ভূমিকা: মানুষ ভ্রমণ করতে পছন্দ করে। এই পছন্দকে কাজে লাগিয়ে ভ্রমণ-বান্ধব এক ধরনের ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে, যার নাম পর্যটন শিল্প। এই শিল্পের কাজ হলো কোনো অঞ্চলের দর্শনীয় স্থানগুলোর তথ্য ভ্রমণপিপাসু মানুষের কাছে তুলে ধরা, ভ্রমণের সুবন্দোবস্ত করা এবং এর মাধ্যমে অর্থ উপার্জন করা। বাংলাদেশের একাধিক বনাঞ্চল, পাহাড়-নদী-ঝরনা, শস্যশোভিত মাঠ ও সবুজ প্রকৃতি, বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র-সৈকত, নান্দনিক স্থাপত্য ও ভাস্কর্য, প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা ও নিদর্শন প্রভৃতি দেশ-বিদেশের পর্যটকদের আকর্ষণ করে। তাই বাংলাদেশে পর্যটন শিল্পের সম্ভাবনা প্রচুর। এগুলোর টানে বিপুল সংখ্যক বিদেশি পর্যটকের বাংলাদেশে আসার সুযোগ রয়েছে। এভাবে বাংলাদেশ পর্যাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে পারে। এটি বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
প্রথমে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন-কেন্দ্রসমূহের দিকে তাকানো যাক।
সুন্দরবন: বাংলাদেশের উপকূলবর্তী অঞ্চলে ৬ হাজার বর্গকিলোমিটারের অধিক জায়গা জুড়ে সুন্দরবন অবস্থিত। এটি পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল। খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা ও বরগুনা জেলায় এর অবস্থান। সুন্দরী বৃক্ষ, গোলপাতাসহ নানা জাতের উদ্ভিদ এবং চিত্রল হরিণ, বাঘ, বানর, হনুমানসহ নানা জাতের পশুপাখির আবাস এই সুন্দরবন। অভ্যন্তরে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য খালে রয়েছে কুমির। রোমাঞ্চপ্রিয় পর্যটকগণ নৌযানে করে সুন্দরবনের সৌন্দর্য উপভোগ করতে যেতে পারেন। ভয় ও ভালো-লাগার অপূর্ব মিশেলের কারণে সুন্দরবন ভ্রমণ যে-কোনো পর্যটকের স্মৃতিতে স্থায়ী হয়ে থাকে।
সিলেটের রাতারগুল: সিলেট জেলার গোয়াইনঘাটে অবস্থিত রাতারগুল জলাবন বাংলাদেশের একমাত্র মিঠাপানির বন। এর আয়তন ৩ হাজার ৩২৫ একর। ১০ ফুট গভীর পানির উপর বনের গাছপালা জেগে থাকে। বর্ষাকালে পানির গভীরতা হয় ২০-৩০ ফুট পর্যন্ত। পর্যটকগণকে নৌকায় করে বনের মধ্যে প্রবেশ করতে দেখা যায়। এখানে উপভোগ করার মতো আছে কদম, হিজল, অর্জুন, ছাতিম প্রভৃতি গাছের সৌন্দর্য। বেড়াতে বেড়াতে দেখা হয়ে যায় বানর, বেজি, গুঁইসাপ, কিংবা সাদা বক, মাছরাঙা, পানকৌড়ি প্রভৃতি প্রাণী ও পাখির সঙ্গে।
সমুদ্র সৈকত: কক্সবাজার জেলায় অবস্থিত কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত পৃথিবীর দীর্ঘতম (১২০ কিলোমিটার দীর্ঘ) প্রাকৃতিক সমুদ্র সৈকত। সমুদ্রের সৌন্দর্য উপভোগ করতে পর্যটকরা ভিড় করেন কক্সবাজারে। সমুদ্র ছাড়াও কক্সবাজার জেলায় রয়েছে একাধিক ক্ষুদ্র জাতিসত্তার ধর্মীয় উপাসনালয় ও বুদ্ধ মূর্তি। স্থাপত্যশিল্পের বিচারে এগুলো অমূল্য। এছাড়া চট্টগ্রামের পতেঙ্গা, কক্সবাজারের ইনানি, পটুয়াখালীর কুয়াকাটা, সুন্দরবনের কটকা প্রভৃতি সমুদ্র সৈকতে ভ্রমণপিপাসুরা বেড়াতে যান। বাংলাদেশের সর্বদক্ষিণে অবস্থিত সেন্টমার্টিন দ্বীপ বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ। সমস্ত দ্বীপ জুড়ে রয়েছে নারিকেল গাছ। দ্বীপ থেকে সমুদ্রের নীল জলরাশির সৌন্দর্য উপভোগ করতে এবং নানা রকমের প্রবাল দেখতে পর্যটকরা সেন্টমার্টিন দ্বীপে ভ্রমণ করেন।
পার্বত্য অঞ্চল: বাংলাদেশের পার্বত্য জেলাসমূহ অর্থাৎ রাঙামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাক্ষেত্র। একদিকে সুউচ্চ পাহাড়ের চূড়ায় উঠে মেঘ ছোঁয়ার আনন্দ, অন্যদিকে প্রাকৃতিক জলের উৎস ঝরনাধারা পর্যটকদের অভিভূত করে। রাঙামাটির কাপ্তাই হ্রদে নৌকায় ভেসে বেড়ানো যায়। হ্রদের উপরে একটি সুদৃশ্য ঝুলন্ত সেতু রয়েছে। খাগড়াছড়ি জেলার অন্তর্গত আলুটিলা পাহাড়, রিসাং ঝরনা, মায়াবিনী লেক প্রভৃতি স্থানে ভ্রমণের হাতছানি পর্যটকরা অগ্রাহ্য করতে পারে না। সিলেটের জাফলং-এর পিয়াইন নদীতে মনোমুগ্ধকর পাথুরে জলের ধারা, মৌলভীবাজারের মাধবকুণ্ড ঝরনা; হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, শ্রীমঙ্গল ও পঞ্চগড়ের চা বাগান; শ্রীমঙ্গলের ইকোপার্ক প্রভৃতি স্থান প্রায় সারাবছরই পর্যটকদের পদচারণায় মুখরিত থাকে। এ অঞ্চলসমূহে ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মানুষদের বর্ণিল জীবনাচারও পর্যটকদের আকর্ষণ করে। বাংলাদেশের একমাত্র পার্বত্য দ্বীপ মহেশখালী। বিখ্যাত আদিনাথ মন্দির ও বড়ো রাখাইনপাড়া বৌদ্ধ মন্দির এই দ্বীপেই অবস্থিত।
পুরাকীর্তি: বাংলাদেশের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলোর রয়েছে ঐতিহাসিক গুরুত্ব। পুরান ঢাকার লালবাগে অবস্থিত মুঘল স্থাপত্য লালবাগ কেল্লা, বুড়িগঙ্গার তীরে নির্মিত আহসান মঞ্জিল, নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও-এ গড়ে ওঠা অনুপম স্থাপত্য শৈলীবিশিষ্ট পানাম নগর, কুমিল্লায় আবিষ্কৃত প্রাচীন নগর ময়নামতী, বগুড়ার প্রাচীন পুরাকীর্তি মহাস্থানগড়, নরসিংদী জেলার বেলাব উপজেলার অন্তর্গত আড়াই হাজার বছর পূর্বের প্রত্ননিদর্শন সংবলিত উয়ারী ও বটেশ্বর গ্রাম, নওগাঁ জেলায় আবিষ্কৃত পৃথিবীর সবচেয়ে বড়ো বৌদ্ধবিহার পাহাড়পুর, বাগেরহাটের ষাটগম্বুজ মসজিদসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে রয়েছে প্রাচীন ও আধুনিক স্থাপত্যকলার বহু নিদর্শন।
ঐতিহাসিক স্থাপনা: আরেক শ্রেণির স্থাপত্য বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করছে। ১৯৫২ সালে সংঘটিত ভাষা আন্দোলনের শহিদদের স্মরণে ঢাকা মেডিকেল প্রাঙ্গণে স্থাপিত কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার, বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের শহিদদের প্রতি নিবেদিত ও ঢাকার সাভারে অবস্থিত জাতীয় স্মৃতিসৌধ, ঢাকার শাহবাগে অবস্থিত জাতীয় জাদুঘর, গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় অবস্থিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধিসৌধ, ১৯৭১ সালের ১৪ই ডিসেম্বর নিহত বুদ্ধিজীবীদের স্মরণে ঢাকার মিরপুরে নির্মিত বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ, ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান এবং এই উদ্যানে স্থাপিত স্বাধীনতা জাদুঘর ইতিহাসপ্রেমী পর্যটকদের আকৃষ্ট করে।
বাংলাদেশে পর্যটন শিল্পের অবস্থা: পর্যটন বিশ্বব্যাপী একটি সম্ভবনাময় খাত। বিভিন্ন পরিসংখ্যানে জানা যায়, বিশ্বজুড়ে পর্যটকদের সম্মিলিত বার্ষিক ভ্রমণ-ব্যয় ৫০ হাজার কোটি টাকা। এমন অনেক দেশ রয়েছে, যার প্রধান আয়ের উৎস পর্যটন। বাংলাদেশের পর্যটন শিল্প দিনে দিনে বিকাশ লাভ করছে। একদিকে বিদেশি পর্যটকদের আগমন দেশের বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চয় বাড়িয়ে তুলছে, অন্যদিকে দেশীয় পর্যটকদের ভ্রমণ সামগ্রিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে প্রতি বছর ৫০ থেকে ৬০ লক্ষ দেশীয় পর্যটক বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে ভ্রমণ করে। এদের বেশির ভাগই মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ। এই বিপুল সংখ্যক পর্যটক বিভিন্ন স্থানে চলাচল করায় পর্যটনের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে দেশের অর্থনীতি গতি লাভ করে। পরিবহণ, আবাসিক হোটেল, রেস্তোরাঁ, পোশাক, অলংকার প্রভৃতি ব্যবসায় পর্যটন শিল্পের বিকাশের সঙ্গে জড়িত। পর্যটনের বিকাশে অসংখ্য মানুষের জীবিকারও সংস্থান হয়। বর্তমানে প্রায় ১২ লক্ষ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে পর্যটন শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থেকে জীবিকা নির্বাহ করছে। অর্থনীতিবিদগণ মনে করেন, পর্যটন শিল্প থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত জিডিপি অর্জন করা সম্ভব।
পর্যটন শিল্পের গুরুত্ব: একটি দেশের পর্যটন শিল্প বিকশিত হলে সেই দেশের সংস্কৃতিও সমৃদ্ধ হয়। পর্যটন এলাকায় অধিবাসীদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। মানুষের অর্থনৈতিক উন্নতি ত্বরান্বিত হয়। পর্যটকদের আগ্রহ রয়েছে এমন স্থান, স্থাপনা বা বিষয়ের প্রতি স্থানীয় অধিবাসীদেরও শ্রদ্ধাশীল করে তোলে। তারা নিজেদের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি রক্ষায় তাগিদ অনুভব করে। এছাড়া পর্যটনের সূত্রে বিভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতির মানুষের মেলবন্ধন একটি মানবিক বিশ্ব তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে।
পর্যটন শিল্পের বিকাশে করণীয়: পৃথিবী ব্যাপী পর্যটন শিল্প এখন দ্রুত বিকাশ লাভ করছে। বাংলাদেশে কয়েকটি বিষয়ের প্রতি নজর দিলে পর্যটন এলাকাগুলোতে পর্যটকদের যাতায়াত বাড়বে। প্রথমেই গুরুত্ব দেওয়া উচিত যাতায়াত ব্যবস্থার দিকে। উন্নত পথ ও যানবাহনের ব্যবস্থা না থাকলে পর্যটকরা নিরুৎসাহিত হবেন, এটাই স্বাভাবিক। বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলসহ বেশকিছু পর্যটনকেন্দ্রে পৌঁছানোর সহজ পথ ও যানবাহনের ব্যবস্থা নেই। পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে সব ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। পর্যটকরা যাতে নির্ভয়ে ও নিঃসঙ্কোচে ভ্রমণ করতে পারে, তার নিশ্চয়তা থাকতে হবে। অতিরিক্ত ভ্রমণ-ব্যয় পর্যটকদের ভ্রমণে নিরুৎসাহিত করে। তাই, যাতায়াত এবং থাকা-খাওয়াসহ সংশ্লিষ্ট ব্যয় যাতে সীমার মধ্যে থাকে তা বিবেচনায় নেওয়া উচিত।
উপসংহার: বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, স্থাপত্যকলা, স্থানীয় অধিবাসীদের বৈচিত্র্যপূর্ণ জীবন ও সংস্কৃতি পর্যটকদের আকর্ষণ করার জন্য যথেষ্ট। তবে পর্যটনকে একটি শিল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে ও স্থায়ী রূপ দিতে দরকার রাষ্ট্রীয় নীতিমালা ও এর প্রয়োগ। স্থানীয় প্রশাসনের পাশাপাশি পর্যটনকেন্দ্রের অধিবাসীদেরও পর্যটকদের সহযোগিতায় সম্পৃক্ত করা উচিত। পর্যটকদের যথাযথ নিরাপত্তা ও সহযোগিতা দেওয়া গেলে ভ্রমণের প্রতি তাদের উৎসাহ আরো বাড়বে। এর ফলে একদিকে যেমন বাংলাদেশের মানবিক সংস্কৃতি, ইতিহাস-ঐতিহ্যের পরিচয় বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়বে, অন্যদিকে দেশের অর্থনীতির চাকা আরো গতিশীল হবে।
Related Question
View Allভূমিকা: বর্তমান বিশ্বসভ্যতা যে কয়টি মারাত্মক সমস্যার সম্মুখীন, মাদকাসক্তি তার অন্যতম। পুরোনো সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটছে দিনে দিনে, নতুন মূল্যবোধও গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠেনি। সামগ্রিকভাবে সমাজব্যবস্থা চলছে বিভ্রান্তি ও অস্থিরতার মধ্যে, আর এই অবস্থা একদিকে যেমন স্বাচ্ছন্দ্য আনছে, অন্যদিকে সঞ্চারিত করছে হতাশা ও উদ্বেগ। ফলে বিশৃঙ্খল এক পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়াতে না পেরে নানা মানুষ নানা বিষয়ের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। যার কোনোটি খারাপ, কোনোটি আবার খারাপ আসক্তি তৈরি করছে। নানারকম এই আসক্তির মাঝে বিপজ্জনক ও ভয়ংকর এক আসন্তি হচ্ছে মাদকাসক্তি। এই আসক্তি এক ভয়ংকর ব্যাধিরূপে সমাজের সর্বস্তরে ছড়িয়ে পড়ছে। মাদকাসক্তি এখন সারাবিশ্বের অন্যতম সমস্যা। এমন দেশ সম্ভবত বিশ্বের কোথাও পাওয়া যাবে না, যেখানে মাদকাসক্তির কালো ছায়া তরুণসমাজকে স্পর্শ করছে না।
মাদকদ্রব্য ও মাদকাসক্তি: মাদকদ্রব্য হচ্ছে সেসব বস্তু বা গ্রহণের ফলে স্নায়বিক বৈকল্যসহ নেশার সৃষ্টি হয়। সুনির্দিষ্ট সময় পরপর মাদক সেবনের দুর্বিনীত আসক্তি অনুভূত হয় এবং কেবল সেবন দ্বারাই সে আসক্তি দূরীভূত হয়। আর মাদকদ্রব্য গ্রহণ করে নেশা সৃষ্টিকে মাদকাসক্তি বলা হয়। তবে বিশ্ব সাস্থ্য সংস্থার মতে- 'মাদকাসক্তি হচ্ছে চিকিৎসা গ্রহণযোগ্য নয় এমন দ্রব্য অতিরিক্ত পরিমাণে ক্রমাগত বিক্ষিপ্তভাবে গ্রহণ করা এবং এসব দ্রব্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়া।'
মাদকদ্রব্যের ধরন: বর্তমান বিশ্বে নানা ধরনের মাদক দ্রব্য চালু রয়েছে। মদ, গাঁজা, ভাং, আফিম ইত্যাদি প্রাচীনকালের মাদকদ্রব্য। বর্তমানে প্রচলিত রয়েছে হেরোইন, মারিজুয়ানা, এলএসডি, হাসিস, কোকেন, প্যাথিড্রিন, ফেনসিডিল, ইয়াবা ইত্যাদি। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে হেরোইনই সবচেয়ে বেশি আলোড়ন সৃষ্টিকারী মাদকদ্রব্য। বাংলাদেশে যেসব মাদকদ্রব্য সেবন সর্বাধিক সেগুলো হলো গাঁজা, ফেন্সিডিল, হেরোইন, মদ, বিয়ার, তাঁড়ি, পচুই, প্যাথেড্রিন ইনজেকশন ইত্যাদি। মাদকদ্রব্যের ব্যবহার ও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট: মাদকদ্রব্য চোরাচালানের যাত্রাপথে বাংলাদেশের মানচিত্র অন্তর্ভুক্ত হওয়ার এ সমস্যা আমাদের সমাজে দিন দিন তীব্রতর হচ্ছে। বাংলাদেশ, ভারত ও নেপালের সীমান্ত গোল্ডেন ওয়েজ বা মাদক পাচার ও চোরাচালানের জন্য বিখ্যাত। আবার পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে মাদক পাচারের ট্রানজিট হিসেবে বাংলাদেশ ব্যবহৃত হওয়ায় বাংলাদেশে মাদক প্রবেশ করছে অবাধে আর বাড়ছে এর ব্যবহার। বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ২০ লক্ষ মাদকসেবনকারী রয়েছে এবং এই সংখ্যা দিন দিন আরও বাড়ছে। বিভিন্ন পেশাজীবী ও শ্রমজীবী থেকে শুরু করে সমাজের সর্বস্তরে এই মাদকের প্রভাব রয়েছে। তবে আমাদের দেশে মাদকাসক্তির অধিকাংশই যুবসমাজ। বিশেষজ্ঞদের ধারণা বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যার ১৭ ভাগ মাদক ব্যবহার করে। দেশে ৩৫০টি বৈধ গাঁজার দোকান রয়েছে। বৈধ লাইসেন্স ছাড়াও আমাদের দেশে বিভিন্ন জায়গায় প্রচুর দেশিয় মদ উৎপাদন ও বিক্রি হয়। উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশ এখন উন্নয়ন ও অবনতির মাঝামাঝি অবস্থান করছে। আর এই মধ্যবর্তী অবস্থাটিই সমাজে এক বিশৃঙ্খল অবস্থা তৈরি করছে। তরুণসমাজ নৈতিকতা ও মূল্যবোধকে সঠিকভাবে ধারণ ও বিকশিত করতে পারছে না, আর দেশীয় অর্থনীতিতে বিরাজমান অস্থিরতা - তাদের মধ্যে তৈরি করে হতাশা, ক্ষোভ, বিষাদ, যার ফলশ্রুতিতে পূর্বের চেয়েও ভয়াল ত্রাসে বাংলাদেশকে ছেয়ে ফেলছে মাদকাসক্তি।
মাদকের উৎস ও বিস্তার অঞ্চল: মায়ানমার, লাওস ও থাইল্যান্ড সীমান্তে অবস্থিত পপি উৎপাদনকারী অঞ্চলকে বলা হয় গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গল। আবার আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও ইরান সীমান্তে অবস্থিত আফিম মাদক উৎপাদনকারী অঞ্চলকে বলা হয় গোল্ডেন ক্রিসেন্ট। মাদকের মধ্যে সবচেয়ে প্রাচীন আফিম। পপি কুনোর নির্যাস থেকে তৈরি হয় আফিম। আফিম থেকে বিশেষ প্রক্রিয়ায় তৈরি হয় হেরোইন। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশের আশপাশের দেশগুলোতেই মাদকের উৎস, তার বিস্তার থেকে বাংলাদেশ মুক্ত নয়। তবে শুধু এশিয়াতেই নয়, ল্যাটিন আমেরিকার ব্রাজিল, প্যারাগুয়ে, জ্যামাইকা, কলম্বিয়া, গুয়াতেমালাসহ দক্ষিণ আফ্রিকা ও আফ্রিকার অন্যান্য দেশে মারিজুয়ানা উৎপাদন হয়। আবার দক্ষিণ আমেরিকা, পেরু, কলম্বিয়া, ব্রাজিল কোকেন উৎপাদনে খ্যাত। আর আফিম, হেরোইন উৎপাদন হচ্ছে এশিয়াসহ দক্ষিণ ও উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন দেশে। এভাবে বিশ্বব্যাপী মাদক ছড়িয়ে পড়ছে নীরব ঘাতকের মতো। মাদক আক্রান্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী: যেসব পরিবারে পারিবারিক বন্ধন শিথিল, ঘনিষ্ঠতা কম, সেসব পরিবারের সদস্যরাই মাদকাসক্ত হয়ে থাকে। বাংলাদেশে মাদকাসক্তদের গড় বয়স ১৮-৩২ বছর। অর্থাৎ আমাদের যুবসমাজ। জরিপে দেখা গেছে, বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশে মাদকাসক্তরা বছরে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে।
মাদকাসন্তির ক্ষতিকর প্রভাব : মাদকাসক্তির প্রভাব নিঃসন্দেহে ধ্বংসাত্মক। আর সে প্রভাবগুলোই নিয়ে আলোচিত হলো
i. কর্মঠ ও সফল হতে পারত যে যুবসমাজ, মাদকাসক্তি সে যুবসমাজকে অবচেতন ও অকর্মণ্য করে তুলছে।
ii. বাংলাদেশে বিভিন্ন শ্রেণির মাদকাসক্তরা মাদকদ্রব্য সংগ্রহের জন্য চুরি, ডাকাতি, ছিনতাইসহ নানা অপকর্মে লিপ্ত। এই সব অপকর্ম সৃষ্টি করছে সামাজিক বিশৃজালা।
iii. চোরাচালান বাড়ছে ও দেশের কর্মঠ জনশক্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে মাদক। ফলে দেশীয় অর্থনীতি পঙ্গু হয়ে পড়ছে।
iv. মাদকদ্রব্য আসক্তদের শারীরিক ও মানসিকভাবে নানা ক্ষতি করে। অতিরিক্ত সেবন সমাজে আনছে চরম নৈতিক অধঃপতন।
vi. আসক্ত ব্যক্তি দ্বারা সৃষ্টি হচ্ছে পারিবারিক ভাঙন এবং পুরো সমাজব্যবস্থার মানুষের মাঝে হতাশা।
vii. সামাজিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের চূড়ান্ত অবক্ষয় হচ্ছে।
viii. অপরাধপ্রবণতা বাড়ছে।
ix. মেধাবী সমাজ ধীরে ধীরে ধ্বংস হচ্ছে।
মাদকাসক্তি ও আমাদের যুবসমাজ : বিশ্বব্যাপী মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার এবং চোরাচালানের মাধ্যমে এর ব্যাপক প্রসার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করছে। মাদকের নিষ্ঠুর ছোবলে অকালে ঝরে যাচ্ছে তাজা প্রাণ এবং অঙ্কুরেই বিনষ্ট হচ্ছে বহু তরুণের সম্ভাবনাময় উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ। প্রেমে ব্যর্থতা, হতাশা, বেকারত্ব, দারিদ্র্য প্রভৃতি কারণে আমাদের দেশের যুবসমাজের এক বিরাট অংশ মাদকদ্রব্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। আর মাদককে কেন্দ্র করেই সমাজে সৃষ্টি হচ্ছে আরও বহু ধ্বংসের সামাজিক সমস্যা। নেশাগ্রস্ত যুবসমাজ শুধু যে নিজেরই সর্বনাশ করে তা নয়, এরা পরিবার ও জাতীয় জীবনকে বিপর্যন্ত ও বিপন্ন করে তুলছে। যে যুবসমাজ দেশকে আলোকিত করবে, সে যুবসমাজ মাদকাসক্ত হয়ে শারীরিক ও মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাদের মাঝে অন্ধকার নেমে আসে, তাতে শুধু সে নয়, পুরো দেশ-জাতি অন্ধকারে পর্যবসিত হয়ে যাবে।
মাদকদ্রব্য সেবনের কারণ: সাময়িক জীবনের প্রতি বিমুখতা ও নেতিবাচক মনোভাব থেকেই মাদকাসক্তির জন্ম। অভ্যাস থেকে আসক্তি, ধূমপান একদিন পরিণত হয় হেরোইন আসক্তিতে। ধনতান্ত্রিক সমাজ ও অর্থনীতিতে ব্যক্তির ভোগের উপকরণ অবাধ ও প্রচুর। ব্যক্তিস্বাধীনতার নামে সেখানে চলে স্বেচ্ছাচারিতা, আনন্দের পোশাকে ঘুরে বেড়ায় উচ্ছৃঙ্খলতা। বর্তমানে সিনেমা ও টেলিভিশনে যেসব অশ্লীল নৃত্য, ছবি, কাহিনি ইত্যাদি দেখা যাচ্ছে, সেসব অনুকরণ করতে গিয়ে তরুণসমাজ তাদের নৈতিক অধঃপতন ডেকে আনছে। তরুণদের এই বিপথগামিতার অন্যতম কারণ হচ্ছে বেকারত্ব। এই বেকারত্ব নামক অভিশাপটি যখন জীবনকে বিষিয়ে তোলে, তখন আপনাতেই মাদকাসক্তের এই ধ্বংসজালে আটকে যেতে হয়। তাছাড়া আবার অনেক সময় অস্থিরতা, কু-চিন্তা, অভাব-অনটন ও পারিবারিক কলহের কারণে তরুণসমাজ এই মোহের জালে আচ্ছন্ন হয়।
মাদকাসক্তি সমস্যা সমাধানের উপায়: বিশ্বজুড়ে মাদকাসক্তি একটি জটিল সমস্যা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করায় এর সমাধানে স্থানীয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে নানা কর্মসূচি গ্রহণ করা হচ্ছে।
ক. প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা: মাদকাসক্তদের শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক অবস্থা বিচার-বিশ্লেষণ করে তাদের সুস্থ করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করাকে প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা বলা হয়। আসক্ত ব্যক্তিকে প্রথমে তাদের পরিবেশ থেকে সরিয়ে আনা হয়। যাতে সে পুনরায় মাদক গ্রহণ করতে না পারে। পরে তাকে সুস্থ ও স্বাভাবিক করার জন্য চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়।
খ. প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা:
১. মাদকদ্রব্যের উৎপাদন ও আমদানি নিষিদ্ধকরণের লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সাথে সমন্বিত কার্যক্রম গ্রহণ করে প্রতিরোধ ব্যবস্থা জোরদার করা।
২. স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচিতে মাদকের ক্ষতিকর দিকগুলো অন্তর্ভুক্ত করা।
৩. প্রচার মাধ্যম ও আলোচনা সভার মাধ্যমে মাদকের ক্ষতিকর দিক তরুণসমাজের কাছে তুলে ধরা।
৪. মাদক প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণসংক্রান্ত আইনের বাস্তবায়ন করা।
৫. পরিবারের সদস্যদের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা।
৬. ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষাকে জোরালো করার প্রচেষ্টা করা।
৭. তরুণসমাজের জন্য সুস্থ বিনোদনের ব্যবস্থা করা।
৮. সামাজিক পরিবেশ উন্নয়নের ব্যবস্থা করা।
উপসংহার : বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে মাদকাসক্তির হাত থেকে রক্ষার জন্য মাদকাসক্তি নিরাময় ও প্রতিরোধ আন্দোলনে আপামর জনসাধারণকে এগিয়ে আসতে হবে। এর পূর্বশর্ত হিসেবে ধূমপান ও মাদকবিরোধী আন্দোলনকে বেগবান করতে হবে। সরকারি মহল থেকে শুরু করে গণমাধ্যম ও রাজনীতিবিদ, কূটনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবি, আইনজীবী, সমাজকর্মী, সমাজবিজ্ঞানী, অর্থনীতিবিদসহ সকল শ্রেণির মানুষকে সক্রিয় অংশগ্রহণ করে মাদকমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তুলে এ বিশ্বকে বাসোপযোগী করে তুলতে হবে।
বিভিন্ন ঘটনার মধ্য দিয়ে মানুষ বিচিত্র অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়। এসব অভিজ্ঞতার কোনোটি আনন্দদায়ক, কোনোটি রোমাঞ্চকর আবার কোনোটি প্রচণ্ড ভয়ের। যে ঘটনাগুলো মনকে বিশেষভাবে নাড়া দেয়, আহত করে বা ভীতিবিহ্বল করে, মানুষ তা সহজে ভোলে না। একটি ঝড়ের রাত তেমনই আমার জীবনের সমস্ত অভিজ্ঞতাকে ছাপিয়ে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে। আমি যখনই সে-রাতের কথা ভাবি, ভয়ে শিউরে উঠি। অন্ধকার রাত, ঝোড়ো বাতাসের গর্জন, সঙ্গে মুষলধারায় বৃষ্টি, হুড়মুড় করে চালা ঘরগুলোর ভেঙে পড়ার শব্দ, ভয়ার্ত মানুষের আর্তনাদ- সবকিছু আমার মনে ছবির মতো ভেসে ওঠে।
সকাল থেকেই ঈশান কোণে মেঘ জমছিল। কালো কালো পুঞ্জীভূত মেঘে দুপুরের পরই দিনের আলো হারিয়ে গেল। বাতাসও যেন থমকে দাঁড়িয়েছিল। বেতার ও টেলিভিশনে বারবার বিপদ সংকেত জানানো হচ্ছে। স্থানীয় প্রশাসন ও বিভিন্ন সংগঠনের সদস্যরা সবাইকে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেওয়ার নির্দেশনা দিচ্ছে। তা শুনে মানুষও দলে দলে আশ্রয়কেন্দ্রের দিকে যাচ্ছে। আমাদের পাকা দেয়ালে টিনের চালার বাড়ি। তাই বাবা বললেন, এখানে আমরা নিরাপদে থাকবো।
সন্ধ্যা হতে হতে প্রকৃতি এক অপরিচিত রূপ নিয়ে আবির্ভূত হলো। রাখালেরা গরুর পাল নিয়ে আগেভাগেই বাড়ি ফেরে। মাঝিরা নিরাপদ স্থানে নৌকা বাঁধে। নদীর ধারে দেখা গেল বেশ কয়েকজন নারী চরম উৎকণ্ঠা নিয়ে তাকিয়ে আছে অস্পষ্ট জেলে-নৌকাগুলোর দিকে। প্রিয়জনের জন্য কাতর অপেক্ষা, পাখিদের ব্যস্ত হয়ে নীড়ে ফেরা, হাটুরেদের আতঙ্কিত পদক্ষেপ, থেকে থেকে গবাদি পশুর আর্তনাদ যেন আসন্ন বিপদের আভাস দিচ্ছিল। অল্পক্ষণেই অন্ধকারের চাদরে চারপাশটা ঢেকে গেল। বিদ্যুৎ চমকে আঙিনা থেকে দিগন্ত পর্যন্ত যেটুকু চোখে পড়ে, তার সবটাই আমার কাছে ভূতুড়ে লাগছিল।
সন্ধ্যার পর থেকে বাতাসের বেগ বাড়তে লাগলো। তা ঝড়ো বৃষ্টিতে রূপ নিতে সময় নিল না। দানবীয় শক্তি নিয়ে ঝড় আছড়ে পড়ল আমাদের লোকালয়ে। আমি ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে বাবা-মার গা-ঘেঁষে বসে আছি। হারিকেনের আবছা আলোয় পরিবেশটা আরো থমথমে। এর মধ্যে ঝড়োবৃষ্টির একটানা শব্দে কানে তালা লাগার মতো অবস্থা। বাবা বললেন, শিলাবৃষ্টি হচ্ছে। টিনের চাল জায়গায় জায়গায় ছিদ্র হয়ে বৃষ্টির পানি পড়তে আরম্ভ হলো। মনে হলো যে-কোনো সময়ে পুরো চালাটি আমাদের মাথার উপরে খসে পড়বে। বাবা আমাদের নিয়ে একটি মজবুত খাটের নিচে অবস্থান নিলেন। কিছুক্ষণ পরেই পায়ের নিচে পানির প্রবাহ টের পেলাম। বুঝলাম দরজার নিচ দিয়ে ঘরে একটু একটু করে পানি ঢুকছে। তখনও পর্যন্ত বাবা খাটের নিচে থাকা নিরাপদ মনে করলেন। পাশের বাড়ি থেকে নারী-পুরুষের আর্তচিৎকার শোনা যাচ্ছিল। বাবা চিৎকার করে তাদেরকে আমাদের ঘরে আসতে বললেন। কিছুক্ষণ পরেই বিকট শব্দে কিছু একটা আছড়ে পড়লো বাড়ির একপাশে। বাতাসের প্রবল তোড়ে উড়ে গেল পিছনের বারান্দার চাল।
অল্পক্ষণ পরে প্রতিবেশীদের কয়েকজন কাকভেজা হয়ে হুড়মুড় করে আমাদের ঘরে ঢুকল। তাদের একজনের মাথায় আঘাত লেগেছে। বাবা দেরি না করে কী একটা ওষুধ মেখে লোকটির মাথা গামছা দিয়ে বেঁধে দিলেন। তাকে ধরে একটি নিরাপদ জায়গায় বসালেন। শুনলাম একটা প্রকাণ্ড শিমুল গাছ উপড়ে গিয়ে তাদের ঘরের উপর পড়েছে। তারাই বললো, আমাদের গোয়ালঘরের চাল নাকি উড়ে গিয়েছে। গরুগুলোর কথা ভেবে আমাদের সবার মন খারাপ হয়ে গেল।
এক সময়ে বাতাসের বেগ খানিকটা কমে আসে। তখনও থেকে থেকে ভয়ানক শব্দে বাজ পড়ছে। বাবা-মা আমাকে শুকনো কাপড় বের করে দিলেন। প্রতিবেশীদের জন্যও কাপড়, কিছু শুকনো খাবার ও পানির ব্যবস্থা করে তাদেরকে মোটামুটি স্বাভাবিক করলেন। বাবা আহত লোকটিকে বারবার পর্যবেক্ষণ করছিলেন। সে আগের চেয়ে ভালো বোধ করছে। আরো কিছুক্ষণ পর ঝড় পুরোপুরি থেমে গেল। তবে সমস্ত রাতই আমরা বসে কাটালাম।
দিনের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে বাবা দরজা-জানালা খুলে দিলেন। আমি বাইরে বেরিয়ে যা দেখলাম, এক কথায় তা অবিশ্বাস্য। বেশ কয়েকটি বড়ো গাছ উপড়ে পড়েছে। এখানে-সেখানে মৃত ও আহত পাখি পড়ে আছে। আমাদের ঘরের দুটি বারান্দার চাল উড়ে গেছে। অন্য একটি বাড়ির ঘরের চাল উড়ে এসে পড়েছে আমাদের উঠানে। গোয়ালঘরে ছুটে গিয়ে দেখি, এর চালা নেই একটি প্রকাণ্ড বৃক্ষ আছড়ে পড়েছে সেখানে। আমাদের চারটি গরুর একটি বড়ো রকমের আঘাত পেয়েছে। কয়েক বাড়ি পরে কান্নার শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। গিয়ে দেখি, বেশ কয়েকজন মারাত্মকভাবে আহত হয়েছে। একজনের অবস্থা খুবই আশঙ্কাজনক। রাস্তাঘাটের যে অবস্থা, তাতে হাসপাতাল পর্যন্ত পৌঁছানোই কঠিন ব্যাপার। বাবা এবং আরো কয়েকজন যুবক মিলে একটি মাচা বানিয়ে লোকটিকে নিয়ে হাসপাতালের দিকে ছুটলেন। আমি মাকে সাহায্য করতে গেলাম। মনে মনে বন্ধুদের কথা ভাবছি আর অজানা আশঙ্কায় শিউরে উঠছি।
সেদিনের রাতে ঝড়ের যে দানবীয় তাণ্ডব দেখলাম, তা মনে পড়লে আজও শিউরে উঠি। ঝড় যেন তার প্রকাণ্ড গ্রাসে সবকিছু নিঃশেষ করতেই এসেছিল। ঘর, আঙিনা, বনবাদাড়, নদীর বাঁধ, মেঠো ও পাকা পথ- সর্বত্রই ধ্বংসলীলার ক্ষত। ওই রাতের পরে গ্রামবাসীর স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে দীর্ঘ সময় লেগেছিল। আর মানসিক আঘাত কাটিয়ে উঠতে সময় লেগেছিল আরো বেশি।
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন ও
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!
শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!