উত্তরঃ
‘সবুজ অর্থনীতি ও বাংলাদেশ’
"সবুজ অর্থনীতিই আগামীর অর্থনীতি। "আতিউর রহমান, বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও সাবেক গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক।
ভূমিকা
একবিংশ শতাব্দীর সংকট ও সমাধান বর্তমান বিশ্বে উন্নয়ন ও পরিবেশ সংরক্ষণের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা মানবজাতির অস্তিত্ব রক্ষার প্রধান চ্যালেঞ্জ। গতানুগতিক শিল্পায়ন ও প্রাকৃতিক সম্পদের যথেচ্ছ ব্যবহারের ফলে পৃথিবী আজ জলবায়ু পরিবর্তন, জীববৈচিত্র্যের অপূরণীয় ক্ষতি এবং ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন। বিশ্ব উষ্ণায়ন ও গ্রিনহাউস গ্যাসের প্রভাবে মানবসভ্যতা যখন ধ্বংসের কিনারে, তখন আশার আলো হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে সবুজ অর্থনীতি (Green Economy)। এটি এমন এক টেকসই অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, যেখানে প্রকৃতিকে ধ্বংস না করে বরং প্রকৃতির সাথে মিতালি করে সমৃদ্ধি অর্জিত হয়। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ পৃথিবী রেখে যাওয়ার লক্ষ্যেই সবুজ অর্থনীতির জয়যাত্রা শুরু হয়েছে।
সবুজ অর্থনীতির ধারণা
সবুজ অর্থনীতির ইংরেজি প্রতিশব্দ Green Economy এখানে "সবুজ” শব্দটি পরিবেশের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থাৎ সবুজ অর্থনীতি বলতে এমন একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বোঝায় যেখানে পরিবেশের ক্ষতি না করে অর্থনৈতিক উন্নয়ন সাধিত হয় এবং প্রাকৃতিক সম্পদের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা হয়।
জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচি (UNEP) এর মতে-"সবুজ অর্থনীতি হলো সেই অর্থনীতি যা মানুষের উন্নয়ন নিশ্চিত করবে কিন্তু পরিবেশগত ঝুঁকি কমাবে এবং পরিবেশগত অভাব দূর করবে।"
সহজ কথায়, যে অর্থনীতি পরিবেশগত ঝুঁকি ও বাস্তুতান্ত্রিক অভাব কমিয়ে মানবকল্যাণ ও সামাজিক সমতা প্রতিষ্ঠা করে, তা-ই সবুজ অর্থনীতি। এর ফলে মানুষের আরাম ও সুস্থতার পাশাপাশি সামাজিক ভারসাম্যের উন্নতি ঘটে এবং সম্পদের অপ্রতুলতা হ্রাস পায়।
সবুজ অর্থনীতির বহুমুখী দিক
সবুজ অর্থনীতির বিভিন্ন দিকগুলো নিচে বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষণ করা হলো
- পরিবেশগত ভারসাম্য (Ecological Balance): উন্নয়নের নামে পাহাড় কাটা, বন উজাড় বা নদী ভরাট না করে বাস্তুসংস্থানের স্বাভাবিক গতিপ্রবাহ রক্ষা করা।
- সবুজ অর্থায়ন (Green Financing): পরিবেশবান্ধব শিল্প বা প্রকল্প (যেমন: সৌর বিদ্যুৎ, ইটিপি স্থাপন) বাস্তবায়নের জন্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান কর্তৃক বিশেষ সুদে ও সহজ শর্তে ঋণের জোগান।
- টেকসই উন্নয়ন (Sustainability): বর্তমানের চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে যেন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সম্পদ ও পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, তা নিশ্চিত করা।
- প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন (Technological Innovation): এমন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা যা কার্বন নিঃসরণ কমাবে (যেমন: ইলেকট্রিক ভেহিকেল) এবং শক্তির অপচয় রোধ করবে।
- ভোক্তা সচেতনতা ও সবুজ ভোক্তা (Consumer Awareness): সাধারণ মানুষের মধ্যে পরিবেশবান্ধব পণ্য (যেমন: পাটের ব্যাগ, অর্গানিক ফুড) ব্যবহারের অভ্যাস গড়ে তোলা।
- বৈদেশিক ও সরকারি-বেসরকারি সমন্বয়: পরিবেশ রক্ষায় স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রযুক্তি ও তহবিলের সমন্বয় সাধন করা।
- ন্যায্য মূল্য (Fair Pricing): পরিবেশবান্ধব পণ্য উৎপাদনের খরচ অনেক সময় বেশি হয়; সে ক্ষেত্রে ভর্তুকি বা নীতি সহায়তার মাধ্যমে এর দাম সাধারণের নাগালে রাখা।
বিশ্বে সবুজ অর্থনীতির গুরুত্ব
"আমি যে সম্পদ অর্জন করি তা প্রকৃতি থেকে আসে।”- ক্লড মোনে।
সবুজ অর্থনীতি অসমতা দূর করে, দারিদ্র্য কমায় এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় পৃষ্ঠপোষকতা যোগায়। সম্পদের অভাব দূর করে। পরিবেশের বিস্তৃত ঝুঁকি কমায় এবং মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলা করে আর টেকসই উন্নয়নের শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করে। তাই সারা বিশ্বের মনোযোগ বাড়ছে সবুজ অর্থনীতি বিষয়ে।
জাতিসংঘের পরিবেশ বিষয়ক সংস্থা ইউএন এনভায়রনমেন্ট-এর তথ্য মতে অন্তর্ভুক্তিমূলক সবুজ অর্থায়ন এমন এক ব্যবস্থা যা পরিবেশের ঝুঁকি কমায়, জনকল্যাণ বাড়ায়, অভাব কমায় এবং সামাজিক সমতা গড়ে তোলে।
২০০৮ সালে জাতিসংঘের পরিবেশ সংস্থা 'গ্রিন ইকোনমি ইনিশিয়েটিভ (GEI)' নামে শুরু করে সবুজ অর্থনীতি কর্মসূচি। যার উদ্দেশ্য ছিল পরিবেশবান্ধব বিনিয়োগে সমর্থন জোরদার করা। বৈশ্বিক ঝুঁকি গবেষণায় দেশীয় পর্যায়ে সহায়তা বাড়ানো এবং সবুজ অর্থনীতি কর্মসূচি সুচারুভাবে সম্পন্ন করার জন্য নীতিনির্ধারকদের প্রভাবিত করা ছিল এই উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য।
→ ২০৩০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক জ্বালানির চাহিদা ৪৫% বৃদ্ধি পাবে।
→ তেলের মূল্য ব্যারেল প্রতি ১৮০ ডলার হবে।
→ গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ ৩৫% বৃদ্ধি পাবে।
→ বৈশ্বিক তাপমাত্রা ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়বে।
→ দারিদ্র্যের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে।
→ সুতরাং বৃহৎ জনগোষ্ঠীর চাহিদা মিটিয়ে পরিবেশকে টিকিয়ে রাখতে হলে সবুজ অর্থনীতি ব্যাপক গুরুত্বের দাবি রাখে।
সবুজ অর্থনীতির প্রধান ক্ষেত্র ও উপাদানসমূহ:
সবুজ অর্থনীতির কাঠামো মূলত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র বা স্তম্ভের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। এই ক্ষেত্রগুলো পরিবেশ সংরক্ষণ, টেকসই উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সবুজ অর্থনীতির মূল লক্ষ্য হলো প্রাকৃতিক সম্পদের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা, পরিবেশ দূষণ কমানো এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন নিশ্চিত করা। এই কাঠামো প্রধানত ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ উপাদানের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, যা নিচে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো।
ক. সবুজ জ্বালানি (Green Energy) : জ্বালানি আধুনিক অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। শিল্প, পরিবহন, কৃষি এবং দৈনন্দিন জীবনের প্রায় সব ক্ষেত্রে জ্বালানির প্রয়োজন হয়। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে পৃথিবীতে প্রধানত কয়লা, খনিজ তেল এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের মতো জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব জ্বালানির দহন থেকে প্রচুর পরিমাণে কার্বন ডাই-অক্সাইড ও অন্যান্য গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গত হয়, যা বৈশ্বিক উষ্ণায়নের অন্যতম প্রধান কারণ।
সবুজ অর্থনীতি এই সমস্যার সমাধান হিসেবে নবায়নযোগ্য এবং পরিবেশবান্ধব জ্বালানির ব্যবহারকে গুরুত্ব দেয়। নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রধান উৎসগুলো হলো
- সৌরশক্তি
- বায়ুশক্তি
- বায়োগ্যাস
- জলবিদ্যুৎ
- ভূ-তাপীয় শক্তি
এসব জ্বালানি পরিবেশের জন্য তুলনামূলকভাবে নিরাপদ এবং দীর্ঘমেয়াদে টেকসই উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উদাহরণস্বরূপ, সৌরশক্তির ব্যবহার বাড়ানোর মাধ্যমে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব। একইভাবে বায়ুবিদ্যুৎ এবং বায়োগ্যাস প্রকল্প পরিবেশবান্ধব শক্তি উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। সবুজ জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি করলে একদিকে যেমন পরিবেশ দূষণ কমে, অন্যদিকে তেমনি জ্বালানি নিরাপত্তাও নিশ্চিত করা যায়।
খ. সবুজ কর্মসংস্থান (Green Jobs): সবুজ অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সবুজ কর্মসংস্থান। পরিবেশবান্ধব শিল্প ও প্রযুক্তির বিকাশের ফলে নতুন নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়। এসব কর্মসংস্থানকে সাধারণত "Green Jobs" বলা হয়। সবুজ কর্মসংস্থানের উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যায়-
- সোলার প্যানেল টেকনিশিয়ান
- বায়ুবিদ্যুৎ প্রকৌশলী
- রিসাইক্লিং ইঞ্জিনিয়ার
- পরিবেশ অডিটর
- পরিবেশ গবেষক
সবুজ কর্মসংস্থান শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়নেই ভূমিকা রাখে না, বরং পরিবেশ সংরক্ষণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পরিবেশবান্ধব নির্মাণ শিল্প এবং পরিবেশগত গবেষণা খাতে বিপুল কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। এই ধরনের কর্মসংস্থান দারিদ্র্য বিমোচনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কারণ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হলে মানুষের আয় বৃদ্ধি পায় এবং সামাজিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হয়।
গ. সবুজ বিনিয়োগ (Green Investment): সবুজ অর্থনীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো সবুজ বিনিয়োগ। সবুজ বিনিয়োগ বলতে পরিবেশবান্ধব প্রকল্প, শিল্প এবং প্রযুক্তিতে অর্থ বিনিয়োগকে বোঝায়। এর মাধ্যমে এমন শিল্প ও প্রকল্পে অর্থায়ন করা হয় যা পরিবেশের ক্ষতি না করে উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালনা করে।
বর্তমানে বিশ্বব্যাপী "Green Bond" এবং "Sustainable Finance" এর মাধ্যমে সবুজ বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাচ্ছে। গ্রিন বন্ড হলো এমন একটি আর্থিক উপকরণ যার মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব প্রকল্পের জন্য অর্থ সংগ্রহ করা হয়।
- সবুজ বিনিয়োগের মাধ্যমে।
- পরিবেশবান্ধব শিল্প প্রতিষ্ঠা করা যায়।
- নতুন প্রযুক্তির উদ্ভাবন সম্ভব হয়।
- কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়।
- অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হয়।
এছাড়া সবুজ বিনিয়োগ পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতেও সহায়তা করে এবং দীর্ঘমেয়াদে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করে।
ঘ. সবুজ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা (4R নীতি): বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আধুনিক বিশ্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। শিল্পায়ন ও নগরায়নের ফলে বিপুল পরিমাণ বর্জ্য উৎপন্ন হচ্ছে, যা পরিবেশ দূষণের প্রধান কারণ। এই সমস্যা সমাধানের জন্য সবুজ অর্থনীতিতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে 4R নীতি অনুসরণ করা হয়। এই চারটি নীতি হলো
- Reduce (হ্রাস): বর্জ্যের উৎপাদন যতটা সম্ভব কমিয়ে আনা। উৎপাদন ও ভোগের ক্ষেত্রে সচেতনতা বাড়িয়ে বর্জ্য কমানো যায়।
- Reuse (পুনঃব্যবহার): কোনো জিনিস একবার ব্যবহার করার পর ফেলে না দিয়ে পুনরায় ব্যবহার করা। এতে সম্পদের অপচয় কমে।
- Recycle (পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ): ব্যবহৃত বা ফেলে দেওয়া বর্জ্যকে পুনরায় প্রক্রিয়াজাত করে নতুন কাঁচামাল বা পণ্যে রূপান্তর করা।
- Recover (পুনঃউদ্ধার): বর্জ্য থেকে জ্বালানি বা অন্যান্য উপযোগী সম্পদ উদ্ধার করা। এই চারটি নীতি অনুসরণ করলে পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব হয় এবং বর্জ্যকে মূল্যবান সম্পদে পরিণত করা যায়।
ঙ. সবুজ পরিবহন (Green Transport) পরিবহন খাত পরিবেশ দূষণের অন্যতম প্রধান উৎস। যানবাহন থেকে নির্গত ধোঁয়া এবং গ্রিনহাউস গ্যাস বায়ু দূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী। সবুজ অর্থনীতি পরিবেশবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দেয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-
- বিদ্যুৎচালিত যানবাহন (Electric Vehicles)
- উন্নত গণপরিবহন ব্যবস্থা
- রেলওয়ে নেটওয়ার্কের সম্প্রসারণ
- পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ব্যবহার
সবুজ পরিবহন ব্যবস্থার মাধ্যমে কার্বন নিঃসরণ কমানো সম্ভব এবং পরিবেশের ওপর পরিবহন খাতের নেতিবাচক প্রভাব হ্রাস করা যায়।
চ. সবুজ কৃষি (Green Agriculture)
কৃষি খাত অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু আধুনিক কৃষিতে অতিরিক্ত রাসায়নিক সার এবং বিষাক্ত কীটনাশক ব্যবহারের ফলে পরিবেশ দূষণ এবং মাটির উর্বরতা হ্রাস পাচ্ছে। সবুজ কৃষিতে পরিবেশবান্ধব কৃষি প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো
- জৈব সার ব্যবহার
- শস্য বহুমুখীকরণ
- মিশ্র ফসল উৎপাদন
- পানি ও মাটির সঠিক ব্যবস্থাপনা
সবুজ কৃষির মাধ্যমে মাটির উর্বরতা বজায় রাখা সম্ভব হয় এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষা করা যায়। একই সঙ্গে এটি নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে সহায়তা করে।
বাংলাদেশে সবুজ অর্থনীতির গুরুত্ব
"সবুজ অর্থনীতিই আগামীর অর্থনীতি।”- আতিউর রহমান, বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ এবং সাবেক গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক।
বাংলাদেশ একটি ভাটির দেশ হিসেবে পরিচিত। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর ফলে বাংলাদেশের ওপর প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, সাইক্লোন ইত্যাদি দুর্যোগ বর্তমানে প্রায় নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। উন্নত দেশগুলো শিল্পায়ন ও দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নামে বিপুল পরিমাণ কার্বন নিঃসরণ করছে।
এর ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব পৃথিবীর সর্বত্র মানুষের জীবনযাত্রায় প্রভাব ফেলছে। এই পরিস্থিতির কারণে অবকাঠামো, ব্যবসা-বাণিজ্য, কর্মসংস্থান, দারিদ্র্য বিমোচনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুরুতর নেতিবাচক প্রভাব দেখা যাচ্ছে।
সম্প্রতি জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক জাতিসংঘের আন্তঃসরকার প্যানেল (IPCC)-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমান হারে যদি কার্বন নিঃসরণ অব্যাহত থাকে, তবে আগামী ১২ বছরের মধ্যেই পৃথিবীতে খরা, বন্যা এবং তীব্র তাপপ্রবাহের মতো ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয় দেখা দিতে পারে।
টেকসই উন্নয়ন, দারিদ্র্য দূরীকরণ ও সবুজ অর্থনীতি
"পরিবেশকে ভিত্তি করে সংগঠিত আর্থ-সামাজিক উন্নয়নই টেকসই উন্নয়ন।" UNEP উন্নয়ন ধারণার গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ধারার একটি দিক হলো টেকসই উন্নয়ন। উন্নয়নের স্থায়িত্ব এবং পরিবেশগত প্রভাবের বিষয়টি বিবেচনা করে এই ধারণার উদ্ভব হয়েছে। টেকসই উন্নয়ন এমন এক উন্নয়ন পদ্ধতি যেখানে বর্তমান প্রজন্মের চাহিদা পূরণ করা হয় কিন্তু ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রয়োজন পূরণের সম্ভাবনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করা হয় না।
অর্থাৎ আন্তঃপ্রজন্ম সমতা টেকসই উন্নয়নের মূল ভিত্তি। টেকসই উন্নয়নের তিনটি প্রধান স্তম্ভ হলো-
১. অর্থনৈতিক উন্নয়ন
২. সামাজিক উন্নয়ন
৩. পরিবেশ সংরক্ষণ
এই তিনটি স্তম্ভ পরস্পর সম্পর্কিত ও একে অপরের ওপর নির্ভরশীল। এই তিনটির সমন্বিত অগ্রগতির মাধ্যমেই প্রকৃত টেকসই উন্নয়ন সম্ভব। এই টেকসই উন্নয়নের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হলো সবুজ অর্থনীতি।
সবুজ অর্থনীতি পরিবেশবান্ধব উন্নয়নের মাধ্যমে দারিদ্র্য দূরীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এর মাধ্যমে প্রাকৃতিক পুঁজির সংরক্ষণ ও উন্নয়ন নিশ্চিত করা হয়। ফলে প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ওপর নির্ভরশীল মানুষের জীবনমান উন্নত হয়। বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চল বা বনাঞ্চলের আশেপাশে বসবাসকারী মানুষের অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং দারিদ্র্য হ্রাসে সবুজ অর্থনীতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বাংলাদেশের পরিবেশগত অর্থনৈতিক ক্ষতি ও সবুজ অর্থনীতি:
বিশ্বব্যাংকের "Creating a Green and Sustainable Growth Path for Bangladesh" শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে পরিবেশের অবনতির করণে বাংলাদেশ প্রতি বছর প্রায় ৬৫০ কোটি ডলার অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। এই ক্ষতির পরিমাণ দেশের মোট জিডিপির প্রায় ৩.৪ শতাংশ। তবে পরিবেশবান্ধব সবুজ অর্থনীতির মাধ্যমে এই ক্ষতির একটি বড় অংশ কমানো সম্ভব। যদিও সবুজ অর্থনীতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখনও কিছুটা পিছিয়ে রয়েছে, তবুও সরকার ইতোমধ্যে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। উদাহরণস্বরূপ, দেশে প্রথম সবুজ অর্থনৈতিক অঞ্চল হিসেবে সিরাজগঞ্জে একটি সবুজ শিল্পাঞ্চল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পরিবেশ সংকট ও বাংলাদেশের বাস্তবতা
পরিবেশ দূষণ বা বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের ভূমিকা তুলনামূলকভাবে খুবই কম। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সম্ভাব্য সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। ক্রমাগত পরিবেশ বিপর্যয়, জলবায়ু পরিবর্তন এবং প্রাকৃতিক সম্পদের ধ্বংস দেশের অস্তিত্বের জন্য হুমকি সৃষ্টি করছে। গত কয়েক দশকে পরিবেশ ও প্রাকৃতিক সম্পদের ক্ষয় অনেক বেশি বেড়ে গেছে। বন উজাড়, বাস্তুতন্ত্রের ধ্বংস এবং জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি এই সংকটকে আরও ত্বরান্বিত করেছে।
বাংলাদেশ একটি ছোট আয়তনের দেশ হলেও এখানে জনসংখ্যা অনেক বেশি। এই বিপুল জনসংখ্যা প্রতিনিয়ত প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। এর ফলে বনভূমির পরিমাণ ক্রমশ কমে যাচ্ছে। একটি দেশের জন্য যেখানে অন্তত ২৫ শতাংশ বনভূমি থাকা প্রয়োজন, সেখানে বাংলাদেশ এই লক্ষ্যমাত্রা থেকে অনেক দূরে রয়েছে।
কিন্তু কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বা উন্নতি দেশের প্রকৃত উন্নয়ন নয়। প্রকৃতি ও পরিবেশ সংরক্ষণ এবং উন্নয়ন একে অপরের সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। একটি আরেকটির পরিপূরক হিসেবে কাজ করে। তাই একদিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বা উন্নয়ন এবং অন্যদিকে তার সঙ্গে পরিবেশ সংরক্ষণ এই দুটিই দেশের জন্য অপরিহার্য। এমন প্রেক্ষাপটে সবুজ অর্থনীতি হতে পারে যুগপৎ উন্নয়নের সর্বোত্তম বিকল্প মাধ্যম।
গৃহীত কার্যক্রম
বাংলাদেশে সবুজ অর্থনীতির বাস্তবায়নের জন্য সরকার বিভিন্ন পরিবেশবান্ধব নীতিমালা, কৌশল, কর্মপরিকল্পনা, আইন ও বিধিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করছে। পরিবেশ সংরক্ষণ এবং টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সরকার ইতোমধ্যে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এসব উদ্যোগ দেশের পরিবেশ রক্ষা, প্রাকৃতিক সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের মধ্যে সমন্বয় সাধনে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে।
→ প্রথমত, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধির জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানি কর্তৃপক্ষ আইন অনুমোদন করা হয়েছে। এই আইনের মাধ্যমে সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি এবং অন্যান্য নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহারকে উৎসাহিত করা হচ্ছে। এর ফলে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব হবে এবং পরিবেশ দূষণ হ্রাস পাবে।
→ দ্বিতীয়ত, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবস্থার প্রসার ঘটানোর জন্য সৌর বিদ্যুৎ ও বায়োগ্যাস প্লান্ট স্থাপনের দ্রুত সম্প্রসারণ কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। দেশের বিভিন্ন গ্রামীণ অঞ্চলে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সুবিধা সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে বায়োগ্যাস প্লান্ট স্থাপনের মাধ্যমে বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো হচ্ছে।
→ তৃতীয়ত, নবায়নযোগ্য জ্বালানির বাণিজ্যিক উৎপাদনকে উৎসাহিত করার জন্য সরকার পাঁচ বছরের জন্য আয়কর মওকুফের সুবিধা প্রদান করেছে। এই নীতির ফলে উদ্যোক্তারা নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগে আগ্রহী হচ্ছেন এবং পরিবেশবান্ধব শিল্পের বিকাশ ঘটছে।
→ চতুর্থত, উপকূলীয় অঞ্চলে পরিবেশ সুরক্ষার জন্য সবুজ বেষ্টনী গড়ে তোলার কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। উপকূলীয় এলাকায় গাছ লাগিয়ে প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করা হচ্ছে, যা ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষতি কমাতে সহায়তা করে।
→ পঞ্চমত, পরিবহন খাতে দূষণ কমানোর জন্য তুলনামূলকভাবে কম দূষণকারী জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পরিবেশবান্ধব জ্বালানি ব্যবহার এবং উন্নত প্রযুক্তির যানবাহন ব্যবহারের মাধ্যমে বায়ু দূষণ কমানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
→ ষষ্ঠত, পৌর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উন্নয়নের জন্য পৌর বর্জ্য থেকে কম্পোস্ট বা জৈব সার তৈরির CDM (Clean Development Mechanism) প্রকল্প চালু করা হয়েছে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে বর্জ্য পুনর্ব্যবহার করে পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব হচ্ছে এবং একই সঙ্গে কার্বন ক্রেডিট অর্জন করা যাচ্ছে।
→ সপ্তমত, ইটভাটা থেকে সৃষ্ট মারাত্মক বায়ুদূষণ কমানোর জন্য এগুলোকে পরিবেশবান্ধব উন্নত প্রযুক্তিতে রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে ইটভাটার দূষণ অনেকাংশে কমানো সম্ভব হচ্ছে।
→ অষ্টমত, Polluters Pay Principle নীতির আওতায় পরিবেশ দূষণকারী শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর কঠোর নজরদারি আরোপ করা হয়েছে। পরিবেশগত ছাড়পত্রের শর্ত অনুযায়ী শিল্প প্রতিষ্ঠানের দূষণ নিয়ন্ত্রণের জন্য নিয়মিত মনিটরিং ও এনফোর্সমেন্ট কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।
→ নবমত, বাংলাদেশ ব্যাংক ২০১১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি Green Banking নীতিমালা জারি করে। এই নীতিমালার মাধ্যমে ব্যাংকগুলোকে পরিবেশবান্ধব প্রকল্পে ঋণ প্রদান এবং সবুজ বিনিয়োগে উৎসাহিত করা হয়েছে। এর ফলে পরিবেশবান্ধব শিল্প ও প্রযুক্তির বিকাশে আর্থিক সহায়তা প্রদান করা সম্ভব হয়েছে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, এসব গৃহীত পদক্ষেপ বাংলাদেশের সবুজ অর্থনীতি বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে এবং ভবিষ্যতে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে।
সবুজ অর্থনীতি বাস্তবায়নে সীমাবদ্ধতা
সবুজ অর্থনীতি ভবিষ্যতের পৃথিবীকে সুন্দর ও বাসযোগ্য করে তোলার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায় কথা বর্তমানে অনেকটাই স্বীকৃত সত্য। কিন্তু বিশ্বব্যাপী সবুজ অর্থনীতির পূর্ণ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এখনও নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতা বিদ্যমান। বিভিন্ন দেশের ভৌগোলিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থার ভিন্নতার কারণে সবুজ অর্থনীতির উপযোগিতা নিয়েও কিছু বিতর্ক রয়েছে।
এছাড়া উন্নত দেশগুলোর কথাবার্তা ও বাস্তব কাজের মধ্যে অনেক ক্ষেত্রই পার্থক্য দেখা যায়। অনেক উন্নত দেশ পরিবেশ রক্ষার কথা বললেও বাস্তবে তারা ভোগবাদী অর্থনৈতিক নীতির অনুসরণ করে থাকে। এর ফলে সবুজ অর্থনীতির প্রকৃত বাস্তবায়ন নিয়ে অনেক ক্ষেত্রে সন্দেহ সৃষ্টি হয়েছে।
কার্বন নিঃসরণের ক্ষেত্রে মূলত উন্নত ও ধনী দেশগুলোই বেশি দায়ী। কিন্তু এই দেশগুলো অনেক সময় পরিবেশ রক্ষার জন্য গৃহীত আন্তর্জাতিক চুক্তি ও নীতিমালা যথাযথভাবে পালন করে না। ফলে বৈশ্বিক পর্যায়ে সবুজ অর্থনীতির অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হয়। এই প্রেক্ষাপটে ধনী দেশগুলোর উচিত আন্তরিকতার সঙ্গে সবুজ অর্থনীতির বাস্তবায়নে এগিয়ে আসা। সবুজ অর্থনীতিতে সকল দেশের সমান অংশগ্রহণ ও দায়িত্ব নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। অন্যথায় এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে যেখানে উন্নত দেশগুলো শুধু নীতি নির্ধারণ করবে আর উন্নয়নশীল দেশগুলোকে তা অনুসরণ করতে হবে যা সবুজ অর্থনীতির ন্যায্যতার নীতির পরিপন্থী।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর এবং বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. আতিউর রহমান বলেছেন "সবাই মিলে আমাদের সবুজ অর্থনীতির পক্ষে কাজ করে যেতে হবে।
"সবুজ অর্থনীতি বাস্তবায়নে করণীয় ও সুপারিশ
"আমাদের সবাইকে লোভাতুর অর্থনীতি থেকে সবুজ অর্থনীতিতে যেতে হবে।”- সুতসিলো বামবাং, সাবেক প্রধানমন্ত্রী, ইন্দোনেশিয়া
সবুজ অর্থনীতি বাস্তবায়নের জন্য বিভিন্ন কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো-
→ প্রথমত, পরিবেশবান্ধব উদ্যোগকে উৎসাহিত করার জন্য আর্থিক ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রণোদনা প্রদান করা। সরকার এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো পরিবেশবান্ধব শিল্প ও প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের জন্য উদ্যোক্তাদের সহায়তা করতে পারে।
→ দ্বিতীয়ত, ব্যবসায়িক উদ্যোগ গ্রহণের ক্ষেত্রে পরিবেশগত ও সামাজিক ঝুঁকি মূল্যায়ন করা জরুরি। পরিবেশের ক্ষতি হতে পারে এমন প্রকল্প গ্রহণের আগে যথাযথ ঝুঁকি বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
→ তৃতীয়ত, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উদ্যোগে সবুজ ব্যাংকিং কার্যক্রমকে উৎসাহিত করা যেতে পারে। ইতোমধ্যে শীর্ষ ১০টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে সবুজ ব্যাংকিং কার্যক্রমে অবদানের জন্য প্রতিবছর পুরস্কৃত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
→ চতুর্থত, সমগ্র অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে টেকসই উন্নয়নের উপযোগী করে সাজানোর জন্য একটি সুস্পষ্ট কৌশলগত পরিকল্পনা প্রয়োজন। এই পরিকল্পনা স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি এবং দীর্ঘমেয়াদি হতে পারে। পাশাপাশি একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ নির্ধারণ করা জরুরি।
সবুজ অর্থায়নের উন্নয়নে ব্যাংকিং খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। কারণ ব্যবসা ও শিল্প প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের যোগান প্রধানত ব্যাংকের মাধ্যমেই প্রদান করা হয়। ব্যাংকগুলো তাদের গ্রাহকদের পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহার ও বাস্তবায়নে উৎসাহিত করতে পারে এবং এসব প্রকল্পে অর্থায়ন করতে পারে।
উপসংহার
বর্তমান বিশ্বে পরিবেশ সংকট ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের দ্বন্দ্ব দিন দিন তীব্রতর হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে সবুজ অর্থনীতি একটি যুগোপযোগী ও কার্যকর উন্নয়ন ধারণা হিসেবে বিশ্বব্যাপী গুরুত্ব অর্জন করেছে। এটি শুধু পরিবেশ সংরক্ষণই নয়, বরং দারিদ্র্য দূরীকরণ, সামাজিক সমতা প্রতিষ্ঠা এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথ সুগম করে। বাংলাদেশের মতো জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশের জন্য সবুজ অর্থনীতির গুরুত্ব আরও বেশি। ইতোমধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সবুজ ব্যাংকিং এবং পরিবেশ সংরক্ষণমূলক বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশ সবুজ অর্থনীতির পথে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করছে। তবে সবুজ অর্থনীতির সফল বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন সরকার, বেসরকারি খাত এবং সাধারণ জনগণের সম্মিলিত উদ্যোগ। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও সচেতনতারও প্রয়োজন রয়েছে। পরিশেষে বলা যায়, পরিবেশ সংরক্ষণ ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের মধ্যে সমন্বয় সাধনের মাধ্যমেই একটি টেকসই ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা সম্ভব।