আমাদের চারপাশে রয়েছে বিশাল প্রকৃতি ও বিচিত্র জীবজগৎ।এসবই পরম করুণাময় মহান আল্লাহর সৃষ্টি।
পবিত্র কুরআনে প্রায় ২০০টি আয়াতে প্রাণিজগতের বিষয়ে উল্লেখ করা রয়েছে। এমনকি বিভিন্ন প্রাণীর নামেও কয়েকটি সূরার নামকরণ করা হয়েছে। যেমন- সূরা বাকারা (গাভি), সূরা আন'আম (চতুষ্পদ জন্তু), সূরা নাহল (মৌমাছি), সূরা নামল (পিপীলিকা), সূরা আনকাবুত (মাকড়সা), সূরা ফিল (হাতি) ইত্যাদি। এতে সহজেই বোঝা যায় যে, মহান আল্লাহর সৃষ্টি হিসেবে জীববৈচিত্র্যের গুরুত্ব অপরিসীম। পৃথিবীর প্রতিটি জীবই কোনো না কোনোভাবে পরিবেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সকল উদ্ভিদ ও প্রাণী পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল। প্রত্যেক প্রজাতির উদ্ভিদ ও প্রাণীর আলাদা আলাদা ভূমিকা রয়েছে। আমাদের চারপাশে অনেক রকমের গৃহপালিত পশু রয়েছে। মহান আল্লাহ সেগুলোকে আমাদের উপকারের জন্য সৃষ্টি করেছেন।
মহানবি (স.) পশু-পাখির অধিকার রক্ষায় সোচ্চার ছিলেন। -অযথা প্রাণীহত্যা থেকে বিরত থাকতে তিনি নির্দেশ দিয়েছেন।
হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বর্ণনা করেছেন, আমরা রাসুলুল্লাহ (স.)-এর সঙ্গে এক সফরে গিয়েছিলাম। তিনি আমাদের কাছ থেকে একটু দূরে গেলে আমরা একটি লাল পাখি দেখতে পেলাম। পাখির সঙ্গে দুইটি বাচ্চা ছিল এবং আমরা বাচ্চা দুইটিকে ধরলাম। এসময় মা লাল পাখি তার ডানা দিয়ে মাটিতে আঘাত করছিল। মহানবি (স.) ইতোমধ্যে ফিরে এসে বললেন, কে এই পাখির বাচ্চাদের ধরে এনে কষ্ট দিয়েছে? তাদের ফিরিয়ে দাও। মহানবি (স.) সেখানে একটি পিঁপড়ার ঢিবিও লক্ষ করলেন, যা আমরা পুড়িয়ে দিয়েছিলাম। তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেন, এ আগুন কে দিয়েছে? আমরা উত্তর দিলাম, আমরা দিয়েছি। তিনি বললেন, আগুনের রব ছাড়া আর কেউ আগুন দিয়ে শাস্তি দিতে পারে না। (রিয়াদুস সালিহিন)
জীবজগৎ ও প্রকৃতি সংরক্ষণের জন্য করণীয় আটটি কাজের তালিকা নিচে তৈরি করা হলো-
| ১. পরিবেশ দূষণ রোধ করা; ২. পানির অপচয় রোধ করা; ৩. বেশি করে গাছ লাগানো এবং সেগুলোর যত্ন নেওয়া; ৪. প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ করা; ৫. সম্পদের অপচয় রোধ করা; ৬. প্রাণীদের অযথা হত্যা না করা; ৭. পশু-পাখিকে কষ্ট না দেওয়া; ৮. সষ্ঠভাবে প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহার করা। |
সাহাবিগণের জীবন থেকে আমরা জীবজগৎ ও প্রকৃতি রক্ষার গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাগুলো পাই। তাঁরা আল্লাহর সৃষ্টি হিসেবে সকল প্রাণী, উদ্ভিদ, ও প্রকৃতিকে ভালোবাসতেন এবং যত্ন নিতেন। সাহাবিগণের জীবন থেকে আমরা প্রাণীর প্রতি দয়া করা শিখি। সাহাবিগণ কোনো প্রাণীকে কষ্ট দিতেন না এবং অসহায় প্রাণীকে সাহায্য করতেন, গাছপালা ও পরিবেশ রক্ষা করার শিক্ষা পাই। অযথা গাছ না কাটা, কৃষিজমি ধ্বংস না করার নির্দেশ দিতেন। সাহাবিগণ থেকে আমরা পরিবেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার শিক্ষা পাই। সর্বশেষ আমরা সাহাবিগণ থেকে কোনো কিছু অতিরিক্ত ব্যবহার না করে মিতব্যয়ী হওয়ার শিক্ষা পাই। সাহাবিগণ পানি, খাদ্য বা প্রাকৃতিক সম্পদ অপচয় করতেন না।
সুতরাং সাহাবিগণের জীবনী থেকে আমরা শিক্ষা পাই যে, প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা করা এবং সৃষ্টির প্রতি সদয় হওয়া একজন মুমিনের নৈতিক দায়িত্ব।
মানবজাতির অস্তিত্ব রক্ষার জন্য জীববৈচিত্র্যের প্রয়োজন।
আমাদের প্রয়োজনীয় খাদ্য, ওষুধপত্র, কাঠ, বিভিন্ন শিল্পের কাঁচামাল ইত্যাদি আমরা জীবজগৎ থেকে পেয়ে থাকি। উদ্ভিদ থেকে আমরা খাদ্যশস্য, ওষুধের কাঁচামাল, তুলা, কাঠ ইত্যাদি পাই। আবার প্রাণী থেকে পাই মাছ, গোশত, দুগ্ধসামগ্রী, চামড়া, মধু ইত্যাদি। আমাদের বাড়িঘর নির্মাণ, আসবাবপত্র তৈরি, জ্বালানি, কাগজ উৎপাদন প্রভৃতি কাজের জন্য আমরা যে কাঠ ব্যবহার করি, তা গাছ থেকে পাই। এককথায় আমাদের খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য আমরা প্রত্যক্ষ বা 'পরোক্ষভাবে জীববৈচিত্র্যের ওপর নির্ভরশীল।
পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় 'জীববৈচিত্র্য বিশেষ ভূমিকা পালন করে। নদ-নদী, খাল-বিল, পুকুর, হাওর-বাঁওড়সহ জলাশয়গুলো পরিবেশ রক্ষায় ব্যাপক ভূমিকা পালন করে থাকে। এছাড়া পরিবেশকে শীতল রাখা, বর্ষা মৌসুমে বন্যা প্রতিরোধ, শহরে জলাবদ্ধতা নিরসন, পানির চাহিদা পূরণ ও আবর্জনা পরিশোধনে জলাভূমিগুলোর গুরুত্ব অপরিসীম।
পরিবেশ দূষণ রোধে জীববৈচিত্র্যের ভারসাম্য বজায় রাখা আবশ্যক। পরিবেশে অক্সিজেনের সরবরাহ ঠিক রাখতে এবং পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত ঘটাতে উদ্ভিদের ভূমিকা অপরিহার্য। নদ-নদী ও জলাশয়ে বৃষ্টিপাতের মাধ্যমে পর্যাপ্ত পানি জমা হয়। সেখানে মাছ ও অন্যান্য জলজ উদ্ভিদ সঠিকভাবে বৃদ্ধি পায়। কৃষির জন্যও আমাদের বৃষ্টির প্রয়োজন হয়। এসবই মহান আল্লাহর দান।
বাংলাদেশ জীববৈচিত্র্যে ভরপুর। এদেশের খাল-বিল, হাওর-বাঁওড়,
সাগর-নদী, পুকুর, জলাশয় ইত্যাদিতে রয়েছে নানা প্রজাতির মাছ এবং অন্যান্য জলজ প্রাণী ও উদ্ভিদ। এগুলো আমাদের জীবনধারণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তাই জীববৈচিত্র্য, রক্ষার প্রতি আমাদেরকে যত্নশীল হতে হবে।
হজরত আবু বকর (রা.) সেনাবাহিনীকে যুদ্ধে প্রেরণের সময় গাছ না ক্লাটা, কৃষিজমি ধ্বংস না করা বা পশু হত্যা না করার নির্দেশ দিতেন।বৃক্ষনিধন জীববৈচিত্র্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এর ফলে জলবায়ু বিপর্যয়, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাসসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দেয়। উদ্ভিদ কমে গেলে অক্সিজেন কমে যায়। খরা ও অনাবৃষ্টি দেখা দেয়। পাখি প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বৃদ্ধির পাশাপাশি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে; কিন্তু শীতের মৌসুমে শিকারিরা অতিথি পাখিদের শিকার করে বাজারে বিক্রি করে। অতিথি পাখি ও অন্যান্য প্রাণীর জীবন ও নিরাপত্তার প্রতি আমাদের যত্নশীল হতে হবে। সকল ক্ষেত্রে জীববৈচিত্র্যের জন্য ক্ষতিকর কাজ পরিহার করতে হবে।
পবিত্র কুরআন ও হাদিসে জীববৈচিত্র্য সংক্ষণের ব্যাপারে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। কোনো প্রাণী যদি বিপন্ন হয় এবং তার অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়ে, তাহলে তা সংরক্ষণে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। হজরত নূহ (আ.)-এর মহাপ্লাবনের সময় মহান আল্লাহ প্রাণিকুলের অস্তিত্ব রক্ষার নির্দেশ দিয়েছিলেন। এ সম্পর্কে তিনি বলেন, "যখন আমার আদেশ এসে গেল এবং চুলা উথলে (পানিতে) উঠল; আমি (নুহকে) বললাম, তাতে (নৌকায়) প্রতিটি শ্রেণির (প্রাণীর) দুটি করে জোড়া তুলে নাও।" (সূরা হ্রদ, আয়াত: ৪০)
মহানবি (স.) পশুপাখির অধিকার রক্ষায় সোচ্চার ছিলেন। তিনি অযথা প্রাণী হত্যা থেকে বিরত থাকতে তিনি নির্দেশ দিয়েছেন।
পানির অপচয় রোধে মহানবি (স.) খুবই সচেতন ও যত্নবান ছিলেন। "একদা মহানবি (স.) প্রখ্যাত সাহাবি হজরত সা'দ (রা.)-এর পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন তিনি ওজু করছিলেন। মহানবি (স.) বললেন, সা'দ! পানির অপচয় করছ কেন? তিনি (সা'দ) বললেন, ওজুর ক্ষেত্রে কি পানির অপচয় হতে পারে? তিনি বললেন, হ্যাঁ, এমনকি তুমি প্রবাহিত পানির পাশে থাকলেও (নদীর পানি বেশি ব্যবহার করলেও পানির অপচয় হবে)" (সুনানে ইবনে মাজাহ)
জীবজগৎ ও প্রকৃতি সংরক্ষণের জন্য করণীয় তিনটি কাজ হলো-
১।বেশি করে গাছ লাগানো এবং সেগুলোর যত্ন নেওয়া।
২।চারপাশের উদ্ভিদ ও প্রাণীর সঠিক যত্ন ও পরিচর্যা করা।
৩।পরিবেশদূষণ রোধ করা।
Related Question
View Allপরিবেশ দূষণ রোধে জীববৈচিত্র্যের ভারসাম্য বজায় রাখা আবশ্যক।
মহানবি (স.) নিজে গাছপালার পরিচর্যা করতেন।
পরিবেশ রক্ষায় আমরা নিয়মিত গাছের পরিচর্যা করব।
জীবজগৎ সংরক্ষণের জন্য প্রাণীদের অযথা হত্যা করব
জীবজগৎ ও প্রকৃতিকে ভালোবেসে আমরা তাদের সংরক্ষণ করব।
আমাদের চারপাশে রয়েছে বিশাল প্রকৃতি।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!