নৌকা ভ্রমণ
ভূমিকা: মানুষের জীবনে অপার আনন্দদান করতে পারে এমন জিনিসের মধ্যে ভ্রমণ অন্যতম। আর যদি হয় নৌভ্রমণ তা হলে তো কথা থাকে না। কারণ বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। এদেশের প্রায় সব মানুষেরই আছে নৌকা-ভ্রমণের অভিজ্ঞতা। সকল প্রকার ভ্রমণমাধ্যমের মধ্যে নৌকা ভ্রমণ অপেক্ষাকৃত সহজ ও কম ব্যয়বহুল। বাংলাদেশের নদীপথের অপূর্ব সৌন্দর্য শুধু আনন্দদায়কই নয়, তা উপভোগেরও একটি মহত্তম অনুষঙ্গ।
উপলক্ষ্য ও যাত্রাশুরু: বার্ষিক পরীক্ষার পর আমরা দীর্ঘ অবকাশ পেলাম। আমরা কয়েকজন বন্ধু মিলে নৌকা ভ্রমণের পরিকল্পনা গ্রহণ করলাম। গন্তব্যস্থান মংলাবন্দরের অপর পাড়ের সুন্দরবন। আমরা সোমবারে খুলনার রূপসা ঘাট থেকে সকাল ৭টায় যাত্রা শুরু করলাম।
প্রস্তুতি গ্রহণ: আমরা একটা মাঝারি গড়নের ছৈওয়ালা নৌকা ভাড়া করলাম। নৌকার মাঝি চারজন। আমরা সাথে করে ক্যামেরা, টেপরেকর্ডার, ভিডিও, বাদাম, চিপস, পাউরুটি, পানি এবং বাসমতি চাল, খাসির মাংস ইত্যাদি নিয়ে রওনা দিলাম।
যাত্রাপথের বর্ণনা: আমাদের যাত্রা শুরুর সময় রূপসা নদীতে ভাটার টান। একজন মাঝি নৌকার হাল ধরল। আর তিনজন মাঝি দাঁড়টানা শুরু করল। আমাদের নৌকা পেল প্রচণ্ড গতি। আমরা নদীপাড়ের নয়নাভিরাম দৃশ্য উপভোগ করতে করতে ছুটে চললাম। নদীর দুপাড়ের গ্রামগঞ্জ ফসলের সবুজ মাঠ আমাদের দারুণভাবে মুগ্ধ করল। নদীর ঘাটে ঘাটে শিশু-কিশোর, নর-নারীর জীবনপ্রবাহ প্রত্যক্ষ করার এক আশ্চর্য অভিজ্ঞতা লাভ করলাম। নদীতে কেউ নৌকা চালায়, নদীর পাড়ে কেউ বসে জাল বোনে, নদীতে কেউ সাঁতার কাটছে, মাছ ধরে, নদীর থেকে কোনো কোনো গাঁয়ের বধূ কলসিতে জল নিয়ে ঘরে ফেরে। নদীর বুকে গাঙচিল উড়ে চলে। ঝাঁপ দিয়ে নেমে ছোট মাছ ধরে খায়। আরও কত কী! এসব দৃশ্য খুবই চমকপ্রদ। ঘণ্টাখানেক যেতে না যেতে আমরা চালনা নদীবন্দরে পৌছে গেলাম। আমাদের সাথে নেওয়া হালকা নাস্তা বন্ধুরা মিলে খেয়ে নিলাম। আর আশপাশের মনোরম দৃশ্যগুলো ক্যামেরাবন্দি করতে ভুল করলাম না। টেপরেকর্ডার ছেড়ে দিয়ে ভাটিয়ালি গান শুনতে লাগলাম। এভাবে ঠিক দুপুরবেলা আমরা মোংলা নদীর অপর পাড়ে সুন্দরবনের কাছাকাছি পৌঁছে গেলাম।
নৌকাতে বসে সুন্দরবনের দৃশ্য উপভোগ: মাঝিরা আমাদের রান্নার কাজে সাহায্য করল। অনন্য ও অপূর্ব তাদের সাথে মিলেমিশে রান্না সম্পন্ন করল। দুপুর একটার দিকে আমরা মধ্যাহ্নভোজ সেরে নিলাম। তারপর নদীর তীর বেয়ে বনের পাশ ঘেঁষে চলতে থাকলাম। সুন্দরবনের তীরে একটা মা হরিণ তার বাচ্চা সাথে নিয়ে বিচরণ করছে দেখতে পেলাম। আমরা সকলে খুশিতে নেচে উঠলাম। মানুষের শব্দ শুনে হরিণগুলো বনের মাঝে লুকিয়ে গেল। সুন্দরবনের নদীর পাড়ের কেওড়া, হেতালি, সুন্দরী নানা জাতের গাছগাছালির সবুজ দৃশ্য সত্যিই চমৎকার ও মনোমুগ্ধকর। যা আমাদের দলের সকলকে অপার আনন্দরসে আপ্লুত করলো। এভাবে বিকেল গড়িয়ে এলো। এবার আমাদের খুলনার পথে ফেরার পালা শুরু হলো। আমরা মোংলা টাউনে নেমে প্রয়োজনীয় কেনাকাটা সেরে নিলাম।
সূর্যাস্তের দৃশ্য ও তারপর: মোংলা নদীতে বসে পশ্চিম আকাশে সূর্যাস্ত যেতে দেখলাম। সন্ধ্যা নেমে এলো প্রকৃতির বুকে। সূর্যের বিদায়ি আভা নদী তীরের গাছগাছালিতে ও নদীর পানিতে অপূর্ব রূপ ধারণ করলো। আমাদের সকলকে তা সত্যিই মুগ্ধ করল। সন্ধ্যায় মোংলাবন্দর ও শহরের বিজলি বাতি জ্বলে উঠল। বড় বড় জাহাজগুলোর বাতিগুলো যেন নদীর বুকে তারা ফুলের মতো ফুটে উঠলো। ক্রমে ক্রমে আঁধার গাঢ় হয়ে ঘনীভূত হলো। নদীর পাড়ের গ্রামগুলো নিস্তব্ধতার চাদরে ঢেকে গেল। আকাশে তারার মেলা ও পানির ছলাৎছলাৎ শব্দে আমাদের মনে শীতলতার পরশ বুলায়ে দিল। মাঝির কণ্ঠে ভাটিয়ালি গান শুরু হলো-
মন মাঝি তোর বৈঠা নেরে
আমি আর বাইতে পারলাম না।'
গন্তব্য থেকে প্রত্যাবর্তন: প্রকৃতির দৃশ্য ও মাঝির গানের সুরের আওয়াজ আমাদের মুগ্ধ করে রাখল। তার রেশ শেষ হতে না হতে বাবলু বলে উঠল বকুল আর কত বেভুল থাকবি। আমরা যে খুলনায় ফিরে এসেছি। সকলে নৌকার ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে তাড়াতাড়ি নৌকা থেকে তীরে নতুন বাজারে নেমে পড়লাম। রাত তখন অনেক হয়ে গেছে। রিকশাতে চড়ে আমরা যার যার বাসার দিকে চললাম। মনের অলিন্দে তখন নৌকা ভ্রমণের অপার আনন্দ গভীর স্বপ্নকল্পনার বিস্তার ঘটিয়ে চলেছে।
উপসংহার: নৌকা ভ্রমণ আমাদের সকলকে দিল এক আনন্দদায়ক অভিজ্ঞতা। তা নদীমাতৃক বাংলাদেশের প্রকৃতির অপূর্ব দৃশ্য উপভোগ করার সুযোগ এনে দিল। নৌকাপথে সুন্দরবন ভ্রমণের এই দৃশ্য আমার মনের মণিকোঠায় চিরদিন দোলা দিয়ে যাবে। দেশ, দেশের নদী ও নদী পাড়ের প্রাকৃতিক দৃশ্য এবং মানুষের জীবনধারা জানার জন্য সকলেরই নৌকাভ্রমণ করা উচিত বলে আমার মনে হয়।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!