শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে (বিশেষত বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে) এবং বিভিন্ন জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে।
দর্শন হলো জ্ঞান ও জীবনের মৌলিক প্রশ্নগুলো নিয়ে যুক্তিপূর্ণ ও পদ্ধতিগত অধ্যয়ন। এর চর্চা মূলত উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যেমন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে হয়ে থাকে, যেখানে শিক্ষার্থীরা দার্শনিক তত্ত্ব, ইতিহাস এবং যুক্তিবিদ্যা নিয়ে পড়াশোনা করে। এছাড়া, সমাজের বুদ্ধিজীবী মহল, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং চিন্তাবিদদের ব্যক্তিগত বা সম্মিলিত আলোচনা ও লেখায়ও দর্শনের চর্চা হয়। এটি মানব অস্তিত্ব, মূল্যবোধ, জ্ঞান, যুক্তি, ভাষা এবং মন-মস্তিষ্কের সম্পর্ক নিয়ে গভীর অনুসন্ধান চালায়।
“সুশিক্ষিত লোকমাত্রই স্বশিক্ষিত”—উক্তিটির মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে যে প্রকৃত অর্থে শিক্ষিত হতে হলে কেবল প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি বা পাঠ্যপুস্তকের জ্ঞান যথেষ্ট নয়; বরং নিজের আগ্রহ, প্রচেষ্টা এবং অনুসন্ধিৎসার মাধ্যমে অর্জিত জ্ঞানই মানুষকে সুশিক্ষিত করে তোলে। স্বশিক্ষা হলো শিক্ষার মূল ভিত্তি, যা ব্যক্তিকে স্বাধীন চিন্তাভাবনা ও জ্ঞানার্জনের পথে পরিচালিত করে।
সুশিক্ষা বলতে কেবল কিছু তথ্য মুখস্থ করা বা পরীক্ষায় ভালো ফল করাকে বোঝায় না। সুশিক্ষা মানুষের মনন, নৈতিকতা ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশকে পরিপূর্ণ করে তোলে। এটি মানুষকে আত্মনির্ভরশীল, বিচক্ষণ এবং যুক্তিবাদী হতে শেখায়। এই সুশিক্ষা অর্জন সম্ভব হয় যখন ব্যক্তি তার চারপাশের জগৎ সম্পর্কে কৌতূহলী হয়, নতুন কিছু জানার আগ্রহ পোষণ করে এবং সে জ্ঞান অর্জনের জন্য নিজের উদ্যোগে বিভিন্ন উৎস থেকে শেখে। এখানেই স্বশিক্ষার গুরুত্ব।
প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা জ্ঞানার্জনের একটি সুনির্দিষ্ট পথ তৈরি করে দেয় এবং কিছু মৌলিক বিষয় সম্পর্কে ধারণা দেয়। কিন্তু এই পথে পাওয়া জ্ঞানকে আরও গভীরে নিয়ে যাওয়া এবং জীবনের বাস্তবতার সঙ্গে সংযুক্ত করার কাজটি ব্যক্তিকেই করতে হয়। যে ব্যক্তি শুধু পাঠ্যপুস্তকনির্ভর থাকে এবং পরীক্ষায় ভালো ফল করাকেই শিক্ষার শেষ কথা মনে করে, সে হয়তো শিক্ষিত হয় কিন্তু সুশিক্ষিত হতে পারে না। সুশিক্ষিত ব্যক্তিরা জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্র থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেন, প্রশ্ন করেন, বিশ্লেষণ করেন এবং নিজেদের অর্জিত জ্ঞানকে সমাজের কল্যাণে কাজে লাগান।
প্রতিভা বিকাশ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শিক্ষার্থীদের পাঠ্যপুস্তকের বাইরে জীবনমুখী বই পড়ার কথা বলে এই স্বশিক্ষার গুরুত্বকেই তুলে ধরেছেন। সাহিত্য মানুষের মনকে সুন্দর করে এবং সুন্দর মনের মানুষেরাই জ্ঞানী হন—এই কথাটিও স্বশিক্ষার ধারণাকে সমর্থন করে। মাইশার মায়ের মতো অনেকে মনে করেন পরীক্ষায় ভালো ফল করাই আসল, কিন্তু কেবল পরীক্ষার ফলের পেছনে ছুটলে জীবনের সামগ্রিক জ্ঞানার্জন ব্যাহত হয়। প্রকৃত সুশিক্ষা আত্ম-অনুসন্ধান ও স্বচেষ্টায় অর্জিত হয়, যা মানুষকে জীবনে সফল ও সার্থক করে তোলে।
সুতরাং, একজন ব্যক্তি তখনই সত্যিকারের শিক্ষিত হিসেবে পরিগণিত হয় যখন সে নিজের চেষ্টায় জ্ঞান আহরণ করে, নিজের চিন্তাশক্তিকে বিকশিত করে এবং অর্জিত জ্ঞানকে জীবনে প্রয়োগ করতে সক্ষম হয়।
উদ্দীপকের মাইশার মায়ের মধ্যে বই পড়ার প্রতি উপযোগবাদী বা ব্যবহারিক দৃষ্টিভঙ্গি ফুটে উঠেছে, যা 'বইপড়া' প্রবন্ধে প্রমথ চৌধুরী তীব্রভাবে সমালোচনা করেছেন।
মাইশার মা মনে করেন, বই পড়ার মূল উদ্দেশ্য হলো পরীক্ষায় ভালো ফলাফল অর্জন করা। পাঠ্যপুস্তকের বাইরে অন্যান্য জীবনমুখী বা সাহিত্যমূলক বই পড়াকে তিনি অপ্রয়োজনীয় মনে করেন এবং ধমক দিয়ে মাইশাকে তা থেকে বিরত থাকতে বলেন। এটি সেই সংকীর্ণ মানসিকতার প্রতিফলন যেখানে জ্ঞান অর্জনের চেয়ে পরীক্ষার নম্বরকেই অধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়।
প্রমথ চৌধুরী তাঁর 'বইপড়া' প্রবন্ধে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, শিক্ষা ব্যবস্থার ত্রুটির কারণে শিক্ষার্থীরা শুধুমাত্র পরীক্ষার পাসের জন্য বই পড়ে। তিনি এই অবস্থাকে "পরীক্ষার দাস" হওয়ার সাথে তুলনা করেছেন। প্রবন্ধের মতে, বই পড়ার মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত জ্ঞান ও আনন্দ লাভ করা, মনের বিকাশ ঘটানো এবং উদার দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী হওয়া। উদ্দীপকের মাইশার মায়ের মনোভাব সেই গতানুগতিক শিক্ষা পদ্ধতিরই অংশ, যা মনের স্বাধীনতাকে খর্ব করে এবং প্রকৃত জ্ঞানার্জনের পথকে রুদ্ধ করে। তিনি প্রমথ চৌধুরীর ধারণার বিপরীত মেরুতে অবস্থান করেন, যেখানে লাইব্রেরিকে মানুষের মনকে সজীব রাখার জন্য একটি অত্যাবশ্যকীয় উপাদান হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।
উদ্দীপকের প্রধান শিক্ষকের চিন্তা ও কর্ম 'বইপড়া' প্রবন্ধের মূল প্রতিপাদ্যকে ধারণ করে। প্রমথ চৌধুরী রচিত 'বইপড়া' প্রবন্ধে তিনি জ্ঞানার্জনের ক্ষেত্রে পাঠ্যপুস্তকের বাইরে অন্যান্য বই পড়ার গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। উদ্দীপকের প্রধান শিক্ষক শিক্ষার্থীদের শুধু পাঠ্যপুস্তক নয়, বরং জীবনমুখী বই-পুস্তক পড়তে উৎসাহিত করেন, যা প্রবন্ধের লেখকের ভাবনার সাথে হুবহু মিলে যায়।
প্রমথ চৌধুরী 'বইপড়া' প্রবন্ধে দেখিয়েছেন যে, মানুষ কেবল পরীক্ষায় পাসের জন্য বা ডিগ্রির লোভে বই পড়লে তা থেকে প্রকৃত জ্ঞান বা আনন্দ লাভ করে না। তাঁর মতে, স্বেচ্ছাপূর্বক বইপড়া-ই পারে মানুষের মনের দিগন্ত প্রসারিত করতে এবং তাকে প্রকৃত জ্ঞানী করে তুলতে। সাহিত্য পাঠের মাধ্যমে মানুষের মন সুন্দর হয়, রুচি তৈরি হয় এবং মানুষ উদার মানসিকতার অধিকারী হয়। তিনি শিক্ষার উদ্দেশ্যকে শুধু কর্মসংস্থান বা পরীক্ষা পাসের সংকীর্ণ গণ্ডি থেকে মুক্ত করে ব্যাপক অর্থে মানুষের আত্মিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের উপর জোর দিয়েছেন।
উদ্দীপকে দেখা যায়, প্রতিভা বিকাশ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শিক্ষার্থীদেরকে পাঠ্যপুস্তকের বাইরে অন্যান্য জীবনমুখী বই পড়ার জন্য উৎসাহিত করছেন। তিনি স্পষ্টতই বলছেন যে, "সাহিত্য মানুষের মনকে সুন্দর করে। আর সুন্দর মনের মানুষেরা জ্ঞানী হয়।" প্রধান শিক্ষকের এই উক্তিটি প্রমথ চৌধুরীর প্রবন্ধের মূল বার্তার প্রতিধ্বনি। মাইশার মায়ের মতো যারা কেবল পরীক্ষার ফলাফলের উপর জোর দেন, তারা শিক্ষকের এই মহৎ উদ্দেশ্যকে বুঝতে পারেন না। প্রধান শিক্ষক যেন প্রমথ চৌধুরীর শিক্ষাদর্শের একজন মূর্ত প্রতীক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন, যিনি শিক্ষার্থীদের প্রকৃত জ্ঞানার্জনের পথ দেখাচ্ছেন।
সুতরাং, এই মন্তব্যটি যথার্থ যে, উদ্দীপকের প্রধান শিক্ষক যেন 'বইপড়া' প্রবন্ধের লেখকের সার্থক প্রতিনিধি, যিনি প্রচলিত পরীক্ষা-কেন্দ্রিক শিক্ষার বিপরীতে উদার ও আত্মিক বিকাশের জন্য বই পড়ার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন এবং তা প্রচারে উদ্যোগী হন।
Related Question
View All১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!