উন্নয়ন পরিকল্পনা হল একটি নির্দিষ্ট সময়ে পূর্বনির্ধারিত সুনির্দিষ্ট কতগুলো অর্থনৈতিক ও সামাজিক লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রাপ্ত সম্পদের সুষ্ঠু ও সচেতন ব্যবহার।
একটি দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনার মধ্যে এমন কিছু কিছু উদ্দেশ্য, লক্ষ্য ও প্রকল্প থাকে যা বাস্তবায়নের জন্য দীর্ঘ সময় প্রয়োজন। এসব কর্মসূচির সব বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়। সুতরাং দীর্ঘকালীন প্রেক্ষাপট ও লক্ষ্য অর্জনের উদ্দেশ্যে যে পরিকল্পনা রচিত হয় তাকে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা বলে।
উদ্দীপকে উল্লিখিত পরিকল্পনা হলো ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা। এদেশের দারিদ্র্য বিমোচনে উক্ত পরিকল্পনার উদ্দেশ্যসমূহ হলো-
দারিদ্র্য হ্রাসের মাধ্যমে দারিদ্র্য দূরীকরণ, যা দুটি সুনির্দিষ্ট পথ অনুসরণের মাধ্যমে অর্জন করা হবে।
∎প্রথমটি হচ্ছে অথনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিতকরণ ও উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান সৃষ্টি।
∎ দ্বিতীয়টি হচ্ছে বণ্টনব্যবস্থার ন্যায্যতা নিশ্চিতকরণ।
∎গ্রামীণ অর্থনীতির প্রাণ ফিরিয়ে আনতে ব্যক্তি পর্যায়ে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পেদ্যোগ বৃদ্ধি এবং কৃষি খাতের উৎপাদন বৃদ্ধি হবে এই কৌশলের মূল উপাদান।
∎কৃষি খাতে উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে বৈচিত্র্য আনয়ন ও এই খাতের বাণিজ্যিকীকরণের জন্য পদক্ষেপ নেওয়া হবে এবং যারা কৃষি খাতে থাকবে, তাদের উচ্চ পারিশ্রমিক দেওয়া হবে।
∎এই পরিকল্পনায় দেশজ বিনিয়োগ কর্মসূচি (সিআইপি) বাস্তবায়নের উপর ভিত্তি করে খাদ্য নিরাপত্তা বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
∎শিক্ষা এবং প্রশিক্ষণের মাধ্যমে মানব উন্নয়নে বিশেষ মনোযোগ প্রদান করা হয়েছে।
∎প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী করা হবে এবং একই সাথে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমাতে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি পুনরুজ্জীবিত করা হবে।
∎সীমিত ভূমি সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে ভূমি ব্যবহার ও ব্যবস্থাপনা নীতিমালা গ্রহণ করা হবে।
সুতরাং বলা যায়, উল্লিখিত উদ্দেশ্য সাধনের মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্য নিয়ে ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
উদ্দীপকের আলোকে ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার স্বাতন্ত্র্য নিচে বিশ্লেষণ করা হলো-
প্রেক্ষাপট, উদ্দেশ্য, লক্ষ্য ও নীতি কৌশল ইত্যাদি দিক থেকে অন্য পাঁচটি পঞ্চবার্ষিক উন্নয়ন পরিকল্পনার থেকে ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা কিছুটা ভিন্নধর্মী। কারণ ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যমাত্রাগুলো প্রেক্ষিত পরিকল্পনার আওতার মধ্যেই নির্ধারিত ও বাস্তবায়িত হবে। ষষ্ঠ পরিকল্পনার শেষে এবং লক্ষ্যমাত্রার সব বাস্তবায়ন বাংলাদেশকে ভিশন-২০২১ ও MDG অর্জনে সহায়তা করবে। সুতরাং পরিষ্কারভাবে বোঝা যায়, ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার উদ্দেশ্য ও দায়িত্ব অন্য পাঁচটি উন্নয়ন পকিল্পনার। থেকে অনেকটাই পৃথক ধরনের।
ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাতগুলো হলো-আয় ও দারিদ্র্য, মানবসম্পদ উন্নয়ন, শক্তি সম্পদ ও অবকাঠামো, লিঙ্গ সমতা ও ক্ষমতায়ন, পরিবেশ সংরক্ষণ, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি এবং পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন। এ লক্ষ্যসমূহ বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা বাংলাদেশে আগামী দিনের জন্য টেকসই উন্নয়নের স্থায়ী ও সক্ষম ক্ষেত্র তৈরির জন্যই প্রণীত হয়েছে, কোনো স্বল্পকালীন অর্থনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের জন্য নয়। এ দিক থেকে পরিকল্পনাটির আর্থসামাজিক বিশেষত্ব রয়েছে।
ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার জন্য গৃহীত উন্নয়ন কৌশলেও কিছুটা ভিন্নতা লক্ষ করা যায়। যেমন- দরিদ্রবান্ধব জিডিপি বৃদ্ধি, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, পরিবেশ সংরক্ষণ, দুর্নীতি হ্রাস ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা, প্রশাসনিক সক্ষমতা ও দক্ষতা বৃদ্ধি, পরিকল্পনার ফলপ্রসূ পর্যবেক্ষণ ইত্যাদি।
সুতরাং বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, বিগত পাঁচটি পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার গতানুগতিক কাঠামো থেকে ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার স্বাতন্ত্র্য আংশিকভাবে হলেও দৃশ্যমান।
Related Question
View Allউন্নয়ন পরিকল্পনা তিন প্রকার।
সাধারণত কয়েকটি স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনার মধ্যে যেসব কর্মসূচি, প্রকল্প ও লক্ষ্য অন্তর্ভুক্ত থাকে জাতীয় স্বার্থে সেগুলো অল্প কয়েক বছরের মধ্যেই বাস্তবায়িত হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু প্রকৃত অর্থে স্বল্প সময়ের মধ্যে এগুলো একত্রে বাস্তবায়ন সম্ব হয় না। তাই এসব কর্মসূচি, প্রকল্প ও লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রয়োজন হয়। তাই বলা যায়, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হলো কয়েকটি স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনার সমষ্টি।
উদ্দীপকে রশিদের কাজের ধারা স্বল্পমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনাকে নির্দেশ করছে।
এ ধরনের পরিকল্পনার মধ্যে এমন ধরনের কর্মসূচি, প্রকল্প ও লক্ষ্য অন্তর্ভুক্ত থাকে, যেগুলো জাতীয় স্বার্থে অল্প কয়েক বছরের মধ্যেই বাস্তবায়িত হওয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশে দ্বি-বার্ষিক ও পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনাগুলোকে স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনা বলা হয়। বাণিজ্যের প্রসার, কৃষি ও শিল্প উৎপাদন বৃদ্ধি, পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন, সেচব্যবস্থার প্রসার, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণ, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন প্রভৃতি লক্ষ্য সামাজিক স্বার্থে স্বল্প সময়ের মধ্যে অর্জন করা দরকার। স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনার মূল বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এক বছরের বেশি অথচ সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের সময়সীমা বিবেচনা করে এই পরিকল্পনা করা হয়। সুনির্দিষ্ট আর্থসামাজিক লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনা করা হয়। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অনিশ্চয়তা হ্রাস করে। এ ধরনের পরিকল্পনায় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পথ ত্বরান্বিত করার জন্য বাস্তব পদক্ষেপ গ্রহণ করা যায়। উন্নয়ন কর্মসূচিগুলোর সফলতা ও ব্যর্থতা মূল্যায়ন করে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়।
অতএব বলা যায়, স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনা এমন কিছু পরিকল্পনা, যেখানে জাতীয় স্বার্থ অন্তর্নিহিত থাকে।
উদ্দীপকে রশিদের কাজের ধারা স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনাকে নির্দেশ করে। আবার ইউনুসের কাজের ধারা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাকে নির্দেশ করছে। এ দুই ধরনের পরিকল্পনা দেশের উন্নয়নের জন্য ব্যবহৃত। নিচে এই দুই ধরনের পরিকল্পনার তুলনা করা হলো-
সাধারণ সময়সীমার মধ্যে কতগুলো সুনির্দিষ্ট আর্থসামাজিক লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য যে পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়, তাকে স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনা বলে। পক্ষান্তরে দীর্ঘ সময়ের মধ্যে বাস্তবায়নযোগ্য কোনো লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নির্বাচন করে যে পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়, তাকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বলে।
সাধারণত স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনার সময় ১-৫ বছর পর্যন্ত হতে পারে। পক্ষান্তরে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মেয়াদ ১০-২৫ বছর পর্যন্ত হতে পারে। স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের ভেতর ব্যক্তির ক্ষুদ্রস্বার্থ বেশি কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম। পক্ষান্তরে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় জাতীয় স্বার্থ ক্ষুদ্র স্বার্থ অপেক্ষা অগ্রাধিকার পায়। স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনা একটি অস্থায়ী পরিকল্পনা। এর মধ্যে অর্থনৈতিক অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত থাকতে পারে। পক্ষান্তরে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ভেতর অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তসমূহের স্থয়িত্ব, অস্তিত্ব, সঠিক কর্মদক্ষতা ও দিকনির্দেশনা থাকে। স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনা অর্থনৈতিকভাবে কম কার্যকর ও ফলপ্রসূ ভূমিকা গ্রহণে সহায়ক। পক্ষান্তরে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা অর্থনৈতিকভাবে অধিক কার্যকর ও ফলপ্রসূ ভূমিকা গ্রহণে সহায়ক।
অতএব স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে।
পাঁচ বছরের বেশি অথচ সর্বোচ্চ পনেরো বছর পর্যন্ত সময়সীমার পরিকল্পনাই মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনা।
স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের পুনর্গঠন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য দেশে প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয় ১৯৭৩ সালে। প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় সরকারি খাতের ব্যয় বরাদ্দের ৮১% ও বেসরকারি খাতের ব্যয় বরাদ্দের ৪৯.১১% অর্থ ব্যয় করা সম্ভব হয়। বার্ষিক জিডিপি বৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৫.৫-এর স্থলে প্রকৃত বৃদ্ধি হয়েছিল ৪% হারে। বার্ষিক মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির লক্ষ্য ২.৫% ধরা হলেও পরিকল্পনা শেষে তা বার্ষিক ১.১% হারে বৃদ্ধি পায়। জিডিপির বার্ষিক ১৫.২% হারে সঞ্চয় আহরণের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে সঞ্চয় আহরণের হার ছিল ৩.৯%।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!