"বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সংকট ও সম্ভাবনা" বিষয়ে একটি প্রবন্ধ রচনা করুন।

Updated: 1 month ago
উত্তরঃ

ভূমিকা :
একটি দেশের সার্বিক উন্নয়ন, অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির মূল চাবিকাঠি হলো শিক্ষা। যেকোনো দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সামাজিক প্রগতি এবং সাংস্কৃতিক বিকাশ সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করে সে দেশের মানসম্মত ও যুগোপযোগী শিক্ষা কাঠামোর ওপর। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। স্বাধীনতার পর থেকে এ দেশের শিক্ষা খাতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কাঠামোগত পরিবর্তন, অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষা, জেন্ডার সমতা এবং সংখ্যাগত প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। তবে একই সাথে যুগের চাহিদার সাথে তাল মেলাতে গিয়ে এবং কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে এই ব্যবস্থা বেশ কিছু গভীর সংকটের মুখে পড়েছে। বর্তমান বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা, চতুর্থ শিল্পবিপ্লব এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক, বিজ্ঞানমনস্ক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও যুগোপযোগী করে তোলা সময়ের অপরিহার্য দাবি।

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার বর্তমান রূপরেখা :
স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে বর্তমান কাঠামোতে এসে পৌঁছেছে, যা দেশের সামগ্রিক আর্থ-সামাজিক ও কাঠামোগত পরিবর্তনের একটি বাস্তব প্রতিচ্ছবি। বাংলাদেশের প্রচলিত এই শিক্ষা ব্যবস্থা মূলত তিনটি প্রধান ধারায় বিভক্ত সাধারণ শিক্ষা, মাদ্রাসা শিক্ষা এবং কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা যা স্তরবিন্যাসের দিক থেকে প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চ-মাধ্যমিক এবং উচ্চশিক্ষা এই চারটি সুনির্দিষ্ট ধাপে বিন্যস্ত। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে শতভাগ ভর্তির হার নিশ্চিতকরণ, ছাত্র-ছাত্রীদের সংখ্যার মধ্যে জেন্ডার সমতা আনয়ন এবং বছরের শুরুতে প্রাক-প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক স্তরের কোটি কোটি শিক্ষার্থীর হাতে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণের মতো লজিস্টিক ও নীতিগত ক্ষেত্রগুলোতে বাংলাদেশ বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে প্রশংসনীয় সাফল্য অর্জন করেছে। তবে অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং এই পরিমাণগত বা সংখ্যাগত বৃদ্ধি অর্জিত হলেও, প্রকৃত গুণগত মানদণ্ডে, কিংবা আধুনিক বৈশ্বিক ও সমকালীন শ্রমবাজারের চাহিদার নিরিখে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা এখনো কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রা স্পর্শ করতে পারেনি। একই সাথে একটি যুগোপযোগী, সমন্বিত ও বৈষম্যহীন জাতীয় শিক্ষা নীতি ও শিক্ষা আইনের কার্যকর ও পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের অভাব এই সমান্তরাল শিক্ষাব্যবস্থাকে বহুমুখী ধারায় বিভক্ত করে রেখেছে, যা একদিকে যেমন শিক্ষার্থীদের মাঝে শ্রেণিগত ও মনস্তাত্ত্বিক বিভাজন তৈরি করছে, অন্যদিকে তেমনি সবার জন্য সমমানের মৌলিক শিক্ষা নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে একটি সুষম ও সাম্যভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণের জাতীয় লক্ষ্যকে অনবরত চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে।

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার বর্তমান সংকটসমূহ :
দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা কাঠামোগত দুর্বলতা এবং সাম্প্রতিক সময়ে উদ্‌ঘাটিত বেশ কিছু নীতিগত সমস্যা বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার গুণগত মান অর্জনকে প্রতিনিয়ত বাধাগ্রস্ত করছে। প্রধান প্রধান সংকটগুলো নিচে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো

  • গুণগত মানের অভাব ও মুখস্থ-নির্ভরতা: শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত শিক্ষার্থীর চিন্তাশক্তি ও সৃজনশীলতার বিকাশ। কিন্তু দেশের প্রচলিত পরীক্ষা পদ্ধতি ও পাঠ্যক্রম এখনো বহুলাংশে মুখস্থবিদ্যার ওপর নির্ভরশীল। শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে মূল্যায়নের চূড়ান্ত পর্যায় পর্যন্ত এমন একটি কাঠামো দাঁড়িয়ে গেছে, যেখানে শিক্ষার্থীর নিজস্ব চিন্তার চেয়ে হুবহু তথ্য পুনরুতপাদনের ক্ষমতাকে বেশি পুরস্কৃত করা হয়। এর ফলে শিক্ষার্থীরা পরীক্ষায় ভালো ফলাফলের মাধ্যমে উচ্চ জিপিএ বা ভালো গ্রেড পেলেও বাস্তব জীবনে কোনো জটিল সমস্যা সমাধান কিংবা স্বাধীন ও যৌক্তিক চিন্তার কোনো ব্যবহারিক দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না। ফলে এই বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীর উচ্চ জিপিএ প্রকৃত জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে।
  • বাস্তবমুখী ও কর্মমুখী শিক্ষার অভাব দেশের প্রচলিত উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার সাথে বাস্তবমুখী কর্মসংস্থানের বাজারের কোনো দীর্ঘমেয়াদি যোগসূত্র বা সমন্বয় নেই। প্রতি বছর লাখ লাখ তরুণ সাধারণ শিক্ষায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হচ্ছে, কিন্তু দেশের অভ্যন্তরে বা আন্তর্জাতিক বাজারে সেই অনুযায়ী চাকরির ক্ষেত্র প্রস্তুত নেই। কারিকুলামে যুগোপযোগী কারিগরি জ্ঞানের তীব্র অভাব থাকায় উচ্চশিক্ষিত বেকারত্বের হার দিন দিন আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। শিক্ষা যখন একজন শিক্ষার্থীর জন্য সম্মানজনক কর্মসংস্থানের পথ তৈরি করতে পারে না, তখন তা যুবকদের মাঝে তীব্র হতাশা ও সামাজিক অসন্তোষের সৃষ্টি করে। তাত্ত্বিক জ্ঞানের আড়ালে এই প্রায়োগিক ও পেশাগত দক্ষতার অভাব বর্তমানে আমাদের অন্যতম প্রধান জাতীয় সংকট হিসেবে দাঁড়িয়েছে।
  • বিষয় ভিত্তিক শিক্ষার অবলুপ্তি: বিষয় ভিত্তিক শিক্ষার অবলুপ্তি বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার জন্য একটি বড় ধাক্কা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। মাধ্যমিক স্তর থেকে বিজ্ঞান, মানবিক, ও ব্যবসায় শিক্ষা শাখা তুলে দেওয়ার পরিকল্পনা শিক্ষার্থীদের শিক্ষার ভিত্তিকে দুর্বল করে দিতে পারে। ঐতিহ্যগতভাবে এই শাখাগুলোর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা তাদের আগ্রহ ও ক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে নির্দিষ্ট বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করে থাকে। তবে নতুন শিক্ষাব্যবস্থায় সব বিষয়ের ওপর সমান গুরুত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে, যা শিক্ষার্থীদের আগ্রহের বিষয়ে গভীর জ্ঞানার্জনের সুযোগ কমিয়ে দেবে। এই পরিবর্তনের ফলে শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার জন্য পর্যাপ্ত প্রস্তুতি থাকবে না এবং তারা ভবিষ্যতে বিশেষায়িত পেশায় প্রবেশের ক্ষেত্রে অসুবিধার সম্মুখীন হতে পারে।
  • শিক্ষক সংকট, অপ্রশিক্ষণ এবং মর্যাদা হ্রাস: বিশেষ করে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে মানসম্মত শিক্ষকের তীব্র সংকট রয়েছে। অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধারণক্ষমতার চেয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা অনেক বেশি হওয়ায় শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর অনুপাত মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। এর পাশাপাশি কর্মরত শিক্ষকদের আধুনিক শিক্ষাদান পদ্ধতি, মনস্তাত্ত্বিক পেডাগোজি ও আধুনিক প্রযুক্তির ওপর পর্যাপ্ত এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণের অভাব রয়েছে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো শিক্ষকদের পেশাগত অবমূল্যায়ন যা তাদের আর্থিক নিরাপত্তা ও সামাজিক অবস্থানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। শিক্ষকদের এই দুর্বল বেতন কাঠামো ও সামাজিক মর্যাদা আকর্ষণীয় না হওয়ার কারণে দেশের মেধাবী ও যোগ্য তরুণেরা এই মহৎ পেশায় আসতে বিন্দুমাত্র আগ্রহ দেখাচ্ছেন না।
  • বাজেট বরাদ্দ ও গবেষণার ঘাটতি ইউনেস্কোর আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী একটি দেশের মোট জিডিপির অন্তত শতাংশ অথবা বার্ষিক বাজেটের ২০ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ করা উচিত। কিন্তু বাংলাদেশে এই বরাদ্দ জাতীয় শিক্ষানীতির লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম। এই অপর্যাপ্ত অর্থায়নের ফলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর আধুনিক গবেষণাগার, সমৃদ্ধ লাইব্রেরি এবং ডিজিটাল অবকাঠামোগত উন্নয়ন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মৌলিক ও প্রায়োগিক গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় রাষ্ট্রীয় ফান্ডের চরম অভাব রয়েছে। নতুন জ্ঞান সৃষ্টির পরিবেশ না থাকায় দেশ থেকে প্রতিবছর মারাত্মক মেধা পাচার বা 'ইৎধরহ উৎধরহ' সৃষ্টি হচ্ছে, যা দেশের মেধা সম্পদকে শূন্য করে দিচ্ছে।
  • নীতি নির্ধারণের ত্রুটি ও ঘন ঘন কারিকুলাম পরিবর্তন: কোনো দীর্ঘমেয়াদি রূপরেখা ও সুনির্দিষ্ট জাতীয় পরিকল্পনা ছাড়া বারবার পাঠ্যক্রম এবং মূল্যায়ন পদ্ধতি পরিবর্তন করায় শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের মধ্যে এক ধরণের স্থায়ী বিভ্রান্তি ও আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। নতুন কোনো পদ্ধতি পুরোপুরি বাস্তবায়িত বা মূল্যায়িত হওয়ার আগেই তা পরিবর্তন করার ফলে পুরো শিক্ষা ব্যবস্থা একটি পরীক্ষামূলক ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। এর পাশাপাশি, নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে আরেকটি বড় অন্তরায় হলো মাঠপর্যায়ের শিক্ষকদের অভিজ্ঞতাকে অবমূল্যায়ন করা। যারা সরাসরি শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের সাথে কাজ করেন, তাদের বাস্তব মতামত ও অন্তর্দৃষ্টি গ্রহণ না করে আমলাতান্ত্রিকভাবে নীতি প্রবর্তন করায় তা বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্যহীন হয়ে পড়ছে।
  • কোচিং বাণিজ্য ও অ্যাসাইনমেন্টের অপব্যবহার শিক্ষার চরম বাণিজ্যিকীকরণ ও শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত কোচিং সেন্টারের রমরমা সিন্ডিকেট ব্যবসা শিক্ষাকে একটি পরম মৌলিক অধিকারের পরিবর্তে 'বাণিজ্যিক পণ্যে' রূপান্তরিত করেছে। এর ফলে ক্লাসরুমের শিক্ষার চেয়ে ছায়া শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর শিক্ষার্থীদের নির্ভরতা বাড়ছে, যা দরিদ্র পরিবারের জন্য মানসম্মত শিক্ষা লাভ অসম্ভব করে তুলছে। তদুপরি, নতুন কারিকুলামে অন্তর্ভুক্ত গ্রুপ স্টাডি বা অ্যাসাইনমেন্টের ধারণাকে যথাযথ গাইডলাইনের অভাবে মাঠপর্যায়ে অপপ্রয়োগ করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীরা নিজে থেকে কোনো পড়াশোনা বা চিন্তাভাবনা না করে সরাসরি ইন্টারনেট, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম কিংবা বাজারজাত অ্যাপ থেকে উত্তর 'কপি-পেস্ট' করে শিক্ষকের কাছে জমা দেওয়ার এক ক্ষতিকর ফাঁকিবাজি সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত হয়ে উঠছে, যা শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্যকে চরমভাবে ব্যাহত করছে।
  • উচ্চশিক্ষার আন্তর্জাতিক র‍্যাংকিংয়ে পিছিয়ে পড়া ও গবেষণার স্থবিরতা আমাদের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বৈশ্বিক র‍্যাংকিংয়ে ক্রমান্বয়ে পিছিয়ে পড়ছে। এর প্রধান কারণ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নতুন জ্ঞান সৃষ্টির চেয়ে কেবল সনদ বিতরণের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় ফান্ড বা তহবিলের তীব্র সংকটের কারণে শিক্ষাবিদ ও শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক মানের গবেষণায় যুক্ত হতে পারছেন না। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের বৈশ্বিক মানদণ্ড হারাচ্ছে এবং দেশ এক গভীর মেধা ও জ্ঞানতাত্ত্বিক শূন্যতার দিকে ধাবিত হচ্ছে।
  • শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অতি-রাজনীতিকরণ ও প্রশাসনিক দুর্বলতা আমাদের প্রাথমিক স্তর থেকে শুরুকরে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে অতি-রাজনীতিকরণ ও প্রশাসনিক দুর্বলতা শিক্ষার মানকে মারাত্মকভাবে গ্রাস করেছে। শিক্ষক নিয়োগ, পদোন্নতি, পরিচালনা পর্ষদ গঠন এবং যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্তগুলোতে মেধার চেয়ে রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত আনুগত্য ও তদবির সংস্কৃতি চরমভাবে প্রাধান্য পায়। রাজনীতির এই নেতিবাচক প্রভাব ও প্রশাসনিক জবাবদিহিতার অভাব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সুষ্ঠু, শৃঙ্খলাপূর্ণ ও নিরপেক্ষ শিক্ষার পরিবেশকে প্রতিদিন মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে।

শিক্ষা খাতে নানাবিধ দৃশ্যমান সংকট যত গভীরই হোক না কেন, বাংলাদেশের বিশাল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী এবং বিগত বছরগুলোতে বাস্তবায়িত কিছু সময়োপযোগী ও ইতিবাচক রূপান্তরের ফলে এই খাতে এক বিশাল ও অবারিত সম্ভাবনার দুয়ার উন্মোচিত হয়েছে। সেই সম্ভাবনার ক্ষেত্রগুলো নিচে বিশদভাবে বিশে ষণ করা হলো :

  • জনমিতিক লভ্যাংশ ও কর্মক্ষম তরুণ প্রজন্ম: বাংলাদেশের বর্তমান জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি অংশ তরুণ, যা জনমিতিক লভ্যাংশ
    বা 'ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড' হিসেবে পরিচিত। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে যেখানে উন্নত দেশগুলো প্রবীণ জনসংখ্যার আধিক্যে ভুগছে, সেখানে বাংলাদেশের এই বিশাল কর্মক্ষম তরুণ সমাজ আমাদের সবচেয়ে বড় জাতীয় শক্তি ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা। এই বিশাল যুবশক্তিকে যদি আধুনিক, বিজ্ঞানমনস্ক ও নৈতিক শিক্ষায় দীক্ষিত করে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করা যায়, তবে তারা অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিকে বেগবান করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারেও নেতৃত্ব দিতে পারবে। এই তরুণ প্রজন্মের মেধা ও শক্তির সঠিক বিকাশই বাংলাদেশের উন্নত রাষ্ট্রে পৌঁছানোর প্রধান চালিকাশক্তি।
  • নতুন কারিকুলাম ও রূপান্তর: শিক্ষাব্যবস্থা থেকে সনাতন মুখস্থনির্ভরতা ও পরীক্ষাভীতি দূর করতে এবং শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে বাস্তবমুখী শেখার সুযোগ বাড়াতে জাতীয় শিক্ষাক্রমে একটি বড় ধরনের কাঠামোগত রূপান্তর আনার প্রচেষ্টা চলছে। এই নতুন রূপান্তরের মূল লক্ষ্যই হলো শিক্ষার্থীদের শুধু তাত্ত্বিক ও পুথিগত জ্ঞানে আবদ্ধ না রেখে বাস্তব জীবনমুখী, সৃজনশীল, অভিজ্ঞতাভিত্তিক এবং দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা নিশ্চিত করা। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মাঝে সূক্ষ্ম চিন্তন দক্ষতা এবং দলগত কাজের মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের মানসিকতা গড়ে উঠবে, যা তাদের ভবিষ্যৎ চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এবং গতিশীল কর্মবাজারের উপযোগী করে তুলবে।
  • তথ্যপ্রযুক্তি ও ডিজিটাল শিক্ষার বিস্তার: সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশে অনলাইন, দূরশিক্ষণ এবং তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক ডিজিটাল শিক্ষার এক অভূতপূর্ব ও ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে। প্রত্যন্ত ও প্রান্তিক অঞ্চলের শিক্ষার্থীরাও এখন দ্রুতগতির ইন্টারনেট ও স্মার্ট ডিভাইসের কল্যাণে দেশের ও আন্তর্জাতিক স্তরের মানসম্মত শিক্ষামূলক কনটেন্ট, ভার্চুয়াল ক্লাসরুম এবং ওপেন সোর্স কোর্স করার সুবর্ণ সুযোগ পাচ্ছে। ক্লাসরুমগুলোতে মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর ও আইসিটি ল্যাবের অন্তর্ভুক্তি শিক্ষাদান প্রক্রিয়াকে আরও আকর্ষণীয় ও সহজবোধ্য করে তুলেছে। একটি আধুনিক, জ্ঞানভিত্তিক ও প্রযুক্তিনির্ভর 'স্মার্ট বাংলাদেশ' বিনির্মাণে এই শিক্ষাগত ও প্রযুক্তিগত রূপান্তর দারুণ ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে।
  • উচ্চশিক্ষায় আন্তর্জাতিকীকরণ ও গবেষণা দেশের পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উচ্চশিক্ষা কাঠামোতে এখন বৈশ্বিক চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চাহিদার সাথে সামঞ্জস্য রেখে রোবোটিক্স, ডেটা সায়েন্স, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), সাইবার সিকিউরিটি এবং বায়োটেকনোলজির মতো অত্যাধুনিক ও প্রায়োগিক বিষয়গুলো দ্রুত অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। এর ফলে আমাদের গ্যাজুয়েটরা বিশ্বমঞ্চে প্রতিযোগিতার যোগ্য হয়ে উঠছে। একই সাথে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আন্তর্জাতিক মানের মৌলিক গবেষণার পরিধি বাড়াতে, দেশীয় শিল্পের সাথে প্রাতিষ্ঠানিক সংযোগ তৈরি করতে এবং মেধাবী শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করতে রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক তহবিল বৃদ্ধির নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে মেধা পাচার রোধে সহায়ক হবে।

উত্তরণের উপায় ও করণীয়:

শিক্ষা ব্যবস্থার বিদ্যমান সংকটগুলোকে সমূলে দূর করে এর সুপ্ত ও অমিত সম্ভাবনাকে শতভাগ জাতীয় কল্যাণে কাজে লাগাতে হলে নিােক্ত সুনির্দিষ্ট ও দীর্ঘমেয়াদী পদক্ষেপসমূহ দ্রুত গ্রহণ করা জরুরি:

⇒ শিক্ষাক্রমের আধুনিকীকরণ ও প্রায়োগিক রূপান্তর: প্রথাগত মুখস্থনির্ভর শিক্ষা পদ্ধতি পুরোপুরি বর্জন করে শিক্ষাক্রমকে সম্পূর্ণ কর্মমুখী,
জীবনমুখী ও কারিগরি দক্ষতাভিত্তিক করতে হবে। প্রাথমিক স্তর থেকেই শিক্ষার্থীদের কোডিং, সমস্যা সমাধান এবং সৃজনশীল চিন্তার সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে হবে। বাস্তব জীবনের সমস্যা সমাধানের দক্ষতার ওপর চূড়ান্ত জোর দিতে হবে। মূল্যায়ন পদ্ধতি এমন হতে হবে যা শিক্ষার্থীর মুখস্থ করার ক্ষমতা নয়, বরং তার চিন্তাশক্তি ও উদ্ভাবনী প্রতিভাকে পরিমাপ ও পুরস্কৃত করবে।

⇒ মূল্যায়ন পদ্ধতির আধুনিকীকরণ: পরীক্ষার খাতার সনাতন সংখ্যার নম্বর ও জিপিএ-ভিত্তিক মূল্যায়নের চেয়ে বছরজুড়ে শিক্ষার্থীর ধারাবাহিক মূল্যায়ন, দলগত কাজ, সৃজনশীল প্রজেক্ট এবং বাস্তব জীবনের সমস্যা সমাধানের দক্ষতার ওপর চূড়ান্ত জোর দিতে হবে। মূল্যায়ন পদ্ধতি এমন হতে হবে যা শিক্ষার্থীর মুখস্থ করার ক্ষমতা নয়, বরং তার চিন্তাশক্তি ও উদ্ভাবনী প্রতিভাকে পরিমাপ ও পুরস্কৃত করবে।
কারিগরি শিক্ষার আধুনিকীকরণ: প্রথাগত সাধারণ শিক্ষার সনাতন ধারার ওপর অতিরিক্ত চাপ কমিয়ে প্রতিটি জেলা ও উপজেলায়

⇒ কারিগরি, বৃত্তিমূলক ও পেশাভিত্তিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মান ও পরিধি বাড়াতে হবে। কারিগরি শিক্ষার কারিকুলাম ও ট্রেডগুলোকে এমনভাবে সাজাতে হবে এবং আধুনিক যন্ত্রপাতি নিশ্চিত করতে হবে, যেন তা দেশীয় শিল্পকারখানা এবং আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের বাস্তব ও সমসাময়িক চাহিদার সাথে সরাসরি সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়।

⇒ শিক্ষা বাজেটে বরাদ্দ বৃদ্ধি: জাতীয় বাজেটে শিক্ষা খাতের বার্ষিক বরাদ্দ ক্রমান্বয়ে বাড়িয়ে জিডিপির ন্যূনতম ৪-৫ শতাংশ বা মোট বাজেটের ২০ শতাংশের কাছাকাছি অর্থাৎ আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে নিয়ে যেতে হবে। তবে কেবল বরাদ্দ বাড়ানোই যথেষ্ট নয়, এই বরাদ্দের সিংহভাগ স্বচ্ছতার সাথে সরাসরি অত্যাধুনিক গবেষণাগার স্থাপন, লাইব্রেরি সমৃদ্ধকরণ, ডিজিটাল ল্যাব তৈরি এবং শিক্ষকদের উচ্চতর গবেষণার বৃত্তিতে ব্যয় করতে হবে।

⇒ শিক্ষকদের মর্যাদা ও উচ্চতর প্রশিক্ষণ নিশ্চিতকরণ:: সবার আগে দেশের সবচেয়ে প্রখর মেধাবীদের শিক্ষকতা পেশায় আকৃষ্ট করতে হবে। এর জন্য প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত শিক্ষকদের জন্য একটি আকর্ষণীয় ও পৃথক বেতন কাঠামো নির্ধারণ করতে হবে। একই সাথে শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতি প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, আমলাতান্ত্রিক জটিলতামুক্ত এবং স্বচ্ছ ও মেধাভিত্তিক করতে হবে এবং তাদের জন্য নিয়মিত আধুনিক পেডাগোজি ও আইসিটি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। একই সাথে শিক্ষকদের জন্য দেশ-বিদেশে আধুনিক পেডাগোজি ও প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।

⇒ নীতি নির্ধারণে শিক্ষকদের মতামতের মূল্যায়ন: বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে শিক্ষকদের মতামত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, শিক্ষকরা সরাসরি শিক্ষার্থীদের সাথে সম্পৃক্ত থাকেন এবং শিক্ষাব্যবস্থার বাস্তব চিত্র সবচেয়ে ভালোভাবে জানেন। তাদের মতামতের মূল্যায়নের জন্য বিভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বন করা যেতে পারে। অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সার্ভে, প্রশ্নোত্তরের আয়োজন করে তাদের মতামত জানা যেতে পারে। শিক্ষকদের মতামতের ভিত্তিতে নীতি নির্ধারণ করা হলে শিক্ষাব্যবস্থায় সুষ্ঠু পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে।

⇒ উচ্চশিক্ষায় গবেষণা ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ: বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণার জন্য বিশেষ তহবিল গঠন করতে হবে। শিল্পকারখানা ও একাডেমিয়ার মধ্যে তৈরি করতে হবে, যাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগুলো সরাসরি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে কাজে লাগে। মেধার সঠিক মূল্যায়ন করে মেধা পাচার রোধ করতে হবে।

⇒ কোচিং বাণিজ্য বন্ধ ও বৈষম্যহীন শিক্ষানীতি প্রতিষ্ঠা: শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ ও কোচিং সেন্টারের দৌরাত্ম্য কঠোর আইনের মাধ্যমে বন্ধ করতে হবে। ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সবার জন্য একই মানের মৌলিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে একটি সমন্বিত, অসাম্প্রদায়িক ও বৈষম্যহীন জাতীয় শিক্ষানীতি ও শিক্ষা আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে।

উপসংহার:
একটি জাতির টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং আত্মমর্যাদার যে ধারা, তাকে দীর্ঘমেয়াদে অক্ষুণ্ণ ও সুদৃঢ় করতে হলে শিক্ষা খাতের আমূল ও কাঠামোগত সংস্কারের কোনো বিকল্প নেই। শুধু বাহ্যিক অবকাঠামোগত উন্নয়ন কিংবা যান্ত্রিক উপায়ে পাসের হার ও সনদের সংখ্যা বাড়ানোই শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হতে পারে না; শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য হতে হবে মানসম্মত, জীবনমুখী, বিজ্ঞানমনস্ক ও নৈতিকতাসম্পন্ন মানবিক মানুষ নিশ্চিত করা। বর্তমান একবিংশ শতাব্দীর বৈশ্বিক জ্ঞান-অর্থনীতির চাহিদা অনুযায়ী যদি আমরা আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের গলদ ও দুর্বলতাগুলো দূর করে দেশের তরুণ প্রজন্মকে আধুনিক শিক্ষায় দীক্ষিত করতে পারি, তবে বাংলাদেশ সমস্ত বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ জয় করে বিশ্বের বুকে একটি উন্নত, প্রগতিশীল, বৈষম্যহীন ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্র হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবেড়এতে কোনো সন্দেহ নেই।

Md Zahid Hasan
Md Zahid Hasan
3 weeks ago
24

Related Question

View All
উত্তরঃ

একজন লেখক তিনিই যিনি লেখেন। তবে সব লেখা লিখেই লেখক হওয়া যায় না। লেখক সব ধরনের হতে পারে। তবে সৃজনশীল লেখকই হচ্ছে আমাদের মূল কেন্দ্রবিন্দু। লেখক হচ্ছে পৃথিবীর অন্যতম একটি স্বাধীন সত্ত্বা।

একজন লেখক পুরোপুরি তার নিজের সত্ত্বার ওপরে বেঁচে থাকে। অনেকেই লেখক হবার সহজ উপায় খোঁজ করে। কিন্তু পড়তে পড়তে আর লিখতে লিখতেই শুধুমাত্র লেখক হওয়া যায়। এছাড়া আর কোনো উপায় নেই। লেখক অনেক ধরনের হতে পারে।

একজন সাংবাদিকও একজন লেখক। উপন্যাস, গল্প, কবিতা, ছড়া, সাহিত্য, প্রবন্ধ, রম্য, ব্লগ সব ধরনের লেখা যারা লেখে তারাই লেখক। অনেকেই মস্তিষ্কের মধ্যে ওকটা লেখার শক্তি পেয়ে যায় আর অনেকে হয়ত শিখে শিখে লেখক হয়।

সমাজ সভ্যতা কখনোই পুরোপুরি একজন লেখকের পক্ষে থাকে না। বরং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বিপক্ষে চলে যায়। স্বাভাবিকভাবেই একজন লেখক তার কলমের আঘাতে জর্জরিত করতে চায় সকল অন্যায়, অপবাদ। তাই হয়ত বেঁধে যেতে পারে সংঘাত। কলমই হচ্ছে একজন লেখকের দাঁড়ানোর জায়গা। কলম ছাড়া লেখকের অস্তিত্ব বিলীন। তবে সবাইকে যে প্রতিবাদ লিখতে হবে এমন কোনো কথা। কেউ কেউ মনোরঞ্জনের জন্যও লেখে। অনেকে আবার চাটুকারিতা করতে লেখে। কেউ আবার কীভাবে পুরষ্কার তুলে নেওয়া যায় সেই ধান্দা করার জন্য লেখে।

একজন লেখক হয়ে উঠতে পারে ন্যায় অন্যায়ের পার্থক্যকারী। সে কলমের ছোঁয়ায় প্রতিবাদ করতে অন্যায়ের আর ফুটিয়ে তুলবে ন্যায়ের কথা। লেখকের কলমের কালি প্রেরণার সুর হয়ে গান গাইবে। আর অশ্রুসিক্ত নয়নে হাসির ঝলক আনবে লেখকের কলম। একজন লেখকের প্রাণ তার লেখা, তার লেখার ভঙ্গি। সে তার লেখা দিয়ে বাঁচিয়ে তুলতে পারবে অসুস্থ কোনো সভ্যতাকে। লেখক তার কলম দিয়ে জাগ্রত করতে পারবে মানুষের ভীতরে লুকিয়ে থাকা অদম্য সাহস।

একজন লেখক কল্পনাকে নিয়ে আসতে পারে বাস্তবে। আমাদের নিয়ে যেতে পারে কল্পনার গহীন বনে। লেখক আমাদের সবাক যুগ থেকে অবাক যুগে নিয়ে যেতে পারে মুহূর্তের মাঝেই। লেখক জাগাতে পারে প্রেম, লেখক জাগাতে পারে নতুন কাজের স্পৃহা।

অনেকেই মনে করে লেখকের সকল বিষয়ে দ্বায় আছে। কিন্তু লেখকের মূলত কারো কাছেই কোনো দ্বায় নেই। তার দ্বায় থাকে শুধু নিজের মনের কাছে, নিজের বিবেকের কাছে, নিজের সুপ্ত চেতনার কাছে। সমাজ কি ভাববে তা নিয়ে লেখক মাথা ঘামাবে না। লেখক ভয়ে নাথা নোয়াবে না। লেখক যতদিন বাঁচবে বীরের মতোই বাঁচবে।

সারা বিশ্বেই লেখকরা নির্যাতনের শিকার হয়। অনেকেই বলে থাকে লিখে কিছুই হয় না। তাই যদি হতো তাহলে লেখার জন্য লেখকের শাস্তি হতো না। লেখকের ফাঁসি হতো না।

লেখকের কলমে অনেক জোর। সেই জোর ভেঙে চুরে গুড়িয়ে দিতে পারে যেকোনো কিছু। বিশেষ করে সাংবাদিকরা বিশ্বজুড়ে নির্যাতিত হয় অনিয়মের বিরুদ্ধে লিখতে গিয়ে। শাস্তি, সাজা বহু কিছু তাদের সহ্য করতে হয়। অন্যায়ের বিরুদ্ধে লিখলে হুমকি আসে, হামলা মামলা বহু ঘটনাই ঘটে। কারণ শাসক, শোষক আর অন্যায়কারীদের অনেক ক্ষমতা। লেখকের সমাজের দায়মুক্তির জন্য জীবনও দিতে হয়। তাইতো একজন লেখক সমাজের শক্তি, সমাজের সম্পদ।

3.8k
উত্তরঃ

সাহিত্য হচ্ছে মানুষের চিন্তা-ভাবনা, অনুভূতি তথা মানব-অভিজ্ঞতার কথা বা শব্দের বাঁধনে নির্মিত নান্দনিক বহিঃপ্রকাশ। এই অর্থে গল্প, কবিতা, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ ইত্যাদি উচ্চতর গুণাবলি সমন্বিত বিশেষ ধরনের সৃজনশীল মহত্তম শিল্পকর্ম। সাহিত্য-শিল্পীগণ যখন ‘অন্তর হতে বচন আহরণ’ করে আত্মপ্রকাশ কলায় ‘গীতরস ধারা’য় সিঞ্চন করে ‘আনন্দলোকে’ নিজের কথা- পরের কথা- বাইরের জগতের কথা আত্মগত উপলব্ধির রসে প্রকাশ করেন- তখনই তা হয়ে ওঠে সাহিত্য। রবীন্দ্রনাথের কথায় “বহিঃপ্রকৃতি এবং মানব-চরিত্র মানুষের মধ্যে অনুক্ষণ যে আকার ধারণ করিতেছে, যে-সঙ্গীত ধ্বনিত করিয়া তুলিতেছে, ভাষা-রচিত সেই চিত্র এবং সেই গানই সাহিত্য।…সাধারণের জিনিসকে বিশেষভাবে নিজের করিয়া – সেই উপায়ে তাহাকে পুনরায় বিশেষভাবে সাধারণের করিয়া তোলাই হচ্ছে সাহিত্যের কাজ।” [রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সাহিত্য] সাহিত্য সত্য-সুন্দরের প্রকাশ হিসেবে প্রবহমাণ সময়ে যা ঘটে – সে-সবের মধ্য থেকে যা মহৎ, যা বস্তুসীমাকে ছাড়িয়ে বাস্তবাতীত প্রকাশ করে, যা জীবনের জন্য কল্যাণময় এবং মহৎ আদর্শের দ্যোতক তাকেই প্রকাশ করে। আসলে মহৎ সাহিত্য তাই- যা একাধারে সমসাময়িক-শাশ্বত-যুগধর্মী-যুগোপযোগী-যুগোত্তীর্ণ। সাহিত্য কেবল পাঠককে আনন্দ দেয় না- সমানভাবে প্রভাবিত করে পাঠক এবং সমাজকে।

আভিধানিকভাবে ‘সহিতের ভাব’ বা ‘মিলন’ অর্থে ‘সাহিত্য’ হলো কাব্য, নাটক, গল্প, উপন্যাস ইত্যাদি সৃজনশিল্পের মাধ্যমে এক হৃদয়ের সঙ্গে অন্য হৃদয়ের সংযোগ স্থাপন; সাহিত্য¯্রষ্টা-সাহিত্যের সাথে পাঠকের এক সানুরাগ বিনিময়। কিন্তু আভিধানিক অর্থের নির্দিষ্ট সীমায় সাহিত্যের স্বরূপ-গতি-প্রকৃতি-বৈচিত্র্য ও বিস্তৃতির সম্যক ধারণা দেওয়া যেমন অসম্ভব, কোনো বিশেষ সংজ্ঞায় তাকে সুনির্দিষ্ট করে দেওয়াও তেমন দুঃসাধ্য। বাচ্যার্থ ও ব্যঞ্জনার্থর সীমাকে অতিক্রম করে নানা রূপে, রসে, প্রকরণ ও শৈলীতে সাহিত্যের নিরন্তর যাত্রা সীমা থেকে অসীমে। প্রত্যক্ষ সমাজপরিবেশ তথা সমকালীন বাস্তব পারিপার্শ্বিক, নিসর্গপ্রীতি ও মহাবিশ্বলোকের বৃহৎ-উদার পরিসরে ব্যক্তিচৈতন্য ও কল্পনার অন্বেষণ ও মুক্তি- আর এইভাবেই শ্রেণিবিভাজন, নামকরণ ও স্বরূপমীমাংসার প্রচেষ্টাকে ছাপিয়ে উঠে সাহিত্যের যাত্রা সীমাহীনতায়। প্রকৃত সাহিত্য তাই যেমন তার সমসময় যা যুগমুহূর্তের, তেমনই তা সর্বকালের সর্বজনের। মার্কসবাদী সাহিত্যতত্ত্বে বাস্তব সমাজজীবনকে ‘ভিত্তি’ আর শিল্প-সাহিত্যকে সমাজের উপরিকাঠামোর [ঝঁঢ়বৎংঃৎঁপঃঁৎব] অংশ হিসেবে গণ্য করা হয়। সাহিত্যের মৌল উপকরণসামগ্রী আহৃত হয় জীবনের ভা-ার থেকে- সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, প্রেম-বৈরিতার বিচিত্র-অনিঃশেষ ভা-ার থেকে। সাহিত্যসৃষ্টির মূলে সক্রিয় যে সৃজনী-ব্যক্তিত্ব তা নিছক বিমূর্ত কোনো সত্তা নয়; আত্মপ্রকাশ ও মানবিক সংযোগ ও বিনিময়ের বাসনায় অনুপ্রাণিত সে সত্তা তার ভাব-ভাবনা, বোধ ও বিশ্বাসকে এক আশ্চর্য কৌশলে প্রকাশ করে জনসমক্ষে কোনো একটি বিশেষ রূপ-রীতি-নীতির আশ্রয়ে। ব্যক্তিক অনুুভূতি-যাপিতজীবন-মিশ্রকল্পনার জগৎ থেকেই সৃষ্টি হয় সাহিত্যের; যুগান্তরের আলোকবর্তিকা হিসেবে সাহিত্য সত্যের পথে সবসময় মাথা উঁচু করে থেকেছে- সত্যকে সন্ধান করেছে। আসলে সাহিত্য এমনি এক দর্পণ- যাতে প্রতিবিম্বিত হয় মানবজীবন, জীবনের চলচ্ছবি, পরিবেশ-প্রতিবেশ, সমাজজীবনে ঘটমান ইতিহাস- ইতিহাসের চোরাস্রােত নানাবিধ কৌণিক সূক্ষ্মতায়।

সাধারণত আত্মপ্রকাশের বাসনা, সমাজ-সত্তার সঙ্গে সংযোগ কামনা, অভিজ্ঞতার আলোয় কল্পলোক নির্মাণ এবং রূপপ্রিয়তা- এই চতুর্মাত্রিক প্রবণতাই মানুষের সাহিত্য-সাধনার মৌল-উৎস। চতুর্মাত্রিক প্রবণতার [আত্মপ্রকাশের কামনা, পারিপার্শ্বিকের সাথে যোগাযোগ বা মিলনের কামনা, কল্প-জগতের প্রয়োজনীয়তা এবং সৌন্দর্য-সৃষ্টির আকাক্সক্ষা বা রূপমুগ্ধতা] মধ্যে সমাজসত্তার সঙ্গে সংযোগ-কামনা এবং অভিজ্ঞতার আলোয় কল্পলোক নির্মাণ- এই উৎসদ্বয়ের মধ্যে নিহিত রয়েছে সাহিত্য ও সমাজের মধ্যে আন্তর-সম্পর্কের প্রাণ-বীজ। সমাজ শিল্পীকে সাহিত্য-সাধনায় প্রণোদিত করে। ‘সহৃদয়-হৃদয় সংবাদ’এর মাধ্যমে সাহিত্যিকগণ লেখক-পাঠকের মধ্যে সেতুবন্ধন রচনা করেন- উভয়ের হৃদয়বীণার তারগুলোকে একই সুতায় গেঁথে দেন। এর কারণে সাহিত্য দেশ-কাল-সমাজের সীমা অতিক্রম করে সর্বসাধারণের হৃদয়কে আকর্ষণ করে। এর ফলে সাহিত্য হয়ে ওঠে সার্বজনীন-সর্বকালের মানুষের হৃদয়ের সামগ্রী এবং সাহিত্য¯্রষ্টাও হয়ে ওঠেন অনেক বড়। কিন্তু বর্তমান বাংলা সাহিত্যচর্চার গতি-প্রকৃতি, সমস্যা-সংকট-সমাধান কোন দিকে? এসব বিষয়ের সন্ধান- এ প্রবন্ধের অন্বিষ্ট।

3.2k
উত্তরঃ

আমাদের লোকশিল্প প্রবন্ধটি আমাদের লোককৃষ্টি গ্রন্থ থেকে গৃহীত হয়েছে। লেখক এ প্রবন্ধে বাংলাদেশের লোকশিল্প ও লোক-ঐতিহ্যের বর্ণনা দিয়েছেন । এ বর্ণনায় লোকশিল্পের প্রতি তার গভীর মমত্ববোধের পরিচয় রয়েছে।
আমাদের নিত্যব্যবহার্য অধিকাংশ জিনিসই এ কুটিরশিল্পের ওপর নির্ভরশীল ।

শিল্পগুণ বিচারে এ ধরনের শিল্পকে লোকশিল্পের মধ্যে গণ্য করা যেতে পারে । পূর্বে আমাদের দেশে যে সমস্ত লোকশিল্পের দ্রব্য তৈরি হতো তার অনেকগুলোই অত্যন্ত উচ্চমানের ছিল। ঢাকাই মসলিন তার অন্যতম। ঢাকাই মসলিন অধুনা বিলুপ্ত হলেও ঢাকাই জামদানি শাড়ি অনেকাংশে সে স্থান অধিকার করেছে।

বর্তমানে জামদানি শাড়ি দেশে-বিদেশে পরিচিত এবং আমাদের গর্বের বস্তু। নকশি কাথা আমাদের একটি গ্রামীণ লোকশিল্প। এ শিল্প আজ বিলুপ্তপ্রায় হলেও এর কিছু কিছু নমুনা পাওয়া যায়। আপন পরিবেশ থেকেই মেয়েরা তাদের মনের মতো করে কীথা সেলাইয়ের অনুপ্রেরণা পেতেন । কাঁথার প্রতিটি সুচের ফোঁড়ের মধ্যে লুকিয়ে আছে এক-একটি পরিবারের কাহিনী, তাদের পরিবেশ, তাদের জীবনগাঁথা ।

আমাদের দেশের কুমোরপাড়ার শিল্পীরা বিভিন্ন ধরনের তৈজসপত্র ছাড়াও পোড়ামাটি দিয়ে নানা প্রকার শৌখিন দ্রব্য তৈরি করে থাকে। নানা প্রকার পুতুল, মূর্তি ও আধুনিক রুচির ফুলদানি, ছাইদানি, চায়ের সেট ইত্যাদি তারা গড়ে থাকে।
খুলনার মাদুর ও সিলেটের শীতলপাটি সকলের কাছে পরিচিত। আমাদের দেশের এই যে লোকশিল্প তা সংরক্ষণের দায়িত আমাদের সকলের । লোকশিল্পের মাধ্যমে আমরা আমাদের ঐতিহ্যকে বিশ্বের কাছে তুলে ধরতে পারি।

arif
arif
3 years ago
3.7k
উত্তরঃ

আমাদের অর্থনৈতিক সম্পদ

 

বাংলাদেশ, একটি দ্রুত উন্নতি লক্ষ্য নির্ধারণ করা দেশ, যা প্রচুর অর্থনৈতিক সম্পদের বেশিরভাগ সম্পদ নিয়ে এগিয়ে চলেছে। এই দেশের অর্থনৈতিক সম্পদ মৌলিকভাবে চারটি প্রধান উৎস থেকে আসে: জমি, কাজ, উদ্যোগ, এবং মানুষের কাজের দক্ষতা। এই সম্পদের বিকাশে বিভিন্ন রাজনৈতিক, আর্থিক এবং সামাজিক পরিবর্তনের ভূমিকা রয়েছে।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পদের মূল স্তম্ভ হল কৃষি। দেশটি একটি প্রধানত কৃষিপ্রধান দেশ হিসেবে পরিচিত। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নতির মূল হিসেবে প্রধানত শস্য ও ফসল চাষ প্রসঙ্গে বিকাশ হয়েছে। বাংলাদেশে প্রধানত ধান, পাট, মশুর ডাল, আখ, পটল, পেঁপে, তেল সহ বিভিন্ন ফসল চাষ করা হয়। অত্যন্ত উচ্চ মানের খাদ্য সামগ্রী উৎপাদনের ফলে এই খাদ্য পণ্য রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক সম্পদের গড়াতে সাহায্য করে।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক উৎস হল প্রবৃদ্ধি ও শিক্ষাগত উন্নতি। বাংলাদেশে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের অভাব কমে আসছে এবং মানুষের দক্ষতা বৃদ্ধি করছে। বিশেষত, প্রযুক্তির আগমন এবং বিনিয়োগে বৃদ্ধি নেওয়া হচ্ছে, যা অর্থনৈতিক সম্পদের উন্নতির পথে সাহায্য করছে।

অন্যান্য উৎস হিসেবে প্রযুক্তিবিদ্যা এবং সেবা অংশ গুলির অগ্রগতি আছে। বাংলাদেশের সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক সম্পদ হল তার মানুষের চাকরিভার্থী শ্রমিকেরা। তাদের দক্ষতা, উদ্যোগ, ও সামর্থ্য বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

যদিও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পদ উন্নতির পথে অনেক উত্সাহজনক প্রগতি হয়েছে, তবে এখনও অনেক চ্যালেঞ্জ র

য়েছে। প্রধানতঃ গরিব মানুষের জন্য আর্থিক সম্পদের অগ্রগতি নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ হলেও এখনও বেশিরভাগ লোকের মধ্যে বৃদ্ধির অভাব আছে। তাছাড়া, পরিবেশের সম্পদ সংরক্ষণের জন্য সঠিক প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থা প্রয়োজন।

পুনর্নির্মাণ ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সম্পদের বিস্তার ও উন্নতি নিশ্চিত করতে পারে। সঠিক নীতি নির্ধারণ, উদ্যোগের বৃদ্ধি, প্রযুক্তিগত প্রবর্তন এবং শিক্ষাগত উন্নতি এমন পরিবর্তন নিশ্চিত করতে সাহায্য করতে পারে।

শেষ কথায়, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পদ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যা দেশটির সমৃদ্ধি ও উন্নতির সাথে অবিভাজ্যভাবে সংযোগিত। একটি দ্রুত বৃদ্ধির উপায় হল সঠিক পরিকল্পনা, ব্যবস্থাপনা এবং উদ্যোগের বৃদ্ধি করা। এই প্রস্তুতি নেওয়ার মাধ্যমে, বাংলাদেশ তার অর্থনৈতিক সম্পদ উন্নতির পথে আরও এগিয়ে যেতে পারে এবং তার মানুষের জন্য আরো উন্নত ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে পারে।

2.4k
উত্তরঃ

"বিক্ষুব্ধ পূর্ব ইউরোপ" বলতে পূর্ব ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ১৯৮৯ সালের পর সাম্যবাদী শাসনের পতন এবং এর ফলে উদ্ভূত রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতাকে বোঝায়। এই সময়কালে, পূর্ব ইউরোপের দেশগুলো গণতন্ত্র ও বাজার অর্থনীতির দিকে ধাবিত হয়, যার ফলে নতুন জাতীয়তাবাদ, অর্থনৈতিক সংকট, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও সামাজিক পরিবর্তন দেখা যায়। 

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও কারণ: 

সাম্যবাদের পতন:

১৯৮৯ সালের ঐতিহাসিক বছরটি পূর্ব ইউরোপে সাম্যবাদী ব্যবস্থার পতন ঘটায়, যা ছিল একটি যুগান্তকারী ঘটনা। এই পরিবর্তনের ফলে দেশগুলো তাদের সাম্যবাদী অতীত থেকে মুক্তি পেতে শুরু করে।

গণতন্ত্রের পথে যাত্রা:

সাম্যবাদের পতনের পর পূর্ব ইউরোপের দেশগুলো গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা ও মুক্ত বাজার অর্থনীতির দিকে ঝুঁকে পড়ে।

বিক্ষোভ ও অস্থিতিশীলতার কারণসমূহ: 

অর্থনৈতিক সংকট:

সাম্যবাদী অর্থনীতি থেকে বাজার অর্থনীতিতে উত্তরণ অনেক দেশে অর্থনৈতিক সংকট সৃষ্টি করে। বেকারত্ব, মুদ্রাস্ফীতি, এবং ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে বৈষম্য বাড়ে, যা সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করে।

জাতীয়তাবাদের উত্থান:

অনেক দেশে সাম্যবাদী শাসনের অবসানের পর বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে জাতীয়তাবোধ তীব্র হয়, যা নতুন করে জাতিগত সংঘাতের জন্ম দেয়।

রাজনৈতিক অস্থিরতা:

নতুন গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো সুসংহত হতে সময় লাগে, ফলে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা দেখা দেয়। অনেক দেশে ক্ষমতা ও আদর্শের লড়াইয়ের কারণে সহিংসতাও ঘটে।

সামাজিক পরিবর্তন:

পুরনো সাম্যবাদী নীতি ও ব্যবস্থার পরিবর্তে নতুন সামাজিক কাঠামো ও মূল্যবোধের জন্ম হতে থাকে, যা সমাজের বিভিন্ন স্তরে অস্থিরতা সৃষ্টি করে।

গুরুত্বপূর্ণ দিক: 

  • এই বিক্ষুব্ধ পরিস্থিতি পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোতে এক নতুন যুগের সূচনা করে, যেখানে তারা তাদের নিজস্ব পথে নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের সুযোগ পায়।
  • যদিও এই পরিবর্তন প্রক্রিয়াটি কঠিন ছিল, এটি এই অঞ্চলে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

এইভাবে, "বিক্ষুব্ধ পূর্ব ইউরোপ" মূলত সেই সময়ের পরিবর্তন, অস্থিরতা এবং নতুন করে গড়ে ওঠার জটিল প্রক্রিয়াকে নির্দেশ করে, যা সাম্যবাদের পতন ও গণতান্ত্রিক যাত্রার ফলস্বরূপ ঘটেছিল। 

Satt Team 10
Satt Team 10
10 months ago
2.3k
উত্তরঃ

পররাষ্ট্রনীতি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নীতির সম্প্রসারণ। পররাষ্ট্রনীতি হলো কোনো সার্বভৌম রাষ্ট্রের গৃহীত সেসব নীতি যা রাষ্ট্র তার রাষ্ট্রীয় স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য অন্যান্য রাষ্ট্রের সাথে যোগাযোগ রক্ষার ক্ষেত্রে সম্পাদন করে থাকে। অন্য রাষ্ট্রের মতো বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে রাষ্ট্রের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতাকে তুলে ধরে।

১৯৭১ সালে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদয় আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। স্বাধীনতা লাভের পরবর্তী সময়ে ভৌগোলিক অবস্থান, স্বল্প পরিসরের ভূখন্ড এবং সীমিত অর্থনৈতিক সম্পদ ইত্যাদি বিভিন্ন নিয়ামক বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণের সুযোগকে সীমাবদ্ধ করে দেয়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি মূলত বহিঃশক্তির প্রভাব থেকে  দেশের সাবভৌমত্ব ও ভূখন্ডকে রক্ষা করার মতো বিষয়েই সীমাবদ্ধ থেকে গেছে।

পররাষ্ট্রনীতি সম্পর্কীয় সাংবিধনিক বিধান  বাংলাদেশের সংবিধানের বিভিন্ন অনুচ্ছেদে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির নির্দেশনা রয়েছে। এই নির্দেশনাসমূহ বাংলাদেশ সংবিধানের ২৫ নং অনুচ্ছেদে বর্ণিত হয়েছে। এগুলি হলো:

জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও সমতার প্রতি শ্রদ্ধা, অপর রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা, আন্তর্জাতিক বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধান এবং আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘের সনদে বর্ণিত নীতিসমূহের প্রতি শ্রদ্ধা, এ সকল নীতিই হবে রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভিত্তি এবং এ সকল নীতির ভিত্তিতে-

১. রাষ্ট্র আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে শক্তিপ্রয়োগ থেকে বিরত থাকা এবং সাধারণ ও পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণের জন্য চেষ্টা করবে; প্রত্যেক জাতির স্বাধীন অভিপ্রায় অনুযায়ী পথ ও পন্থার মাধ্যমে অবাধে নিজস্ব সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা নির্ধারণ ও গঠনের অধিকার সমর্থন করবে; এবং সাম্রাজ্যবাদ, উপনিবেশবাদ বা বর্ণ্যবৈষম্যবাদের বিরুদ্ধে বিশ্বের সর্বত্র নিপীড়িত জনগণের ন্যায়সঙ্গত সংগ্রামকে সমর্থন করবে।

২. রাষ্ট্র ইসলামী সংহতির ভিত্তিতে মুসলিম দেশসমূহের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব সম্পর্ক সংহত, সংরক্ষণ এবং জোরদার করতে সচেষ্ট হবে। সংবিধানের ৬৩ অনুচ্ছেদে যুদ্ধ-ঘোষণা সংক্রান্ত নীতি উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে সংসদের সম্মতি ব্যতিত যুদ্ধ ঘোষণা করা যাবে না, কিংবা প্রজাতন্ত্র কোনো যুদ্ধে অংশগ্রহণ করবে না। অনুচ্ছেদ ১৪৫(ক)তে বৈদেশিক চুক্তি সম্পর্কে বলা হয়েছে: ‘বিদেশের সাথে সম্পাদিত সকল চুক্তি রাষ্ট্রপতির নিকট পেশ করা হবে, এবং রাষ্ট্রপতি তা সংসদে পেশ করার ব্যবস্থা করবেন। তবে শর্ত হচ্ছে যে, জাতীয় নিরাপত্তার সাথে সংশ্লিষ্ট অনুরূপ কোন চুক্তি কেবলমাত্র সংসদের গোপন বৈঠকে পেশ করা হবে।’

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূলনীতিসমূহ  পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কিছু মূলনীতি অনুসরণ করে থাকে। জাতিসংঘ এবং ন্যামের মতো বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠনের সদস্য হিসেবে বাংলাদেশ এসব সংগঠনের মূলনীতিসমূহ মেনে চলে, এবং বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির প্রধান নীতিসমূহ এসব সংগঠনের নীতির সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির প্রধান চারটি মূলনীতি হলো:

সকলের প্রতি বন্ধুত্ব, কারও প্রতি বিদ্বেষ নয়  একটি দরিদ্র রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ তার অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য বৈদেশিক সাহায্যের উপর নির্ভরশীল হবার কারণে বাংলাদেশকে বিভিন্ন মতাদর্শ দ্বারা প্রভাবিত হতে হয়। এ কারণেই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু  শেখ মুজিবুর রহমান পররাষ্ট্রনীতির মূলনীতি হিসেবে বলেছিলেন, ‘আমাদের একটি ক্ষুদ্র দেশ, কারও প্রতি বিদ্বেষ নয়, আমরা চাই সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব’।

অন্য রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, স্বাধীনতা ও ভৌগোলিক অখন্ডতার প্রতি সম্মান প্রদর্শন  বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্য। জাতিসংঘ সনদের ২(৪) ধারায় বলা হয়েছে ‘আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সকল সদস্য-রাষ্ট্র আঞ্চলিক অখন্ডতার বিরুদ্ধে কিংবা অন্য কোনো রাষ্ট্রের রাজনৈতিক স্বাধীনতার বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগের ভীতি প্রদর্শন থেকে এবং জাতিসংঘের উদ্দেশ্যের সংঙ্গে সামঞ্জস্যহীন কোনো উপায় গ্রহণ করা থেকে নিবৃত্ত থাকবে’।

অন্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ না করা  জাতিসংঘ সনদের ২(৭) ধারায় বলা হয়েছে যে,  ‘বর্তমান সনদ জাতিসংঘকে কোনো রাষ্ট্রের নিছক অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের অধিকার দিচ্ছে না বা সেরূপ বিষয়ের নিষ্পত্তির জন্য কোনো সদস্যকে জাতিসংঘের দারস্থ হতে হবে না; কিন্তু সপ্তম অধ্যায় অনুযায়ী কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের ব্যাপারে এই নীতি অন্তরায় হবে না’। জাতিসংঘের একটি সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ এই মূলনীতির উপর তার পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন করেছে, যা অন্য রাষ্ট্রের কাছে বাংলাদেশের বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে প্রকাশিত।

২০০৯ সালে পুনরায় আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসে, এবং প্রধানমন্ত্রী  শেখ হাসিনা পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনয়নের কথা ঘোষণা করেন। বাংলাদেশের নিরাপত্তা ধারণা বিবেচনায় রেখে প্রায় তিন দশক পর ভারতের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের কথা ঘোষণা করা হয়। সম্প্রতি সরকার রাশিয়ার সাথে সম্পর্ক ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে রাশিয়ার সাহায্যে দেশে পারমাণবিক প্ল্যান্ট স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।

সময়ের পরিবর্তনের সাথে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ভবিষ্যত অর্জনের সম্ভাবনা অনেকটা ক্ষীণ হয়ে পড়ছে। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ তার প্রতিবেশী এবং আঞ্চলিক রাষ্ট্রসমূহের সাথে এবং বিশ্বের আরো কিছু রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূলনীতি ‘সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে শত্রুতা নয়’ একটি সত্তুরের দশকের ধারণা, যা প্রায় ৪০ বছরের পুরনো। বর্তমান পরিবর্তিত বিশ্ব প্রেক্ষাপটে পুরনো ধারার পরররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করে বাংলাদেশ প্রতিনিয়ত তার অর্জনের সম্ভাবনা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। সুতরাং পররাষ্ট্রনীতির লক্ষ্য নিয়ে নতুন কৌশল-পরিকল্পনা করা উচিত, যার মাধ্যমে পরিবর্তিত বিশ্বে নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনের পথে বাংলাদেশ এগিয়ে যেতে পারে।  [ঊর্মি হোসেন]

Md. Aminul Islam
Md. Aminul Islam
3 years ago
4.5k
শিক্ষকদের জন্য বিশেষভাবে তৈরি

১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!

শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!

প্রশ্ন এডিট করা যাবে
জলছাপ দেয়া যাবে
ঠিকানা যুক্ত করা যাবে
Logo, Motto যুক্ত হবে
অটো প্রতিষ্ঠানের নাম
অটো সময়, পূর্ণমান
প্রশ্ন এডিট করা যাবে
জলছাপ দেয়া যাবে
ঠিকানা যুক্ত করা যাবে
Logo, Motto যুক্ত হবে
অটো প্রতিষ্ঠানের নাম
অটো সময়, পূর্ণমান
অটো নির্দেশনা (এডিটযোগ্য)
অটো বিষয় ও অধ্যায়
OMR সংযুক্ত করা যাবে
ফন্ট, কলাম, ডিভাইডার
প্রশ্ন/অপশন স্টাইল পরিবর্তন
সেট কোড, বিষয় কোড
অটো নির্দেশনা (এডিটযোগ্য)
অটো বিষয় ও অধ্যায়
OMR সংযুক্ত করা যাবে
ফন্ট, কলাম, ডিভাইডার
প্রশ্ন/অপশন স্টাইল পরিবর্তন
সেট কোড, বিষয় কোড
এখনই শুরু করুন ডেমো দেখুন
৫০,০০০+
শিক্ষক
৩০ লক্ষ+
প্রশ্নপত্র
মাত্র ১৫ পয়সায় প্রশ্নপত্র
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন তৈরি করুন আজই

Complete Exam
Preparation

Learn, practice, analyse and improve

1M+ downloads
4.6 · 8k+ Reviews