‘আনন্দ ধারা বহিছে ভুবনে'—রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গানের এই কথাগুলিতে শিল্পকলার মূল সত্যটি প্রকাশ পেয়েছে। সব মানুষই জীবনের এই আনন্দকে পাওয়ার জন্যে কত রকম চেষ্টা করে যাচ্ছে। আনন্দ প্ৰকাশ জীবনীশক্তির প্রবলতারই প্রকাশ। আনন্দকে আমরা বুঝি রূপ-রস-শব্দ-স্পর্শ-গন্ধ ইত্যাদির সাহায্যে, ইন্দ্রিয়সকলের সাহায্যে। মানুষ যখন আনন্দ পায় তখন সে তার মনকে প্রকাশ করতে চায়—নানা রূপে। তাই সৃষ্টি হলো চিত্রশিল্পী, নৃত্যশিল্পী, সংগীতশিল্পী, কবি, সাহিত্যিক। পুরাকালের গুহামানুষ থেকে শুরু করে বর্তমান যুগ পর্যন্ত মানুষ নিজের পাওয়া আনন্দকে সুন্দরকে অন্য মানুষের মধ্যে বিস্তার করতে চেয়েছে। তাই সৃষ্টি হয়েছে নানান আঙ্গিকের শিল্পকলা। যেমন- চিত্রকলা, ভাস্কর্য, নৃত্যকলা, সংগীতকলা, অভিনয়কলা, চলচ্চিত্র, স্থাপত্য ইত্যাদি কলাভঙ্গি। প্রতিটি ক্ষেত্রেই মানুষ তার নিত্য নতুন অবদান রেখে চলেছে শিল্পকলার বিস্তীর্ণ অঙ্গনে শিল্পকলার একটি অস্পষ্ট অর্থ আমরা বুঝতে পারি কিন্তু শিল্পকলার সঠিক অর্থ কী আর শিল্পকলার গুণাগুণ কী, এই প্রশ্ন যদি কেউ করে, তাহলে উত্তর দেয়া কঠিন হয়ে পড়ে। যেমন গান শুনে ভালো লাগে, ছবি দেখে ভালো লাগে, কিন্তু ভালো লাগে কেন? এই প্রশ্ন নিয়ে মানুষের মন চিন্তা-ভাবনা করতে লাগল। দেখা গেল, সকল শিল্পকলায় রূপ আছে, ছন্দ আছে, সুর আছে, রং আছে, বিশেষ গড়ন আছে, সবকিছুকে সাজাবার একটি সুবিন্যস্ত নিয়ম আছে। এই নিয়মটি লুকিয়ে থাকে, নিজেকে প্রকাশ করে না, সুন্দরের মধ্যে মিলেমিশে একটা বন্ধন সৃষ্টি করে। নিয়মটি না জানলেও সুন্দরকে চেনা যায়। একটি উপমা দেয়া যাক। পৃথিবীর সব ফুলই একই নিয়ম মেনে ফুল নাম পেয়েছে। আমরা দেখে বলি সুন্দর। এর নিয়মটি হলো, একই বিন্দু থেকে সকল পাপড়ি বিন্দুর চারিদিকে ছড়িয়ে থাকবে। কিন্তু এক নিয়ম মেনেই কত রকম ফুল। নিয়ম মেনেও ফুল স্বাধীনভাবে ফুটে ওঠে। তোমাদের এখন সুন্দরের নিয়ম জানতে হবে না, সুন্দর লাগলেই সুন্দর বলবে। সুন্দর দেখতে দেখতেই একদিন সুন্দরের বিশেষ বিশেষ নিয়মগুলি জানতে পারবে। শুধু এইটুকু জেনে রাখো, সুন্দরকে জানার যে জ্ঞান তার নাম ‘নন্দনতত্ত্ব'। নন্দনতত্ত্ব মানে সুন্দরকে বিশ্লেষণ করা, সুন্দরকে আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করা। সব সুন্দরের সৃষ্টির মধ্যেই একটা রূপ আছে, তার নাম স্বাধীনতা—অপর নাম যা খুশি ভাই করা। যে কাজ সকলকে আনন্দ দেয় খুশি করে, তাই সুন্দর। স্বার্থপর বা অসংগত আমি-র খুশি নয়, অনেক মনে খুশির বিস্তার করা আমি। অন্ধকার ঘর আলোকিত করবার জন্যে নিয়ম মেনে প্রদীপ জ্বালাতে হয়, ঘরে অসংগত আগুন লাগিয়ে ঘর আলোকিত করা নয়।
আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে, কত রকম জিনিস প্রয়োজন হয়—ঘটি, বাটি থেকে বিছানাপত্র। শুধু প্রয়োজন মিটলেই মানুষ খুশি হয় না— মানুষের মন বলে, প্রয়োজন মিটলেই হবে না তাকে সুন্দর হতে হবে। যেমন নকশি কাঁথা, রাত্রে বিছানায় গায়ে দিয়ে শোওয়ার জন্য একটি সামগ্রী – সেটা তো সুন্দর-অসুন্দর হওয়ার প্রয়োজন নেই। কিন্তু এই প্রয়োজনের জিনিসকে সুঁই আর রঙিন সুতা দিয়ে অপূর্ব নকশা করে সাজিয়েছে গাঁয়ের বধূরা। নকশি কাঁথা দেখলেই সুন্দর লাগে, জিনিসটির প্রয়োজনের কথা মনেই পড়ে না। এ কারণেই সকল জ্ঞানী মানুষ বলেন, সব সুন্দরই সরাসরি প্রয়োজনের বাইরে। প্রয়োজনের কাজ মিটল তো শরীরকে তৃপ্ত করল, আর প্রয়োজনের বাইরে যে সুন্দর তা মনকে তৃপ্ত করল। অর্থাৎ প্রয়োজন আর অপ্রয়োজন মিলিয়েই মানুষের সৌন্দর্যের আশা পূর্ণ হয়।
এবার বিভিন্ন শিল্পকলা নিয়ে সংক্ষিপ্ত করে কিছু বলা যাক। ছবি আঁকা। বিশ্বের সকল দেশেই শিশুরা ছবি আঁকে। বাংলাদেশের ছোটরাও খুব সুন্দর ছবি আঁকতে পারে। ছবি আঁকা মানে 'দেখা শেখা'। ছোটরা প্রকৃতিকে দেখে, মা-বাবা, ভাই-বোন মিলিয়ে একটা সমাজকে দেখে। প্রতিদিনের দেখা বিষয়বস্তু, রং, গড়ন, আকৃতি শিশুমনের কল্পনার সঙ্গে মিলেমিশে যায়। নানা রকম গল্প শুনে, দেশের কথা শুনে, কবিতা ছড়া শুনেও শিশু মনে ছবি তৈরি হতে থাকে। এ সকল দেখা-অদেখা বস্তু নিয়ে শিশুরা ছবি আঁকে কল্পনা বাস্তব মিলিয়ে। নিজেদের মনের কথা প্রকাশ করতে শেখে।
সকল শিল্পকলার মধ্যে কতকগুলি মূল বস্তু থাকে যেমন—বিন্দু, রেখা, রং, আকার, গতি বা ছন্দ, আলোছায়া গাঢ়-হালকার সম্পর্ক ইত্যাদি। এই সকলের মিলনেই হয় ছবি বা ভাস্কর্য। আর আছে মাধ্যম, অর্থাৎ কোন মাধ্যমে শিল্পসৃষ্টি হয়েছে। চিত্রকলার মাধ্যম হলো কালি-কলম, জল রং, প্যাস্টেল রং, তেল মিশ্রিত রং ইত্যাদি। ছোটদের জন্য প্যাস্টেল ও জল রং ব্যবহার করা সহজ হয়। বাংলাদেশে পুরাকালে জল রং দিয়েই ছবি আঁকত শিল্পীরা। পুরাতন পুঁথিতে তালপাতায় আঁকা ছবির বহু নিদর্শন আছে। বর্তমানেও জল রং অত্যন্ত প্রিয়, তবে এখন আর কেউ তালপাতায় আঁকে না, কাগজে আঁকে।
ভাস্কর্য। নরম মাটি দিয়ে কোনো কিছুর রূপ দেয়া বা শক্ত পাথর কেটে কোনো গড়ন বানানো। বিশেষ এক ধরনের ছাঁচ বানিয়ে গলিত মেটাল ঢেলে গড়ন বানানো, এই ধরনের কাজকে বলে ভাস্কর্য। আমাদের দেশে পোড়ামাটির ভাস্কর্য খুব প্রসিদ্ধ ছিল।
আমাদের সংস্কৃতি বা কালচার গড়ে উঠেছে নানান শিল্পকলার কারুকাজ দিয়ে। সকল শিল্পীর একটি দায়িত্ব আছে-দেশের ঐতিহ্যকে শ্রদ্ধা করা। বাংলায় একটি কথা আছে—'কালি কলম মন, লেখে তিন জন’—কালি মানে দেশের ঐতিহ্যে হাজার বছর প্রবাহিত কালি, কলম হলো শিল্পসৃষ্টির বর্তমান সরঞ্জাম, আর মন হলো বর্তমান যুগের সঙ্গে ঐতিহ্যের মিল করে নিজেকে প্রকাশ করার মন। একটি দেশকে জানা যায় দেশের মানুষকে জানা যায় তার শিল্পকলা চর্চার ধারা দেখে। শিল্পকলা চর্চা সকলের জন্য অপরিহার্য।
Related Question
View Allমুস্তাফা মনোয়ার ঝিনাইদহ জেলার মনোহরপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।
প্রয়োজন এবং অপ্রয়োজন মিলেই সৌন্দর্যের প্রকাশ ঘটে, মানুষের সৌন্দর্যের আশা পূর্ণ হয়।
আমরা আমাদের মনের চাহিদামাফিক জিনিসটি সুন্দর হিসেবেও পেতে চাই। সামান্য কাঁথা যেটি আমরা ব্যবহার করে থাকি, তা যদি নানা রকম নকশা তুলে নকশিকাঁথায় রূপান্তরিত করা হয় তখন এটির সৌন্দর্যের দিকেই আমরা বেশি মনোযোগী হই, প্রয়োজনের কথা মনেই থাকে না। প্রয়োজন শরীরকে তৃপ্ত করে, আর সৌন্দর্য তৃপ্ত করে আমাদের মনকে। এভাবেই প্রয়োজন আর অপ্রয়োজন মিলেই মানুষের সৌন্দর্যের আশা পূর্ণ হয়।
ক্যাম্পাসে মেহেরুন্নেসা শিল্পকলার ভাস্কর্যের দিকটি দেখছেন। চিত্রকলা, ভাস্কর্য, স্থাপত্য, সংগীত, নৃত্য, কবিতা সবকিছুর মধ্য দিয়েই সুন্দরকে প্রকাশ করা হয়। আর এই মাধ্যমগুলোই বিভিন্ন আঙ্গিকের শিল্পকলা।
উদ্দীপকে বর্ণিত মেহেরুন্নেসা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে নবীনবরণ অনুষ্ঠান শেষে বান্ধবীদের সাথে ক্যাম্পাসে ঘুরতে ঘুরতে কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির সামনে 'সংশপ্তক' ভাস্কর্য দেখতে পান। 'সংশপ্তক' অর্থ নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও যে সামনে এগিয়ে যায়। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বের কথা স্মরণ করেই সংশপ্তক নির্মিত হয়েছে। মুস্তাফা মনোয়ার 'শিল্পকলার নানা দিক' প্রবন্ধে এ ধরনের ভাস্কর্যের কথা বলেছেন। তিনি আমাদের দেশের বিভিন্ন ধরনের ভাস্কর্যের কথা বলেছেন। যেমন- শক্ত পাথর কেটে বানানো, গলিত মেলেট দিয়ে বানানো ও পোড়া মাটির ভাস্কর্য ইত্যাদি। উদ্দীপকের মেহেরুন্নেসা তেমনই একটি ভাষ্কর্য দেখেছেন, যার নাম সংশপ্তক।
"মেহেরুন্নেসার দেখা সংশপ্তকই শিল্পকলার প্রধান দিক"-মন্তব্যটি যথার্থ।
ভাস্কর্য শিল্পকলার একটি প্রধান দিক। ভাস্কর্য একটি দেশের ইতিহাস ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি ধারণ করে। বর্তমানে বিভিন্ন জিনিস দিয়ে ভাস্কর্য নির্মাণ করা হচ্ছে।
'শিল্পকলার নানা দিক' প্রবন্ধে লেখক মানুষের মনের সৌন্দর্য প্রকাশ করার বিভিন্ন মাধ্যমের কথা বলেছেন। এই মাধ্যমগুলোর একটি হচ্ছে ভাস্কর্য তৈরি। এক ধরনের ছাঁচ বানিয়ে গলিত মেটাল ঢেলে গড়ন বানানো, এই ধরনের কাজকে বলে ভাস্কর্য। আমাদের দেশে পোড়ামাটির ভাস্কর্য খুব প্রসিদ্ধ ছিল। সব শিল্পকলার মূল বস্তুর সমন্বয়ে তৈরি হয় এ ভাস্কর্য। এ জন্য ভাস্কর্য এত গুরুত্বপূর্ণ। উদ্দীপকে শিল্পকলার অন্যতম প্রধান এই দিকটিরই ইঙ্গিত করা হয়েছে। মেহেরুন্নেসা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক লাইব্রেরির সামনে মুক্তিযুদ্ধের ভাস্কর্য 'সংশপ্তক' প্রত্যক্ষ করেন; যা 'শিল্পকলার নানাদিক' প্রবন্ধে বর্ণিত শিল্পকলার প্রতিনিধিত্ব করে।
উদ্দীপকের মেহেরুন্নেসার দেখা 'সংশপ্তক' একটি ভাস্কর্য। 'শিল্পকলার নানা দিক' রচনায় যে শিল্পের কথা গুরুত্বের সাথে প্রকাশ করেছেন লেখক। তাই বলা যায় যে, প্রশ্নোক্ত মন্তব্যটি যথার্থ।
জগতের সৌন্দর্যের আনন্দ-ইতিহাস-ঐতিহ্য, দেশ ও মানুষ। সম্পর্কে জানার জন্য শিল্পকলা চর্চা সকলের পক্ষে অপরিহার্য।
ভুবনে যে আনন্দধারা প্রবাহিত হচ্ছে তাতে শিল্পকলার মূল সত্যটি প্রকাশিত। সব মানুষই জীবনের এ আনন্দকে পাওয়ার জন্য ব্যাকুল। কারণ আনন্দ প্রকাশ মানুষের জীবনীশক্তির প্রবলতারই প্রকাশ। এছাড়াও দেশ ও দেশের মানুষকে জানা যায় শিল্পকলার চর্চা দেখে। এ বিবেচনায় শিল্পকলা চর্চা সকলের পক্ষে অপরিহার্য।
উদ্দীপকের ললিতকলা বলতে 'শিল্পকলার নানা দিক' প্রবন্ধের শিল্পকলার বিষয়টিকে নির্দেশ করা হয়েছে।
প্রয়োজন পূরণ হলেই মানুষের আকাঙ্ক্ষা শেষ হয়ে যায় না। মানুষ প্রয়োজন মেটানোর জন্য যা ব্যবহার করে তা থেকে মনের আনন্দও পেতে চায়। কারণ সৌন্দর্য উপভোগ করার ইচ্ছা মানুষের স্বভাবগত।
উদ্দীপকে ললিতকলার কথা প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, সৃষ্টির মধ্যে মানুষের প্রয়োজন সাধন অপেক্ষা অহেতুক আনন্দ বেশি, মানুষের জৈব অপেক্ষা আত্মিক ও মানসিক আনন্দ সৃষ্টি বেশি। 'শিল্পকলার নানা দিক' প্রবন্ধেও প্রকাশ পেয়েছে প্রয়োজনের কাজ মিটল তো শরীরকে তৃপ্ত করল, আর প্রয়োজনের বাইরে যে সুন্দর তা মনকে তৃপ্ত করল। এভাবে উদ্দীপকের বিষয়টির প্রতিফলন লক্ষ করা যায় প্রবন্ধে। তাই বলতে পারি যে, উদ্দীপকের ললিতকলা বলতে প্রবন্ধের শিল্পকলার বিষয়টিকে নির্দেশ করা হয়েছে।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!