উত্তরঃ
ভূমিকা :
একটি দেশের সার্বিক উন্নয়ন, অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির মূল চাবিকাঠি হলো শিক্ষা। যেকোনো দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সামাজিক প্রগতি এবং সাংস্কৃতিক বিকাশ সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করে সে দেশের মানসম্মত ও যুগোপযোগী শিক্ষা কাঠামোর ওপর। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। স্বাধীনতার পর থেকে এ দেশের শিক্ষা খাতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কাঠামোগত পরিবর্তন, অবৈতনিক প্রাথমিক শিক্ষা, জেন্ডার সমতা এবং সংখ্যাগত প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। তবে একই সাথে যুগের চাহিদার সাথে তাল মেলাতে গিয়ে এবং কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে এই ব্যবস্থা বেশ কিছু গভীর সংকটের মুখে পড়েছে। বর্তমান বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা, চতুর্থ শিল্পবিপ্লব এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক, বিজ্ঞানমনস্ক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও যুগোপযোগী করে তোলা সময়ের অপরিহার্য দাবি।
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার বর্তমান রূপরেখা :
স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে বর্তমান কাঠামোতে এসে পৌঁছেছে, যা দেশের সামগ্রিক আর্থ-সামাজিক ও কাঠামোগত পরিবর্তনের একটি বাস্তব প্রতিচ্ছবি। বাংলাদেশের প্রচলিত এই শিক্ষা ব্যবস্থা মূলত তিনটি প্রধান ধারায় বিভক্ত সাধারণ শিক্ষা, মাদ্রাসা শিক্ষা এবং কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা যা স্তরবিন্যাসের দিক থেকে প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চ-মাধ্যমিক এবং উচ্চশিক্ষা এই চারটি সুনির্দিষ্ট ধাপে বিন্যস্ত। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে শতভাগ ভর্তির হার নিশ্চিতকরণ, ছাত্র-ছাত্রীদের সংখ্যার মধ্যে জেন্ডার সমতা আনয়ন এবং বছরের শুরুতে প্রাক-প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক স্তরের কোটি কোটি শিক্ষার্থীর হাতে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণের মতো লজিস্টিক ও নীতিগত ক্ষেত্রগুলোতে বাংলাদেশ বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে প্রশংসনীয় সাফল্য অর্জন করেছে। তবে অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং এই পরিমাণগত বা সংখ্যাগত বৃদ্ধি অর্জিত হলেও, প্রকৃত গুণগত মানদণ্ডে, কিংবা আধুনিক বৈশ্বিক ও সমকালীন শ্রমবাজারের চাহিদার নিরিখে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা এখনো কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রা স্পর্শ করতে পারেনি। একই সাথে একটি যুগোপযোগী, সমন্বিত ও বৈষম্যহীন জাতীয় শিক্ষা নীতি ও শিক্ষা আইনের কার্যকর ও পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের অভাব এই সমান্তরাল শিক্ষাব্যবস্থাকে বহুমুখী ধারায় বিভক্ত করে রেখেছে, যা একদিকে যেমন শিক্ষার্থীদের মাঝে শ্রেণিগত ও মনস্তাত্ত্বিক বিভাজন তৈরি করছে, অন্যদিকে তেমনি সবার জন্য সমমানের মৌলিক শিক্ষা নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে একটি সুষম ও সাম্যভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণের জাতীয় লক্ষ্যকে অনবরত চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে।
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার বর্তমান সংকটসমূহ :
দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা কাঠামোগত দুর্বলতা এবং সাম্প্রতিক সময়ে উদ্ঘাটিত বেশ কিছু নীতিগত সমস্যা বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার গুণগত মান অর্জনকে প্রতিনিয়ত বাধাগ্রস্ত করছে। প্রধান প্রধান সংকটগুলো নিচে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো
- গুণগত মানের অভাব ও মুখস্থ-নির্ভরতা: শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত শিক্ষার্থীর চিন্তাশক্তি ও সৃজনশীলতার বিকাশ। কিন্তু দেশের প্রচলিত পরীক্ষা পদ্ধতি ও পাঠ্যক্রম এখনো বহুলাংশে মুখস্থবিদ্যার ওপর নির্ভরশীল। শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে মূল্যায়নের চূড়ান্ত পর্যায় পর্যন্ত এমন একটি কাঠামো দাঁড়িয়ে গেছে, যেখানে শিক্ষার্থীর নিজস্ব চিন্তার চেয়ে হুবহু তথ্য পুনরুতপাদনের ক্ষমতাকে বেশি পুরস্কৃত করা হয়। এর ফলে শিক্ষার্থীরা পরীক্ষায় ভালো ফলাফলের মাধ্যমে উচ্চ জিপিএ বা ভালো গ্রেড পেলেও বাস্তব জীবনে কোনো জটিল সমস্যা সমাধান কিংবা স্বাধীন ও যৌক্তিক চিন্তার কোনো ব্যবহারিক দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না। ফলে এই বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীর উচ্চ জিপিএ প্রকৃত জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে।
- বাস্তবমুখী ও কর্মমুখী শিক্ষার অভাব দেশের প্রচলিত উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার সাথে বাস্তবমুখী কর্মসংস্থানের বাজারের কোনো দীর্ঘমেয়াদি যোগসূত্র বা সমন্বয় নেই। প্রতি বছর লাখ লাখ তরুণ সাধারণ শিক্ষায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হচ্ছে, কিন্তু দেশের অভ্যন্তরে বা আন্তর্জাতিক বাজারে সেই অনুযায়ী চাকরির ক্ষেত্র প্রস্তুত নেই। কারিকুলামে যুগোপযোগী কারিগরি জ্ঞানের তীব্র অভাব থাকায় উচ্চশিক্ষিত বেকারত্বের হার দিন দিন আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। শিক্ষা যখন একজন শিক্ষার্থীর জন্য সম্মানজনক কর্মসংস্থানের পথ তৈরি করতে পারে না, তখন তা যুবকদের মাঝে তীব্র হতাশা ও সামাজিক অসন্তোষের সৃষ্টি করে। তাত্ত্বিক জ্ঞানের আড়ালে এই প্রায়োগিক ও পেশাগত দক্ষতার অভাব বর্তমানে আমাদের অন্যতম প্রধান জাতীয় সংকট হিসেবে দাঁড়িয়েছে।
- বিষয় ভিত্তিক শিক্ষার অবলুপ্তি: বিষয় ভিত্তিক শিক্ষার অবলুপ্তি বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার জন্য একটি বড় ধাক্কা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। মাধ্যমিক স্তর থেকে বিজ্ঞান, মানবিক, ও ব্যবসায় শিক্ষা শাখা তুলে দেওয়ার পরিকল্পনা শিক্ষার্থীদের শিক্ষার ভিত্তিকে দুর্বল করে দিতে পারে। ঐতিহ্যগতভাবে এই শাখাগুলোর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা তাদের আগ্রহ ও ক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে নির্দিষ্ট বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করে থাকে। তবে নতুন শিক্ষাব্যবস্থায় সব বিষয়ের ওপর সমান গুরুত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে, যা শিক্ষার্থীদের আগ্রহের বিষয়ে গভীর জ্ঞানার্জনের সুযোগ কমিয়ে দেবে। এই পরিবর্তনের ফলে শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার জন্য পর্যাপ্ত প্রস্তুতি থাকবে না এবং তারা ভবিষ্যতে বিশেষায়িত পেশায় প্রবেশের ক্ষেত্রে অসুবিধার সম্মুখীন হতে পারে।
- শিক্ষক সংকট, অপ্রশিক্ষণ এবং মর্যাদা হ্রাস: বিশেষ করে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে মানসম্মত শিক্ষকের তীব্র সংকট রয়েছে। অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধারণক্ষমতার চেয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা অনেক বেশি হওয়ায় শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর অনুপাত মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। এর পাশাপাশি কর্মরত শিক্ষকদের আধুনিক শিক্ষাদান পদ্ধতি, মনস্তাত্ত্বিক পেডাগোজি ও আধুনিক প্রযুক্তির ওপর পর্যাপ্ত এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণের অভাব রয়েছে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো শিক্ষকদের পেশাগত অবমূল্যায়ন যা তাদের আর্থিক নিরাপত্তা ও সামাজিক অবস্থানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। শিক্ষকদের এই দুর্বল বেতন কাঠামো ও সামাজিক মর্যাদা আকর্ষণীয় না হওয়ার কারণে দেশের মেধাবী ও যোগ্য তরুণেরা এই মহৎ পেশায় আসতে বিন্দুমাত্র আগ্রহ দেখাচ্ছেন না।
- বাজেট বরাদ্দ ও গবেষণার ঘাটতি ইউনেস্কোর আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী একটি দেশের মোট জিডিপির অন্তত শতাংশ অথবা বার্ষিক বাজেটের ২০ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ করা উচিত। কিন্তু বাংলাদেশে এই বরাদ্দ জাতীয় শিক্ষানীতির লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম। এই অপর্যাপ্ত অর্থায়নের ফলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর আধুনিক গবেষণাগার, সমৃদ্ধ লাইব্রেরি এবং ডিজিটাল অবকাঠামোগত উন্নয়ন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মৌলিক ও প্রায়োগিক গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় রাষ্ট্রীয় ফান্ডের চরম অভাব রয়েছে। নতুন জ্ঞান সৃষ্টির পরিবেশ না থাকায় দেশ থেকে প্রতিবছর মারাত্মক মেধা পাচার বা 'ইৎধরহ উৎধরহ' সৃষ্টি হচ্ছে, যা দেশের মেধা সম্পদকে শূন্য করে দিচ্ছে।
- নীতি নির্ধারণের ত্রুটি ও ঘন ঘন কারিকুলাম পরিবর্তন: কোনো দীর্ঘমেয়াদি রূপরেখা ও সুনির্দিষ্ট জাতীয় পরিকল্পনা ছাড়া বারবার পাঠ্যক্রম এবং মূল্যায়ন পদ্ধতি পরিবর্তন করায় শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের মধ্যে এক ধরণের স্থায়ী বিভ্রান্তি ও আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। নতুন কোনো পদ্ধতি পুরোপুরি বাস্তবায়িত বা মূল্যায়িত হওয়ার আগেই তা পরিবর্তন করার ফলে পুরো শিক্ষা ব্যবস্থা একটি পরীক্ষামূলক ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। এর পাশাপাশি, নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে আরেকটি বড় অন্তরায় হলো মাঠপর্যায়ের শিক্ষকদের অভিজ্ঞতাকে অবমূল্যায়ন করা। যারা সরাসরি শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের সাথে কাজ করেন, তাদের বাস্তব মতামত ও অন্তর্দৃষ্টি গ্রহণ না করে আমলাতান্ত্রিকভাবে নীতি প্রবর্তন করায় তা বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্যহীন হয়ে পড়ছে।
- কোচিং বাণিজ্য ও অ্যাসাইনমেন্টের অপব্যবহার শিক্ষার চরম বাণিজ্যিকীকরণ ও শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত কোচিং সেন্টারের রমরমা সিন্ডিকেট ব্যবসা শিক্ষাকে একটি পরম মৌলিক অধিকারের পরিবর্তে 'বাণিজ্যিক পণ্যে' রূপান্তরিত করেছে। এর ফলে ক্লাসরুমের শিক্ষার চেয়ে ছায়া শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর শিক্ষার্থীদের নির্ভরতা বাড়ছে, যা দরিদ্র পরিবারের জন্য মানসম্মত শিক্ষা লাভ অসম্ভব করে তুলছে। তদুপরি, নতুন কারিকুলামে অন্তর্ভুক্ত গ্রুপ স্টাডি বা অ্যাসাইনমেন্টের ধারণাকে যথাযথ গাইডলাইনের অভাবে মাঠপর্যায়ে অপপ্রয়োগ করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীরা নিজে থেকে কোনো পড়াশোনা বা চিন্তাভাবনা না করে সরাসরি ইন্টারনেট, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম কিংবা বাজারজাত অ্যাপ থেকে উত্তর 'কপি-পেস্ট' করে শিক্ষকের কাছে জমা দেওয়ার এক ক্ষতিকর ফাঁকিবাজি সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত হয়ে উঠছে, যা শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্যকে চরমভাবে ব্যাহত করছে।
- উচ্চশিক্ষার আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়ে পিছিয়ে পড়া ও গবেষণার স্থবিরতা আমাদের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বৈশ্বিক র্যাংকিংয়ে ক্রমান্বয়ে পিছিয়ে পড়ছে। এর প্রধান কারণ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নতুন জ্ঞান সৃষ্টির চেয়ে কেবল সনদ বিতরণের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় ফান্ড বা তহবিলের তীব্র সংকটের কারণে শিক্ষাবিদ ও শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক মানের গবেষণায় যুক্ত হতে পারছেন না। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের বৈশ্বিক মানদণ্ড হারাচ্ছে এবং দেশ এক গভীর মেধা ও জ্ঞানতাত্ত্বিক শূন্যতার দিকে ধাবিত হচ্ছে।
- শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অতি-রাজনীতিকরণ ও প্রশাসনিক দুর্বলতা আমাদের প্রাথমিক স্তর থেকে শুরুকরে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে অতি-রাজনীতিকরণ ও প্রশাসনিক দুর্বলতা শিক্ষার মানকে মারাত্মকভাবে গ্রাস করেছে। শিক্ষক নিয়োগ, পদোন্নতি, পরিচালনা পর্ষদ গঠন এবং যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্তগুলোতে মেধার চেয়ে রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত আনুগত্য ও তদবির সংস্কৃতি চরমভাবে প্রাধান্য পায়। রাজনীতির এই নেতিবাচক প্রভাব ও প্রশাসনিক জবাবদিহিতার অভাব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সুষ্ঠু, শৃঙ্খলাপূর্ণ ও নিরপেক্ষ শিক্ষার পরিবেশকে প্রতিদিন মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে।
শিক্ষা খাতে নানাবিধ দৃশ্যমান সংকট যত গভীরই হোক না কেন, বাংলাদেশের বিশাল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী এবং বিগত বছরগুলোতে বাস্তবায়িত কিছু সময়োপযোগী ও ইতিবাচক রূপান্তরের ফলে এই খাতে এক বিশাল ও অবারিত সম্ভাবনার দুয়ার উন্মোচিত হয়েছে। সেই সম্ভাবনার ক্ষেত্রগুলো নিচে বিশদভাবে বিশে ষণ করা হলো :
- জনমিতিক লভ্যাংশ ও কর্মক্ষম তরুণ প্রজন্ম: বাংলাদেশের বর্তমান জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি অংশ তরুণ, যা জনমিতিক লভ্যাংশ
বা 'ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড' হিসেবে পরিচিত। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে যেখানে উন্নত দেশগুলো প্রবীণ জনসংখ্যার আধিক্যে ভুগছে, সেখানে বাংলাদেশের এই বিশাল কর্মক্ষম তরুণ সমাজ আমাদের সবচেয়ে বড় জাতীয় শক্তি ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা। এই বিশাল যুবশক্তিকে যদি আধুনিক, বিজ্ঞানমনস্ক ও নৈতিক শিক্ষায় দীক্ষিত করে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করা যায়, তবে তারা অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিকে বেগবান করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারেও নেতৃত্ব দিতে পারবে। এই তরুণ প্রজন্মের মেধা ও শক্তির সঠিক বিকাশই বাংলাদেশের উন্নত রাষ্ট্রে পৌঁছানোর প্রধান চালিকাশক্তি। - নতুন কারিকুলাম ও রূপান্তর: শিক্ষাব্যবস্থা থেকে সনাতন মুখস্থনির্ভরতা ও পরীক্ষাভীতি দূর করতে এবং শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে বাস্তবমুখী শেখার সুযোগ বাড়াতে জাতীয় শিক্ষাক্রমে একটি বড় ধরনের কাঠামোগত রূপান্তর আনার প্রচেষ্টা চলছে। এই নতুন রূপান্তরের মূল লক্ষ্যই হলো শিক্ষার্থীদের শুধু তাত্ত্বিক ও পুথিগত জ্ঞানে আবদ্ধ না রেখে বাস্তব জীবনমুখী, সৃজনশীল, অভিজ্ঞতাভিত্তিক এবং দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা নিশ্চিত করা। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মাঝে সূক্ষ্ম চিন্তন দক্ষতা এবং দলগত কাজের মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের মানসিকতা গড়ে উঠবে, যা তাদের ভবিষ্যৎ চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এবং গতিশীল কর্মবাজারের উপযোগী করে তুলবে।
- তথ্যপ্রযুক্তি ও ডিজিটাল শিক্ষার বিস্তার: সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশে অনলাইন, দূরশিক্ষণ এবং তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক ডিজিটাল শিক্ষার এক অভূতপূর্ব ও ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে। প্রত্যন্ত ও প্রান্তিক অঞ্চলের শিক্ষার্থীরাও এখন দ্রুতগতির ইন্টারনেট ও স্মার্ট ডিভাইসের কল্যাণে দেশের ও আন্তর্জাতিক স্তরের মানসম্মত শিক্ষামূলক কনটেন্ট, ভার্চুয়াল ক্লাসরুম এবং ওপেন সোর্স কোর্স করার সুবর্ণ সুযোগ পাচ্ছে। ক্লাসরুমগুলোতে মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর ও আইসিটি ল্যাবের অন্তর্ভুক্তি শিক্ষাদান প্রক্রিয়াকে আরও আকর্ষণীয় ও সহজবোধ্য করে তুলেছে। একটি আধুনিক, জ্ঞানভিত্তিক ও প্রযুক্তিনির্ভর 'স্মার্ট বাংলাদেশ' বিনির্মাণে এই শিক্ষাগত ও প্রযুক্তিগত রূপান্তর দারুণ ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে।
- উচ্চশিক্ষায় আন্তর্জাতিকীকরণ ও গবেষণা দেশের পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উচ্চশিক্ষা কাঠামোতে এখন বৈশ্বিক চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চাহিদার সাথে সামঞ্জস্য রেখে রোবোটিক্স, ডেটা সায়েন্স, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), সাইবার সিকিউরিটি এবং বায়োটেকনোলজির মতো অত্যাধুনিক ও প্রায়োগিক বিষয়গুলো দ্রুত অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। এর ফলে আমাদের গ্যাজুয়েটরা বিশ্বমঞ্চে প্রতিযোগিতার যোগ্য হয়ে উঠছে। একই সাথে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আন্তর্জাতিক মানের মৌলিক গবেষণার পরিধি বাড়াতে, দেশীয় শিল্পের সাথে প্রাতিষ্ঠানিক সংযোগ তৈরি করতে এবং মেধাবী শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করতে রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক তহবিল বৃদ্ধির নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে মেধা পাচার রোধে সহায়ক হবে।
উত্তরণের উপায় ও করণীয়:
শিক্ষা ব্যবস্থার বিদ্যমান সংকটগুলোকে সমূলে দূর করে এর সুপ্ত ও অমিত সম্ভাবনাকে শতভাগ জাতীয় কল্যাণে কাজে লাগাতে হলে নিােক্ত সুনির্দিষ্ট ও দীর্ঘমেয়াদী পদক্ষেপসমূহ দ্রুত গ্রহণ করা জরুরি:
⇒ শিক্ষাক্রমের আধুনিকীকরণ ও প্রায়োগিক রূপান্তর: প্রথাগত মুখস্থনির্ভর শিক্ষা পদ্ধতি পুরোপুরি বর্জন করে শিক্ষাক্রমকে সম্পূর্ণ কর্মমুখী,
জীবনমুখী ও কারিগরি দক্ষতাভিত্তিক করতে হবে। প্রাথমিক স্তর থেকেই শিক্ষার্থীদের কোডিং, সমস্যা সমাধান এবং সৃজনশীল চিন্তার সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে হবে। বাস্তব জীবনের সমস্যা সমাধানের দক্ষতার ওপর চূড়ান্ত জোর দিতে হবে। মূল্যায়ন পদ্ধতি এমন হতে হবে যা শিক্ষার্থীর মুখস্থ করার ক্ষমতা নয়, বরং তার চিন্তাশক্তি ও উদ্ভাবনী প্রতিভাকে পরিমাপ ও পুরস্কৃত করবে।
⇒ মূল্যায়ন পদ্ধতির আধুনিকীকরণ: পরীক্ষার খাতার সনাতন সংখ্যার নম্বর ও জিপিএ-ভিত্তিক মূল্যায়নের চেয়ে বছরজুড়ে শিক্ষার্থীর ধারাবাহিক মূল্যায়ন, দলগত কাজ, সৃজনশীল প্রজেক্ট এবং বাস্তব জীবনের সমস্যা সমাধানের দক্ষতার ওপর চূড়ান্ত জোর দিতে হবে। মূল্যায়ন পদ্ধতি এমন হতে হবে যা শিক্ষার্থীর মুখস্থ করার ক্ষমতা নয়, বরং তার চিন্তাশক্তি ও উদ্ভাবনী প্রতিভাকে পরিমাপ ও পুরস্কৃত করবে।
কারিগরি শিক্ষার আধুনিকীকরণ: প্রথাগত সাধারণ শিক্ষার সনাতন ধারার ওপর অতিরিক্ত চাপ কমিয়ে প্রতিটি জেলা ও উপজেলায়
⇒ কারিগরি, বৃত্তিমূলক ও পেশাভিত্তিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মান ও পরিধি বাড়াতে হবে। কারিগরি শিক্ষার কারিকুলাম ও ট্রেডগুলোকে এমনভাবে সাজাতে হবে এবং আধুনিক যন্ত্রপাতি নিশ্চিত করতে হবে, যেন তা দেশীয় শিল্পকারখানা এবং আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের বাস্তব ও সমসাময়িক চাহিদার সাথে সরাসরি সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়।
⇒ শিক্ষা বাজেটে বরাদ্দ বৃদ্ধি: জাতীয় বাজেটে শিক্ষা খাতের বার্ষিক বরাদ্দ ক্রমান্বয়ে বাড়িয়ে জিডিপির ন্যূনতম ৪-৫ শতাংশ বা মোট বাজেটের ২০ শতাংশের কাছাকাছি অর্থাৎ আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে নিয়ে যেতে হবে। তবে কেবল বরাদ্দ বাড়ানোই যথেষ্ট নয়, এই বরাদ্দের সিংহভাগ স্বচ্ছতার সাথে সরাসরি অত্যাধুনিক গবেষণাগার স্থাপন, লাইব্রেরি সমৃদ্ধকরণ, ডিজিটাল ল্যাব তৈরি এবং শিক্ষকদের উচ্চতর গবেষণার বৃত্তিতে ব্যয় করতে হবে।
⇒ শিক্ষকদের মর্যাদা ও উচ্চতর প্রশিক্ষণ নিশ্চিতকরণ:: সবার আগে দেশের সবচেয়ে প্রখর মেধাবীদের শিক্ষকতা পেশায় আকৃষ্ট করতে হবে। এর জন্য প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত শিক্ষকদের জন্য একটি আকর্ষণীয় ও পৃথক বেতন কাঠামো নির্ধারণ করতে হবে। একই সাথে শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতি প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, আমলাতান্ত্রিক জটিলতামুক্ত এবং স্বচ্ছ ও মেধাভিত্তিক করতে হবে এবং তাদের জন্য নিয়মিত আধুনিক পেডাগোজি ও আইসিটি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। একই সাথে শিক্ষকদের জন্য দেশ-বিদেশে আধুনিক পেডাগোজি ও প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।
⇒ নীতি নির্ধারণে শিক্ষকদের মতামতের মূল্যায়ন: বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে শিক্ষকদের মতামত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, শিক্ষকরা সরাসরি শিক্ষার্থীদের সাথে সম্পৃক্ত থাকেন এবং শিক্ষাব্যবস্থার বাস্তব চিত্র সবচেয়ে ভালোভাবে জানেন। তাদের মতামতের মূল্যায়নের জন্য বিভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বন করা যেতে পারে। অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সার্ভে, প্রশ্নোত্তরের আয়োজন করে তাদের মতামত জানা যেতে পারে। শিক্ষকদের মতামতের ভিত্তিতে নীতি নির্ধারণ করা হলে শিক্ষাব্যবস্থায় সুষ্ঠু পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে।
⇒ উচ্চশিক্ষায় গবেষণা ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ: বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণার জন্য বিশেষ তহবিল গঠন করতে হবে। শিল্পকারখানা ও একাডেমিয়ার মধ্যে তৈরি করতে হবে, যাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগুলো সরাসরি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে কাজে লাগে। মেধার সঠিক মূল্যায়ন করে মেধা পাচার রোধ করতে হবে।
⇒ কোচিং বাণিজ্য বন্ধ ও বৈষম্যহীন শিক্ষানীতি প্রতিষ্ঠা: শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ ও কোচিং সেন্টারের দৌরাত্ম্য কঠোর আইনের মাধ্যমে বন্ধ করতে হবে। ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সবার জন্য একই মানের মৌলিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে একটি সমন্বিত, অসাম্প্রদায়িক ও বৈষম্যহীন জাতীয় শিক্ষানীতি ও শিক্ষা আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে।
উপসংহার:
একটি জাতির টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং আত্মমর্যাদার যে ধারা, তাকে দীর্ঘমেয়াদে অক্ষুণ্ণ ও সুদৃঢ় করতে হলে শিক্ষা খাতের আমূল ও কাঠামোগত সংস্কারের কোনো বিকল্প নেই। শুধু বাহ্যিক অবকাঠামোগত উন্নয়ন কিংবা যান্ত্রিক উপায়ে পাসের হার ও সনদের সংখ্যা বাড়ানোই শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হতে পারে না; শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য হতে হবে মানসম্মত, জীবনমুখী, বিজ্ঞানমনস্ক ও নৈতিকতাসম্পন্ন মানবিক মানুষ নিশ্চিত করা। বর্তমান একবিংশ শতাব্দীর বৈশ্বিক জ্ঞান-অর্থনীতির চাহিদা অনুযায়ী যদি আমরা আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের গলদ ও দুর্বলতাগুলো দূর করে দেশের তরুণ প্রজন্মকে আধুনিক শিক্ষায় দীক্ষিত করতে পারি, তবে বাংলাদেশ সমস্ত বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ জয় করে বিশ্বের বুকে একটি উন্নত, প্রগতিশীল, বৈষম্যহীন ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্র হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবেড়এতে কোনো সন্দেহ নেই।