মহান অর্জনের পেছনেও বীর বাঙালির সুদীর্ঘ সংগ্রাম ও আত্মদানের ইতিহাস রয়েছে। পাকিস্তান সৃষ্টির প্রায় প্রথম থেকেই বাঙালিদের মনে পশ্চিমা শোষণ থেকে মুক্তিলাভের ইচ্ছার জাগরণ ঘটে।
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে নানা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে তা প্রবল আকার ধারণ করতে থাকে। অবশেষে বাঙালির স্বাধিকার চেতনা ১৯৬৯ সালে গণঅভ্যুত্থানে রূপ লাভ করে। বাঙালির স্বাধিকারের ন্যায্য দাবিকে চিরতরে নির্মূল করার জন্য ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সামরিক জান্তা বাঙালি-নিধনের নিষ্ঠুর খেলায় মেতে ওঠে।
এ অবস্থায় বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে বাঙালিরা রুখে দাঁড়ায়। গর্জে ওঠে, ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলে। কৃষক-শ্রমিক, ছাত্র-শিক্ষক, ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার, শিল্পী-সাহিত্যিক, নারী-পুরুষ, হিন্দু-মুসলমান- বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান সবাইকে নিয়ে গঠিত হয় মুক্তিবাহিনী। যার যা আছে তাই নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে দেশমাতৃকার মুক্তিসংগ্রামে। সুদীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ চলে।
অবশেষে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর এদেশের মুক্তিসেনা ও মিত্রবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে। দীর্ঘ রক্তাক্ত সংগ্রামের অবসান ঘটে। বাংলাদেশ শত্রুমুক্ত হয়। অর্জিত হয় বাংলাদেশের মহান বিজয়।
আত্মসমর্পণ:
বাংলাদেশ সময় বিকাল ৫টায় আত্মসমর্পণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর যৌথ কমান্ডের কাছে পাকবাহিনী আত্মসমর্পণ করে। পাক বাহিনীর অধিনায়ক লে. জে. নিয়াজী, রাও ফরমান আলী ও তিরানব্বই হাজার সৈন্যের নিয়মিত বাহিনী যুদ্ধবন্দি হয়। তাদেরকে বন্দি শিবিরে নিয়ে যাওয়ার হুকুম দেওয়া হয়।
বিজয় দিবসের গুরুত্ব:
স্বাধীনতা যুদ্ধের নয় মাসে প্রায় ত্রিশ লাখ মানুষ শাহাদাত বরণ করেছে। তাদের এই আত্মত্যাগের বিনিময়ে আমরা অর্জন করেছি আমাদের মহান স্বাধীনতা। আমরা সেই শহিদদের কাছে চিরঋণী। আমাদের সব কর্ম ও উন্নয়ন চেতনার মূলে রয়েছে শহিদদের আত্মত্যাগ। তারাই আমাদের অহংকার, আমাদের গৌরব।
চূড়ান্ত বিজয়:
১৯৭০ সালের নির্বাচনে এদেশের মানুষ পূর্ববাংলার রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগকে বিপুল ভোটে নির্বাচিত করে। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানিরা এদেশের মানুষের হাতে রাষ্ট্র ক্ষমতা না দিয়ে দমনের পথ বেছে নেয়। ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাতের অন্ধকারে পাকিস্তানি সৈন্যরা এদেশের নিরীহ বাঙালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। হত্যা করে অসংখ্য বাঙালিকে। এ বর্বরতা বাঙালিদের দমিয়ে রাখতে পারেনি। তারাও প্রতিরোধের পথ বেছে নেয়।
২৬শে মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করা হয়। শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। বাঙালিদের অসীম সাহস, দেশপ্রেম এবং বীরত্বের কাছে পরাজিত হয় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। অবশেষে ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর পক্ষে লে. জেনারেল নিয়াজী আত্মসমর্পণ দলিলে স্বাক্ষর করেন। ঐ দিন বাংলার আকাশে বিজয়ের লাল সূর্য উদিত হয়। চারদিকে মানুষের মনে মুক্তির আনন্দ হিল্লোল জেগে ওঠে।'
৭১-এর বিজয়োল্লাস:
১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর বাংলার আকাশে উদিত হয়েছিল মুক্তির লাল টকটকে সূর্য। স্বজন হারানোর বেদনা ভুলে মানুষ সেদিন মুক্তির আনন্দে রাজপথে নেমেছিল। মুক্তির উল্লাসে মুখরিত ছিল বাংলার আকাশ-বাতাস। ১৯৭১ সালের এই বিজয়ের দিনটি ছিল বাঙালির মহা উৎসবের দিন। এর চেয়ে আনন্দের দিন বাঙালির জীবনে আর আসেনি।
বিজয় দিবস ও আমাদের প্রত্যাশা:
রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যকে সামনে রেখেই সূচিত হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধের ৪২ বছর পেরিয়ে গেছে। রাজনৈতিক মুক্তি অর্জিত হলেও দেশের আপামর জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তি আজো অর্জিত হয়নি। প্রতিবছর বিজয় দিবসের আদর্শ আমাদের কর্ণকুহরে যে বার্তা শোনায়, বাস্তব জীবনে আমরা তা ভুলে যাই বার বার।
তবু বিজয়দিবসে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার অদম্য প্রতিজ্ঞায় ঋদ্ধ হয়ে উঠি আমরা। আমরা বিজয়ের তাৎপর্যকে যথার্থতা দানে সফল হলেই এ দিবস উদযাপনের সার্থকতা ফুটে উঠবে।
বিজয় দিবসের উৎসব:
১৬ ডিসেম্বর ভোরে সাভারে অবস্থিত জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণের মধ্য দিয়ে দিবসটির শুভ সূচনা হয়। বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণ মহাসমারোহে বিজয় দিবস পালন করে। ১৫ ডিসেম্বর রাত থেকেই বিজয় দিবস উদযাপনের প্রস্তুতি চলে। দেশের সব স্কুল- কলেজ, বাড়ি, দোকানপাট, ভবন ও যানবাহনে শোভা পায় লাল-সবুজ পতাকা। স্কুল-কলেজ কিংবা রাস্তায় রাস্তায় আয়োজন করা হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের।
স্বাধীনতার আনন্দে সব শ্রেণির মানুষ যোগ দেয় এসব অনুষ্ঠানে। কোথাও কোথাও বসে বিজয় মেলা। সরকারিভাবে এদিনটি বেশ জাঁকজমকভাবে উদযাপন করা হয়। ঢাকার জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে সামরিক ও প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যরা কুচকাওয়াজ প্রদর্শন করেন। মহামান্য রাষ্ট্রপতি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিসভার সদস্য, বিরোধীদলীয় নেতা-নেত্রী ও গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের উপস্থিতিতে হাজার হাজার মানুষ এই কুচকাওয়াজ উপভোগ করেন।
অনেক সাহিত্য-সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান বিজয় দিবস উপলক্ষ্যে বিভিন্ন অনুষ্ঠান করে। পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয় বিশেষ ক্রোড়পত্র। বেতার ও টেলিভিশনে প্রচারিত হয় বিশেষ অনুষ্ঠান। বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে মহান মুক্তিযুদ্ধের বীর শহিদদের আত্মার শান্তি ও দেশের কল্যাণ কামনায় প্রার্থনা করা হয়। শহরে সন্ধ্যায় আয়োজন করা হয় আলোকসজ্জার। দেশজুড়ে উৎসবমুখর পরিবেশে বিজয় দিবস উদ্যাপিত হয়।
বিজয় দিবসের তাৎপর্য:
বাঙালির জীবনের এক ঐতিহাসিক দিন ১৬ই ডিসেম্বর। শোষণের বিরুদ্ধে সংগ্রামে অর্জিত বিজয় আমাদের চেতনায় চির অম্লান। আমাদের জাতীয় জীবনে তাই এ বিজয় দিবসের বিশেষ তাৎপর্য আছে। এ বিজয় আমাদের এনে দিয়েছে মুক্ত জীবনের স্বাদ। আমরা এখন স্বাধীন। এ বিজয়ের ফলে আমরা পেয়েছি একটি পতাকা, একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ।
পৃথিবীর মানচিত্রে স্থান করে নিয়েছি নিজেদের অবস্থান। এ পাওয়া আমাদের অনেক বড় পাওয়া। এ বিজয় আমাদের শিখিয়েছে অন্যায়, অবিচার ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে। সমগ্র বিশ্বের শোষিত ও নিপীড়িত মানুষের সংগ্রামের প্রেরণা বাঙালির মুক্তিযুদ্ধ। স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশে ক্ষুধা, দারিদ্র্য আর অশিক্ষার বিরুদ্ধে নতুন সংগ্রামে বিজয় দিবস আমাদের প্রেরণার উৎস।
অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক মুক্তির লক্ষ্যে বাঙালি জাতি অবতীর্ণ হয়েছিল '৭১ এর মুক্তিযুদ্ধে। লাখো শহিদের সেই স্বপ্ন-সাধ বাস্তবায়নের মধ্য দিয়েই বিজয় দিবসের চেতনা চিরজাগ্রত রাখা সম্ভব।
বিজয় দিবস উদযাপন:
বাঙালি জাতি এদিনই স্বাধীন জাতি হিসেবে দীর্ঘদিনের পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে সগৌরবে জয়যাত্রা শুরু করেছে। তাই প্রতিবছর যথাযোগ্য রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় বিজয় দিবস উদযাপিত হচ্ছে। এ দিনে সকল সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। এ দিনটি সরকারি ছুটির দিন। বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন শোভাযাত্রা, র্যালি, আলোচনা সভা, সেমিনার, ক্রীড়া প্রতিযোগিতা প্রভৃতির মাধ্যমে দিবসটিকে উদযাপন করে থাকে।
বিজয় দিবসের চেতনাঃ
বিজয় দিবস একটি অমূল্য ঐতিহাসিক দিন, যা আমাদের মনে জাগায় স্বাধীনতা, সাহস এবং জনগণের একত্রীকরণের চেতনা। এই দিনটি আমাদেরকে জাতীয় গর্ব এবং অভিমান দেয়, সেই গর্বের সাথে আমরা স্মরণ করি কীভাবে আমাদের পূর্বপুরুষরা বিপ্লব, সংগ্রাম এবং বিজয়ের জন্য অসংখ্য বিপন্ন করেছিলেন।
বিজয় দিবসের চেতনা আমাদের মনে জাগিয়ে দেয় যে সংগ্রাম, সঙ্গে একত্রিত জনগণের সংঘর্ষ এবং অপরাজেয়তা পরাজিত করতে সক্ষম হয়। এই চেতনা আমাদের মনে জাগিয়ে দেয় যে কোন প্রতিবাদ, যুদ্ধ, বিপণ্ড বা অত্যাচারের বিরুদ্ধে সত্য, ন্যায় এবং মানবিকতা জয়লাভের জন্য সম্পূর্ণ সংগ্রাম করা উচিত।
আমাদের করণীয়:
অনেক সংগ্রাম ও ত্যাগের পর আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি। তাই বিজয় দিবস আমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা এদিন উদযাপনের পাশাপাশি শহিদদের ত্যাগের প্রতি সম্মান জানাব।
উপসংহার:
বহু রক্তের বিনিময়ে আমরা অর্জন করেছি আমাদের বিজয়। এ বিজয় বাঙালি জাতির অবিস্মরণীয় গৌরবের ধন। যথাযথ মর্যাদার সঙ্গে প্রতি বছর ১৬ ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবস পালন করা হয়। বিজয়ের চেতনা জাতির সব কর্মকাণ্ডে প্রবাহিত করতে হবে।
পরিবেশ দূষণ: কারণ ও প্রতিকার
ভূমিকা
আকাশ, বাতাস, জল, উদ্ভিদজগত, প্রাণীজগত সবকিছু নিয়ে আমাদের পরিবেশ। এগুলির কোনোটিকে বাদ দিয়ে আমরা বাঁচতে পারি না। মানুষ তার বিদ্যা, বুদ্ধি দিয়ে এবং অনলস পরিশ্রমে তার চারপাশের পরিবেশকে আরও সুন্দর করে সাজিয়েছে। প্রাকৃতিক পরিবেশ থেকে বেশি মণিমানিক্য সংগ্রহ করে মানুষ উষর মরুভূমির বুকেও ফুটিয়েছে সোনালী ফসল। কিন্তু সভ্যতার অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে আর স্বার্থান্বেষী কিছু মানুষের লোভে প্রাকৃতিক পরিবেশ আজ নানান ভাবে দূষিত হচ্ছে। যেমন বায়ু, জল, মাটি, শব্দ প্রভৃতি দূষণের ফলে মানুষের জীবনেও এসেছে নানা রকম দুরারোগ্য ব্যাধি। নির্বিচারে প্রকৃতির সম্পদ লুঠ করতে গিয়ে মানুষ বন্যা, অনাবৃষ্টি, ক্ষতিকর প্রাণী ও কীটপতঙ্গের উপদ্রব, মারাত্মক ব্যাধির বিস্তার প্রভৃতি বিপর্যয়ের সম্মুখীন হচ্ছে। এই পরিবেশ দূষণ একবিংশ শতাব্দীর মানবসভ্যতার পক্ষে অত্যন্ত বিপজ্জনক হয়ে দেখা দিয়েছে।
পরিবেশ দূষণ কি?
প্রাকৃতিক কারণে অথবা মানুষের কার্যকলাপে সৃষ্ট উদ্ভুত দুষিত পদার্থ যখন পরিবেশকে বিষময় করে তলে তখনই আমরা দূষণ শব্দটা ব্যবহার করি। পরিবেশের প্রাকৃতিক বিভিন্ন উপাদান যেমন- মাটি, বায়ু, জল ইত্যাদির ভৌত, রাসায়নিক ও জৈব পরিবর্তন ঘটলে তা জীবজগতের উপর ক্ষতিকর প্রভাব সৃষ্টি করে। এটিকে পরিবেশ দূষণ বলে। ক্ষতিকর পদার্থের বৃদ্ধির ফলে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হয়। এবং স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যহত হয়।
পরিবেশ দূষণের কারণ
পরিবেশের প্রাকৃতিক বিভিন্ন উপাদান যেমন মাটি, বায়ু, জল ইত্যাদি বিভিন্ন ভাবে দূষিত হয়ে থাকে যেমন-
বায়ুদুষণ
আমাদের প্রাকৃতিক পরিবেশের অন্যতম ও প্রধান হলো বায়ু বা বাতাস যা ছাড়া প্রাণীজগত এক মুহূর্ত ও বাঁচতে পারে না। বায়ুদূষণের অন্যতম কারণ হল নিউক্লীয় আবর্জনা, কয়লা পুড়িয়ে কার্বন-ডাই অক্সাইড বাতাসে ছড়িয়ে দেওয়া, কলকারখানার দুষিত গ্যাস, যানবাহনের জ্বালানি পোড়া গন্ধ বাতাসে মিশে বাতাস দুষিত হচ্ছে। দূষণের ফলে মানুষের শ্বাসকষ্ট, ক্যান্সারের মতো দুরারোগ্য ব্যাধির শিকার হতে হচ্ছে
জলদুষণ
জলের আর এক নাম জীবন। জল ছাড়া কোনো জীব বাঁচে না। অথচ সভ্যতার অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে কলকারখানার সংখ্যা বেড়ে চলেছে প্রতিনিয়ত। সেই কলকারখানা থেকে নির্গত রাসায়নিক পদার্থমিশ্রিত জল নদীর জলে মিশে নদীর জলকে দূষিত করছে। এছাড়া শহরের সমস্ত নর্দমার জল ও নদীতে পড়ে নদীর জলকে দুষিত করছে। ফলে জলবাহিত রোগের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। জলবাহিত রোগে আজ মানুষ বড় বিপন্ন।
শব্দদূষণ
কলকারখানার উচ্চশব্দ, যন্ত্রচালিত গাড়ির হর্ন, বাজি-পটকার শব্দ মাইক্রোফোনের আওয়াজে মানুষের শ্রবণক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে। মানসিক বিপর্যয়, রক্তচাপ বৃদ্ধি, স্নায়বিক অস্থিরতা প্রভৃতি নানা রকমের সমস্যা সৃষ্টি করছে। এছাড়াও বর্তমানে যেকোনো ধরণের অনুষ্ঠানে DJ গান শব্দ দূষণের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মাটিদূষণ
বর্তমানে কৃষিক্ষেত্রে সবুজবিপ্লব এসেছে। কিন্তু উৎপাদন বৃদ্ধি করতে গিয়ে জমিতে নানা প্রকারের রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার করা হচ্ছে, এর ফলে মাটি দূষিত হচ্ছে। সারা বছর জমিতে সেচব্যবস্থা নিশ্চিত করার জন্য বহু নদীতে বাঁধ দিয়ে নদীর গতিকে থামিয়ে দেওয়া হয়েছে, এতে একদিকে যেমন নদীর জল দূষিত হচ্ছে অপরদিকে মৃত্তিকা দূষণ ও হচ্ছে। রাসায়নিক সার দ্বারা প্রস্তুত কৃষিজাত সামগ্রী থেকে নানা ধরণের রোগ সৃষ্টি হচ্ছে। যত্রতত্র প্লাস্টিক ফেলে রাখার ফলেও মাটি দূষণ ঘটে।
এছাড়া পরিবেশ দূষণের অন্যতম কারণ হল-
জনসংখ্যা বৃদ্ধি
ক্রমাগত জনসংখ্যা বৃদ্ধি, প্রাকৃতিক ভারসাম্যহীনতা ও পরিবেশ দূষণ মারাত্মক আকার ধারণ করছে। বর্ধিত জনসংখ্যার প্রয়োজনে বনজঙ্গল, গাছপালা কেটে চাষের জমি তৈরী করা হয় বা বসতবাড়ি নির্মান করা হয়, গাছপালা কাটার ফলে বৃষ্টিপাত কমে যায়, খরার প্রকোপ বৃদ্ধি পায়। অধিক জনসংখ্যা পরিবেশের ওপর অধিক চাপ সৃষ্টি করে। স্যানিটেশন ব্যবস্থাকে কলুষিত করে এবং পরিবেশের বিপর্যয় ঘটায়।
দূষণ প্রতিরোধের উপায় ও প্রতিকার
পরিবেশ দূষণ আজ সারা পৃথিবীর একটি বিরাট সমস্যা। এই সমস্যা সমাধানের জন্য আমাদের কিছু ব্যবস্থা নিতে হবে। সব রকম দূষণ থেকে আমাদের মুক্তি দিতে পারে একমাত্র উদ্ভিদ। সবুজ উদ্ভিদ বা গাছ সালোকসংশ্লেষ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিজের খাদ্য নিজে প্রস্তুত করতে পারে। এই প্রক্রিয়ায় গাছ বাতাস থেকে কার্বন-ডাই অক্সাইড গ্রহণ করে আর বাতাসে অক্সিজেন ছেড়ে দেয়। যে অক্সিজেন প্রাণীজগতের বাঁচার জন্য অপরিহার্য্য। তাই বেশি করে গাছ লাগাতে হবে এবং সংরক্ষণ করতে হবে। তাহলে বাতাসে কার্বন-ডাইও অক্সাইডের ভারসাম্য বজায় থাকবে । কলকারখানা থেকে দূষণ নিয়ন্ত্রণ করার জন্য নিয়ন্ত্রক যন্ত্রের ব্যবস্থা গ্রহণ, যথা কলকারখানার বা নর্দমার তরল যাতে নদীর জলে না মেশে সে ব্যাপারে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। শব্দদূষণ কমানোর জন্য শব্দ নিরোধক যন্ত্রের ব্যবহারের উপর জোর দিতে হবে। রাসায়নিক সারের পরিবর্তে জৈব সারের প্রয়োগ বেশি করে এবং কীটনাশকের পরিমাণ কমিয়ে মৃত্তিকা দূষণ রোধ সম্ভব। সর্বোপরি যানবাহনে পেট্রল বা ডিজেল পোড়ানোর পরিবর্তে ব্যাটারি চালিত গাড়ির ব্যবহার করতে পারলে দূষণ থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে।
উপসংহার
পরিবেশ দূষণ একটা গুরুতর সমস্যা। আজ মানব সভ্যতার অস্তিত্ব বিঘ্নিত। এই গভীর সংকটের মোকাবিলা করার জন্য আমাদের প্রত্যেকেই সচেতন হতে হবে এবং নজর দিতে হবে যাতে পরিবেশের দূষণের মাত্রা না বাড়ে। কারণ বিজ্ঞান যতই উন্নত হোক বা প্রযুক্তিবিজ্ঞান যতই আমাদের উন্নতির শীর্ষে নিয়ে যাক না কেন মানুষের জন্যে সভ্যতা মানুষের হাতেই যদি বিনাশ হয় তাহলে কি লাভ। এই সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্যে আমাদের সবাইকেই হাত মিলিয়ে কোমর বেঁধে নেমে পড়তে হবে।
জ্যোৎস্নাশোভিত রাত
অপূর্ব মন মাতানো জ্যোৎস্নার রূপ দেখার আগে রাতের আকাশেকে অন্ধকার বলেই ভেবেছি আমি। আমার ধারণা ছিল রাতের কর্মহীন পৃথিবী পরিশ্রান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। হয়ে যায় নিঝুম। কিন্তু রাতের পৃথিবীতে যে সৌন্দর্যের ঐশ্বর্যময় সমারোহ ঘটতে পারে তা কখনো আমার অভিজ্ঞতায় ছিল না। অভিজ্ঞতা হলো সেদিন হঠাৎ করে আকাশে চন্দ্রোলোকিত রাতের শোভা দেখেছিলাম মুগ্ধনয়নে। সৌন্দর্যের এমন মাদকতা আমি আমার ক্ষুদ্র জীবনে কখনও অবলোকন করি নি।
পৃথিবীতে এমন লোক হয়ত খুবই কম পাওয়া যাবে যে অন্ধকারে ভয় পায় না। অন্ধকার সবার মনকে দুর্বল করে দেয়; বয়ে আনে ভয়ংকর রহস্যের শিহরণ। যতক্ষণ ঘরে আলো থাকে কিংবা পড়ালেখায় ব্যস্ত থাকি ততক্ষণ কোনো কিছুকেই ভয় পাই না। কিন্তু ঘর অন্ধকার হলে বা রাতে ঘুম না আসলে অজানা এক ভয় আমাকে গ্রাস করে। সেই আমি জ্যোৎস্নার মোহনীয় রূপ দেখে মুগ্ধ হয়েছি। ঘটনাচক্রে এক রাতে জ্যোৎস্নার রূপ-মাধুরী নিজ চোখে অবলোকন করার সৌভাগ্য আমার হয়। সে এক অপরূপ রাত- রূপময় জ্যোৎস্না রাত।
পরীক্ষা সমানে। তাই লেখাপড়ার চাপ খুবই বেশি। কোন দিকে তাকানোর সময় নেই। অনেক রাত পর্যন্ত পড়ালেখা করতে হচ্ছে।
চারতলার ঘরে প্রচণ্ড গরমে সিদ্ধ হয়ে বাসার সবাই গেছে ছাদে। আমি একা পড়ছি। পড়তে পড়তে মাথা ঝিম ঝিম করতে লাগলো। কোনো পড়াই আর মাথায় ঢুকছে বলে মনে হচ্ছিল না।
হঠাৎ তখনই বিদ্যুৎ চলে গেল। মা তাড়াতাড়ি নিচে নেমে এলেন। বললেন, গরমে অসুখ বাঁধাবি। চল কিছুক্ষণ ছাদে বসবি। চমৎকার চাঁদ উঠেছে আকাশে। পূর্ণিমার চাঁদ।
মা'র সঙ্গে ছাদে গেলাম। সেখানে গিয়েই আমি চাঁদের স্নিগ্ধ আলোয় অভিভূত। ঝিরঝিরে স্নিগ্ধ বাতাসে প্রাণ যেন জুড়িয়ে গেল। চারপাশের লোড শেডিংয়ের মধ্যে মনে হলো, স্বচ্ছ রূপালি ঝরনার মত চাঁদের আলো যেন চারপাশ ভাসিয়ে নিয়ে চলেছে।
আকাশে বিন্দুমাত্র মেঘ নেই। সারা আকাশ জুড়ে কেবল মিটিমিটি জ্বলছে চাঁদের সাথী তারারা। চাঁদের আলোর বন্যায় রাতকে মনে হচ্ছে যেন এক মায়াবী দিন। চাঁদ যতই উপরে উঠছে ততই বাড়ছে তার উজ্জ্বলতা। বাড়ছে সেই মায়াবী রাতের সৌন্দর্য। এরই মধ্যে আমার ছোট ভাই বোনেরা সবাই মিলে গান ধরলো:
আজ জ্যোৎস্না রাতে সবাই গেছে বনে
বসন্তেরই মাতাল সমীকরণে....
আমিও তাদের সঙ্গে সুর মেলালাম।
বাড়ির ছাদে জ্যোৎস্নার সৌন্দর্যের যে এমন সমারোহ ঘটতে পারে তা কখনো আমার কল্পনায় ছিল না। এর আগেও রাতে অনেকবার ছাদে উঠেছি অন্যদের সঙ্গে কিন্তু এমন অপূর্ব অনুভূতি কখনো মনে জাগে নি। ভাবলাম, কত যে সুন্দর মুহূর্ত উপভোগ করতে আমরা ব্যর্থ হই পড়ার চাপে আর টেলিভিশনের আকর্ষণে।
বাইরে চারিদিক নিস্তব্ধ, নিঝুম। সব পাখপাখালি তাদের নীড়ে ঘুমাচ্ছে। কোথাও পাতা নড়ার শব্দও নেই। যেন সম্পূর্ণ প্রকৃতি ঘুমে আচ্ছন্ন, খালি জেগে আছে আকাশের বিশাল উজ্জ্বল চাঁদটা আর তার সাথী তারারা। চারপাশের বাড়িঘর, গাছপালা সবকিছুই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে জ্যোৎস্নায়। চাঁদের স্নিগ্ধ আলোয় সবাইকে কেমন যেন মায়াবী দেখাচ্ছিল। আমাদের চারপাশে জ্যোৎস্নার সমুদ্র বয়ে যাচ্ছে। চারপাশের সবুজ প্রকৃতির কারণে তা রূপ বহুক্ষণ দেখতে পাব। আজ বুঝতে পারলাম, কেন কবি লিখেছিলেন-
"এমন চাঁদের আলো মরি যদি তাও ভালো
সে মরণ স্বর্গ সমান।"
হঠাৎ করে অনেকগুলো কাক ডেকে উঠলো। শুনেছি, জ্যোৎস্না হলে কাকেরা মনে করে ভোর হয়ে আসছে। তাই তারা ডাকাডাকি শুরু করে দেয়। এরই মধ্যে মাঝে মাঝে কোথা থেকে হাসনাহেনা ফুলের মন মাতানো সুরভি এসে মনপ্রাণ ভরে দিচ্ছে। আকাশে উজ্জ্বল আলোময় ঝলমলে চাঁদ, চারপাশে তারই প্রভাবে অপূর্ব সৌন্দর্ঘময় পৃথিবী এবং মনমাতানো ফুলের সুরভি আমাকে আপ্লুত করে তুলল। মনে হলো, কবি- শিল্পীরা এই জন্যেই এমন জ্যোৎস্না রাতে কবিতা লিখেছেন, গান গেয়েছেন।
এই সব ভাবছি। এমন সময় হঠাৎ চারপাশে বৈদ্যুতিক আলো জ্বলে উঠল। লোড শেডিং শেষ হয়েছে। আমার ঘোর ভেঙে গেল। আরে, কাল যে আমার পরীক্ষা! তাড়াতাড়ি ছাদ থেকে নেমে আবার পড়ার টেবিলে।
সে রাতে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখলাম, আমি ডানাওয়ালা পরীদের সঙ্গে জ্যোৎস্না-সমুদ্রে ভেসে বেড়াচ্ছি।
Related Question
View Allএকজন লেখক তিনিই যিনি লেখেন। তবে সব লেখা লিখেই লেখক হওয়া যায় না। লেখক সব ধরনের হতে পারে। তবে সৃজনশীল লেখকই হচ্ছে আমাদের মূল কেন্দ্রবিন্দু। লেখক হচ্ছে পৃথিবীর অন্যতম একটি স্বাধীন সত্ত্বা।
একজন লেখক পুরোপুরি তার নিজের সত্ত্বার ওপরে বেঁচে থাকে। অনেকেই লেখক হবার সহজ উপায় খোঁজ করে। কিন্তু পড়তে পড়তে আর লিখতে লিখতেই শুধুমাত্র লেখক হওয়া যায়। এছাড়া আর কোনো উপায় নেই। লেখক অনেক ধরনের হতে পারে।
একজন সাংবাদিকও একজন লেখক। উপন্যাস, গল্প, কবিতা, ছড়া, সাহিত্য, প্রবন্ধ, রম্য, ব্লগ সব ধরনের লেখা যারা লেখে তারাই লেখক। অনেকেই মস্তিষ্কের মধ্যে ওকটা লেখার শক্তি পেয়ে যায় আর অনেকে হয়ত শিখে শিখে লেখক হয়।
সমাজ সভ্যতা কখনোই পুরোপুরি একজন লেখকের পক্ষে থাকে না। বরং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বিপক্ষে চলে যায়। স্বাভাবিকভাবেই একজন লেখক তার কলমের আঘাতে জর্জরিত করতে চায় সকল অন্যায়, অপবাদ। তাই হয়ত বেঁধে যেতে পারে সংঘাত। কলমই হচ্ছে একজন লেখকের দাঁড়ানোর জায়গা। কলম ছাড়া লেখকের অস্তিত্ব বিলীন। তবে সবাইকে যে প্রতিবাদ লিখতে হবে এমন কোনো কথা। কেউ কেউ মনোরঞ্জনের জন্যও লেখে। অনেকে আবার চাটুকারিতা করতে লেখে। কেউ আবার কীভাবে পুরষ্কার তুলে নেওয়া যায় সেই ধান্দা করার জন্য লেখে।
একজন লেখক হয়ে উঠতে পারে ন্যায় অন্যায়ের পার্থক্যকারী। সে কলমের ছোঁয়ায় প্রতিবাদ করতে অন্যায়ের আর ফুটিয়ে তুলবে ন্যায়ের কথা। লেখকের কলমের কালি প্রেরণার সুর হয়ে গান গাইবে। আর অশ্রুসিক্ত নয়নে হাসির ঝলক আনবে লেখকের কলম। একজন লেখকের প্রাণ তার লেখা, তার লেখার ভঙ্গি। সে তার লেখা দিয়ে বাঁচিয়ে তুলতে পারবে অসুস্থ কোনো সভ্যতাকে। লেখক তার কলম দিয়ে জাগ্রত করতে পারবে মানুষের ভীতরে লুকিয়ে থাকা অদম্য সাহস।
একজন লেখক কল্পনাকে নিয়ে আসতে পারে বাস্তবে। আমাদের নিয়ে যেতে পারে কল্পনার গহীন বনে। লেখক আমাদের সবাক যুগ থেকে অবাক যুগে নিয়ে যেতে পারে মুহূর্তের মাঝেই। লেখক জাগাতে পারে প্রেম, লেখক জাগাতে পারে নতুন কাজের স্পৃহা।
অনেকেই মনে করে লেখকের সকল বিষয়ে দ্বায় আছে। কিন্তু লেখকের মূলত কারো কাছেই কোনো দ্বায় নেই। তার দ্বায় থাকে শুধু নিজের মনের কাছে, নিজের বিবেকের কাছে, নিজের সুপ্ত চেতনার কাছে। সমাজ কি ভাববে তা নিয়ে লেখক মাথা ঘামাবে না। লেখক ভয়ে নাথা নোয়াবে না। লেখক যতদিন বাঁচবে বীরের মতোই বাঁচবে।
সারা বিশ্বেই লেখকরা নির্যাতনের শিকার হয়। অনেকেই বলে থাকে লিখে কিছুই হয় না। তাই যদি হতো তাহলে লেখার জন্য লেখকের শাস্তি হতো না। লেখকের ফাঁসি হতো না।
লেখকের কলমে অনেক জোর। সেই জোর ভেঙে চুরে গুড়িয়ে দিতে পারে যেকোনো কিছু। বিশেষ করে সাংবাদিকরা বিশ্বজুড়ে নির্যাতিত হয় অনিয়মের বিরুদ্ধে লিখতে গিয়ে। শাস্তি, সাজা বহু কিছু তাদের সহ্য করতে হয়। অন্যায়ের বিরুদ্ধে লিখলে হুমকি আসে, হামলা মামলা বহু ঘটনাই ঘটে। কারণ শাসক, শোষক আর অন্যায়কারীদের অনেক ক্ষমতা। লেখকের সমাজের দায়মুক্তির জন্য জীবনও দিতে হয়। তাইতো একজন লেখক সমাজের শক্তি, সমাজের সম্পদ।
সাহিত্য হচ্ছে মানুষের চিন্তা-ভাবনা, অনুভূতি তথা মানব-অভিজ্ঞতার কথা বা শব্দের বাঁধনে নির্মিত নান্দনিক বহিঃপ্রকাশ। এই অর্থে গল্প, কবিতা, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ ইত্যাদি উচ্চতর গুণাবলি সমন্বিত বিশেষ ধরনের সৃজনশীল মহত্তম শিল্পকর্ম। সাহিত্য-শিল্পীগণ যখন ‘অন্তর হতে বচন আহরণ’ করে আত্মপ্রকাশ কলায় ‘গীতরস ধারা’য় সিঞ্চন করে ‘আনন্দলোকে’ নিজের কথা- পরের কথা- বাইরের জগতের কথা আত্মগত উপলব্ধির রসে প্রকাশ করেন- তখনই তা হয়ে ওঠে সাহিত্য। রবীন্দ্রনাথের কথায় “বহিঃপ্রকৃতি এবং মানব-চরিত্র মানুষের মধ্যে অনুক্ষণ যে আকার ধারণ করিতেছে, যে-সঙ্গীত ধ্বনিত করিয়া তুলিতেছে, ভাষা-রচিত সেই চিত্র এবং সেই গানই সাহিত্য।…সাধারণের জিনিসকে বিশেষভাবে নিজের করিয়া – সেই উপায়ে তাহাকে পুনরায় বিশেষভাবে সাধারণের করিয়া তোলাই হচ্ছে সাহিত্যের কাজ।” [রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সাহিত্য] সাহিত্য সত্য-সুন্দরের প্রকাশ হিসেবে প্রবহমাণ সময়ে যা ঘটে – সে-সবের মধ্য থেকে যা মহৎ, যা বস্তুসীমাকে ছাড়িয়ে বাস্তবাতীত প্রকাশ করে, যা জীবনের জন্য কল্যাণময় এবং মহৎ আদর্শের দ্যোতক তাকেই প্রকাশ করে। আসলে মহৎ সাহিত্য তাই- যা একাধারে সমসাময়িক-শাশ্বত-যুগধর্মী-যুগোপযোগী-যুগোত্তীর্ণ। সাহিত্য কেবল পাঠককে আনন্দ দেয় না- সমানভাবে প্রভাবিত করে পাঠক এবং সমাজকে।
আভিধানিকভাবে ‘সহিতের ভাব’ বা ‘মিলন’ অর্থে ‘সাহিত্য’ হলো কাব্য, নাটক, গল্প, উপন্যাস ইত্যাদি সৃজনশিল্পের মাধ্যমে এক হৃদয়ের সঙ্গে অন্য হৃদয়ের সংযোগ স্থাপন; সাহিত্য¯্রষ্টা-সাহিত্যের সাথে পাঠকের এক সানুরাগ বিনিময়। কিন্তু আভিধানিক অর্থের নির্দিষ্ট সীমায় সাহিত্যের স্বরূপ-গতি-প্রকৃতি-বৈচিত্র্য ও বিস্তৃতির সম্যক ধারণা দেওয়া যেমন অসম্ভব, কোনো বিশেষ সংজ্ঞায় তাকে সুনির্দিষ্ট করে দেওয়াও তেমন দুঃসাধ্য। বাচ্যার্থ ও ব্যঞ্জনার্থর সীমাকে অতিক্রম করে নানা রূপে, রসে, প্রকরণ ও শৈলীতে সাহিত্যের নিরন্তর যাত্রা সীমা থেকে অসীমে। প্রত্যক্ষ সমাজপরিবেশ তথা সমকালীন বাস্তব পারিপার্শ্বিক, নিসর্গপ্রীতি ও মহাবিশ্বলোকের বৃহৎ-উদার পরিসরে ব্যক্তিচৈতন্য ও কল্পনার অন্বেষণ ও মুক্তি- আর এইভাবেই শ্রেণিবিভাজন, নামকরণ ও স্বরূপমীমাংসার প্রচেষ্টাকে ছাপিয়ে উঠে সাহিত্যের যাত্রা সীমাহীনতায়। প্রকৃত সাহিত্য তাই যেমন তার সমসময় যা যুগমুহূর্তের, তেমনই তা সর্বকালের সর্বজনের। মার্কসবাদী সাহিত্যতত্ত্বে বাস্তব সমাজজীবনকে ‘ভিত্তি’ আর শিল্প-সাহিত্যকে সমাজের উপরিকাঠামোর [ঝঁঢ়বৎংঃৎঁপঃঁৎব] অংশ হিসেবে গণ্য করা হয়। সাহিত্যের মৌল উপকরণসামগ্রী আহৃত হয় জীবনের ভা-ার থেকে- সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, প্রেম-বৈরিতার বিচিত্র-অনিঃশেষ ভা-ার থেকে। সাহিত্যসৃষ্টির মূলে সক্রিয় যে সৃজনী-ব্যক্তিত্ব তা নিছক বিমূর্ত কোনো সত্তা নয়; আত্মপ্রকাশ ও মানবিক সংযোগ ও বিনিময়ের বাসনায় অনুপ্রাণিত সে সত্তা তার ভাব-ভাবনা, বোধ ও বিশ্বাসকে এক আশ্চর্য কৌশলে প্রকাশ করে জনসমক্ষে কোনো একটি বিশেষ রূপ-রীতি-নীতির আশ্রয়ে। ব্যক্তিক অনুুভূতি-যাপিতজীবন-মিশ্রকল্পনার জগৎ থেকেই সৃষ্টি হয় সাহিত্যের; যুগান্তরের আলোকবর্তিকা হিসেবে সাহিত্য সত্যের পথে সবসময় মাথা উঁচু করে থেকেছে- সত্যকে সন্ধান করেছে। আসলে সাহিত্য এমনি এক দর্পণ- যাতে প্রতিবিম্বিত হয় মানবজীবন, জীবনের চলচ্ছবি, পরিবেশ-প্রতিবেশ, সমাজজীবনে ঘটমান ইতিহাস- ইতিহাসের চোরাস্রােত নানাবিধ কৌণিক সূক্ষ্মতায়।
সাধারণত আত্মপ্রকাশের বাসনা, সমাজ-সত্তার সঙ্গে সংযোগ কামনা, অভিজ্ঞতার আলোয় কল্পলোক নির্মাণ এবং রূপপ্রিয়তা- এই চতুর্মাত্রিক প্রবণতাই মানুষের সাহিত্য-সাধনার মৌল-উৎস। চতুর্মাত্রিক প্রবণতার [আত্মপ্রকাশের কামনা, পারিপার্শ্বিকের সাথে যোগাযোগ বা মিলনের কামনা, কল্প-জগতের প্রয়োজনীয়তা এবং সৌন্দর্য-সৃষ্টির আকাক্সক্ষা বা রূপমুগ্ধতা] মধ্যে সমাজসত্তার সঙ্গে সংযোগ-কামনা এবং অভিজ্ঞতার আলোয় কল্পলোক নির্মাণ- এই উৎসদ্বয়ের মধ্যে নিহিত রয়েছে সাহিত্য ও সমাজের মধ্যে আন্তর-সম্পর্কের প্রাণ-বীজ। সমাজ শিল্পীকে সাহিত্য-সাধনায় প্রণোদিত করে। ‘সহৃদয়-হৃদয় সংবাদ’এর মাধ্যমে সাহিত্যিকগণ লেখক-পাঠকের মধ্যে সেতুবন্ধন রচনা করেন- উভয়ের হৃদয়বীণার তারগুলোকে একই সুতায় গেঁথে দেন। এর কারণে সাহিত্য দেশ-কাল-সমাজের সীমা অতিক্রম করে সর্বসাধারণের হৃদয়কে আকর্ষণ করে। এর ফলে সাহিত্য হয়ে ওঠে সার্বজনীন-সর্বকালের মানুষের হৃদয়ের সামগ্রী এবং সাহিত্য¯্রষ্টাও হয়ে ওঠেন অনেক বড়। কিন্তু বর্তমান বাংলা সাহিত্যচর্চার গতি-প্রকৃতি, সমস্যা-সংকট-সমাধান কোন দিকে? এসব বিষয়ের সন্ধান- এ প্রবন্ধের অন্বিষ্ট।
আমাদের লোকশিল্প প্রবন্ধটি আমাদের লোককৃষ্টি গ্রন্থ থেকে গৃহীত হয়েছে। লেখক এ প্রবন্ধে বাংলাদেশের লোকশিল্প ও লোক-ঐতিহ্যের বর্ণনা দিয়েছেন । এ বর্ণনায় লোকশিল্পের প্রতি তার গভীর মমত্ববোধের পরিচয় রয়েছে।
আমাদের নিত্যব্যবহার্য অধিকাংশ জিনিসই এ কুটিরশিল্পের ওপর নির্ভরশীল ।
শিল্পগুণ বিচারে এ ধরনের শিল্পকে লোকশিল্পের মধ্যে গণ্য করা যেতে পারে । পূর্বে আমাদের দেশে যে সমস্ত লোকশিল্পের দ্রব্য তৈরি হতো তার অনেকগুলোই অত্যন্ত উচ্চমানের ছিল। ঢাকাই মসলিন তার অন্যতম। ঢাকাই মসলিন অধুনা বিলুপ্ত হলেও ঢাকাই জামদানি শাড়ি অনেকাংশে সে স্থান অধিকার করেছে।
বর্তমানে জামদানি শাড়ি দেশে-বিদেশে পরিচিত এবং আমাদের গর্বের বস্তু। নকশি কাথা আমাদের একটি গ্রামীণ লোকশিল্প। এ শিল্প আজ বিলুপ্তপ্রায় হলেও এর কিছু কিছু নমুনা পাওয়া যায়। আপন পরিবেশ থেকেই মেয়েরা তাদের মনের মতো করে কীথা সেলাইয়ের অনুপ্রেরণা পেতেন । কাঁথার প্রতিটি সুচের ফোঁড়ের মধ্যে লুকিয়ে আছে এক-একটি পরিবারের কাহিনী, তাদের পরিবেশ, তাদের জীবনগাঁথা ।
আমাদের দেশের কুমোরপাড়ার শিল্পীরা বিভিন্ন ধরনের তৈজসপত্র ছাড়াও পোড়ামাটি দিয়ে নানা প্রকার শৌখিন দ্রব্য তৈরি করে থাকে। নানা প্রকার পুতুল, মূর্তি ও আধুনিক রুচির ফুলদানি, ছাইদানি, চায়ের সেট ইত্যাদি তারা গড়ে থাকে।
খুলনার মাদুর ও সিলেটের শীতলপাটি সকলের কাছে পরিচিত। আমাদের দেশের এই যে লোকশিল্প তা সংরক্ষণের দায়িত আমাদের সকলের । লোকশিল্পের মাধ্যমে আমরা আমাদের ঐতিহ্যকে বিশ্বের কাছে তুলে ধরতে পারি।
আমাদের অর্থনৈতিক সম্পদ
বাংলাদেশ, একটি দ্রুত উন্নতি লক্ষ্য নির্ধারণ করা দেশ, যা প্রচুর অর্থনৈতিক সম্পদের বেশিরভাগ সম্পদ নিয়ে এগিয়ে চলেছে। এই দেশের অর্থনৈতিক সম্পদ মৌলিকভাবে চারটি প্রধান উৎস থেকে আসে: জমি, কাজ, উদ্যোগ, এবং মানুষের কাজের দক্ষতা। এই সম্পদের বিকাশে বিভিন্ন রাজনৈতিক, আর্থিক এবং সামাজিক পরিবর্তনের ভূমিকা রয়েছে।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পদের মূল স্তম্ভ হল কৃষি। দেশটি একটি প্রধানত কৃষিপ্রধান দেশ হিসেবে পরিচিত। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নতির মূল হিসেবে প্রধানত শস্য ও ফসল চাষ প্রসঙ্গে বিকাশ হয়েছে। বাংলাদেশে প্রধানত ধান, পাট, মশুর ডাল, আখ, পটল, পেঁপে, তেল সহ বিভিন্ন ফসল চাষ করা হয়। অত্যন্ত উচ্চ মানের খাদ্য সামগ্রী উৎপাদনের ফলে এই খাদ্য পণ্য রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক সম্পদের গড়াতে সাহায্য করে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক উৎস হল প্রবৃদ্ধি ও শিক্ষাগত উন্নতি। বাংলাদেশে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের অভাব কমে আসছে এবং মানুষের দক্ষতা বৃদ্ধি করছে। বিশেষত, প্রযুক্তির আগমন এবং বিনিয়োগে বৃদ্ধি নেওয়া হচ্ছে, যা অর্থনৈতিক সম্পদের উন্নতির পথে সাহায্য করছে।
অন্যান্য উৎস হিসেবে প্রযুক্তিবিদ্যা এবং সেবা অংশ গুলির অগ্রগতি আছে। বাংলাদেশের সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক সম্পদ হল তার মানুষের চাকরিভার্থী শ্রমিকেরা। তাদের দক্ষতা, উদ্যোগ, ও সামর্থ্য বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
যদিও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পদ উন্নতির পথে অনেক উত্সাহজনক প্রগতি হয়েছে, তবে এখনও অনেক চ্যালেঞ্জ র
য়েছে। প্রধানতঃ গরিব মানুষের জন্য আর্থিক সম্পদের অগ্রগতি নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ হলেও এখনও বেশিরভাগ লোকের মধ্যে বৃদ্ধির অভাব আছে। তাছাড়া, পরিবেশের সম্পদ সংরক্ষণের জন্য সঠিক প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থা প্রয়োজন।
পুনর্নির্মাণ ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সম্পদের বিস্তার ও উন্নতি নিশ্চিত করতে পারে। সঠিক নীতি নির্ধারণ, উদ্যোগের বৃদ্ধি, প্রযুক্তিগত প্রবর্তন এবং শিক্ষাগত উন্নতি এমন পরিবর্তন নিশ্চিত করতে সাহায্য করতে পারে।
শেষ কথায়, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পদ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যা দেশটির সমৃদ্ধি ও উন্নতির সাথে অবিভাজ্যভাবে সংযোগিত। একটি দ্রুত বৃদ্ধির উপায় হল সঠিক পরিকল্পনা, ব্যবস্থাপনা এবং উদ্যোগের বৃদ্ধি করা। এই প্রস্তুতি নেওয়ার মাধ্যমে, বাংলাদেশ তার অর্থনৈতিক সম্পদ উন্নতির পথে আরও এগিয়ে যেতে পারে এবং তার মানুষের জন্য আরো উন্নত ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে পারে।
"বিক্ষুব্ধ পূর্ব ইউরোপ" বলতে পূর্ব ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ১৯৮৯ সালের পর সাম্যবাদী শাসনের পতন এবং এর ফলে উদ্ভূত রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতাকে বোঝায়। এই সময়কালে, পূর্ব ইউরোপের দেশগুলো গণতন্ত্র ও বাজার অর্থনীতির দিকে ধাবিত হয়, যার ফলে নতুন জাতীয়তাবাদ, অর্থনৈতিক সংকট, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও সামাজিক পরিবর্তন দেখা যায়।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও কারণ:
সাম্যবাদের পতন:
১৯৮৯ সালের ঐতিহাসিক বছরটি পূর্ব ইউরোপে সাম্যবাদী ব্যবস্থার পতন ঘটায়, যা ছিল একটি যুগান্তকারী ঘটনা। এই পরিবর্তনের ফলে দেশগুলো তাদের সাম্যবাদী অতীত থেকে মুক্তি পেতে শুরু করে।
গণতন্ত্রের পথে যাত্রা:
সাম্যবাদের পতনের পর পূর্ব ইউরোপের দেশগুলো গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা ও মুক্ত বাজার অর্থনীতির দিকে ঝুঁকে পড়ে।
বিক্ষোভ ও অস্থিতিশীলতার কারণসমূহ:
অর্থনৈতিক সংকট:
সাম্যবাদী অর্থনীতি থেকে বাজার অর্থনীতিতে উত্তরণ অনেক দেশে অর্থনৈতিক সংকট সৃষ্টি করে। বেকারত্ব, মুদ্রাস্ফীতি, এবং ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে বৈষম্য বাড়ে, যা সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করে।
জাতীয়তাবাদের উত্থান:
অনেক দেশে সাম্যবাদী শাসনের অবসানের পর বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে জাতীয়তাবোধ তীব্র হয়, যা নতুন করে জাতিগত সংঘাতের জন্ম দেয়।
রাজনৈতিক অস্থিরতা:
নতুন গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো সুসংহত হতে সময় লাগে, ফলে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা দেখা দেয়। অনেক দেশে ক্ষমতা ও আদর্শের লড়াইয়ের কারণে সহিংসতাও ঘটে।
সামাজিক পরিবর্তন:
পুরনো সাম্যবাদী নীতি ও ব্যবস্থার পরিবর্তে নতুন সামাজিক কাঠামো ও মূল্যবোধের জন্ম হতে থাকে, যা সমাজের বিভিন্ন স্তরে অস্থিরতা সৃষ্টি করে।
গুরুত্বপূর্ণ দিক:
- এই বিক্ষুব্ধ পরিস্থিতি পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোতে এক নতুন যুগের সূচনা করে, যেখানে তারা তাদের নিজস্ব পথে নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের সুযোগ পায়।
- যদিও এই পরিবর্তন প্রক্রিয়াটি কঠিন ছিল, এটি এই অঞ্চলে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
এইভাবে, "বিক্ষুব্ধ পূর্ব ইউরোপ" মূলত সেই সময়ের পরিবর্তন, অস্থিরতা এবং নতুন করে গড়ে ওঠার জটিল প্রক্রিয়াকে নির্দেশ করে, যা সাম্যবাদের পতন ও গণতান্ত্রিক যাত্রার ফলস্বরূপ ঘটেছিল।
পররাষ্ট্রনীতি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নীতির সম্প্রসারণ। পররাষ্ট্রনীতি হলো কোনো সার্বভৌম রাষ্ট্রের গৃহীত সেসব নীতি যা রাষ্ট্র তার রাষ্ট্রীয় স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য অন্যান্য রাষ্ট্রের সাথে যোগাযোগ রক্ষার ক্ষেত্রে সম্পাদন করে থাকে। অন্য রাষ্ট্রের মতো বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে রাষ্ট্রের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতাকে তুলে ধরে।
১৯৭১ সালে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদয় আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। স্বাধীনতা লাভের পরবর্তী সময়ে ভৌগোলিক অবস্থান, স্বল্প পরিসরের ভূখন্ড এবং সীমিত অর্থনৈতিক সম্পদ ইত্যাদি বিভিন্ন নিয়ামক বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণের সুযোগকে সীমাবদ্ধ করে দেয়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি মূলত বহিঃশক্তির প্রভাব থেকে দেশের সাবভৌমত্ব ও ভূখন্ডকে রক্ষা করার মতো বিষয়েই সীমাবদ্ধ থেকে গেছে।
পররাষ্ট্রনীতি সম্পর্কীয় সাংবিধনিক বিধান বাংলাদেশের সংবিধানের বিভিন্ন অনুচ্ছেদে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির নির্দেশনা রয়েছে। এই নির্দেশনাসমূহ বাংলাদেশ সংবিধানের ২৫ নং অনুচ্ছেদে বর্ণিত হয়েছে। এগুলি হলো:
জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও সমতার প্রতি শ্রদ্ধা, অপর রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা, আন্তর্জাতিক বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধান এবং আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘের সনদে বর্ণিত নীতিসমূহের প্রতি শ্রদ্ধা, এ সকল নীতিই হবে রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভিত্তি এবং এ সকল নীতির ভিত্তিতে-
১. রাষ্ট্র আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে শক্তিপ্রয়োগ থেকে বিরত থাকা এবং সাধারণ ও পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণের জন্য চেষ্টা করবে; প্রত্যেক জাতির স্বাধীন অভিপ্রায় অনুযায়ী পথ ও পন্থার মাধ্যমে অবাধে নিজস্ব সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা নির্ধারণ ও গঠনের অধিকার সমর্থন করবে; এবং সাম্রাজ্যবাদ, উপনিবেশবাদ বা বর্ণ্যবৈষম্যবাদের বিরুদ্ধে বিশ্বের সর্বত্র নিপীড়িত জনগণের ন্যায়সঙ্গত সংগ্রামকে সমর্থন করবে।
২. রাষ্ট্র ইসলামী সংহতির ভিত্তিতে মুসলিম দেশসমূহের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব সম্পর্ক সংহত, সংরক্ষণ এবং জোরদার করতে সচেষ্ট হবে। সংবিধানের ৬৩ অনুচ্ছেদে যুদ্ধ-ঘোষণা সংক্রান্ত নীতি উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে সংসদের সম্মতি ব্যতিত যুদ্ধ ঘোষণা করা যাবে না, কিংবা প্রজাতন্ত্র কোনো যুদ্ধে অংশগ্রহণ করবে না। অনুচ্ছেদ ১৪৫(ক)তে বৈদেশিক চুক্তি সম্পর্কে বলা হয়েছে: ‘বিদেশের সাথে সম্পাদিত সকল চুক্তি রাষ্ট্রপতির নিকট পেশ করা হবে, এবং রাষ্ট্রপতি তা সংসদে পেশ করার ব্যবস্থা করবেন। তবে শর্ত হচ্ছে যে, জাতীয় নিরাপত্তার সাথে সংশ্লিষ্ট অনুরূপ কোন চুক্তি কেবলমাত্র সংসদের গোপন বৈঠকে পেশ করা হবে।’
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূলনীতিসমূহ পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কিছু মূলনীতি অনুসরণ করে থাকে। জাতিসংঘ এবং ন্যামের মতো বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠনের সদস্য হিসেবে বাংলাদেশ এসব সংগঠনের মূলনীতিসমূহ মেনে চলে, এবং বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির প্রধান নীতিসমূহ এসব সংগঠনের নীতির সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির প্রধান চারটি মূলনীতি হলো:
সকলের প্রতি বন্ধুত্ব, কারও প্রতি বিদ্বেষ নয় একটি দরিদ্র রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ তার অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য বৈদেশিক সাহায্যের উপর নির্ভরশীল হবার কারণে বাংলাদেশকে বিভিন্ন মতাদর্শ দ্বারা প্রভাবিত হতে হয়। এ কারণেই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পররাষ্ট্রনীতির মূলনীতি হিসেবে বলেছিলেন, ‘আমাদের একটি ক্ষুদ্র দেশ, কারও প্রতি বিদ্বেষ নয়, আমরা চাই সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব’।
অন্য রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, স্বাধীনতা ও ভৌগোলিক অখন্ডতার প্রতি সম্মান প্রদর্শন বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্য। জাতিসংঘ সনদের ২(৪) ধারায় বলা হয়েছে ‘আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সকল সদস্য-রাষ্ট্র আঞ্চলিক অখন্ডতার বিরুদ্ধে কিংবা অন্য কোনো রাষ্ট্রের রাজনৈতিক স্বাধীনতার বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগের ভীতি প্রদর্শন থেকে এবং জাতিসংঘের উদ্দেশ্যের সংঙ্গে সামঞ্জস্যহীন কোনো উপায় গ্রহণ করা থেকে নিবৃত্ত থাকবে’।
অন্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ না করা জাতিসংঘ সনদের ২(৭) ধারায় বলা হয়েছে যে, ‘বর্তমান সনদ জাতিসংঘকে কোনো রাষ্ট্রের নিছক অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের অধিকার দিচ্ছে না বা সেরূপ বিষয়ের নিষ্পত্তির জন্য কোনো সদস্যকে জাতিসংঘের দারস্থ হতে হবে না; কিন্তু সপ্তম অধ্যায় অনুযায়ী কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের ব্যাপারে এই নীতি অন্তরায় হবে না’। জাতিসংঘের একটি সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ এই মূলনীতির উপর তার পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন করেছে, যা অন্য রাষ্ট্রের কাছে বাংলাদেশের বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে প্রকাশিত।
২০০৯ সালে পুনরায় আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসে, এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনয়নের কথা ঘোষণা করেন। বাংলাদেশের নিরাপত্তা ধারণা বিবেচনায় রেখে প্রায় তিন দশক পর ভারতের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের কথা ঘোষণা করা হয়। সম্প্রতি সরকার রাশিয়ার সাথে সম্পর্ক ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে রাশিয়ার সাহায্যে দেশে পারমাণবিক প্ল্যান্ট স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
সময়ের পরিবর্তনের সাথে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ভবিষ্যত অর্জনের সম্ভাবনা অনেকটা ক্ষীণ হয়ে পড়ছে। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ তার প্রতিবেশী এবং আঞ্চলিক রাষ্ট্রসমূহের সাথে এবং বিশ্বের আরো কিছু রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূলনীতি ‘সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে শত্রুতা নয়’ একটি সত্তুরের দশকের ধারণা, যা প্রায় ৪০ বছরের পুরনো। বর্তমান পরিবর্তিত বিশ্ব প্রেক্ষাপটে পুরনো ধারার পরররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করে বাংলাদেশ প্রতিনিয়ত তার অর্জনের সম্ভাবনা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। সুতরাং পররাষ্ট্রনীতির লক্ষ্য নিয়ে নতুন কৌশল-পরিকল্পনা করা উচিত, যার মাধ্যমে পরিবর্তিত বিশ্বে নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনের পথে বাংলাদেশ এগিয়ে যেতে পারে। [ঊর্মি হোসেন]
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!