বাংলাদেশের গ্রামীণ জনগণের জীবন-জীবিকায় নদ-নদীর প্রভাব অপরিসীম। বাংলাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা অনেকাংশে নদীনির্ভর। নদীকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে নদীবন্দর। এ নদীবন্দরগুলো ব্যবসায়-বাণিজ্য, পণ্য পরিবহণসহ নানা অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের কেন্দ্র। এতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। নদী আমাদের মাছের চাহিদা পূরণ করে এবং মাছ রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে সাহায্য করে। তাছাড়া নদ-নদীকে কেন্দ্র করে পর্যটন শিল্পের বিকাশ ঘটে। বর্ষাকালে নদ-নদীর বয়ে আনা পলি কৃষিজমিকে উর্বর করে। নদীকে কেন্দ্র করেই অনেক সেচ প্রকল্প গড়ে উঠেছে। আমাদের বেশির ভাগ শহর নদীর তীরে গড়ে উঠেছে।
নদীদূষণ রোধে আমাদের নানা করণীয় রয়েছে। নদীতে বর্জ্য ফেলা, স্রোতের পরিবর্তন, নদী ভরাট ও দখল করা অপরাধ। এসব কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে আমাদের সবাইকে সচেতন হতে হবে। নদীদূষণ কমাতে শিল্পবর্জ্য শোধনাগার ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা তৈরি করতে হবে। মরা নদীকে খনন করে আসল রূপ ফিরিয়ে আনতে হবে। নদীতে পলিথিন ও প্লাস্টিক ফেলা যাবে না। নদীতে বালু উত্তোলন বন্ধ করতে হবে। শিল্পকারখানার বর্জ্য নদীতে নির্গমন বন্ধ করতে হবে। মৎস্য সম্পদের আবাস ও বংশবৃদ্ধি বিঘ্নিত করা যাবে না।
রপ্তানিমুখী শিল্পজাত পণ্য আমাদের অর্থনীতি, জীবন ও জীবিকার উন্নতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এ পণ্যগুলো রপ্তানি করে আমরা প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করি। এর ফলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় ও আর্থিক লেনদেন বাড়ে। আমাদের দারিদ্র্য কমে। তাছাড়া শিল্পজাত পণ্যের কারখানায় কাজ করে মানুষ আয় বৃদ্ধি করতে পারে এবং জীবনের চাহিদাগুলো পূরণ করতে পারে। রাষ্ট্রের আয় বৃদ্ধির ফলে অবকাঠামো নির্মাণ সহজ হয়।
বাংলাদেশের প্রধান তিনটি ভূমিরূপ হলো- পাহাড়ি ভূমি, সমতল ভূমি এবং সোপান ভূমি। সমতল ভূমির তিনটি বৈশিষ্ট্য হলো-
- বাংলাদেশের প্রায় ৮০ ভাগ ভূমিই সমতল বা প্লাবন সমভূমি।
- এখানকার মাটি পলি সমৃদ্ধ হওয়ায় অত্যন্ত উর্বর।
- উর্বর মাটির কারণে এখানে প্রচুর পরিমাণে কৃষিজাত ফসল উৎপাদন হয়।
বাংলাদেশের ভূমিরূপ মূলত তিন ভাগে বিভক্ত। এগুলো হলো- পাহাড়ি ভূমি, সোপান ভূমি এবং সমতল ভূমি। দেশের অধিকাংশ এলাকাই পলিমাটি দিয়ে গঠিত উর্বর সমতল ভূমি। চট্টগ্রাম, রাঙামাটি ও সিলেট এলাকায় উঁচু পাহাড়ি ভূমি দেখা যায় যা খনিজ ও বনজ সম্পদে সমৃদ্ধ। সমতল থেকে কিছুটা উঁচু ও পাহাড় থেকে নিচু ভূমিকে সোপান ভূমি বলে, যা বরেন্দ্রভূমি বা মধুপুর গড় নামে পরিচিত। এই বৈচিত্র্যময় ভূমিরূপের কারণে আমাদের দেশের প্রকৃতি এত সুন্দর।
বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলের উঁচু ভূমিগুলোকে পাহাড়ি ভূমি বলে। এগুলো মূলত চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগে অবস্থিত।
পাহাড়ি অঞ্চলের তিনটি গুরুত্ব হলো-
- পাহাড়ের গায়ে প্রচুর বনজ সম্পদ ও মূল্যবান গাছপালা থাকে।
- এসব পাহাড়ে বন্যপ্রাণীদের নিরাপদ আবাসস্থল বা অভয়ারণ্য রয়েছে।
- পাহাড়ের ঝরনা ও নদীগুলো গৃহস্থালি এবং কৃষিকাজের পানির বড়ো উৎস।
সমতল ভূমি থেকে কিছুটা উঁচু এবং পাহাড় থেকে নিচু ভূমিকে সোপান ভূমি বলা হয়। এই ভূমির মাটি সাধারণত ধূসর ও লালচে বর্ণের হয়ে থাকে।
তিনটি সোপান অঞ্চলের নাম হলো-
- রাজশাহী অঞ্চলের বরেন্দ্রভূমি।
- ময়মনসিংহ ও টাঙ্গাইল অঞ্চলের মধুপুর ও ভাওয়ালের গড়।
- কুমিল্লা জেলার লালমাই পাহাড় এলাকা।
বাংলাদেশ একটি নদীমাতৃক দেশ হওয়ায় আমাদের জীবনে নদ-নদীর গুরুত্ব অপরিসীম। নদীগুলো আমাদের কৃষিকাজে সেচের পানির প্রধান উৎস এবং পলি বহন করে জমিকে উর্বর করে। মাছের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি আমরা মাছ বিদেশে রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করি। নদীপথ পণ্য পরিবহণের জন্য অনেক সহজ ও সাশ্রয়ী মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এছাড়া নদীর তীরে অসংখ্য শহর, বন্দর ও ব্যবসা-বাণিজ্য কেন্দ্র গড়ে উঠেছে।
নদীতে পলিথিন, প্লাস্টিক বা কলকারখানার বর্জ্য ফেলে পানি ব্যবহার অনুপযোগী করাকে নদী দূষণ বলে। নদী দখল করাও একটি বড় অপরাধ।
'নদী রক্ষা করার তিনটি উপায় হলো-
- নদীতে কখনো প্লাস্টিক, পলিথিন রা. কোনো ময়লা-আবর্জনা ফেলা যাবে না।
- শিল্পকারখানার বিষাক্ত বর্জ্য যাতে নদীতে না পড়ে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
- মরা নদী খনন করে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে হবে।
বাংলাদেশ একটি কৃষিপ্রধান দেশ এবং কৃষিজাত পণ্য আমাদের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। ধান আমাদের প্রধান খাদ্য যা আমাদের শরীরের শর্করার চাহিদা পূরণ করে থাকে। পাটকে 'সোনালি আঁশ' বলা হয় কারণ এটি রপ্তানি করে আমরা প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করি। ডাল, তৈলবীজ এবং মসলাজাতীয় ফসল আমাদের আমিষ ও পুষ্টির ঘাটতি পূরণ করে। এছাড়া বিভিন্ন মৌসুমি ফল ও সবজি শরীরকে রোগপ্রতিরোধে সহায়তা করে। কৃষিজাত পণ্যের উৎপাদন আমাদের দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
কলকারখানায় কাঁচামাল ব্যবহার করে যে পণ্য তৈরি করা হয়, তাকে শিল্পজাত পণ্য বলে। যেমন- সার, কাগজ ও কাপড়। তিনটি শিল্পের গুরুত্ব হলো-
- তৈরি পোশাক শিল্প রপ্তানি করে আমরা সবচেয়ে বেশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করি।
- চামড়াজাত ও ওষুধ শিল্প মানুষের দৈনন্দিন চাহিদা মেটায় এবং কর্মসংস্থান বাড়ায়।
- স্থানীয় শিল্পে দেশি পণ্য উৎপাদন বাড়লে আমাদের আমদানি ব্যয় কম হয়।
বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য শিল্পজাত পণ্য হলো তৈরি পোশাক, পাটজাত দ্রব্য, চামড়া, চা ও ওষুধ। এসব পণ্য বিদেশে রপ্তানি করে আমরা প্রতিবছর প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয় করি। দেশে শিল্পকারখানা স্থাপনের ফলে অনেক মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে, যা মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করে। নিজস্ব শিল্পে উৎপাদিত পণ্য ব্যবহার করলে আমাদের বিদেশের ওপর নির্ভরতা কমে এবং আমদানি ব্যয় হ্রাস পায়। তাই অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনে শিল্প খাতের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
দেশের উৎপাদিত পণ্য বিদেশে রপ্তানি বা বিক্রি করার মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয়। এটি আমাদের দেশের অর্থনৈতিক উন্নতিতে সাহায্য করে।
নদ-নদী ও মৎস্য খাতের তিনটি ভূমিকা হলো-
- বাংলাদেশ মাছ উৎপাদনে বিশ্বে চতুর্থ, যা বিদেশে রপ্তানি করে প্রচুর মুদ্রা আয় হয়।
- নদীপথে পণ্য পরিবহণ অনেক সহজ ও সস্তা, যা ব্যবসা-বাণিজ্যে লাভজনক।
- নদ-নদীর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য পর্যটকদের আকৃষ্ট করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে সাহায্য করে।
নদী আমাদের অমূল্য সম্পদ, তাই নদীকে দূষণমুক্ত রাখা আমাদের সকলের দায়িত্ব। নদীতে কখনো পলিথিন, প্লাস্টিক বা গৃহস্থালির ময়লা-আবর্জনা ফেলা যাবে না। কলকারখানার বিষাক্ত বর্জ্য যাতে সরাসরি নদীতে না মিশতে পারে সেদিকে কড়া নজরদারি রাখতে হবে। এছাড়া নদী দখল করা বা নদীর প্রবাহ বন্ধ করা। একটি বড়ো অপরাধ, তাই আমাদের সচেতন হতে হবে। মরা নদীগুলো খনন করে পানির স্বাভাবিক গতিপথ ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। আমরা সবাই সচেতন হলে নদীগুলো রক্ষা পাবে এবং মৎস্য সম্পদের আবাসস্থল নিরাপদ থাকবে।
Contribute high-quality content, help learners grow, and earn for your efforts! 💡💰'
Related Question
View Allবাংলাদেশের ভূমিরূপ মূলত তিন ভাগে বিভক্ত।
বাংলাদেশ একটি নদীমাতৃক দেশ।
বাংলাদেশ পৃথিবীর একটি বৃহত্তম বদ্বীপ
সকল নদ-নদী উত্তর থেকে দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের দিকে প্রবাহিত হয়েছে।
বাংলাদেশের প্রায় ১২ ভাগ পাহাড়ি ভূমি।
পাহাড়ের গহিনে লুকিয়ে আছে অসংখ্য ঝরনা ও জলপ্রপাত
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!