পদ বলতে বৈষ্ণব ধর্মতত্ত্বের প্রভাবে রাধা-কৃষ্ণের প্রেমলীলাকে কেন্দ্র করে রচিত এক প্রকার গীতি-কবিতাকে বোঝায়।
তিন জন পদকর্তার নাম: বিদ্যাপতি, চণ্ডীদাস, জ্ঞানদাস।
মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের এক বিশেষ ও গুরুত্বপূর্ণ ধারা হলো বৈষ্ণব পদাবলি সাহিত্য, যার মূল বিষয়বস্তু হলো রাধা ও কৃষ্ণের অলৌকিক প্রেমলীলা। এই প্রেমলীলা বর্ণনা করতে গিয়ে পদকর্তাগণ যে গীতি-কবিতা রচনা করেছেন, তাই 'পদ' নামে পরিচিত। এই পদগুলো সাধারণত সুর করে গাওয়া হতো এবং রাগ-রাগিণী অনুযায়ী রচিত হতো। বৈষ্ণব দর্শন ও ভক্তিবাদের গভীর প্রভাব এই পদাবলির রন্ধ্রে রন্ধ্রে বিদ্যমান।
পদাবলির প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো হলো:
বিষয়বস্তু: রাধা-কৃষ্ণের প্রেমলীলা, বিরহ, মিলন, আক্ষেপ, এবং ভক্তিভাব।
ভাষা: ব্রজবুলি (মৈথিলি, অবহট্ঠ ও বাংলার মিশ্র রূপ) এবং বাংলা ভাষার ব্যবহার।
গীতিময়তা: পদগুলো সুর করে গাওয়ার উপযোগী করে রচিত।
দার্শনিক ভিত্তি: বৈষ্ণব ভক্তিবাদের মাধুর্যরস ও ঈশ্বর প্রেমের গভীর প্রকাশ।
উল্লেখযোগ্য পদকর্তাগণের মধ্যে অন্যতম হলেন:
বিদ্যাপতি: তিনি মিথিলার কবি হলেও তার ব্রজবুলি ভাষায় রচিত পদাবলি বাংলা বৈষ্ণব সাহিত্যে বিশেষভাবে সমাদৃত। তার পদের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো রূপ ও সৌন্দর্য বর্ণনা।
চণ্ডীদাস: তার পদের মূল বৈশিষ্ট্য হলো রাধার আত্মনিবেদন ও প্রেম নিবেদনের সরলতা ও গভীরতা। তিনি বিরহের কবি হিসেবে পরিচিত।
জ্ঞানদাস: বিদ্যাপতির অনুসারী হিসেবে পরিচিত হলেও তার পদে নিজস্ব মৌলিকতা ও মানবিক আবেদন লক্ষ্য করা যায়।
গোবিন্দদাস: বিদ্যাপতির ধারার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি, তার পদে অলংকার ও কারুকার্যময়তার সাথে ভাবের গভীরতার প্রকাশ ঘটেছে।
এই পদাবলি বাংলা সাহিত্যের সম্পদ এবং মধ্যযুগের কাব্যকলার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ ১৮০০ সালের ৪ মে কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত হয়। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নবনিযুক্ত সিভিলিয়ানদের (কর্মচারী) ভারতীয় ভাষা, সংস্কৃতি, আইন ও রীতিনীতি সম্পর্কে জ্ঞান প্রদানের উদ্দেশ্যে এটি স্থাপন করা হয়েছিল। ১৮০১ সালে এই কলেজে বাংলা বিভাগ খোলা হয়, যার প্রধান ছিলেন উইলিয়াম কেরি। বাংলা বিভাগের প্রধান কাজ ছিল ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের বাংলা ভাষা শেখানো, যাতে তারা স্থানীয় জনগণের সাথে কার্যকরভাবে যোগাযোগ করতে পারে।
ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের বাংলা বিভাগ বাংলা গদ্যের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই বিভাগের পণ্ডিতগণ, যেমন রামরাম বসু, মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার, চণ্ডীচরণ মুনশী প্রমুখ, বাংলা ভাষায় পাঠ্যপুস্তক রচনা করেন, যা আধুনিক বাংলা গদ্যের ভিত্তি স্থাপন করে। এর মাধ্যমে বাংলা সাহিত্য ও শিক্ষাক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়।
কাজী নজরুল ইসলামের বেশ কয়েকটি গ্রন্থ ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক বাজেয়াপ্ত হয়েছিল। তাঁর প্রথম বাজেয়াপ্ত গ্রন্থটি ছিল ‘যুগবাণী’। এটি ১৯২২ সালে প্রকাশিত প্রবন্ধ সংকলন, যা ব্রিটিশ সরকারের শোষণ ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদী মনোভাব ব্যক্ত করে।
এছাড়া, ব্রিটিশ সরকার নজরুলের নিম্নলিখিত উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলো বাজেয়াপ্ত করে:
বিষের বাঁশি: ১৯২৪ সালে প্রকাশিত এই কাব্যগ্রন্থটি তার বিপ্লবী চেতনার জন্য বাজেয়াপ্ত হয়।
ভাঙ্গার গান: ১৯২৪ সালে প্রকাশিত এটিও একটি কাব্যগ্রন্থ, যা পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার আহ্বান জানিয়েছিল।
প্রলয়শিখা: ১৯৩০ সালে প্রকাশিত এই কাব্যগ্রন্থটিও ব্রিটিশ বিরোধী তীব্র প্রতিবাদী রচনার জন্য বাজেয়াপ্ত হয়।
চন্দ্রবিন্দু: ১৯৩১ সালে প্রকাশিত এই ব্যঙ্গাত্মক কাব্যগ্রন্থটিও বাজেয়াপ্ত হয়।
নজরুলের এসব লেখায় ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে সরাসরি বিদ্রোহ, পরাধীন জাতির মুক্তি কামনা এবং শোষিত মানুষের পক্ষে সোচ্চার কণ্ঠস্বর ছিল, যা তৎকালীন ব্রিটিশ সরকারকে ভীত করে তুলেছিল। ফলস্বরূপ, তাঁর একাধিক গ্রন্থ বাজেয়াপ্ত করা হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগও আনা হয়।
উত্তরঃ
সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, আবু ইসহাক এবং আখতারুজ্জামান ইলিয়াস।
প্রদত্ত তিনটি সাহিত্যকর্ম বাংলা সাহিত্যের আধুনিককালের তিন গুরুত্বপূর্ণ লেখকের সৃষ্টি।
লালসালু: এটি আধুনিক বাংলা সাহিত্যের কালজয়ী উপন্যাসগুলির মধ্যে অন্যতম, যা লিখেছেন খ্যাতিমান সাহিত্যিক সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ (১৯২২-১৯৭১)। ১৯৪৮ সালে প্রকাশিত এই উপন্যাসে গ্রামীণ সমাজের ধর্মীয় ভণ্ডামি, কুসংস্কার এবং ক্ষমতার অপব্যবহার চমৎকারভাবে চিত্রিত হয়েছে।
সূর্যদীঘল বাড়ী: গ্রামীণ জীবনের দারিদ্র্য, সংগ্রাম ও টিকে থাকার অদম্য স্পৃহার এক বাস্তবসম্মত চিত্রায়ণ এই উপন্যাস। এর রচয়িতা হলেন বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক আবু ইসহাক (১৯২৬-২০০৩)। ১৯৫৫ সালে প্রকাশিত এই উপন্যাসটি পরবর্তীতে সফল চলচ্চিত্র রূপও লাভ করে।
চিলেকোঠার সেপাই: বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে রচিত এই শক্তিশালী উপন্যাসের লেখক আখতারুজ্জামান ইলিয়াস (১৯৪৩-১৯৯৭)। ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত এই উপন্যাসে মধ্যবিত্ত সমাজের জটিল মনস্তত্ত্ব এবং গণসংগ্রামের চালচিত্র গভীর অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
উত্তরঃ
বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন ছিলেন বাঙালি মুসলিম নারী জাগরণের অগ্রদূত, সাহিত্যিক ও সমাজ সংস্কারক।
বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন (১৮৮০-১৯৩২) ছিলেন ভারতীয় উপমহাদেশে, বিশেষত বাঙালি মুসলিম সমাজে নারী অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং নারীশিক্ষার প্রসারে এক অবিস্মরণীয় নাম। তার বিখ্যাত হওয়ার প্রধান কারণসমূহ নিম্নরূপ:
নারীশিক্ষার প্রসার: তিনি মুসলিম মেয়েদের জন্য প্রথম বিদ্যালয় স্থাপন করেন। ১৯০৯ সালে ভাগলপুরে এবং ১৯১১ সালে কলকাতায় 'সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল' প্রতিষ্ঠা তার দূরদর্শী চিন্তাভাবনার ফসল ছিল।
সাহসী সাহিত্যকর্ম: তার লেখনীর মাধ্যমে তিনি সমাজের গোঁড়ামি, কুসংস্কার, অবরোধপ্রথা এবং নারীর প্রতি বৈষম্যের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন। 'সুলতানার স্বপ্ন', 'অবরোধবাসিনী', 'মতিচূর' ইত্যাদি তার উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্ম, যা নারীর মুক্তি ও স্বাধীনতার পক্ষে জোরালো সওয়াল করে।
সমাজ সংস্কার: তিনি কেবল লেখনীতেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না, বরং বাস্তবেও নারীর অর্থনৈতিক মুক্তি, কর্মসংস্থান এবং সমাজে তাদের স্বাবলম্বী করে তোলার জন্য কাজ করেছেন। তিনি 'আঞ্জুমান-এ-খাওয়াতিন-এ-ইসলাম' (মুসলিম মহিলা সমিতি) নামে একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন।
তার অসামান্য অবদান বাঙালি নারী সমাজে নবজাগরণ এনেছিল এবং আধুনিক নারী আন্দোলনের ভিত্তি স্থাপন করেছিল, যার জন্য তিনি চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন।
উত্তরঃ
সৈয়দ শামসুল হক - পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায় সেলিম আল দীন - শকুন্তলা মুনীর চৌধুরী - রক্তাক্ত প্রান্তর
বাংলাদেশের নাট্য সাহিত্যের ইতিহাসে উল্লেখিত নাট্যকারগণ স্ব-স্ব ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। সৈয়দ শামসুল হকের 'পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়' মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক একটি কালজয়ী নাটক, যা বাংলা নাটকের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। সেলিম আল দীন বাংলা নাটকের নিজস্ব ধারা, বিশেষত 'কথা-নাট্য' রীতি প্রবর্তনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন এবং তার 'শকুন্তলা' নাটকটি তার মৌলিক সৃজনশীলতার পরিচয় বহন করে। মুনীর চৌধুরী 'রক্তাক্ত প্রান্তর' নাটকে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে মানবতা ও যুদ্ধের করুণ পরিণতি চিত্রিত করেছেন। তাদের রচনা বাংলা নাট্য সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে এবং প্রজন্মের পর প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করছে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'শেষের কবিতা' বাংলা সাহিত্যের একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং কালজয়ী উপন্যাস। এটি ১৯২৯ সালে (১৩৩৬ বঙ্গাব্দ) প্রকাশিত হয়। শিলংয়ের পটভূমিতে রচিত এই উপন্যাসে আধুনিক প্রেম, সম্পর্ক, এবং চিরায়ত মূল্যবোধের সংঘাতকে অসাধারণ শিল্পরূপ দেওয়া হয়েছে। উপন্যাসের প্রধান চরিত্র অমিত রায় এবং লাবণ্যর প্রেমকাহিনী এবং তাদের স্বতন্ত্র জীবনবোধ পাঠককে গভীরভাবে আকর্ষণ করে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার উপন্যাসে কবিতা, গান, এবং দার্শনিক আলোচনার মিশ্রণ ঘটিয়ে একটি অনন্য শৈলী তৈরি করেছেন, যা 'শেষের কবিতা'কে বাংলা সাহিত্যের এক বিশেষ স্থানে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
উত্তরঃ
তিনি তাঁর কাব্যে বাংলার গ্রামীণ জীবন, প্রকৃতি ও সংস্কৃতিকে অত্যন্ত নিবিড়ভাবে তুলে ধরেছেন।
জসীমউদ্দীনকে 'পল্লীকবি' বলা হয় কারণ তাঁর কবিতার মূল বিষয়বস্তু হলো গ্রামীণ বাংলার জীবনযাত্রা, সংস্কৃতি, প্রকৃতি, প্রেম, বিরহ এবং উৎসব। তিনি পল্লীর সহজ-সরল মানুষ, তাদের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, স্বপ্ন ও সংগ্রামকে তাঁর লেখনীর মাধ্যমে জীবন্ত করে তুলেছেন। তাঁর কাব্যে ব্যবহৃত ভাষা, উপমা ও চিত্রকল্প সবই গ্রামীণ পটভূমি থেকে নেওয়া। "নকশী কাঁথার মাঠ", "সোজন বাদিয়ার ঘাট" -এর মতো অমর কাব্যগুলোতে তিনি গ্রামের সাধারণ মানুষের প্রেম ও ট্র্যাজেডিকে এমনভাবে উপস্থাপন করেছেন যা পাঠকদের হৃদয় ছুঁয়ে যায়। গ্রাম বাংলার মাটি ও মানুষের প্রতি তাঁর গভীর ভালোবাসাই তাঁকে এই উপাধিতে ভূষিত করেছে।
উত্তরঃ
একটি বাংলা সাহিত্য পত্রিকা ও সাহিত্য আন্দোলন
'কল্লোল' ছিল বিশ শতকের বিশের দশকে (১৯২৩-১৯২৯) কলকাতা থেকে প্রকাশিত একটি অত্যন্ত প্রভাবশালী বাংলা সাহিত্য পত্রিকা এবং এর দ্বারা সূচিত আধুনিক বাংলা সাহিত্যের একটি যুগান্তকারী সাহিত্য আন্দোলন। এই আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল রবীন্দ্র-প্রভাব থেকে মুক্ত হয়ে নতুন ধারার সাহিত্য সৃষ্টি করা, যেখানে নগরজীবন, প্রেম, মনস্তত্ত্বের জটিলতা এবং প্রথা ভাঙার বিদ্রোহ প্রাধান্য পেত।
দীনেশচন্দ্র দাস এই পত্রিকার সম্পাদক হলেও, প্রেমেন্দ্র মিত্র, অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত, বুদ্ধদেব বসু, কাজী নজরুল ইসলাম, জগদীশ গুপ্ত প্রমুখ তরুণ সাহিত্যিকরা ছিলেন এর মূল চালিকাশক্তি। 'কল্লোল' আধুনিক বাংলা কবিতার পথ উন্মোচন করেছিল এবং পরবর্তী প্রজন্মের সাহিত্যিকদের উপর গভীর প্রভাব ফেলেছিল, যা 'কল্লোল যুগ' নামে পরিচিতি লাভ করে।
প্রাচীন যুগের একমাত্র নিদর্শন চর্যাপদ। এর ভাষা ও বিষয়বস্তু দুর্বোধ্য এবং এর কবিরা ছিলেন বৌদ্ধ সাধক। এতে বিধৃত হয়েছে বৌদ্ধ ধর্মের তত্ত্বকথা। এ সময়ের সাহিত্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো গোষ্ঠী কেন্দ্রিকতা ও ধর্মনির্ভরতা। ধর্মের বিষয়টি সমাজজীবনের চিন্তাভাবনাকে নিয়ন্ত্রিত করেছে, তাই সাহিত্যে ধর্মের কথা বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।
প্রাচীন যুগের সময়কাল-
ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ এর মতে
৬৫০-১২০০ খ্রি.
ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় এর মতে
৯৫০-১২০০ খ্রি.
ড. সুকুমার সেনের মতে
৯০০-১৩৫০ খ্রি.
চর্যাপদ: বাংলা ভাষার প্রথম কাব্য/কবিতা সংকলন চর্যাপদ। এটি বাংলা সাহিত্যের আদিযুগের একমাত্র লিখিত নিদর্শন। ডক্টর হরপ্রসাদ শাস্ত্রী নেপালের রাজ দরবারের গ্রন্থাগার হতে ১৯০৭ সালে 'চর্যাচর্য বিনিশ্চয়' নামক পুঁথিটি আবিষ্কার করেন। চর্যাপদের সাথে 'ডাকার্ণব' ও 'দোহাকোষ' নামে আরও দুটি বই নেপালের রাজ দরবারের গ্রন্থাগার হতে আবিষ্কৃত হয়। ১৯১৬ সালে সবগুলো বই একসাথে 'হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা ভাষায় বৌদ্ধগান ও দোহা' নামে প্রকাশ করেন।
বাংলার পাল বংশের রাজারা ছিলেন বৌদ্ধধর্মালম্বী। তাদের আমলে চর্যাগীতিগুলোর বিকাশ ঘটেছিল। সপ্তম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে পদগুলো রচিত। পাল বংশের পরে আসে সেন বংশ। সেন বংশ হিন্দুধর্ম এবং ব্রাহ্মণ্যসংস্কার রাজধর্ম হিসাবে গ্রহণ করে। ফলে বৌদ্ধ সিদ্ধচার্যেরা এদেশ হতে বিতাড়িত হয় এবং নেপালে আশ্রয় গ্রহণ করে। তাই বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন বাংলাদেশের বাহিরে নেপালে পাওয়া গেছে।
ড. হরপ্রসাদ শাস্ত্রী
চর্যাপদের শব্দগুলো অপরিচিত, শব্দ ব্যবহারের রীতি বর্তমানের রীতি থেকে ভিন্ন --এর কবিতাগুলো পড়ে বুঝতে কষ্ট হয়। এজন্য চর্যাপদের ভাষাকে 'সন্ধ্যা ভাষা'ও বলে। চর্যাপদের কবিতাগুলো গাওয়া হত। তাই এগুলো একইসাথে গান ও কবিতা।
সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় তার 'বাঙলা ভাষার উৎপত্তি ও বিকাশ' (Origin and Development of Bengali language) নামক গ্রন্থে ধ্বনি তত্ত্ব ব্যাকরণ ও ছন্দ বিচার করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন যে, পদসংকলনটি আদি বাংলা ভাষায় রচিত। কেউ কেউ একে মৈথিলি, উড়িয়া বা আসামি ভাষা বলে দাবি করেন। ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতে, সেকালের বাংলা, উড়িয়া বা আসামি ভাষার পার্থক্য ছিল সামান্যই। উল্লেখ্য যে, চর্যাপদ উড়িষ্যা, বিহার, আসাম, পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের নিজ নিজ ভাষা ও সাহিত্যের আদি নিদর্শন হিসাবে বিবেচিত।
এতে মোট ৫১ টি পদ'রয়েছে। কয়েক পাতা নষ্ট হয়ে যাওয়ায় সর্বমোট সাড়ে ৪৬টি পদ পাওয়া গেছে। ২৩ নং পদটি খণ্ডিত আকারে উদ্ধার করা হয়েছে অর্থাৎ এর শেষাংশ পাওয়া যায়নি। ২৪, ২৫ ও ৪৮ নং পদগুলো পাওয়া যায়নি। চর্যাপদের মোট পদকর্তা ২৪। অনেকের মতে, আদি চর্যাকার লুইপা। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতে প্রাচীনতম চর্যাকার শবরপা এবং আধুনিকতম সরহ বা ভুসুকু। কাহ্নপা সর্বাধিক ১৩ টি পদ রচনা করেন।
রাজশাহী কলেজ গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত দুর্লভ চর্যাপদ এর অংশবিশেষ
চর্যাপদের কবি / পদকর্তা-
ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ এর মতে
২৩ জন
ড. সুকুমার সেনের মতে
২৪ জন
পদকর্তা: লুই, শবর, ককুরী, বিরুআ, গুণ্ডারী, চাটিল, ভুসুকু, কাহ্ন, কামলি, ডোম্বী, শান্তি, মহিত্তা, বীণা, সরহ, আজদেব, ঢেণ্টণ, দারিক, ভাদে, তাড়ক, কঙ্কণ, জঅনন্দি, ধাম, তন্ত্রী ও লাড়ীডোম্বী। পদকর্তাদের নামের শেষে সম্মানসূচক 'পা' যোগ করা হয়। যেমন: লুই থেকে লুইপা, শবর থেকে শবরপা।
কাহ্ন : ১৩ টি পদ রচনা করেন।
ভুসুকু : ৮ টি পদ রচনা করেন।
সরহ : ৪ টি পদ রচনা করেন।
লুই, শান্তি ও শবরী: ২ টি করে পদ রচনা করেন।
বাকিরা : ১ টি করে পদ রচনা করেন।
লাড়ীডোম্বী : কোন পদ পাওয়া যায়নি।
ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর 'Buddhist Mystic Songs' গ্রন্থের মতে, পদ সংখ্যা ৫০টি এবং প্রাপ্ত পদ সাড়ে ছেচল্লিশটি।
ড. সুকুমার সেনের 'বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস' গ্রন্থের মতে, পদ সংখ্যা ৫১টি।
লুইপা। তিনি ২টি পদ রচনা করেন। যথা: ১, ২৯। হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর মতে, তিনি রাঢ় অঞ্চলের বাঙালি কবি হিসেবে পরিচিত। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতে, তিনি শবরপার শিষ্য ছিলেন। লুইপাকে আদি চর্যাকার হিসেবে ধরে নেয়া হয়।
চর্যাপদের প্রথম পদটিঃ
কাআ (শরীর) তরুবর পঞ্চ বি ডাল।
চঞ্চল চীএ পইঠো কাল ॥
দিঢ় করিঅ মহাসুহ পরিমাণ।
লুই ভণই (বলে) গুরু পুচ্ছিঅ জাণ ॥
সঅল সহিঅ কাহি করিঅই।
সুখ দুখেতে নিচিত মরিঅই ॥
এড়ি এউ ছান্দক বান্ধ করণক পাটের আস।
সুনুপথ ভিতি লেহু রে পাস ॥
ভণই লুই আমহে ঝাণে দিঠা।
ধমণ চমণ বেণি পিত্তি বইঠা ॥
মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর মতে, সন্ধ্যা বা সান্ধ্য ভাষা বা আলো-আঁধারির ভাষা।
ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর মতে, এর ভাষার নাম 'বঙ্গকামরূপী'। এটি মাত্রাবৃত্ত ছন্দে রচিত।
চর্যাপদ হলো বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন এবং প্রাচীনতম বাংলা কাব্য। এটি খ্রিস্টীয় অষ্টম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে রচিত বৌদ্ধ সহজিয়া সাধকদের এক ধরণের গান ও কবিতা সংকলন। বাংলা ভাষার উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশের ইতিহাস জানতে এবং প্রাচীন বাংলার সামাজিক, অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় জীবন সম্পর্কে এটি মূল্যবান তথ্য প্রদান করে।
১৯০৭ সালে মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী নেপালের রাজকীয় গ্রন্থাগার থেকে এর পুথি আবিষ্কার করেন। তাঁর সম্পাদনায় ১৯১৬ সালে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ থেকে এটি ‘হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা ভাষায় বৌদ্ধ গান ও দোহা’ নামে প্রকাশিত হয়। চর্যাপদের ভাষা 'সন্ধ্যা ভাষা' নামে পরিচিত, যার অর্থ আংশিক আলো ও আংশিক অন্ধকারময় বা দ্ব্যর্থবোধক ভাষা।
ভানুসিংহ ছিল বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি ছদ্মনাম। তিনি এই ছদ্মনামে "ভানুসিংহের পদাবলী" নামক একটি কাব্যগ্রন্থ রচনা করেন। এই কাব্যগ্রন্থটি মূলত বৈষ্ণব পদাবলীর ঢঙে লেখা একগুচ্ছ কবিতা নিয়ে গঠিত। রবীন্দ্রনাথ তাঁর কৈশোরকালে বৈষ্ণব সাহিত্যের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে এই কবিতাগুলো লেখেন, যেখানে রাধা-কৃষ্ণের প্রেমলীলা, বিরহ ও মিলনকে নতুন আঙ্গিকে তুলে ধরা হয়েছে। এটি বাংলা সাহিত্যে তাঁর প্রাথমিক কাব্যপ্রতিভার এক অনন্য নিদর্শন এবং একটি স্বতন্ত্র সংযোজন হিসেবে বিবেচিত হয়।
প্রাচীন যুগে রচিত বাংলা সাহিত্যের একমাত্র নিশ্চিত নিদর্শন হলো চর্যাপদ। এটি বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন হিসেবে স্বীকৃত। ড. হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ১৯০৭ সালে নেপালের রাজকীয় গ্রন্থশালা থেকে এর পুঁথি আবিষ্কার করেন, যা ১৯১৬ সালে 'হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা বৌদ্ধ গান ও দোঁহা' নামে প্রকাশিত হয়।
চর্যাপদ মূলত বৌদ্ধ সহজিয়া সাধকদের রচিত কিছু গান বা কবিতা, যা তাদের ধর্মীয় ও দার্শনিক চিন্তাভাবনা প্রকাশ করে। এর ভাষা প্রাচীন বাংলা ভাষারূপের একটি উদাহরণ এবং এটি আধুনিক বাংলা ভাষার উদ্ভবের প্রথম ধাপ নির্দেশ করে। চর্যাপদের রচয়িতাদের মধ্যে লুইপা, কাহ্নপা, ভুসুকুপা, শবরীপা, সরহপা প্রমুখ উল্লেখযোগ্য। চর্যাপদ শুধুমাত্র বাংলা সাহিত্যেরই নয়, বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির ইতিহাসের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দলিল।
চর্যাপদ হলো বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম ও প্রথম নিদর্শন। এটি বৌদ্ধ সহজিয়া সাধকদের দ্বারা রচিত গান ও কবিতার একটি সংকলন, যা খ্রিস্টীয় অষ্টম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে রচিত হয়েছিল বলে অনুমান করা হয়।
১৯০৭ সালে মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী নেপালের রাজদরবারের গ্রন্থাগার থেকে এর পুথি আবিষ্কার করেন। পরবর্তীতে ১৯১৬ সালে তাঁরই সম্পাদনায় 'হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা বৌদ্ধ গান ও দোঁহা' নামে এটি বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ থেকে প্রকাশিত হয়। চর্যাপদগুলি মূলত বৌদ্ধ সহজিয়া মতের তত্ত্ব ও সাধনপ্রণালী ব্যাখ্যা করে, যা 'সন্ধ্যাভাষা' বা 'সান্ধ্যভাষা' নামক একটি রূপক ভাষায় রচিত। এতে মোট ৫১টি পদ ছিল, যার মধ্যে সাড়ে ছেচল্লিশটি পদ এবং ৪৬ জন কবির নাম (যেমন- লুইপা, কাহ্নপা, ভুসুকুপা, শবরপা প্রমুখ) পাওয়া গেছে। চর্যাপদ কেবল বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসেই নয়, বাংলা ভাষার বিবর্তন ও তৎকালীন সমাজের ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবন সম্পর্কেও মূল্যবান তথ্য সরবরাহ করে।