চল্লিশের দশকে আবির্ভূত শক্তিমান কবিদের অন্যতম ফরুখ আহমদ ছিলেন ইসলামি স্বাতন্ত্র্যবাদী কবি। তাঁর রচিত কবিতায় পাকিস্তানবাদ, ইসলামি আদর্শ বিশেষত মুসলিম জাগরণ এবং আরব-ইরানের ঐতিহ্য উজ্জ্বলভাবে প্রস্ফুটিত হয়েছে। আরবি-ফারসি শব্দের প্রয়োগ নৈপুণ্য, বিষয়বস্তু ও আঙ্গিকের অভিনবত্বে তাঁর রচিত কবিতা বিশিষ্ট স্থান দখল করে আছে।
ফররুখ আহমদ ১০ জুন, ১৯১৮ [১০ জুলাই, ১৯১৮: বাংলা একাডেমি চরিতাভিধান] সালে মাগুরা জেলার (তৎকালীন যশোর) শ্রীপুর উপজেলার মাঝআইল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। প্রকৃত নাম সৈয়দ ফরুখ আহমদ। দাদী ডাকতেন রমজান নামে।
তাঁকে ইসলামি স্বাতন্ত্র্যবাদী কবি, ইসলামি রেনেসাঁর কবি বলা হয়।
তাঁর উপাধি: মুসলিম রেনেসাঁর কবি।
তিনি 'মাসিক মোহাম্মদী' পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক এবং ঢাকা বেতারের 'স্টাফ রাইটার' হিসেবে কাজ করেছেন।
১৯৩৭ সালে 'বুলবুল' পত্রিকায় তাঁর প্রথম কবিতা 'রাত্রি' এবং 'মাসিক মোহাম্মদী' পত্রিকায় 'পাপজন্ম' কবিতাটি প্রকাশিত হয়।
তিনি ১৯৫২ সালে রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে বাংলার পক্ষে এবং ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে, পাকিস্তানের অখণ্ডতার পক্ষে অবস্থান নিয়ে বক্তব্য, বিবৃতি প্রদান করেন এবং কবিতা রচনা করেন।
১৯৬৭ সালে পাকিস্তান সরকার রেডিও ও টেলিভিশনে রবীন্দ্র সংগীত প্রচার বন্ধের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলে তিনি এ সিদ্ধান্তের প্রতি সমর্থন জ্ঞাপন করেন।
তিনি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (১৯৬০), আদমজী সাহিত্য পুরস্কার (১৯৬৬), ইউনেস্কো পুরস্কার (১৯৬৬), একুশে পদক (১৯৭৭), স্বাধীনতা পুরস্কার (১৯৮০) পান।
তিনি ১৯ অক্টোবর, ১৯৭৪ সালে ঢাকায় মারা যান।
তাঁর রচিত গ্রন্থসমূহঃ
কাব্যগ্রন্থ:
'সাত সাগরের মাঝি' (১৯৪৪): ১৯টি কবিতার সমন্বয়ে এটি কবির প্রথম প্রকাশিত ও শ্রেষ্ঠ কাব্য। মুসলিম জাগরণের লক্ষ্যে এ কাব্যের কবিতাগুলি লিখিত। সেজন্য কবি বঙ্গীয় শব্দ ও অনুষঙ্গ ত্যাগ করে গ্রহণ করেছেন আরব্য উপন্যাস, ইরান-আরবের সংস্কৃতি ও পুরাণকথা। বাংলা প্রচলিত শব্দ পরিত্যাগ করে কবি বহু অপ্রচলিত আরবি-ফারসি শব্দ গ্রহণ করেছেন। ইসলামের ইতিহাস ও ঐতিহ্য কাব্যটির মূল সুর। বিখ্যাত উর্দু কবি আল্লামা ইকবালকে তিনি কাব্যটি উৎসর্গ করেন। এ কাব্যটি প্রকাশে অর্থায়ন করেন কবি বেনজির আহমেদ। 'সাত সাগরের মাঝি' ও 'পাঞ্জেরি' এ কাব্যের কবিতা।
'নৌফেল ও হাতেম' (১৯৬১): এটি কাব্যনাট্য।
'হাতেমতায়ী' (১৯৬৬): এটি কাহিনিকাব্য, এর জন্য তিনি ১৯৬৬ সালে আদমজী পুরস্কার লাভ করেন।
'মুহূর্তের কবিতা (১৯৬৩): এটি তাঁর সনেট সংকলন। এ সনেটের অন্তর্ভুক্ত কবিতা 'বৃষ্টি'।
'হরফের ছড়া' (১৯৬৯): এটি শিশুতোষ বিষয়ক গ্রন্থ। হরফ বা বর্ণ দিয়েই ভাষার শুরু। যারা ভাষা লিখতে ও পড়তে শিখবে হরফ তাদের জন্য। ভাষা যত সহজ, সুরেলা ও বৈচিত্র্যময় হবে, ততই শিশুদের ভাষা শিক্ষার আগ্রহ তৈরি হবে। ফলে অল্পদিনেই তারা বর্ণ শেখার মাধ্যমে ভাষা আয়ত্ত করতে পারবে। সে লক্ষ্যে কবি প্রতিটি হরফ বা বর্ণ দিয়ে ছড়া রচনা করেছেন। এ ছড়াগুলোর সামষ্টিক রূপায়ণ 'হরফের ছড়া'।
কবিতা: 'উপহার': এ কবিতাটি তিনি নিজের বিয়ে উপলক্ষে লিখেন। এটি পরবর্তীতে 'সওগাত' পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।
'স্মরণী': এ কবিতাটি তিনি আল্লামা ইকবালের স্মরণে লিখেন।
'পাঞ্জেরী': পাঞ্জেরী ফারসি শব্দ। এর বাংলা অর্থ জাহাজের অগ্রভাগে রক্ষিত পথনির্দেশক আলোকবর্তিকা বা আলোকবর্তিকাধারী ব্যক্তি। এটি তিনি রূপক অর্থে ব্যবহার করেছেন। ইংরেজ শাসনের যাতাকলে পিষ্ট ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী নেতাকে পাঞ্জেরী হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। 'পাঞ্জেরী' কবিতাটি মাত্রাবৃত্ত ছন্দে রচিত।
ফররুখ আহমদ ছিলেন বাংলা সাহিত্যের একজন প্রথিতযশা কবি, যিনি 'মুসলিম রেনেসাঁর কবি' হিসেবে সমধিক পরিচিত। তাঁর রচিত সনেট সংকলনটির নাম হলো 'মুহূর্তের কবিতা'। এই গ্রন্থটি ১৯৫৬ সালে প্রকাশিত হয় এবং এটি ফররুখ আহমদের কাব্যপ্রতিভার একটি বিশেষ দিক উন্মোচন করে। তাঁর কবিতায় ইসলামী ঐতিহ্য, ইতিহাস ও সংস্কৃতি গভীরভাবে প্রোথিত ছিল, যা বাঙালি মুসলিম সমাজে এক নতুন জাগরণ সৃষ্টিতে সহায়ক হয়েছিল। তাঁর অন্যান্য উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্মের মধ্যে রয়েছে কাব্যগ্রন্থ 'সাত সাগরের মাঝি', 'সিরাজাম মুনীরা', 'নৌফেল ও হাতেম', 'হাতেম তাই' এবং শিশুতোষ গ্রন্থ 'পাখির বাসা', 'হরফের ছড়া' ইত্যাদি।
ফররুখ আহমদ (১৯১৮-১৯৭৪) ছিলেন একজন প্রধান বাঙালি কবি ও সাহিত্যিক। তাকে "মুসলিম রেনেসাঁর কবি" হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। তার কবিতায় প্রধানত ইসলামী আদর্শ, ঐতিহ্য এবং মুসলিম সংস্কৃতির প্রতিফলন দেখা যায়। তিনি একাধারে কবিতা, গল্প, নাটক, প্রবন্ধ ও শিশুসাহিত্য রচনা করেছেন। ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষ এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সামাজিক অস্থিরতা তার সাহিত্যে বিশেষ প্রভাব ফেলেছিল।
তার উল্লেখযোগ্য আরও কিছু গ্রন্থ হলো:
কাব্যগ্রন্থ: মুহূর্তের কবিতা (১৯৬৩), পাখির বাসা (১৯৬৫), হাতেম তায়ী (১৯৬৬)
গল্পগ্রন্থ: মাস্কেন-রঙ-কোরআন (১৯৬৬)
শিশুতোষ: নতুন লেখা (১৯৫৯), ছড়ার আসর (১৯৬২), চিড়িয়াখানা (১৯৬৮)
তিনি বাংলা সাহিত্যের অন্যতম পথিকৃৎ হিসেবে বিবেচিত এবং তার সাহিত্যকর্ম বাংলাদেশের সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে গভীর প্রভাব ফেলেছিল।
ফররুখ আহমেদের বিখ্যাত দুইটি কাব্যগ্রন্থ হলো সাত সাগরের মাঝি" (১৯৪৪) এবং "সিরাজাম মুনীরা' (১৯৫২)। তাঁর রচিত অন্যান্য কাব্যগ্রন্থগুলোঃ 'নৌলে ও হাতেম' (১৯৬১), 'মুহুর্তের কবিতা' (১৯৬৩), 'ধোলাই কাব্য' (১৯৬৩), 'হাতেম তায়ী' (১৯৬৬), 'নতুন লেখা' (১৯৬৯), 'কাফেলা' (১৯৮০), হাবিদা মরুর কাহিনি' (১৯৮১), 'সিন্দাবাদ' (১৯৮৩), 'দিলরুবা' (১৯৯৪) ইত্যাদি।