বাংলার গ্রামে দুই ভাইবোন অপু ও দুর্গার বেড়ে ওঠা নিয়েই বিখ্যাত এই উপন্যাস। এই উপন্যাসের ছোটদের জন্য সংস্করণের নাম - আম আঁটির ভেঁপু। পরবর্তীকালে বিখ্যাত বাঙালি পরিচালক সত্যজিৎ রায় এই উপন্যাস অবলম্বনে পথের পাঁচালী চলচ্চিত্র নির্মণ করেন যা পৃথিবী বিখ্যাত হয়।
প্রখ্যাত ঔপন্যাসিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় শরৎচন্দ্রের পরবর্তী ঔপন্যাসিকদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয় ছিলেন। তাঁর রচিত সাহিত্য মধুর ও কাব্যধর্মী ভাষায় অখণ্ড ও অবিচ্ছিন্ন সত্তায় ধারণ করেছে প্রকৃতি ও নিম্নশ্রেণির মানবজীবন। তাঁর ছোটগল্পগুলোর মধ্যে প্রস্ফুটিত হয়েছে গীতিকবির ব্যক্তিত্ব।
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় ১২ সেপ্টেম্বর, ১৮৯৪ সালে চব্বিশ পরগনার মুরারিপুর গ্রামে (মাতুলালয়) জন্মগ্রহণ করেন। পৈতৃক নিবাস চব্বিশ পরগনার ব্যারাকপুর গ্রাম।
তিনি 'চিত্রলেখা' (১৯৩০) পত্রিকা এবং হেমন্তকুমার গুপ্তের সাথে 'দীপক' (১৯৩০), পত্রিকা সম্পাদনা করেন।
১৯২১ সালে প্রবাসী পত্রিকায় 'উপেক্ষিতা' নামক গল্প প্রকাশের মাধ্যমে সাহিত্যিক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।
তিনি ১ সেপ্টেম্বর, ১৯৫০ সালে (১৫ কার্তিক, ১৩৫৭) বিহারের ঘাটশীলায় মারা যান।
তাঁর রচিত উপন্যাসসমূহ
'পথের পাঁচালী' (১৯২৯): এটি তাঁর প্রথম ও শ্রেষ্ঠ উপন্যাস। এটি ইংরেজি ও ফরাসি ভাষায় অনূদিত। মূল চরিত্র: অপু, দুর্গা। উপন্যাসটি তিনটি অংশে বিভক্ত। যথা: বল্লালী বালাই, আমআঁটির ভেঁপু ও অক্রুর সংবাদ। সত্যজিৎ রায় এ উপন্যাস অবলম্বনে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন।
'অপরাজিত' (১৯৩১): এটিকে 'পথের পাঁচালী' উপন্যাসের দ্বিতীয় খণ্ড বলা হয়। উপন্যাসটি ধারাবাহিকভাবে মাসিক 'প্রবাসী' পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। গ্রন্থাকারে দুই খণ্ডে প্রকাশিত হয় ১৯৩১ সালে (১৩৩৮)। 'আলোেক সারথী' নামে এ উপন্যাসটির প্রথমে নামকরণ করা হয়েছিল।
উপন্যাসের নায়ক অপুর শৈশব ও কৈশোর জীবন, মা সর্বজয়ার মৃত্যু, অপর্ণার সাথে বিবাহ ও শিশুপুত্র কাজলের মাধ্যমে পুনরায় প্রিয় শৈশবের প্রিয় গ্রাম নিশ্চিন্দিপুরের স্মৃতিমন্থন এ উপন্যাসের মূল কাহিনি। অপরাজিত উপন্যাসের একটি অংশ নিয়েই সত্যজিৎ রায় 'অপুর সংসার' সিনেমা তৈরি করেছেন।
'দৃষ্টিপ্রদীপ' (১৯৩৫): অবাস্তব ও অধিবাস্তব দৃষ্টিভঙ্গি এর কাহিনি।
'আরণ্যক' (১৯৩৮): এ উপন্যাসে প্রাধান্য পেয়েছে অরণ্যাচারী মানুষের জীবন। ভাগলপুরের নিকটবর্তী বনাঞ্চলের মানুষের জীবনের সাথে প্রকৃতির সম্পর্কের টানাপোড়েন, বিচিত্র চরিত্র, তাদের সুখ-দুঃখ, আশা-আনন্দ এ উপন্যাসের মূল কাহিনি।
'আদর্শ হিন্দু হোটেল' (১৯৪০): এ উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র হাজারী ঠাকুরের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে প্রাতষ্ঠা লাভএবং মানুষের ভালোবাসা অর্জনের কাহিনিই এ উপন্যাসের মূল বিষয়।
'অনুবর্তন' (১৯৪২): বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যক্তি অভিজ্ঞতার রূপায়ণ এ উপন্যাস। গ্রামের মানুষের মধ্যে সামান্য স্বার্থ নিয়ে দলাদলি এবং পরিণামে ট্র্যাজিক পরিণতিই এ উপন্যাসের মূল সুর।
'দেবযান' (১৯৪৪): এটি প্রেমতত্ত্ব ও পরলোকতত্ত্ব ভিত্তিক উপন্যাস। অবাস্তব ও অধিবাস্তব দৃষ্টিভঙ্গি এর কাহিনি ও চরিত্রবিন্যাসের নিয়ামক।
'ইছামতি' (১৯৪৯): ইছামতি নদীর তীরবর্তী গ্রামে প্রচলিত সংস্কার ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে নারী জাগরণ, ইংরেজ শাসকদের প্রভাবে কৃষিনির্ভর বাঙালির বাণিজ্য চেতনা এবং নীলচাষের প্রতিবাদ, নদীর তীরবর্তী মানুষের জীবনকথা এ উপন্যাসের আলেখ্য। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় এ উপন্যাসের জন্য 'রবীন্দ্র পুরস্কার' (মরণোত্তর) লাভ করেন।
'অশনি সংকেত' (১৯৫৯): এ উপন্যাসটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ফলে সৃষ্ট পঞ্চাশের মন্বন্তরের প্রেক্ষাপটে রচিত। এটি ধারাবাহিকভাবে মাতৃভূমি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। [বাজারে প্রচলিত বইয়ে বলা হয়েছে যে, ঋত্বিক ঘটক এ উপন্যাস অবলম্বনে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। প্রকৃতপক্ষে সত্যজিৎ রায় এ উপন্যাস অবলম্বনে ১৯৭৩ সালে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেনা। এ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য বাংলাদেশের চিত্রনায়িকা ববিতাকে চলচ্চিত্রে ডক্টরেট ডিগ্রি দেয়া হয়।
'বিপিনের সংসার' (১৯৪১), 'দম্পতি' (১৯৫২)।
পথের পাঁচালী (উপন্যাস)
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
পথের দাবী (উপন্যাস)
শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অন্যান্য রচনাবলিঃ
ছোটগল্প:
'আহ্বান': গল্পটি বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের রচনাবনি থেকে সংকলিত। এটি উদার মানবিক সম্পর্কের গল্প মানুষের স্নেহ-মমতা-প্রীতির যে বাঁধন তা ধন-সম্পদে না হৃদয়ের নিবিড় আন্তরিকতার স্পর্শেই গড়ে ওঠে- এটিই 'আহ্বান' গল্পের মূল উপজীব্য। চরিত্র: বুড়ি, গোপাল।
প্রাগৈতিহাসিক' গল্পের লেখক হলেন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। উল্লেখ্য, 'প্রাগৈতিহাসিক' (১৯৩৭) গল্পের পাত্র-পাত্রী হলো 'ভিখু ও পার্টি'। তাঁর রচিত অন্যান্য গল্পসমূহঃ অতসী মামী ও অন্যান্য গল্প (১৯৩৫), মিহি ও মোটা কাহিনী (১৯৩৮) সরীসৃপ (১৯৩৯), বৌ (১৯৪৩), সমুদ্রের স্বাদ (১৯৪৩) ইত্যাদি।