ঈশ্বর এক ও অদ্বিতীয় হলেও তিনি জগতের কল্যাণার্থে ভিন্ন ভিন্ন রূপ ধারণ করেন এবং তাঁর এই গুণ বা ক্ষমতার প্রকাশিত রূপই হলো দেব-দেবী। দেব-দেবীরা মূলত পরমেশ্বরের একেকটি বিশেষ শক্তির প্রতীক হিসেবে কাজ করেন। যেমন- সৃষ্টি করার শক্তির প্রতীক হলেন ব্রহ্মা, প্রতিপালন ও রক্ষার শক্তির প্রতীক হলেন বিষ্ণু এবং ধ্বংস বা সংহারের শক্তির প্রতীক হলেন শিব। এছাড়া, দেবী দুর্গা পরমেশ্বরের অজেয় শক্তির রূপ এবং দেবী সরস্বতী তাঁর বিদ্যা ও জ্ঞান দানকারী শক্তির প্রতীক। বৈদিক দেবতা অগ্নি যজ্ঞের সারথী ও সকল জীবের আশ্রয়স্থলের প্রতীক হিসেবে পূজিত হন। আবার মা মনসা সর্পদংশন থেকে রক্ষা ও প্রজনন শক্তির প্রতীক হিসেবে আমাদের নিকট পরিচিত। অর্থাৎ, বিভিন্ন দেব-দেবী মূলত এক ঈশ্বরেরই বহুমুখী দিব্য শক্তির সাকার প্রকাশ।
ঋগ্বেদে অগ্নিদেবকে অত্যন্ত মহান ও শক্তিশালী দেবতা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। নিচে তার দৈহিক গঠন ও বাহন সম্পর্কে লেখা হলো-
দৈহিক গঠন: অগ্নিদেবতার দেহবর্ণ উজ্জ্বল লাল বা সুবর্ণ এবং তিনি
প্রজ্বলিত অগ্নিশিখার মতো দীপ্তিময়। তাঁর তিনটি মুখ, চারটি হাত, তিনটি জিহ্বা ও তিনখানা পা রয়েছে। তাঁর মাথায় সাতটি শিখা বা রশ্মি বিরাজমান। অগ্নিদেবতার কেশ ও দাড়ি সোনালি বর্ণের এবং চোখ দীপ্তিমান। তিনি সর্বদা জ্যোতির্ময় ও কান্তিময় শক্তির প্রতীক।
রাহন: ছাগ হলো অগ্নিদেবতার প্রধান বাহন। এছাড়া তিনি লালবর্ণের সাতটি ঘোড়া সংযুক্ত তিন চাকা বিশিষ্ট একটি রথে আরোহণ করেন।
বৈদিক যজ্ঞে অগ্নিদেবকে সতুষ্ট করার জন্য বৈদিক মন্ত্র পাঠ করা হয় এবং বিভিন্ন পবিত্র উপকরণ ব্যবহার করা হয়। এগুলো যজ্ঞে অর্পণ করা হয়। যজ্ঞের উপকরণসমূহ, ঘৃত, তিল, নবধান্য, সমিধ প্রভৃতি। উক্ত উপকরণগুলোর মাধ্যমে অগ্নিকে হোম দেওয়া হয়। তিনি দেবতাদের কাছে যজ্ঞের অংশ পৌঁছে দেন।
মনসা হলেন সর্পদেবী এবং লৌকিক দেব-দেবীদের মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দেবী। তাঁর অপর নাম বিষহরা এবং পদ্মাবতী। পুরাণ অনুযায়ী তিনি ঋষি কশ্যপের কন্যা, নাগরাজ বাসুকির ভগিনী এবং খঋষি জরৎকারুর স্ত্রী। মা মনসা সর্প দ্বারা পরিবেষ্টিত এবং তিনি সাধারণত হংস বা পদ্মের উপর অবস্থান করেন। তাঁর চারটি হাত রয়েছে;, বাম দিকের হাতে পদ্ম ও সর্প, ডান দিকের হাতে শ্বেতপদ্ম ও বরাভয় থাকে। মাথার উপর সাতটি, এগারোটি বা বিয়াল্লিশটি সর্পের ফণা ছাউনির মতো অবস্থান করে।
নিচে মনসা পূজার উদ্দেশ্য ও পূজায় ব্যবহৃত উপকরণ সম্পর্কে লেখা হলো-
মনসা পূজার উদ্দেশ্য: মা মনসার পূজার মূল উদ্দেশ্য হলো সর্পদংশনের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া। এছাড়া তিনি প্রজনন দেবী হিসেবে পরিচিত, তাই বিবাহের সময় সন্তান কামনা এবং পরিবারে সমৃদ্ধি ও ঐশ্বর্য লাভের জন্যও তাঁর পূজা করা হয়। নাগপঞ্চমী বা মনসা পূজার মাধ্যমে ভক্তরা তাঁর আশীর্বাদ গ্রহণ করেন এবং ভয় ও বিপদ দূর করার জন্য প্রার্থনা করেন।
মনসা পূজায় ব্যবহৃত উপকরণ: মনসা দেবীর পূজায় ঘট, সিঁদুর, মধু, হরীতকী, তিল, বেলপাতা, পুষ্প, দূর্বা, তুলসী, আম্রপল্লব এবং দুধ ব্যবহার করা হয়। এছাড়া পূজার সময় পুষ্প, কলাসহ অন্যান্য ধর্মীয় উপকরণও ব্যবহৃত হয়। এগুলো পূজার মাধ্যমে দেবীর প্রতি ভক্তি প্রদর্শন এবং তাঁর কৃপা প্রার্থনা করা হয়।
ঈশ্বর সর্বশক্তিমান ও এক অদ্বিতীয় সত্তা। তিনি নির্গুণ, কারণ তাঁর কোনো সীমা বা নির্দিষ্ট গুণ নেই। আবার মানব কল্যাণের জন্য তিনি সগুণ রূপে প্রকাশিত হন। একইভাবে তিনি নিরাকার হলেও মানুষের বোধগম্যতার জন্য সাকার রূপ ধারণ করেন। মানুষের উপাসনা ও সাধনার সুবিধার্থেই ঈশ্বর বিভিন্ন রূপে আবির্ভূত হন। এসব রূপের মধ্য দিয়ে মানুষ ঈশ্বরকে অনুভব করতে পারে। তাই নির্গুণ ও সগুণ-উভয় রূপেই ঈশ্বরের অস্তিত্ব বিদ্যমান।
প্রাচীনকালে মানুষ প্রকৃতির বিভিন্ন শক্তির উপর নির্ভরশীল ছিল। মুনি-ঋষিরা সূর্য, অগ্নি, বৃষ্টি ও বিদ্যুৎ দেখে বিস্মিত হতেন। তাঁদের চিন্তাভাবনা থেকেই প্রাকৃতিক শক্তিগুলো দেবতার রূপ পায়। অগ্নি, ইন্দ্র, বরুণ প্রমুখ দেবতা প্রকৃতির শক্তিকে বোঝায়। এসব শক্তিকে সম্মান জানাতেই দেবরূপে পূজা করা হতো। বৈদিক যুগে প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের গভীর সম্পর্ক ছিল। তাই 'বৈদিক দেবতারা মূলত প্রাকৃতিক শক্তির প্রতীক।
মা মনসার রূপ ও প্রতীকী বৈশিষ্ট্যগুলো নিম্নরূপ-
১. তিনি সর্প পরিবেষ্টিতা দেবী।
২. তাঁর চারটি হাত রয়েছে।
৩. তিনি পদ্ম, সর্প, শ্বেতপদ্ম ও বরাভয় মুদ্রা ধারণ করেন।
৪. তাঁর মাথার উপর সাতটি বা এগারোটি বা বিয়াল্লিশটি সর্পফণার ছাউনি থাকে।
৫. হংস বা পদ্মে তিনি অবস্থান করেন।
৬. তাঁর গলদেশে সাপ পেঁচানো থাকে।,
মনসা পূজা সাধারণত সর্পদংশন থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য করা হয়। তিনি প্রজনন দেরী হিসেবেও পূজিত। বিবাহ, সন্তান কামনা ও ঐশ্বর্য লাভের জন্য তাঁর পূজা হয়। আষাঢ় মাসের কৃষ্ণপক্ষের পঞ্চমীতে নাগপঞ্চমী পালিত হয়। বাংলাদেশে শ্রাবণ সংক্রান্তিতে মনসা পূজা হয়। এই পূজাকে কেন্দ্র করে মানুষের সমাগম ঘটে। ফলে সমাজে সম্প্রীতি ও সংহতি বৃদ্ধি পায়।
নিচে অগ্নিদেবতার প্রণাম মন্ত্রটি সরলার্থসহ লেখা হলো-
অগ্নির প্রণাম মন্ত্র:
নমো নমস্তে ত্রিপুরারিচক্ষুষে, মখেশ্বরাণাং মখতামুপেয়ুষে।
চরাচরাণাং জঠরেষে স্বীয়তে ত্রিধাবিভক্তয় নমোহস্তু বহ্নয়ে।।
(পুরোহিত-দর্পণ, পৃষ্ঠা, ৫৬)
সরলার্থ: ত্রিপুরারী শিবের তৃতীয় নয়নরূপ অগ্নিদেবকে প্রণাম! তিনি যজ্ঞের দেবতাদের মুখে পৌঁছান, যজ্ঞ আহুতি গ্রহণ করেন। তিনি জড় ও চেতন সকল সত্তার অন্তরে অবস্থান করেন। তিনি তিনভাগে বিভক্ত হয়ে বিরাজমান, সেই অগ্নিদেবকে আমার প্রণাম।
Contribute high-quality content, help learners grow, and earn for your efforts! 💡💰'
Related Question
View Allসাধকেরা তাঁর শক্তিকে দেব-দেবী রূপে উপাসনা করেন।
ঋগ্বেদে অগ্নিকে অন্যতম দেবতা হিসেবে স্তুতি করা হয়েছে।
অগ্নির গাত্রবর্ণ উজ্জ্বল লাল বা সুবর্ণ l
মা মনসার অপর নাম বিষহরা ও. পদ্মাবতী l
মনসা দেবী সর্প। পরিবেষ্টিতা।
১. ঈশ্বর সর্বশক্তিমান।
২. ঈশ্বরের গুণ বা ক্ষমতার প্রকাশিত রূপ হলো দেবী-দেবী।
৩.ঈশ্বর সৃষ্টি করেন ব্রহ্মা রূপে।
৪. দেবী দুর্গা শক্তির প্রতীক।
৫. বৈদিক দেরতারা হলেন অগ্নি, ইন্দ্র, সোম।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!