হিন্দুধর্মকে সনাতন ধর্ম বলা হয় কারণ 'সনাতন' শব্দের অর্থ চিরন্তন বা চিরকালীন, যা পূর্বে ছিল, এখন আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। অর্থাৎ যা অপরিবর্তনীয়। এই ধর্মের মূল শিক্ষা ও আচরণ যেমন- কেউ গৃহে এলে তাকে উঠে বসার আসন দেওয়া, তৃষ্ণার্তকে জল দেওয়া, ক্ষুধার্তকে খাদ্য দেওয়া, সুন্দরভাবে কথা বলা। এসব আচরণ সবসময় মঙ্গলদায়ক এবং মানুষের কর্তব্য হিসেবে বিবেচিত। বেদ, রামায়ণ, মহাভারত ও শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার মতো ধর্মগ্রন্থে 'সনাতন' শব্দের উল্লেখ রয়েছে। ভালো কথা ও ভালো কাজ যুগ যুগ ধরে সনাতন ধর্ম নামে পরিচিত। হিন্দু ধর্মবিশ্বাসে এই অবিনাশী বাণী, চিরন্তন আচরণ শ্রদ্ধার সঙ্গে চর্চা করা হয়। এজন্য হিন্দুধর্মকে সনাতন ধর্ম বলা হয়।
হিন্দুধর্মের মৌলিক বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে নিচে আটটি বাক্য লেখা হলো-
১.হিন্দুধর্মে একজন সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব স্বীকার করা হয়, যিনি সাকার ও নিরাকার দুইভাবেই পূজিত হন।
২. ঈশ্বর সর্বত্র বিরাজ করেন- প্রকৃতি ও জীবের মধ্যেও তাঁর অস্তিত্ব রয়েছে।
৩. হিন্দুধর্মে প্রকৃতি পূজার মাধ্যমে প্রকৃতি সংরক্ষণের গুরুত্ব দেওয়া হয়।
৪. জীবসেবার মাধ্যমে জীবের মঙ্গল ও রক্ষাকে ধর্মের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে মানা হয়।
৫. জন্মান্তর ও কর্মফল বিশ্বাস করা হিন্দুধর্মের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য।
৬. এই ধর্মে ঈশ্বরকে মঙ্গলময়, প্রেমময় ও অতি আপন' হিসেবে ভাবা হয়।
৭. ভালো কাজ ও সুন্দর আচরণকে যুগ যুগ ধরে চর্চার কারণে এই ধর্মকে সনাতন বা চিরন্তন বলা হয়।
মানুষের পূর্ব জন্মের কর্মই তার পরবর্তী জন্ম নির্ধারণ করে। যারা ভালো কাজ করে তারা সুখ, শান্তি ও কল্যাণময় পরিবেশে জন্ম নেয়। আর যারা মন্দ কাজ করে, তাদের জন্ম হয় কষ্ট ও সমস্যা ভোগ করতে। জন্ম-মৃত্যু কেবল দেহের পরিবর্তন, কিন্তু আত্মা অবিনাশী। পূর্বজন্মের কর্মফল অনুযায়ী আত্মা নতুন দেহ গ্রহণ করে, তাই জীবনের প্রতিটি কাজ গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য আমাদের অন্যের ক্ষতি না করে' সবসময় ভালো কাজ করা উচিত। এভাবেই জীবন ধারাবাহিক কর্মফল ও পুনর্জন্মের নিয়মে এগিয়ে চলে।
গান্ধারী ও শ্রীকৃষ্ণের কথোপকথন থেকে আমরা এ শিক্ষা পাই যে, মানুষের প্রতিটি কাজেরই ফল আছে। ভালো কাজের ফল ভালো হয়, আর মন্দ কাজের ফল মন্দ হয়। পূর্ব জন্মের কর্মও বর্তমান জন্মে প্রভাব ফেলে। তাই বীনা কারণে কোনো প্রাণীকে কষ্ট দেওয়া বা হত্যা করা উচিত নয়। আমাদের সর্বদা ন্যায়, দয়া ও সততার পথে চলা উচিত, কারণ কর্মফল একদিন আমাদের কাছেই ফিরে আসে। এই শিক্ষা আমাদের জীবনকে সৎ ও শান্তিপূর্ণ পথে পরিচালিত করে।
আত্মা সম্পর্কে শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় বর্ণিত শ্লোকটি নিচে সরলার্থসহ লেখা হলো-
বাসাংসি জীর্ণানি যথা বিহায় নবানি গৃহ্লাতি নরোহপরাণি। তথা শরীরাণি বিহায় জীর্ণান্যন্যানি সংযাতি নবানি দেহী।। (২/২২)
সরলার্থ : মানুষ যেমন জীর্ণ বস্ত্র ত্যাগ করে নতুন বস্ত্র পরিধান করে, আত্মাও তেমনি জীর্ণ শরীর ত্যাগ করে নতুন শরীর গ্রহণ করে।
হিন্দুধর্মীয় বিধিবিধান: ও অনুশাসন পরিবারিক ও সামাজিক জীবনে অনুশীলন করার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে নিচে আটটি বাক্য
লেখা হলো-
১. এগুলো শরীর ও মনকে সুস্থ রাখে।
২. নিয়মিত নিত্যকর্ম জীবনকে শৃঙ্খলিত করে।
৩. গুরুজনদের শ্রদ্ধা পারিবারিক সম্পর্ক দৃঢ় করে।
৪. অনুশাসন সমাজে শৃঙ্খলা ও সম্প্রীতি বাড়ায়।
৫. আমাদের আদর্শ মানুষ হতে শেখায়।
৬. মাতা-পিতা ও গুরুজনদের প্রতি ভক্তি শেখায়।
৭. বৃক্ষ ও প্রাণীর সেবা এবং পরিবেশের প্রতি যত্ন শেখায়।'
৮. এগলো আমাদের নৈতিক শিক্ষার ভিত্তি।
পাঠ্যপুস্তক অবলম্বনে প্রাতঃকৃত্যের মন্ত্রটি নিচে সরলার্থসহ লেখা হলো-
ব্রহ্মা মুরারিস্ত্রিপুরান্তকারী ভানুঃ শশী ভূমিসুতো বুধশ্চ।
গুরুশ্চ শুক্রঃ শনিরাহুকেতুঃ কুর্বন্তু সর্বে মম সুপ্রভাতম্।।
(চতুর্দশ অধ্যায়, বামন পুরাণ)
সরলার্থ: ব্রহ্মা, মুরারি, ত্রিপুরের বিনাশকারী শিব, সূর্য, চন্দ্র, বুধ, গুরু বৃহস্পতি, শুক্র, শনি, রাহু, কেতু, সকলে আমার সকালটিকে সুন্দর করুন।
স্তব: দেবতাদের প্রশংসা বা গুণগান করাকে স্তব বলে। এতে দেবতার মহত্ত্ব, বিরাটত্ব, শক্তি ও করুণার বর্ণনা করা হয়।
স্তোত্র: দেবতার উদ্দেশ্যে রচিত ছন্দোবদ্ধ কবিতা বা পদ্যকে স্তোত্র বলে। স্তোত্র সাধারণত দেবতার মহিমা ও গুণের কাব্যিক প্রকাশ।
প্রার্থনা: দেবতার কাছে নিজের, অন্যের ও বিশ্বের মঙ্গলের জন্য প্রার্থনা করা হয়। এতে আমরা শান্তি, জ্ঞান, শক্তি বা কল্যাণ কামনা করি।
স্তব, স্তোত্র ও প্রার্থনার গুরুত্ব:
১. স্তব, স্তোত্র ও প্রার্থনা আমাদের মনে শান্তি ও ভক্তি জাগায়।
২. এতে দেবতার প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা বৃদ্ধি পায়।
৩. মনোসংযম ও একাগ্রতা বাড়ে।
৪. আমাদের কণ্ঠ ও উচ্চারণ সুন্দর ও স্পষ্ট হয়।
আমার পাঠ্যপুস্তক অবলম্বনে নিচে উপনিষদের স্তোত্রটি সরলার্থসহ লেখা হলো-
তিলেঘু তৈলং দধনীব সর্পিরাপঃ স্রোতঃস্বরণীষু চাগ্নিঃ।
এবমাত্মাত্মনি গৃহ্যতেহসৌ সত্যেনৈনং তপসা যোহনুপশ্যতি।
(শ্বেতাশ্বতর উপনিষদ, ১/১৫)
সরলার্থ: যেমন তিল থেকে তেল, দধি থেকে ঘৃত, নদীগর্ভে জল, ঘর্ষণে কাঠ থেকে আগুন পাওয়া যায়, সেরূপ যিনি সত্যনিষ্ঠা ও তপস্যার সাথে পরমেশ্বরের ধ্যান ধরেন, তিনিই পরমাত্মাকে লাভ করে থাকেন।
আমার পাঠ্যপুস্তক অনুসারে বাংলা প্রার্থনা কবিতাটির প্রথম আট লাইন নিচে লেখা হলো-
আমার মাথা নত করে দাও হে তোমার
চরণধুলার তলে।
সকল অহংকার হে আমার
ডুবাও চোখের জলে।
নিজেরে করিতে গৌরব দান
নিজেরে কেবলই করি অপমান,
আপনারে শুধু ঘেরিয়া ঘেরিয়া
সর্বপ্রাচীন ধর্মগ্রন্থ ঋগ্বেদে ঈশ্বর সম্পর্কে বলা হয়েছে-"একং সদ্ বিপ্রা বহুধা বদন্তি।"
অর্থাৎ সদৃ বস্তু বা পরমেশ্বর এক। বিপ্র বা জ্ঞানী ব্যক্তিরা তাঁর বহু নাম দিয়েছেন। উদাহরণে সাহায্যে বিষয়টি নিচে ব্যাখ্যা করা হলো-আমরা যখন বন বলি, তখন অনেক গাছের সমষ্টি বোঝায়। বিচ্ছিন্নভাবে; কিন্তু সেগুলো বিভিন্ন নামের গাছ। যখন জলাশয় বলি তখন জলযুক্ত স্থানের সমষ্টি বোঝায়। আবার খাল-বিল-নদ-নদী-সমুদ্র যখন বলি তখন বিভিন্ন নামের জলাশয় বোঝায়। ঈশ্বরও এক। দেব-দেবী তাঁর বিভিন্ন নাম। ঈশ্বর সত্যসুন্দর, আনন্দময় ও মঙ্গলময়।
'সনাতন' শব্দের অর্থ চিরন্তন বা চিরকালীন, যা পূর্বে ছিল, এখন আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। অর্থাৎ যা অপরিবর্তনীয়। 'সনাতন' ধর্ম বলতে যে ধরনের কর্তব্য ও আচরণকে বোঝায়, নিচে
সে সম্পর্কে চারটি বাক্যে লেখা হলো-
১. কেউ গৃহে এলে তাকে উঠে বসার আসান দেওয়া।
২. তৃষ্ণার্তাকে জল দেওয়া।
৩. ক্ষুধার্তকে খাদ্য দেওয়া।
৪. সুন্দরভাবে কথা বলা ও ভালো কাজ করা।
আত্মা হলো জীবনের মূল সত্তা। আত্মা চলে গেলে আমাদের দেহ পড়ে থাকে। অর্থাৎ আমাদের মৃত্যু হয়।
আত্মার বৈশিষ্ট্যসমূহ নিম্নরূপ-
১. আত্মা অবিনাশী, অর্থাৎ আত্মার মৃত্যু নেই।
২. আত্মা অন্য দেহে ধারণ করে।
৩. আত্মা আছে বলেই আমরা বেঁচে আছি।
৪. আত্মার পথ পূর্ব জন্মের কর্মফলের ওপর নির্ভর করে।
৫. ভালো কাজ ও ঈশ্বর স্মরণ করলে আত্মা পুনর্জন্ম থেকে মুক্তি পায়।
গান্ধারী মহাভারতের একটি অন্যতম চরিত্র। তিনি শত পুত্র ও
এক কন্যার জননী ছিলেন। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে তার শতপুত্রের মৃত্যু হলে পুত্রশোকে তিনি আকুল হয়ে পড়েন। তখন তিনি শ্রীকৃষ্ণকে প্রশ্ন করেন, কোন পাপের ফলে তাকে এমন শোক ভোগ করতে হলো? শ্রীকৃষ্ণ জানান, "পূর্বজন্মে গান্ধারী খেলাচ্ছলে শত পতঙ্গকে বিদ্ধ করে মেরেছিল। সেই পাপের ফলেই এ জন্মে তাঁর শত পুত্রের মৃত্যু হয়েছে।" এই ঘটনাপ্রবাহ থেকে বোঝায় যায়, মানুষের প্রতিটি কর্মেরই ফল আছে। সে ফল বর্তমান জীবনেই হোক বা জন্মান্তরে, ভোগ করতেই হবে। তাই কর্মফলই মানুষের জীবনের সুখ-দুঃখ ও পুনর্জন্ম নির্ধারণ করে।
নিত্যকর্ম ছয় প্রকার। এগুলো হলো- প্রাতঃকৃত্য, পূর্বাহ্ণকৃত্য, মধ্যাহ্নকৃত্য, অপরাহুকৃত্য, সায়ংকৃত্য ও রাত্রিকৃত্য। নিচে দুটি নিত্যকর্ম সম্পর্কে লেখা হলো-
১.পূর্বাহ্ণকৃত্য: সকাল এবং দুপুরের মধ্য সময়ে যে কৃত্য করা হয় তা পূর্বাহ্ণকৃত্য। এই সময়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হয়ে প্রার্থনা এবং পূজা করতে হয়। এই সময়ই আহার ও অধ্যয়ন করতে হয়। কর্মস্থল ও বিদ্যালয়ে যেতে হয়। সকলেরই এটা পালন করা উচিত।
২.অপরাহকৃত্য: দুপুরের পর এবং সন্ধ্যার পূর্ব পর্যন্ত যে কৃত্য তা অপরাহকৃত্য। এটা মূলত বিকালবেলা। এই সময়ে আমাদের নিজের এবং পরিবারের প্রয়োজনীয় কাজ করতে হয়। খেলাধুলা ও ব্যায়ামের জন্য এটা উপযুক্ত সময়।
স্তব ও স্তোত্রের অর্থ স্তুতি বা প্রশংসা। আমরা যখন দেবতাদের মহত্ত্বে, বিরাটত্বে মুগ্ধ হয়ে তাঁর প্রশংসা করি তখন তাকে স্তব-স্তোত্র বলে।
শ্রীশ্রীচণ্ডীর স্তোত্রটি নিচে সরলার্থসহ লেখা হলো-
সৃষ্টি-স্থিতি-বিনাশানাং শক্তিভূতে সনাতনি।
গুণাশ্রয়ে গুণময়ে নারায়ণি নমোহস্তু তে।.। (১১/১১)
সরলার্থ: হে নারায়ণী! তুমি সৃষ্টি, স্থিতি ও বিনাশের শক্তিস্বরূপা, তুমি নিত্যা, তুমি সমস্ত গুণের আশ্রয়, তুমি গুণময়ী, তোমাকে নমস্কার।
Contribute high-quality content, help learners grow, and earn for your efforts! 💡💰'
Related Question
View Allঈশ্বর সত্যসুন্দর, আনন্দময় ও মঙ্গলময় l
হিন্দুধর্ম সনাতন ধর্ম নামেও পরিচিত।
যে ব্যক্তি ভালো কাজ করেন তিনি পুরস্কার পান।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!