আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে পূর্ব বাংলার ছাত্ররা প্রথম আন্দোলন করেছিল।
৬ দফা আন্দোলনকে দমন করার জন্য পাকিস্তানি শাসকরা শেখ মুজিব ও অন্য নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে। বলা হয় বাঙালি নেতারা ভারতের আগরতলায় বসে ভারতের সাথে গোপন ষড়যন্ত্র করে পূর্ব পাকিস্তানকে পাকিস্তান রাষ্ট্র হতে বিচ্ছিন্ন করে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের চেষ্টা করেছে। এ অভিযোগে শেখ মুজিবুর রহমানসহ ৩৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। ইতিহাসে এটিই আগরতলা মামলা নামে পরিচিত।
ছয় দফা কর্মসূচি ছিল মূলত বাঙালিদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের সনদ, যা ড. গোলাম হোসেনের ন্যায় সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানের জনগণকে আলোড়িত করেছিল।
৬ দফা ছিল বাঙালিদের আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের দাবি। ৬ দফাভিত্তিক আন্দোলনের মাধ্যমেই বাঙালি জাতীয়তাবাদ সুসংগঠিত হয় এবং এর চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ হিসেবে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা সংগ্রাম মুক্তিযুদ্ধের রূপ নিয়েছে এবং শেষপর্যন্ত স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম হয়েছে। বাংলার জনগণের বাঁচার দাবি ৬ দফার পথ ধরেই বাঙালি জাতি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের প্রেরণা লাভ করে। ৬ দফা আন্দোলনকে স্বাধীনতা সংগ্রামের ভিত্তি বলা হয়।
সুতরাং নিঃসন্দেহে বলা যায়, ঐতিহাসিক ৬ দফা কর্মসূচি গোলাম হোসেনসহ সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানের জনগণকে দারুণভাবে আলোড়িত করেছিল নিজেদের অধিকার আদায়ের স্বপ্ন বাস্তবায়িত করতে।
ড. গোলাম হোসেন দৈনিক পত্রিকায় যে ধারাগুলো পড়েছিলেন তা ছিল ঐতিহাসিক ৬ দফা কর্মসূচি সংশ্লিষ্ট ধারা এবং পূর্ব পাকিস্তানিদের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা উন্মোচনের হাতিয়ার। ১৯৬৬ সালের ৫ই ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমান যে ঐতিহাসিক ছয় দফা কর্মসূচি পেশ করেন তার ধারাগুলোর স্বরূপ নিম্নরূপ-
১. ১৯৪০ সালের ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে পাকিস্তানের জন্য যুক্তরাষ্ট্রীয় (পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান) ধরনের সংবিধান রচনা করতে হবে। সর্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে সকল প্রাপ্তবয়স্কের ভোটে কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক আইনসভা গঠিত হবে।
২. শুধু দেশরক্ষা ও পররাষ্ট্র বিষয় থাকবে যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকারের হাতে। অবশিষ্ট সব বিষয়ে প্রদেশগুলোর পূর্ণ ক্ষমতা থাকবে।
৩. পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য দুটি ভিন্ন ভিন্ন মুদ্রা চালু থাকবে। তবে দুই অংশেই তা সহজে ব্যবহার করা যাবে।
৪. আঞ্চলিক সরকারের সকল প্রকার ট্যাক্স ও খাজনা ধার্য এবং আদায়ের ক্ষমতা থাকবে। আদায় করা অর্থের একটি অংশ কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে জমা হবে।
৫. প্রতি অঞ্চলের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের হিসাব আলাদা করে রাখতে হবে।
৬. পূর্ব পাকিস্তানের জন্য আলাদা করে একটি আধা সামরিক বাহিনী গঠন করতে হবে।
সুতরাং গোলাম হোসেন পত্রিকায় প্রকাশিত ৬ দফা কর্মসূচির যে ধারাগুলো পড়েছিলেন তা ছিল পূর্ব পাকিস্তানের জন্য ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা উন্মোচনের এক বলিষ্ঠ হাতিয়ার। প্রশ্নোক্ত এ উক্তিটি যথার্থ ও তাৎপর্যপূর্ণ।
Related Question
View All১৯৫৮ সালে তদানীন্তন পাকিস্তানে সামরিক আইন জারি করেন ইস্কান্দার মির্জা।
১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনে মুসলিম লীগ রাজনৈতিক দুর্বলতা ও দুঃশাসনের কারণে পরাজিত হন। এছাড়া মুসলিম লীগের অপশাসন, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, শোষণ, দলের মধ্যে অন্তর্দ্বন্দ্ব, দুর্নীতি, পাকিস্তানের দুই অংশে বৈষম্য ইত্যাদি মুসলিম লীগের জনপ্রিয়তা অনেক হ্রাস করে। ফলে যুক্তফ্রন্টের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পায় এবং মুসলিম লীগের পরাজয় ঘটে।
কাশিমপুরের মানুষের আন্দোলনে পূর্ব পাকিস্তানের ১৯৬৯ সালের গণআন্দোলনের বৈশিষ্ট্য ফুটে উঠেছে।
১৯৪৭ সালে দেশবিভাগের পর পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বিভিন্ন উপায়ে তাদের ক্ষমতা আঁকড়ে থাকে এবং স্বৈরাচারী হয়ে ওঠে। তাদের কার্যকলাপে অতিষ্ঠ হয়ে বাঙালি জনগোষ্ঠী বারবার রাজপথে নেমেছে। যার প্রতিফলন আমরা দেখতে পাই ১৯৬৬ সালের ৬ দফা দাবি ঘোষণার পর থেকে। সরকার এ আন্দোলনকে দমন করার জন্য পুলিশি নির্যাতন শুরু করে। এ সময় ঢাকায় ছাত্র-জনতার মিছিলে পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের ছাত্র আসাদুজ্জামান (আসাদ) নিহত হয়। আসাদ নিহত হওয়ার পর এ আন্দোলন পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের মনে ক্ষোভের আগুন জ্বলে ওঠে। জনগণের ঐক্য, জাগরণ যে স্বৈরাচারী শাসকদের বুলেটের চেয়ে শক্তিশালী তা উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়। ১৯৬৯ সালের গণআন্দোলনের উল্লিখিত তথ্যসমূহের সাথে কাশিমপুরের মানুষের আন্দোলনের মিল পাওয়া যায়।
তাই বলা যায়, কাশিমপুর অঞ্চলের মানুষের আন্দোলনে পূর্ব পাকিস্তানের ১৯৬৯ সালের গণআন্দোলনের বৈশিষ্ট্য ফুটে উঠেছে।
কাশিমপুরের চেয়ারম্যানের পরিণতি যেন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের পরিণতিরই প্রতিচ্ছবি- উক্তিটি যথার্থ।
তদানীন্তন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল আইয়ুব খানের ক্ষেত্রে দেখা যায়, তার স্বৈরাচারী মনোভাব ও কার্যকলাপে অতিষ্ঠ হয়ে পূর্ব-পাকিস্তানের সুবিধাবঞ্চিত জনগণ দুর্বার গণআন্দোলন শুরু করে। জেনারেল আইয়ুব খান এ আন্দোলন দমন করার জন্য পুলিশি নির্যাতন শুরু করেন। পুলিশের গুলিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আসাদ শহিদ হওয়ার পর এ আন্দোলন গণঅভ্যুত্থানে পরিণত হয়। আন্দোলনের তীব্রতায় ভীত হয়ে ক্ষমতায় টিকে থাকার কোনো উপায় খুঁজে না পেয়ে ১৯৬৯ সালের ২৫শে মার্চ জেনারেল আইয়ুব খান পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। একইভাবে কাশিমপুর অঞ্চলের মানুষ তাদের চেয়ারম্যানের স্বৈরাচারী মনোভাব ও কার্যকলাপে অতিষ্ট হয়ে আন্দোলন ও বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। চেয়ারম্যান পেশিশক্তি ও রক্তপাত ঘটিয়েও এ আন্দোলন স্তিমিত করতে পারেনি। এক পর্যায়ে উক্ত 'চেয়ারম্যান পদত্যাগ করতে বাধ্য হন, যেমনটি পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের ক্ষেত্রে ঘটেছে।
সুতরাং বলা যায়, কাশিমপুরের চেয়ারম্যানের পরিণতি তৎকালীন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের পরিণতিরই প্রতিচ্ছবি।
শেখ মুজিবুর রহমানসহ মোট ৩৫ জনের বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক আগরতলা মামলা (রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিবুর রহমান এবং অন্যান্য) দায়ের করা হয়।
৬ দফা পূর্ব বাংলার জনগণের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামরিকসহ সকল অধিকারের কথা তুলে ধরে। এতে প্রত্যক্ষভাবে স্বাধীনতার কথা বলা না হলেও এ কর্মসূচি বাঙালিদের স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত করে। এ ছয় দফার পথ ধরে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করি। তাই ছয় দফাকে বাংলার মানুষের মুক্তির দলিল বলা হয়।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!