আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীই (১৮৮০-১৯৭৬) মজলুম জননেতা হিসেবে সুপরিচিত ছিলেন।
স্থানীয় অত্যাচারী জমিদার ও ঔপনিবেশিক ইংরেজ সরকারের বাহিনীকে প্রতিহত করতে এবং নিজের অনুসারীদের সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য তিতুমীর (সৈয়দ মীর নিসার আলী; ১৭৮২-১৮৩১) বাঁশের কেল্লা নির্মাণ করেন।
পশ্চিমবঙ্গের বাসিন্দা তিতুমীর দরিদ্র কৃষকদের সাথে নিয়ে অত্যাচারী জমিদার এবং ব্রিটিশ নীলকরদের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করেন। তার আন্দোলন চব্বিশ পরগনা ও নদীয়া জেলার কৃষক, তাঁতীদের মধ্যে জনপ্রিয়তা লাভ করে। একসময় সরকারসহ ক্ষমতাবানদের সাথে তাদের সংঘাত শুরু হয়। জমিদারদের বাহিনী এবং ব্রিটিশ সরকারের সেনাদল তিতুমীরের হাতে কয়েকবার পরাজিত হয়। তিতুমীর তার বাহিনীর নিরাপত্তা রক্ষা এবং প্রশিক্ষণের জন্য নারিকেলবাড়িয়ায় বাঁশ দিয়ে একটি কেল্লা নির্মাণ করেন।
ফয়সাল সাহেবের সাথে বাংলার ইতিহাসের অন্যতম মহৎ ব্যক্তি হাজী শরীয়তউল্লাহর (১৭৮১-১৮৪০) মিল পাওয়া যায়।
হাজী শরীয়তউল্লাহ শৈশব থেকে ধর্মীয় শিক্ষার প্রতি অনুরাগী ছিলেন। তিনি মাত্র ১৮ বছর বয়সে মক্কায় গিয়েছিলেন। দীর্ঘ বিশ বছর সেখানে অবস্থান করে ইসলামি শিক্ষা আয়ত্ত করেন। উদ্দীপকের ফয়সাল সাহেবের ক্ষেত্রেও এমনটি লক্ষণীয়।
ফয়সাল সাহেব দীর্ঘদিন মক্কায় অবস্থান করেন। এরপর দেশে ফিরে ধর্মীয় সংস্কার এবং রাজনৈতিক সচেতনতা সৃষ্টির উদ্যোগ গ্রহণ করেন। হাজী শরীয়তউল্লাহও মক্কা থেকে দেশে ফিরে মুসলমান সমাজে নানা কুসংস্কার দেখতে পান। পীরপূজা, কবর পূজা, মনসা-শীতলা পূজাসহ নানা ধরনের অনৈসলামিক কাজ মুসলমান সমাজকে আচ্ছন্ন করেছিল। এ অবস্থায় তিনি মুসলমানদের ইসলাম ধর্মের অবশ্যপালনীয় কর্তব্য অর্থাৎ ফরজ পালনের আহ্বান জানান। কুসংস্কার ও অনৈসলামিক কাজকর্ম ত্যাগ করে ফরজ পালনের তাগিদ দেওয়া হতো বলে হাজী শরীয়তউল্লাহর এ প্রচারণা ফরায়েজি অন্দোলন নামে পরিচিত। এ আন্দোলনের মূল লক্ষ্যগুলোর মধ্যে ছিল- ১. মুসলিম সমাজকে ইসলামি মূলনীতি তথা ফরজ এর ওপর প্রতিষ্ঠিত করা; ২. মুসলমানদের কুসংস্কারমুক্ত প্রকৃত ধর্মীয় শিক্ষা দান; ৩. তাদেরকে অধিকার ও কর্তব্য পালনে সচেতন করে তোলা; ৪. মুসলমানদের ধর্মভীরু ও নৈতিক বলে বলীয়ান করা ও ৫. ইংরেজ বাহিনী ও জমিদারদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা।
উদ্দীপকে ইঙ্গিতকৃত আন্দোলন অর্থাৎ ফরায়েজি আন্দোলন তৎকালীন মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে নবজাগরণের সূচনা করেছিল- এ বিষয়টির সাথে আমি একমত।
ব্রিটিশ শাসনামলে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে ভারতীয়রা বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক অধিকার থেকে বঞ্চিত ছিল। তবে শিক্ষায় অনগ্রসরতাসহ বিভিন্ন কারণে মুসলমানদের অবস্থা ছিল তুলনামূলকভাবে বেশি পশ্চাদপদ। ফরায়েজি আন্দোলনের মাধ্যমে বাংলা অঞ্চলের মুসলমানরা ধর্মীয় সংস্কারের পাশাপাশি তাদের আর্থ-সামাজিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ হয়।
ফরায়েজি আন্দোলন মুসলমানদের ধর্মীয় জীবনে অনুপ্রবেশ করা কবরপূজা, পীরপূজা, মনসা-শীতলা পুজা ইত্যাদি অনৈসলামিক কার্যকলাপ ও বিভিন্ন কুসংস্কার ত্যাগ করার তাগিদ দেয়। এছাড়া ইসলামের ফরজ কাজগুলো পালনের ওপর গুরুত্বারোপ করে। হাজী শরীয়তুল্লাহ ঔপনিবেশিক সরকার ও অত্যাচারী জমিদারের নির্যাতন মোকাবেলা, সামাজিক, অর্থনৈতিক বৈষম্য বিলোপ এবং রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের বিষয়ে মুসলমানদের সচেতন করে তোলেন। তার আন্দোলন জমিদার, জোতদার, মহাজন, নীলকর ও ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ গড়ে তোলে। তখন বৃহত্তর ফরিদপুর অঞ্চলের কারিগর, কৃষক, তাঁতি ও জেলে সম্প্রদায় জমিদার ও ব্রিটিশদের অত্যাচার-নির্যাতন ভোগ করত বেশি। ফরায়েজী আন্দোলনের ফলে এরা নিজেদের অধিকার আদায় ও ভাগ্য উন্নয়নে সচেষ্ট হয়। এভাবে ধীরে ধীরে সমগ্র বাংলার মুসলমান জনগোষ্ঠী নিজেদের অবস্থান সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠে।
পরিশেষে বলা যায়, ফরায়েজি আন্দোলন মুসলমানদের মধ্যে ইসলাম ধর্ম এবং দেশ ও সমাজ বিষয়ে বিদ্যমান অজ্ঞতা ও কুসংস্কার দূর করে এবং তাদেরকে সংগ্রামী হতে সাহায্য করে। তাই এ কথা বলা অত্যুক্তি হবে না যে, ফরায়েজি আন্দোলন তৎকালীন মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে নবজাগরণের সূচনা করেছিল।
Related Question
View Allবেজাল প্যাক্ট' স্বাক্ষরিত হয় ১৯২৩ সালে
বেজাল প্যাক্ট হলো বাংলার হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে বিদ্যমান সাম্প্রদায়িক বিভেদ সমাধানের লক্ষ্যে সম্পাদিত চুক্তি।
দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ অনুভব করেছিলেন যে, বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের দাবি অগ্রাহ্য করে স্বাধীনতা আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। এ দিক বিবেচনা করে চিত্তরঞ্জন দাশ মুসলমানদের সমর্থন ও হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন। বাংলার মুসলিম নেতারাও তাঁর সাথে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন এ.কে. ফজলুল হক, মৌলবি আবদুল করিম এবং হোসেন শহীদ সোহ্রাওয়ার্দী। তাদের উদ্যোগে ১৯২৩ সালে 'বেঙ্গল প্যাক্ট' স্বাক্ষরিত হয়।
উদ্দীপকের শামসুল হুদার সাথে আমার পঠিত মহান নেতা শহিদ তিতুমীরের সাদৃশ্য রয়েছে।
ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের অগ্রসৈনিক শহিদ তিতুমীরের আসল নাম সৈয়দ মীর নিসার আলী। তিনি দেশের মানুষকে ইংরেজ, জমিদার এবং নীলকরদের অত্যাচার ও শোষণের হাত থেকে রক্ষার প্রচেষ্টা চালান। তিনি কৃষকদেরকে তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করে তোলেন এবং তাদেরকে সংঘবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান। শোষকদের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য তিনি কৃষকদেরকে সামরিক প্রশিক্ষণ দিতে শুরু করেন। এ লক্ষ্যে তিনি কলকাতার নিকটবর্তী নারিকেলবাড়িয়া নামক স্থানে একটি বাঁশের কেল্লা বা দুর্গ নির্মাণ করেন।
উদ্দীপকের শামসুল হুদার ক্ষেত্রে লক্ষ করা যায়, তিনি একজন সৎ ও সাহসী ব্যক্তি। অন্যায়ের বিরুদ্ধে তিনি সব সময় সোচ্চার। অত্যাচারী জমিদার ও সুদখোর মহাজনদের হাত থেকে জনগণকে রক্ষায় তিনি একটি বাহিনী গড়ে তোলেন এবং তাদের প্রশিক্ষণের জন্য একটি দুর্গ প্রতিষ্ঠা করেন। তার এ লক্ষ্য ও কার্যক্রমের সাথে আমার পঠিত শহিদ তিতুমীরের সাদৃশ্য রয়েছে।
উদ্দীপকের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ ব্যক্তিত্বের অর্থাৎ তিতুমীরের আন্দোলনের কারণে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন গতি লাভ করেছিল।
তিতুমীরের কৃষক আন্দোলন ও বারাসাত বিদ্রোহ ছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিরুদ্ধে শক্তিশালী বিদ্রোহ। এর মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেন যে, রক্তদান ব্যতীত স্বাধীনতা অর্জন সম্ভব নয়। তাঁর পরিচালিত এ বিদ্রোহ ছিল জমিদার ও নীলকরদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে। তিনি নারিকেলবাড়িয়ার আশপাশের জমিদারদের পরাজিত করে চব্বিশ পরগনা, নদীয়া এবং ফরিদপুর জেলার কিছু অংশ নিয়ে একটি স্বাধীন রাজ্য গঠন করেন এবং কোম্পানি সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। তিনি ইংরেজ সরকারের আক্রমণ মোকাবিলার জন্য নারিকেলবাড়িয়ায় একটি বাঁশের কেল্লা নির্মাণ করেন। ১৮৩১ সালে ইংরেজ বাহিনীর সাথে যুদ্ধে তিতুমীরও শহিদ হন।
ইংরেজদের গোলাবারুদ এবং নীলকর ও জমিদারদের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের মুখে তিতুমীরের বাঁশের কেল্লা ছিল সাহস আর দেশপ্রেমের প্রতীক। যা যুগে যুগে বাঙালিকে অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদমুখর হতে সাহস যুগিয়েছে। প্রেরণা যুগিয়েছে স্বাধীনতার পথে এগিয়ে যেতে। উপরের আলোচনা থেকে এটাই প্রমাণিত হয় যে তিতুমীরের আন্দোলনের কারণেই পরবর্তী সময়ের ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনগুলো গতি লাভ করেছে।
১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধুর উত্থাপিত ছয় দফা কর্মসূচিকে বাঙালির মুক্তির সনদ বলা হয়।
ফরায়েজি আন্দোলন বলতে হাজী শরীয়তউল্লাহ কর্তৃক পরিচালিত ফরজভিত্তিক আন্দোলনকে বোঝায়।
১৮১৮ সালে হাজী শরীয়তউল্লাহ মক্কা থেকে দেশে ফিরে আসেন। দেশে ফিরে তিনি দেখলেন মুসলমানরা নানা প্রকার কুসংস্কারে লিপ্ত। তারা কবরপূজা, পীরপূজা, ওরস ও মানত করে পরিত্রাণ পাবে বলে মনে করত। এ অবস্থা দেখে হাজী শরীয়তউল্লাহ ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলনের ডাক দেন। এতে ইসলাম ধর্মের পাঁচটি ফরজ পালনের ওপর সর্বাধিক গুরুত্বারোপ করা হয়। এই আন্দোলনই ইতিহাসে ফরায়েজি আন্দোলন নামে পরিচিত।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!