"বাংলাদেশে সমুদ্র সম্পদ আহরণ: সমস্যা ও সম্ভাবনা" বিষয়ে একটি প্রবন্ধ লিখুন।

Updated: 10 hours ago
উত্তরঃ

বাংলাদেশে সমুদ্র সম্পদ আহরণ: সমস্যা ও সম্ভাবনা

ভূমিকা

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে বঙ্গোপসাগরের বিশাল সামুদ্রিক অঞ্চল। ২০১২ ও ২০১৪ সালে মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তির পর বাংলাদেশ প্রায় ১,১৮,৮১৩ বর্গকিলোমিটার সমুদ্র এলাকা লাভকরেছে। এই বিশাল সামুদ্রিক অঞ্চল বাংলাদেশের অর্থনৈতিক, পরিবেশগত ও কৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সামুদ্রিক মৎস্য, তেল-গ্যাস, খনিজ, নৌ-বাণিজ্য, পর্যটন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যকে কেন্দ্র করে Blue Economy বা সুনীল অর্থনীতি বিকাশের বিপুল সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। তবে প্রযুক্তি, দক্ষ জনবল, গবেষণা, অবকাঠামো, অর্থায়ন ও নীতিগত দুর্বলতার কারণে বাংলাদেশ এখনো এ সম্পদের পূর্ণাঙ্গ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারেনি। তাই সমুদ্র সম্পদকে টেকসইভাবে আহরণ ও ব্যবহারের মাধ্যমে জাতীয় অর্থনীতিতে যুক্ত করা এখন সময়ের গুরুত্বপূর্ণ দাবি।

সমুদ্র সম্পদের সম্ভাবনা

বাংলাদেশের সমুদ্র সম্পদ আহরণের ক্ষেত্রে অনেক সম্ভাবনা রয়েছে। নিম্নে তা আলোচনা করা হলো:

মৎস্য সম্পদ ও সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য: বঙ্গোপসাগর বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মৎস্যসম্পদের ভাণ্ডার। এখানে বিপুলসংখ্যক মাছ, চিংড়ি, কাঁকড়া ও অন্যান্য সামুদ্রিক প্রাণীর পাশাপাশি মূল্যবান টুনা ও টুনা-জাতীয় মাছের সম্ভাবনা রয়েছে। ইলিশ বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক সম্পদ; চিংড়ি ও কাঁকড়া রপ্তানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রাও অর্জিত হয়। গভীর সমুদ্রের টুনা, স্কুইডসহ আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদাসম্পন্ন মাছ আহরণের সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি সামুদ্রিক শৈবাল খাদ্য, ওষুধ, প্রসাধনী ও জৈব জ্বালানি উৎপাদনে ব্যবহার করা যায়। উপযুক্ত প্রযুক্তি ও বাণিজ্যিক চাষের মাধ্যমে শৈবাল বাংলাদেশের নতুন রপ্তানি খাতেও পরিণত হতে পারে।

খনিজ সম্পদ ও জ্বালানি: বাংলাদেশের সামুদ্রিক অঞ্চলে বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাসের মজুত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। দেশের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা মেটাতে গভীর ও অগভীর সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য আন্তর্জাতিক কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করা হচ্ছে। সফলভাবে এই সম্পদ উত্তোলন করা গেলে তা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। এছাড়া বঙ্গোপসাগরের মহীসোপানের নিচে মিথেন গ্যাস হাইড্রেটের বিশাল মজুত রয়েছে। এটি এক ধরনের বরফ আকৃতির গ্যাস, যা ভবিষ্যতের জ্বালানির এক বিশাল উৎস হতে পারে। এই সম্পদ আহরণের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা অর্জন করা গেলে তা বাংলাদেশের জন্য অর্থনৈতিকভাবে বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে আসবে। অন্যান্য খনিজ সম্পদের মধ্যে সমুদ্র তলদেশে মূল্যবান খনিজ; যেমন- ইলমেনাইট, টাইটেনিয়াম অক্সাইড, জিরকন, এবং ম্যাগনেটাইটের সন্ধান পাওয়া গেছে। এসব খনিজ উত্তোলন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ করা গেলে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব।

সমুদ্র পরিবহন ও বন্দর ব্যবস্থা: বাংলাদেশের প্রায় ৯০% আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য সমুদ্রপথেই সম্পন্ন হয়। চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরের পাশাপাশি পায়রা সমুদ্রবন্দর স্থাপন করা হয়েছে। এছাড়া, মাতারবাড়ীতে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ কাজ চলছে। এই বন্দরগুলোকে আধুনিকীকরণ করা গেলে এবং বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা গেলে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের কেন্দ্র হিসেবে বাংলাদেশ নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে। পায়রা ও মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্রবন্দর বাংলাদেশের ট্রান্সশিপমেন্ট ও আঞ্চলিক লজিস্টিক হাবে রূপ নিতে পারে।

নবায়নযোগ্য শক্তি: বঙ্গোপসাগরের উপকূলীয় অঞ্চলে সৌর এবং বায়ু শক্তির বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। অফশোর বায়ু টারবাইন স্থাপন করে নবায়নযোগ্য শক্তি উৎপাদন করা সম্ভব। এর মাধ্যমে দেশের বিদ্যুৎ চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি কার্বন নিঃসরণও কমানো যাবে। অন্যদিকে, বঙ্গোপসাগরের জোয়ার-ভাটা ও ঢেউকে কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা ও প্রকল্প চালু করা গেলে তা এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।

পর্যটন শিল্প: বাংলাদেশের সমুদ্র উপকূল ও দ্বীপাঞ্চলে (সেন্ট মার্টিন, কক্সবাজার, কুয়াকাটা) পর্যটনের অনেক সুযোগ রয়েছে। বিশ্বের দীর্ঘতম অবিচ্ছিন্ন বালুকাময় সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান পর্যটন কেন্দ্র। এই সৈকতকে কেন্দ্র করে আধুনিক হোটেল-মোটেল, রিসোর্ট এবং অন্যান্য পর্যটন অবকাঠামো নির্মাণ করা গেলে আন্তর্জাতিক পর্যটকদের আকর্ষণ করা সম্ভব। সমুদ্রভিত্তিক পর্যটনের মধ্যে অন্যতম স্কুবা ডাইভিং, ক্রুজ ট্যুর ইত্যাদি। বঙ্গোপসাগরে আন্তর্জাতিক মানের ক্রুজ শিপ সার্ভিস চালু করা গেলে তা পর্যটন শিল্পকে আরও সমৃদ্ধ করবে। এর মাধ্যমে দেশি-বিদেশি পর্যটকরা সমুদ্রের সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবেন এবং এটি অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করবে। সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ বন এবং সেন্ট মার্টিন, কুতুবদিয়া, নিঝুম দ্বীপের মতো উপকূলীয় দ্বীপগুলোকে পরিবেশবান্ধব পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা গেলে তা বৈচিত্র্যময় পর্যটনের সুযোগ সৃষ্টি করবে। এছাড়া জেগে উঠা দেশের নতুন দ্বীপাঞ্চলগুলোও পর্যটনের আওতায় আনা সম্ভব।

মানব সম্পদ, শিপ বিল্ডিং ও রিসাইক্লিং: মানবসম্পদ, শিল্প বিল্ডিং ও রিসাইক্লিং সমুদ্র সম্পদের সঠিক আহরণ ও ব্যবহারের জন্য দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করা জরুরি। এজন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মেরিন সায়েন্স, ওশানোগ্রাফি এবং মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং-এর মতো বিষয়গুলোতে গবেষণা ও শিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। বাংলাদেশে জাহাজ নির্মাণ ও জাহাজ ভাঙা শিল্প একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত। এই শিল্পকে আরও আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব করা গেলে এটি একটি বড় অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি হতে পারে।

সমুদ্র সম্পদ আহরণে প্রধান সমস্যা ও চ্যালেঞ্জ

আধুনিক প্রযুক্তির অভাব: গভীর সমুদ্রে মৎস্য আহরণ, তেল- গ্যাস অনুসন্ধান, খনিজ উত্তোলন ও সামুদ্রিক পরিবেশ পর্যবেক্ষণের জন্য অত্যাধুনিক প্রযুক্তি প্রয়োজন। কিন্তু বাংলাদেশের আধুনিক গভীর সমুদ্রগামী ট্রলার, ইকো-সাউন্ডার, ফিশ ফাইন্ডার, সিসমিক সার্ভে, ড্রিলিং রিগ এবং পানির নিচের অনুসন্ধান প্রযুক্তির সক্ষমতা সীমিত। মাছ সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য কোল্ড চেইন, ফ্রোজেন স্টোরেজ ও আধুনিক প্রসেসিং প্ল্যান্টও পর্যাপ্ত নয়। সমুদ্রের তলদেশের মূল্যবান খনিজ অনুসন্ধান ও উত্তোলনের জন্য প্রয়োজনীয় ROV ও AUV প্রযুক্তিরও ঘাটতি রয়েছে। সমুদ্রের আবহাওয়া, জোয়ার-ভাটা, ঝড়-জলোচ্ছ্বাস ও অন্যান্য তথ্য রিয়েল-টাইমে সংগ্রহের সক্ষমতা সীমিত হওয়ায় নিরাপদ ও কার্যকর সম্পদ আহরণ ব্যাহত হচ্ছে।

দক্ষ জনবলের অভাব: সামুদ্রিক সম্পদ ব্যবস্থাপনায় মেরিন বায়োলজিস্ট, ওশেনোগ্রাফার, জিওসায়েন্টিস্ট, মেরিন ইঞ্জিনিয়ার, তথ্য বিশ্লেষক ও প্রযুক্তিবিদ প্রয়োজন। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ সীমিত হওয়ায় দক্ষ জনবলের ঘাটতি রয়েছে। ফলে গভীর সমুদ্র অনুসন্ধান, আধুনিক মৎস্য আহরণ, বন্দর ব্যবস্থাপনা ও সামুদ্রিক গবেষণায় বিদেশি বিশেষজ্ঞের ওপর নির্ভরতা তৈরি হয়। এ ছাড়া সমুদ্রজলবায়ু বিশ্লেষণ, ভূতাত্ত্বিক গবেষণা ও সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য ব্যবস্থাপনায় প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞও দেশে অপ্রতুল। ফলে প্রযুক্তি ও সম্পদ ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিদেশি পরামর্শদাতা বা প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরতা তৈরি হচ্ছে।

অপর্যাপ্ত গবেষণা ও জরিপ: বাংলাদেশের সামুদ্রিক অঞ্চলের সম্পদ, জীববৈচিত্র্য, মৎস্য মজুত, খনিজ সম্ভাবনা ও পরিবেশগত অবস্থার বিষয়ে পর্যাপ্ত ও হালনাগাদ তথ্যের ঘাটতি রয়েছে। কোন অঞ্চলে কী পরিমাণ মাছ রয়েছে, কী হারে আহরণ করা নিরাপদ, কোথায় তেল-গ্যাস বা খনিজের সম্ভাবনা বেশি-এসব বিষয়ে নির্ভুল তথ্য ছাড়া দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করা কঠিন। একইভাবে দূষণ, প্রবাল, শৈবাল ও সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য পর্যবেক্ষণেও গবেষণা বাড়ানো প্রয়োজন। সামুদ্রিক সম্পদের সঠিক মানচিত্র ও তথ্যভান্ডার না থাকায় সম্পদের অবস্থান ও ব্যবহারযোগ্যতা সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ ধারণা পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে মৎস্য আহরণ, তেল-গ্যাস অনুসন্ধান, সামুদ্রিক পর্যটন ও বন্দর ব্যবস্থাপনার সঠিক পরিকল্পনাও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

অবকাঠামোগত দুর্বলতা: আধুনিক বন্দর, গভীর সমুদ্রগামী ট্রলার, কোল্ড স্টোরেজ, মাছ প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র, ড্রাই ডক, গবেষণা জাহাজ, ল্যাবরেটরি ও অফশোর অনুসন্ধান অবকাঠামোর ঘাটতি রয়েছে। চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরের ওপর অতিরিক্ত চাপ এবং সামুদ্রিক লজিস্টিকসের সীমাবদ্ধতা সমুদ্রভিত্তিক অর্থনীতির সম্প্রসারণকে বাধাগ্রস্ত করছে। পায়রা সমুদ্রবন্দর এখনো পূর্ণ সক্ষমতায় কার্যকর হয়নি এবং মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরও নির্মাণাধীন। একই সঙ্গে অফশোর তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য ড্রিলিং প্ল্যাটফর্ম, রিগ, পাইপলাইন ও স্টোরেজ সুবিধা এবং সমুদ্র গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় জাহাজ ও ল্যাবরেটরিও সীমিত।

বৈদেশিক নির্ভরতাঃ আধুনিক প্রযুক্তি, যন্ত্রপাতি, অর্থায়ন, জরিপ ও বিশেষজ্ঞের ঘাটতির কারণে গভীর সমুদ্র অনুসন্ধান ও সম্পদ আহরণে বাংলাদেশকে বিদেশি কোম্পানি ও উন্নয়ন সহযোগীদের ওপর নির্ভর করতে হয়। এতে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও মূল্য সংযোজনের বড় অংশ দেশের বাইরে থেকে আসে এবং সামুদ্রিক সম্পদ থেকে বাংলাদেশের প্রত্যক্ষ অর্থনৈতিক সুবিধা সীমিত হতে পারে। বন্দর উন্নয়ন, গবেষণা, ট্রলার সংগ্রহ ও সামুদ্রিক সম্পদ ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন ক্ষেত্রেও বিদেশি অর্থায়ন ও সহযোগিতার প্রয়োজন হয়। ফলে প্রযুক্তি, দক্ষতা ও গবেষণায় নিজস্ব সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তি স্থানান্তরের ব্যবস্থা করা জরুরি হয়ে পড়েছে।

পরিবেশগত ঝুঁকি: অতিরিক্ত মাছ ধরা, প্লাস্টিক ও শিল্পবর্জ্য, তেল ও রাসায়নিক দূষণ এবং অপরিশোধিত বর্জ্য বঙ্গোপসাগরের সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও অপরিকল্পিত আহরণও সামুদ্রিক প্রাণী ও জীববৈচিত্র্যের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। পাশাপাশি সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড় ও লবণাক্ততা বৃদ্ধির মতো জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি উপকূলীয় অর্থনীতিকে আরও দুর্বল করে তুলছে। নদীপথ ও শিল্পাঞ্চল থেকে আসা দূষিত বর্জ্য এবং জাহাজ থেকে তেল ও রাসায়নিক নিঃসরণও সামুদ্রিক পরিবেশের জন্য বড় হুমকি। ফলে মাছ, শৈবাল, প্রবাল ও অন্যান্য সামুদ্রিক জীবের প্রাকৃতিক আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে জীববৈচিত্র্যের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

আইন ও নীতির দুর্বল প্রয়োগ: মৎস্য সংরক্ষণ, নৌ-নিরাপত্তা ও পরিবেশ সংরক্ষণসহ বিভিন্ন আইন ও নীতিমালা থাকলেও বাস্তব প্রয়োগ ও মনিটরিং অনেক ক্ষেত্রে দুর্বল। অবৈধ মাছ ধরা, বিদেশি ট্রলারের অনুপ্রবেশ, জাটকা ও প্রজনন মৌসুমে মাছ শিকার এবং নিবন্ধনবিহীন ট্রলারের কার্যক্রম সম্পদ সংরক্ষণকে বাধাগ্রস্ত করছে। সীমিত নজরদারি ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সক্ষমতার কারণে অনেক ক্ষেত্রে আইনভঙ্গকারীদের কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয় না। এর ফলে সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হচ্ছে এবং সংরক্ষণ ও টেকসই ব্যবস্থাপনা ব্যাহত হচ্ছে। অর্থায়নের ঘাটতি গভীর সমুদ্রে মাছ ধরা, তেল-গ্যাস অনুসন্ধান, আধুনিক বন্দর, গবেষণা অবকাঠামো, কোল্ড চেইন ও সামুদ্রিক পরিবেশ সংরক্ষণে বিপুল বিনিয়োগ প্রয়োজন। কিন্তু সুনীল অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে পর্যাপ্ত ও ধারাবাহিক বিনিয়োগ এখনো নিশ্চিত হয়নি। ফলে সম্ভাবনাময় অনেক প্রকল্প বাস্তবায়ন ধীরগতির হচ্ছে। আধুনিক ট্রলার, জিপিএস, ফিশ ফাইন্ডার, কোল্ড স্টোরেজ ও প্রসেসিং ইউনিট স্থাপনেও বড় অঙ্কের বিনিয়োগ প্রয়োজন। একইভাবে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, দূষণ নিয়ন্ত্রণ ও জলবায়ু অভিযোজনমূলক প্রকল্পে পর্যাপ্ত অর্থায়নের অভাব রয়েছে।

আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সীমাবদ্ধতা: বঙ্গোপসাগরের মৎস্যসম্পদ, সামুদ্রিক পরিবেশ, নৌনিরাপত্তা ও অবৈধ মাছ ধরা নিয়ন্ত্রণে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে যৌথ গবেষণা ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনা আরও জোরদার করা প্রয়োজন। উন্নত সামুদ্রিক প্রযুক্তিসম্পন্ন দেশগুলোর সঙ্গে প্রযুক্তি স্থানান্তর, গবেষণা ও প্রশিক্ষণ সহযোগিতাও বাড়ানো দরকার।

সমুদ্র সম্পদ আহরণে উত্তরণের উপায়

প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি: আধুনিক গভীর সমুদ্রগামী ট্রলার, সমুদ্র গবেষণা জাহাজ, ফিশ ফাইন্ডার, স্যাটেলাইট ও পানির নিচের অনুসন্ধান প্রযুক্তি সংগ্রহ করতে হবে। তেল-গ্যাস ও খনিজ অনুসন্ধানে আধুনিক সিসমিক জরিপ ও ড্রিলিং প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। এ ছাড়া সমুদ্রের আবহাওয়া, জোয়ার-ভাটা ও ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের রিয়েল-টাইম তথ্য সংগ্রহের প্রযুক্তি উন্নত করতে হবে। মাছ সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য আধুনিক কোল্ড চেইন ও ফ্রোজেন স্টোরেজ সুবিধাও বাড়াতে হবে।

দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন: বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে মেরিন সায়েন্স, ওশেনোগ্রাফি, মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং ও সামুদ্রিক অর্থনীতিতে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ সম্প্রসারণ করতে হবে। আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তি বিনিময়ের মাধ্যমে দক্ষ বিশেষজ্ঞ তৈরি করা জরুরি। মেরিন বায়োলজিস্ট, জিওসায়েন্টিস্ট, সমুদ্রজলবায়ু বিশ্লেষক ও সামুদ্রিক প্রযুক্তিবিদ তৈরিতে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি জেলেদের আধুনিক মৎস্য আহরণ ও সংরক্ষণ প্রযুক্তিতে প্রশিক্ষিত করতে হবে।

গবেষণা ও তথ্যভিত্তিক ব্যবস্থাপনা: সমুদ্রের মৎস্য মজুত, খনিজ সম্পদ, জীববৈচিত্র্য, দূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সম্পর্কে নিয়মিত জরিপ ও ডেটাবেস তৈরি করতে হবে। গবেষণালব্ধ তথ্যের ভিত্তিতে মৎস্য আহরণ, খনিজ উত্তোলন ও পরিবেশ সংরক্ষণের পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। সামুদ্রিক সম্পদের সঠিক মানচিত্র তৈরি ও নিয়মিত হালনাগাদ তথ্য সংগ্রহের ব্যবস্থা করতে হবে। এতে কোন এলাকায় কী পরিমাণ সম্পদ রয়েছে এবং কতটুকু আহরণ নিরাপদ-সে বিষয়ে বিজ্ঞানভিত্তিক সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হবে।

আধুনিক অবকাঠামো নির্মাণ: গভীর সমুদ্রবন্দর, মাছ সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র, কোল্ড চেইন, ড্রাই ডক, গবেষণাগার এবং সামুদ্রিক লজিস্টিকস অবকাঠামো উন্নত করতে হবে। এতে আহরণ থেকে প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানি পর্যন্ত পুরো মূল্যশৃঙ্খল শক্তিশালী হবে। চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি পায়রা ও মাতারবাড়ী বন্দরকে আধুনিক ও কার্যকর করতে হবে। একই সঙ্গে অফশোর তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য প্রয়োজনীয় ড্রিলিং, পাইপলাইন, স্টোরেজ ও গবেষণা অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে।

বিনিয়োগ ও সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব: সুনীল অর্থনীতির সম্ভাবনাময় খাতগুলোতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে হবে। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের মাধ্যমে গভীর সমুদ্র মৎস্য, সামুদ্রিক পর্যটন, নবায়নযোগ্য শক্তি, বন্দর ও খনিজ অনুসন্ধান প্রকল্প বাস্তবায়ন করা যেতে পারে। বিশেষ করে আধুনিক ট্রলার, কোল্ড স্টোরেজ, মাছ প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সামুদ্রিক গবেষণায় বেসরকারি বিনিয়োগের সুযোগ বাড়াতে হবে। বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে প্রযুক্তি স্থানান্তর ও দেশীয় দক্ষতা উন্নয়নের বিষয়টিও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

সামুদ্রিক পরিবেশ সংরক্ষণ: অবৈধ ও অতিরিক্ত মাছ ধরা বন্ধ, সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকা বৃদ্ধি, প্লাস্টিক ও শিল্পবর্জ্য নিয়ন্ত্রণ এবং তেল দূষণ প্রতিরোধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। উন্নয়ন ও সম্পদ আহরণের ক্ষেত্রে Environmental Impact Assessment (EIA) নিশ্চিত করা প্রয়োজন। নদী ও শিল্পাঞ্চল থেকে দূষিত বর্জ্য এবং জাহাজ থেকে তেল ও রাসায়নিক সমুদ্রে ফেলা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। একই সঙ্গে সামুদ্রিক শৈবাল, প্রবাল, মাছ ও অন্যান্য জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের মাধ্যমে সম্পদ আহরণ ও পরিবেশের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে।

নজরদারি ও আইন প্রয়োগ জোরদার: কোস্টগার্ড ও নৌবাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি করে সমুদ্রসীমায় অবৈধ অনুপ্রবেশ, অবৈধ মাছ ধরা ও অন্যান্য অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। আধুনিক রাডার, স্যাটেলাইট ও স্বয়ংক্রিয় নজরদারি ব্যবস্থার ব্যবহার বাড়ানো প্রয়োজন। বিদেশি ট্রলারের অনুপ্রবেশ, নিবন্ধনবিহীন ট্রলারের কার্যক্রম এবং জাটকা ও প্রজনন মৌসুমে অবৈধ মাছ ধরা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। বিদ্যমান মৎস্য, পরিবেশ ও নৌ-নিরাপত্তা আইন কার্যকরভাবে প্রয়োগের পাশাপাশি নিয়মিত মনিটরিং নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি: ভারত, মিয়ানমারসহ বঙ্গোপসাগরীয় দেশ এবং উন্নত সামুদ্রিক প্রযুক্তিসম্পন্ন দেশগুলোর সঙ্গে যৌথ গবেষণা, প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি স্থানান্তর ও সামুদ্রিক সম্পদ ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতা বাড়াতে হবে। বিশেষ করে আন্তঃসীমান্ত মৎস্যসম্পদ ব্যবস্থাপনা, সামুদ্রিক দূষণ নিয়ন্ত্রণ ও নৌনিরাপত্তায় আঞ্চলিক সমন্বয় জোরদার করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে উন্নত দেশগুলোর কাছ থেকে প্রযুক্তি ও দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে ধীরে ধীরে বিদেশিনির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে।

উপসংহার

বাংলাদেশের সমুদ্র সম্পদ জাতীয় অর্থনীতির জন্য এক বিশাল কিন্তু এখনো যথেষ্টভাবে অনাবিষ্কৃত সম্ভাবনা। মৎস্য, তেল-গ্যাস, খনিজ, নৌ-বাণিজ্য, পর্যটন, নবায়নযোগ্য শক্তি ও সামুদ্রিক শিল্প-প্রতিটি ক্ষেত্রেই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগ রয়েছে। তাই সমন্বিত দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, আধুনিক প্রযুক্তি, দক্ষ মানবসম্পদ, পর্যাপ্ত বিনিয়োগ, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার মাধ্যমে সমুদ্র সম্পদের টেকসই ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। সঠিক পরিকল্পনা ও কার্যকর বাস্তবায়ন করা গেলে বঙ্গোপসাগর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও টেকসই উন্নয়নের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত হতে পারে।

3

Related Question

View All
উত্তরঃ

একজন লেখক তিনিই যিনি লেখেন। তবে সব লেখা লিখেই লেখক হওয়া যায় না। লেখক সব ধরনের হতে পারে। তবে সৃজনশীল লেখকই হচ্ছে আমাদের মূল কেন্দ্রবিন্দু। লেখক হচ্ছে পৃথিবীর অন্যতম একটি স্বাধীন সত্ত্বা।

একজন লেখক পুরোপুরি তার নিজের সত্ত্বার ওপরে বেঁচে থাকে। অনেকেই লেখক হবার সহজ উপায় খোঁজ করে। কিন্তু পড়তে পড়তে আর লিখতে লিখতেই শুধুমাত্র লেখক হওয়া যায়। এছাড়া আর কোনো উপায় নেই। লেখক অনেক ধরনের হতে পারে।

একজন সাংবাদিকও একজন লেখক। উপন্যাস, গল্প, কবিতা, ছড়া, সাহিত্য, প্রবন্ধ, রম্য, ব্লগ সব ধরনের লেখা যারা লেখে তারাই লেখক। অনেকেই মস্তিষ্কের মধ্যে ওকটা লেখার শক্তি পেয়ে যায় আর অনেকে হয়ত শিখে শিখে লেখক হয়।

সমাজ সভ্যতা কখনোই পুরোপুরি একজন লেখকের পক্ষে থাকে না। বরং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বিপক্ষে চলে যায়। স্বাভাবিকভাবেই একজন লেখক তার কলমের আঘাতে জর্জরিত করতে চায় সকল অন্যায়, অপবাদ। তাই হয়ত বেঁধে যেতে পারে সংঘাত। কলমই হচ্ছে একজন লেখকের দাঁড়ানোর জায়গা। কলম ছাড়া লেখকের অস্তিত্ব বিলীন। তবে সবাইকে যে প্রতিবাদ লিখতে হবে এমন কোনো কথা। কেউ কেউ মনোরঞ্জনের জন্যও লেখে। অনেকে আবার চাটুকারিতা করতে লেখে। কেউ আবার কীভাবে পুরষ্কার তুলে নেওয়া যায় সেই ধান্দা করার জন্য লেখে।

একজন লেখক হয়ে উঠতে পারে ন্যায় অন্যায়ের পার্থক্যকারী। সে কলমের ছোঁয়ায় প্রতিবাদ করতে অন্যায়ের আর ফুটিয়ে তুলবে ন্যায়ের কথা। লেখকের কলমের কালি প্রেরণার সুর হয়ে গান গাইবে। আর অশ্রুসিক্ত নয়নে হাসির ঝলক আনবে লেখকের কলম। একজন লেখকের প্রাণ তার লেখা, তার লেখার ভঙ্গি। সে তার লেখা দিয়ে বাঁচিয়ে তুলতে পারবে অসুস্থ কোনো সভ্যতাকে। লেখক তার কলম দিয়ে জাগ্রত করতে পারবে মানুষের ভীতরে লুকিয়ে থাকা অদম্য সাহস।

একজন লেখক কল্পনাকে নিয়ে আসতে পারে বাস্তবে। আমাদের নিয়ে যেতে পারে কল্পনার গহীন বনে। লেখক আমাদের সবাক যুগ থেকে অবাক যুগে নিয়ে যেতে পারে মুহূর্তের মাঝেই। লেখক জাগাতে পারে প্রেম, লেখক জাগাতে পারে নতুন কাজের স্পৃহা।

অনেকেই মনে করে লেখকের সকল বিষয়ে দ্বায় আছে। কিন্তু লেখকের মূলত কারো কাছেই কোনো দ্বায় নেই। তার দ্বায় থাকে শুধু নিজের মনের কাছে, নিজের বিবেকের কাছে, নিজের সুপ্ত চেতনার কাছে। সমাজ কি ভাববে তা নিয়ে লেখক মাথা ঘামাবে না। লেখক ভয়ে নাথা নোয়াবে না। লেখক যতদিন বাঁচবে বীরের মতোই বাঁচবে।

সারা বিশ্বেই লেখকরা নির্যাতনের শিকার হয়। অনেকেই বলে থাকে লিখে কিছুই হয় না। তাই যদি হতো তাহলে লেখার জন্য লেখকের শাস্তি হতো না। লেখকের ফাঁসি হতো না।

লেখকের কলমে অনেক জোর। সেই জোর ভেঙে চুরে গুড়িয়ে দিতে পারে যেকোনো কিছু। বিশেষ করে সাংবাদিকরা বিশ্বজুড়ে নির্যাতিত হয় অনিয়মের বিরুদ্ধে লিখতে গিয়ে। শাস্তি, সাজা বহু কিছু তাদের সহ্য করতে হয়। অন্যায়ের বিরুদ্ধে লিখলে হুমকি আসে, হামলা মামলা বহু ঘটনাই ঘটে। কারণ শাসক, শোষক আর অন্যায়কারীদের অনেক ক্ষমতা। লেখকের সমাজের দায়মুক্তির জন্য জীবনও দিতে হয়। তাইতো একজন লেখক সমাজের শক্তি, সমাজের সম্পদ।

3.8k
উত্তরঃ

সাহিত্য হচ্ছে মানুষের চিন্তা-ভাবনা, অনুভূতি তথা মানব-অভিজ্ঞতার কথা বা শব্দের বাঁধনে নির্মিত নান্দনিক বহিঃপ্রকাশ। এই অর্থে গল্প, কবিতা, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ ইত্যাদি উচ্চতর গুণাবলি সমন্বিত বিশেষ ধরনের সৃজনশীল মহত্তম শিল্পকর্ম। সাহিত্য-শিল্পীগণ যখন ‘অন্তর হতে বচন আহরণ’ করে আত্মপ্রকাশ কলায় ‘গীতরস ধারা’য় সিঞ্চন করে ‘আনন্দলোকে’ নিজের কথা- পরের কথা- বাইরের জগতের কথা আত্মগত উপলব্ধির রসে প্রকাশ করেন- তখনই তা হয়ে ওঠে সাহিত্য। রবীন্দ্রনাথের কথায় “বহিঃপ্রকৃতি এবং মানব-চরিত্র মানুষের মধ্যে অনুক্ষণ যে আকার ধারণ করিতেছে, যে-সঙ্গীত ধ্বনিত করিয়া তুলিতেছে, ভাষা-রচিত সেই চিত্র এবং সেই গানই সাহিত্য।…সাধারণের জিনিসকে বিশেষভাবে নিজের করিয়া – সেই উপায়ে তাহাকে পুনরায় বিশেষভাবে সাধারণের করিয়া তোলাই হচ্ছে সাহিত্যের কাজ।” [রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সাহিত্য] সাহিত্য সত্য-সুন্দরের প্রকাশ হিসেবে প্রবহমাণ সময়ে যা ঘটে – সে-সবের মধ্য থেকে যা মহৎ, যা বস্তুসীমাকে ছাড়িয়ে বাস্তবাতীত প্রকাশ করে, যা জীবনের জন্য কল্যাণময় এবং মহৎ আদর্শের দ্যোতক তাকেই প্রকাশ করে। আসলে মহৎ সাহিত্য তাই- যা একাধারে সমসাময়িক-শাশ্বত-যুগধর্মী-যুগোপযোগী-যুগোত্তীর্ণ। সাহিত্য কেবল পাঠককে আনন্দ দেয় না- সমানভাবে প্রভাবিত করে পাঠক এবং সমাজকে।

আভিধানিকভাবে ‘সহিতের ভাব’ বা ‘মিলন’ অর্থে ‘সাহিত্য’ হলো কাব্য, নাটক, গল্প, উপন্যাস ইত্যাদি সৃজনশিল্পের মাধ্যমে এক হৃদয়ের সঙ্গে অন্য হৃদয়ের সংযোগ স্থাপন; সাহিত্য¯্রষ্টা-সাহিত্যের সাথে পাঠকের এক সানুরাগ বিনিময়। কিন্তু আভিধানিক অর্থের নির্দিষ্ট সীমায় সাহিত্যের স্বরূপ-গতি-প্রকৃতি-বৈচিত্র্য ও বিস্তৃতির সম্যক ধারণা দেওয়া যেমন অসম্ভব, কোনো বিশেষ সংজ্ঞায় তাকে সুনির্দিষ্ট করে দেওয়াও তেমন দুঃসাধ্য। বাচ্যার্থ ও ব্যঞ্জনার্থর সীমাকে অতিক্রম করে নানা রূপে, রসে, প্রকরণ ও শৈলীতে সাহিত্যের নিরন্তর যাত্রা সীমা থেকে অসীমে। প্রত্যক্ষ সমাজপরিবেশ তথা সমকালীন বাস্তব পারিপার্শ্বিক, নিসর্গপ্রীতি ও মহাবিশ্বলোকের বৃহৎ-উদার পরিসরে ব্যক্তিচৈতন্য ও কল্পনার অন্বেষণ ও মুক্তি- আর এইভাবেই শ্রেণিবিভাজন, নামকরণ ও স্বরূপমীমাংসার প্রচেষ্টাকে ছাপিয়ে উঠে সাহিত্যের যাত্রা সীমাহীনতায়। প্রকৃত সাহিত্য তাই যেমন তার সমসময় যা যুগমুহূর্তের, তেমনই তা সর্বকালের সর্বজনের। মার্কসবাদী সাহিত্যতত্ত্বে বাস্তব সমাজজীবনকে ‘ভিত্তি’ আর শিল্প-সাহিত্যকে সমাজের উপরিকাঠামোর [ঝঁঢ়বৎংঃৎঁপঃঁৎব] অংশ হিসেবে গণ্য করা হয়। সাহিত্যের মৌল উপকরণসামগ্রী আহৃত হয় জীবনের ভা-ার থেকে- সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, প্রেম-বৈরিতার বিচিত্র-অনিঃশেষ ভা-ার থেকে। সাহিত্যসৃষ্টির মূলে সক্রিয় যে সৃজনী-ব্যক্তিত্ব তা নিছক বিমূর্ত কোনো সত্তা নয়; আত্মপ্রকাশ ও মানবিক সংযোগ ও বিনিময়ের বাসনায় অনুপ্রাণিত সে সত্তা তার ভাব-ভাবনা, বোধ ও বিশ্বাসকে এক আশ্চর্য কৌশলে প্রকাশ করে জনসমক্ষে কোনো একটি বিশেষ রূপ-রীতি-নীতির আশ্রয়ে। ব্যক্তিক অনুুভূতি-যাপিতজীবন-মিশ্রকল্পনার জগৎ থেকেই সৃষ্টি হয় সাহিত্যের; যুগান্তরের আলোকবর্তিকা হিসেবে সাহিত্য সত্যের পথে সবসময় মাথা উঁচু করে থেকেছে- সত্যকে সন্ধান করেছে। আসলে সাহিত্য এমনি এক দর্পণ- যাতে প্রতিবিম্বিত হয় মানবজীবন, জীবনের চলচ্ছবি, পরিবেশ-প্রতিবেশ, সমাজজীবনে ঘটমান ইতিহাস- ইতিহাসের চোরাস্রােত নানাবিধ কৌণিক সূক্ষ্মতায়।

সাধারণত আত্মপ্রকাশের বাসনা, সমাজ-সত্তার সঙ্গে সংযোগ কামনা, অভিজ্ঞতার আলোয় কল্পলোক নির্মাণ এবং রূপপ্রিয়তা- এই চতুর্মাত্রিক প্রবণতাই মানুষের সাহিত্য-সাধনার মৌল-উৎস। চতুর্মাত্রিক প্রবণতার [আত্মপ্রকাশের কামনা, পারিপার্শ্বিকের সাথে যোগাযোগ বা মিলনের কামনা, কল্প-জগতের প্রয়োজনীয়তা এবং সৌন্দর্য-সৃষ্টির আকাক্সক্ষা বা রূপমুগ্ধতা] মধ্যে সমাজসত্তার সঙ্গে সংযোগ-কামনা এবং অভিজ্ঞতার আলোয় কল্পলোক নির্মাণ- এই উৎসদ্বয়ের মধ্যে নিহিত রয়েছে সাহিত্য ও সমাজের মধ্যে আন্তর-সম্পর্কের প্রাণ-বীজ। সমাজ শিল্পীকে সাহিত্য-সাধনায় প্রণোদিত করে। ‘সহৃদয়-হৃদয় সংবাদ’এর মাধ্যমে সাহিত্যিকগণ লেখক-পাঠকের মধ্যে সেতুবন্ধন রচনা করেন- উভয়ের হৃদয়বীণার তারগুলোকে একই সুতায় গেঁথে দেন। এর কারণে সাহিত্য দেশ-কাল-সমাজের সীমা অতিক্রম করে সর্বসাধারণের হৃদয়কে আকর্ষণ করে। এর ফলে সাহিত্য হয়ে ওঠে সার্বজনীন-সর্বকালের মানুষের হৃদয়ের সামগ্রী এবং সাহিত্য¯্রষ্টাও হয়ে ওঠেন অনেক বড়। কিন্তু বর্তমান বাংলা সাহিত্যচর্চার গতি-প্রকৃতি, সমস্যা-সংকট-সমাধান কোন দিকে? এসব বিষয়ের সন্ধান- এ প্রবন্ধের অন্বিষ্ট।

3.2k
উত্তরঃ

আমাদের লোকশিল্প প্রবন্ধটি আমাদের লোককৃষ্টি গ্রন্থ থেকে গৃহীত হয়েছে। লেখক এ প্রবন্ধে বাংলাদেশের লোকশিল্প ও লোক-ঐতিহ্যের বর্ণনা দিয়েছেন । এ বর্ণনায় লোকশিল্পের প্রতি তার গভীর মমত্ববোধের পরিচয় রয়েছে।
আমাদের নিত্যব্যবহার্য অধিকাংশ জিনিসই এ কুটিরশিল্পের ওপর নির্ভরশীল ।

শিল্পগুণ বিচারে এ ধরনের শিল্পকে লোকশিল্পের মধ্যে গণ্য করা যেতে পারে । পূর্বে আমাদের দেশে যে সমস্ত লোকশিল্পের দ্রব্য তৈরি হতো তার অনেকগুলোই অত্যন্ত উচ্চমানের ছিল। ঢাকাই মসলিন তার অন্যতম। ঢাকাই মসলিন অধুনা বিলুপ্ত হলেও ঢাকাই জামদানি শাড়ি অনেকাংশে সে স্থান অধিকার করেছে।

বর্তমানে জামদানি শাড়ি দেশে-বিদেশে পরিচিত এবং আমাদের গর্বের বস্তু। নকশি কাথা আমাদের একটি গ্রামীণ লোকশিল্প। এ শিল্প আজ বিলুপ্তপ্রায় হলেও এর কিছু কিছু নমুনা পাওয়া যায়। আপন পরিবেশ থেকেই মেয়েরা তাদের মনের মতো করে কীথা সেলাইয়ের অনুপ্রেরণা পেতেন । কাঁথার প্রতিটি সুচের ফোঁড়ের মধ্যে লুকিয়ে আছে এক-একটি পরিবারের কাহিনী, তাদের পরিবেশ, তাদের জীবনগাঁথা ।

আমাদের দেশের কুমোরপাড়ার শিল্পীরা বিভিন্ন ধরনের তৈজসপত্র ছাড়াও পোড়ামাটি দিয়ে নানা প্রকার শৌখিন দ্রব্য তৈরি করে থাকে। নানা প্রকার পুতুল, মূর্তি ও আধুনিক রুচির ফুলদানি, ছাইদানি, চায়ের সেট ইত্যাদি তারা গড়ে থাকে।
খুলনার মাদুর ও সিলেটের শীতলপাটি সকলের কাছে পরিচিত। আমাদের দেশের এই যে লোকশিল্প তা সংরক্ষণের দায়িত আমাদের সকলের । লোকশিল্পের মাধ্যমে আমরা আমাদের ঐতিহ্যকে বিশ্বের কাছে তুলে ধরতে পারি।

arif
arif
3 years ago
3.8k
উত্তরঃ

আমাদের অর্থনৈতিক সম্পদ

 

বাংলাদেশ, একটি দ্রুত উন্নতি লক্ষ্য নির্ধারণ করা দেশ, যা প্রচুর অর্থনৈতিক সম্পদের বেশিরভাগ সম্পদ নিয়ে এগিয়ে চলেছে। এই দেশের অর্থনৈতিক সম্পদ মৌলিকভাবে চারটি প্রধান উৎস থেকে আসে: জমি, কাজ, উদ্যোগ, এবং মানুষের কাজের দক্ষতা। এই সম্পদের বিকাশে বিভিন্ন রাজনৈতিক, আর্থিক এবং সামাজিক পরিবর্তনের ভূমিকা রয়েছে।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পদের মূল স্তম্ভ হল কৃষি। দেশটি একটি প্রধানত কৃষিপ্রধান দেশ হিসেবে পরিচিত। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নতির মূল হিসেবে প্রধানত শস্য ও ফসল চাষ প্রসঙ্গে বিকাশ হয়েছে। বাংলাদেশে প্রধানত ধান, পাট, মশুর ডাল, আখ, পটল, পেঁপে, তেল সহ বিভিন্ন ফসল চাষ করা হয়। অত্যন্ত উচ্চ মানের খাদ্য সামগ্রী উৎপাদনের ফলে এই খাদ্য পণ্য রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক সম্পদের গড়াতে সাহায্য করে।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক উৎস হল প্রবৃদ্ধি ও শিক্ষাগত উন্নতি। বাংলাদেশে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের অভাব কমে আসছে এবং মানুষের দক্ষতা বৃদ্ধি করছে। বিশেষত, প্রযুক্তির আগমন এবং বিনিয়োগে বৃদ্ধি নেওয়া হচ্ছে, যা অর্থনৈতিক সম্পদের উন্নতির পথে সাহায্য করছে।

অন্যান্য উৎস হিসেবে প্রযুক্তিবিদ্যা এবং সেবা অংশ গুলির অগ্রগতি আছে। বাংলাদেশের সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক সম্পদ হল তার মানুষের চাকরিভার্থী শ্রমিকেরা। তাদের দক্ষতা, উদ্যোগ, ও সামর্থ্য বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

যদিও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পদ উন্নতির পথে অনেক উত্সাহজনক প্রগতি হয়েছে, তবে এখনও অনেক চ্যালেঞ্জ র

য়েছে। প্রধানতঃ গরিব মানুষের জন্য আর্থিক সম্পদের অগ্রগতি নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ হলেও এখনও বেশিরভাগ লোকের মধ্যে বৃদ্ধির অভাব আছে। তাছাড়া, পরিবেশের সম্পদ সংরক্ষণের জন্য সঠিক প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থা প্রয়োজন।

পুনর্নির্মাণ ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সম্পদের বিস্তার ও উন্নতি নিশ্চিত করতে পারে। সঠিক নীতি নির্ধারণ, উদ্যোগের বৃদ্ধি, প্রযুক্তিগত প্রবর্তন এবং শিক্ষাগত উন্নতি এমন পরিবর্তন নিশ্চিত করতে সাহায্য করতে পারে।

শেষ কথায়, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পদ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যা দেশটির সমৃদ্ধি ও উন্নতির সাথে অবিভাজ্যভাবে সংযোগিত। একটি দ্রুত বৃদ্ধির উপায় হল সঠিক পরিকল্পনা, ব্যবস্থাপনা এবং উদ্যোগের বৃদ্ধি করা। এই প্রস্তুতি নেওয়ার মাধ্যমে, বাংলাদেশ তার অর্থনৈতিক সম্পদ উন্নতির পথে আরও এগিয়ে যেতে পারে এবং তার মানুষের জন্য আরো উন্নত ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে পারে।

2.5k
উত্তরঃ

"বিক্ষুব্ধ পূর্ব ইউরোপ" বলতে পূর্ব ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ১৯৮৯ সালের পর সাম্যবাদী শাসনের পতন এবং এর ফলে উদ্ভূত রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতাকে বোঝায়। এই সময়কালে, পূর্ব ইউরোপের দেশগুলো গণতন্ত্র ও বাজার অর্থনীতির দিকে ধাবিত হয়, যার ফলে নতুন জাতীয়তাবাদ, অর্থনৈতিক সংকট, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও সামাজিক পরিবর্তন দেখা যায়। 

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও কারণ: 

সাম্যবাদের পতন:

১৯৮৯ সালের ঐতিহাসিক বছরটি পূর্ব ইউরোপে সাম্যবাদী ব্যবস্থার পতন ঘটায়, যা ছিল একটি যুগান্তকারী ঘটনা। এই পরিবর্তনের ফলে দেশগুলো তাদের সাম্যবাদী অতীত থেকে মুক্তি পেতে শুরু করে।

গণতন্ত্রের পথে যাত্রা:

সাম্যবাদের পতনের পর পূর্ব ইউরোপের দেশগুলো গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা ও মুক্ত বাজার অর্থনীতির দিকে ঝুঁকে পড়ে।

বিক্ষোভ ও অস্থিতিশীলতার কারণসমূহ: 

অর্থনৈতিক সংকট:

সাম্যবাদী অর্থনীতি থেকে বাজার অর্থনীতিতে উত্তরণ অনেক দেশে অর্থনৈতিক সংকট সৃষ্টি করে। বেকারত্ব, মুদ্রাস্ফীতি, এবং ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে বৈষম্য বাড়ে, যা সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করে।

জাতীয়তাবাদের উত্থান:

অনেক দেশে সাম্যবাদী শাসনের অবসানের পর বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে জাতীয়তাবোধ তীব্র হয়, যা নতুন করে জাতিগত সংঘাতের জন্ম দেয়।

রাজনৈতিক অস্থিরতা:

নতুন গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো সুসংহত হতে সময় লাগে, ফলে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা দেখা দেয়। অনেক দেশে ক্ষমতা ও আদর্শের লড়াইয়ের কারণে সহিংসতাও ঘটে।

সামাজিক পরিবর্তন:

পুরনো সাম্যবাদী নীতি ও ব্যবস্থার পরিবর্তে নতুন সামাজিক কাঠামো ও মূল্যবোধের জন্ম হতে থাকে, যা সমাজের বিভিন্ন স্তরে অস্থিরতা সৃষ্টি করে।

গুরুত্বপূর্ণ দিক: 

  • এই বিক্ষুব্ধ পরিস্থিতি পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোতে এক নতুন যুগের সূচনা করে, যেখানে তারা তাদের নিজস্ব পথে নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের সুযোগ পায়।
  • যদিও এই পরিবর্তন প্রক্রিয়াটি কঠিন ছিল, এটি এই অঞ্চলে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

এইভাবে, "বিক্ষুব্ধ পূর্ব ইউরোপ" মূলত সেই সময়ের পরিবর্তন, অস্থিরতা এবং নতুন করে গড়ে ওঠার জটিল প্রক্রিয়াকে নির্দেশ করে, যা সাম্যবাদের পতন ও গণতান্ত্রিক যাত্রার ফলস্বরূপ ঘটেছিল। 

Satt Team 10
Satt Team 10
1 year ago
2.3k
উত্তরঃ

পররাষ্ট্রনীতি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নীতির সম্প্রসারণ। পররাষ্ট্রনীতি হলো কোনো সার্বভৌম রাষ্ট্রের গৃহীত সেসব নীতি যা রাষ্ট্র তার রাষ্ট্রীয় স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য অন্যান্য রাষ্ট্রের সাথে যোগাযোগ রক্ষার ক্ষেত্রে সম্পাদন করে থাকে। অন্য রাষ্ট্রের মতো বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে রাষ্ট্রের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতাকে তুলে ধরে।

১৯৭১ সালে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যুদয় আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। স্বাধীনতা লাভের পরবর্তী সময়ে ভৌগোলিক অবস্থান, স্বল্প পরিসরের ভূখন্ড এবং সীমিত অর্থনৈতিক সম্পদ ইত্যাদি বিভিন্ন নিয়ামক বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণের সুযোগকে সীমাবদ্ধ করে দেয়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি মূলত বহিঃশক্তির প্রভাব থেকে  দেশের সাবভৌমত্ব ও ভূখন্ডকে রক্ষা করার মতো বিষয়েই সীমাবদ্ধ থেকে গেছে।

পররাষ্ট্রনীতি সম্পর্কীয় সাংবিধনিক বিধান  বাংলাদেশের সংবিধানের বিভিন্ন অনুচ্ছেদে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির নির্দেশনা রয়েছে। এই নির্দেশনাসমূহ বাংলাদেশ সংবিধানের ২৫ নং অনুচ্ছেদে বর্ণিত হয়েছে। এগুলি হলো:

জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও সমতার প্রতি শ্রদ্ধা, অপর রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা, আন্তর্জাতিক বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধান এবং আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘের সনদে বর্ণিত নীতিসমূহের প্রতি শ্রদ্ধা, এ সকল নীতিই হবে রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভিত্তি এবং এ সকল নীতির ভিত্তিতে-

১. রাষ্ট্র আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে শক্তিপ্রয়োগ থেকে বিরত থাকা এবং সাধারণ ও পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণের জন্য চেষ্টা করবে; প্রত্যেক জাতির স্বাধীন অভিপ্রায় অনুযায়ী পথ ও পন্থার মাধ্যমে অবাধে নিজস্ব সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা নির্ধারণ ও গঠনের অধিকার সমর্থন করবে; এবং সাম্রাজ্যবাদ, উপনিবেশবাদ বা বর্ণ্যবৈষম্যবাদের বিরুদ্ধে বিশ্বের সর্বত্র নিপীড়িত জনগণের ন্যায়সঙ্গত সংগ্রামকে সমর্থন করবে।

২. রাষ্ট্র ইসলামী সংহতির ভিত্তিতে মুসলিম দেশসমূহের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব সম্পর্ক সংহত, সংরক্ষণ এবং জোরদার করতে সচেষ্ট হবে। সংবিধানের ৬৩ অনুচ্ছেদে যুদ্ধ-ঘোষণা সংক্রান্ত নীতি উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে সংসদের সম্মতি ব্যতিত যুদ্ধ ঘোষণা করা যাবে না, কিংবা প্রজাতন্ত্র কোনো যুদ্ধে অংশগ্রহণ করবে না। অনুচ্ছেদ ১৪৫(ক)তে বৈদেশিক চুক্তি সম্পর্কে বলা হয়েছে: ‘বিদেশের সাথে সম্পাদিত সকল চুক্তি রাষ্ট্রপতির নিকট পেশ করা হবে, এবং রাষ্ট্রপতি তা সংসদে পেশ করার ব্যবস্থা করবেন। তবে শর্ত হচ্ছে যে, জাতীয় নিরাপত্তার সাথে সংশ্লিষ্ট অনুরূপ কোন চুক্তি কেবলমাত্র সংসদের গোপন বৈঠকে পেশ করা হবে।’

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূলনীতিসমূহ  পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কিছু মূলনীতি অনুসরণ করে থাকে। জাতিসংঘ এবং ন্যামের মতো বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠনের সদস্য হিসেবে বাংলাদেশ এসব সংগঠনের মূলনীতিসমূহ মেনে চলে, এবং বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির প্রধান নীতিসমূহ এসব সংগঠনের নীতির সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির প্রধান চারটি মূলনীতি হলো:

সকলের প্রতি বন্ধুত্ব, কারও প্রতি বিদ্বেষ নয়  একটি দরিদ্র রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ তার অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য বৈদেশিক সাহায্যের উপর নির্ভরশীল হবার কারণে বাংলাদেশকে বিভিন্ন মতাদর্শ দ্বারা প্রভাবিত হতে হয়। এ কারণেই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু  শেখ মুজিবুর রহমান পররাষ্ট্রনীতির মূলনীতি হিসেবে বলেছিলেন, ‘আমাদের একটি ক্ষুদ্র দেশ, কারও প্রতি বিদ্বেষ নয়, আমরা চাই সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব’।

অন্য রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, স্বাধীনতা ও ভৌগোলিক অখন্ডতার প্রতি সম্মান প্রদর্শন  বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্য। জাতিসংঘ সনদের ২(৪) ধারায় বলা হয়েছে ‘আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সকল সদস্য-রাষ্ট্র আঞ্চলিক অখন্ডতার বিরুদ্ধে কিংবা অন্য কোনো রাষ্ট্রের রাজনৈতিক স্বাধীনতার বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগের ভীতি প্রদর্শন থেকে এবং জাতিসংঘের উদ্দেশ্যের সংঙ্গে সামঞ্জস্যহীন কোনো উপায় গ্রহণ করা থেকে নিবৃত্ত থাকবে’।

অন্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ না করা  জাতিসংঘ সনদের ২(৭) ধারায় বলা হয়েছে যে,  ‘বর্তমান সনদ জাতিসংঘকে কোনো রাষ্ট্রের নিছক অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের অধিকার দিচ্ছে না বা সেরূপ বিষয়ের নিষ্পত্তির জন্য কোনো সদস্যকে জাতিসংঘের দারস্থ হতে হবে না; কিন্তু সপ্তম অধ্যায় অনুযায়ী কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের ব্যাপারে এই নীতি অন্তরায় হবে না’। জাতিসংঘের একটি সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ এই মূলনীতির উপর তার পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন করেছে, যা অন্য রাষ্ট্রের কাছে বাংলাদেশের বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে প্রকাশিত।

২০০৯ সালে পুনরায় আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসে, এবং প্রধানমন্ত্রী  শেখ হাসিনা পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনয়নের কথা ঘোষণা করেন। বাংলাদেশের নিরাপত্তা ধারণা বিবেচনায় রেখে প্রায় তিন দশক পর ভারতের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের কথা ঘোষণা করা হয়। সম্প্রতি সরকার রাশিয়ার সাথে সম্পর্ক ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে রাশিয়ার সাহায্যে দেশে পারমাণবিক প্ল্যান্ট স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।

সময়ের পরিবর্তনের সাথে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ভবিষ্যত অর্জনের সম্ভাবনা অনেকটা ক্ষীণ হয়ে পড়ছে। এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ তার প্রতিবেশী এবং আঞ্চলিক রাষ্ট্রসমূহের সাথে এবং বিশ্বের আরো কিছু রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূলনীতি ‘সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে শত্রুতা নয়’ একটি সত্তুরের দশকের ধারণা, যা প্রায় ৪০ বছরের পুরনো। বর্তমান পরিবর্তিত বিশ্ব প্রেক্ষাপটে পুরনো ধারার পরররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করে বাংলাদেশ প্রতিনিয়ত তার অর্জনের সম্ভাবনা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। সুতরাং পররাষ্ট্রনীতির লক্ষ্য নিয়ে নতুন কৌশল-পরিকল্পনা করা উচিত, যার মাধ্যমে পরিবর্তিত বিশ্বে নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনের পথে বাংলাদেশ এগিয়ে যেতে পারে।  [ঊর্মি হোসেন]

Md. Aminul Islam
Md. Aminul Islam
3 years ago
4.5k
শিক্ষকদের জন্য বিশেষভাবে তৈরি

১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন
অনলাইন পরীক্ষা তৈরির সফটওয়্যার!

শুধু প্রশ্ন সিলেক্ট করুন — প্রশ্নপত্র অটোমেটিক তৈরি!

প্রশ্ন এডিট করা যাবে
জলছাপ দেয়া যাবে
ঠিকানা যুক্ত করা যাবে
Logo, Motto যুক্ত হবে
অটো প্রতিষ্ঠানের নাম
অটো সময়, পূর্ণমান
প্রশ্ন এডিট করা যাবে
জলছাপ দেয়া যাবে
ঠিকানা যুক্ত করা যাবে
Logo, Motto যুক্ত হবে
অটো প্রতিষ্ঠানের নাম
অটো সময়, পূর্ণমান
অটো নির্দেশনা (এডিটযোগ্য)
অটো বিষয় ও অধ্যায়
OMR সংযুক্ত করা যাবে
ফন্ট, কলাম, ডিভাইডার
প্রশ্ন/অপশন স্টাইল পরিবর্তন
সেট কোড, বিষয় কোড
অটো নির্দেশনা (এডিটযোগ্য)
অটো বিষয় ও অধ্যায়
OMR সংযুক্ত করা যাবে
ফন্ট, কলাম, ডিভাইডার
প্রশ্ন/অপশন স্টাইল পরিবর্তন
সেট কোড, বিষয় কোড
এখনই শুরু করুন ডেমো দেখুন
৫০,০০০+
শিক্ষক
৩০ লক্ষ+
প্রশ্নপত্র
মাত্র ১৫ পয়সায় প্রশ্নপত্র
১ ক্লিকে প্রশ্ন, শীট, সাজেশন তৈরি করুন আজই

Complete Exam
Preparation

Learn, practice, analyse and improve

1M+ downloads
4.6 · 8k+ Reviews