প্রবন্ধ রচনা করুন: 'সুনীল অর্থনীতি ও বাংলাদেশ।'

Updated: 4 hours ago
উত্তরঃ

সুনীল অর্থনীতি ও বাংলাদেশ

ভূমিকা: একুশ শতকের বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও টেকসই সমৃদ্ধির অন্যতম অপার সম্ভাবনাময় দিগন্ত হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে সুনীল অর্থনীতি বা বু-ইকোনমি (Blue Economy) । প্রথাগত স্থলভিত্তিক সম্পদের সীমাবদ্ধতা, দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি, ভূমির তীব্র সংকট এবং পরিবেশগত বিপর্যয়ের এই যুগে সমুদ্রই হয়ে উঠছে মানবসভ্যতার টেকসই ভবিষ্যতের প্রধান আধার। ভৌগোলিক অবস্থান, ৭২৪ কিলোমিটার দীর্ঘ তটরেখা এবং বঙ্গোপসাগরের প্রাচুর্যময় প্রাকৃতিক সম্পদ বাংলাদেশকে সুনীল অর্থনীতির সুবিধা গ্রহণের এক অনন্য কৌশলগত অবস্থানে দাঁড় করিয়েছে। রূপকল্প ২০৪১ বাস্তবায়ন, জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন এবং বাংলাদেশকে একটি বিশ্বমানের উন্নত ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্রে পরিণত করার প্রক্রিয়ায় সমুদ্রসম্পদভিত্তিক এই অর্থনীতির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সুনীল অর্থনীতি (Blue Economy): সংজ্ঞা ও ধারণা সুনীল অর্থনীতি বা Blue Economy হলো সমুদ্রের অপার সম্পদ ও সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে টেকসই উপায়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন করাই হলো সুনীল অর্থনীতি। তবে কেবল সম্পদ আহরণই এর একমাত্র লক্ষ্য নয়; বরং সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের (Marine Ecosystem) ভারসাম্য ও স্বাস্থ্য রক্ষা করে সমুদ্রকে অর্থনৈতিক অগ্রগতির ইঞ্জিনে রূপান্তর করাই সুনীল অর্থনীতির মূল দর্শন। ২০১৪ সালে সমুদ্রসীমা জয়ের পর বাংলাদেশের জন্য সুনীল অর্থনীতির এক বিশাল দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে। বঙ্গোপসাগরের ১,১৮,৮১৩ বর্গকিলোমিটার এলাকায় বাংলাদেশের একছত্র অধিকার রয়েছে। সুনীল অর্থনীতির প্রধান উপাদানগুলো হলো: সমুদ্র থেকে তেল-গ্যাস ও খনিজ সম্পদ (যেমন: ব্ল‍্যাক গোল্ড বা মোনাজাইট) আহরণ, সামুদ্রিক মৎস্য চাষ ও গভীর সমুদ্রে ব্লু-বায়োটেকনোলজি ব্যবহার, পরিবেশবান্ধব শিপিং বা জাহাজ চলাচল, আন্তর্জাতিক নৌ-বাণিজ্যের বন্দর সুবিধা বৃদ্ধি এবং সমুদ্র উপকূলীয় পর্যটন বা ইকো-ট্যুরিজম বিকাশ। এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যতের অন্যতম অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি।

বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান ও বিশাল সামুদ্রিক সীমানা: বাংলাদেশের দক্ষিণাংশে অবস্থিত বঙ্গোপসাগর কেবল একটি সুবিশাল জলাশয় নয়, এটি বাংলাদেশের জন্য এক আশীর্বাদপুষ্ট আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক করিডোর। ভারতের সাথে ২০১৪ সালে এবং মিয়ানমারের সাথে ২০১২ সালে আন্তর্জাতিক সালিসি আদালতের ঐতিহাসিক রায়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ বঙ্গোপসাগরে তার সুনির্দিষ্ট ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে। এই রায়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ সমুদ্র উপকূলে ১২ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট টেরিটোরিয়াল অর্জন করেছে। এর পাশাপাশি উপকূল হতে ২০০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত ১,১৮,৮১৩ বর্গকিলোমিটার বিস্তৃত বিশাল একচ্ছত্র অর্থনৈতিক অঞ্চল (EEZ) অর্জিত হয়েছে। চট্টগ্রাম উপকূল থেকে ৩৫৪ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত মহীসোপান-এর তলদেশে অবস্থিত সমস্ত অণুজীবাশ্ম, খনিজ ও প্রাণিজ সম্পদের ওপর বাংলাদেশের একচ্ছত্র আইনগত অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই বিশাল অর্জন বাংলাদেশকে মূল ভূখণ্ডের মোট আয়তনের (১,৪৭,৫৭০ বর্গকিমি) প্রায় ৮১ শতাংশের সমপরিমাণ একটি দ্বিতীয় বাংলাদেশ বা নীল ভূখণ্ড উপহার দিয়েছে, যা মূল ভূখণ্ডের ভূমিনির্ভর চাপ কমিয়ে নতুন অর্থনৈতিক দিগন্তের জন্ম দিয়েছে।

বাংলাদেশে সুনীল অর্থনীতির প্রধান খাতসমূহ:

বঙ্গোপসাগরের সুবিশাল সমুদ্রসীমায় বিস্তৃত রয়েছে বৈচিত্র্যময় সম্পদ। বাংলাদেশে সুনীল অর্থনীতির সম্ভাবনা যেসব মূল খাতের ওপর প্রতিষ্ঠিত, তা নিচে আলোচনা করা হলো

ক. সামুদ্রিক মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ : বাংলাদেশের জাতীয় অর্থনীতি ও মানুষের পুষ্টির চাহিদায় মৎস্য খাতের অবদান অপরিসীম। বঙ্গোপসাগরে প্রায় ৪৭৫ প্রজাতির মাছ, ২০ প্রজাতির চিংড়ি, ৫০ প্রজাতির কাঁকড়া এবং বহু মূল্যবান সামুদ্রিক প্রাণীর বাস। বঙ্গোপসাগরের অর্থনৈতিক অঞ্চলে আধুনিক প্রযুক্তির অভাব ও গভীর সমুদ্রে মাছ ধরার সক্ষমতা কম থাকায় আমরা এখনো প্রধানত অগভীর সমুদ্রের ওপর নির্ভর করি। আধুনিক ট্রলার ও লং-লাইনিং প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে গভীর সমুদ্র থেকে টুনা ও অন্যান্য মূল্যবান মাছ আহরণ করে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব।

খ. অফশোর খনিজ সম্পদ ও জ্বালানি: বঙ্গোপসাগরের তলদেশ প্রাকৃতিক গ্যাস ও তেলের সমৃদ্ধ ভাণ্ডার বলে চিহ্নিত। অগভীর ও গভীর সমুদ্রে বহু গ্যাস ব্লক রয়েছে, যা থেকে তেল-গ্যাস উত্তোলনের অপার সম্ভাবনা বিদ্যমান। এছাড়া সমুদ্রের বালুচর ও তলদেশে জিরকন, রুটাইল, ইলমেনাইট, মোনাজাইট ও ম্যাগনেটাইটের মতো অত্যন্ত মূল্যবান তেজস্ক্রিয় ও ভারী খনিজ উপাদানের সমৃদ্ধ মজুত রয়েছে, যা জাতীয় শিল্পখাতে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।

গ. শিপিং, পোর্ট অবকাঠামো ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য: বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রায় ৯০ শতাংশেরও বেশি সম্পন্ন হয় সমুদ্রপথে। চট্টগ্রাম, মংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরের পাশাপাশি নির্মিত মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর অঞ্চলটিকে একটি প্রধান আঞ্চলিক অর্থনৈতিক হাব (Hub)-এ পরিণত করেছে। নিজস্ব বাণিজ্য জাহাজের সংখ্যা বাড়ানো এবং সমুদ্র বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে প্রতি বছর বিলিয়ন ডলার সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় ও আয় করা সম্ভব।

ঘ . জাহাজ নির্মাণ ও শিপ ব্রেকিং শিল্প: আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে বাংলাদেশে ছোট ও মাঝারি আকারের আধুনিক জাহাজ তৈরি হয়ে ইউরোপ ও এশিয়ায় রপ্তানি হচ্ছে। অন্যদিকে, বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শিপ ব্রেকিং বা জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প বাংলাদেশে গড়ে উঠেছে, যা দেশের রড-ইস্পাত শিল্পের কাঁচামালের প্রায় ৬০-৭০% সরবরাহ করে। এই খাতকে সবুজ প্রযুক্তিবান্ধব করে তুললে তা সুনীল অর্থনীতিকে ত্বরান্বিত করবে।

ঙ. নবায়নযোগ্য সামুদ্রিক শক্তি: উপকূলীয় ৭২৪ কিলোমিটার দীর্ঘ অঞ্চলজুড়ে অফশোর বায়ুবিদ্যুৎ এবং জোয়ার-ভাটার তরঙ্গ শক্তি কাজে লাগিয়ে প্রচুর নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। এটি জ্বালানি নিরাপত্তায় অবদান রাখার সাথে সাথে কার্বন নির্গমন কমাতেও ভূমিকা রাখবে।

চ. সামুদ্রিক পর্যটন ও পরিবেশবান্ধব ইকো-ট্যুরিজম: বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক বালুকাময় সমুদ্র সৈকত কক্সবাজার, সুন্দরবন, সেন্টমার্টিন প্রবাল দ্বীপ এবং কুয়াকাটাকে কেন্দ্র করে সামুদ্রিক পর্যটনের অপার সম্ভাবনা রয়েছে। আধুনিক ক্রুজ শিপ চালু, স্কুবা ডাইভিং, সার্ফিং ও ওয়াটার বাইকিংয়ের মতো ওয়াটার স্পোর্টসের অবকাঠামো গড়ে তুলে আন্তর্জাতিক ও দেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করা সম্ভব।

ছ . ব্লু-বায়োটেকনোলজি ও সামুদ্রিক শৈবাল চাষ: সামুদ্রিক শৈবাল চাষ অত্যন্ত লাভজনক একটি খাত, যার আন্তর্জাতিক বাজারে ওষুধ, কসমেটিকস ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্য হিসেবে প্রচুর চাহিদা রয়েছে। দেশের কক্সবাজার ও সেন্টমার্টিন উপকূলে এর বাণিজ্যিক চাষ শুরু হয়েছে, যা উপকূলের নারীদের আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে। পাশাপাশি সামুদ্রিক অণুজীবাশ্ম ও শৈবাল থেকে জীবন রক্ষাকারী ওষুধ তৈরির জন্য গবেষণাগার স্থাপন এখন সময়ের দাবি।

সুনীল অর্থনীতির সম্ভাব্য অর্থনৈতিক প্রভাব ও গুরুত্ব:

বাংলাদেশ একটি ঘনবসতিপূর্ণ দেশ, যেখানে ভূমিনির্ভর প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর প্রচণ্ড চাপ তৈরি হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে সুনীল অর্থনীতি বাংলাদেশের জন্য কেবল একটি বিকল্প খাত নয়, বরং ভবিষ্যতের মূল চালিকাশক্তি।

জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে অবদান : সুনীল অর্থনীতি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির একটি সম্ভাবনাময় চালিকাশক্তি। বিশ্বব্যাংক ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার মতে, সমুদ্রসম্পদের টেকসই ও বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে দেশের জিডিপিতে এর অবদান উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। মৎস্যসম্পদ, সমুদ্রবন্দর, নৌপরিবহন, সামুদ্রিক পর্যটন, অফশোর জ্বালানি এবং জাহাজ নির্মাণ শিল্পের উন্নয়নের মাধ্যমে উৎপাদন ও রপ্তানি আয় বৃদ্ধি পাবে। পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং দীর্ঘমেয়াদি টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত হবে।

বিশাল কর্মসংস্থান সৃষ্টি: সুনীল অর্থনীতির বিকাশের মাধ্যমে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বিপুল কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা সম্ভব। মৎস্য আহরণ ও চাষ, সামুদ্রিক খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, নৌপরিবহন, জাহাজ নির্মাণ ও মেরামত, সামুদ্রিক পর্যটন এবং সামুদ্রিক জীবপ্রযুক্তির মতো খাতে লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হতে পারে। বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলের যুবসমাজের জন্য নতুন আয়ের উৎস তৈরি হবে, যা বেকারত্ব ও দারিদ্র্য হ্রাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এবং দক্ষ মানবসম্পদ গঠনে সহায়তা করবে।

খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা সুনিশ্চিতকরণ: বাংলাদেশের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সুনীল অর্থনীতির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বঙ্গোপসাগরের বিপুল মৎস্যসম্পদ, সামুদ্রিক শৈবাল, শামুক ও অন্যান্য জলজ সম্পদের টেকসই ব্যবহার দেশের প্রাণিজ প্রোটিনের চাহিদা পূরণে সহায়ক হবে। এর ফলে অপুষ্টি হ্রাস, জনগণের পুষ্টিমান উন্নয়ন এবং খাদ্য নিরাপত্তা জোরদার হবে। পাশাপাশি সামুদ্রিক খাদ্য রপ্তানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের নতুন সুযোগও সৃষ্টি হবে।

জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ: বঙ্গোপসাগরের অফশোর এলাকায় প্রাকৃতিক গ্যাস, তেল ও অন্যান্য খনিজ সম্পদের সম্ভাবনা বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এসব সম্পদের সুষ্ঠু অনুসন্ধান ও উত্তোলন দেশের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা পূরণে সহায়তা করবে, আমদানিনির্ভরতা কমাবে এবং বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করবে। একই সঙ্গে শিল্পায়ন ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করবে।

বাংলাদেশে সুনীল অর্থনীতি বাস্তবায়নের প্রধান প্রধান চ্যালেঞ্জসমূহ:

সুনীল অর্থনীতির সম্ভাবনা যতটাই চোখধাঁধানো হোক না কেন, তা বাস্তবায়নে বাংলাদেশে বেশ কিছু অবকাঠামোগত, প্রযুক্তিগত ও পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ রয়েছে:

প্রযুক্তি ও আধুনিক গবেষণা নৌযানের ঘাটতি: সুনীল অর্থনীতির কার্যকর বাস্তবায়নের অন্যতম প্রধান বাধা হলো আধুনিক প্রযুক্তি ও গবেষণা অবকাঠামোর ঘাটতি। গভীর সমুদ্রে ত্রিমাত্রিক (3D) সিজমিক সার্ভে, সমুদ্রতল মানচিত্রায়ন, অফশোর তেল-গ্যাস অনুসন্ধান এবং গভীর সমুদ্রে মৎস্য আহরণের জন্য অত্যাধুনিক গবেষণা নৌযান ও প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম অপরিহার্য। কিন্তু বাংলাদেশে এ ধরনের উন্নত গবেষণা জাহাজ, ল্যাবরেটরি এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এখনও সীমিত। ফলে সমুদ্রসম্পদের প্রকৃত সম্ভাবনা নিরূপণ, বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং টেকসই ব্যবস্থাপনা ব্যাহত হচ্ছে।

বিশেষায়িত ও দক্ষ জনবলের অভাব: সুনীল অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে দক্ষ মানবসম্পদের অভাব বাংলাদেশের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ওশেনোগ্রাফি, হাইডোগ্রাফি, মেরিন ইকোসিস্টেম, অফশোর ইঞ্জিনিয়ারিং, সামুদ্রিক জীবপ্রযুক্তি এবং আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইন বিষয়ে প্রশিক্ষিত বিশেষজ্ঞের সংখ্যা এখনও খুবই সীমিত। ফলে সমুদ্রসম্পদ অনুসন্ধান, গবেষণা, সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনায় বিদেশি বিশেষজ্ঞের ওপর নির্ভরশীলতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ খাতের টেকসই উন্নয়নের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং কারিগরি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ জনবল গড়ে তোলা অপরিহার্য।

সামুদ্রিক দূষণ ও বাস্তুতন্ত্রের সংকট: প্লাস্টিক ও পলিথিন বর্জ্য, শিল্পকারখানার রাসায়নিক বর্জ্য, অপরিশোধিত পয়ঃবর্জ্য এবং জাহাজের তেল বঙ্গোপসাগরে নিঃসৃত হয়ে সামুদ্রিক পরিবেশের জন্য গুরুতর হুমকি সৃষ্টি করছে। এর ফলে মাছ, প্রবাল প্রাচীর, ম্যানগ্রোভ বন এবং অন্যান্য সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সামুদ্রিক দূষণ শুধু পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করে না, বরং মৎস্যসম্পদ, পর্যটন এবং উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জীবিকাকেও ঝুঁকির মুখে ফেলে। তাই কার্যকর দূষণ নিয়ন্ত্রণ ও পরিবেশ সংরক্ষণ সুনীল অর্থনীতির পূর্বশর্ত।

অবৈধ ও অনিয়ন্ত্রিত মৎস্য আহরণ: অবৈধ, অনিয়ন্ত্রিত ও অনিবন্ধিত মৎস্য আহরণ বাংলাদেশের সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদের জন্য একটি বড় হুমকি। নিষিদ্ধ জাল ব্যবহার, প্রজনন মৌসুমে মা মাছ নিধন এবং বিদেশি ট্রলারের অবৈধ অনুপ্রবেশের কারণে মাছের প্রাকৃতিক প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে এবং মৎস্যসম্পদের মজুত দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। এর ফলে জেলেদের জীবিকা, খাদ্য নিরাপত্তা এবং সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ সমস্যা মোকাবিলায় কঠোর আইন প্রয়োগ, আধুনিক নজরদারি ব্যবস্থা এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদার করা প্রয়োজন।

জলবায়ু পরিবর্তনের মারাক প্রভাব: জলবায়ু পরিবর্তন বাংলাদেশের সুনীল অর্থনীতির জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি ও বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধি, সমুদ্রের অম্লায়ন এবং ঘন ঘন ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস উপকূলীয় অবকাঠামো, মৎস্যসম্পদ এবং সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এর ফলে উপকূলীয় জনগণের জীবিকা, খাদ্য নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ব্যাহত হচ্ছে। তাই জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণ, দুর্যোগ মোকাবিলা এবং টেকসই সম্পদ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।

উত্তরণের উপায় ও সুপারিশমালা:

সুনীল অর্থনীতির সম্ভাবনাকে শতভাগ বাস্তবে রূপ দিতে হলে দ্রুত ও সুপরিকল্পিত পদক্ষেপ গ্রহণ প্রয়োজন:

সমন্বিত সামুদ্রিক জরিপ ও মেরিন স্পেশাল প্ল্যানিং: সুনীল অর্থনীতির কার্যকর বাস্তবায়নের জন্য বঙ্গোপসাগরের তলদেশে বিদ্যমান প্রাণিজ ও অপ্রাণিজ সম্পদের সঠিক পরিমাণ, অবস্থান ও সম্ভাবনা নিরূপণ জরুরি। এজন্য আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে সমন্বিত Marine Spatial Planning (MSP), 3D সিজমিক সার্ভে এবং নিয়মিত সমুদ্র গবেষণা পরিচালনা করতে হবে। নির্ভরযোগ্য তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনা সম্পদ আহরণ, সংরক্ষণ ও টেকসই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করবে।

প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামোর উন্নয়ন: গভীর সমুদ্রে মৎস্য আহরণ, অফশোর তেল-গ্যাস অনুসন্ধান এবং সামুদ্রিক গবেষণার জন্য উন্নত প্রযুক্তি ও আধুনিক অবকাঠামো গড়ে তোলা অপরিহার্য। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের মাধ্যমে উন্নত দেশগুলোর প্রযুক্তি স্থানান্তর নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি গবেষণা নৌযান, আধুনিক ল্যাবরেটরি এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করে সমুদ্রসম্পদের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।

দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি: সুনীল অর্থনীতির টেকসই উন্নয়নের জন্য দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা অপরিহার্য। দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ওশেনোগ্রাফি, মেরিন বায়োলজি, অফশোর ইঞ্জিনিয়ারিং এবং আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইন বিষয়ে শিক্ষা ও গবেষণায় অধিক বিনিয়োগ করতে হবে। পাশাপাশি প্রশিক্ষণ, বৃত্তি এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে দক্ষ পেশাজীবী তৈরি করতে হবে।

আইন প্রয়োগ ও সামুদ্রিক সুরক্ষা: সামুদ্রিক সম্পদের টেকসই ব্যবহার নিশ্চিত করতে অবৈধ মৎস্য আহরণ, দূষণ ও সামুদ্রিক অপরাধ কঠোরভাবে দমন করতে হবে। এজন্য কোস্ট গার্ড ও বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি, আধুনিক নজরদারি প্রযুক্তির ব্যবহার এবং সামুদ্রিক আইন কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন জরুরি। পাশাপাশি Marine Protected Area (MPA) সম্প্রসারণ ও যথাযথ সংরক্ষণ সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

টেকসই অর্থায়ন ও বেসরকারি বিনিয়োগ সম্প্রসারণ: সুনীল অর্থনীতিতে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে সহজ শর্তে ঋণ, কর প্রণোদনা এবং স্বল্পসুদে অর্থায়নের ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে সমুদ্রভিত্তিক টেকসই প্রকল্পে অর্থায়নের জন্য Blue Bond ও Green Financing চালু করা প্রয়োজন। এতে পরিবেশবান্ধব শিল্প, সামুদ্রিক পর্যটন, মৎস্য ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাবে এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হবে।

আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদার: সামুদ্রিক নিরাপত্তা, সম্পদ সংরক্ষণ ও টেকসই ব্যবহারের জন্য আঞ্চলিক সহযোগিতা অপরিহার্য। ভারত, মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কাসহ BIMSTEC- ভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে গবেষণা, প্রযুক্তি বিনিময়, যৌথ টহল এবং তথ্য আদান-প্রদান জোরদার করতে হবে। এ ধরনের সহযোগিতা অবৈধ মৎস্য আহরণ প্রতিরোধ, সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং সমুদ্রসম্পদের টেকসই ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

উপসংহার: পাহাড় ও সমতলের ভূমিপ্রধান বাংলাদেশ আজ সমুদ্রের দিকে মুখ ফিরিয়ে ডানা মেলতে প্রস্তুত। প্রথাগত অর্থনীতির সীমানা ছাড়িয়ে নীল জলরাশির অসীম সম্ভাবনাকে জয় করাই একুশ শতকের বাংলাদেশের মূল অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ ও সুযোগ। ভৌগোলিক সীমানা জয়ের পর এখন সময় এসেছে সমুদ্রের অর্থনৈতিক জয় সুনিশ্চিত করার। সময়োপযোগী পলিসি, আধুনিক প্রযুক্তির সংযোজন, সঠিক মূলধন বিনিয়োগ এবং পরিবেশগত ভারসাম্য বজায় রেখে এগোতে পারলে সুনীল অর্থনীতিই হবে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির মূল ভিত্তি। রূপকল্প ২০৪১ বাস্তবায়ন ও একটি স্বনির্ভর উন্নত বাংলাদেশ গঠনে বঙ্গোপসাগরের নীল জলরাশিই লিখবে সমৃদ্ধির নতুন ইতিহাস।

2

Related Question

View All
উত্তরঃ

একজন লেখক তিনিই যিনি লেখেন। তবে সব লেখা লিখেই লেখক হওয়া যায় না। লেখক সব ধরনের হতে পারে। তবে সৃজনশীল লেখকই হচ্ছে আমাদের মূল কেন্দ্রবিন্দু। লেখক হচ্ছে পৃথিবীর অন্যতম একটি স্বাধীন সত্ত্বা।

একজন লেখক পুরোপুরি তার নিজের সত্ত্বার ওপরে বেঁচে থাকে। অনেকেই লেখক হবার সহজ উপায় খোঁজ করে। কিন্তু পড়তে পড়তে আর লিখতে লিখতেই শুধুমাত্র লেখক হওয়া যায়। এছাড়া আর কোনো উপায় নেই। লেখক অনেক ধরনের হতে পারে।

একজন সাংবাদিকও একজন লেখক। উপন্যাস, গল্প, কবিতা, ছড়া, সাহিত্য, প্রবন্ধ, রম্য, ব্লগ সব ধরনের লেখা যারা লেখে তারাই লেখক। অনেকেই মস্তিষ্কের মধ্যে ওকটা লেখার শক্তি পেয়ে যায় আর অনেকে হয়ত শিখে শিখে লেখক হয়।

সমাজ সভ্যতা কখনোই পুরোপুরি একজন লেখকের পক্ষে থাকে না। বরং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বিপক্ষে চলে যায়। স্বাভাবিকভাবেই একজন লেখক তার কলমের আঘাতে জর্জরিত করতে চায় সকল অন্যায়, অপবাদ। তাই হয়ত বেঁধে যেতে পারে সংঘাত। কলমই হচ্ছে একজন লেখকের দাঁড়ানোর জায়গা। কলম ছাড়া লেখকের অস্তিত্ব বিলীন। তবে সবাইকে যে প্রতিবাদ লিখতে হবে এমন কোনো কথা। কেউ কেউ মনোরঞ্জনের জন্যও লেখে। অনেকে আবার চাটুকারিতা করতে লেখে। কেউ আবার কীভাবে পুরষ্কার তুলে নেওয়া যায় সেই ধান্দা করার জন্য লেখে।

একজন লেখক হয়ে উঠতে পারে ন্যায় অন্যায়ের পার্থক্যকারী। সে কলমের ছোঁয়ায় প্রতিবাদ করতে অন্যায়ের আর ফুটিয়ে তুলবে ন্যায়ের কথা। লেখকের কলমের কালি প্রেরণার সুর হয়ে গান গাইবে। আর অশ্রুসিক্ত নয়নে হাসির ঝলক আনবে লেখকের কলম। একজন লেখকের প্রাণ তার লেখা, তার লেখার ভঙ্গি। সে তার লেখা দিয়ে বাঁচিয়ে তুলতে পারবে অসুস্থ কোনো সভ্যতাকে। লেখক তার কলম দিয়ে জাগ্রত করতে পারবে মানুষের ভীতরে লুকিয়ে থাকা অদম্য সাহস।

একজন লেখক কল্পনাকে নিয়ে আসতে পারে বাস্তবে। আমাদের নিয়ে যেতে পারে কল্পনার গহীন বনে। লেখক আমাদের সবাক যুগ থেকে অবাক যুগে নিয়ে যেতে পারে মুহূর্তের মাঝেই। লেখক জাগাতে পারে প্রেম, লেখক জাগাতে পারে নতুন কাজের স্পৃহা।

অনেকেই মনে করে লেখকের সকল বিষয়ে দ্বায় আছে। কিন্তু লেখকের মূলত কারো কাছেই কোনো দ্বায় নেই। তার দ্বায় থাকে শুধু নিজের মনের কাছে, নিজের বিবেকের কাছে, নিজের সুপ্ত চেতনার কাছে। সমাজ কি ভাববে তা নিয়ে লেখক মাথা ঘামাবে না। লেখক ভয়ে নাথা নোয়াবে না। লেখক যতদিন বাঁচবে বীরের মতোই বাঁচবে।

সারা বিশ্বেই লেখকরা নির্যাতনের শিকার হয়। অনেকেই বলে থাকে লিখে কিছুই হয় না। তাই যদি হতো তাহলে লেখার জন্য লেখকের শাস্তি হতো না। লেখকের ফাঁসি হতো না।

লেখকের কলমে অনেক জোর। সেই জোর ভেঙে চুরে গুড়িয়ে দিতে পারে যেকোনো কিছু। বিশেষ করে সাংবাদিকরা বিশ্বজুড়ে নির্যাতিত হয় অনিয়মের বিরুদ্ধে লিখতে গিয়ে। শাস্তি, সাজা বহু কিছু তাদের সহ্য করতে হয়। অন্যায়ের বিরুদ্ধে লিখলে হুমকি আসে, হামলা মামলা বহু ঘটনাই ঘটে। কারণ শাসক, শোষক আর অন্যায়কারীদের অনেক ক্ষমতা। লেখকের সমাজের দায়মুক্তির জন্য জীবনও দিতে হয়। তাইতো একজন লেখক সমাজের শক্তি, সমাজের সম্পদ।

3.8k
উত্তরঃ

সাহিত্য হচ্ছে মানুষের চিন্তা-ভাবনা, অনুভূতি তথা মানব-অভিজ্ঞতার কথা বা শব্দের বাঁধনে নির্মিত নান্দনিক বহিঃপ্রকাশ। এই অর্থে গল্প, কবিতা, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ ইত্যাদি উচ্চতর গুণাবলি সমন্বিত বিশেষ ধরনের সৃজনশীল মহত্তম শিল্পকর্ম। সাহিত্য-শিল্পীগণ যখন ‘অন্তর হতে বচন আহরণ’ করে আত্মপ্রকাশ কলায় ‘গীতরস ধারা’য় সিঞ্চন করে ‘আনন্দলোকে’ নিজের কথা- পরের কথা- বাইরের জগতের কথা আত্মগত উপলব্ধির রসে প্রকাশ করেন- তখনই তা হয়ে ওঠে সাহিত্য। রবীন্দ্রনাথের কথায় “বহিঃপ্রকৃতি এবং মানব-চরিত্র মানুষের মধ্যে অনুক্ষণ যে আকার ধারণ করিতেছে, যে-সঙ্গীত ধ্বনিত করিয়া তুলিতেছে, ভাষা-রচিত সেই চিত্র এবং সেই গানই সাহিত্য।…সাধারণের জিনিসকে বিশেষভাবে নিজের করিয়া – সেই উপায়ে তাহাকে পুনরায় বিশেষভাবে সাধারণের করিয়া তোলাই হচ্ছে সাহিত্যের কাজ।” [রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সাহিত্য] সাহিত্য সত্য-সুন্দরের প্রকাশ হিসেবে প্রবহমাণ সময়ে যা ঘটে – সে-সবের মধ্য থেকে যা মহৎ, যা বস্তুসীমাকে ছাড়িয়ে বাস্তবাতীত প্রকাশ করে, যা জীবনের জন্য কল্যাণময় এবং মহৎ আদর্শের দ্যোতক তাকেই প্রকাশ করে। আসলে মহৎ সাহিত্য তাই- যা একাধারে সমসাময়িক-শাশ্বত-যুগধর্মী-যুগোপযোগী-যুগোত্তীর্ণ। সাহিত্য কেবল পাঠককে আনন্দ দেয় না- সমানভাবে প্রভাবিত করে পাঠক এবং সমাজকে।

আভিধানিকভাবে ‘সহিতের ভাব’ বা ‘মিলন’ অর্থে ‘সাহিত্য’ হলো কাব্য, নাটক, গল্প, উপন্যাস ইত্যাদি সৃজনশিল্পের মাধ্যমে এক হৃদয়ের সঙ্গে অন্য হৃদয়ের সংযোগ স্থাপন; সাহিত্য¯্রষ্টা-সাহিত্যের সাথে পাঠকের এক সানুরাগ বিনিময়। কিন্তু আভিধানিক অর্থের নির্দিষ্ট সীমায় সাহিত্যের স্বরূপ-গতি-প্রকৃতি-বৈচিত্র্য ও বিস্তৃতির সম্যক ধারণা দেওয়া যেমন অসম্ভব, কোনো বিশেষ সংজ্ঞায় তাকে সুনির্দিষ্ট করে দেওয়াও তেমন দুঃসাধ্য। বাচ্যার্থ ও ব্যঞ্জনার্থর সীমাকে অতিক্রম করে নানা রূপে, রসে, প্রকরণ ও শৈলীতে সাহিত্যের নিরন্তর যাত্রা সীমা থেকে অসীমে। প্রত্যক্ষ সমাজপরিবেশ তথা সমকালীন বাস্তব পারিপার্শ্বিক, নিসর্গপ্রীতি ও মহাবিশ্বলোকের বৃহৎ-উদার পরিসরে ব্যক্তিচৈতন্য ও কল্পনার অন্বেষণ ও মুক্তি- আর এইভাবেই শ্রেণিবিভাজন, নামকরণ ও স্বরূপমীমাংসার প্রচেষ্টাকে ছাপিয়ে উঠে সাহিত্যের যাত্রা সীমাহীনতায়। প্রকৃত সাহিত্য তাই যেমন তার সমসময় যা যুগমুহূর্তের, তেমনই তা সর্বকালের সর্বজনের। মার্কসবাদী সাহিত্যতত্ত্বে বাস্তব সমাজজীবনকে ‘ভিত্তি’ আর শিল্প-সাহিত্যকে সমাজের উপরিকাঠামোর [ঝঁঢ়বৎংঃৎঁপঃঁৎব] অংশ হিসেবে গণ্য করা হয়। সাহিত্যের মৌল উপকরণসামগ্রী আহৃত হয় জীবনের ভা-ার থেকে- সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, প্রেম-বৈরিতার বিচিত্র-অনিঃশেষ ভা-ার থেকে। সাহিত্যসৃষ্টির মূলে সক্রিয় যে সৃজনী-ব্যক্তিত্ব তা নিছক বিমূর্ত কোনো সত্তা নয়; আত্মপ্রকাশ ও মানবিক সংযোগ ও বিনিময়ের বাসনায় অনুপ্রাণিত সে সত্তা তার ভাব-ভাবনা, বোধ ও বিশ্বাসকে এক আশ্চর্য কৌশলে প্রকাশ করে জনসমক্ষে কোনো একটি বিশেষ রূপ-রীতি-নীতির আশ্রয়ে। ব্যক্তিক অনুুভূতি-যাপিতজীবন-মিশ্রকল্পনার জগৎ থেকেই সৃষ্টি হয় সাহিত্যের; যুগান্তরের আলোকবর্তিকা হিসেবে সাহিত্য সত্যের পথে সবসময় মাথা উঁচু করে থেকেছে- সত্যকে সন্ধান করেছে। আসলে সাহিত্য এমনি এক দর্পণ- যাতে প্রতিবিম্বিত হয় মানবজীবন, জীবনের চলচ্ছবি, পরিবেশ-প্রতিবেশ, সমাজজীবনে ঘটমান ইতিহাস- ইতিহাসের চোরাস্রােত নানাবিধ কৌণিক সূক্ষ্মতায়।

সাধারণত আত্মপ্রকাশের বাসনা, সমাজ-সত্তার সঙ্গে সংযোগ কামনা, অভিজ্ঞতার আলোয় কল্পলোক নির্মাণ এবং রূপপ্রিয়তা- এই চতুর্মাত্রিক প্রবণতাই মানুষের সাহিত্য-সাধনার মৌল-উৎস। চতুর্মাত্রিক প্রবণতার [আত্মপ্রকাশের কামনা, পারিপার্শ্বিকের সাথে যোগাযোগ বা মিলনের কামনা, কল্প-জগতের প্রয়োজনীয়তা এবং সৌন্দর্য-সৃষ্টির আকাক্সক্ষা বা রূপমুগ্ধতা] মধ্যে সমাজসত্তার সঙ্গে সংযোগ-কামনা এবং অভিজ্ঞতার আলোয় কল্পলোক নির্মাণ- এই উৎসদ্বয়ের মধ্যে নিহিত রয়েছে সাহিত্য ও সমাজের মধ্যে আন্তর-সম্পর্কের প্রাণ-বীজ। সমাজ শিল্পীকে সাহিত্য-সাধনায় প্রণোদিত করে। ‘সহৃদয়-হৃদয় সংবাদ’এর মাধ্যমে সাহিত্যিকগণ লেখক-পাঠকের মধ্যে সেতুবন্ধন রচনা করেন- উভয়ের হৃদয়বীণার তারগুলোকে একই সুতায় গেঁথে দেন। এর কারণে সাহিত্য দেশ-কাল-সমাজের সীমা অতিক্রম করে সর্বসাধারণের হৃদয়কে আকর্ষণ করে। এর ফলে সাহিত্য হয়ে ওঠে সার্বজনীন-সর্বকালের মানুষের হৃদয়ের সামগ্রী এবং সাহিত্য¯্রষ্টাও হয়ে ওঠেন অনেক বড়। কিন্তু বর্তমান বাংলা সাহিত্যচর্চার গতি-প্রকৃতি, সমস্যা-সংকট-সমাধান কোন দিকে? এসব বিষয়ের সন্ধান- এ প্রবন্ধের অন্বিষ্ট।

3.2k
উত্তরঃ

আমাদের লোকশিল্প প্রবন্ধটি আমাদের লোককৃষ্টি গ্রন্থ থেকে গৃহীত হয়েছে। লেখক এ প্রবন্ধে বাংলাদেশের লোকশিল্প ও লোক-ঐতিহ্যের বর্ণনা দিয়েছেন । এ বর্ণনায় লোকশিল্পের প্রতি তার গভীর মমত্ববোধের পরিচয় রয়েছে।
আমাদের নিত্যব্যবহার্য অধিকাংশ জিনিসই এ কুটিরশিল্পের ওপর নির্ভরশীল ।

শিল্পগুণ বিচারে এ ধরনের শিল্পকে লোকশিল্পের মধ্যে গণ্য করা যেতে পারে । পূর্বে আমাদের দেশে যে সমস্ত লোকশিল্পের দ্রব্য তৈরি হতো তার অনেকগুলোই অত্যন্ত উচ্চমানের ছিল। ঢাকাই মসলিন তার অন্যতম। ঢাকাই মসলিন অধুনা বিলুপ্ত হলেও ঢাকাই জামদানি শাড়ি অনেকাংশে সে স্থান অধিকার করেছে।

বর্তমানে জামদানি শাড়ি দেশে-বিদেশে পরিচিত এবং আমাদের গর্বের বস্তু। নকশি কাথা আমাদের একটি গ্রামীণ লোকশিল্প। এ শিল্প আজ বিলুপ্তপ্রায় হলেও এর কিছু কিছু নমুনা পাওয়া যায়। আপন পরিবেশ থেকেই মেয়েরা তাদের মনের মতো করে কীথা সেলাইয়ের অনুপ্রেরণা পেতেন । কাঁথার প্রতিটি সুচের ফোঁড়ের মধ্যে লুকিয়ে আছে এক-একটি পরিবারের কাহিনী, তাদের পরিবেশ, তাদের জীবনগাঁথা ।

আমাদের দেশের কুমোরপাড়ার শিল্পীরা বিভিন্ন ধরনের তৈজসপত্র ছাড়াও পোড়ামাটি দিয়ে নানা প্রকার শৌখিন দ্রব্য তৈরি করে থাকে। নানা প্রকার পুতুল, মূর্তি ও আধুনিক রুচির ফুলদানি, ছাইদানি, চায়ের সেট ইত্যাদি তারা গড়ে থাকে।
খুলনার মাদুর ও সিলেটের শীতলপাটি সকলের কাছে পরিচিত। আমাদের দেশের এই যে লোকশিল্প তা সংরক্ষণের দায়িত আমাদের সকলের । লোকশিল্পের মাধ্যমে আমরা আমাদের ঐতিহ্যকে বিশ্বের কাছে তুলে ধরতে পারি।

arif
arif
3 years ago
3.7k
উত্তরঃ

আমাদের অর্থনৈতিক সম্পদ

 

বাংলাদেশ, একটি দ্রুত উন্নতি লক্ষ্য নির্ধারণ করা দেশ, যা প্রচুর অর্থনৈতিক সম্পদের বেশিরভাগ সম্পদ নিয়ে এগিয়ে চলেছে। এই দেশের অর্থনৈতিক সম্পদ মৌলিকভাবে চারটি প্রধান উৎস থেকে আসে: জমি, কাজ, উদ্যোগ, এবং মানুষের কাজের দক্ষতা। এই সম্পদের বিকাশে বিভিন্ন রাজনৈতিক, আর্থিক এবং সামাজিক পরিবর্তনের ভূমিকা রয়েছে।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পদের মূল স্তম্ভ হল কৃষি। দেশটি একটি প্রধানত কৃষিপ্রধান দেশ হিসেবে পরিচিত। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নতির মূল হিসেবে প্রধানত শস্য ও ফসল চাষ প্রসঙ্গে বিকাশ হয়েছে। বাংলাদেশে প্রধানত ধান, পাট, মশুর ডাল, আখ, পটল, পেঁপে, তেল সহ বিভিন্ন ফসল চাষ করা হয়। অত্যন্ত উচ্চ মানের খাদ্য সামগ্রী উৎপাদনের ফলে এই খাদ্য পণ্য রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক সম্পদের গড়াতে সাহায্য করে।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক উৎস হল প্রবৃদ্ধি ও শিক্ষাগত উন্নতি। বাংলাদেশে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের অভাব কমে আসছে এবং মানুষের দক্ষতা বৃদ্ধি করছে। বিশেষত, প্রযুক্তির আগমন এবং বিনিয়োগে বৃদ্ধি নেওয়া হচ্ছে, যা অর্থনৈতিক সম্পদের উন্নতির পথে সাহায্য করছে।

অন্যান্য উৎস হিসেবে প্রযুক্তিবিদ্যা এবং সেবা অংশ গুলির অগ্রগতি আছে। বাংলাদেশের সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক সম্পদ হল তার মানুষের চাকরিভার্থী শ্রমিকেরা। তাদের দক্ষতা, উদ্যোগ, ও সামর্থ্য বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

যদিও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পদ উন্নতির পথে অনেক উত্সাহজনক প্রগতি হয়েছে, তবে এখনও অনেক চ্যালেঞ্জ র

য়েছে। প্রধানতঃ গরিব মানুষের জন্য আর্থিক সম্পদের অগ্রগতি নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ হলেও এখনও বেশিরভাগ লোকের মধ্যে বৃদ্ধির অভাব আছে। তাছাড়া, পরিবেশের সম্পদ সংরক্ষণের জন্য সঠিক প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থা প্রয়োজন।

পুনর্নির্মাণ ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সম্পদের বিস্তার ও উন্নতি নিশ্চিত করতে পারে। সঠিক নীতি নির্ধারণ, উদ্যোগের বৃদ্ধি, প্রযুক্তিগত প্রবর্তন এবং শিক্ষাগত উন্নতি এমন পরিবর্তন নিশ্চিত করতে সাহায্য করতে পারে।

শেষ কথায়, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পদ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যা দেশটির সমৃদ্ধি ও উন্নতির সাথে অবিভাজ্যভাবে সংযোগিত। একটি দ্রুত বৃদ্ধির উপায় হল সঠিক পরিকল্পনা, ব্যবস্থাপনা এবং উদ্যোগের বৃদ্ধি করা। এই প্রস্তুতি নেওয়ার মাধ্যমে, বাংলাদেশ তার অর্থনৈতিক সম্পদ উন্নতির পথে আরও এগিয়ে যেতে পারে এবং তার মানুষের জন্য আরো উন্নত ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে পারে।

2.5k
উত্তরঃ

"বিক্ষুব্ধ পূর্ব ইউরোপ" বলতে পূর্ব ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ১৯৮৯ সালের পর সাম্যবাদী শাসনের পতন এবং এর ফলে উদ্ভূত রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতাকে বোঝায়। এই সময়কালে, পূর্ব ইউরোপের দেশগুলো গণতন্ত্র ও বাজার অর্থনীতির দিকে ধাবিত হয়, যার ফলে নতুন জাতীয়তাবাদ, অর্থনৈতিক সংকট, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও সামাজিক পরিবর্তন দেখা যায়। 

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও কারণ: 

সাম্যবাদের পতন:

১৯৮৯ সালের ঐতিহাসিক বছরটি পূর্ব ইউরোপে সাম্যবাদী ব্যবস্থার পতন ঘটায়, যা ছিল একটি যুগান্তকারী ঘটনা। এই পরিবর্তনের ফলে দেশগুলো তাদের সাম্যবাদী অতীত থেকে মুক্তি পেতে শুরু করে।

গণতন্ত্রের পথে যাত্রা:

সাম্যবাদের পতনের পর পূর্ব ইউরোপের দেশগুলো গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা ও মুক্ত বাজার অর্থনীতির দিকে ঝুঁকে পড়ে।

বিক্ষোভ ও অস্থিতিশীলতার কারণসমূহ: 

অর্থনৈতিক সংকট:

সাম্যবাদী অর্থনীতি থেকে বাজার অর্থনীতিতে উত্তরণ অনেক দেশে অর্থনৈতিক সংকট সৃষ্টি করে। বেকারত্ব, মুদ্রাস্ফীতি, এবং ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে বৈষম্য বাড়ে, যা সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করে।

জাতীয়তাবাদের উত্থান:

অনেক দেশে সাম্যবাদী শাসনের অবসানের পর বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে জাতীয়তাবোধ তীব্র হয়, যা নতুন করে জাতিগত সংঘাতের জন্ম দেয়।

রাজনৈতিক অস্থিরতা:

নতুন গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো সুসংহত হতে সময় লাগে, ফলে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা দেখা দেয়। অনেক দেশে ক্ষমতা ও আদর্শের লড়াইয়ের কারণে সহিংসতাও ঘটে।

সামাজিক পরিবর্তন:

পুরনো সাম্যবাদী নীতি ও ব্যবস্থার পরিবর্তে নতুন সামাজিক কাঠামো ও মূল্যবোধের জন্ম হতে থাকে, যা সমাজের বিভিন্ন স্তরে অস্থিরতা সৃষ্টি করে।

গুরুত্বপূর্ণ দিক: 

  • এই বিক্ষুব্ধ পরিস্থিতি পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোতে এক নতুন যুগের সূচনা করে, যেখানে তারা তাদের নিজস্ব পথে নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের সুযোগ পায়।
  • যদিও এই পরিবর্তন প্রক্রিয়াটি কঠিন ছিল, এটি এই অঞ্চলে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

এইভাবে, "বিক্ষুব্ধ পূর্ব ইউরোপ" মূলত সেই সময়ের পরিবর্তন, অস্থিরতা এবং নতুন করে গড়ে ওঠার জটিল প্রক্রিয়াকে নির্দেশ করে, যা সাম্যবাদের পতন ও গণতান্ত্রিক যাত্রার ফলস্বরূপ ঘটেছিল। 

Satt Team 10
Satt Team 10
11 months ago
2.3k
উত্তরঃ

পররাষ্ট্রনীতি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নীতির সম্প্রসারণ। পররাষ্ট্রনীতি হলো কোনো সার্বভৌম রাষ্ট্রের গৃহীত সেসব নীতি যা রাষ্ট্র তার রাষ্ট্রীয় স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য অন্যান্য রাষ্ট্রের সাথে যোগাযোগ রক্ষার ক্ষেত্রে সম্পাদন করে থাকে। অন্য রাষ্ট্রের মতো বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে রাষ্ট্রের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতাকে তুলে ধরে।

১৯৭১ সালে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদয় আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। স্বাধীনতা লাভের পরবর্তী সময়ে ভৌগোলিক অবস্থান, স্বল্প পরিসরের ভূখন্ড এবং সীমিত অর্থনৈতিক সম্পদ ইত্যাদি বিভিন্ন নিয়ামক বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণের সুযোগকে সীমাবদ্ধ করে দেয়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি মূলত বহিঃশক্তির প্রভাব থেকে  দেশের সাবভৌমত্ব ও ভূখন্ডকে রক্ষা করার মতো বিষয়েই সীমাবদ্ধ থেকে গেছে।

পররাষ্ট্রনীতি সম্পর্কীয় সাংবিধনিক বিধান  বাংলাদেশের সংবিধানের বিভিন্ন অনুচ্ছেদে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির নির্দেশনা রয়েছে। এই নির্দেশনাসমূহ বাংলাদেশ সংবিধানের ২৫ নং অনুচ্ছেদে বর্ণিত হয়েছে। এগুলি হলো:

জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও সমতার প্রতি শ্রদ্ধা, অপর রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা, আন্তর্জাতিক বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধান এবং আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘের সনদে বর্ণিত নীতিসমূহের প্রতি শ্রদ্ধা, এ সকল নীতিই হবে রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভিত্তি এবং এ সকল নীতির ভিত্তিতে-

১. রাষ্ট্র আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে শক্তিপ্রয়োগ থেকে বিরত থাকা এবং সাধারণ ও পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণের জন্য চেষ্টা করবে; প্রত্যেক জাতির স্বাধীন অভিপ্রায় অনুযায়ী পথ ও পন্থার মাধ্যমে অবাধে নিজস্ব সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা নির্ধারণ ও গঠনের অধিকার সমর্থন করবে; এবং সাম্রাজ্যবাদ, উপনিবেশবাদ বা বর্ণ্যবৈষম্যবাদের বিরুদ্ধে বিশ্বের সর্বত্র নিপীড়িত জনগণের ন্যায়সঙ্গত সংগ্রামকে সমর্থন করবে।

২. রাষ্ট্র ইসলামী সংহতির ভিত্তিতে মুসলিম দেশসমূহের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব সম্পর্ক সংহত, সংরক্ষণ এবং জোরদার করতে সচেষ্ট হবে। সংবিধানের ৬৩ অনুচ্ছেদে যুদ্ধ-ঘোষণা সংক্রান্ত নীতি উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে সংসদের সম্মতি ব্যতিত যুদ্ধ ঘোষণা করা যাবে না, কিংবা প্রজাতন্ত্র কোনো যুদ্ধে অংশগ্রহণ করবে না। অনুচ্ছেদ ১৪৫(ক)তে বৈদেশিক চুক্তি সম্পর্কে বলা হয়েছে: ‘বিদেশের সাথে সম্পাদিত সকল চুক্তি রাষ্ট্রপতির নিকট পেশ করা হবে, এবং রাষ্ট্রপতি তা সংসদে পেশ করার ব্যবস্থা করবেন। তবে শর্ত হচ্ছে যে, জাতীয় নিরাপত্তার সাথে সংশ্লিষ্ট অনুরূপ কোন চুক্তি কেবলমাত্র সংসদের গোপন বৈঠকে পেশ করা হবে।’

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূলনীতিসমূহ  পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কিছু মূলনীতি অনুসরণ করে থাকে। জাতিসংঘ এবং ন্যামের মতো বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠনের সদস্য হিসেবে বাংলাদেশ এসব সংগঠনের মূলনীতিসমূহ মেনে চলে, এবং বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির প্রধান নীতিসমূহ এসব সংগঠনের নীতির সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির প্রধান চারটি মূলনীতি হলো:

সকলের প্রতি বন্ধুত্ব, কারও প্রতি বিদ্বেষ নয়  একটি দরিদ্র রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ তার অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য বৈদেশিক সাহায্যের উপর নির্ভরশীল হবার কারণে বাংলাদেশকে বিভিন্ন মতাদর্শ দ্বারা প্রভাবিত হতে হয়। এ কারণেই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু  শেখ মুজিবুর রহমান পররাষ্ট্রনীতির মূলনীতি হিসেবে বলেছিলেন, ‘আমাদের একটি ক্ষুদ্র দেশ, কারও প্রতি বিদ্বেষ নয়, আমরা চাই সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব’।

অন্য রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, স্বাধীনতা ও ভৌগোলিক অখন্ডতার প্রতি সম্মান প্রদর্শন  বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্য। জাতিসংঘ সনদের ২(৪) ধারায় বলা হয়েছে ‘আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সকল সদস্য-রাষ্ট্র আঞ্চলিক অখন্ডতার বিরুদ্ধে কিংবা অন্য কোনো রাষ্ট্রের রাজনৈতিক স্বাধীনতার বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগের ভীতি প্রদর্শন থেকে এবং জাতিসংঘের উদ্দেশ্যের সংঙ্গে সামঞ্জস্যহীন কোনো উপায় গ্রহণ করা থেকে নিবৃত্ত থাকবে’।

অন্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ না করা  জাতিসংঘ সনদের ২(৭) ধারায় বলা হয়েছে যে,  ‘বর্তমান সনদ জাতিসংঘকে কোনো রাষ্ট্রের নিছক অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের অধিকার দিচ্ছে না বা সেরূপ বিষয়ের নিষ্পত্তির জন্য কোনো সদস্যকে জাতিসংঘের দারস্থ হতে হবে না; কিন্তু সপ্তম অধ্যায় অনুযায়ী কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের ব্যাপারে এই নীতি অন্তরায় হবে না’। জাতিসংঘের একটি সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ এই মূলনীতির উপর তার পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন করেছে, যা অন্য রাষ্ট্রের কাছে বাংলাদেশের বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে প্রকাশিত।

২০০৯ সালে পুনরায় আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসে, এবং প্রধানমন্ত্রী  শেখ হাসিনা পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনয়নের কথা ঘোষণা করেন। বাংলাদেশের নিরাপত্তা ধারণা বিবেচনায় রেখে প্রায় তিন দশক পর ভারতের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের কথা ঘোষণা করা হয়। সম্প্রতি সরকার রাশিয়ার সাথে সম্পর্ক ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে রাশিয়ার সাহায্যে দেশে পারমাণবিক প্ল্যান্ট স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।

সময়ের পরিবর্তনের সাথে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ভবিষ্যত অর্জনের সম্ভাবনা অনেকটা ক্ষীণ হয়ে পড়ছে। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ তার প্রতিবেশী এবং আঞ্চলিক রাষ্ট্রসমূহের সাথে এবং বিশ্বের আরো কিছু রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূলনীতি ‘সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে শত্রুতা নয়’ একটি সত্তুরের দশকের ধারণা, যা প্রায় ৪০ বছরের পুরনো। বর্তমান পরিবর্তিত বিশ্ব প্রেক্ষাপটে পুরনো ধারার পরররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করে বাংলাদেশ প্রতিনিয়ত তার অর্জনের সম্ভাবনা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। সুতরাং পররাষ্ট্রনীতির লক্ষ্য নিয়ে নতুন কৌশল-পরিকল্পনা করা উচিত, যার মাধ্যমে পরিবর্তিত বিশ্বে নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনের পথে বাংলাদেশ এগিয়ে যেতে পারে।  [ঊর্মি হোসেন]

Md. Aminul Islam
Md. Aminul Islam
3 years ago
4.5k
শিক্ষকদের জন্য বিশেষভাবে তৈরি

১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!

শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!

প্রশ্ন এডিট করা যাবে
জলছাপ দেয়া যাবে
ঠিকানা যুক্ত করা যাবে
Logo, Motto যুক্ত হবে
অটো প্রতিষ্ঠানের নাম
অটো সময়, পূর্ণমান
প্রশ্ন এডিট করা যাবে
জলছাপ দেয়া যাবে
ঠিকানা যুক্ত করা যাবে
Logo, Motto যুক্ত হবে
অটো প্রতিষ্ঠানের নাম
অটো সময়, পূর্ণমান
অটো নির্দেশনা (এডিটযোগ্য)
অটো বিষয় ও অধ্যায়
OMR সংযুক্ত করা যাবে
ফন্ট, কলাম, ডিভাইডার
প্রশ্ন/অপশন স্টাইল পরিবর্তন
সেট কোড, বিষয় কোড
অটো নির্দেশনা (এডিটযোগ্য)
অটো বিষয় ও অধ্যায়
OMR সংযুক্ত করা যাবে
ফন্ট, কলাম, ডিভাইডার
প্রশ্ন/অপশন স্টাইল পরিবর্তন
সেট কোড, বিষয় কোড
এখনই শুরু করুন ডেমো দেখুন
৫০,০০০+
শিক্ষক
৩০ লক্ষ+
প্রশ্নপত্র
মাত্র ১৫ পয়সায় প্রশ্নপত্র
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন তৈরি করুন আজই

Complete Exam
Preparation

Learn, practice, analyse and improve

1M+ downloads
4.6 · 8k+ Reviews