বাংলায় মুসলিম শাসনের প্রাথমিক পর্যায় ছিল (১২০৪-১৩৩৮) সাল পর্যন্ত। এ যুগের শাসকগণ সবাই দিল্লির সুলতানের অধীনে বাংলার শাসনকর্তা হয়ে এসেছিলেন। বাংলার অনেক শাসনকর্তাই দিল্লির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে স্বাধীন হতে চেয়েছিলেন। বারংবার এমন বিদ্রোহ সংঘটিত হওয়ার জন্য দিল্লির ঐতিহাসিক জিয়াউদ্দিন বারানী “তারিখ- ই-ফিরোজশাহী" গ্রন্থে বাংলার নাম দিয়েছিলেন বুলগাকপুর বা বিদ্রোহের নগরী।
১. ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খলজী (১২০৪–১২০৬)
তিনি ছিলেন বাংলায় তুর্কি শাসনের প্রতিষ্ঠাতা। তিনি জাতিতে তুর্কি এবং আফগানিস্তানের 'গরমশির' এলাকার অধিবাসী ছিলেন।
নদীয়া বিজয়: ১২০৪ সালে মাত্র ১৭ জন অশ্বারোহী সৈন্য নিয়ে তিনি রাজা লক্ষণ সেনের অস্থায়ী রাজধানী নদীয়া আক্রমণ করেন। লক্ষণ সেন পিছনের দরজা দিয়ে বিক্রমপুরে পালিয়ে যান।
রাজধানী: নদীয়া জয়ের পর তিনি গৌড় (লখনৌতি) অধিকার করেন এবং সেখানে রাজধানী স্থাপন করেন।
তিব্বত অভিযান: ১২০৬ সালে তিনি তিব্বত অভিযানে যান, যা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়। তিব্বত থেকে ফেরার পথে তাঁর সেনাপতি আলী মর্দান খলজী তাঁকে হত্যা করেন।
অবদান: তিনি বাংলায় অসংখ্য মসজিদ, মাদরাসা এবং খানকাহ প্রতিষ্ঠা করেন।
২. গিয়াসউদ্দিন ইওয়াজ খলজী (১২১২–১২২৭)
তুর্কি শাসকদের মধ্যে তিনি অত্যন্ত প্রভাবশালী ও সফল ছিলেন।
রাজধানী স্থানান্তর: তিনি লখনৌতি থেকে রাজধানী দেবকোটে স্থানান্তর করেন।
নৌবাহিনী গঠন: বাংলায় নদীমাতৃক ভৌগোলিক পরিবেশ বুঝে তিনি প্রথম একটি শক্তিশালী নৌবাহিনী গঠন করেন।
স্থাপত্য: তিনি রাজধানীর প্রতিরক্ষার জন্য 'গৌড়' দুর্গ নির্মাণ করেন এবং দুর্গের চারদিকে 'বর্মন' নামক রাজপথ তৈরি করেন।
৩. দিল্লি ও বাংলার দ্বন্দ (১২২৭–১৩৩৮)
এই সময়ে বাংলার তুর্কি শাসকরা দিল্লির সুলতানদের বশ্যতা মেনে চলতেন, তবে সুযোগ পেলেই তারা স্বাধীনতা ঘোষণা করতেন।
মালিক ইখতিয়ার উদ্দিন বলকা খলজী: দিল্লির সুলতান ইলতুতমিশ তাঁকে পরাজিত করে বাংলায় দিল্লির আধিপত্য পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন।
সুলতান নাসিরুদ্দিন বুঘরা খাঁ: দিল্লির সুলতান গিয়াসউদ্দিন বলবনের পুত্র। তিনি দিল্লির সিংহাসন ত্যাগ করে বাংলায় শাসন করাকেই প্রাধান্য দিয়েছিলেন।
গুরুত্বপূর্ণ তথ্য:
বখতিয়ার খলজীর আগমনের সময় বাংলার রাজা কে ছিলেন? — রাজা লক্ষণ সেন।
বাংলার প্রথম তুর্কি বিজয়ী কে? — ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খলজী।
কোন শাসকের আমলে বাংলায় প্রথম নৌবাহিনী গঠিত হয়? — গিয়াসউদ্দিন ইওয়াজ খলজী।
বখতিয়ার খলজী কোন বংশের ছিলেন? — তিনি খলজী বংশের তুর্কি ছিলেন (খলজীরা মূলত তুর্কি হলেও আফগানিস্তানে দীর্ঘদিন বসবাসের কারণে তারা আফগান কৃষ্টির প্রভাব পেয়েছিল)।
তুর্কি শাসনের ধারাবাহিকতা :
সময়কাল
শাসক/রাজবংশ
প্রধান ঘটনা
১২০৪–১২০৬
বখতিয়ার খলজী
বাংলায় মুসলিম শাসনের সূচনা ও লখনৌতি বিজয়।
১২১২–১২২৭
গিয়াসউদ্দিন ইওয়াজ খলজী
প্রশাসনিক সংস্কার এবং নৌবাহিনী গঠন।
১২৮১–১২৯১
বুঘরা খাঁ
দিল্লির অধীনতা থাকা সত্ত্বেও বাংলার স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখা।
১৩৩৮
ফখরুদ্দিন মোবারক শাহ
তুর্কি আমলের সমাপ্তি ঘটিয়ে স্বাধীন সুলতানি আমলের সূচনা।
বাংলার তুর্কি শাসনের অবসান ঘটে যখন ফখরুদ্দিন মোবারক শাহ স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং এর ফলে প্রায় ২০০ বছরের স্বাধীন সুলতানি আমলের সূচনা হয়।
বাংলায় তুর্কী শাসক
নাসির উদ্দিন মাহমুদ বাংলার প্রথম তুর্কি শাসক ছিলেন। তিনি ইলতুৎমিসের পৌত্র ছিলেন।
সুলতান গিয়াসউদ্দিন ইওয়াজ খলজি 'বাসনকোর্ট' দুর্গ নির্মাণ করেন। প্রথম মুসলিম নৌবাহিনী গঠন করে।
সুলতান সামসুদ্দিন ফিরোজ শাহ সিলেটের অত্যাচারী গৌরগোবিন্দকে পরাজিত করেন। তার সময়ে হযরত শাহ জালাল বাংলায় আসেন।
শিক্ষকদের জন্য বিশেষভাবে তৈরি
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!