সূচনা : ব্যর্থতা কেউ চায় না। সবাই সাফল্য খোঁজে। কিন্তু কেউই সব কাজে একবারে সফল হয় না। সফলতার জন্য বারবার চেষ্টা করতে হয়। কোনো কাজে সাফল্য লাভের জন্য বারবার এই চেষ্টার নামই অধ্যবসায়। অধ্যবসায় ছাড়া জীবনে উন্নতি লাভ করা যায় না। অধ্যবসায়ই হচ্ছে মানব সভ্যতার অগ্রগতির চাবিকাঠি।
অধ্যবসায় কী : অধ্যবসায় শব্দের আভিধানিক অর্থ অবিরাম সাধনা, ক্রমাগত চেষ্টা। কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য অবিরাম সাধনা বা ক্রমাগত চেষ্টা চালিয়ে যাওয়াকে বলে অধ্যবসায়। ব্যর্থতায় নিরাশ না হয়ে কঠোর পরিশ্রম আর ধৈর্যের সাথে অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছানোর মধ্যেই অধ্যবসায়ের সার্থকতা নিহিত।
অধ্যবসায়ের প্রয়োজনীয়তা : ব্যর্থতাই সফলতার প্রথম সোপান। ব্যর্থতা থেকে সাধনার শুরু, আর সফলতার মাধ্যমে তার শেষ। তাই মানবজীবনে সাধনা বা অধ্যবসায়ের বিকল্প নেই। অধ্যবসায়ী মানুষ অসাধ্য সাধন করতে পারে। এমনকি অধ্যবসায়ের গুণেই মানুষ পৃথিবীতে অমরত্ব লাভ করতে পারে। তাই মানবজীবনে অধ্যবসায়ের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম।
ছাত্রজীবনে অধ্যবসায় : ছাত্রজীবনে অধ্যবসায়ের গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি। ছাত্রজীবনই ভবিষ্যৎ গড়ার উপযুক্ত সময়। এ সময় ব্যর্থ হলে সম্পূর্ণ মানবজীবনই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। যে ছাত্র অধ্যবসায়ী, সাফল্য তার হাতের মুঠোয়। অলস ছাত্র-ছাত্রী মেধাবী হলেও পড়াশোনায় কখনো সফল হতে পারে না। কঠোর অধ্যবসায় ছাড়া কোনো কাজেই জয়ী হওয়া যায় না। ছাত্রজীবনেই এই সত্য উপলব্ধি করে নিজেকে অধ্যবসায়ী হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। মনে রাখতে হবে কবি কালীপ্রসন্ন ঘোষের বিখ্যাত উক্তি :
পারিব না একথাটি বলিও না আর,
কেন পারিবে না তাহা ভাব একবার,
পার কি না পার কর যতন আবার
একবার না পারিলে দেখ শতবার।
অধ্যবসায় ও প্রতিভা : অধ্যবসায় প্রতিভার চেয়ে অনেক বড়। মনীষী ভলতেয়ারের ভাষায়, ‘প্রতিভা বলে কোনো কিছু নেই। পরিশ্রম ও সাধনা করে যাও তাহলে প্রতিভাকে অগ্রাহ্য করতে পারবে।' ডালটন বলেছেন, ‘লোকে আমাকে প্রতিভাবান বলে; কিন্তু আমি পরিশ্রম ছাড়া আর কিছু জানি না।' বিজ্ঞানী নিউটনের উক্তি, ‘আমার আবিষ্কার প্রতিভা-প্রসূত নয়, বহু বছরের অধ্যবসায় ও নিরবচ্ছিন্ন সাধনার ফল।' এ থেকেই বোঝা যায়, অধ্যবসায় ও পরিশ্রম ছাড়া শুধু প্রতিভার কোনো মূল্য নেই। প্রতিভাবান ব্যক্তিরা অধ্যবসায় দ্বারাই নিজের কাজকে সুসম্পন্ন করে তোলেন। আবার অধ্যবসায়ের দ্বারা অনেকে প্রতিভাবান হিসেবে সুনাম অর্জন করেন।
অধ্যবসায়ের উদাহরণ : পৃথিবীতে যেসব মনীষী সাফল্যের উচ্চ শিখরে আরোহণ করে অমরত্ব লাভ করেছেন, তাঁরা সকলেই ছিলেন অধ্যবসায়ী। স্কটল্যান্ডের রাজা রবার্ট ব্রুস ও ফ্রান্সের বিখ্যাত ঐতিহাসিক কার্লাইল অধ্যবসায়ের শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। রবার্ট ব্রুস বারবার ইংরেজদের কাছে পরাজিত হয়েও যুদ্ধ-জয়ের আশা ও চেষ্টা ত্যাগ করেন নি। ষষ্ঠবার পরাজিত হয়ে তিনি যুদ্ধ চিন্তায় মগ্ন আছেন, এমন সময় দেখতে পেলেন একটি মাকড়সা বারবার কড়িকাঠে সুতা বাঁধবার চেষ্টা করছে এবং ব্যর্থ হচ্ছে। এইভাবে ছয়বার ব্যর্থ হয়ে সপ্তমবারে মাকড়সাটি সফল হলো। এই দেখে রবার্ট ব্রুসও সপ্তমবার যুদ্ধ করে ইংরেজদের পরাজিত করেন এবং স্কটল্যন্ডের ওপর নিজের আধিপত্য বিস্তার করেন। মনীষী কার্লাইল তাঁর লেখা ফরাসি বিপ্লবের ইতিহাসের পাণ্ডুলিপি এক বন্ধুকে পড়তে দিয়েছিলেন। বন্ধুর বাড়ির কাজের মহিলা সেটিকে বাজে কাগজ ভেবে পুড়িয়ে ফেলেন। কার্লাইল এতে একটুও দমে যান নি। তিনি আবার চেষ্টা করে বইখানা লিখে বিশ্ববাসীকে উপহার দিয়েছিলেন। সম্রাট নেপোলিয়ান, আব্রাহাম লিঙ্কন, ক্রিস্টোফার কলম্বাস প্রমুখ মনীষীর জীবনও অধ্যবসায়ের এক বিরাট সাক্ষ্য। আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু, সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় অধ্যবসায়ের গুণেই আজ বিশ্ববিখ্যাত । ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, কাজী নজরুল ইসলাম, সুকান্ত ভট্টাচার্য অধ্যবসায়ের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। আমরা বাঙালিমাত্রই তাঁদের জন্য গর্বিত।
উপসংহার : অধ্যবসায় হচ্ছে জীবনসংগ্রামের মূল প্রেরণা। এ সংগ্রামে সফলতা ও ব্যর্থতা উভয়ই সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। অধ্যবসায়ী মানুষ জীবনের সব ব্যর্থতাকে সাফল্যে পরিণত করতে পারে। তাই নির্দ্বিধায় বলা যায়, জীবনে সাফল্যের জন্য অধ্যবসায়ের বিকল্প নেই।
মানব কল্যাণে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
ভূমিকা
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মানবজাতির অগ্রগতির মূল চাবিকাঠি। বিজ্ঞানের অবদান আমাদের জীবনযাত্রাকে সহজ, সুন্দর এবং উন্নত করেছে। প্রযুক্তির উন্নতির মাধ্যমে আমাদের জীবনযাত্রা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা একসময় কল্পনার বাইরে ছিল। মানব কল্যাণে বিজ্ঞানের এই অবদান সমাজ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, কৃষি এবং পরিবেশসহ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বিজ্ঞানের অবদান
স্বাস্থ্য খাতে
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নতির ফলে চিকিৎসা খাতে বিপ্লব ঘটেছে। জটিল রোগের নিরাময়ে উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার, সার্জারি, টেলিমেডিসিন এবং বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধকারী ভ্যাকসিন উদ্ভাবন চিকিৎসা সেবা উন্নত করেছে। করোনা মহামারির সময় ভ্যাকসিন তৈরির দ্রুত উদ্ভাবন বিজ্ঞানের একটি যুগান্তকারী সাফল্য।
যোগাযোগ খাতে
বিজ্ঞান যোগাযোগ ব্যবস্থা দ্রুততর করেছে। টেলিফোন, মোবাইল, ইন্টারনেট এবং উপগ্রহ প্রযুক্তির ফলে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যোগাযোগ এখন মুহূর্তের ব্যাপার। ইন্টারনেটের মাধ্যমে তথ্যপ্রাপ্তি এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম মানুষকে কাছে এনেছে।
শিক্ষা ও জ্ঞান বিস্তারে
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অবদান শিক্ষা ক্ষেত্রে অনন্য। ই-বুক, অনলাইন ক্লাস, ডিজিটাল ল্যাব এবং ভার্চুয়াল রিয়েলিটি প্রযুক্তি শিক্ষার ধরণকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। প্রযুক্তি শিক্ষার্থীদের জ্ঞান লাভের সুযোগকে আরও সহজ এবং আকর্ষণীয় করেছে।
কৃষি খাতে
কৃষি উৎপাদনে বিজ্ঞানের অবদান অমূল্য। উন্নত বীজ, কৃষি যন্ত্রপাতি, এবং সেচ ব্যবস্থার উন্নতির ফলে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে। একই সঙ্গে কীটনাশক এবং সার ব্যবহারে বিজ্ঞান কৃষির নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
প্রযুক্তির অবদান
প্রযুক্তি আমাদের জীবনযাত্রাকে যেমন সহজ করেছে, তেমনি মানব কল্যাণে নতুন নতুন দিক উন্মোচন করেছে। রোবটিক্স, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, ড্রোন প্রযুক্তি, ব্লকচেইন এবং ৩ডি প্রিন্টিংয়ের মতো উদ্ভাবনগুলো প্রতিদিনই মানুষের কাজে লাগছে। প্রযুক্তি আজকের বিশ্বকে একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে পরিণত করেছে, যা আধুনিক জীবনের অন্যতম প্রধান ভিত্তি।
চ্যালেঞ্জ ও সমাধান
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি যেমন মানবকল্যাণে অবদান রাখছে, তেমনি এর অপব্যবহারে সমাজে নতুন চ্যালেঞ্জের উদ্ভব হচ্ছে। পরিবেশ দূষণ, প্রযুক্তি নির্ভরতা, এবং সাইবার ক্রাইম এই সমস্যার উদাহরণ। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সচেতনতা, সঠিক নীতি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
উপসংহার
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মানবকল্যাণের মূল ভিত্তি। এর সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে আমরা আরও উন্নত, নিরাপদ এবং সুন্দর সমাজ গড়ে তুলতে পারি। প্রযুক্তির বিকাশের সঙ্গে মানবিক মূল্যবোধ ও সচেতনতা জাগ্রত করা জরুরি, যাতে বিজ্ঞানের প্রতিটি আবিষ্কার মানবতার জন্য আশীর্বাদ হয়ে থাকে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সুফলকে কাজে লাগিয়ে আমরা একটি সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ গড়তে সক্ষম হবো।
সারসংক্ষেপ:
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে সহজতর এবং উন্নত করেছে। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি এবং যোগাযোগসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে এর অবদান অপরিসীম। তবে এর অপব্যবহার রোধে সচেতন হওয়া জরুরি। বিজ্ঞানের সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করে আমরা একটি সুখী ও সমৃদ্ধ সমাজ গড়ে তুলতে পারি।
ভূমিকা
বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চিরকল্যাণকর
অর্ধেক তার করিয়াছে নারী অর্ধেক তার নর।
— কাজী নজরুল ইসলাম
সভ্যতার অসাধারণ সাফল্যের পেছনে নারী ও পুরুষের সমান অবদান রয়েছে। নারীদের অংশগ্রহণ ছাড়া সমাজের উন্নয়ন কল্পনাও করা যায় না। তবে যুগ যুগ ধরে নারীরা অবহেলা ও শোষণের শিকার হয়ে এসেছে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় সামাজিক কুসংস্কার, ধর্মীয় গোঁড়ামি ও বৈষম্যের কারণে নারীরা অনেক সময় তাদের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছে। তাদের প্রতিভা বিকাশের সুযোগ অনেকাংশে সীমিত হয়েছে। নারীর পূর্ণ মর্যাদা প্রদান, মেধা ও শ্রমকে শক্তিতে রূপান্তর এবং স্বনির্ভরশীলতা অর্জনের মাধ্যমে সমাজ ও রাষ্ট্র সর্বত্র নারীর ক্ষমতায়ন সম্ভব।
নারীর ক্ষমতায়ন
নারীর ক্ষমতায়ন বলতে বোঝানো হয় একজন নারীর স্বকীয়তা, নিজস্বতা এবং স্বয়ংসম্পূর্ণতার বিকাশ। নারীর ও পুরুষের মধ্যে সমতা প্রতিষ্ঠাই নারীর ক্ষমতায়নের মূল লক্ষ্য। নারীদের ক্ষমতা বিকাশের সুযোগ প্রদান, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সকল ক্ষেত্রে সমান অধিকার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। নারীদের শিক্ষিত ও দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করা এবং সমাজ ও অর্থনীতিতে তাদের অবদানকে যথাযথ সম্মান দেওয়া দরকার। নারীদের প্রতি নির্যাতন প্রতিরোধ করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তখনই নারীর ক্ষমতায়ন সফল হবে।
সংবিধানে নারীর অধিকার
বাংলাদেশের সংবিধানে নারীদের সঠিক স্থান ও অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। সংবিধানের ১৯ নং অনুচ্ছেদে উল্লেখ আছে, “জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে মহিলাদের অংশগ্রহণ ও সুযোগের নিশ্চয়তা রাষ্ট্র দিবে।” ২৭ নং ধারায় বলা হয়েছে, “সকল নাগরিক আইন সমান এবং আইনের সুরক্ষা পাবেন।” এছাড়াও ২৮, ২৯ ও ৬৫ নং ধারায় নারীর সমান অধিকারের বিধান রয়েছে। নারীদের জন্য জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত আসন রয়েছে এবং স্থানীয় শাসন ব্যবস্থায়ও প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা হয়েছে।
বিশ্বে নারীর অবস্থা
পশ্চিমা দেশগুলোতে নারীর ক্ষমতায়নের বিষয়টি তুলনামূলকভাবে এগিয়ে। জাতিসংঘ নারীর উন্নয়ন ও ক্ষমতায়ন নিয়ে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। ১৯৭৫ সালকে ‘বিশ্ব নারী বর্ষ’ ঘোষণা করে এবং পরবর্তীতে নারী দশক ঘোষণা করা হয়। প্রথম থেকে চতুর্থ বিশ্ব নারী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে নারীর অধিকারের প্রসারে। উন্নত দেশগুলোর নারী শিক্ষা, অর্থনীতি ও রাজনীতিতে সমানভাবে অংশ নিচ্ছে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশে নারীরা অনেক ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হলেও অগ্রগতি লক্ষণীয়। স্বাধীনতা সংগ্রামে নারীদের অবদান এবং নারী পুনর্বাসন, প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় নারীর নিরাপত্তা, দারিদ্র্য বিমোচন ও সমঅংশগ্রহণ নিশ্চিতকরণে কাজ করছে। তৈরি পোশাক খাতের নারীদের অবদান দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ।
নারীর প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক অবস্থান
বাংলাদেশে মহিলাদের জন্য ৫০টি আসন সংরক্ষিত থাকলেও সরাসরি নির্বাচিত নারীর সংখ্যা কম। কর্মক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ সীমিত। সরকারি চাকরিতে নারীদের সংখ্যা তুলনামূলক কম। কৃষি, ম্যানুফ্যাকচারিং, পরিবহন ও বিপণন খাতে নারীদের অবস্থান উল্লেখযোগ্য হলেও উন্নয়নের সুযোগ আরও বাড়ানো প্রয়োজন।
নারীর ক্ষমতায়নের বাধা
তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশে নারীর ক্ষমতায়ন সন্তোষজনক নয়। সামাজিক কুসংস্কার, শিক্ষার অভাব, নিরাপত্তার ঘাটতি, এবং সংকীর্ণ চিন্তাভাবনা নারীদের উন্নয়নের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে।
করণীয়
নারীদের শিক্ষা বাড়ানো এবং আইনি ও রাজনৈতিক অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে।
সামাজিক অবকাঠামোতে নারী-পুরুষের সমতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
ধর্মীয় বাণী ও নৈতিক শিক্ষার মাধ্যমে নারীদের মর্যাদা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।
নারীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ উৎসাহিত করতে হবে।
স্বাস্থ্য, প্রশিক্ষণ ও সাংস্কৃতিক উন্নয়নে নারীদের সুযোগ দিতে হবে।
কর্মস্থলে নিরাপত্তা ও সমান মজুরি নিশ্চিত করতে হবে।
সরকারী উদ্যোগ
সরকার নারীর ক্ষমতায়ন এবং উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। সরকারি চাকরিতে নারীর জন্য কোটা নির্ধারণ, মহিলা বিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠন, প্রাথমিক শিক্ষায় নারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি, এবং আইনি সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ এসব উদ্যোগের মধ্যে রয়েছে।
নারী নির্যাতন প্রতিরোধ
নারীর ক্ষমতায়নের জন্য নারী নির্যাতন বন্ধ করা প্রয়োজন। সচেতনতা বৃদ্ধি, কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা, নিরাপদ আশ্রয় ও আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি।
উপসংহার
“কোনো কালে একা হয়নিকো জয়ী পুরুষের তরবারি
প্রেরণা দিয়েছে সাহস দিয়েছে বিজয়লক্ষ্মী নারী।”
— কাজী নজরুল ইসলাম
নারীরা সমাজের অর্ধেক অংশ, তাদের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। নারীর ক্ষমতায়ন ছাড়া সমৃদ্ধ ও উন্নত সমাজ গড়া সম্ভব নয়।
বাংলাদেশে পর্যটন শিল্প: সমস্যা ও সম্ভাবনা
ভূমিকা:
পর্যটন শিল্প একটি দেশের অর্থনীতি ও সামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশের বৈচিত্র্যময় প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ঐতিহাসিক স্থান, সংস্কৃতি ও জনজীবন পর্যটকদের জন্য আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। তবে পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে নানা ধরনের সমস্যা বিদ্যমান। সেগুলো অতিক্রম করে বাংলাদেশ তার পর্যটন শিল্পকে বড় একটি অর্থনৈতিক সেক্টর হিসেবে গড়ে তুলতে পারে।
সমস্যাসমূহ:
১. অপর্যাপ্ত অবকাঠামো:
বাংলাদেশে পর্যটন কেন্দ্রে সড়ক, পরিবহন ও যোগাযোগের যথাযথ উন্নয়ন হয়নি। অধিকাংশ পর্যটন এলাকার কাছাকাছি পর্যাপ্ত থাকার ব্যবস্থা ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধার অভাব রয়েছে।
২. পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অভাব:
অনেক পর্যটনস্থলে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার যথাযথ ব্যবস্থা নেই, যা পর্যটকদের জন্য অস্বস্তিকর হয়ে দাঁড়ায়। আবর্জনা নিষ্পত্তির অপর্যাপ্ত ব্যবস্থাও বড় সমস্যা।
৩. পর্যটন নিরাপত্তা:
পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য পর্যাপ্ত পুলিশ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতি রয়েছে। অপরাধ প্রবণতা ও সন্ত্রাসের আশঙ্কাও পর্যটকদের জন্য ঝুঁকি সৃষ্টি করে।
৪. পর্যটন প্রচারের অভাব:
বহিঃদেশে বাংলাদেশের পর্যটন স্থান ও সংস্কৃতি সম্পর্কে সঠিক তথ্য ও আকর্ষণীয় প্রচার করা হয় না। ফলে আন্তর্জাতিক পর্যটকদের সংখ্যা কম থাকে।
৫. প্রশিক্ষণ ও মানবসম্পদের ঘাটতি:
পর্যটন খাতে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত কর্মীর অভাব রয়েছে। পর্যটন সেবা মান উন্নয়নে এটি বড় বাধা।
৬. পরিবেশগত চাপ:
বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ, বনাঞ্চল ও নৈসর্গিক স্থানগুলোতে পর্যটন বৃদ্ধির ফলে পরিবেশ ও প্রকৃতির উপর চাপ সৃষ্টি হচ্ছে, যা টেকসই পর্যটনের ক্ষেত্রে সমস্যা।
সম্ভাবনাসমূহ:
১. প্রাকৃতিক সৌন্দর্য:
সুন্দরবন, কক্সবাজার, লেকইলেক, রাঙ্গামাটি, সিলেটের চা বাগানসহ নানা মনোরম প্রাকৃতিক স্থান পর্যটনকে বিকাশের সুযোগ দেয়।
২. ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সম্পদ:
বাংলাদেশের পহেলা বৈশাখ, দুর্গাপূজা, ইদ, এবং ঐতিহাসিক মসজিদ, মন্দির, মঠসহ নানা ঐতিহ্য পর্যটকদের আকর্ষণ করে।
৩. স্বল্পব্যয়ের গন্তব্য:
বাংলাদেশ তুলনামূলকভাবে স্বল্প খরচে ভ্রমণের সুযোগ দেয়, যা অনেক পর্যটকের জন্য আকর্ষণীয়।
৪. বিভিন্ন ধরনের পর্যটন:
সাহসিক পর্যটন, গ্রামীণ পর্যটন, সাংস্কৃতিক পর্যটন ও ধর্মীয় পর্যটনসহ নানা ধরণের পর্যটন বিকাশের সম্ভাবনা রয়েছে।
৫. সরকারি পরিকল্পনা ও উদ্যোগ:
বাংলাদেশ সরকার পর্যটন শিল্প উন্নয়নে বিভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে, যেমন পর্যটন কর, অবকাঠামো উন্নয়ন, নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার ইত্যাদি।
উপসংহার:
পর্যটন শিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতি ও সামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। এর সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে সমস্যা সমাধানের জন্য সরকারি-বেসরকারি সকল স্তরে আন্তরিক উদ্যোগ প্রয়োজন। পর্যটন খাতের উন্নয়ন দেশকে বৈশ্বিক পর্যটন মানচিত্রে আরও দৃঢ় অবস্থানে নিয়ে আসবে।
স্বদেশ প্রেম
ভূমিকাঃ
স্বদেশ প্রেম মানুষের মহৎ গুণাবলীর অন্যতম। একজন মানুষ যে দেশে জন্মগ্রহণ করেছেন, যে দেশের মাটি, আলো বাতাসে তার জীবন বিকশিত হয়েছে সেটাই হলো তার স্বদেশ। স্বদেশের প্রতি প্রেম ভালবাসা থাকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ জীবনের সফলতার জন্য, দেশ ও জাতির কল্যাণের ক্ষেত্রে স্বদেশ প্রেমের বৈশিষ্ট্যকে প্রাধান্য দিতে হবে। একজন স্বদেশ প্রেমের প্রতি সদা সর্বদা সচেতন হতে হবে। মাতৃভূমির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা প্রকাশ করতে গিয়ে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন,
ও আমার দেশের মাটি,
তোমার 'পরে ঠেকাই মাথা।
তোমাতে বিশ্বময়ী,
তোমাতে বিশ্ব মায়ের আঁচল পাতা।
স্বদেশপ্রেম কীঃ
স্বদেশ প্রেম হল নিজের দেশের প্রতি, জাতির প্রতি, ভাষার প্রতি গভীর ভালোবাসা ও আকর্ষণ অনুভব করাকে বোঝায়। এছাড়াও নিজ দেশের প্রতি প্রবল অনুরাগ, নিবিড় ভালোবাসা ও যথার্থ আনুগত্যকে দেশপ্রেম বলে। গর্ভধারণকারিনী জননী যেমন তার সন্তানকে ভীষণভাবে ভালবাসে, এমনিভাবে দেশ মাটি কাকেও মানুষ জন্মলগ্ন থেকেই শ্রদ্ধা করতে ও ভালোবাসতে শেখে। দেশ ও দেশের প্রতি মানুষের যে আকর্ষণ ও ভালবাসা তা থেকেই জন্ম দেশপ্রেমের। জননী, জন্মভূমি স্বর্গের চাইতেও গরীয়সী এবং মহিমায় দীপ্ত। তাইতো কবি দীজেন্দ্রলাল রায়ের সেই গানটি আজও স্বদেশপ্রেমী মানুষের প্রার্থনা...
আমার এ দেশেতেই জন্ম যেন,
এই দেশেতেই মরি।
স্বদেশপ্রেমের উৎস:
প্রতিটা মানুষ নিজেকে অনেক ভালোবাসে। আর নিজের প্রতি অনেক ভালোবাসা থেকেই জন্ম নেয় স্বদেশের প্রত্যেকটি জীবের মধ্যেই এই স্বদেশ প্রতি ভালবাসা বিদ্যমান পশু বনভূমি ছেড়ে লোকালয়ে ছটফট করে। আবার পাখিকে নীড়চৎ করলে তার মর্মভেদী আর্তনাদ বাতাস ভারি করে তোলে। নিজ আবশ্যের প্রতি ভালবাসা থেকেই এটি হয়। আর নিজ আবাসের প্রতি ভালোবাসা থেকেই জন্ম নেয় স্বদেশের প্রতি ভালোবাসা। স্বদেশের মাটি, বাতাস, পানির সঙ্গে আমরা অবিচ্ছেদ্য বন্ধনে আবদ্ধ। তাই এগুলির প্রতি মমত্ববোধ থেকেই সৃষ্টি হয় স্বদেশপ্রেম।
স্বদেশপ্রেমের বৈশিষ্ট্য
আশ্রস্থলের প্রতি আকর্ষণ জীবনের স্বভাব যার ধর্ম। গরুর জন্য গোয়াল, বাঘের জন্য গুহা, পাখির জন্য নীড় প্রত্যেকের নিজস্ব আবসস্থল আছে। মানুষের স্বদেশ প্রেম একটি বিশেষ আদর্শাড়িত আন্তরিক প্রেরণা। অন্যান্য প্রাণীর ঐতিহ্যবোধ নেই, নেই সংস্কৃতি চেতনা-মানুষের এগুলো আছে। সেই সাথে আছে ইতিহাসের পাতা থেকে আহরিত জ্ঞান। তাই দেশের মাটির প্রতি মমত্ববোধের সাথে মিশে থাকে শ্রদ্ধা, প্রীতি ও গৌরববোধের আকাঙ্ক্ষা। কবির ভাষায়......
স্বদেশ প্রেম যত সেই মাত্র অবগত,
বিদেশেতে অধিবাস যার,
ভাব তুলি ধ্যানে ধলে,
চিত্রপটে চিত্র করে,
স্বদেশের সকল ব্যাপার।
স্বদেশপ্রেমের স্বরূপ
মানুষ সমগ্র বিশ্বের বাসিন্দা হলেও একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে সে বেড়ে ওঠে। একটি বিশেষ দেশের অধিবাসী হিসেবে এসে পরিচয় লাভ করেন। এ দেশি তার জন্মভূমি, তার স্বদেশ। মানুষ স্বদেশে জন্মগ্রহণ করে ও স্বদেশের ভালোবাসায় লালিত-পালিত হয়। নিজেকে প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার সকল উপাদান সে স্বদেশের গৌরবে গৌরবান্বিত হয় এবং স্বদেশের অপমানে অপমানিত হয়। স্বদেশের স্বাধীনতা ও মান-মর্যাদা রক্ষার জন্যই নিজের প্রাণ উৎসর্গ করতে প্রস্তুত থাকেন। তাই কবি লিখেছেন.......
মিছা মনিমুক্তা হেম স্বদেশের প্রিয়,
প্রেম তার চেয়ে রত্ন নয় আর।
স্বদেশপ্রেমের অভিব্যক্তি:
স্বদেশের বিপর্যয়ের মুহূর্তে স্বদেশের প্রতি আমাদের ভালোবাসা প্রকাশ পায়। দেশের দুর্দিনে দেশপ্রেমের পূর্ণ বিকাশ ঘটে এবং জন্মভূমি জননীর মতো সন্তানের দিকে কাতর নয়নে তাকায়, আর জননীর বেদনায় সন্তানের হৃদয় হয় বিদীর্ণ। জলাশয় থেকে বিচ্ছিন্ন করলে মাছ যেমন জলের গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারে তেমনি প্রবাস জীবনে ও মানুষের ভেতর স্বদেশপ্রীতি মূর্ত হয়ে ওঠে। দীর্ঘ প্রবাস জীবনের পর স্বদেশে ফিরে এলে মনের অজান্তেই বেজে ওঠে......
আমার কুঠির খানি,
সে যে আমার হৃদয় রাণী।
স্বদেশপ্রেমের প্রকাশ:
স্বদেশপ্রেম মানব হৃদয়ে লালিত হয়। আর স্বদেশপ্রেম প্রকাশ পায় জাতীয় জীবনের দুঃসময়ে মানুষের কর্মের মাধ্যমে। স্বদেশের স্বাধীনতা রক্ষায়, স্বদেশের মানুষের কল্যাণ সাধনে মানুষের মনে স্বদেশপ্রেম জেগে উঠে। যারা দেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করেছেন এবং দেশের জন্য সংগ্রাম করেছেন তাদের নাম ও কীর্তি চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তাদের সে প্রেম ও আত্মত্যাগ ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করবে চিরকাল। স্বদেশের তরে জীবন উৎসর্গকারীরা সারা বিশ্বের শ্রেষ্ঠ সন্তান। তাই ভাষায় লিখেছেন......
ও আমার দেশের মাটি,
তোমার পরে ঠেকাই মাথা,
তোমাতে বিশ্বমায়ীর তোমাতে বিশ্বমায়ের আঁচল পাতা।
স্বদেশপ্রেমের ভিন্নতর বহিঃপ্রকাশ:
কেবল দেশকে ভালোবাসার মধ্যে স্বদেশপ্রেম সীমাবদ্ধ নয়। দেশকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে এগিয়ে নেওয়া যেমন শিল্পসাহিত্য, বিজ্ঞান, অর্থনীতি, সমাজনীতি প্রভৃতির ক্ষেত্রে অবদান রাখাও স্বদেশপ্রেমের বহিঃপ্রকাশ। সম্প্রতি ২৬ শে মার্চ জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে লাখো কণ্ঠে সোনার বাংলা গাইতে ২ লক্ষ ৫৪ হাজার ৬৮১ জন মানুষের একত্রিত হওয়া স্বদেশপ্রেমেরই বহিঃপ্রকাশ। দেশের কল্যাণ ও অগ্রগতিতে ভূমিকা রেখে বিশ্বসভ্যতায় গৌরব বাড়ানো যায়।
স্বদেশপ্রেম ও বিশ্বপ্রেম:
স্বদেশকে ভালোবাসার মধ্য দিয়ে বিশ্বকে ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ ঘটে। স্বদেশপ্রেম কখনোই বিশ্ব প্রেমের বাধা হয় না। দেশপ্রেম যদি বিশ্ববন্ধুত্ব ও ভ্রাতৃত্বের সহায়ক না হয় তবে তা প্রকৃত দেশপ্রেম হতে পারে না। জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকলকেই দেশপ্রেমের চেতনায় উৎসাহিত হতে হবে। যে নিজের দেশকে ভালোবাসে না সে অন্য দেশ, ভাষা, গোষ্ঠী যথা মানুষকে ভালবাসতে পারবেনা। তাই দেশপ্রেমের মধ্য দিয়েই বিশ্ব প্রেমের প্রকাশ ঘটে।
স্বদেশপ্রেম ও বিশ্বপ্রেমের মধ্যে পার্থক্য
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মতে, জাতীয়তা ও স্বদেশপ্রেম যখন সুঙ্কীর্ণতার অন্ধকূপে বন্দি হয়ে উগ্র ছিন্নমস্ত রূপ ধারণ করে, তখন বিশ্বপ্রেম পদদলিত হয়। স্বদেশকে একমাত্র পরম প্রিয় মনে করে আমরা বিশ্বকে শত্রু মনে করি এবং তাকে ধ্বংস করার জন্য ধাবিত হয়। তখন শুভ বিচার-বুদ্ধি স্বদেশপ্রেমের অন্ধ আবেগে লুপ্ত হয়। তার ফলে পরপর হানাহানি এবং অবারিত রক্তক্ষয় অনিবার্যরূপে দেখা যায়। আর, নানা মারণাস্ত্র আবিষ্কার-এর জন্য সে হানাহানি অচিরেই ধারণ করে এক বিভীষিকাময় রূপ।
সাহিত্যের আয়নায় দেশপ্রেম:
নানা কবি সাহিত্যিক তাদের কবিতা, কাব্য, নাটক, গান, উপন্যাস প্রভৃতি লেখনির মাধ্যমে তাদের দেশপ্রেমকে ফুটিয়ে তুলেছেন। আধুনিক এই যুগে বাংলা সাহিত্যে দেশপ্রেমের বিকাশ ঘটে ব্রিটিশ আমল থেকে। নীলদর্পণ, আনন্দমঠ, মেঘনাদ বধ প্রভৃতি গ্রন্থে দেশপ্রেমের প্রকাশ ঘটেছে। তাছাড়া রবীন্দ্রনাথ, নজরুল ইসলাম, জীবনানন্দ দাশ, প্রমুখের সাহিত্যে দেশ প্রেমের প্রকাশ ঘটেছে।
ছাত্র জীবনে স্বদেশপ্রেমের শিক্ষা:
স্বদেশ প্রেম মানুষের সহযাত প্রবৃতি হওয়া সত্বেও এই গুনটি তাকে অর্জন করতে হয়। সেজন্য ছাত্র জীবন থেকে দেশপ্রেমের দীক্ষা গ্রহণ করতে হয়। দেশের মাটি ও মানুষকে ভালবাসতে হবে। ছাত্র জীবনে ছাত্ররা যেই দেশপ্রেম অর্জন করে সেটি মনে আজীবন ধরে লালিত হয়। বর্ধমানের ছাত্রছাত্রীরা আগামী দিনের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ। দেশের ভালো-মন্দ ভবিষ্যতে তাদের উপরে নির্ভরশীল। ছাত্র-ছাত্রীদেরকেই এগিয়ে আসতে হবে দেশের বিপদে আপদে। প্রয়োজনে দেশের স্বার্থে ছাত্রদেরকে জীবন উৎসর্গ করতে হবে। যেমনটা ছাত্রছাত্রীরা করেছিল ১৯৫২ সালের মাতৃভাষা মর্যাদার রক্ষার আন্দোলনে বুকের তাজা রক্ত দিয়ে এবং ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে অকাতরে প্রাণ উৎসর্গ করে।
বাঙালির স্বদেশপ্রেম
এ পৃথিবীতে যুগে যুগে অসংখ্য দেশ প্রেমিক জন্মেছেন। তারা নিজ দেশের জন্য আত্মত্যাগ স্বীকার করে নিজ দেশ ও বিশ্বের কাছে অমর হয়েছেন। আর বাংলাদেশেও তার দৃষ্টান্ত রয়েছে। ১৯৫২ সালে পাকিস্তানে স্বৈরশাসকের হাতে বাংলা ভাষার জন্য রফিক, রফিক, সালাম, জব্বার, বরকতের আত্মদান। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের আত্মদান করেছেন অসংখ্য ছাত্র, শিক্ষক, কৃষক, শ্রমিক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, মা-বোন সহ সাধারণ মানুষ। এখনো দেশের লক্ষ কোটি জনতা দেশের সামান্য ক্ষতির আশঙ্কায় বজ্র কন্ঠে গর্জে ওঠে। তাই বলা হয়.......
উদয়ের পথে শুনি কার বাণী,
ভয় নাই ওরে ভয় নাই,
নিঃশেষে প্রাণ, যে করিবে দান,
ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই
স্বদেশপ্রেম শিক্ষা:
মানুষ দেশকে ভালবাসতে খেলেই দেশের কল্যাণের জীবন উৎসর্গ করার মনোবৃত্তি স্বদেশপ্রেম মানুষের সহজাত এক প্রবৃত্তি, এরপরেও এই স্বদেশ প্রেমের গুণটি অর্জন করতে হয়। এই স্বদেশ প্রেমের গুণ অর্জনের জন্য দেশের সুদিনে দেশের উন্নয়নে তৎপর থাকা প্রয়োজন। এছাড়া দেশের দুর্দিনে এবং দেশের স্বাধীনতা রক্ষার ক্ষেত্রেও জীবন উৎসর্গ করার মনোবৃত্তি গড়ে তুলতে হবে। নিজ দেশের মাটি এবং মানুষকে ভালবাসতে শিখতে হবে। আর এর মাধ্যম দিয়েই স্বদেশ প্রেমের মহৎ শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়া যাবে।
স্বদেশপ্রেমের উপায়:
স্বদেশের উপকারে নাই যার মন,
কে বলে মানুষ তারে পশু সে জন।
পবিত্র ইসলাম ধর্মে বলা হয়েছে "দেশপ্রেম ঈমানের অঙ্গ'। এই পৃথিবীতে এমন কোন ধর্ম নেই, যেই ধর্মের দেশকে ভালোবাসার নির্দেশ দেওয়া হয়নি। দেশ ও জাতির কল্যাণে আত্মত্যাগকে সবচাইতে মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। দেশের প্রত্যেক নাগরিকই নিজ নিজ কর্মের সীমারেখায় স্বদেশপ্রেমের পরিচয় দেয়। স্বীয় দায়িত্ব সুষ্ঠুভাবে পালন করার মধ্যে দেশপ্রেম নিহিত। জাতির জন্য দেশের জন্য প্রত্যেক মানুষের, তা সে ছোটই হোক কি বড়ই হোক-তার কিছু না কিছু করার আছে। জাতির জন্য যদি কিছু অবদান রাখা যায় তাহলে তাতে দেশপ্রেমের নিদর্শন থাকে। কিন্তু উগ্র স্বদেশপ্রেম মানবজাতির জন্য ক্ষতিকর। অন্ধ স্বদেশপ্রেম মানুষকে সংকীর্ণ করে জাতিতে জাতিতে বিরোধের সৃষ্টি করে এবং মানুষের জন্য সর্বনাশ ডেকে আনে। অন্যদিকে মানবিকতার চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে হয়ে অনেক মহামানব বিশ্ববরেণ্য হয়েছে। তাদের স্বদেশ প্রেম বিশ্ব প্রেমে রূপান্তরিত হয়েছে।
স্বদেশপ্রেমের প্রভাব:
স্বদেশপ্রেমের মহৎ চেতনায় মন ও মানসিকতা সার্থক রূপে বিকশিত হয়। তার মন থেকে সংকীর্ণতা, স্বার্থপরতা দূর হয়। স্বদেশপ্রেম জাতির জন্য কল্যাণ নিয়ে আসে এবং তার ফলে জনসেবার মনোভাব সৃষ্টি হয়। স্বদেশপ্রেম মানুষকে উদার করে, আত্মসুখ বিসর্জনের অনুপ্রেরণা দান করে ও পরের জন্য স্বার্থ ত্যাগ করতে উদ্বুদ্ধ করে থাকে। তাই বিশ্বের শ্রেষ্ঠ সন্তানরা স্বদেশের ফলে জীবন উৎসর্গ করেছেন। স্বদেশ প্রেমের চেতনায় অনুপ্রাণিত হয়ে মহান ব্যক্তিরা নিজেদের উৎসর্গ করে গেছেন। স্বাধীনতার জন্য যারা জীবন দিয়েছে তারা রেখে গেছেন স্বদেশ প্রেমের অবদান। যেমনটি কবি সাহিত্যিক লেখনীর মাধ্যমে স্বদেশপ্রেমের স্বাক্ষর রেখে গিয়েছেন। রাজনীতিবিদ, শিক্ষক, বিজ্ঞানী, চিকিৎসক ইত্যাদি অগণিত পেশায় নিবেদিত প্রাণ মানুষ মানুষের কল্যাণে তাদের কাজ করে গিয়েছেন। এবং তারা দেশের প্রতি ভালবাসার পরিচয় দিয়েছেন ও নিজেদেরও অমর করে নিয়েছেন স্বদেশ প্রেমের মাধ্যমে। তারা কেবল নিজেরাই এই কাজ করেনি, জাতিকেও এই কাজে অনুপ্রাণিত করে গিয়েছেন।
স্বদেশপ্রেমের দৃষ্টান্ত:
যুগে যুগে অসংখ্য মনীষী স্বদেশের কল্যাণে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন। এই উপমহাদেশে মহাত্মা গান্ধী, শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং নাম না জানা লক্ষ লক্ষ শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধা দেশের জন্য জীবন দিয়ে অমর হয়েছেন। বিশ্ব অনলাইনে দেশ প্রেমের ক্ষেত্রে দৃষ্টান্ত রেখেছেন চীনের মাওসেতুং, রাশিয়ার লেলিন ও স্ট্যাইলিন, আমেরিকার জর্জ ওয়াশিংটন প্রমুখ ব্যক্তি। তাদের সবার নাম সারা বিশ্বের ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে স্বদেশপ্রেমের জন্যই।
স্বদেশপ্রেম ও রাজনীতি
বস্তুত রাজনীতিদের প্রথম ও প্রধান শর্তই হচ্ছে স্বদেশপ্রেম। স্বদেশপ্রেমের পবিত্র বেদিমূলেই রাজনীতির পাঠ। স্বদেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ রাজনীতিবিদ দেশের সদাজাগ্রত প্রহরী। তবে বর্তমান রাজনৈতিক দল অথবা রাজনীতিবিদদের চেহারা ভিন্ন। অধিকাংশ রাজনৈতিক দলে মহওর, বহওর কল্যাণবোধ থেকে ভ্রষ্ট। ব্যক্তিক ও দলীয় স্বার্থচিন্তায় অনেক ক্ষেত্রে প্রবল। দেশের স্বার্থে, জাতির স্বার্থে, মানুষের প্রয়োজনে সর্বস্ব বিলিয়ে দেওয়ার সাধনা, স্বদেশপ্রেমের অঙ্গীকার ও সার্থকতা, এখনো প্রায় অনুপস্থিত।
বর্তমান সামাজিক পরিস্থিতি ও দেশপ্রেম:
বর্তমানের এই আধুনিক সমাজে মানুষের মধ্যে দেশপ্রেমের চেতনা দিন দিন লোপ পাচ্ছে। বর্তমানে মানুষ দিন দিন আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়ছে এবং নিজের স্বার্থের দিকে বেশি ঝোঁকে পড়ছে। দেশ ও দেশের মানুষের কথা না ভেবে দেশের ক্ষতি করে নিজেদের উদরপূর্তি করছে। তারা দেশপ্রেমের চেতনাকে ভুলে গিয়ে নিজ স্বার্থকে বড় করে দেখছে। এই ধরনের মানসিকতার ফলে ধনীরা আরো ধনী হচ্ছে আর গরিবরা আরো দিন দিন গরীব হচ্ছে। সেজন্য এই ধরনের মানসিকতা থেকে আমাদের বেরিয়ে এসে দেশের ও দেশের উন্নয়নে কাজ করে যেতে হবে।
উপসংহার:
স্বাধীনতাহীনতায় কে বাঁচিতে চায় হে
কে বাঁচিতে চায়,
দাসত্বশৃংখল বল কে পরিবে পায়,
হে কে পরিবে পায়।
স্বদেশপ্রেম মানব জীবনে একটি শ্রেষ্ঠ গুণ ও অমূল্য সম্পদ। একটি মহৎ গুণ হিসেবে প্রত্যেক মানুষের মধ্যেই স্বদেশপ্রেম থাকা উচিত। অর্থাৎ, স্বদেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে দেশ ও জাতির জন্য কিছু না কিছু অবদান রাখা প্রত্যেকটি স্বদেশপ্রেমিক নাগরিকের একান্ত দায়িত্ব কর্তব্য। তাই আমাদের সকলকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে। স্বার্থপরতা ত্যাগ করে দেশের কল্যাণে সর্বস্ব বিলিয়ে দিতে হবে। তবেই দেশ, সামাজিক, অর্থনৈতিক দিক থেকে অগ্রসর হতে সক্ষম হতে পারবে।
Related Question
View All১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!